পুনর্জন্ম (পঞ্চশক্তি ও নাগমণি) — পর্ব ৩০

লেখক: রিয়াদ ইসলাম আযান · বিভাগ: সিজন সিরিজ · পর্ব ৩০ · ৩০ পর্বের মধ্যে ৩০

সাদিয়া ও তার মাকে সবকিছু বুঝিয়ে তাদের মূসা হুজুরের সন্ধান দি। এরপর লাঞ্চ করে আমি বাড়ি ফিরে আসি।

বাড়ি আসার পর থেকেই আমার শরীরে ধূম জ্বর উঠে। প্রচুর মাথা ব্যথা। এসবের পাশাপাশি আবার রক্তক্ষরণও হচ্ছিল। তখনই আমার মাথার টনক নড়ে উঠে, আমি ফিউচার ফিল করতে পারি। তাহলে একবার চেষ্টা করে দেখি গফফার হুজুর সেই লেবুটা কোথায় লুকিয়েছে যদি জানতে পারি।

এতদিন কাজের কাজ নাহ করে কতশত অপ্রোয়জনীয় কাজ করেছি। আর যে কাজটা আমার সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সেটার কথাই ভুলে গেছি। যাই হোক হয়তো কালোজাদুর ফলেই হঠাৎ করে শরীরটা খারাপ হয়ে গেলো। একটু চেষ্টা করি যদি জানতে পারি তাহলে আরো একটু সমস্যা সমাধান হবে।

যেই ভাবা সেই কাজ, চোখগুলো বন্ধ করে চেষ্টা করতে থাকি কিছু অনুভব করার জন্য। কিন্তু এবার কোনো কিছুই দেখতে পাচ্ছিলাম নাহ। সবকিছু কেমন কালো, অন্ধকার। কি ব্যাপার.? এর আগে তোহ কখন এমন হয়নি.? তাহলে আজ হঠাৎ করে এমন হলো কেনো..? হয়তো আমার শরীর খারাপ এজন্য কিছু দেখতে পারছি নাহ। শরীর ঠিক হলে হয়তো আবারও সবকিছু দেখতে পারবো। অপেক্ষা করতে থাকি।

ওইদিন অসুস্থ শরীর নিয়ে রাতটা কাটাই। সকালে ঘুম ভাঙ্গে সাদিয়ার কলে। কল রিসিভ করার আগেই কেটে যায়। আমার ফোনে ব্যালেন্স নাহ থাকার কারণে দ্বিতীয় বার কলের অপেক্ষা করতে থাকি তখনই একটা টেক্সট আসে "সরি দোস্ত, পারলে আমাকে ক্ষমা করে দিস! আমি অনেক দূরে চলে যাচ্ছি। তুই আমাকে কোনোদিন খুঁজিস নাহ। তোকে অনেক ভালোবাসি, প্রিয় বন্ধু তুই আমার। আমার কঠিন সময়ে তোকে পাশে পেয়েছি। আব্বুও এখন আমাদের সাথে কথা বলে আর আম্মুও একদম সুস্থ হয়ে গেছে। নিজের যত্ন নিস। কখনো আমার কথা মনে পড়লে আমার দেওয়া ডায়েরিতে লিখে রাখিস। কোনোদিন হয়তো আমাদের আবার দেখা হবে তখন এই ডায়েরিটা চাইবো তোর কাছে। ভালো থাকিস" টেক্সটটা পড়ার পর রিপ্লাই দিতে যাবো তখনই দেখি সাদিয়া আমাকে ব্লক করে দিয়েছে। কিছুটা খটকা লাগার ফলে ইমার্জেন্সি ব্যালেন্স এনে কল দি তাও দেখি ব্লক করে দিয়েছে। ছুটে গিয়ে আম্মির ফোন থেকে কল দিয়ে বুঝতে পারি সিম নট রিচঅ্যাবেল। কি হলো হঠাৎ করে.? কিছু নাহ জানিয়েই কেনো এমনটা করলো। কোনো রকম ব্রাশ করে অসুস্থ শরীর নিয়েই দৌড়ে চলে গেলাম সাদিয়ার বাসায়। গিয়ে দেখি বাসার মেইন গেটে তালা ঝুলছে। আশেপাশের লোকজনকে জিজ্ঞেস করলে তারাও কিছু বলতে পারে নাহ। এই কয়েকদিন সাদিয়ার সাথে যতগুলো জায়গায় ঘুরতে গিয়েছিলাম আজ সারাদিন সেই সকল জায়গায় খুঁজলাম কিন্তু কোত্থাও সাদিয়াকে খুঁজে পেলাম নাহ। ওর অন্যান্য ফ্রেন্ডের কাছেও জানাই ব্যাপারটা কিন্তু কেউ কিচ্ছু বলতে পারে নাহ।

এক প্রকার কান্না মাখা চেহারা নিয়ে বাড়ি ফিরে এলাম। সারাদিন নাওয়া খাওয়া কিচ্ছু হয়নি। নিজের রুমের এক কোণে বসে বসে কান্না করতে থাকি। যদি চলেই যাওয়ার ছিলো তাহলে কেনো এতটা ক্লোজ হয়েছিলো.? আমি কি কোনো অন্যায় করেছি.? কেনো আমার সাথে এমনটা করলো.? যদি কোনো অন্যায়ও করে থাকি তাহলে একটি বার আমাকে বলতে পারতো আমি শুধরে নিতাম কিন্তু এভাবে অগোচরে চলে যাওয়ার মানে কি.? কান্না করার এক পর্যায়ে দরজায় কেউ নক করলো। আমি চোখের পানি মুছে দরজা খুলে দেখি হাসমি ভাইয়া....

চিশতি:- ভাইয়া তুমি.?

হাসমি:- কোথায় গিয়েছিলি.?

চিশতি:- এইতো এখানেই

হাসমি:- সারাদিন বাইরে কাটিয়ে বিকেলে বাড়ি ফিরে এসে বলছিস এখানেই। তাও আবার কাউকে কিচ্ছু নাহ জানিয়ে গিয়েছিস

চিশতি:- তেমন কিছু নাহ ভাইয়া

হাসমি:- যাকগে এসব নিয়ে কথা বলতে আসিনি। তোর সাথে একটা জরুরী কথা ছিলো

চিশতি:- কি কথা.?

হাসমি:- দেখ! ভাই আমার! আমি জানি আর কেউ আমার কষ্টটা নাহ বুঝলেও তুই আমার কষ্টটা বুঝবি।

চিশতি:- হয়েছেটা কি সেটা তোহ বলবে.?

হাসমি:- আমি বিয়ে করতে চাই। আর কতকাল এভাবে একা একা জীবন কাটাবো বল তোহ.? এই পরিবারের ভুলের জন্য আমাকে কেনো মাশুল দিতে হচ্ছে বলতে পারিস.?

চিশতি:- ভাইয়া.. তুমি তোহ জানো......

হাসমি:- হ্যাঁ! আমি সবটা জানি! কিন্তু এখন আর এসব সহ্য করতে পারছি নাহ। ভাই তোর তোহ অনেক ক্ষমতা তুই কি আমার বিয়েটা দিতে পারবি নাহ.? আমি তুই চাইলে আমার বিয়েটা দিতে পারবি। প্লিজ ভাই আমার, আমার এই অনুরোধটা রাখ।

চিশতি:- ভাইয়া! ভাইয়া! ভাইয়া! তুমি এত অধৈর্য হচ্ছো কেনো.? আমি দেখছি কি করা যায়! তুমি যাও আমি পরে এ বিষয়ে তোমার সাথে কথা বলবো।

ভাইয়াকে তোহ বুঝিয়ে পাঠিয়ে দিলাম কিন্তু এবার কি করবো আমি.? এমন একটা পরিস্থিতিতে রয়েছি কিছুই করতে পারছি নাহ। ওইদিকে সাদিয়াকে খুঁজে পাচ্ছি নাহ। এদিকে ভাইয়া বিয়ে করতে চাচ্ছে। আর এগুলোর মাঝখানে আমার প্রতিশোধ।

যাই হোক একবার সাক্ষী আর জটায়ুকে ডেকে দেখি ওরা কোনো সমাধান দিতে পারে কি নাহ..?

চোখ বন্ধ করে ওদের ডাকতে থাকি কিন্তু ওদের কোনো সারা পাচ্ছিলাম নাহ। কি হলো ওরা আসছে নাহ কেনো..? ওরা কি আমাকে ধোঁকা দিলো..? এভাবে লড়াইয়ের মাঝপথে আমাকে একা করে সবাই চলে গেলো.? এখন একা একা কিভাবে এই যুদ্ধে বিজয়ী হবো.? আমি কি একা বিজয়ী হতে পারবো.?

১৯শে ফেব্রুয়ারী আম্মি আমার কাছে এসে বলে "মূসা হুজুরের বউ প্রেগন্যান্ট" শুনে আমিও খুশি হলাম। মূসা হুজুরের কথা শুনে মনে পড়লো, এখন যদি আমাকে কেউ হেল্প করতে পারে সেটা একমাত্র মূসা হুজুর। তড়িঘড়ি করে মূসা হুজুরকে কল দিলাম। কল করার সাথে সাথে রিসিভ করলেন তিনি।

চিশতি:- হ্যালো! আসসালামু আলাইকুম

আল মূসা:- ওয়া আলাইকুম সালাম

চিশতি:- হুজুর আপনি কি ফ্রী আছেন.?

আল মূসা:- হ্যাঁ! কিন্তু কি হয়েছে.?

চিশতি:- আপনার সাথে আমার জরুরী কিছু কথা আছে। আমি কিছুক্ষণ পর আসছি।

আল মূসা:- ঠিক আছে। আর ধন্যবাদ তোমাকে

চিশতি:- ধন্যবাদ দিয়ে ছোট করবেন নাহ। আপনি আমাদের জন্য যা যা করেছেন সেগুলোর কাছে এটা কিছু নাহ্।

মূসা হুজুরের সাথে কথোপকথন শেষ করে ফ্রেশ হয়ে নিচে চলে গেলাম। নিচে আসার পর চাচ্চুর ঘর থেকে কেমন ফিসফিস শব্দ ভেসে আসছিলো এজন্য এক পা দু পা করে চাচ্চুর রুমের সামনে যাই। দরজার পাশে দাঁড়াতেই শুনি.....

ফুফাজি:- হা!হা!হা! যাই বলো। আগের জন্মে আমাদের যে শক্তি ছিলো ওই শক্তি যদি এই জন্মেও থাকতো তাহলে নিমেষেই ওই পঞ্চশক্তি আমাদের হতো

চাচ্চু:- আগের জন্মেই বা পঞ্চশক্তি দখল করলাম কবে.? তখন তোহ আমরা আরো বেশি শক্তিশালী ছিলাম কিন্তু তখনও দখল করতে পারিনি। আরো হেরে গেলাম ওই পঞ্চমা আর চন্দ্রাবতীর চালে।

ফুফাজি:- ভুলে যেও নাহ, ওরা জিতে গিয়েও হেরে গিয়েছিলো।

চাচ্চু:- হ্যাঁ! ওরাও পঞ্চশক্তি পেলো নাহ আর আমরাও পাইনি। কিন্তু সবশেষে ওরা নিজেদের জীবনটাই হারালো। বেচারি পঞ্চমা ও তার স্বামী সন্তান আমাদের হাতে জীবন হারালো।

"তার মানে ওইদিন আমি ঠিকই শুনেছিলাম। ওরা আগের জন্মে আমার পিতা মাতাকেও হত্যা করেছে"

ফুফাজি:- পঞ্চমা আর বাবর আজমকে এমন ভয়ংকর মৃত্যু দিয়েছি যে ওদের লাশ দেখে কুকুরও মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে

চাচ্চু:- হা!হা!হা! সে আবার বলতে। এমন কালোজাদু করেছিলাম যে কালোজাদুর প্রভাবে ওদের শরীরে হাড় ছিলো ঠিকই কিন্তু কোনো মাংস ছিলো নাহ। শরীরের চামড়া গলে গলে পড়ছিলো। হাজারো পোকামাকড় ওদের শরীরে বাসা বেঁধেছিলো জীবিত অবস্থায়ই।

তখনই আমার ফোনে রিং বেজে উঠে....

চাচ্চু:- কে! কে ওখানে..?

ফোনটা তুলে দেখি মূসা হুজুর কল করেছে। কল কেটে দিয়ে চাচ্চুর রুমে গিয়ে ঢুকলাম।

ফুফাজি:- আমি আগেই বলেছিলাম তুই ছাড়া আর কারো স্পর্ধা হবে নাহ আমাদের কথা শোনার জন্য আড়ি পাতবে।

চিশতি:- আজ শুধু আড়ি পাততে আসিনি। আজ তোমাকে উপর খাপ পাততে এসেছি

চাচ্চু:- মানে.?

চাচ্চুর কথার উত্তর নাহ দিয়ে বাঘ রূপে আসার চেষ্টা করলাম অথচ বাঘ হতে পারলাম নাহ। কি হলো.? ব্যাঘ্র শক্তিও কাজ করছে নাহ কেনো..? রীতিমতো অবাক হয়ে গেলাম। আমার কোনো শক্তি কাজ করছে নাহ। তার সাথে সাথে সাক্ষী আর জটায়ুকে ডাকার পরও আসলো নাহ। কিছু তোহ একটা গোলমাল হচ্ছে। হঠাৎ করে চাচ্চু বলে উঠলো...

চাচ্চু:- কি কোনো শক্তি কাজ করছে নাহ.? হা!হা!হা!

ফুফাজি:- আর কাজও করবে নাহ! হা!হা!হা!

