নির্বাসিত কৃষ্ণচূড়া — পর্ব ৩৮
লেখক: সাদিয়া তিন্তি · বিভাগ: রহস্য · পর্ব ৩৮ · ৪৭ পর্বের মধ্যে ৩৮
সময় গড়িয়ে দুপুর আসতেই বাড়ির পরিবেশে হঠাৎ এক অদ্ভুত ব্যস্ততা তৈরি হয়। দীর্ঘদিনের ব্যবধান পেরিয়ে আজ আবার অতিথি আপ্যায়নের আয়োজন চলছে। দুপুরের শেষ প্রহরেই আলিফ আর মিনু রহমান এসে হাজির হন। সব যেন তূর্যর প্লান মাফিক চলছে। রহস্যের আসামিরা একে একে সকলেই হাজির। মিনু রহমানকে আব্দুর রুশান মোহাম্মদ তার প্রখর অসুস্থতার দোহাই দিয়ে এতো জরুরি তলব করেছেন। কিন্তু মিনু রহমান এসে নিজের সুস্থ ভাইকে দেখে এক প্রকার হাফ ছেড়ে বাঁচেন। তবে অসুস্থতার মিথ্যের জন্য বাড়ির কোনায় কোনায় গিয়ে প্রতিটি মানুষকে বকে বকে জিদ মেটান। রাশিদা আর আলী একপ্রকার মুখ বাঁচিয়ে চলেন। তবে এ বাড়িতে থেকেও আব্দুর রবিউল মোহাম্মদ এসব ঘটনার সাথে একেবারেই অপরিচিত। তাকে জানানোই হয় নি অতিথি কিংবা মিনু রহমানকে এভাবে তলব করার কোন কারন। তিনি অবশ্য এ বিষয়ে কোনো কৌতুহলও দেখান নি। হিয়ার পরিচর্যায় এক রকম ব্যস্ত তিনি।
সকালের বিষণ্ণতা, দুপুরের গুঞ্জন, আর বিকেলের আলো ছায়া পেরিয়ে সন্ধ্যার পর্দা নামার আগে যেন বাতাসও ভার হয়ে ওঠে। আব্দুর রুশান মোহাম্মদ দুপুরবেলাতেই ফোন করে আসতে বলেন মাসুম সাহেবকে, মোটকথা চিঠির শঙ্খের সাথে সাক্ষাৎ করারই আমন্ত্রণ জানান। তূর্য দূর থেকে এই কথোপকথন শুনলেও কিছুই বলেনা। সে চায়নি বাইরের কেউ থাকুক। এই রাত শুধুই তাদের পরিবারের মুখোশের একে একে খসে পড়ার। কোন বাইরের কারোর সামনে এ লজ্জা গ্রহণ করবে কিভাবে! তবে আব্দুর রুশান মোহাম্মদ তো জানেন না এই শঙ্খনীল সাহার আড়ালেই দাঁড়িয়ে আছে সেই অমিমাংসিত চেনা-মুখোশহীন রক্তমাংসের মানুষ, স্বাত্ত্বকি। তূর্য চায় না বিষয়টা এখনই প্রকাশিত হোক। আর যে কোন ভাবেই হোক, মাসুম সাহেব একমাত্র, যিনি আব্দুর রুশান মোহাম্মদের সকল সময়ের সাক্ষী, তাহলে তার সামনে আর কিসের পর্দা! তূর্য তাই কিছু বলবে ভেবেও চুপ করে যায়। সত্য বলার মতো সময়টা এখনও আসেনি।
বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা। চায়ের ট্রে সাজানো। বসার ঘরে আড্ডা চলছে লম্বা সময়। মাসুম সাহেব আড্ডা জমাতে পটু। আব্দুর রুশান মোহাম্মদ আর রবিউল মোহাম্মদ সে আড্ডায়ই মেতে উঠেছেন। এদিকে হিয়া এখনও নিজ ঘরে। জ্বর নেই ঠিকই, কিন্তু মনের তাপ আগের চেয়েও বেশি। মিম নিচে রাশিদার কাজে এক প্রকার সাহায্য করছে। আলিফ চুপচাপ এই বৃদ্ধ মানুষ গুলোর আড্ডায় বিরক্ত। আর মিনু রহমান হিয়ার সাথেই আছেন ফেরার পর থেকে।
রাত নামতে নামতেই, দরজায় এসে দাঁড়ান চির প্রত্যাশিত ব্যক্তি। ধুলোমাখা আলোয় দেখা যায় সাদা লম্বা পাঞ্জাবি, হালকা ধূসর চাদর কাঁধে। চোখে ভারী ফ্রেমের চশমা, মুখে এক গম্ভীর সৌম্যতা। শঙ্খনীল সাহা অরপে স্বাত্ত্বকি। দরজায় কড়া নাড়তেই তূর্য ছুটে এসে কপাট সরায়। চোখাচোখি হয় দু’জনের। স্বাত্ত্বকি ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি টেনে বলেন, “আমি একটু দেরি করে ফেললাম মনে হয়?”
