নির্বাসিত কৃষ্ণচূড়া — পর্ব ০৫
লেখক: সাদিয়া তিন্তি · বিভাগ: রহস্য · পর্ব ০৫ · ৪৭ পর্বের মধ্যে ৫
সকালের আলো জানালার পর্দা গলে ধীরে ধীরে হিয়ার ঘরে ঢুকে পড়ছিল, কিন্তু তার চোখে সে আলো কোনো পরিত্রাণ আনল না। সারারাত ঘুম আসেনি। মাথার ভেতর প্রকৃতি, ডায়েরি, শেষ পাতার ছেঁড়া দাগ আর তূর্যের চুপচাপ চোখ সব মিলিয়ে যেন এক অদৃশ্য গোলকধাঁধায় আটকে গেছে। হিয়া উঠে মুখ ধুয়ে সরাসরি তূর্যের ঘরের দিকে এগোল। পা টিপে টিপে গিয়ে দরজার সামনে দাঁড়াল। অন্যদিন হলে হয়তো সাহস পেত না, কিন্তু আজ তার ভেতরে এক অন্যরকম তাড়া। সে জানতে চায় তূর্য কি কিছু বুঝেছে? তার চোখ কি ডাইরিতে অন্য কিছু খুঁজে পেয়েছে, যা সে খুঁজে পাইনি!
তূর্যের ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে হিয়া হালকা করে দরজায় কড়া নাড়ার সাহস পেল না। বরং শুরু করল নিঃশব্দে হাঁটাহাঁটি। পাঁচ-পাঁচবার একই জায়গা দিয়ে হেঁটে গেছে। একবার দম বন্ধ করে কান পাতল তূর্য জেগে উঠেছে কি না।
‘তূর্য ভাই জেগেছে কি? ডায়েরিটা পড়েছে? কী মনে হলো ওর?’ এই প্রশ্নগুলো এখন হিয়ার মন নয়, শরীরের রন্ধ্র দিয়ে বেড়িয়ে আসছে।
শেষমেশ আবার ঘরের দরজার এক কোণায় হেলান দিয়ে দাঁড়াল সে। চোখে কালি জমেছে, কিন্তু সেই ক্লান্ত চোখের ভেতরে এখনো এক রকম উন্মাদ কৌতূহল জ্বলে আছে। যেন একটা লুকানো গল্পের একমাত্র সাক্ষী সে নিজেই, আর তূর্য এখন সেই রহস্যের একমাত্র পাঠক। তূর্য কখন ঘুম থেকে উঠবে, কখন দরজা খুলবে, তা নিয়ে এখন সময় থমকে গেছে হিয়ার কাছে।
ঘড়িতে সকাল আটটা বেজে দু'চার মিনিট হবে হয়তো। তূর্যের ঘরের জানালার পর্দায় রোদের লাইন আঁকা হয়ে গেছে। একটা ছোট্ট পাখি জানালার গ্রিল ধরে চেঁচিয়ে যাচ্ছে বহুক্ষণ ধরেই।
শেষমেশ তূর্য চোখ কচলাতে কচলাতে উঠে বসল। তার সারা রাত কেটেছে প্রকৃতির ডায়েরির পাতা গুলোর ভাঁজে। চোখটা বোধহয় মাত্র লেগেই খুললো। হঠাৎই একটা শব্দ পেল, দরজার বাইরে যেন কেউ হেঁটে যাচ্ছে। কিঞ্চিৎ কৌতূহলে দরজার ছিটকিনি খুলে হালকা করে ঠেলতেই,
সামনে এক অদ্ভুত দৃশ্য।
দরজার একদম গায়ের কাছেই দাঁড়িয়ে আছে হিয়া। একদম চুপচাপ, দু’হাত জড়ো করা, চোখে ক্লান্তির ছায়া, আর তবুও সেই চোখে একটা কৌতূহলের দীপ্তি।
তূর্য খানিকটা চমকে গেল,
"তুই দরজার সামনে?"
