নির্বাসিত কৃষ্ণচূড়া — last part 47

লেখক: সাদিয়া তিন্তি · বিভাগ: রহস্য · last part 47 · ৪৭ পর্বের মধ্যে ৪৭

মিনু রহমান তার বিছানায় হাসিমুখে বসা ছিলেন , তবে তূর্যের মুখের দৃঢ়তা তার হাসিতে ফাটল বাঁধায়। তূর্য কোনো ভূমিকা না করে সরাসরি মিনু রহমানের চোখে চোখ রেখে বলল, “আপনি বড় দাদাকে সব সত্যি কেন বলেননি দাদি?”

কথাটা এমন ছিল, যেন ঘরের বাতাস থমথমে হয়ে উঠলো। মিনু রহমানের মুখ মুহূর্তেই নিস্তব্ধ, চোখে ক্ষীণ বিস্ময়, ঠোঁটে থেমে যাওয়া নিঃশ্বাস। তিনি আড়ষ্টতা নিয়ে বলেন, “তুমি… কী বলতে চাও, তূর্য?”

তূর্য এক ধাপ এগিয়ে আসে, চোখের পলক না ফেলে বলল, “আমি জানতে চাই, আপনি কেন আংশিক সত্য বলেছিলেন? আপনি জানতেন সব। প্রকৃতির ডায়রি কিংবা বাকি সব। তবে অস্বীকার কেন করলেন?"

মিনু রহমানের মুখ অস্বাভাবিক বদলে যায়। তিনি তেঁতে উঠে বলেন, "কি সব বাজে কথা বলছো? কে তোমার কান ভারি করছে? হিয়া? ঐ দুদিনের মেয়ে?"

তূর্য খুব ধীর কন্ঠে বলল, "কি করবেন জেনে? তুহুরার মতো ওকেও মেরে ফেলবেন? দায় এবার কার উপর চাপাবেন? আমার উপর?"

মিনু রহমান এবার ঘাবড়ে যান। তিনি যেন কথা বলার শব্দ পান না। তূর্য অটোল, তার মুখে এমন ভঙ্গি যেন সে সব জেনেই দাঁড়িয়ে আছে। মিনু রহমান চুপ করে শান্ত হয়ে পড়েন। একটি নীরবতার প্রাচীন ভার যেন ছেয়ে ফেলেছে চারপাশ। মিনু রহমান একদম চুপ, তার চেহারার ভেতর ধীরে ধীরে গলে যেতে থাকে এক জমাট দৃঢ়তা। ঠোঁট কাঁপে, কিন্তু শব্দ আসে না। তূর্য তখন আরো এক ধাপ এগিয়ে এসে কাঁপা গলায় বলল,

“কিসের এত রাগ ছিল আপনার ভাইদের ওপর, দাদি? কিসের এত শত্রুতা? সত্যিটা কী দাদি? এত বছর ধরে এই পাপ বয়ে নিয়ে যাচ্ছেন, কেন? আপনার বয়স চলে গেছে। আপনাদের জীবনও শেষের দিকে। আমার বড় ভাই মৃত… চিরতরে। তাও আপনি এই পাপ নিয়েই বসে আছেন? আপনি তো মায়ের জায়গায় ছিলেন আমাদের… আমি আপনাকে চিনতে পারছি না।”

মিনু রহমান কিছু বলার চেষ্টা করেন, গলায় যেন কাঁটা গেঁথে আছে। ঠোঁট সামান্য নড়ে ওঠে, কিন্তু শব্দ হয় না। তূর্যের চোখ চিকচিক করে ওঠে। সেই চোখে প্রশ্নও আছে, কান্নাও, ক্ষোভও। সে আবার বলল, “আপনার ভালোবাসার স্নেহ… সবটাই কি তবে লোক দেখানো ছিল? এই ঘরে আপনার হাতে গড়া ভালোবাসা, শিক্ষা, নীতি সবটাই কি শুধু নাটক ছিল?”

এবারও মিনু রহমান কিছু বলেন না। তার চোখে জল টলমল করে, কিন্তু মুখ কঠিন। তূর্য এবার তার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে যায়। সেই দৃঢ়, উচ্চকণ্ঠ এখন এক অচেনা কোমলতায় মোড়ানো একটা প্রার্থনার মতো হয়ে ওঠে। সে বলল, “দাদি… আমি শুধু সত্য শুনতে চাই। বড় দাদা যে দুঃখ নিয়ে চলে গেছেন… তার তো সেটা প্রাপ্য ছিল না। তার ভাগে থাকা উচিৎ ছিল একটা সুন্দর মুক্তি। এমন প্রতারণা নয়। মানুষটা শুধু একটা বারের জন্য জানতে চাইতো প্রকৃতি কোথায়। যদি সে জেনে যেত, তবে হয়তো এত অভিমান নিয়ে তাকেই চলে যেতে হতো না। আমি চাই না, এবার মেঝ দাদা সেই দায় নিয়ে চলে যাক। যদি সত্যটা আপনি না বলেন, তবে সব মুছে যাবে। সবটাই ভুল হয়ে যাবে। আপনি কি চান, সেই ভুলটুকুই আপনার উত্তরাধিকার হোক?”