তূর্য হাসে, “একদমই নয়। একেবারে সঠিক সময়ে এসেছেন।”
তূর্য দরজা থেকে সরে স্বাত্ত্বকিকে ভেতরের রাস্তা দেখিয়ে দেয়। কয়েক কদম বাড়ান তিনি। তবে তার সীমানা যেন ঝাপসা হয়ে যায়। তাঁর ধীর পায়ে চলা, চোখের গভীরতা, গালের রেখা আর কাঁধে পড়া ধূসর চাদরের ভার সব মিলিয়ে তিনি যেন এক জীবন্ত প্রলেপ একটা জীবনের ইতিহাস বই, যার পাতাগুলো কেউ কোনদিন পুরোটা পড়েনি।
বসার ঘরে আলো হালকা, দেয়ালের পাশে টাঙানো পুরোনো ছবি আর চেয়ারে বসা পুরুষদের মুখে তখনো গল্পের আবছা ধারা। মাসুম হেসে কিছু বলছিলেন, আব্দুর রুশান মোহাম্মদ মনোযোগে শুনছিলেন। সেই মুহূর্তে, দরজার দিক থেকে হালকা শব্দে চুপচাপ পায়ে পায়ে এগিয়ে আসা একজন মানুষকে দেখে ঘরের সকল চোখ ঘুরে যায়।
তাদের নজরে তিনি শঙ্খনীল সাহা। এ নজর উপেক্ষা করে স্বাত্ত্বকি থামেন না, সোজা চলে আসেন বসার ঘরের মাঝখানে। তাঁর চোখের চশমার কাঁচের ওপারে যেন বহু দশকের অভিজ্ঞতা জমাট বেঁধে আছে। চুল সাদা, কপালে চিন্তার ভাঁজ, ঠোঁটজোড়া নীরব অথচ দৃঢ়। তিনি কিছু বলেন না প্রথমেই। আব্দুর রুশান মোহাম্মদের চোখ বিস্ময়ে স্থির হয়ে যায়। এক চির অপরিচিত মুখাকৃতি। উপস্থিত বাকি দুজনও একটু স্থির চাহনিতে দেখেন। তাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন এক বৃদ্ধ, বয়স ষাটেরও বেশি। শরীরে সময়ের দাগ, কিন্তু চোখে সেই চিরচেনা স্থিরতা। আব্দুর রুশান মোহাম্মদ কিছু বলতে গিয়ে থেমে যান। শুধু তাকিয়ে থাকেন… যেন তাঁর ভিতরের এক অব্যক্ত চিৎকার খুঁজে পায় অবয়ব।
কেউ কিছু বলছে না। এই নিরবতা কাটিয়ে মাসুম সাহেব কণ্ঠে উৎসাহ নিয়ে বলেন, “আপনি… আপনি নিশ্চয়ই শঙ্খনীল সাহা?”