চাচ্চু:- সে ফিরে এসেছে! শীতাক্ষী ফিরে এসেছে। এবার আমাদের কেউ হারাতে পারবে নাহ।

ফুফাজি:- আমাদের বোন যেমন সবচেয়ে জেদি তেমনই সবচেয়ে শক্তিশালীও। তুই নিজেও বুঝতে পারছিস নাহ তুই কার জালে পা দিয়েছিস।

"তার মানে আমার সাথে যা যা হচ্ছে সবকিছু ওই শীতাক্ষীর কারণেই হচ্ছে! কিন্তু কে এই শীতাক্ষী.? কোথায় খুঁজবো তাকে.?"

চাচ্চু আর ফুফাজির সাথে কথা নাহ বাড়িয়ে ডাইনিং-এ চলে এলাম। তখন আবারও মূসা হুজুর কল দিলো। কল রিসিভ করতেই....

আল মূসা:- হ্যালো! চিশতি তুমি কোথায়.?

চিশতি:- এই তোহ আমি বাসায়ই আছি এখন

আল মূসা:- এখনো বের হওনি.?

চিশতি:- নাহ! কেনো কি হয়েছে.?

আল মূসা:- কিছুই হয়নি। শুধু জিজ্ঞেস করার জন্য কল করলাম। আচ্ছা আমাকে খুলে বলো তোহ কি কারণে হঠাৎ দেখা করতে চাইছো..?

চিশতি:- হুজুর! গফফার হুজুর আমার উপর কালোজাদু করেছে একটা লেবুর মাধ্যমে। আমার শরীর থেকে অনবরত রক্তক্ষরণ হচ্ছে। এখন কি করবো.? ওই লেবু নাহ পেলে হয়তো এভাবেই একদিন মারা যাবো.?

আল মূসা:- ওই লেবু হাতে পেলেও তুমি কিছু করতে পারবে নাহ.!

চিশতি:- মানে.?

আল মূসা:- ফোনে এতকিছু বলা যাবে নাহ। তুমি আসার সময় একটা ব্লেট, ছুড়ি আর একটা লেবু নিয়ে এসো।

চিশতি:- আবার লেবু.?

আল মূসা:- যা বলছি শুনো

চিশতি:- ঠিক আছে।

ব্রেকফাস্ট করেই বেরিয়ে পরি মূসা হুজুরের বাসার উদ্দেশ্যে। যাওয়ার সময় একটা লেবু, ব্লেট আর একটা ছুড়ি কিনে সাথে করে নিয়ে গেলাম।

হুজুরের বাসায় যাওয়ার পর, উনি কথা নাহ বাড়িয়ে আমার হাত থেকে ছুড়িটা নিয়ে ওইটা দিয়ে মাটিতে কিছু একটা অঙ্কন করলো দেখতে অনেকটা ঘরের মতো হলেও জিনিসটা ঘর নাহ। তারপর ব্লেট দিয়ে এক এক করে সবগুলো ঘরের মতো দেখতে অঙ্কনগুলো কাটলো। এরপর লেবুটা নিলো। ব্লেট দিয়ে লেবুর শরীরে অনেকগুলো আচ কাটলো। এরপর লেবুটা আমার কাছে দিয়ে বললো "আগুনে পুড়িয়ে ফেলতে"। লেবুটা পুড়িয়ে ফেললেই আমি সুস্থ হয়ে যাবো। আমার আর রক্তক্ষরণ হবে নাহ। মূসা হুজুরের কথা মতো উনার সামনেই লেবুটা পুড়িয়ে ফেলি।

যাই হোক আমার ৬টা প্রশ্নের মধ্যে ২টা প্রশ্ন জানা হয়েছে। এখন আবার নতুন কিছু প্রশ্ন বের হলো এগুলোর উত্তরও জানতে হবে।

মূসা হুজুরকে সবকিছু খুলে বললাম তারপর উনি জায়নামাজ বিছিয়ে চোখ বন্ধ করে কিছু আয়াত পড়লো। অনেকক্ষণ চুপ থাকার পর উনি বললেন.....

আল মূসা:- তোমার উপর একটা ভয়ংকর কালোজাদু করা হয়েছে। এরফলে তুমি তোমার কোনো শক্তি প্রয়োগ করতে পারবে নাহ। এই জাদুর ফলেই তোমার লড়াইয়ের সাথীরা তোমার ডাকে সাড়া দিতে পারছে নাহ।

চিশতি:- এখন উপায়..?

আল মূসা:- উপায় একটাই, যেভাবেই হোক তোমাকে তোমার পঞ্চশক্তি অর্জন করতে হবে। ওই শক্তির বলেই তুই এই কালোজাদুর প্রভাব কাটাতে পারবে।

চিশতি:- কে বা কারা আমার উপর কালোজাদু করেছে সেটা বলতে পারবেন..?

আল মূসা:- নাহ! এটা বলা সম্ভব নাহ।

হুজুরের সাথে কথা শেষ করে বাড়ি ফিরে আসি। আর মাত্র একটা দিন তারপর বগুড়া যাবো। আর একবার যদি বগুড়া জেলায় পৌঁছে যাই তাহলে পঞ্চশক্তি নিয়েই ফিরবো।

২০শে ফেব্রুয়ারী গোছগাছ শুরু করি। চিত্রা আপুনি, জিজু, ভাইয়া, আমি, কাকিয়া, চাচ্চু, ফুফাজি, আব্বু, আম্মি এক কথায় আমরা সবাই যাবো। যাকে বলে ফ্যামিলি ট্যুর।

ওইদিকে আগামীকাল যে আমার জন্মদিন সেদিকে আমার খেয়ালই ছিলো নাহ।

২০শে ফেব্রুয়ারী বিকেলে বগুড়া জেলায় গিয়ে পৌঁছালাম। উপজেলার সামনে দিয়ে যখন গাড়ি যাচ্ছিলো তখন খেয়াল করলাম বড় বড় অক্ষরে একটা ভবনে লিখা "শিবগঞ্জ পৌরসভা ও জেলা কর্পোরেশন" তারমানে জায়টার নাম শিবগঞ্জ।

উপজেলা থেকে গাংগাইট গ্রামে যেতে ১৫ মিনিট লাগলো।

উনাদের বাসায় গিয়ে আমি প্রায় অবাক। একটা পুরাতন বাড়ি। দেখতে কোনো রাজপ্রাসাদের মতোই। কিন্তু বাড়িটা একদম তালাবদ্ধ। দেখে মনে হচ্ছে শতবছর ধরে এইখানে কেউ প্রবেশ করে নাহ। প্রাসাদের সামনেই একটা ঘাট। ঘাটের সামনে আবার সাইনবোর্ড টাঙানো "যতন রাজার ঘাট"।

তার মানে এই ঘাটেই সাক্ষী বসবাস করতো। ঘাটের চারিদিকে রঙিন লাইট জ্বালানো হয়েছে। ঘাটটিও সুন্দর করে সাজানো হয়েছে। দেখে মনে হয় নাহ এটা কোনো মুসলিম বাড়ি। কেমন অস্বস্তিকর একটা অনুভূতি। হিন্দু বাড়ির মতো লাগছিলো সবকিছু। এতটুকু সময়ে যা বুঝলাম, যতন রাজার প্রাসাদ আর ঘাট কাকিয়ার বাপের বাড়ি লোকেরাই পেয়েছে। এগুলো তাদেরই জমি।

আম্মির কাছে জিজ্ঞেস করে জানতে পারি এই জমির মালিক কাকিমার ভাই রমজান মামার নামে।

কিন্তু যতন রাজার বংশধর কোথায়.? প্রশ্ন তোহ হাজারটা ঘুরপাক করছে কিন্তু এগুলোর উত্তর কে দিবে.?

২০শে ফেব্রুয়ারী রাত ৯টার দিকে, আমাদের সবাইকে একটা রুমে বিশ্রামের জন্য নিয়ে গেলো। আমরা যে যার মতো কথা বলছিলাম তখন রুমে একটা মেয়ে এলো। দেখতে তেমন ফর্সা নাহ হলেও চেহারাটা খুব মিষ্টি। যে কেউ ওই চেহারার মায়ায় পড়ে যাবে। শ্যামলা মুখে কাজল কালো চোখগুলো যেনো আরো বেশি সুন্দর লাগছে। চুলগুলো বিনুনি করা। ঠোঁটে হালকা গোলাপি লিপস্টিক আর হ্যাঁ একটা নীল রঙের শাড়ী পড়া ছিলো। প্রথম দেখায় ভালো লেগে গেলো। মনে মনে নিজেকে গালি দিতে থাকি, প্রথমে হায়াতি তারপর সাদিয়া এখন আবার এই মেয়েটা। আমি কি প্লেবয় হয়ে গেলাম নাহ মানে যাকে দেখি তাকেই ভালো লাগে। নাহ আসলে তেমনটা নাহ! হায়াতিকে ভালো লাগতো ওর বাচ্চামো'গুলোতে আর সাদিয়াকে ভালো লাগতো সেইম মেন্টালিটির বলে। কিন্তু ওদের দুইজনের একজনকেও প্রথম দেখায় এত ভালো লাগেনি। এই মেয়েটিকে দেখার পর যেনো আমার চোখগুলো ওর দিকেই আটকে গেলো। চোখ সরতেই চাইছিলো নাহ।

যাই হোক মেয়েটি আমাদের সবার জন্য শরবত সাথে আরো অনেক কিছু নিয়ে। মেয়েটিকে দেখে কাকিয়া বললো....

কাকিয়া:- আরে নূরী! এতকিছু কে আনতে বলেছে তোকে.?

নূরী:- আমি আম্মাজানকে বলেছিলাম, শুধু শরবতটুকুই নিয়ে যাই কিন্তু তোমার ভাবি এত সব আমার হাতে ধরিয়ে দিলো। যারা খেতে চায় নাহ তাদের এত খাবার নাহ দেওয়াই উচিৎ!

বুঝতে পারলাম এটা রমজান মামার মেয়ে কিন্তু নূরীর এমন কথা শুনে আমার অনেক সন্দেহ হলো। এতগুলো গেস্টের সাথে মেয়েটি এভাবে কাকিয়াকে অপমান করছে কেনো।

যা বুঝলাম মেয়েটি এতক্ষণ আমাকে দেখেনি। হঠাৎ যখন মেয়েটি আমার দিকে তাকালো....

নূরী:- তুমি!

চিত্রা:- তুমি ওকে চিনো..?

নূরী:- নাহ! চিনি নাহ। তবে চেনা চেনা লাগছে

চিশতি:- কি বলেন.?

নূরী:- হ্যাঁ! হয়তো আগের জন্মের কোনো সম্পর্ক আছে আমাদের

ওর কথা শুনে সবাই হাসলেও আমি হাসিনি। আমার এখন কেমন সন্দেহ হতে লাগলো। এই মেয়েটিই কি ৯জন জাদুকরের একমাত্র বোন।

কি বলতে চাইছে মেয়েটি.?

মেয়েটি চলে গেলো। যে যার মতো কথা বলছে। আমার কেমন যেনো এক অদ্ভুত অনুভূতি হতে লাগলো।

যাই হোক চিত্রা আপুনিকে একাকী ডেকে কিছু কথা জিজ্ঞেস করলাম....

চিশতি:- আপুনি! একটা কথা বলতে পারবি.?

চিত্রা:- কি.?

চিশতি:- বড় আপুনি যখন ওয়ারিশ নিয়েছিলো তখন কি ও নিজের ইচ্ছায় নিয়েছিলো নাকী ওর উপর কোনো জাদু টোনা করা হয়েছিলো.?

চিত্রা:- হঠাৎ এই প্রশ্ন??

চিশতি:- তুই বল.?

চিত্রা:- কি জানি! আমি তোহ তখন নেত্রকোনা ছিলাম। আর পরে যতটুকু জানতে পেরেছিলাম, চৈতীর উপর জাদু করা হয়েছিলো।

চিশতি:- বড় জিজু কেনো এমন কাজ করলো.?

চিত্রা:- কি জানি! বাদ দে এসব। আজকে কত সুন্দর একটা দিন এটা উপভোগ কর।

চিশতি:- তোর কাছে বড় জিজুর কোনো ছবি আছে.?

চিত্রা:- আমার কাছে নেই। তবে উনার ফেইসবুক আইডিতে আছে

চিশতি:- উনার সাথে তোর অ্যাড আছে..?

চিত্রা:- আরে নাহ! চৈতী আর ওর ছেলেকে দেখার জন্য জিজুর আইডিটা খুজে বের করেছি। তাছাড়া জিজুর আইডি তোহ আনলক সবকিছুই পাবলিক করা।

চিশতি:- আচ্ছা যাই হোক জিজুর পিক দেখা

তারপর চিত্রা আপুনির ফোন থেকে বড় আপুনি, বড় জিজু, ওর ছেলে আর ওর মেয়ের পিক দেখলাম। ছেলেটা বাবার মতো কালো হলেও মেয়েটা আমার বোনের মতোই ফর্সা হয়েছে।

ইশশ কেমন হতো যদি আজ ওরাও আমাদের সাথে থাকতো। কতই নাহ মজা হতো। থাক যা হবার নয় সেসব ভেবে লাভ নেই।

রাত ১১টার দিকে পুকুর ঘাটে যাওয়ার সময় প্রাসাদের সামনে ২জন লোককে কথা বলতে শুনি....

প্রথম লোকটি বললো....

"তুমিও যে আমাদেরই একজন এটা যেনো চিশতি জানতে নাহ পারে"

দ্বিতীয় লোকটি.....

"কখনোই জানতে পারবে নাহ, চিশতি আমার এখানে অতিথি হয়ে এসেছে আর লাশ হয়ে যাবে"

প্রথম লোকটি....