তূর্যের সাথে ভেতর ঘরে বসে থাকা আলিফও চোখ গোল করে তাকিয়ে রইল। ওর মুখে প্রায় একটা বিস্ময়ের হুংকার আসতে আসতে আটকে গেল।
হিয়া মুহূর্তেই নিজেকে ধরে ফেলল, সে তো ভাবেইনি তূর্য এমন হঠাৎ দরজা খুলে দেবে!
অপ্রস্তুত হেসে ফেলল সে, একটা বোকা বোকা, চাপা হাসি।
চোখ নিচু করে ফিসফিসিয়ে বলল,
"ওই… আমি মানে… বুঝতেই পারছেন...ডায়েরিটা…" তার কথাগুলো যেন বাতাসেই মিলিয়ে গেল।
তূর্য একবার তাকাল, তারপর ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি। প্রথমবারের মতো হিয়ার এই অসহায় অবস্থাটা তাকে মজারও লাগল, কেমন যেন আপনও।
ভেতর থেকে আলিফ বলল,
"ভাই, হিয়া আপির আজ আর ঘুম হয় নাই মনে হয়।"
তূর্য হেসে বলল,
"তাই তো দেখছি। ভালোই তো ঘটনা!"
হিয়া আরো কাঁদো কাঁদো মুখ করে দাঁড়িয়ে থাকল।
তূর্য হিয়ার মুখের দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর হালকা গলায় বলল,
"আলিফ, একটু বাইরে যা তো। আমি একটু কথা বলি হিয়ার সঙ্গে।"
আলিফ মুচকি হেসে বলল,
"আচ্ছা ভাই, বুঝে গেছি। আমি গেলাম!"
মনে মনে খুব খুশি আলিফ। তা তার চোখেই দৃশ্যমান। তবে সে ঠিক কি বুঝেছে তা হিয়া আর তূর্য কারোই বোধগম্য হলো না।
আলিফ বেরিয়ে যাওয়ার পর তূর্য আবার হিয়ার দিকে তাকাল।
"এক কাপ চা আনবি? বসে একটু ভালো করে বলি সব।"
হিয়া সঙ্গে সঙ্গে মাথা নেড়ে চলে গেল রান্নাঘরের দিকে। চায়ের কাপ হাতে ফিরতে ফিরতে তার বুকের ভেতর যেন হালকা কাঁপুনি। এই প্রথম তূর্য তাকে নিজে কিছু করতে বলেছে। এমন যত্ন করে তূর্যের জন্য চা বানানো একদমই অপ্রত্যাশিত। তারপরও সে খুব খুশি মনে চা টা বানিয়েছে।
তূর্য চা নিয়ে এক চুমুক দিয়ে বলল,
"আমি ডায়েরিটা কাল সারারাত ধরে পড়েছি, খুব ভালো করে। পাতায় পাতায় শব্দগুলো শুধু লেখা না, একটা দমবন্ধ করা সত্যি।
তুই ঠিক বলেছিলি। কেউ হয়তো প্রকৃতির অস্তিত্ব লুকাতে চেয়েছে। কেউ চায়নি, ওর কথা কেউ জানুক। ডায়েরির শেষ পাতাগুলো ছেঁড়া, সেটাও ইচ্ছাকৃত মনে হয়।"
তূর্য এবার হিয়ার চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে বলল,
"আজ একবার কৌশলে বড় দাদাকে জিগ্যেস করবি তো? জাস্ট জানতে চাইবি যে, প্রকৃতি যে ডায়েরি লিখতো, সেটা উনি জানতেন কিনা। উনি কিছু বললে, আমি বুঝতে পারব কতটা জানে বা লুকাচ্ছে।"
হিয়া কাঁপা গলায় বলল,
"আমি চেষ্টা করব… কিন্তু যদি উনি কিছু আঁচ করেন..."