স্বাত্ত্বকি মাথা নাড়েন। মুখে একরাশ স্থিরতা। “হ্যাঁ, তাই তো পরিচয় দিচ্ছি আজকাল। শঙ্খনীল… এই নামেই ডাকা হয় এখন।”
তাঁর গলা ভারী, ধীর, নরম অথচ দৃঢ়। আব্দুর রুশান মোহাম্মদের ঠোঁট থেকে একরাশ নিঃশ্বাস বেরিয়ে আসে। তিনি উঠে দাঁড়ান, হাত বাড়িয়ে দেন স্বাত্ত্বকির দিকে। “আমরা এতদিন আপনার অপেক্ষা করেছি…”
স্বাত্ত্বকি এক চিলতে হাসি দিয়ে বলেন, “আমি বুঝতেও পারিনি যে আপনি আমার অপেক্ষায় থাকবেন রুশান ভাই। তবে আরো অনেক আগেই আসা হতো।”
ঘরের পরিবেশ হঠাৎই ঘন হয়ে ওঠে। কথারা থেমে যায়, বাতাস থমকে দাঁড়ায়। মিনু রহমান সিঁড়ির মাথা থেকে নিচে তাকিয়ে দেখেন। কলিং বেলের আওয়াজে হিয়াও নিচে নেমে এসেছে। মিনু রহমানের কাছে এ কোন পরিচিত স্বর নয় তবে হিয়ার এতো তাড়াহুড়ো করে নিচে চলে আসার কৌতুহল তাকেও ডেকে এনেছে। তিনি সামনে আসেন না। দাড়িয়েই থাকেন সিঁড়ির মুখে। উপস্থিত আব্দুর রবিউল মোহাম্মদের মুখ অদ্ভুত নিরুত্তাপ। যেন তিনি একেবারে কিছুই বুঝতে পারছেন না, বা বুঝেও বুঝতে চাইছেন না।
এখানে উপস্থিত প্রত্যেকটা মানুষ স্বাত্ত্বকিকে দেখেছে ১৪ কিংবা ১৫ বছরের কিশোর রুপে। পাড়ায় খেলে বেড়ানো উঠতি যুবক। কিন্তু সে সময় পেরিয়েছে, স্বাত্ত্বকি তাঁদের সামনে শঙ্খনীল সাহা রূপে দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁর চোখের গভীরে জেগে আছে এক অমোচনীয় সত্য, যা আজ এই বাড়ির প্রতিটি দেয়ালকে নাড়িয়ে তুলতে সক্ষম।
স্বাত্ত্বকি ধীর পায়ে বসেন ঘরের মাঝখানে রাখা বেতের সোফাটিতে। তাঁর বসার ভঙ্গিমায় কোনও তাড়াহুড়ো নেই, কিন্তু আশ্চর্য এক পরিপূর্ণতা আছে। যেন বহু বছর পর এই ঘর, এই স্থান, এই মানুষদের মাঝখানে বসাটাই ছিল পূর্বনির্ধারিত। তিনি একবার চোখ বুলিয়ে নেন চারপাশে দেয়ালে টাঙানো পুরনো ফ্রেমের ভেতরে আবছা হয়ে যাওয়া চেহারা, পিতলের ঘড়ির কাঁটা, ফুলদানির পাশে পড়ে থাকা খবরের কাগজ, আর সেই সব চেনা গন্ধ, পুরনো কাঠ, বিস্মৃত স্মৃতির ধূলি। সামান্য জিরিয়ে তিনি নিজেই মুখ খোলেন। ভরাট, ভারী, থিতানো কণ্ঠে বলেন, “রুশান ভাই, আপনি নিশ্চয়ই আমাকে চিনতে পারেননি তাই না?”
আব্দুর রুশান মোহাম্মদ একটু চমকে তাকান তাঁর দিকে। প্রশ্নটা যেন কানে গিয়ে ধাক্কা খায় না, বরং হৃদয়ে আঘাত করে। স্বাত্ত্বকিকে তূর্য আগে থেকেই পরিষ্কার করে বলে দিয়েছে সব সত্য তার অপেক্ষায় থাকবে। সে নিজে কিছুই উচ্চারণ করবে না। স্বাত্ত্বকিও সে হিসেব মতো প্রস্তুতি নিয়েই এসেছেন।
আব্দুর রুশান মোহাম্মদের চোখে চোখ রাখতেই স্বাত্ত্বকি মুখে এক দুর্ভর মৃদু হাসি এনে বলেন, “আমি স্বাত্ত্বকি। এলাকায় ক্রিকেট খেলার মাঠে রোজকার দেখা হতো আপনার সাথে। আর আজকের বড় পরিচয় আমি প্রকৃতির ভাই স্বাত্ত্বকি।”
ঘরের বাতাস যেন এক মুহূর্তে জমে বরফ হয়ে যায়। আব্দুর রবিউল মোহাম্মদ বিদ্যুৎস্পৃষ্টের মতো চমকে ওঠেন। তাঁর মুখের স্বাভাবিক ভাব ভেঙে পড়ে, কপালে ঘাম জমে। “স্বাত্ত্বকি…!” তাঁর কণ্ঠে একটা গলা কাঁপানো স্তব্ধতা। এই নামটা যেন এক দুঃস্বপ্নের মতো ফিরেছে। অথবা, একটা ভুলে যাওয়া শাস্তির মতো।
মাসুম সাহেব হতবাক হয়ে আব্দুর রুশান মোহাম্মদের দিকে তাকান। আব্দুর রুশান মোহাম্মদও একবার তাকিয়ে নেন তূর্য আর মাসুমের দিকে পালা করে। কেউ যেন কিছু বলতে চায় না, অথচ না বললেও কথা হয়ে যায়। চোখে চোখে ঘুরে বেড়ায় একটাই প্রশ্ন, “এটা কি সত্য!”