"তাই যেনো হয়! আর শুনো রমজান মিয়া তোমার একটা ভুল কিন্তু আমাকে ধরিয়ে দিতে পারে। আমি যে এখানে এসেছি এটা যেনো কেউ জানতে নাহ পারে।"

তারমানে দ্বিতীয় লোকটি রমজান মামা.?

রমজান মামাও ১০জনের ১জন..?

হায় আল্লাহ! এমন একটা সময়ে এই লোকটির পরিচয় জানতে পারলাম যে সময়টাতে আমি কিছুই করতে পারবো নাহ। কিন্তু প্রথম লোকটি কে..? এখন ওদের চিনে রাখতে হবে যখন পঞ্চশক্তি পাবো তখন ওদের এক এক করে শেষ করবো। প্রথম লোকটির মুখ দেখতে হবে যেভাবেই হোক। তখনই রমজান মামা বলে....

রমজান:- তুমি চিন্তা করো নাহ ইকবাল! তুমি যে এখানে এসেছে কেউ জানতে পারবে নাহ এমনি কি আমজাদ আর মিনহাজও নাহ

কি! বড় জিজু এখানেও চলে এসেছে.? ইশশ আজকে ৪জনের পরিচয় আমার সামনে এসেছে অথচ আমি কিছুই করতে পারছি নাহ। তখনই বড় জিজু বলে....

ইকবাল:- নাহ! আমজাদ আর মিনহাজকেও জানিয়ে দিও আমি এসেছি। আজকে চিশতির উপর আমরা ৪জন অ্যাটাক করবো। যেভাবেই হোক আজকে পঞ্চশক্তি হাসিল করতে হবে।

রমজান:- একটা কথা.? ৯নাম্বার জাদুকর কবে মুখ প্রকাশ করবে.? আমরাই সব কাজ করছি.? সে কি করবে.?

ইকবাল:- ওর এখনো বাইরে আসার সময় হয়নি। সময় হলে ঠিকই বের হবে।

ওরা ৯ নাম্বার লোকটির কথা বলছে। কিন্তু কে সেই ৯ নাম্বার লোক.? ৪জনকে মেরেছি আর ৪জনের পরিচয় আমার সামনে। এখন বাকি ২জনকে কোথায় খুজবো.?

রমজান:- ভাই ইকবাল! অনেক দিন ধরে একটা কথা জিজ্ঞেস করবো করবো ভাবছিলাম...

ইকবাল:- কি কথা.?

রমজান:- তোমার সাথে গফফার ভাইয়ে কি নিয়ে ঝামেলা হয়েছিলো.?

ইকবাল:- হা!হা!হা! শুনলে তুমিও হাসবে..

রমজান:- বলো.?

ইকবাল:- তুমি তোহ জানোই আমাদের পুনর্জন্মের কারণে আগের জন্মের সব শক্তি হারিয়ে ফেলেছি। এই জন্মে যদি শক্তি অর্জন করতে হয় তাহলে নিজের মাকেই রক্ত বাণ মারতে হয়। আমিও তাই করেছি। কিন্তু বাণ মারার আগে গফফার ভাই আমাকে বাঁধা দিয়েছিলো। উনি বলেছিলো আমি যেনো এই কাজটা নাহ করি। আমি যেনো সাধারণ মানুষ হয়েই থাকি। হা!হা!হা!

রমজান:- কিন্তু উনি এই কথা কেনো বলেছিলো.?

ইকবাল:- উনি চেয়েছিলো, তোমরা সবাই নিজেদের শক্তি দিয়ে শীতাক্ষীকে পঞ্চশক্তি উপহার দিবে আর ও তোদের কাজে খুশি হয়ে পঞ্চশক্তির ভাগ দিবে। আমি যদি আমার মাকে বাণ নাহ মারি তাহলে আমি শক্তি পাবো নাহ আর তোমাদের সাথে পঞ্চশক্তির ভাগ পাবো নাহ।

রমজান:- হা!হা!হা! এই বিষয়

ইকবাল:- শুনো.. ১২টা বাজতে আর কিছু সময়৷ আজকে ওতপেতে থাকতে হবে। আজকে চিশতি ওর পঞ্চরূপে আসবে।

রমজান:- হ্যাঁ! এখন দুইজন দুই দিকে চলে যাই।

তারপর ওরা দুইজন দুই দিকে চলে গেলো আমি ওদের কিছুই করতে পারলাম নাহ। মন খারাপ নিয়ে পুকুর ঘাটের সিঁড়িতে গিয়ে একা বসে ছিলাম। তখন হঠাৎ কেউ একজন পিছন থেকে গান গাইতে গাইতে আমার দিকে আসছিলো "বাতাসে গুন গুন এসেছে ফাগুন" আমি পিছন ফিরে তাকিয়ে দেখি নূরী।

চিশতি:- তুমি এখানে.?

নূরী:- চলে এলাম আমার আশিকের কাছে

চিশতি:- মানে! বাদ এসব আগে বলো তখন সবার সামনে কাকিয়াকে অপমান করলে কেনো.? আর আমাকে তোমার চেনা লাগছিলো মানে.?

নূরী:- তুমি শুধু আমার চেনাই নাহ! তুমি আমার এমনই একজন যারে এক জনমে ভালোবেসে ভরবে নাহ এ মন...

চিশতি:- কথায় কথায় গান নাহ গেয়ে, কে তুমি সেটা বলো। আর আমি কিন্তু আমার প্রশ্নের উত্তর পাইনি.?

নূরী:- তোমার কাকিয়া! ও মানুষ নাহ আস্ত একটা সয়তান

চিশতি:- মানে.?

নূরী:- ও প্রথম থেকেই জানতো, ওর ভাই, ওর স্বামী আর তোমার ফুফাজি কালোজাদু করে। আমি ওকে অনেকবার বলেছি কিন্তু ও শুনেও নাহ শোনার ভান করে ছিলো।

চিশতি:- তুমি কিভাবে জানো যে ওরা কালোজাদু করে..?

নূরী:- সে অনেক কাহিনি। প্রতিশোধ নিতে এসেছি আমি। ওদের প্রত্যেককে এক এক করে শেষ করবো আমি।

এতক্ষণ নূরীর কথা শুনে মনে হচ্ছিল ও হয়তো কালোজাদুর বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নিতে চাইছে কিন্তু ও যে প্রতিশোধ নিতে চাইছে এটা বুঝিনি। কি জন্য প্রতিশোধ নিতে চাইছে ও..? এ আবার কোন ধাঁধার মুখোমুখি হলাম..?

নূরী:- কি ভাবছো.? এটা শুধু আমার একার প্রতিশোধ নাহ এটা তোমার আর আমার প্রতিশোধ।

চিশতি:- মানে.?

নূরী:- "মিরান"

চিশতি:- মানে.? মিরান কে.??

নূরী:- তুমি.!

চিশতি:- তোমার বোধহয় ভুল হচ্ছে! আমি মিরান নই আমি চিশতি

নূরী:- আমি জানি তুমি চিশতি! কিন্তু এই রূপ, এই চেহারা, এই শরীর, এই দেহ সবটাই মিরানের। তুমি চিশতি হলেও তুমি আমার মিরান শুধুই আমার। তুমি আমার আমি তোমার। আমি তোমার তুমি আমার।

চিশতি:- কি বলছো তুমি.? মাথা ঠিক আছে তোহ তোমার.?

নূরী:- চন্দ্রা!

চিশতি:- এ-এ-এই নাম তুমি কিভাবে জানো..?

নূরী:- দেখো চিশতি! মনোযোগ দিয়ে আমার কথা শুনো। তুমি চাইলেই কিন্তু চন্দ্রার রূপে জন্মগ্রহণ করতে পারতে কিন্তু তা নাহ হয়ে তুমি মিরানের রূপে জন্মগ্রহণ করেছো। তোমার মধ্যে শুধু তুমি নও। তোমার মধ্যে ৩জন আছে। চন্দ্রা, মিরান আর চিশতি। মিরানের দেহে আর চন্দ্রার শক্তিতে নতুন ভাবে তুমি চিশতি হয়ে ফিরে এসেছো। এবার আমাদের আর কেউ আলাদা করতে পারবে নাহ।

চিশতি:- আমি কিছুই বুঝতে পারছি নাহ কি বলছো তুমি.?

নূরী:- তুমি জানো, তুমি আসলে কে.?

চিশতি:- হ্যাঁ জানি

নূরী:- কে তুমি.?

চিশতি:- পঞ্চশক্তি উত্তরাধিকারী চন্দ্রাবতীর পুনর্জন্ম চিশতি।

নূরী:- ঠিক! কিন্তু এটাও মনে রেখো তুমি যতন ও যৌথার একমাত্র পুত্র মিরান। শঙ্খ নাগরাজ মিরান আর আমি তোমার শঙ্খিনী ইশরাখ। মনে করো।

চিশতি:- কি যা-তা বলছো.?

নূরী:- আমি যা-তা বলছি নাহ।

২৩ বছর আগে..............

১০০ বছর পর শঙ্খ নাগ আর শঙ্খিনী মানুষ রূপে মনুষ্য জগৎ ঘুরতে এসেছিলো। কিন্তু তাদের এই ঘুরতে আসাই তাদের জন্য কাল হয়ে যায়।

যতন রাজা ও যৌথার একমাত্র পুত্র সন্তান জন্মের ২১ বছর পর তাকে যতন রাজার প্রাসাদ ছেড়ে নাগলোকে চলে যেতে হয়। কারণ তার মধ্যে ছিলো নাগমণি। যার কাছে নাগমণি থাকে সেই একমাত্র নাগলোক আর ওই নাগমণির হকদার। নাগলোক শুধুমাত্র তার হুকুমেরই গোলাম। কোনো এক অলৌকিক ক্ষমতার বরদানের ফল ছিলো মিরান। কিন্তু মিরানের ২১ বছর পূর্ণ হওয়ার সাথে সাথেই নাগলোক থেকে তার ডাক চলে আসে এবং সে যতন রাজা ও যৌথাকে বিদায় জানিয়ে নাগলোক শাসনে চলে যায়। মিরান ছিলো একজন বিষধর নাগ। আর ইশরাখ ছিলো বিষধর নাগিন। মিরানের পক্ষে একা নাগলোক পরিচালনা করা সম্ভব হচ্ছিল নাহ তাই সে ইশরাখকেই নিজের জীবনসঙ্গী হিসেবে বেছে নেয় এবং তারা দুইজন সুষ্ঠু ও ন্যায়পরায়ণ ছিলো নাগলোকে। নাগলোকে তাদের শাসনের ১০০ বছর পূর্ণ হওয়ার পর তারা মনুষ্য জগতে আসে যতন ও যৌথার সাথে দেখা করতে। কিন্তু তারা এখানে এসে দেখে যতন আর যৌথা কেউই বেঁচে নেই। শুধু তাই নাহ, এই প্রাসাদও এখন আর চলমান নেই। কিন্তু প্রাসাদের বাইরের সেই ঘাটটি এখনো জনবহুল হয়ে রয়েছে কারণ এখন থেকে প্রায়ই নাগলোক থেকে বিভিন্ন নাগ নাগিন মনুষ্য জগতে আসে।

আজ থেকে প্রায় ২৩ বছর আগে যখন শঙ্খিনী আর শঙ্খ নাগ এই প্রাসাদে এসেছিলো তখন ওই ৩জন কালো জাদুকর ওদের দুইজনকে মারা ষড়যন্ত্র করে। তারা শঙ্খ নাগের কাছে থেকে নাগমণি হাসিল করতে চেয়েছিলো কিন্তু নাগমণি নাগলোকে ছিলো বিদ্বায় ওদের হাতে পরেনি কিন্তু ওরা শঙ্খ নাগকে হত্যা করতে সফল হয়। আমি আহত অবস্থায় কোনো রকম প্রাসাদ থেকে পালিয়ে আসি। প্রাসাদ থেকে পালিয়ে আসার ৩দিন পর আমিও মারা যাই। ওই ৩দিন গাংগাইট গ্রামে নাগলোকের বিভিন্ন নাগ নাগিনদের ক্ষোভ পরে। ফলে অনেক নিরীহ মানুষ প্রাণ হারায় কিন্তু ওই ৩ জন কালো জাদুকর এখনো বেঁচে আছে। ওদের কাছ থেকে প্রতিশোধ নেওয়ার জন্যই হয়তো আমার আবার পুনর্জন্ম হয়েছে। কিন্তু এমন এক পরিবারে জন্ম হয়েছে যে পরিবারে আমার বাবাই হলো সেই কালো জাদুকরদের একজন।

গতকাল রাতেই আমার আগের জন্মের সবকিছু মনে পড়েছে কিন্তু এখন অব্দি আমি নাগিন শক্তি পাইনি। আমি যে আবারও ফিরে এসেছি সেটা কেউ জানে নাহ। কিন্তু মিরানের দেহে চন্দ্রার শক্তি নিয়ে যে তুমি আবারও ফিরে এসেছো সেটা কিন্তু সবাই জানে।

"নূরীর কথা শুনে আমি আবারও অবাক হলাম। মানে আমি এখন যারা দেহে আছি সে একজন নাগরাজ ছিলো। আর সেই নাগরাজই হলো পঞ্চশক্তির বরদানের ফল। আমার মধ্যে তাহলে আমি সহ আরো ২জন আছে। মিরানের দেহে চন্দ্রার শক্তি নিয়ে চিশতি রূপে আবারও আমার আগমন হয়েছে। কোথাকার কাহিনি কোথায় কোথায় এসে থেমেছে"

নূরী:- কি ভাবছো.?

চিশতি:- তুমি যা বললে সবকিছু কি সত্যি.?