তূর্য থামিয়ে বলল,
"চিন্তা করিস না। আমি আছি। সত্যিটা বের করতেই হবে। সত্যি এখন যারই হোক না কেন, প্রকৃতির কিংবা অন্য কারো।"
চায়ের কাপ থেকে ধোঁয়া উঠছে, আর সেই ধোঁয়ার ভেতর যেন ভেসে উঠছে এক হারিয়ে যাওয়া অতীতের ছায়া।
বিকেলের দিকে একরকম সাহস জুগিয়ে হিয়া ধীরে ধীরে উঠে গেল বাড়ির ছাদে, যেখানে বিকেল হলেই বেশিরভাগ সময় আব্দুর রুশান মোহাম্মদ বসে থাকেন। একটা বই আর চা হাতে, নিঃশব্দে তাকিয়ে থাকেন অজানা কোনো দূরত্বে। তাঁর চেহারায় সবসময় একটা চাপা ভাব, যেন চোখের ভেতর কিছু পুরোনো দিনের ছবি আটকে আছে।
হিয়া গিয়ে সামনের চেয়ারে বসে, বেশ স্বাভাবিকভাবে বলল,
"এই জায়গাটাকে শান্তি আছে তাই না বড় দাদা?"
আব্দুর রুশান মোহাম্মদ তার অমায়িক হাসিটা দিয়ে বললেন, "শান্তি মনের মধ্যে থাকে, হিয়া। পরিবেশ পরিস্থিতি শান্তি এনে দিতে পারে না যদি মন শূন্য হয়।"
হিয়ার জমানোর সাহস টা যেন দমে গেল। তবে তার উদ্দেশ্য দমলো না।
"বড় দাদা, প্রকৃতি কেমন ছিল?"
আব্দুর রুশান মোহাম্মদ একটু তাকালেন, তারপর হালকা হাসলেন।
"ও ছিল খুব শান্তশিষ্ট ছিলো। তবে কথায় চঞ্চল, ছোটখাটো কথা বলত, কিন্তু খুব গভীর চিন্তা করত মেয়েটা। একদম তোর মত বই পাগল ছিল। রবীন্দ্রনাথের খুব বড় ভক্ত ছিল। এমন কোন উপন্যাসিক হয়তোবা বাদ পড়ে নি, যার বই ও আঙুলে ছোঁয় নি।"
হিয়া ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল মূল প্রসঙ্গে,
"উনি কি লিখতেনও? মানে… ডায়েরি বা কবিতা, বা কিছু একটা?"
রুশান মোহাম্মদ কপাল কুঁচকে তাকালেন।
"ডায়েরি? না তো, এমন কিছু শুনিনি। তবে বেশ সুন্দর গাইতো। তানপুরার হাত অমায়িক ছিল।"
হিয়া গলায় দ্বিধা লুকিয়ে বলল,
"ওহ্। তাহলে লিখতো না?"
রুশান মোহাম্মদ তখন একদম গম্ভীর হয়ে গেলেন।
"হয়তো লিখত, কিন্তু আমাকে কখনো বলেনি। আর তেমন কিছু থাকলে, এতদিনে নিশ্চয়ই জানতে পারতাম।"
একটা থেমে থাকা দম যেন চেপে বসল তার গলায়। হিয়া আর কিছু বলল না। ধীরে ধীরে নিচে নেমে এল। মনে হচ্ছিল, কথা শেষ হয়নি—শুধু চাপা পড়ে গেছে।
কিছু সময় পেরিয়ে, তূর্যের ঘরে বসে হিয়া সবটা খুলে বলল। তূর্য মাথা নেড়ে বলল,
"মানে, সবচেয়ে কাছের মানুষই জানে না যে প্রকৃতি ডায়েরি লিখত? এটা কি আদৌ সম্ভব?"
হিয়ার চোখে শঙ্কার ছায়া।
"আপনি বুঝলেন কিছু?"
তূর্য ঠোঁট চেপে বলল,
"একদম উল্টো যাচ্ছে সবকিছু। যার জানার কথা, সে না জেনে বসে আছে। আর আমরা যাদের জানার কথা না, তারাই এখন খুঁজছি সত্যি। ডায়েরির রহস্যটা যেন ধরা দিচ্ছে না, বরং পালিয়ে যাচ্ছে আমাদের চোখের আড়ালে..."