সিঁড়ির মুখে দাঁড়িয়ে থাকা মিনু রহমান এতক্ষণে নিঃশ্বাস আটকে শুনছিলেন সবকিছু। কিন্তু স্বাত্ত্বকির নাম উচ্চারণ হতেই যেন পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে যায়। এক পা দু’পা করে নিচে নামতে থাকেন। কি যেন এক ঘোরে আটকে এগিয়ে চলেছেন তিনি। স্বাত্ত্বকির বসার ঘরের ভিতরে প্রবেশের মাত্রই বসার ঘরের দরজায় মিম আর হিয়া এসে দাঁড়িয়েছে আড়ালে। তূর্য ইশারায় আলিফকেও বের করে দেয় বসার ঘর থেকে। সেও মিম আর হিয়ার সাথে এসেই দাঁড়ায়। তারা সকলেই সত্য জানে, ঘটনার পালাক্রম জানে। তারা যে এ ঘরে আজ আমন্ত্রিত নয় তাও জানে। তবুও এক অদ্ভুত সময়ের সাক্ষি হবার এ আয়োজন।
স্বাত্ত্বকি তখনো শান্ত। কিন্তু চোখ দুটো কুয়াশার মতো ঘোলা স্মৃতি ছাড়িয়ে খোঁজ করে বের করে কার চোখে এখনও সেই প্রশ্ন লুকানো আছে। মিনু রহমান সিঁড়ি থেকে নেমে থমকে দাঁড়ান বসার ঘরের ঠিক গেটের মুখে। তাঁর চোখ জুড়ে অভাবনীয় বিস্ময়। সেই বিস্ময়, যা শুধু অতীতের সঙ্গে বর্তমানের হঠাৎ মুখোমুখি হলে ঘটে। একধরনের নিঃশব্দ কান্না মিশে থাকে তাঁর দৃষ্টিতে। তিনি মিম, হিয়া আর আলিফকে এড়িয়ে বসার ঘরের ভেতরে এগিয়ে চলেন। স্বাত্ত্বকি তখনো স্থির, শান্তভাবে বসে আছেন। মিনু রহমানের দিকে তাকাতেই চোখ দুটো নরম হয়ে যায়।
স্বাত্ত্বকি হালকা মৃদু হাসি টেনে বলেন, “ভালো আছো, মিনু?”
কথাটা যেন বাতাসে ভেসে আসে, কিন্তু মিনুর ভেতর আঘাত করে ফাটল ফেলে দেয়। মিনু রহমানের ঠোঁট কেঁপে ওঠে, কিন্তু কোনো শব্দ বেরোয় না। শুধু চেয়েই থাকেন। এক পা করে এগিয়ে এসে দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে যান, বসেন না। যেন ভিতরে বসার সাহস হারিয়ে ফেলেছেন।
ঘরের আবহ আরও স্তব্ধ হয়ে ওঠে। আব্দুর রুশান মোহাম্মদ কিছু বলতে উদ্যত হন। পাশে বসে থাকা মাসুমও কথা খুঁজছিলেন। কিন্তু তার আগেই তূর্য ধীরে পা ফেলে সামনে এসে দাঁড়ায়। তার কণ্ঠে দ্বিধাহীন, স্পষ্ট সুর, সে বলে, “আমি ইচ্ছা করেই আপনাদের জানাইনি যে শঙ্খনীল সাহা আসলে স্বাত্ত্বকি। আমি চেয়েছি সত্য, বাস্তবতা, কিংবা ঘটনার গভীরতা, সবটা একসাথে সবার সামনে প্রকাশ পাক। আলাদা করে নয়।”
তূর্যর কণ্ঠে কোনও নাটকীয়তা নেই, কিন্তু তাতে ছিল অদ্ভুত এক ভার। আব্দুর রুশান মোহাম্মদ এবার চেয়ারে সোজা হয়ে বসেন। চোখে চূড়ান্ত গম্ভীরতা। তিনি আর দ্বিধা করেন না। সরাসরি স্বাত্ত্বকির চোখে চোখ রেখে জিজ্ঞেস করেন, “প্রকৃতি কোথায়?”