তূর্য থামলো। মিনু রহমান ভেঙে পড়েছেন তাও মচকাচ্ছেন না। তূর্য কিছু চিঠি ওর পকেট থেকে বের করে মিনু রহমানের সামনে রেখে আবার বলল, “আমাকে ক্ষমা করে দেবেন। আমি আপনার এই লুকানো সত্যের মাঝে ভুল করে ঢুকে গিয়েছি। এই চিঠিগুলো আমি ভুল করে পড়ে নিয়েছি।”

মিনু রহমান এবার চুপ করে আর থাকতে পারেন না। তাঁর চোখের কোণে বয়সের চেনা রেখাগুলো যেন হঠাৎ আরও গভীর হয়ে ওঠে। তূর্যর রাখা চিঠি গুলোর দিকে তাকিয়ে থাকেন শুধু। এরপর তিনি খুব আস্তে বলে ওঠেন, "সবাই সাধু সন্ন্যাসী আর আমি পাপি। ওরা কেউ সাধু সন্ন্যাসী না। আর মিয়া ভাই সব থেকে বড় পাপী। আমি ওকে কোনদিন মাফ করবো না। আমার জীবনটা ধ্বংস লীলায় নামিয়েছে ওরা। আমি কি সত্যিই এমন জীবনের অধিকারী ছিলাম?"

সব চুপ। বাইরের জীবনের গর্জন এখানে ঢুকতে পারে না, এ ঘর যেন সময়ের বাইরে দাঁড়িয়ে আছে। তূর্যের সামনে বসে থাকা বৃদ্ধা নারীটি ধীরে ধীরে নিজের মুখোশ খুলে ফেলেন চোখে, মুখে, কণ্ঠে। সত্যর নগ্নতা এখন আর তাকে লজ্জায় ঢাকে না। মিনু রহমান ফিসফিসিয়ে বলেন, “আমার বয়স তখন কতোই বা! পনেরো কিংবা ষোলো। তখন কি বা জানতাম প্রেম ভালোবাসা কিংবা পাপ এসব নিয়ে? স্কুলের বান্দায় প্রথম প্রেম এলো স্বাত্ত্বকি।”

মিনু রহমান চোখ মুছলেন না। কান্নার রেখাগুলো বয়সের রেখার সঙ্গে মিশে গিয়ে যেন একটাই হয়ে গেল। সামান্য থেমে তিনি বলেন, “এই প্রেম… আমার জীবনের সবথেকে বড় অপরাধ হয়ে দাঁড়াল। মিয়া ভাই কি করে যেন জেনে গেলেন! শুধু জানলেন নাকি তাকে কেউ চরমভাবে উসকে দিলো সেটা বোঝার পর্যন্ত বয়স ছিল না আমার। তবে সেদিন জানলাম প্রেম মানে পাপ। আমার ছোট্ট মস্তিষ্ক এসব বোঝার আগেই। বাড়ির প্রতিটা মানুষের সামনে আমাকে অপমানে বিষিয়ে দেয়া হল। আমি নাকি বংশের নাম ডুবিয়ে দিয়েছি, ধর্মের পাপ করেছি। অধর্ম করেছি। আমি তাদের পা পর্যন্ত ধরেছিলাম… মা, বাবা, ভাই… সবাইকে বলেছিলাম, ‘আমার ভুল হয়ে গেছে, আমাকে আর একবার ক্ষমা করুন।’ কিন্তু কেউ করল না। ক্ষমা তো দূরের কথা, রাতারাতি আমায় ঘর থেকে নামিয়ে হাসানের গলায় ঝুলিয়ে দেয়া হয়।”

তূর্য বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকে। মিনু রহমানের কণ্ঠ যেন তপ্ত ছাইয়ের মতো দগ্ধ কিন্তু নিস্তব্ধ। তিনি বলেই চলেছেন, “হাসান… আমার চেয়ে প্রায় তিন গুণ বয়সে বড়‌ ছিল। সে আগেই বিবাহিত ছিল। তার স্ত্রী সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে মারা যায়, বাচ্চা সমেত। আব্বা জানতেন না। তবে মেঝভাই জানতেন… তাও কাউকে কিছু বললেন না।

দায়! যুদ্ধের সময় রাজাকাররা নাকি যুবতী মেয়েদেরকে তুলে নিয়ে যাচ্ছে। আর এই মেয়ে তো বড্ড পাপ করে ফেলেছে, তাকে ঘাড় থেকে নামিয়ে দাও। তারা আমাকে সাজা দিতে চেয়েছিল, একটা আজীবন জেল… হাসানের হাত ধরে। বংশ পরিচয়, অর্থ এগুলার কাছেই বোধহয় আমাকে বিক্রি করে দিয়েছিল নিজেদের নাক বাঁচাতে। যুবতী মেয়ে তখন ঘরে তুহুরাও ছিল, তবে শাস্তি শুধু আমার হলো। কারন পাপ তো একা আমার।

বড়ভাই তখন যুদ্ধে। তিনি যদি থাকতেন, এ অন্যায় কিছুতেই হতে দিতেন না। উনি ছিলেন একমাত্র মানুষ, যিনি অন্যায়ের সামনে দাঁড়াতে পারতেন।”