দুজনেই চুপ করে বসে থাকল কিছুক্ষণ।
চোখের সামনে খোলা ডায়েরির ছেঁড়া পাতাগুলোর মতোই সবকিছু এলোমেলো, ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। এখন সবকিছু যেন আরও গলায় গিয়ে গাঁথা।
সারা বিকেল, সন্ধ্যা, রাতের অনেকাংশ দরজা বন্ধ করে ডায়েরির পাতাগুলো আরো একবার পড়ল তূর্য। আগের মতো আর পড়ে যাওয়া নয়, এবার সে প্রতিটা শব্দ বিশ্লেষণ করছে, শব্দের নিচে চাপা থাকা মানে বুঝতে চাইছে। প্রকৃতি কেবল অনুভব নয়, সে লিখেছে তার জীবনের সাথে জড়িত কিছু নাম, ঠিকানা।
তূর্য এসব টুকে নিতে লাগল একখানা নোট প্যাডে।
রাতটা নেমে আসতেই, সে ছাদের দিকে গেল। একটা চাপা উত্তেজনা মাথার মধ্যে গুনগুন করে বাজছে। তূর্য একবার শুধু ডেকে এসেছিল হিয়াকে। কিছুক্ষণ পর হিয়াও ছাদে এল। জোছনার আলোতে আজকের রাতটা যেন ঠিক আগের রাতের মতোই আবার রহস্যময়।
তূর্য মুখ না ঘুরিয়ে বলে উঠল,
"ডায়রিটায় আবারো খুজলাম। তবে কোন সংকেত নেই, বোধহয় যা ছিল সব শেষ পাতায়। আর সেগুলোই কেউ জোর করে মুছতে ছিঁড়ে নিয়েছে। "
হিয়া চুপচাপ শুনছিল। তূর্য ধীরে ধীরে মুখ ঘুরিয়ে হিয়ার দিকে তাকালো,
"আমার মনে হয়… এই ডায়েরিটা বড় দাদাকে দেখানো উচিত। এখানে এমন কিছু নেই যা তাঁর থেকে লুকানো দরকার। বরং মনে হচ্ছে, কেউ ইচ্ছা করেই এটা বাড়ির কারো নজর থেকে সরিয়ে রেখেছিল। হতেই পারে বড় দাদার নজর থেকে লুকানো চেষ্টা করেছে কেউ। "
হিয়ার চোখ বড় হয়ে যায়।
"আপনি নিশ্চিত?"
"না, কিন্তু সত্যি জানার একমাত্র রাস্তা এটাকেই সামনে আনা। পিউ, আলিফ আর তুই সবাই মিলে বড় দাদাকে ডায়রিটা দিবি। যেহেতু ডাইরিটা ওরা উদ্ধার করেছে, ওরা ভালো বর্ণনা দিতে পারবে যে সঠিক কোথা থেকে ওরা পেয়েছে এটা। তারপর দেখা যাক তিনি কী বলেন। যদি সত্যি কিছু জানেন, তিনি বলবেন। আর যদি না জানেন, তাহলে আমরাও জানব কে লুকিয়ে রেখেছিল আর কেন।"
হিয়া কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। তারপর একটুও দ্বিধা না করে মাথা নেড়ে বলে,
"তাহলে কাল সকালে…”
চুপচাপ ছাদে দাঁড়িয়ে থাকল ওরা দু’জন। নিচের বাড়িগুলোর কোলাহল অনেক দূরের মনে হচ্ছে এখন, যেন এ দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন একটা ছোট গ্রহে দাঁড়িয়ে আছে তারা, যেখানে শুধু জোছনা আর নিঃশব্দতা। আকাশটা আজ অন্যরকম। একেবারে গোল, ঝকঝকে এক পূর্ণচাঁদ ঝুলে আছে মাথার উপর। তার আলো ছড়িয়ে পড়েছে ছাদের রেলিং, হিয়ার মুখ, তূর্যের চোখ, আর তাদের মাঝখানের নীরবতাজুড়ে। ছাদের এক কোণে একটা পাতাঝরা গাছের পাতাগুলোও যেন চুপচাপ দাঁড়িয়ে, কথা শুনছে।