এই প্রশ্নটা যেন থেমে থাকা বাতাসকে চিরে দেয়। সবাই থেমে যায়। আলিফ, হিয়া, মিম দরজার আড়ালেই দাঁড়িয়ে থাকে নিঃশব্দে, নিঃশ্বাস টেনে। মিনু রহমান শক্ত হয়ে যান। তার হাত আঁচলের কোণ চেপে রাখেন মজবুত করে। মাসুম একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকেন শুধু চোখেমুখে হাজার প্রশ্ন নিয়ে। স্বাত্ত্বকি একটু মাথা নিচু করে, তারপর চোখ তুলে ধীরে বলেন, “প্রকৃতি...মানে বড়দি'ভাই কোথায় আছেন সেটা নয় শুধু, সবটা জানাতেই আজ আমার উপস্থিতি।”
একটা দীর্ঘ নীরবতা নেমে আসে চারদিকে। স্বাত্ত্বকি নিজের হাতের আঙুলে জড়ানো একটা পুরোনো রুপার আংটি ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখে বলতে শুরু করেন। একেবারেই প্রথম থেকে শুরু করেন বলা। একটা শব্দও যেন বাদ পড়ে গেলে খুব বড় কিছু আবারো রহস্যে ডেবে যাবে। তার গলা কখনো ভারী, কখনো শান্ত। মাঝে মাঝে থেমে গেছেন, কিন্তু শুধু শ্বাস টানার জন্য, না থেমে গেলে কথাগুলোর ভার সহ্য করার ক্ষমতা থাকত না হয়তো শ্রোতাদের। কথাগুলো যেন আর কেবল গল্প নয়, যেন দীর্ঘ শোকপ্রকাশ, একজনের হয়ে বলা যে গল্প সে নিজে বলে যেতে পারেনি। তিনি বেশ গুছিয়ে শেষ করেন সকল রহস্যের সমাধান। প্রকৃতি থেকে শুরু করে তুহুরা পর্যন্ত শেষ হয়।
বাকিরা তখন পাথরের মূর্তির মতো জমে যায়। সন্ধ্যার ঘন অন্ধকার বাইরের কাচের জানালার ওপারে ঠায় দাঁড়িয়ে তখন। ঘরের বাতি টিমটিম করছে। এই নীরবতা যেন পাপমোচনের প্রস্তুতি। আব্দুর রুশান মোহাম্মদ কিছুক্ষণ চুপ থেকে একেবারে হেলে পড়েন সোফায়। তাঁর মুখের সব রং, দৃঢ়তা সব উবে গেছে। চোখে ভেসে আসে প্রাচীন ক্লান্তি, যেন শত বছর ধরে তিনি এই খবরটা শুনতে চাচ্ছিলেন কিন্তু হৃদয় প্রস্তুত ছিল না। তাঁর বুকে ফাটলের মতো শূন্যতা।
মাসুম নিজেও পেছনে হেলে পড়েন। তার চোখে অজানা দুঃখ, অচেনা প্রশ্ন। তিনি অপ্রস্তুত। মিনু রহমান তখনো দাঁড়িয়ে, দুহাত জড়ানো বুকের কাছে। তাঁর চোখে জল। না কাঁদছেন, না আটকাচ্ছেন। এই কান্না এমন যা বেরিয়ে আসে হৃদয় থেকে, যেখানে শব্দের দরকার হয় না। তিনি এ গল্পের এক বাজে চরিত্র। ঘৃণা করা যায় এমন এক চরিত্র। তার হাতেই এসেছিল প্রকৃতির শেষ চিঠি, শেষ বার্তা। তবে তিনি রক্ষা করতে পারেননি। তার চোখ ভেজা, কিন্তু তার দৃষ্টিতে একটা বোঝার ছাপ। স্বাত্ত্বকি আজ সবটা বলার আগেই তিনি তো অনেক কিছুই জানতেন তবে তা সব তো এতো ঘৃণিত ছিল না।
আব্দুর রবিউল মোহাম্মদ চুপ করে বসে থাকেন, মাথা নিচু। একটা মৃত আলোয় যেন বসে আছেন তিনি। আজ যেন তার অস্তিত্বই প্রশ্নবিদ্ধ। তাঁর কাঁধ ঝুঁকে পড়েছে, চিবুক বুকের দিকে নেমে গেছে। তিনি অপরাধির মতো বিড়বিড় করে বলেন, যেন নিজের কাছেই একটা অজুহাত খুঁজে পেতে চান। , “আমি... আমি তখন ভেবেছিলাম, চুপ থাকাই ভালো...”