মিনু রহমান একটু থেমে নিঃশ্বাস নেন। তারপর আবার বলেন, “আমাকে বিয়ে দেয়া হয়। আমি… আমি তখনো সদ্য গৃহবধূ। এসেই যা দেখলাম, তা কোনো দুঃস্বপ্নকেও হার মানায়। শাশুড়ির চোখে আমি ছিলাম একটা অপবিত্র, আর হাসান… তার কাছে আমি ছিলাম একখণ্ড মাংস মাত্র। তার মন মতো না হলেই গায়ে হাত তুলতো। মারত, পেটাতো, দরজা বন্ধ করে শ্বাস বন্ধ করে দিত।”

তূর্যের শিরদাঁড়া ঠাণ্ডা হয়ে যায়। সে শুধু শুনে যায়। মিনু রহমান আঁচলে চোখ মুছে বলেন, “প্রথম প্রথম কাউকেই বলার সাহস হতো না। শরীরে মারের ছাপ দেখে মা জেনে গেলেন। আমিও বাড়ির লোককে জানালাম। বাবা একবার শালিস বসালেন। খুব শোড়গোল হয়ে সে সব মিটে যায়। আমার দাদি বললেন, ‘এমনটাই তো হওয়ার কথা ছিল, তোর মত মেয়ের।’ আমি ওই বাড়িতে মরেও বেঁচে ছিলাম। কিন্তু কারো কাছে আমি মানুষ ছিলাম না। মা খুব কাঁদতেন আমার জন্য। আব্বা-আম্মা অসুস্থ হয়ে পড়ার কারণে আমি আর এসব নির্যাতনের কথা তাকে প্রকাশ করতাম না। বড়ভাই তখন ছন্নছাড়া, তাকে খুঁজে পাওয়া দায়। দিন রাত কোথায় থাকতেন, কি করতেন এসবই মাসুম ভাইয়ের থেকে জানতে হতো। বাড়িতে মিয়া ভাই থাকতেন, তবে মিয়াভাইয়ের আমার প্রতি তেমন নজর ছিল না। তুহুরার সাথে ছোট থেকে বড় হয়েছিলাম আমি, বোন থেকে বন্ধু ছিল বেশি ও আমার। আমি আমার সব কথা ওর কাছে বলতাম চিঠিতে। নিজের কষ্ট, লজ্জা, বেঁচে থাকার ছোট ছোট কারণগুলো। ওই আমাকে বলেছিল প্রকৃতির কথা, ডায়েরির কথা… সব।

তুহুরা প্রথমে খুব ভালো রুপ দেখাতো। বোঝাতো আমাকে, কিন্তু মিয়াভাইয়ের সাথে বিয়ের পর থেকে তুহুরা বদলে গেল। বড় ভাইয়ের প্রতি ওর আবেগ যেন আরো ফেঁপে উঠলো। ও পাগল হয়ে ওঠেছিল বড়ভাইকে প্রকৃতির সত্যতা জানাতে। জানি না কি ভাবছিল ও! কি ওকে এতো বিরক্ত করছিলো! তবে ও নিজেকে প্রকৃতির আভায় করে নিয়েছিল। ঠিক কেমন একটা! প্রকৃতির ডায়রির বর্ননার মত সাজতো, কেমন পড়ে থাকতো নিজেকে নিয়ে‌।

আমি তখনো মানিয়ে নিতে চাইছিলাম এই দুনিয়াকে। কিন্তু নির্যাতনের মাঝে কতোদিন? ঠিক তখনই পরিচয় হয় আমজাদের সাথে। আমাদের বাড়ির গ্যারেজে থাকত, ভাড়া করা একটা ঘরে। ও আমাকে মুক্তির লোভ দেয়। ধর্ম ভাই পাতিয়েছিলাম তাকে। স্বপ্ন দেখছিলাম এই জাহান্নাম থেকে মুক্তির। ভেবেছিলাম এখান থেকে পালিয়ে অনেক দূরে চলে যাবো। কেউ কখনো খোঁজ অব্দি পাবে না। আমজাদ শুধু এ বাড়ি থেকে বের হতে সাহায্য করবে বিনিময়ে আমি ওকে মোটা অংকের টাকা দেবো।

তুহুরাকে এসব কিছুই বোকার মতো জানিয়েছিলাম। সবটা বলেছিলাম। তবে এটাই যেন কাল হল। তুহুরা আমাকে না বুঝে উল্টো আমাকে ভুল বুঝতে শুরু করলো। আমি যতোই মুক্তির জন্য কাতর হয়ে উঠছিলাম ততোই তুহুরা আমাকে ভীত করছিল। আমি যে অত্যাচারিত সেটা জানিনা কেন আমার শত বোঝানোর পরও বৃথা যাচ্ছিল তুহুরার কাছে। ওই দিন আমি প্রথম জানলাম আমার আর স্বাত্ত্বকির কথা তুহুরাই মিয়া ভাইকে বলেছিলেন। মিয়া ভাই তো তুহুরা বলতে পাগল ছিল। তুহুরা চাইলেই তবে গোপনে আমাকে থামাতে পারতো, আমাকে বোঝাতে পারতো তখন। সে সেটা না করে মিয়াভাইকে উসকে ছিল আমার বিরুদ্ধে সারা পরিবারের সামনে আমাকে ছুঁড়ে দিতে। আমি নিস্তব্ধ হয়ে গেলাম। তবে তুহুরা যেন নিজের তুরুপের দাস পেয়ে গেল। আমাকে ব্ল্যাকমেইল করতে শুরু করল যে, আমি যেন বড় ভাইকে প্রকৃতির ডায়েরির ব্যাপারে সব সত্য কথা বলে দেই। এতে ওর ঘাড় থেকে পাপ নামবে। আর আমি না বললে ও আমার বাবাকে আর হাসানকে বলবে যে আমার আর আমজাদের অবৈধ সম্পর্ক আছে। আমি ওর সাথে পালাতে চাই। এমনকি ও আমার চিঠি গুলো প্রমান সমেত দেখাবে। যতোটা পরিবর্তন দরকার নিজে করে নেবে। আমার প্রচন্ড ঘৃণা হল তুহুরাকে। বোকা আমি বুঝে গেলাম, পর কোনদিনও আপন হয় না। যেখানে আমার নিজের ভাই’ই আমার আপন না, সেখানে তুহুরা কি করে হবে?