নূরী:- হ্যাঁ! আর মাত্র কিছুক্ষণ এরপর তুমি আর আমি দুজনেই দু'জনের শক্তি ফিরে পাবো আর আমরা আমাদের প্রতিশোধ নেবো।

আকাশে তাকিয়ে দেখি লাল পূর্ণিমা শুরু হয়ে গেছে। রাত ১২টা বাজতে আর ২ মিনিট সময় বাকি। নূরী হঠাৎ করে যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে পুকুর ঘাট থেকে দৌড়ে কোথাও চলে গেলো। আমি যেনো স্থির হয়ে গেছি কোথাও নড়তে পারছিলাম নাহ। কিছুক্ষণ পর পুকুর থেকে বিশাল বড় বড় দুইটা সাপ উঠে এলো। তাদের মাঝ থেকে জ্বলজ্বল করছে কিছু একটা। হুট করে সেই উজ্জ্বল জিনিসটা আমার নাভিতে এসে প্রবেশ করলো। এবার যেনো আমি নিজের শরীরে শক্তি ফিরে পেলাম। কিন্তু আমার এমন অদ্ভুত লাগছে কেনো.?

মনে হচ্ছে আমি অনেক দূর দূর পর্যন্ত শুনতে পাচ্ছিলাম। অনেক দূর পর্যন্ত দেখতেও পাচ্ছিলাম। তখনই আমার দুই পাশ থেকে সাক্ষী আর জটায়ু বেরিয়ে আসে। পুকুরে নিজের প্রতিচ্ছবি দেখলাম আমার মধ্যে কোনো পরিবর্তন হয়নি। শুধুমাত্র আমার নীল চোখগুলো লাল হয়ে গেছে। মুখ হা করে দেখি দুই পাশের দুইটা দাঁত বড় বড় হয়ে গেছে যেমনটা রক্ত খেকোদের হয়ে থাকে।

নিজের প্রতিচ্ছবি দেখে পিছন ঘুরে দেখি একটা বিশাল বড় সাপ আমার সামনে এসে হাজির হলো। তার মানে এটাই নূরী। হ্যাঁ! এটাই নূরী কারণ সে আমার সামনে আসার সাথে সাথে নিজের আসল রূপ নেয়।

আমি চন্দ্রা ও মিরান দুইজনকেই অনুভব করতে পারছিলাম। এখন ঠিকই মনে হচ্ছে আমিই সেই ৩জন ব্যক্তি যাদের একটাই অস্তিত্ব।

এবার তাহলে প্রতিশোধের পালা। ঘাট থেকে উঠে আসার সময় চারিদিক থেকে ওই ৪জন জাদুকর আমাদের ঘিরে ধরে।

চাচ্চু, ফুফাজি, বড় জিজু আর রমজান মামা।

ইকবাল:- হা!হা!হা! ফাইনালি! হা!হা!হা! ফাইনালি! ফাইনালি! ফাইনালি! আজকে সেই দিনটা এসেই গেলো।

ফুফাজি:- কি ভেবেছিস.? আমরা জানতাম নাহ যে তখন তোর মধ্যে পঞ্চশক্তি জাগ্রত হয়নি.? আমরা অনেক আগেই জানতাম এই কথাটা এজন্যই তোহ তোর সাথে এতদিন ধরে খেল খেললাম আর তুইও বোকার মতো খেলায় মেতে উঠলি।

চাচ্চু:- হা!হা!হা! তুই কি ভেবেছিস তুই এখানে নিজের ইচ্ছায় এসেছিস.? নাহ তোকে আমরা এনেছি। নাগমণি তোকে ছাড়া উদ্ধার করা সম্ভব ছিলো নাহ। আর নাগমণি উদ্ধার করা নাগ গেলে পঞ্চশক্তিও হাসিল করা সম্ভব ছিলো নাহ।

রমজান:- আজ নাগমণি আর পঞ্চশক্তি দুইটাই তোর মধ্যে। এখন তুইও শেষ আর পঞ্চশক্তিও আমাদের.....

তখনই নূরী আমার পিছন থেকে বেরিয়ে এসে বলে

নূরী:- ব্যস!

রমজান:- নূরী! তুই.?

নূরী:- হ্যাঁ! আমি..? ভুলে গেছিস তোরা আজ থেকে ২৩ বছর আগের কথা.? কি করেছিলি তোরা.? আমাকে আর আমার শঙ্খ নাগকে হত্যা করেছিলি। আজ তোদের মৃত্যু নিশ্চিত। আজ শুধু চিশতি একা নাহ, ওর সাথে সাক্ষী, জটায়ু, শঙ্খিনী, নূরী, চন্দ্রা আর শঙ্খ নাগ আছে।

ইকবাল:- আজ তোদের সবাইকে আবারও মারবো.! তোরা যতবার জন্মাবি ততবার তোদের মারবো।

চিশতি:- হা!হা!হা! তোরা হয়তো ভুলে গিয়েছিস। তোদের মৃত্যুর সাথে সাথে তোদের শক্তিরও মৃত্যু হয়েছে আর পঞ্চশক্তি সেদিনও মারা যায়নি আর আজও মারা যায়নি।

হ্যাঁ! পঞ্চশক্তি উত্তরাধিকারী বার বার নিজের জীবন দিয়েছে কিন্তু এবার আর তা হবে নাহ। এবার পঞ্চশক্তির পাশাপাশি তার উত্তরাধিকারীও শক্তিশালী হয়ে ফিরেছে।

এই বলে আমি পঞ্চশক্তি আহ্বান করি। আমার চোখগুলো আগুনের মতো জ্বলে উঠলো। আমার ডান হাতে সাক্ষী, বাম হাতে জটায়ু আর মাথায় নূরী নাগিন রূপে এসে আমাকে সাহায্য করলো।

এতে যেনো আমি আরো শক্তিশালী হয়ে গেলাম।

ইকবালের উপর ঝাপিয়ে পরলাম, মুহুর্তেই বিশাল এক দানবের মতো হয়ে গেলাম। ইকবালকে দুই হাত দিয়ে টেনে ছিড়ে ফেললাম।

ইকবালকে মেরে ফুফাজির দিকে চোখ তুলে তাকাতেই আমার মাথা থেকে হাজারেরও অধিক উড়ন্ত সাপ গিয়ে ফুফাজিকে ছোবলের উপর ছোবল দিয়ে মেরে ফেললো।

ফুফাজিকে মারার পর রমজান মামার দিকে এক লাফে চলে গেলাম। উনার সামনে গিয়েই ঘাড় কামরে ধরলাম। শরীরের সমস্ত রক্ত এক টানেই শুষে নিলাম।

এক এক করে সবাইকে মরতে দেখে চাচ্চু পালাইতে চাইলে তাকে বিশাল সাপ হয়ে গিলে ফেললাম।

ভয়ংকর তান্ডব শেষে শান্ত হলাম। এটা কেমন হলো.? বারংবার বলেছিলাম এদের এত সহজে মারবো নাহ। এদের মাধ্যমেই বাকি ২জনকে খুঁজতে হবে। কিন্তু এখন কিভাবে বাকিদের খুঁজবো.?

পঞ্চশক্তি এতটা শক্তিশালী ভাবিনি। যাই হোক আজ আমার শত্রু তালিকা থেকে আরো ৪জনের নাম মুছে গেলো। এখন বাকি ২জন। ওই ২জনকেও খুঁজে বের করতে হবে।

এদিকে যে ৪জনের জীবন কাহিনি শেষ সে খবর কেউ জানে নাহ। ওদের লাশগুলোর মধ্যে একজন তোহ আমার পেটে বাকি ৩টা লাশ যতন রাজার ঘাটেই ফেলে দি।

প্রতিশোধ শেষে কিছু নাহ জানার মতোই রুমে চলে গেলাম। কিছুক্ষণ পর হাসমি ভাইয়া এলো....

হাসমি:- চিশতি!

চিশতি:- হ্যাঁ! ভাইয়া! বলো..?

হাসমি:- তোকে একটা কথা বলবো..? কাউকে বলবি নাহ..?

চিশতি:- কি.? বলো..

হাসমি:- আমি আজকেই বিয়ে করতে চাই..

চিশতি:- মানে..?

হাসমি:- আমি একটা মেয়েকে ভালোবাসি! ও এখানেই থাকে। আমরা অনেক দিন ধরে বিয়ে করবো ভাবছি কিন্তু যতবারই বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নি ততবারই কিছু নাহ কিছু অঘটন ঘটে। তুই প্লিজ কিছু একটা কর যাতে এবার বিয়ে করে বউ সাথে করে বাড়ি ফিরতে পারি।

চিশতি:- আচ্ছা! আমি কথা দিলাম কালকেই তোমার বিয়ে হবে...

হাসমি:- সত্যি!

ভাইয়া খুশিতে আমাকে জড়িয়ে ধরলো...

ভাইয়াকে রুম থেকে বের করে সাক্ষী আর জটায়ুকে ডাকি....

জটায়ু:- বলো..

চিশতি:- আমার ভাইয়ে বিয়ে দিতে চাই

সাক্ষী:- কিন্তু ওর তোহ বিয়ে হবে নাহ কখনো.?

চিশতি:- হ্যাঁ! জানি সেজন্যই তোহ তোমাদের ডেকেছি। কিছু একটা উপায় বলো কিভাবে ওর বিয়ে দেবো

জটায়ু:- ওর উপর ভয়ংকর কালোজাদু করা হয়েছে, এই কালোজাদু আমাদের পক্ষে কাটানো সম্ভব নাহ।

চিশতি:- তাহলে উপায়.?

সাক্ষী:- উপায় একটা আছে..?

জটায়ু:- সাক্ষী! এবার কোনো ঝামেলা করনি নাহ্। তুই খুব ভালো করেই জানিস কত কষ্টের পর পঞ্চশক্তি চিশতির মধ্যে স্থাপিত হয়েছে।

সাক্ষী:- কিন্তু এটা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই

চিশতি:- কি বলছো তোমরা..? কোন উপায়ের কথা বলছে.? যেকোনো উপায়েই হোক ভাইয়ার বিয়ে দিবো। তোমরা শুধু উপায়টা বলো...

জটায়ু:- তোমাকে হয় প্রতিশোধ আর নাহয় দায়িত্ব যেকোনো একটা বেছে নিতে হবে..

চিশতি:- মানে!

সাক্ষী:- পঞ্চশক্তির সমস্ত বল প্রয়োগ করে তারপর হাসমির বিয়ে দিতে হবে। এর ফলে....

চিশতি:- এর ফলে কি..?

জটায়ু:- তোমাকে পঞ্চশক্তি বিসর্জন দিতে হবে। এই কাজটা করলে পঞ্চশক্তি তোমার মধ্যে আর থাকবে নাহ।

চিশতি:- এই ব্যাপার! তবে তাই হোক! আমার পরিবারের উর্ধ্বে কখনোই আমার প্রতিশোধ বড় নাহ। আমি আমার পরিবার নিয়েই সুখে থাকতে চাই। এসব মরণ খেলা এবার বন্ধ করতে চাই।

জটায়ু:- ভুলে যেও নাহ, এখনো আরো ২জন শত্রু বেঁচে আছে এবং তাদের পরিচয়ও তুমি জানো নাহ।

চিশতি:- যাই হোক, এতকিছু ভাবার সময় নেই। আমি আমার সমস্ত শক্তি বিসর্জন দিতে রাজি। কি করতে হবে আমায়..?

সাক্ষী:- শুধুমাত্র ৩বার বলতে হবে "পঞ্চশক্তি আমি তোমায় ত্যাগ করলাম"

চিশতি:- ঠিক আছে

জটায়ু:- তুমি এমনটা করলে কিন্তু আমরাও হারিয়ে যাবো...

চিশতি:- আমার পরিবারের সুখের জন্য তোমাদের হারাতেও রাজি

জটায়ু:- বেশ তবে তাই হোক। কিন্তু মনে রেখো, আজ যেখান থেকে তুমি প্রতিশোধ নেওয়া স্থগিত করেছো ঠিক সেখান থেকেই এই প্রতিশোধ আবার শুরু হবে। এই প্রতিশোধ এখানেই থেমে থাকবে নাহ। আমরা চলে যাচ্ছি, অপেক্ষা করো ৩০ বছর পর আমরা আবারও ফিরবো.....