তূর্য হঠাৎ চোখ ফেরায় হিয়ার দিকে। সেই মুহূর্তে হিয়ার চুলগুলো বাতাসে একটু হেলে পড়েছে কাঁধের ওপর, কালো ঢেউয়ের মতো, জোছনার আলোতে যেন সেগুলো চকচক করছে। চোখ দুটো হঠাৎই গাঢ় ভাষায় ভরে উঠেছে। গভীর, শান্ত, অথচ একটা অদ্ভুত টান নিয়ে তাকিয়ে আছে দূর আকাশের দিকে। তূর্য একমুহূর্ত থমকে যায়।
এই মেয়েটাকে সে কতদিন ধরেই তো চেনে, অথচ এইভাবে, এই নীরবতার ভেতর থেকে হিয়াকে যেন নতুন করে চিনল সে। পাতলা গড়নের এই মেয়ে, অদ্ভুত নিরবতার এক আকর্ষণ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে তার পাশে। যেন কোনো রহস্যময় কবিতার একটা ছায়া, যাকে ছুঁতে ইচ্ছে হয়, আবার না ছুঁয়েও পাশে রাখতে ইচ্ছে হয়।
তূর্য চুপচাপ তাকিয়ে থাকে, কিছু না বলে। তূর্য চোখ ফেরায়, আবার তাকায় হিয়ার দিকে।
এই নীরবতায়, কোনো কথা নেই, তবু যেন সব কথার চেয়ে বেশি কিছু আছে। হিয়া তখনও চুপচাপ দাঁড়িয়ে, চাঁদের আলো মুখজুড়ে পড়ায় তার চোখদুটো আরও গভীর মনে হচ্ছে। ঠোঁটদুটো একটুখানি কাঁপে যেন কিছু বলতে গিয়ে থেমে গেছে। কিন্তু সে কিছু বলে না।
এবার হিয়া তাকাল তূর্যের দিকে। তার চোখে একরকম খেয়ালি মনোযোগ, একরকম পর্যবেক্ষণ। এই মানুষটা ওর থেকে কতটা লম্বা! এত কাছে দাঁড়িয়ে থাকা সত্ত্বেও যেন অনেক উপরে কোথাও দাঁড়িয়ে আছে সে। হিয়ার মনে হলো, তূর্যের পাশে দাঁড়িয়ে সে যেন একদম লিলিপুট। তার মুখে হঠাৎ এক অদ্ভুত অভিব্যক্তি ফুটে উঠল, অস্বস্তি, একটু হীনমন্যতা, আর একটু হাসিও যেন।
তূর্য সেটা দেখে হেসে ফেলল।
"তুই এরপর থেকে একটা টুল নিয়ে আসবি, এরপর দাঁড়াবি আমার পাশে। তাহলে আর তোর এই অনুভূতি হবে না।"
হিয়া চমকে তাকাল ওর দিকে।
"বুঝলে কিভাবে?" চোখে বিস্ময়।
তূর্য কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল,
"তোর চোখ, হিয়া… খুব স্পষ্ট কথা বলে। শুধু শুনতে জানতে হয়।"
হিয়া থতমত খেয়ে গেল। তূর্য আর মুখে কিছু বলল না। শুধু হালকা একখানা হাসি ঠোঁটের কোণে আঁকা রয়ে গেল চুপচাপ, জোছনার মতো।
রাত আরো গভীর হলো। ওরা ধীরে ধীরে ছাদ থেকে নেমে এলো। চারপাশে নিস্তব্ধতা, শুধুই পায়ের আওয়াজ। বারান্দার রেলিং ছুঁয়ে হিয়া একবার পেছন ফিরে তাকাল, জোছনার আলোতে ছাদটা যেন এখনো কথা বলে যাচ্ছে, মৃদু কিছুর ইশারা করছে।