কিন্তু সেই লজ্জা… সেই ঘেন্না… সেই অসম্মান, আবার নতুন করে সামনে আসবে ভাবতেই আমি… আমি… আমি অন্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। আমি ঢাকায় ছুটে আসি তুহুরাকে আটকাতে। বাবা তখন প্রচন্ড অসুস্থ। বড়ভাইকে নিয়ে বাড়িতে রোজ ঝামেলা। আমি তুহুরার পা অব্দি ধরলাম। তবে তার একই কথা। সে প্রকৃতির রহস্য আর রাখতে পারছে না, বড়ভাইকে বলে সব শেষ করতে হবে। আমি আম্মাকে বলি, প্রকৃতির ডায়রির কথা তুহুরা আমাকে জানিয়েছে। প্রকৃতির মৃত্যুর কথা কেন বড় ভাইকে জানাচ্ছো না? তবেই তো বোধহয় বড়ভাইয়ের খোঁজ শেষ হয়।

আম্মা সোজা আমাকে বলেন, এই ডায়েরির কথা যদি কোন ভাবে বড় ভাই জানেন তবে অনর্থ হবে। প্রকৃতির শেষ পরিণতিতে তাকে সামলানো যাবে না। বড়ভাই মেনে নেয়ার পরিবর্তে ভেঙে যাবে। মরে যাবে বড়ভাই। মা তো ঠিক জানতেন। দেখো মরে গেলো বড়ভাই। মা এটাই বলেছিলেন, মরে যাবে বড়ভাই।”

মিনু রহমান ঢুকরে কেঁদে উঠলেন। চোখ মুছে তিনি আবার বললেন, “তখন আমিও আর সাহস করলাম না তুহুরার কথা মেনে নেয়ার। তুহুরার এসব পাগলামি ব্যবহারে রোজই মিয়াভাইয়ের সাথে ওর ঝামেলা লেগেই থাকতো। কোন ছেলেই বা মেনে নেবে নিজের বউয়ের এমন পাগলামী তাও তার নিজের বড়ভাইয়ের জন্য! আমিও তাতে ঘি ঢালতে শুরু করি। মিয়াভাই বরাবরই কাঁচা কানের মানুষ। খুব সহজেই মানুষের কথা মেনে নেয়। আমার আধিপত্যে তাদের ঝামেলাটা এবার বড় হয়, তাতেই আচমকা ধাক্কাধাক্কি পর্যায়ে পৌঁছায়। মিয়াভাই গায়ে হাত তোলা মানুষ নন, তবে অতিরিক্ত রাগে তুহুরাকে একরকম ধাক্কা দিয়ে চলে যান তিনি। আমার মস্তিষ্কে শয়তান বসবর্তি হয়। মিয়াভাই আর তুহুরার উপর সব খোব একত্র হয়। এক ঢিলে দুই পাখি। তুহুরাকে ধাক্কা দিয়েই মিয়াভাই ঘর থেকে বের হয়ে যায়। সাথে সাথেই আমি ঐ ঘরে আমি ঢুকি। তুহুরা তখন মাথায় হাত দিয়ে নিজেকে সামলাতে ব্যস্ত। আমি কোনদিকে না তাকিয়ে টেবিলের পাশে রাখা চিনামাটির টব ছুঁড়ে দেই ওর মাথার দিকে। ঠিক মাথার পিছনে আঘাতটা লাগে।”

স্তব্ধ হয়ে ওঠে তূর্য। কেঁপে ওঠে মিনু রহমানের কন্ঠস্বর। তিনি সামান্য থেমে বলেন, “আমার লক্ষ্য ওকে মেরে ফেলা ছিল না। আমি চেয়েছিলাম বাড়ির সবার সামনে বউ পেটানোর দায়ে মিয়াভাই বেইজ্জত হোক। শাস্তি পাক তুহুরাও। ওই মুহূর্তে আমি বুঝতে পারি নি ও মারা যাবে। আমি তো টব ছুঁড়ে দিয়েই বেরিয়ে চলে যেতে চেয়েছিলাম। আমি কেবল চেয়েছিলাম ও থেমে যাক…তবে ও মারা গেল। আমি ঘাবড়ে উঠলাম এতো রক্তপাত দেখে। আমি সমস্ত দায় মিয়া ভাইয়ের ঘাড়ে তুলে দিলাম। তুহুরার থেকে নিয়ে নিলাম সে সমস্ত চিঠি যা ও আমার বিপক্ষে জোগাড় করেছিল। আমি পড়ে রইলাম একই জায়গায়। নিজের জীবন নিজেই দেখছিলাম ধ্বংস হতে। মুক্তির আশা ছেড়ে দিলাম।”