জটায়ু বাঁধা দেওয়ার পরও আমি বললাম

"পঞ্চশক্তি আমি তোমাকে ত্যাগ করলাম,পঞ্চশক্তি আমি তোমাকে ত্যাগ করলাম,পঞ্চশক্তি আমি তোমাকে ত্যাগ করলাম"

সাথে সাথে চারিদিকে জোড় হাওয়া বইতে থাকলো। আমার নাভি দিয়ে টগবগিয়ে রক্ত পড়তে লাগলো। একসময় নাভি থেকে নাগমণি বেরিয়ে কোথায় যেনো মিলিয়ে গেলো।

প্রচুর হায়ার মাঝেও লক্ষ করে দেখলাম সাক্ষী আর জটায়ু একত্র হয়ে একটা স্বর্ণ সর্প হয়ে নাগমণির মতোই কোথাও একটা মিলিয়ে গেলো।

পরদিন সকালে ঘুম ভেঙ্গেই শুনতে পাই হাসমি ভাইয়া বিয়ে করে ফেলছে। গাংগাইট গ্রামের রহমান নামে এক ভদ্রলোকের বড় মেয়ে নাম ইসামতি।

এরপর সবাইকে নূরী আর আমার কথা জানালে সবাই মেনে নেয় এবং সবাই সিদ্ধান্ত নেয় আমাকে সামনের বছর বিদেশ পাঠাবে, আমি যেনো বিদেশ থেকে এসেই নূরীকে বিয়ে করি। আজকে আমার আর নূরীর আংটি বদল করে রাখবে। এবং আমাদের সাথেই নূরে নিয়ে যাবে।

সাদিয়া ও তার মাকে সবকিছু বুঝিয়ে তাদের মূসা হুজুরের সন্ধান দি। এরপর লাঞ্চ করে আমি বাড়ি ফিরে আসি।

বাড়ি আসার পর থেকেই আমার শরীরে ধূম জ্বর উঠে। প্রচুর মাথা ব্যথা। এসবের পাশাপাশি আবার রক্তক্ষরণও হচ্ছিল। তখনই আমার মাথার টনক নড়ে উঠে, আমি ফিউচার ফিল করতে পারি। তাহলে একবার চেষ্টা করে দেখি গফফার হুজুর সেই লেবুটা কোথায় লুকিয়েছে যদি জানতে পারি।

এতদিন কাজের কাজ নাহ করে কতশত অপ্রোয়জনীয় কাজ করেছি। আর যে কাজটা আমার সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সেটার কথাই ভুলে গেছি। যাই হোক হয়তো কালোজাদুর ফলেই হঠাৎ করে শরীরটা খারাপ হয়ে গেলো। একটু চেষ্টা করি যদি জানতে পারি তাহলে আরো একটু সমস্যা সমাধান হবে।

যেই ভাবা সেই কাজ, চোখগুলো বন্ধ করে চেষ্টা করতে থাকি কিছু অনুভব করার জন্য। কিন্তু এবার কোনো কিছুই দেখতে পাচ্ছিলাম নাহ। সবকিছু কেমন কালো, অন্ধকার। কি ব্যাপার.? এর আগে তোহ কখন এমন হয়নি.? তাহলে আজ হঠাৎ করে এমন হলো কেনো..? হয়তো আমার শরীর খারাপ এজন্য কিছু দেখতে পারছি নাহ। শরীর ঠিক হলে হয়তো আবারও সবকিছু দেখতে পারবো। অপেক্ষা করতে থাকি।

ওইদিন অসুস্থ শরীর নিয়ে রাতটা কাটাই। সকালে ঘুম ভাঙ্গে সাদিয়ার কলে। কল রিসিভ করার আগেই কেটে যায়। আমার ফোনে ব্যালেন্স নাহ থাকার কারণে দ্বিতীয় বার কলের অপেক্ষা করতে থাকি তখনই একটা টেক্সট আসে "সরি দোস্ত, পারলে আমাকে ক্ষমা করে দিস! আমি অনেক দূরে চলে যাচ্ছি। তুই আমাকে কোনোদিন খুঁজিস নাহ। তোকে অনেক ভালোবাসি, প্রিয় বন্ধু তুই আমার। আমার কঠিন সময়ে তোকে পাশে পেয়েছি। আব্বুও এখন আমাদের সাথে কথা বলে আর আম্মুও একদম সুস্থ হয়ে গেছে। নিজের যত্ন নিস। কখনো আমার কথা মনে পড়লে আমার দেওয়া ডায়েরিতে লিখে রাখিস। কোনোদিন হয়তো আমাদের আবার দেখা হবে তখন এই ডায়েরিটা চাইবো তোর কাছে। ভালো থাকিস" টেক্সটটা পড়ার পর রিপ্লাই দিতে যাবো তখনই দেখি সাদিয়া আমাকে ব্লক করে দিয়েছে। কিছুটা খটকা লাগার ফলে ইমার্জেন্সি ব্যালেন্স এনে কল দি তাও দেখি ব্লক করে দিয়েছে। ছুটে গিয়ে আম্মির ফোন থেকে কল দিয়ে বুঝতে পারি সিম নট রিচঅ্যাবেল। কি হলো হঠাৎ করে.? কিছু নাহ জানিয়েই কেনো এমনটা করলো। কোনো রকম ব্রাশ করে অসুস্থ শরীর নিয়েই দৌড়ে চলে গেলাম সাদিয়ার বাসায়। গিয়ে দেখি বাসার মেইন গেটে তালা ঝুলছে। আশেপাশের লোকজনকে জিজ্ঞেস করলে তারাও কিছু বলতে পারে নাহ। এই কয়েকদিন সাদিয়ার সাথে যতগুলো জায়গায় ঘুরতে গিয়েছিলাম আজ সারাদিন সেই সকল জায়গায় খুঁজলাম কিন্তু কোত্থাও সাদিয়াকে খুঁজে পেলাম নাহ। ওর অন্যান্য ফ্রেন্ডের কাছেও জানাই ব্যাপারটা কিন্তু কেউ কিচ্ছু বলতে পারে নাহ।

এক প্রকার কান্না মাখা চেহারা নিয়ে বাড়ি ফিরে এলাম। সারাদিন নাওয়া খাওয়া কিচ্ছু হয়নি। নিজের রুমের এক কোণে বসে বসে কান্না করতে থাকি। যদি চলেই যাওয়ার ছিলো তাহলে কেনো এতটা ক্লোজ হয়েছিলো.? আমি কি কোনো অন্যায় করেছি.? কেনো আমার সাথে এমনটা করলো.? যদি কোনো অন্যায়ও করে থাকি তাহলে একটি বার আমাকে বলতে পারতো আমি শুধরে নিতাম কিন্তু এভাবে অগোচরে চলে যাওয়ার মানে কি.? কান্না করার এক পর্যায়ে দরজায় কেউ নক করলো। আমি চোখের পানি মুছে দরজা খুলে দেখি হাসমি ভাইয়া....

চিশতি:- ভাইয়া তুমি.?

হাসমি:- কোথায় গিয়েছিলি.?

চিশতি:- এইতো এখানেই

হাসমি:- সারাদিন বাইরে কাটিয়ে বিকেলে বাড়ি ফিরে এসে বলছিস এখানেই। তাও আবার কাউকে কিচ্ছু নাহ জানিয়ে গিয়েছিস

চিশতি:- তেমন কিছু নাহ ভাইয়া

হাসমি:- যাকগে এসব নিয়ে কথা বলতে আসিনি। তোর সাথে একটা জরুরী কথা ছিলো

চিশতি:- কি কথা.?

হাসমি:- দেখ! ভাই আমার! আমি জানি আর কেউ আমার কষ্টটা নাহ বুঝলেও তুই আমার কষ্টটা বুঝবি।

চিশতি:- হয়েছেটা কি সেটা তোহ বলবে.?

হাসমি:- আমি বিয়ে করতে চাই। আর কতকাল এভাবে একা একা জীবন কাটাবো বল তোহ.? এই পরিবারের ভুলের জন্য আমাকে কেনো মাশুল দিতে হচ্ছে বলতে পারিস.?

চিশতি:- ভাইয়া.. তুমি তোহ জানো......

হাসমি:- হ্যাঁ! আমি সবটা জানি! কিন্তু এখন আর এসব সহ্য করতে পারছি নাহ। ভাই তোর তোহ অনেক ক্ষমতা তুই কি আমার বিয়েটা দিতে পারবি নাহ.? আমি তুই চাইলে আমার বিয়েটা দিতে পারবি। প্লিজ ভাই আমার, আমার এই অনুরোধটা রাখ।

চিশতি:- ভাইয়া! ভাইয়া! ভাইয়া! তুমি এত অধৈর্য হচ্ছো কেনো.? আমি দেখছি কি করা যায়! তুমি যাও আমি পরে এ বিষয়ে তোমার সাথে কথা বলবো।

ভাইয়াকে তোহ বুঝিয়ে পাঠিয়ে দিলাম কিন্তু এবার কি করবো আমি.? এমন একটা পরিস্থিতিতে রয়েছি কিছুই করতে পারছি নাহ। ওইদিকে সাদিয়াকে খুঁজে পাচ্ছি নাহ। এদিকে ভাইয়া বিয়ে করতে চাচ্ছে। আর এগুলোর মাঝখানে আমার প্রতিশোধ।

যাই হোক একবার সাক্ষী আর জটায়ুকে ডেকে দেখি ওরা কোনো সমাধান দিতে পারে কি নাহ..?

চোখ বন্ধ করে ওদের ডাকতে থাকি কিন্তু ওদের কোনো সারা পাচ্ছিলাম নাহ। কি হলো ওরা আসছে নাহ কেনো..? ওরা কি আমাকে ধোঁকা দিলো..? এভাবে লড়াইয়ের মাঝপথে আমাকে একা করে সবাই চলে গেলো.? এখন একা একা কিভাবে এই যুদ্ধে বিজয়ী হবো.? আমি কি একা বিজয়ী হতে পারবো.?

১৯শে ফেব্রুয়ারী আম্মি আমার কাছে এসে বলে "মূসা হুজুরের বউ প্রেগন্যান্ট" শুনে আমিও খুশি হলাম। মূসা হুজুরের কথা শুনে মনে পড়লো, এখন যদি আমাকে কেউ হেল্প করতে পারে সেটা একমাত্র মূসা হুজুর। তড়িঘড়ি করে মূসা হুজুরকে কল দিলাম। কল করার সাথে সাথে রিসিভ করলেন তিনি।

চিশতি:- হ্যালো! আসসালামু আলাইকুম

আল মূসা:- ওয়া আলাইকুম সালাম

চিশতি:- হুজুর আপনি কি ফ্রী আছেন.?

আল মূসা:- হ্যাঁ! কিন্তু কি হয়েছে.?

চিশতি:- আপনার সাথে আমার জরুরী কিছু কথা আছে। আমি কিছুক্ষণ পর আসছি।

আল মূসা:- ঠিক আছে। আর ধন্যবাদ তোমাকে

চিশতি:- ধন্যবাদ দিয়ে ছোট করবেন নাহ। আপনি আমাদের জন্য যা যা করেছেন সেগুলোর কাছে এটা কিছু নাহ্।

মূসা হুজুরের সাথে কথোপকথন শেষ করে ফ্রেশ হয়ে নিচে চলে গেলাম। নিচে আসার পর চাচ্চুর ঘর থেকে কেমন ফিসফিস শব্দ ভেসে আসছিলো এজন্য এক পা দু পা করে চাচ্চুর রুমের সামনে যাই। দরজার পাশে দাঁড়াতেই শুনি.....

ফুফাজি:- হা!হা!হা! যাই বলো। আগের জন্মে আমাদের যে শক্তি ছিলো ওই শক্তি যদি এই জন্মেও থাকতো তাহলে নিমেষেই ওই পঞ্চশক্তি আমাদের হতো

চাচ্চু:- আগের জন্মেই বা পঞ্চশক্তি দখল করলাম কবে.? তখন তোহ আমরা আরো বেশি শক্তিশালী ছিলাম কিন্তু তখনও দখল করতে পারিনি। আরো হেরে গেলাম ওই পঞ্চমা আর চন্দ্রাবতীর চালে।

ফুফাজি:- ভুলে যেও নাহ, ওরা জিতে গিয়েও হেরে গিয়েছিলো।

চাচ্চু:- হ্যাঁ! ওরাও পঞ্চশক্তি পেলো নাহ আর আমরাও পাইনি। কিন্তু সবশেষে ওরা নিজেদের জীবনটাই হারালো। বেচারি পঞ্চমা ও তার স্বামী সন্তান আমাদের হাতে জীবন হারালো।

"তার মানে ওইদিন আমি ঠিকই শুনেছিলাম। ওরা আগের জন্মে আমার পিতা মাতাকেও হত্যা করেছে"

ফুফাজি:- পঞ্চমা আর বাবর আজমকে এমন ভয়ংকর মৃত্যু দিয়েছি যে ওদের লাশ দেখে কুকুরও মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে

চাচ্চু:- হা!হা!হা! সে আবার বলতে। এমন কালোজাদু করেছিলাম যে কালোজাদুর প্রভাবে ওদের শরীরে হাড় ছিলো ঠিকই কিন্তু কোনো মাংস ছিলো নাহ। শরীরের চামড়া গলে গলে পড়ছিলো। হাজারো পোকামাকড় ওদের শরীরে বাসা বেঁধেছিলো জীবিত অবস্থায়ই।

তখনই আমার ফোনে রিং বেজে উঠে....

চাচ্চু:- কে! কে ওখানে..?

ফোনটা তুলে দেখি মূসা হুজুর কল করেছে। কল কেটে দিয়ে চাচ্চুর রুমে গিয়ে ঢুকলাম।

ফুফাজি:- আমি আগেই বলেছিলাম তুই ছাড়া আর কারো স্পর্ধা হবে নাহ আমাদের কথা শোনার জন্য আড়ি পাতবে।

চিশতি:- আজ শুধু আড়ি পাততে আসিনি। আজ তোমাকে উপর খাপ পাততে এসেছি

চাচ্চু:- মানে.?

চাচ্চুর কথার উত্তর নাহ দিয়ে বাঘ রূপে আসার চেষ্টা করলাম অথচ বাঘ হতে পারলাম নাহ। কি হলো.? ব্যাঘ্র শক্তিও কাজ করছে নাহ কেনো..? রীতিমতো অবাক হয়ে গেলাম। আমার কোনো শক্তি কাজ করছে নাহ। তার সাথে সাথে সাক্ষী আর জটায়ুকে ডাকার পরও আসলো নাহ। কিছু তোহ একটা গোলমাল হচ্ছে। হঠাৎ করে চাচ্চু বলে উঠলো...

চাচ্চু:- কি কোনো শক্তি কাজ করছে নাহ.? হা!হা!হা!

ফুফাজি:- আর কাজও করবে নাহ! হা!হা!হা!

