পুনর্জন্ম (পঞ্চশক্তি ও নাগমণি) — পর্ব ০৯

লেখক: রিয়াদ ইসলাম আযান · বিভাগ: সিজন সিরিজ · পর্ব ০৯ · ৩০ পর্বের মধ্যে ৯

আমি আর তাইমন ভাইয়া ঘুমনোর আগে শপিং করা নিয়ে অনেক প্ল্যান করে ঘুমিয়ে পড়ি।

প্রতিদিনের মতও আজ সকালেও পিপির ডাকে ঘুম ভাঙ্গলো...

পিপি:- চিশতি.. তাইমন, তাড়াতাড়ি উঠো ব্রেকফাস্ট করে নাও, এত বেলা অব্দি ঘুমলে হবে।

ভুলে গেছো শপিং করতে যেতে হবে আবার।

আমরা তাড়াতাড়ি ঘুম থেকে উঠে ফ্রেশ হয়ে নিচে চলে গেলাম ব্রেকফাস্ট করতে।

ব্রেকফাস্ট করা শেষে আমি পিপির কাছে গেলাম কিছু কথা জিজ্ঞেস করতে...

আমি:- পিপি...

পিপি:- হ্যাঁ! ব্যাটা বলো...?

আমি:- পিপি আমার আব্বু আম্মুও কি আমার মতোই এত ফর্সা..?

পিপি:- ধূর কি বলছো.? ওদের তোহ দুধে আলতা গায়ের রঙ, তোমার গায়ের রঙই তুষার বর্ণ।

আমি:- আচ্ছা পিপি বেশি ফর্সা হওয়া কি দোষের..?

পিপি:- তুমি এখনো হায়াতির কথা নিয়ে মন খারাপ করে আছো..?

আমি:- বলো নাহ পিপি, বেশি ফর্সা হওয়া কি দোষের..?

আমি তোহ ইচ্ছে করে এত ফর্সা হইনি, আল্লাহ চাইছেন বলেই তোহ এমন হয়েছি, উনি চাইলে তোহ কালোও হতে পারতাম তাই নাহ বলো..?

পিপি:- হ্যাঁ ব্যাটা তুমি ঠিক বলেছো..

আমি:- তাহলে হায়াত আমাকে অপমান করলো কেনো..?

পিপি:- তুমি ওর কথা বাদ দাও, আজকে নিজের দেশে যাবে কি কি করবে ওখানে গিয়ে সেসব ভাবো।

যাও তোহ ব্যাটা তাইমনকে ডেকে নিয়ে আমার রুমে আসো...

আমি:- আচ্ছা..

তাইমন ভাইয়াকে নিয়ে পিপির রুমে গেলাম..

আমি:- পিপি আসতে বলেছিলে...

পিপি:- এইযে তোমার ফুফাজি টাকা দিয়ে গেছেন, তোমাদের যা যা লাগে কিনে নিও...

আর তাইমন তোমাকে বলছি, তোমরা এর আগে কখনো বাংলাদেশ যাওনি তাই নিজেও সাবধানে থাকবে আর চিশতিকেও দেখে রাখবে...

তাইমন:- ওখানে তোহ চিশতিকে দেখার অনেকেই আছে, আম্মি...

আমি:- হ্যাঁ, হয়তো অনেকেই আছে, যদি সত্যি সত্যি অনেকেই থাকতো তাহলে জন্মের পর থেকে এখানে রেখে যেতো নাহ...

পিপি:- দিলি তোহ আমার সোনা বাবার মনটা খারাপ করে...

তুমি ওদের ভুল ভাবছো ব্যাটা ওরা ইচ্ছে করে তোমাকে এখানে রেখে যায়নি, তোমার সুরক্ষার কথা ভেবেই তোমাকে এখানে রেখে গেছে...

আমি:- সন্তানরা বাবা মায়ের কাছ থেকে আর কোথাও সুরক্ষিত থাকে বলে আমার মনে হয় নাহ...

পিপি:- কেনো ব্যাটা আমি কি তোমাকে আগলে রাখিনি..?

আমি কি তোমাকে ভালোবাসি নাহ..?

আমি:- কি বলছো পিপি.? তুমি আমাকে যথেষ্ট ভালোবাসো মাঝে মাঝে মনে হয় তুমি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ পিপি।

পিপি:- আচ্ছা! আচ্ছা! এখন যাও তোমাদের কি কি লাগবে শপিং করে আসো...