তূর্য ধীরে মাথা নিচু করে, তার হাত দাদির হাঁটুতে। ঠান্ডা শীতল ঘরের ভেতর যেন তখন এক বিস্ফোরণের মতো নীরবতা ছড়িয়ে পড়ে। তূর্যের গলা যেন কেঁপে উঠল, “আপনি তো আমাদের সব ছিলেন দাদি… আপনি যদি পাথর হয়ে যান, তাহলে আমরা কোথায় যাবো! একবারও বুক কাপলো না আপনার?”

মিনু রহমান কিছু বলেন না। তার মুখে ভাষা নেই শুধু কান্নার এক গর্জন… আর চারপাশে থেমে থাকা সময়, যে সাক্ষী হলো এক প্রজন্মের পাপ ও প্রজন্মের সত্যের। সবকিছু থেমে যায়। সময় যেন হঠাৎ করেই হাঁপিয়ে ওঠে। জীবনটা এক অমিমাংসিত পাপে আঁটকে আছে, শাস্তি বিহীন পাপ। আর না, আর এক কদম নয়। মিনু রহমানের মুখোমুখি ভেঙে পড়ল তূর্যের বুকের ভিতরের সমস্ত বিশ্বাস। সে কোন কথা না বলে, একটা শব্দ না বাড়িয়ে মিনু রহমানের ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। দরজার বাইরে, চুপসে যাওয়া ছায়া, মিম আর হিয়া একেবারে স্তব্ধ হয়ে দায়িয়ে রইলো শুধু। তূর্য তাদের দেখেও না দেখার নাটোকে চলে গেল স্থান ছেড়ে। কেবল একটা সত্য আছড়ে পড়ছিল মিম আর হিয়ার বুকের ভেতর। এমন একটা সত্য, যা না শুনলেই ভালো হতো।

তূর্য যেতেই মিনু রহমান সাথে সাথে উঠে দরজাটা আবার জোরে লাগিয়ে দেন। খুব তাড়াহুড়ো করেই নিজের আলমারিটা খোলেন। ড্রয়ারের শাড়ির স্তুপের ভাজে একটা ভাজ করা পুরোনো শাড়ি টেনে বের করেন। তার মাঝে একগাদা পুরোনো কাগজে লেখা কিছু চিঠি, একটা পুরনো সিরিঞ্জ আর তার স্বামী হাসান সাহেবের কিছু ছবি। মিনু রহমান বোধহয় এগুলো নিজের জমানো চিঠি থেকে অধিক যত্নে রেখেছিলেন গোপনে। খুব আতঙ্কে ছিলেন এই সত্য ফাঁসের। তবে এগুলো একই অবস্থায় আশস্ত হন। তিনি ঘরের এক কোণে দাঁড়িয়ে পুরোনো শাড়ি সমেত চিঠি আর সিরিঞ্জ সব পুড়িয়ে দেন। এমনকি নিজের স্বামীর পুরোনো নষ্ট হয়ে যাওয়া ছবি গুলোও জ্বালিয়ে দেন। এ যেন দায় মুক্তি। কোন রহস্যের শেষ প্রমাণ মুছে ফেলা। তার যতো পাপ আছে সব যেন সীমায় আটকিয়ে লুকিয়ে নিলেন।

তূর্য প্রস্তুত ছিল না। কখনোই না। তার পা যেন আপনাতেই চলে যেতে থাকে। নিঃশব্দ, নিঃশ্বাসহীন এক যাত্রায় সে ঘরে ফিরে আসে। দেহে রক্ত বইছে, অথচ হৃদয় যেন জলে ডুবে গেছে। চোখেমুখে কোনো রাগ নেই, অভিযোগ নেই, কেবল এক বিষণ্ন শূন্যতা। দরজাটা সে আলতো করে টেনে দেয়। তারপর ধীরে ধীরে বিছানার পাশে বসে পড়ে, নিজের অস্তিত্ব থেকেও পিছিয়ে এসেছে সে।

অনেকক্ষণ পর, ভারি পায়ে, ধীরে ঘরে ঢোকে হিয়া। চোখ ফোলা, নিজের শরীর আর মনের ভার যেন আর বইতে পারছে না। চোখ পড়ে তূর্যর ওপর, নিঃশব্দ, নিশ্চল। সে আর কিছু না বলে সোজা গিয়ে তূর্যর কাছে বসে পড়ে। তারপর হঠাৎ করেই তাকে জাপটে ধরে, এমন করে যেন একটা ডুবে যাওয়া শিশু খুঁজে পেয়েছে তার শেষ আশ্রয়। ঠিক তখনই, তূর্য ফুঁপিয়ে ওঠে। অসহায়, ছিন্নভিন্ন, শিশুর মতো। তুফানের ভেতর আটকে পড়া এক নাবিক, যার পাথেয় বলে কিছু নেই। হিয়ার গলা শুকনো। চোখে জল নেই। কাঁদতে কাঁদতে সে শেষ করে ফেলেছে সব। তবু সে তার বাহু আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরে তূর্যকে, মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। আর কিছু বলে না, কারণ এখন ভাষা ব্যর্থ।