চাচ্চু:- সে ফিরে এসেছে! শীতাক্ষী ফিরে এসেছে। এবার আমাদের কেউ হারাতে পারবে নাহ।

ফুফাজি:- আমাদের বোন যেমন সবচেয়ে জেদি তেমনই সবচেয়ে শক্তিশালীও। তুই নিজেও বুঝতে পারছিস নাহ তুই কার জালে পা দিয়েছিস।

"তার মানে আমার সাথে যা যা হচ্ছে সবকিছু ওই শীতাক্ষীর কারণেই হচ্ছে! কিন্তু কে এই শীতাক্ষী.? কোথায় খুঁজবো তাকে.?"

চাচ্চু আর ফুফাজির সাথে কথা নাহ বাড়িয়ে ডাইনিং-এ চলে এলাম। তখন আবারও মূসা হুজুর কল দিলো। কল রিসিভ করতেই....

আল মূসা:- হ্যালো! চিশতি তুমি কোথায়.?

চিশতি:- এই তোহ আমি বাসায়ই আছি এখন

আল মূসা:- এখনো বের হওনি.?

চিশতি:- নাহ! কেনো কি হয়েছে.?

আল মূসা:- কিছুই হয়নি। শুধু জিজ্ঞেস করার জন্য কল করলাম। আচ্ছা আমাকে খুলে বলো তোহ কি কারণে হঠাৎ দেখা করতে চাইছো..?

চিশতি:- হুজুর! গফফার হুজুর আমার উপর কালোজাদু করেছে একটা লেবুর মাধ্যমে। আমার শরীর থেকে অনবরত রক্তক্ষরণ হচ্ছে। এখন কি করবো.? ওই লেবু নাহ পেলে হয়তো এভাবেই একদিন মারা যাবো.?

আল মূসা:- ওই লেবু হাতে পেলেও তুমি কিছু করতে পারবে নাহ.!

চিশতি:- মানে.?

আল মূসা:- ফোনে এতকিছু বলা যাবে নাহ। তুমি আসার সময় একটা ব্লেট, ছুড়ি আর একটা লেবু নিয়ে এসো।

চিশতি:- আবার লেবু.?

আল মূসা:- যা বলছি শুনো

চিশতি:- ঠিক আছে।

ব্রেকফাস্ট করেই বেরিয়ে পরি মূসা হুজুরের বাসার উদ্দেশ্যে। যাওয়ার সময় একটা লেবু, ব্লেট আর একটা ছুড়ি কিনে সাথে করে নিয়ে গেলাম।

হুজুরের বাসায় যাওয়ার পর, উনি কথা নাহ বাড়িয়ে আমার হাত থেকে ছুড়িটা নিয়ে ওইটা দিয়ে মাটিতে কিছু একটা অঙ্কন করলো দেখতে অনেকটা ঘরের মতো হলেও জিনিসটা ঘর নাহ। তারপর ব্লেট দিয়ে এক এক করে সবগুলো ঘরের মতো দেখতে অঙ্কনগুলো কাটলো। এরপর লেবুটা নিলো। ব্লেট দিয়ে লেবুর শরীরে অনেকগুলো আচ কাটলো। এরপর লেবুটা আমার কাছে দিয়ে বললো "আগুনে পুড়িয়ে ফেলতে"। লেবুটা পুড়িয়ে ফেললেই আমি সুস্থ হয়ে যাবো। আমার আর রক্তক্ষরণ হবে নাহ। মূসা হুজুরের কথা মতো উনার সামনেই লেবুটা পুড়িয়ে ফেলি।

যাই হোক আমার ৬টা প্রশ্নের মধ্যে ২টা প্রশ্ন জানা হয়েছে। এখন আবার নতুন কিছু প্রশ্ন বের হলো এগুলোর উত্তরও জানতে হবে।

মূসা হুজুরকে সবকিছু খুলে বললাম তারপর উনি জায়নামাজ বিছিয়ে চোখ বন্ধ করে কিছু আয়াত পড়লো। অনেকক্ষণ চুপ থাকার পর উনি বললেন.....

আল মূসা:- তোমার উপর একটা ভয়ংকর কালোজাদু করা হয়েছে। এরফলে তুমি তোমার কোনো শক্তি প্রয়োগ করতে পারবে নাহ। এই জাদুর ফলেই তোমার লড়াইয়ের সাথীরা তোমার ডাকে সাড়া দিতে পারছে নাহ।

চিশতি:- এখন উপায়..?

আল মূসা:- উপায় একটাই, যেভাবেই হোক তোমাকে তোমার পঞ্চশক্তি অর্জন করতে হবে। ওই শক্তির বলেই তুই এই কালোজাদুর প্রভাব কাটাতে পারবে।

চিশতি:- কে বা কারা আমার উপর কালোজাদু করেছে সেটা বলতে পারবেন..?

আল মূসা:- নাহ! এটা বলা সম্ভব নাহ।

হুজুরের সাথে কথা শেষ করে বাড়ি ফিরে আসি। আর মাত্র একটা দিন তারপর বগুড়া যাবো। আর একবার যদি বগুড়া জেলায় পৌঁছে যাই তাহলে পঞ্চশক্তি নিয়েই ফিরবো।

২০শে ফেব্রুয়ারী গোছগাছ শুরু করি। চিত্রা আপুনি, জিজু, ভাইয়া, আমি, কাকিয়া, চাচ্চু, ফুফাজি, আব্বু, আম্মি এক কথায় আমরা সবাই যাবো। যাকে বলে ফ্যামিলি ট্যুর।

ওইদিকে আগামীকাল যে আমার জন্মদিন সেদিকে আমার খেয়ালই ছিলো নাহ।

২০শে ফেব্রুয়ারী বিকেলে বগুড়া জেলায় গিয়ে পৌঁছালাম। উপজেলার সামনে দিয়ে যখন গাড়ি যাচ্ছিলো তখন খেয়াল করলাম বড় বড় অক্ষরে একটা ভবনে লিখা "শিবগঞ্জ পৌরসভা ও জেলা কর্পোরেশন" তারমানে জায়টার নাম শিবগঞ্জ।

উপজেলা থেকে গাংগাইট গ্রামে যেতে ১৫ মিনিট লাগলো।

উনাদের বাসায় গিয়ে আমি প্রায় অবাক। একটা পুরাতন বাড়ি। দেখতে কোনো রাজপ্রাসাদের মতোই। কিন্তু বাড়িটা একদম তালাবদ্ধ। দেখে মনে হচ্ছে শতবছর ধরে এইখানে কেউ প্রবেশ করে নাহ। প্রাসাদের সামনেই একটা ঘাট। ঘাটের সামনে আবার সাইনবোর্ড টাঙানো "যতন রাজার ঘাট"।

তার মানে এই ঘাটেই সাক্ষী বসবাস করতো। ঘাটের চারিদিকে রঙিন লাইট জ্বালানো হয়েছে। ঘাটটিও সুন্দর করে সাজানো হয়েছে। দেখে মনে হয় নাহ এটা কোনো মুসলিম বাড়ি। কেমন অস্বস্তিকর একটা অনুভূতি। হিন্দু বাড়ির মতো লাগছিলো সবকিছু। এতটুকু সময়ে যা বুঝলাম, যতন রাজার প্রাসাদ আর ঘাট কাকিয়ার বাপের বাড়ি লোকেরাই পেয়েছে। এগুলো তাদেরই জমি।

আম্মির কাছে জিজ্ঞেস করে জানতে পারি এই জমির মালিক কাকিমার ভাই রমজান মামার নামে।

কিন্তু যতন রাজার বংশধর কোথায়.? প্রশ্ন তোহ হাজারটা ঘুরপাক করছে কিন্তু এগুলোর উত্তর কে দিবে.?

২০শে ফেব্রুয়ারী রাত ৯টার দিকে, আমাদের সবাইকে একটা রুমে বিশ্রামের জন্য নিয়ে গেলো। আমরা যে যার মতো কথা বলছিলাম তখন রুমে একটা মেয়ে এলো। দেখতে তেমন ফর্সা নাহ হলেও চেহারাটা খুব মিষ্টি। যে কেউ ওই চেহারার মায়ায় পড়ে যাবে। শ্যামলা মুখে কাজল কালো চোখগুলো যেনো আরো বেশি সুন্দর লাগছে। চুলগুলো বিনুনি করা। ঠোঁটে হালকা গোলাপি লিপস্টিক আর হ্যাঁ একটা নীল রঙের শাড়ী পড়া ছিলো। প্রথম দেখায় ভালো লেগে গেলো। মনে মনে নিজেকে গালি দিতে থাকি, প্রথমে হায়াতি তারপর সাদিয়া এখন আবার এই মেয়েটা। আমি কি প্লেবয় হয়ে গেলাম নাহ মানে যাকে দেখি তাকেই ভালো লাগে। নাহ আসলে তেমনটা নাহ! হায়াতিকে ভালো লাগতো ওর বাচ্চামো'গুলোতে আর সাদিয়াকে ভালো লাগতো সেইম মেন্টালিটির বলে। কিন্তু ওদের দুইজনের একজনকেও প্রথম দেখায় এত ভালো লাগেনি। এই মেয়েটিকে দেখার পর যেনো আমার চোখগুলো ওর দিকেই আটকে গেলো। চোখ সরতেই চাইছিলো নাহ।

যাই হোক মেয়েটি আমাদের সবার জন্য শরবত সাথে আরো অনেক কিছু নিয়ে। মেয়েটিকে দেখে কাকিয়া বললো....

কাকিয়া:- আরে নূরী! এতকিছু কে আনতে বলেছে তোকে.?

নূরী:- আমি আম্মাজানকে বলেছিলাম, শুধু শরবতটুকুই নিয়ে যাই কিন্তু তোমার ভাবি এত সব আমার হাতে ধরিয়ে দিলো। যারা খেতে চায় নাহ তাদের এত খাবার নাহ দেওয়াই উচিৎ!

বুঝতে পারলাম এটা রমজান মামার মেয়ে কিন্তু নূরীর এমন কথা শুনে আমার অনেক সন্দেহ হলো। এতগুলো গেস্টের সাথে মেয়েটি এভাবে কাকিয়াকে অপমান করছে কেনো।

যা বুঝলাম মেয়েটি এতক্ষণ আমাকে দেখেনি। হঠাৎ যখন মেয়েটি আমার দিকে তাকালো....

নূরী:- তুমি!

চিত্রা:- তুমি ওকে চিনো..?

নূরী:- নাহ! চিনি নাহ। তবে চেনা চেনা লাগছে

চিশতি:- কি বলেন.?

নূরী:- হ্যাঁ! হয়তো আগের জন্মের কোনো সম্পর্ক আছে আমাদের

ওর কথা শুনে সবাই হাসলেও আমি হাসিনি। আমার এখন কেমন সন্দেহ হতে লাগলো। এই মেয়েটিই কি ৯জন জাদুকরের একমাত্র বোন।

কি বলতে চাইছে মেয়েটি.?

মেয়েটি চলে গেলো। যে যার মতো কথা বলছে। আমার কেমন যেনো এক অদ্ভুত অনুভূতি হতে লাগলো।

যাই হোক চিত্রা আপুনিকে একাকী ডেকে কিছু কথা জিজ্ঞেস করলাম....

চিশতি:- আপুনি! একটা কথা বলতে পারবি.?

চিত্রা:- কি.?

চিশতি:- বড় আপুনি যখন ওয়ারিশ নিয়েছিলো তখন কি ও নিজের ইচ্ছায় নিয়েছিলো নাকী ওর উপর কোনো জাদু টোনা করা হয়েছিলো.?

চিত্রা:- হঠাৎ এই প্রশ্ন??

চিশতি:- তুই বল.?

চিত্রা:- কি জানি! আমি তোহ তখন নেত্রকোনা ছিলাম। আর পরে যতটুকু জানতে পেরেছিলাম, চৈতীর উপর জাদু করা হয়েছিলো।

চিশতি:- বড় জিজু কেনো এমন কাজ করলো.?

চিত্রা:- কি জানি! বাদ দে এসব। আজকে কত সুন্দর একটা দিন এটা উপভোগ কর।

চিশতি:- তোর কাছে বড় জিজুর কোনো ছবি আছে.?

চিত্রা:- আমার কাছে নেই। তবে উনার ফেইসবুক আইডিতে আছে

চিশতি:- উনার সাথে তোর অ্যাড আছে..?

চিত্রা:- আরে নাহ! চৈতী আর ওর ছেলেকে দেখার জন্য জিজুর আইডিটা খুজে বের করেছি। তাছাড়া জিজুর আইডি তোহ আনলক সবকিছুই পাবলিক করা।

চিশতি:- আচ্ছা যাই হোক জিজুর পিক দেখা

তারপর চিত্রা আপুনির ফোন থেকে বড় আপুনি, বড় জিজু, ওর ছেলে আর ওর মেয়ের পিক দেখলাম। ছেলেটা বাবার মতো কালো হলেও মেয়েটা আমার বোনের মতোই ফর্সা হয়েছে।

ইশশ কেমন হতো যদি আজ ওরাও আমাদের সাথে থাকতো। কতই নাহ মজা হতো। থাক যা হবার নয় সেসব ভেবে লাভ নেই।

রাত ১১টার দিকে পুকুর ঘাটে যাওয়ার সময় প্রাসাদের সামনে ২জন লোককে কথা বলতে শুনি....

প্রথম লোকটি বললো....

"তুমিও যে আমাদেরই একজন এটা যেনো চিশতি জানতে নাহ পারে"

দ্বিতীয় লোকটি.....

"কখনোই জানতে পারবে নাহ, চিশতি আমার এখানে অতিথি হয়ে এসেছে আর লাশ হয়ে যাবে"

প্রথম লোকটি....

"তাই যেনো হয়! আর শুনো রমজান মিয়া তোমার একটা ভুল কিন্তু আমাকে ধরিয়ে দিতে পারে। আমি যে এখানে এসেছি এটা যেনো কেউ জানতে নাহ পারে।"

তারমানে দ্বিতীয় লোকটি রমজান মামা.?