কেউ কিছু বলে না। কারণ এই মুহূর্তে শব্দ যথেষ্ট নয়। এই মুহূর্ত শুধু বোঝার, গ্রহণ করার, ভেতরে চেপে রাখা সব মুখোশ নিজের হাতে খুলে ফেলার। স্বাত্ত্বকি বসে থাকেন চুপ করে, মাথা নিচু। তাঁর হাতের আঙুলে ঘোরে সেই পুরনো রুপার আংটি, যেন এই পুরোটাই ছিল পূর্বলিখিত। আব্দুর রবিউল মোহাম্মদ আরো কিছু বলার আগেই মিনু রহমান হাঁটু গেড়ে বসে পড়েন আব্দুর রুশান মোহাম্মদের পায়ের কাছে। গভীর আবেগ ও কান্না জড়ানো কন্ঠে তিনি বলেন, "বড় আমাকে মাফ করে দিন। বিশ্বাস করুন আমি কিছু জানি না এবিষয়ে। প্রকৃতি আপার ডায়রি যেদিন সকালে আসে ওদিন বিকেলেই হাসান আমাকে রাজশাহী নিয়ে যায়। আমার কোন ধারণা নেই এসব বিষয়ে। আমার জীবনে যে জঞ্জাল তৈরি হয়েছিল এসবের ভাঁজে আমি কোন দিকেই সয়ে উঠতে পারি নি।"
উপস্থিত সকলেই চুপ। আব্দুর রুশান মোহাম্মদ যেন কিছুই শুনছেন না। কিংবা শুনতে চাইছেন না। মিনু রহমানের এ কান্না, আবেগ কারোই মন ছুতে ব্যর্থ হলো। তূর্য এই নিরবতার বাঁধ ভেঙে বললো, "যদি আপনি এ বিষয়ে কিছু নাই জেনে থাকেন, তাহলে আপনি ছোটদাদাকে সেদিন কোন পাপের কথা বলছিলেন দাদি? কোন পাপ লুকাতে চাইছিলেন বড়দাদার কাছ থেকে?"
মিনু রহমান এবার যেন ঘাবড়ে ওঠে। তিনি মৃদু স্বরে আমতা আমতা করে বলেন, "পাপের নাম তু…..তুহুরা। প্রকৃতি বিষয়ক কোন কিছুই আমি কোনদিনও জানতাম না। আমার পাপ এটাই যে, আমি কোনদিনও কাউকে জানতে দেইনি তুহুরার মৃত্যুর আসল সত্য।"
কথাটা শেষ হতেই মিনু রহমান আব্দুল রবিউল মোহাম্মদের কাছে গিয়ে তার হাত ধরে বলেন, "মিয়া ভাই জীবনের শেষ মুহূর্তে চলে এসেছি আমরা। দয়াকরে এবার অন্ততঃ আমার ঘাড় থেকে এই পাপের বোঝা নামান। সবকিছু প্রকাশ করে দিন। আর লুকোচুরি করবেন না।"
মিনু রহমানের আর্তনাদ আব্দুর রবিউল মোহাম্মদকেও ছুঁতে পারলো না বোধহয়। তিনি কোন কথা বলেন না। বরফের মত জমে গিয়েছেন যেন তিনি। মাসুম সাহেব খুব তিক্ত নজরে তাকিয়ে থাকেন মিনু রহমান আর আব্দুর রবিউল মোহাম্মদের মুখের দিকে। এরপর গভীর ক্ষিপ্রতা নিয়ে বলেন, "তোমাদের মত ভাই বোন থাকলে জীবনে শত্রুর প্রয়োজন হয় না।"
এ কথায় মিনু রহমান আরো বেশি কান্নায় জর্জরিত হয়ে ভেঙে পড়েন। আব্দুর রবিউল মোহাম্মদ চুপ করে ছিলেন অনেকক্ষণ। যেন বুকের গভীরে আটকে থাকা বিষ এক ঢোঁকে গিলে ফেলতে চাইছেন।
_____________
চলবে....... 💔