সারাদিন ধরে অনেক অনেক শপিং করলাম।

আমার জন্য, তাইমন ভাইয়ার জন্য, দেশের মানুষের জন্য, পিপি-ফুফাজির জন্যও নিলাম।

আমি নিজের দায়িত্বে হায়াতির জন্য কিছুই কিনলাম নাহ কারণ আমি জানি ও এখন আমাকে অনেক ঘৃণা করে, আমার দেওয়া কিছুই নিবে নাহ।

সবকিছু কেনাকাটা করে বাড়ি চলে এলাম।

পিপি:- তোমরা তাড়াতাড়ি করে গোসল করে আসো তারপর কিছু খেয়ে নাও আমি আর হায়াতি তোমাদের ব্যাগ প্যাক করে দিচ্ছি।

তোমার ফুফাজি এয়ারপোর্টে তোমাদের জন্য অপেক্ষা করছে।

সাড়ে আট'টার মধ্যে ওখানে থাকতে বলেছে তোমাদের।

আমি আর তাইমন ভাইয়া গোসল করে এসে খাবার খাচ্ছি আর উপরে পিপি আর হায়াতি আমাদের ব্যাগ প্যাক করছে।

খাওয়া দাওয়া করে আমি আর তাইমন ভাইয়া ব্যাগ নিয়ে বেরিয়ে পরলাম।

যাওয়ার সময় পিপি আর হায়াতিকে বিদায় জানালাম কিন্তু হায়াতি আমার বিদায়ের কোনো প্রতুত্তর করলো নাহ।

মন খারাপ নিয়েই বেরিয়ে পরলাম, কিচ্ছু করার নেই যে ভালোবাসতে চায় নাহ তাকে দিয়ে জোড় করে ভালোবাসানো যায় নাহ।

মাঝ রাস্তায় গাড়িতে তাইমন ভাইয়া আমাকে জিজ্ঞেস করলো...

তাইমন:- কিরে, তোর সাথে কি হায়াতির ঝগড়া হয়েছে নাকী..?

আমি:- কই নাহ তোহ, কেনো রেহ..?

তাইমন:- লক্ষ করলাম তুই ওর সাথে কথা বলতে গেলে ও তোকে ইগ্নোর করছে..

আমি:- হয়তো অভিমান করেছে কারণ আমার সাথে তোকে পাঠাচ্ছে অথচ ওকে পাঠানো হলো নাহ...

তাইমন:- হয়তো..

কথা বলতে বলতে এয়ারপোর্টে চলে এলাম....

ফ্লাইটে উঠার আগে পিপির সাথে কলে কথা হলো...

পিপি:- চিশতি ব্যাটা, সাবধানে যেও, আর ওখানে পৌঁছেই আমাকে কল করবে...

আর হ্যাঁ বাংলাদেশে তোমাদের যে বাড়ি ওইটা কিন্তু আমাদের মতো এত উন্নত নাহ, ওখানে তোমার কষ্ট হতে পারে একটু সহ্য করে নিও ব্যাটা।

আর তুমি সুস্থ হয়ে গেলে তোহ আবার আমাদের কাছেই ফিরে আসবে।

আমি:- আচ্ছা পিপি ঠিক আছে।

আমাদের এয়ারপোর্ট থেকে কে কে নিতে আসবে..?

পিপি:- তোমার বড় ভাইয়া, ছোট আপুনি, আর তোমার আব্বু।

আমি:- আমরা তোহ উনাদের কখনো দেখিনি চিনবো কিভাবে...

এত বছরে উনারা একটা দিনও আমার কাছে৷ একটু কথা বলেনি, আমি যে তাদের কেউ এটা তারা ভুলেই গেছে...

পিপি:- এসব ব্যাপারে মন খারাপ করতে নেই ব্যাটা, আর আমি তোমার হোয়াটসঅ্যাপে ওদের পিক দিচ্ছি, ফ্লাইটে উঠার আগে ড্যাটা অন করে পিকগুলো দেখে নিও।

পিপি কল কেটে উনাদের সবার পিক দিলো...

পিকগুলোতে ওদের দেখে কত হাসিখুশি মনে হচ্ছে, আর হবেই নাহ কেনো ওরা সবাই ছোট থেকেই বাবা মায়ের আদর পেয়ে বড় হয়েছে...

দেখতে দেখতে ১১টা ১৮মিনিট হয়ে গেলো, আমি আর তাইমন ভাইয়া ফ্লাইটে উঠে নিজেদের সিটে বসে পরলাম।

কিছুক্ষণ পর বিমানবালা এসে আমাদের সুরক্ষার জন্য কিছু কথা বললো।

ফ্লাইটের সকল নিয়ম মেনে প্ল্যান আকাশে উড়তে শুরু করলো।

আমি আর তাইমন ভাইয়া প্ল্যানেই ঘুমিয়ে পরলাম।

হঠাৎ আমার ঘুম ভেঙ্গে গেলে দেখতে পাই আমি একটা বিশাল রাজপ্রাসাদে দাঁড়িয়ে আছি...

প্রাসাদের বাইরে গোলাপ বাগানে একটা মেয়ে আসন পেতে করজোড় করে বসে আছে, হয়তো সে কোনো কিছুর জন্য উপাসনা করছে...

কিছুটা এগিয়ে গিয়ে দেখি মেয়েটা একদম আমার মতো তুষার বর্ণের চুলগুলোও আমার মতোই সোনালী।

প্রাসাদ থেকে কোনো এক মহিলা এসে মেয়েটিকে ডাক দিতেই আমার ঘুম ভেঙ্গে যায় তাইমন ভাইয়ার ডাকে....