রমজান মামাও ১০জনের ১জন..?

হায় আল্লাহ! এমন একটা সময়ে এই লোকটির পরিচয় জানতে পারলাম যে সময়টাতে আমি কিছুই করতে পারবো নাহ। কিন্তু প্রথম লোকটি কে..? এখন ওদের চিনে রাখতে হবে যখন পঞ্চশক্তি পাবো তখন ওদের এক এক করে শেষ করবো। প্রথম লোকটির মুখ দেখতে হবে যেভাবেই হোক। তখনই রমজান মামা বলে....

রমজান:- তুমি চিন্তা করো নাহ ইকবাল! তুমি যে এখানে এসেছে কেউ জানতে পারবে নাহ এমনি কি আমজাদ আর মিনহাজও নাহ

কি! বড় জিজু এখানেও চলে এসেছে.? ইশশ আজকে ৪জনের পরিচয় আমার সামনে এসেছে অথচ আমি কিছুই করতে পারছি নাহ। তখনই বড় জিজু বলে....

ইকবাল:- নাহ! আমজাদ আর মিনহাজকেও জানিয়ে দিও আমি এসেছি। আজকে চিশতির উপর আমরা ৪জন অ্যাটাক করবো। যেভাবেই হোক আজকে পঞ্চশক্তি হাসিল করতে হবে।

রমজান:- একটা কথা.? ৯নাম্বার জাদুকর কবে মুখ প্রকাশ করবে.? আমরাই সব কাজ করছি.? সে কি করবে.?

ইকবাল:- ওর এখনো বাইরে আসার সময় হয়নি। সময় হলে ঠিকই বের হবে।

ওরা ৯ নাম্বার লোকটির কথা বলছে। কিন্তু কে সেই ৯ নাম্বার লোক.? ৪জনকে মেরেছি আর ৪জনের পরিচয় আমার সামনে। এখন বাকি ২জনকে কোথায় খুজবো.?

রমজান:- ভাই ইকবাল! অনেক দিন ধরে একটা কথা জিজ্ঞেস করবো করবো ভাবছিলাম...

ইকবাল:- কি কথা.?

রমজান:- তোমার সাথে গফফার ভাইয়ে কি নিয়ে ঝামেলা হয়েছিলো.?

ইকবাল:- হা!হা!হা! শুনলে তুমিও হাসবে..

রমজান:- বলো.?

ইকবাল:- তুমি তোহ জানোই আমাদের পুনর্জন্মের কারণে আগের জন্মের সব শক্তি হারিয়ে ফেলেছি। এই জন্মে যদি শক্তি অর্জন করতে হয় তাহলে নিজের মাকেই রক্ত বাণ মারতে হয়। আমিও তাই করেছি। কিন্তু বাণ মারার আগে গফফার ভাই আমাকে বাঁধা দিয়েছিলো। উনি বলেছিলো আমি যেনো এই কাজটা নাহ করি। আমি যেনো সাধারণ মানুষ হয়েই থাকি। হা!হা!হা!

রমজান:- কিন্তু উনি এই কথা কেনো বলেছিলো.?

ইকবাল:- উনি চেয়েছিলো, তোমরা সবাই নিজেদের শক্তি দিয়ে শীতাক্ষীকে পঞ্চশক্তি উপহার দিবে আর ও তোদের কাজে খুশি হয়ে পঞ্চশক্তির ভাগ দিবে। আমি যদি আমার মাকে বাণ নাহ মারি তাহলে আমি শক্তি পাবো নাহ আর তোমাদের সাথে পঞ্চশক্তির ভাগ পাবো নাহ।

রমজান:- হা!হা!হা! এই বিষয়

ইকবাল:- শুনো.. ১২টা বাজতে আর কিছু সময়৷ আজকে ওতপেতে থাকতে হবে। আজকে চিশতি ওর পঞ্চরূপে আসবে।

রমজান:- হ্যাঁ! এখন দুইজন দুই দিকে চলে যাই।

তারপর ওরা দুইজন দুই দিকে চলে গেলো আমি ওদের কিছুই করতে পারলাম নাহ। মন খারাপ নিয়ে পুকুর ঘাটের সিঁড়িতে গিয়ে একা বসে ছিলাম। তখন হঠাৎ কেউ একজন পিছন থেকে গান গাইতে গাইতে আমার দিকে আসছিলো "বাতাসে গুন গুন এসেছে ফাগুন" আমি পিছন ফিরে তাকিয়ে দেখি নূরী।

চিশতি:- তুমি এখানে.?

নূরী:- চলে এলাম আমার আশিকের কাছে

চিশতি:- মানে! বাদ এসব আগে বলো তখন সবার সামনে কাকিয়াকে অপমান করলে কেনো.? আর আমাকে তোমার চেনা লাগছিলো মানে.?

নূরী:- তুমি শুধু আমার চেনাই নাহ! তুমি আমার এমনই একজন যারে এক জনমে ভালোবেসে ভরবে নাহ এ মন...

চিশতি:- কথায় কথায় গান নাহ গেয়ে, কে তুমি সেটা বলো। আর আমি কিন্তু আমার প্রশ্নের উত্তর পাইনি.?

নূরী:- তোমার কাকিয়া! ও মানুষ নাহ আস্ত একটা সয়তান

চিশতি:- মানে.?

চিশতি:- মানে.?

নূরী:- ও প্রথম থেকেই জানতো, ওর ভাই, ওর স্বামী আর তোমার ফুফাজি কালোজাদু করে। আমি ওকে অনেকবার বলেছি কিন্তু ও শুনেও নাহ শোনার ভান করে ছিলো।

চিশতি:- তুমি কিভাবে জানো যে ওরা কালোজাদু করে..?

নূরী:- সে অনেক কাহিনি। প্রতিশোধ নিতে এসেছি আমি। ওদের প্রত্যেককে এক এক করে শেষ করবো আমি।

এতক্ষণ নূরীর কথা শুনে মনে হচ্ছিল ও হয়তো কালোজাদুর বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নিতে চাইছে কিন্তু ও যে প্রতিশোধ নিতে চাইছে এটা বুঝিনি। কি জন্য প্রতিশোধ নিতে চাইছে ও..? এ আবার কোন ধাঁধার মুখোমুখি হলাম..?

নূরী:- কি ভাবছো.? এটা শুধু আমার একার প্রতিশোধ নাহ এটা তোমার আর আমার প্রতিশোধ।

চিশতি:- মানে.?

নূরী:- "মিরান"

চিশতি:- মানে.? মিরান কে.??

নূরী:- তুমি.!

চিশতি:- তোমার বোধহয় ভুল হচ্ছে! আমি মিরান নই আমি চিশতি

নূরী:- আমি জানি তুমি চিশতি! কিন্তু এই রূপ, এই চেহারা, এই শরীর, এই দেহ সবটাই মিরানের। তুমি চিশতি হলেও তুমি আমার মিরান শুধুই আমার। তুমি আমার আমি তোমার। আমি তোমার তুমি আমার।

চিশতি:- কি বলছো তুমি.? মাথা ঠিক আছে তোহ তোমার.?

নূরী:- চন্দ্রা!

চিশতি:- এ-এ-এই নাম তুমি কিভাবে জানো..?

নূরী:- দেখো চিশতি! মনোযোগ দিয়ে আমার কথা শুনো। তুমি চাইলেই কিন্তু চন্দ্রার রূপে জন্মগ্রহণ করতে পারতে কিন্তু তা নাহ হয়ে তুমি মিরানের রূপে জন্মগ্রহণ করেছো। তোমার মধ্যে শুধু তুমি নও। তোমার মধ্যে ৩জন আছে। চন্দ্রা, মিরান আর চিশতি। মিরানের দেহে আর চন্দ্রার শক্তিতে নতুন ভাবে তুমি চিশতি হয়ে ফিরে এসেছো। এবার আমাদের আর কেউ আলাদা করতে পারবে নাহ।

চিশতি:- আমি কিছুই বুঝতে পারছি নাহ কি বলছো তুমি.?

নূরী:- তুমি জানো, তুমি আসলে কে.?

চিশতি:- হ্যাঁ জানি

নূরী:- কে তুমি.?

চিশতি:- পঞ্চশক্তি উত্তরাধিকারী চন্দ্রাবতীর পুনর্জন্ম চিশতি।

নূরী:- ঠিক! কিন্তু এটাও মনে রেখো তুমি যতন ও যৌথার একমাত্র পুত্র মিরান। শঙ্খ নাগরাজ মিরান আর আমি তোমার শঙ্খিনী ইশরাখ। মনে করো।

চিশতি:- কি যা-তা বলছো.?

নূরী:- আমি যা-তা বলছি নাহ।

২৩ বছর আগে..............

১০০ বছর পর শঙ্খ নাগ আর শঙ্খিনী মানুষ রূপে মনুষ্য জগৎ ঘুরতে এসেছিলো। কিন্তু তাদের এই ঘুরতে আসাই তাদের জন্য কাল হয়ে যায়।

যতন রাজা ও যৌথার একমাত্র পুত্র সন্তান জন্মের ২১ বছর পর তাকে যতন রাজার প্রাসাদ ছেড়ে নাগলোকে চলে যেতে হয়। কারণ তার মধ্যে ছিলো নাগমণি। যার কাছে নাগমণি থাকে সেই একমাত্র নাগলোক আর ওই নাগমণির হকদার। নাগলোক শুধুমাত্র তার হুকুমেরই গোলাম। কোনো এক অলৌকিক ক্ষমতার বরদানের ফল ছিলো মিরান। কিন্তু মিরানের ২১ বছর পূর্ণ হওয়ার সাথে সাথেই নাগলোক থেকে তার ডাক চলে আসে এবং সে যতন রাজা ও যৌথাকে বিদায় জানিয়ে নাগলোক শাসনে চলে যায়। মিরান ছিলো একজন বিষধর নাগ। আর ইশরাখ ছিলো বিষধর নাগিন। মিরানের পক্ষে একা নাগলোক পরিচালনা করা সম্ভব হচ্ছিল নাহ তাই সে ইশরাখকেই নিজের জীবনসঙ্গী হিসেবে বেছে নেয় এবং তারা দুইজন সুষ্ঠু ও ন্যায়পরায়ণ ছিলো নাগলোকে। নাগলোকে তাদের শাসনের ১০০ বছর পূর্ণ হওয়ার পর তারা মনুষ্য জগতে আসে যতন ও যৌথার সাথে দেখা করতে। কিন্তু তারা এখানে এসে দেখে যতন আর যৌথা কেউই বেঁচে নেই। শুধু তাই নাহ, এই প্রাসাদও এখন আর চলমান নেই। কিন্তু প্রাসাদের বাইরের সেই ঘাটটি এখনো জনবহুল হয়ে রয়েছে কারণ এখন থেকে প্রায়ই নাগলোক থেকে বিভিন্ন নাগ নাগিন মনুষ্য জগতে আসে।

আজ থেকে প্রায় ২৩ বছর আগে যখন শঙ্খিনী আর শঙ্খ নাগ এই প্রাসাদে এসেছিলো তখন ওই ৩জন কালো জাদুকর ওদের দুইজনকে মারা ষড়যন্ত্র করে। তারা শঙ্খ নাগের কাছে থেকে নাগমণি হাসিল করতে চেয়েছিলো কিন্তু নাগমণি নাগলোকে ছিলো বিদ্বায় ওদের হাতে পরেনি কিন্তু ওরা শঙ্খ নাগকে হত্যা করতে সফল হয়। আমি আহত অবস্থায় কোনো রকম প্রাসাদ থেকে পালিয়ে আসি। প্রাসাদ থেকে পালিয়ে আসার ৩দিন পর আমিও মারা যাই। ওই ৩দিন গাংগাইট গ্রামে নাগলোকের বিভিন্ন নাগ নাগিনদের ক্ষোভ পরে। ফলে অনেক নিরীহ মানুষ প্রাণ হারায় কিন্তু ওই ৩ জন কালো জাদুকর এখনো বেঁচে আছে। ওদের কাছ থেকে প্রতিশোধ নেওয়ার জন্যই হয়তো আমার আবার পুনর্জন্ম হয়েছে। কিন্তু এমন এক পরিবারে জন্ম হয়েছে যে পরিবারে আমার বাবাই হলো সেই কালো জাদুকরদের একজন।

গতকাল রাতেই আমার আগের জন্মের সবকিছু মনে পড়েছে কিন্তু এখন অব্দি আমি নাগিন শক্তি পাইনি। আমি যে আবারও ফিরে এসেছি সেটা কেউ জানে নাহ। কিন্তু মিরানের দেহে চন্দ্রার শক্তি নিয়ে যে তুমি আবারও ফিরে এসেছো সেটা কিন্তু সবাই জানে।

"নূরীর কথা শুনে আমি আবারও অবাক হলাম। মানে আমি এখন যারা দেহে আছি সে একজন নাগরাজ ছিলো। আর সেই নাগরাজই হলো পঞ্চশক্তির বরদানের ফল। আমার মধ্যে তাহলে আমি সহ আরো ২জন আছে। মিরানের দেহে চন্দ্রার শক্তি নিয়ে চিশতি রূপে আবারও আমার আগমন হয়েছে। কোথাকার কাহিনি কোথায় কোথায় এসে থেমেছে"

নূরী:- কি ভাবছো.?

চিশতি:- তুমি যা বললে সবকিছু কি সত্যি.?