রাতটা যেন নিঃশব্দে নিজের দেহটাকে মেলে দেয় আকাশজুড়ে, তারারাও যেন আজ কিছু জানে, কিছু বোঝে, তাই তারা আলো দেয় ম্লান হয়ে, যেন তাদের জ্যোতিও এই গোপন গ্লানির বোঝা টানতে টানতেই নিঃশেষ। তূর্য ঘুমায় না সারা রাত, হিয়ার বুকের আশ্রয়ে সে যেন নিজেরই ভাঙা সত্তাকে জোড়া দিতে চেষ্টা করে। হিয়া, নির্বাক, কিন্তু পরম মমতায় জড়িয়ে রাখে তাকে। একটাও শব্দ নয়, তবু তার হাতের ছোঁয়া, চোখের কোণে জমে থাকা শেষ কষ্টের জল, তূর্যকে বলেছিল “তুমি একা না। আমি আছি তোমার।”

ভোরের আলো জানালার কাচে এসে পড়লে তবেই তারা একটু সরে আসে একে অপরের বুক থেকে। তূর্য উঠে বসে, চোখজোড়া লাল কিন্তু মুখে এক নিঃশ্বাসে পাওয়া শান্তি। যেন কান্নার ফাঁকে কিছু একটা ঝরে পড়েছে তীব্র, দগ্ধ, অথচ অবসানময়। হিয়া তখন জানালার দিকে তাকিয়ে ছিল। তূর্য ধীরে তার পেছনে গিয়ে দাঁড়ায়। কিছু বলতে চায়, কিন্তু হিয়া মাথা নাড়ে, “না, কিছু বলতে হবে না।”

তারা জানে, এই সত্য আর কারও কানে পৌঁছনো উচিত নয়। এই ক্ষত, এই গোপন শোক এখন তাদের হৃদয়ের দরজার ভেতরেই থাকবে। মিমকেও নিষেধ করা হয় এই সত্য মুখে আনতে। কিসের খুনের বিচার? কিসের যুদ্ধ? এক বৃদ্ধার বিরুদ্ধে কিসের বিদ্রোহ তাদের? মিনু রহমানের অন্যায় শুধু যার বিরুদ্ধে তিনিই জানুন মাত্র এ পাপ। হিয়া কারও কাছে কিছু বলে না।

সময় এগোয়। রাতের সমস্ত আবেগ যেন কোথাও শুকিয়ে ওঠে। চুপচাপ অন্দরমহলে আরো আয়োজনে মেতে ওঠে। তূর্য আর হিয়ার বৌভাতের অনুষ্ঠান। ঘরভর্তি মানুষ, সাজসজ্জা।

হিয়া সেজে ওঠে আবার নববধূ রুপে। সব কিছুই নিয়মে, শৃঙ্খলায়, আনন্দের মাঝে পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে। হিয়ার পরিবারের প্রতিটা মানুষ আসে, আব্দুর রবিউল মোহাম্মদ একটি অস্পষ্ট সংকোচ আর বহুদিনের জমে থাকা অপরাধবোধ নিয়েই হিয়ার সামনে দাঁড়ান। হিয়া নিজে জাপটে ধরে তার দাদাকে। অভিমান , অভিযোগর মিথ্যেদের মুক্তি মেলেছে। অনুষ্ঠানের শেষ হতেই তার পরিবারের সকলের বাড়ি ফেরার আগেই হিয়া আব্দুর রবিউল মোহাম্মদকে আলাদা করে সব সত্য জানিয়ে দেয়। প্রত্যেকটি সত্য যেমন ঘটেছে, ঠিক তেমন করেই বলল, একেবারে নির্বাসিত, নির্মম রুপে।

আব্দুর রবিউল মোহাম্মদ প্রথমে চুপ করে থাকেন। তারপর ধীরে ধীরে বসে পড়েন একটি খালি চেয়ারে। যেন হঠাৎ তাঁর পায়ের নিচের মাটি সরে গেছে। সব দায় যেন তাকে ছেড়ে চলে যাওয়া তিনি মেনে নিতে পারেন না। তিনি কি আদৌতেও এতো বোকা ছিলেন? একটা মানুষের খুনের দায়ে তিনি তার সমগ্র জীবন পার করেছেন। খুনীর তকমা থেকে বাঁচতে মিথ্যের আশ্রয় নিয়েছেন তবে সেই দায় তো তারই না!

তার চোখে জল আসে না, কিন্তু তাঁর ঠোঁট ফাঁটা নদীর পাড়ের মতো কেঁপে ওঠে, “আমার ভাই… আমার ভাই তো আমাকেই দোষী ভাবলো… আর আমি… আমি তো…আমারই দায় সব… অথচ….”