তাইমন:- কিরে, এখানেই থাকবি নাকী..?

চল প্ল্যান ল্যান্ড করেছে...

আমি:- সকাল হয়ে গেছে..

তাইমন:- আরে রাখ তোর সকাল, প্ল্যান ল্যান্ড করেছে, আমরা এখন বাংলাদেশে...

আমি:- ওহ্, তাহলে চল...

প্ল্যান থেকে নামার পর আমার আর তাইমন ভাইয়ার প্রচুর পরিমাণে মাথা ব্যথা শুরু হয়, হঠাৎ এমন মাথা ব্যথা কেনো শুরু হলো কিছুই বুঝলাম নাহ।

মাথা ব্যথার মধ্যে আমি যেনো কারো প্রতিচ্ছবি আমার চারপাশে দেখতে পাচ্ছিলাম, তাইমন ভাইয়া বললো ও-ও নাকী ওর আশপাশে কারো প্রতিচ্ছবি দেখতে পাচ্ছে কিন্তু চেহারাগুলো বুঝা যাচ্ছে নাহ....

যাই হোক মাথা ব্যথা নিয়ে আমরা এয়ারপোর্টের ওয়েটিং রুমে বসে আছি কিছুক্ষণ পর দেখলাম বড় ভাইয়া আর ছোট আপুনি কোনো একটা বিষয় নিয়ে হাসতে হাসতে আমাদের দিকে এগিয়ে আসছে তাদের পিছনে ওই দেখা যাচ্ছে আমার আব্বুর মুখটা...

জীবনে প্রথমবার নিজের আপন ভাই বোন আর নিজের পিতার চেহারা চোখের সামনে দেখার যে কি একটা অনুভূতি কাউকে বুঝাতে পারছিলাম নাহ তখন।

ওদের দিকে যেনো আমি এক দৃষ্টিতে তাকিয়েই আছি, আমার চোখ দিয়ে অঝোরে টপটপ করে পানি পড়ছে।

ছুটে এসে আমার বড় ভাইয়া আর ছোট আপুনি তাইমনকে জড়িয়ে ধরলো, এখন আমার একটু অভিমান আর হিংসা হলো তারা আনার আপন ভাই বোন আমাকে আগে নাহ জড়িয়ে ধরে তাইমনকে জড়িয়ে ধরলো কেনো..?

[আসলে তাইমনের ওদের মতোই দুধে আলতা গায়ের রঙ তাই ওরা ভেবেছিলো তাইমনই আমি আর আমি তাইমন]

সবশেষে আমার আব্বু এসে আমাকে জড়িয়ে ধরে বললো...

আব্বু:- তোমাদের আসতে কোনো অসুবিধা হয়নি তোহ...

আমি উনার কথার মানে বুঝলাম নাহ তাই উর্দুতে জিজ্ঞেস করলাম সে কি বললেন...

তারপর আব্বু আমার সাথে উর্দুতে কথা বললেন...

আমিও তাকে উর্দুতে জবাব দিলাম।

আম্মু:- হাসমি, চিত্রা এটাই তোদের ছোট ভাই চিশতি...

তখন আমি মনে মনে ভাবছি, পিপি বলেছিলো আমার ভাইয়ার নাম লাবিব আর ছোট আপুনির নাম মরিয়ম তাহলে আব্বু ওদের হাসমি আর চিত্রা বলে ডাকলো কেনো...?

হাজারটা প্রশ্ন আমার মনে ঘুরপাক খাচ্ছে...

যাই হোক ভাইয়া আর আপুনি এসে আমাকে জড়িয়ে ধরে বললো...

আপুনি:- কেমন আছিস ছোটু..?

আমি:- আলহামদুলিল্লাহ, শুকরিয়া জানাই মহান আল্লাহ তায়ালাকে যিনি আমাকে সুস্থ রেখেন, আপনারা কেমন আছেন..?

আপুনি:- আমরাও ভালো আছি, আর আপনি আপনি করে কি বলছিস হ্যাঁ.?

আমরা তোর ভাই বোন আমাদের তুই করে বলবি...

আমি:- ঠিক আছে

ভাইয়া:- বাকি কথা বাসায় গিয়ে বলবো এখন চল..

আব্বু:- হ্যাঁ চলো বাইরে গাড়ি দাঁড় করিয়ে এসেছি...

তাইমন:- গাড়ি কি আপনাদের নিজেদের..?

ভাইয়া:- নাহ, ভাইয়া..

তাইমন:- ওহ্, আমি ভেবেছিলাম আপনাদের..

আমি:- এখন এসব কথা বাদ দে...

আপুনি:- তাড়াতাড়ি আয় বাসার সবাই তোদের জন্য অপেক্ষা করে আছে...

আব্বু:- হ্যাঁ, লাগেজগুলো নিয়ে যা এক এক করে...