নূরী:- হ্যাঁ! আর মাত্র কিছুক্ষণ এরপর তুমি আর আমি দুজনেই দু'জনের শক্তি ফিরে পাবো আর আমরা আমাদের প্রতিশোধ নেবো।

আকাশে তাকিয়ে দেখি লাল পূর্ণিমা শুরু হয়ে গেছে। রাত ১২টা বাজতে আর ২ মিনিট সময় বাকি। নূরী হঠাৎ করে যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে পুকুর ঘাট থেকে দৌড়ে কোথাও চলে গেলো। আমি যেনো স্থির হয়ে গেছি কোথাও নড়তে পারছিলাম নাহ। কিছুক্ষণ পর পুকুর থেকে বিশাল বড় বড় দুইটা সাপ উঠে এলো। তাদের মাঝ থেকে জ্বলজ্বল করছে কিছু একটা। হুট করে সেই উজ্জ্বল জিনিসটা আমার নাভিতে এসে প্রবেশ করলো। এবার যেনো আমি নিজের শরীরে শক্তি ফিরে পেলাম। কিন্তু আমার এমন অদ্ভুত লাগছে কেনো.?

মনে হচ্ছে আমি অনেক দূর দূর পর্যন্ত শুনতে পাচ্ছিলাম। অনেক দূর পর্যন্ত দেখতেও পাচ্ছিলাম। তখনই আমার দুই পাশ থেকে সাক্ষী আর জটায়ু বেরিয়ে আসে। পুকুরে নিজের প্রতিচ্ছবি দেখলাম আমার মধ্যে কোনো পরিবর্তন হয়নি। শুধুমাত্র আমার নীল চোখগুলো লাল হয়ে গেছে। মুখ হা করে দেখি দুই পাশের দুইটা দাঁত বড় বড় হয়ে গেছে যেমনটা রক্ত খেকোদের হয়ে থাকে।

নিজের প্রতিচ্ছবি দেখে পিছন ঘুরে দেখি একটা বিশাল বড় সাপ আমার সামনে এসে হাজির হলো। তার মানে এটাই নূরী। হ্যাঁ! এটাই নূরী কারণ সে আমার সামনে আসার সাথে সাথে নিজের আসল রূপ নেয়।

আমি চন্দ্রা ও মিরান দুইজনকেই অনুভব করতে পারছিলাম। এখন ঠিকই মনে হচ্ছে আমিই সেই ৩জন ব্যক্তি যাদের একটাই অস্তিত্ব।

এবার তাহলে প্রতিশোধের পালা। ঘাট থেকে উঠে আসার সময় চারিদিক থেকে ওই ৪জন জাদুকর আমাদের ঘিরে ধরে।

চাচ্চু, ফুফাজি, বড় জিজু আর রমজান মামা।

ইকবাল:- হা!হা!হা! ফাইনালি! হা!হা!হা! ফাইনালি! ফাইনালি! ফাইনালি! আজকে সেই দিনটা এসেই গেলো।

ফুফাজি:- কি ভেবেছিস.? আমরা জানতাম নাহ যে তখন তোর মধ্যে পঞ্চশক্তি জাগ্রত হয়নি.? আমরা অনেক আগেই জানতাম এই কথাটা এজন্যই তোহ তোর সাথে এতদিন ধরে খেল খেললাম আর তুইও বোকার মতো খেলায় মেতে উঠলি।

চাচ্চু:- হা!হা!হা! তুই কি ভেবেছিস তুই এখানে নিজের ইচ্ছায় এসেছিস.? নাহ তোকে আমরা এনেছি। নাগমণি তোকে ছাড়া উদ্ধার করা সম্ভব ছিলো নাহ। আর নাগমণি উদ্ধার করা নাগ গেলে পঞ্চশক্তিও হাসিল করা সম্ভব ছিলো নাহ।

রমজান:- আজ নাগমণি আর পঞ্চশক্তি দুইটাই তোর মধ্যে। এখন তুইও শেষ আর পঞ্চশক্তিও আমাদের.....

তখনই নূরী আমার পিছন থেকে বেরিয়ে এসে বলে

নূরী:- ব্যস!

রমজান:- নূরী! তুই.?

নূরী:- হ্যাঁ! আমি..? ভুলে গেছিস তোরা আজ থেকে ২৩ বছর আগের কথা.? কি করেছিলি তোরা.? আমাকে আর আমার শঙ্খ নাগকে হত্যা করেছিলি। আজ তোদের মৃত্যু নিশ্চিত। আজ শুধু চিশতি একা নাহ, ওর সাথে সাক্ষী, জটায়ু, শঙ্খিনী, নূরী, চন্দ্রা আর শঙ্খ নাগ আছে।

ইকবাল:- আজ তোদের সবাইকে আবারও মারবো.! তোরা যতবার জন্মাবি ততবার তোদের মারবো।

চিশতি:- হা!হা!হা! তোরা হয়তো ভুলে গিয়েছিস। তোদের মৃত্যুর সাথে সাথে তোদের শক্তিরও মৃত্যু হয়েছে আর পঞ্চশক্তি সেদিনও মারা যায়নি আর আজও মারা যায়নি।

হ্যাঁ! পঞ্চশক্তি উত্তরাধিকারী বার বার নিজের জীবন দিয়েছে কিন্তু এবার আর তা হবে নাহ। এবার পঞ্চশক্তির পাশাপাশি তার উত্তরাধিকারীও শক্তিশালী হয়ে ফিরেছে।

এই বলে আমি পঞ্চশক্তি আহ্বান করি। আমার চোখগুলো আগুনের মতো জ্বলে উঠলো। আমার ডান হাতে সাক্ষী, বাম হাতে জটায়ু আর মাথায় নূরী নাগিন রূপে এসে আমাকে সাহায্য করলো।

এতে যেনো আমি আরো শক্তিশালী হয়ে গেলাম।

ইকবালের উপর ঝাপিয়ে পরলাম, মুহুর্তেই বিশাল এক দানবের মতো হয়ে গেলাম। ইকবালকে দুই হাত দিয়ে টেনে ছিড়ে ফেললাম।

ইকবালকে মেরে ফুফাজির দিকে চোখ তুলে তাকাতেই আমার মাথা থেকে হাজারেরও অধিক উড়ন্ত সাপ গিয়ে ফুফাজিকে ছোবলের উপর ছোবল দিয়ে মেরে ফেললো।

ফুফাজিকে মারার পর রমজান মামার দিকে এক লাফে চলে গেলাম। উনার সামনে গিয়েই ঘাড় কামরে ধরলাম। শরীরের সমস্ত রক্ত এক টানেই শুষে নিলাম।

এক এক করে সবাইকে মরতে দেখে চাচ্চু পালাইতে চাইলে তাকে বিশাল সাপ হয়ে গিলে ফেললাম।

ভয়ংকর তান্ডব শেষে শান্ত হলাম। এটা কেমন হলো.? বারংবার বলেছিলাম এদের এত সহজে মারবো নাহ। এদের মাধ্যমেই বাকি ২জনকে খুঁজতে হবে। কিন্তু এখন কিভাবে বাকিদের খুঁজবো.?

পঞ্চশক্তি এতটা শক্তিশালী ভাবিনি। যাই হোক আজ আমার শত্রু তালিকা থেকে আরো ৪জনের নাম মুছে গেলো। এখন বাকি ২জন। ওই ২জনকেও খুঁজে বের করতে হবে।

এদিকে যে ৪জনের জীবন কাহিনি শেষ সে খবর কেউ জানে নাহ। ওদের লাশগুলোর মধ্যে একজন তোহ আমার পেটে বাকি ৩টা লাশ যতন রাজার ঘাটেই ফেলে দি।

প্রতিশোধ শেষে কিছু নাহ জানার মতোই রুমে চলে গেলাম। কিছুক্ষণ পর হাসমি ভাইয়া এলো....

হাসমি:- চিশতি!

চিশতি:- হ্যাঁ! ভাইয়া! বলো..?

হাসমি:- তোকে একটা কথা বলবো..? কাউকে বলবি নাহ..?

চিশতি:- কি.? বলো..

হাসমি:- আমি আজকেই বিয়ে করতে চাই..

চিশতি:- মানে..?

হাসমি:- আমি একটা মেয়েকে ভালোবাসি! ও এখানেই থাকে। আমরা অনেক দিন ধরে বিয়ে করবো ভাবছি কিন্তু যতবারই বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নি ততবারই কিছু নাহ কিছু অঘটন ঘটে। তুই প্লিজ কিছু একটা কর যাতে এবার বিয়ে করে বউ সাথে করে বাড়ি ফিরতে পারি।

চিশতি:- আচ্ছা! আমি কথা দিলাম কালকেই তোমার বিয়ে হবে...

হাসমি:- সত্যি!

ভাইয়া খুশিতে আমাকে জড়িয়ে ধরলো...

ভাইয়াকে রুম থেকে বের করে সাক্ষী আর জটায়ুকে ডাকি....

জটায়ু:- বলো..

চিশতি:- আমার ভাইয়ে বিয়ে দিতে চাই

সাক্ষী:- কিন্তু ওর তোহ বিয়ে হবে নাহ কখনো.?

চিশতি:- হ্যাঁ! জানি সেজন্যই তোহ তোমাদের ডেকেছি। কিছু একটা উপায় বলো কিভাবে ওর বিয়ে দেবো

জটায়ু:- ওর উপর ভয়ংকর কালোজাদু করা হয়েছে, এই কালোজাদু আমাদের পক্ষে কাটানো সম্ভব নাহ।

চিশতি:- তাহলে উপায়.?

সাক্ষী:- উপায় একটা আছে..?

জটায়ু:- সাক্ষী! এবার কোনো ঝামেলা করনি নাহ্। তুই খুব ভালো করেই জানিস কত কষ্টের পর পঞ্চশক্তি চিশতির মধ্যে স্থাপিত হয়েছে।

সাক্ষী:- কিন্তু এটা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই

চিশতি:- কি বলছো তোমরা..? কোন উপায়ের কথা বলছে.? যেকোনো উপায়েই হোক ভাইয়ার বিয়ে দিবো। তোমরা শুধু উপায়টা বলো...

জটায়ু:- তোমাকে হয় প্রতিশোধ আর নাহয় দায়িত্ব যেকোনো একটা বেছে নিতে হবে..

চিশতি:- মানে!

সাক্ষী:- পঞ্চশক্তির সমস্ত বল প্রয়োগ করে তারপর হাসমির বিয়ে দিতে হবে। এর ফলে....

চিশতি:- এর ফলে কি..?

জটায়ু:- তোমাকে পঞ্চশক্তি বিসর্জন দিতে হবে। এই কাজটা করলে পঞ্চশক্তি তোমার মধ্যে আর থাকবে নাহ।

চিশতি:- এই ব্যাপার! তবে তাই হোক! আমার পরিবারের উর্ধ্বে কখনোই আমার প্রতিশোধ বড় নাহ। আমি আমার পরিবার নিয়েই সুখে থাকতে চাই। এসব মরণ খেলা এবার বন্ধ করতে চাই।

জটায়ু:- ভুলে যেও নাহ, এখনো আরো ২জন শত্রু বেঁচে আছে এবং তাদের পরিচয়ও তুমি জানো নাহ।

চিশতি:- যাই হোক, এতকিছু ভাবার সময় নেই। আমি আমার সমস্ত শক্তি বিসর্জন দিতে রাজি। কি করতে হবে আমায়..?

সাক্ষী:- শুধুমাত্র ৩বার বলতে হবে "পঞ্চশক্তি আমি তোমায় ত্যাগ করলাম"

চিশতি:- ঠিক আছে

জটায়ু:- তুমি এমনটা করলে কিন্তু আমরাও হারিয়ে যাবো...

চিশতি:- আমার পরিবারের সুখের জন্য তোমাদের হারাতেও রাজি

জটায়ু:- বেশ তবে তাই হোক। কিন্তু মনে রেখো, আজ যেখান থেকে তুমি প্রতিশোধ নেওয়া স্থগিত করেছো ঠিক সেখান থেকেই এই প্রতিশোধ আবার শুরু হবে। এই প্রতিশোধ এখানেই থেমে থাকবে নাহ। আমরা চলে যাচ্ছি, অপেক্ষা করো ৩০ বছর পর আমরা আবারও ফিরবো.....

জটায়ু বাঁধা দেওয়ার পরও আমি বললাম

"পঞ্চশক্তি আমি তোমাকে ত্যাগ করলাম,পঞ্চশক্তি আমি তোমাকে ত্যাগ করলাম,পঞ্চশক্তি আমি তোমাকে ত্যাগ করলাম"

সাথে সাথে চারিদিকে জোড় হাওয়া বইতে থাকলো। আমার নাভি দিয়ে টগবগিয়ে রক্ত পড়তে লাগলো। একসময় নাভি থেকে নাগমণি বেরিয়ে কোথায় যেনো মিলিয়ে গেলো।

প্রচুর হায়ার মাঝেও লক্ষ করে দেখলাম সাক্ষী আর জটায়ু একত্র হয়ে একটা স্বর্ণ সর্প হয়ে নাগমণির মতোই কোথাও একটা মিলিয়ে গেলো।

পরদিন সকালে ঘুম ভেঙ্গেই শুনতে পাই হাসমি ভাইয়া বিয়ে করে ফেলছে। গাংগাইট গ্রামের রহমান নামে এক ভদ্রলোকের বড় মেয়ে নাম ইসামতি।

এরপর সবাইকে নূরী আর আমার কথা জানালে সবাই মেনে নেয় এবং সবাই সিদ্ধান্ত নেয় আমাকে সামনের বছর বিদেশ পাঠাবে, আমি যেনো বিদেশ থেকে এসেই নূরীকে বিয়ে করি। আজকে আমার আর নূরীর আংটি বদল করে রাখবে। এবং আমাদের সাথেই নূরে নিয়ে যাবে।

★★★The End★★★