তাঁর স্বর ভেঙে যায়। কথা ঠিক ধরা দিচ্ছে না তার স্বরে। হিয়া একটা গ্লাসে পানি এগিয়ে দেয়, আব্দুর রবিউল মোহাম্মদের গলা দিয়ে নামাতে পারেন না পানি। পাথরের মতো ভার হয়ে দাঁড়ায় বুকের মাঝখানে। সে তো সারা জীবন নিজেকেই দোষারোপ করে গেছেন, নিজেকে ক্ষমা করেননি কখনো। অথচ প্রকৃত অপরাধীই এতো নাটক করে চললো! আব্দুর রবিউল মোহাম্মদ উঠে দাঁড়ান। তাঁর চোখে এখন আর জল নেই, কেবল ক্রোধ, এমন এক ধরণের সুস্পষ্ট নিরাসক্তি যা বর্ননা করা যায় না। তিনি কোনো উচ্চ স্বরে কথা বলেন না। কোনো নাটক হয় না। শুধু সোজা হাঁটেন মিনু রহমানের ঘরের দিকে। কোনো অনুমতি ছাড়াই ঢুকে পড়েন। দুজনেই স্তব্ধ, একজন জানেন কী বলতে চান, অন্যজন জানেন আর কিছু বলার নেই।

আব্দুর রবিউল মোহাম্মদ শান্ত স্বরে শুধু জিজ্ঞেস করেন, “এতো রাগ তোর? আর কোন দায় আছে আমার?”

মিনু রহমান চুপ থাকেন। কোনো প্রতিবাদ নয়, কান্নাও নয়। শুধু এক বিবর্ণ মুখে দাঁড়িয়ে থাকেন তিনি। আব্দুর রবিউল মোহাম্মদ বলেন, “আমার ভাই আর নেই। কিন্তু আমি আছি। আর আমি সব কিছু থেকে আমি নিজেকে সরিয়ে নিচ্ছি। তুই মুক্ত মিনু। তোর জন্য আজ থেকে আমি ও মৃত। আমি ভুলে গেলাম যে আমার কোন বোনও ছিল। আমি মরে গেলেও আমার মরা মুখ যেন তোর দেখার দূভাগ্য না হয়। তোর ছায়াও আমি আমার লাশে চাই না।”

মিনু রহমান শুধু শুনে যান। আব্দুর রবিউল মোহাম্মদ চলে যান। ফিরে আসেন না কারও দিকে তাকিয়ে। বাড়িতে বউভাতের আনন্দধ্বনি তখনও চলছে পেছনে, অথচ সে আওয়াজ যেন এখন আরও বেশি অসহ্য হয়ে ওঠে। তিনি বাড়ির দরজার সামনে এসে দাঁড়িয়ে সকলের সামনে হিয়াকে স্পষ্ট বলেন, “হিয়া, বাড়ি ফিরবি? তোর যদি এখন মনে হয় তুই চলে যেতে চাস তবে চলে আয়‌। তোকে কেউ আটকাবে না।”

তূর্য মূহুর্তে থমকে যায় আবার। হিয়ার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকেন আব্দুর রবিউল মোহাম্মদ। তার মুখে এতো দৃঢ়তা যে, যদি হিয়া একবার হ্যাঁ বলে, তবে তিনি এই মুহূর্তে একবারও কারো কথা শুনবেন না। হিয়াকে নিয়ে বাড়ি ফেরত যাবেন। তূর্য একটা শব্দ ও উচ্চারণ করে না। শুধু তার সদ্য বিবাহিতা নববধূর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। হিয়া আব্দুর রবিউল মোহাম্মদের চোখের দিকে তাকিয়ে নরম গলায় বলল, “আমি সংসার করতে চাই দাদাভাই। সেই মানুষটার সঙ্গে সংসার করতে চাই যে মানুষটা, আমাকে প্রচন্ড ভালোবাসে। যদি কোনদিন আমার মনে হয় এই মানুষটার মাঝে আমি ভালোবাসা খুঁজে পাচ্ছি না, আমি সেদিন বাড়ি ফিরে আসবো।”

আব্দুর রবিউল মোহাম্মদ খুব গম্ভীর কণ্ঠে বলেন, “আমি আর কোনদিনও এ বাড়ির মুখো হবো না হিয়া। এবাড়িটা শুধু তোমার শশুর বাড়ি। তুমি যেদিন তোমার নিজের বাড়ি ফিরতে চাও, বাড়ি ফিরে আসবে। আমি সহ বাড়ির একটা মানুষ ও তোমাকে একবারো প্রশ্ন করবো না যে, কেন বাড়ি ফিরলে।”

তিনি সামান্য থেমে তূর্যের মুখের দিক তাকিয়ে বলেন, “সীতাকে বনবাসে রেখে যাচ্ছি তূর্য। এখন এই বনবাস স্বর্গ বানানোর দায়িত্ব তোমার। কোনদিন এক মুহূর্তের জন্যও যদি মনে হয় হিয়া কে সামান্য কষ্ট ছুইছে। আমি বিনা কথায় হিয়াকে বাড়ি নিয়ে যাব। প্রশ্ন করার কোন প্রয়োজন বোধ করবো না।”

তূর্য আব্দুর রবিউল মোহাম্মদের হাতটা দুই হাতের মাঝে পরম যত্নে নিয়ে বলল, “আমি কথা দিচ্ছি মেঝদাদা, আপনার রেখে যাওয়ার বনবাস, হিয়ার জন্য স্বর্গ করে ছাড়বো। আজ থেকে হিয়ার সব দুঃখ আমার।”

তূর্য মাথা নত করে, কিন্তু আজ তার ভেতরে আর আত্মগ্লানি নেই। আব্দুর রবিউল মোহাম্মদ চলে যান। তাঁর পদক্ষেপ নিঃশব্দ, কিন্তু এক যুগের বোঝা যেন খসে পড়ে মাটিতে।

আর ঘরে?

হিয়া আর তূর্য এখন তারা সত্যের ভারে পরিণত, নীরব ভালোবাসার স্বীকৃত এক যুগল। সুখ তাদের কাছে এখন আর চমক নয়, বরং এক নীরব, সাহসী নির্বাচনের নাম। তাদের গল্প শেষ হয়নি, কেবল থিতু হয়েছিল। বুকে এক একটি পাথরের মতো সত্য নিয়ে, তারা গড়ে তোলে এক নতুন জীবন। যেখানে অতীতের ছায়া তাদের পেছন থেকে হাঁটে, কিন্তু পায়ে শেকল হয়ে বাঁধে না।

তারা একে অপরের চোখে ঝুঁকে থেকে দেখে সময়ের গভীরতা, বোঝে নিরবতার ভাষা।

প্রেম আর প্রতিজ্ঞার মাঝখানে যে অস্পষ্ট দাগ থাকে, তারা সেটাকেই আঁকড়ে বাঁচে। তারা কখনো অতীতকে অস্বীকার করে না, বরং তাকে গুছিয়ে রাখে‌। তারা জানে, সব উত্তর কখনোই পাওয়া যায় না। তবুও তারা প্রতিদিন এগোয় প্রশ্নের পাশে দাঁড়িয়ে, ভালোবাসার আলো হাতে নিয়ে।

তাদের ঘরে আসে সন্তানের কাঁদুনি, আসে নতুন ঋতুর গন্ধ, আসে আবার কৃষ্ণচূড়ার সময়। তূর্য আর হিয়া একে অপরের কাছে এক চূড়ান্ত পূর্ণতা হয়ে ওঠে। তাদের গল্পে যত অপূর্ণতা থাকুক, তাদের নাম একসাথে উচ্চারিত হলেই যেন সব পরিপূর্ণ হয়ে যায়।

আর রহস্য? তা কি কখনো থামে? না, রহস্য থামে না। রহস্য বদলায়। চোখে চোখে, মানুষের হৃদয়ে, কালের ছায়ায়। কারণ সত্য সবসময় একরঙা নয়। মানুষের ভাজে মানুষ ঠিক কতটা রহস্য দমিয়ে রাখে, তার প্রকাশ কি আদৌও সম্ভব? আমরা কতটা জানতে পারি কে লুকাচ্ছে কোন সত্য? মানুষ তো নিজেই বহু রঙে আঁকা অসমাপ্ত ক্যানভাস। এখানে পড়ে থাকে কতশত নির্বাসিত কৃষ্ণচূড়ার গল্প। তবে কজন জানে সেসব? ক'জন বা মনে রাখে? ক'টা গল্প পূর্ণতা ছোঁয়?

____________________________

আমার হিসাবে গল্পের কোন শেষ নেই। শুধু ঘটনা শেষ হয়। রহস্য উন্মোচন হয়। তবে রহস্য সে ঘুরে ফিরে নতুন নতুন করে চলতে থাকে। কিন্তু কোথায় থামে বাকি সব? কোথায় থেমেছিল আব্দুর রুশান মোহাম্মদের বুকের মাঝে জীবন্ত প্রকৃতির প্রেম? আদৌ কি থামবে আব্দুর রবিউল মোহাম্মদের মনের ভেতরে গেঁড়ে রাখা তার জীবন ভর গোপন করা ব্যর্থতা? কোথায় শান্তি মিলবে মিনু রহমানের? জবাব দিতে পারবেন তো সৃষ্টিকর্তাকে? তুহুরা নামটাই কি ব্যর্থ!

এতো ব্যর্থতায় সম্ভাবনা এটুকুই যে, তূর্য হিয়ার জীবনের গল্প চলছে আর চলবে। তাদের বাগানে নতুন কলি আসবে ফুল ফুটবে। এগিয়ে যাবে মিম, আলিফ আর পিউয়ের জীবন। বয়স বাড়বে নতুন গল্প কিংবা বাস্তবতায় তাদের জীবন রাঙাবে।

_____________________________

যারা এই গল্পটা প্রথম থেকে সম্পূর্ণভাবে শেষ অব্দি পড়ে আসছেন, তাদের সবাইকে আমার তরফ থেকে অসংখ্য ধন্যবাদ। আপনারা ছিলেন বলেই এই গল্পের যাত্রাটা এই শেষ পর্যন্ত এলো। ধন্যবাদ আপনাকে। যারা নতুন করে পড়বেন তাদের জন্যও শুভকামনা। অনুগ্রহ পূর্বক নিজেদের একটা মূল্যবান মন্তব্য রেখে যাবেন আমার জন্য। সকলকে অনেক ভালোবাসা 🌸