তূর্য চুপচাপ হাঁটছিল পাশে, কিন্তু ওর চোখে মুখে তখনো রয়ে গেছে একরকম নিরব বোধ। এই রাত, একটা ডায়েরি, আর হিয়ার সাথে এই সাদামাটা জোছনার সংলাপ যেন মনের ভিতর অনেক কিছু নাড়িয়ে দিয়ে গেছে।
নিচে এসে দু’জনেই থেমে গেল একবার। ঘর আলাদা, দরজা আলাদা, কিন্তু কিছু অনুভূতি একসাথেই থেকে যায়।
কিছু বলা হলো না এরপর আর তাদের। শুধু দু'জনের মাঝখানে কিছু না বলা শব্দ, না বলা অনুভূতির ছায়া পড়ে রইল। হিয়া ঘরের দরজা খুলে ঢুকে পড়ল, তূর্যও ফিরে গেল নিজের ঘরে।
ঘরে ফিরে হিয়া চুপচাপ জানালার পর্দা সরিয়ে তাকাল বাইরের দিকে। জোছনা তখনো জানালার কাচে লেগে। বিছানায় শুয়ে সে চোখ বন্ধ করল ঠিকই, কিন্তু ঘুম এল না। মন জুড়ে ছিল ছাদের আলো, তূর্যের চোখ, আর সেই একান্ত মুহূর্তের নিঃশব্দ ভাষা। রাতটা ধীরে ধীরে পেরিয়ে গেল স্মৃতির মতো, স্বপ্নের মতো।
সকালটা ধীরে ধীরে এল। পাখিদের ডাক, জানালায় ফোঁটা ফোঁটা রোদ, ঘড়িতে আটটার কাঁটা। হিয়া আর তূর্য আলাদা ঘরে, কিন্তু একই অনুভূতিতে জেগে উঠল। হিয়ার চোখে হালকা ক্লান্তি, কিন্তু ঠোঁটের কোণে একচিলতে আশ্বাস। তূর্য ঘুম থেকে উঠে প্রথমেই ডায়রিটার দিকে তাকাল আজ একটা দিন, যা হয়তো অনেক কিছু বদলে দেবে।
ওরা দু’জনই নরম পায়ে খাবার টেবিলে এল। খাওয়ার টেবিলে তখন নিরব একটা ছায়া। প্লেটের শব্দ, চামচের টুংটাং আওয়াজ, আর মাঝেমাঝে চোখাচোখি। হঠাৎ করে খুব সাধারণ একটা সকালের মধ্যে ঢুকে পড়েছে অনেক গভীর কিছু।
খাবার শেষে তূর্য আস্তে করে বলল, "এবার সময় হয়েছে।"
হিয়া কিছু না বলে মাথা নাড়ল। পিউ আর আলিফকে উঠতে ইশারা করলো। ডায়রিটা হাতের মাঝে চেপে ধরে তারা গেল আব্দুর রুশান মোহাম্মদের ঘরের সামনে। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে তূর্য একবার হিয়ার দিকে তাকাল। তার চোখে অনিশ্চয়তা, কিন্তু সাহসও।
তূর্য দরজায় নক করল। ভেতর থেকে আসা গম্ভীর কণ্ঠ,
"ভেতরে আসো।"
দরজা খুলে তারা ভিতরে ঢুকল। কক্ষে সূর্যের আলো নরমভাবে ঢুকে পড়েছে জানালা ভেদ করে। আব্দুর রুশান মোহাম্মদ চেয়ারে বসে ছিলেন, চোখে চশমা, হাতে কিছু কাগজ। মাথা তুলে তাকালেন হিয়া আর তূর্যের দিকে।
তূর্য নীরবে এগিয়ে গিয়ে ডায়রিটা তাঁর টেবিলে রাখল।
"আমরা কিছু পেয়েছি। হয়তো এটা আপনার দেখা উচিত," তূর্য বলল।
একটি পুরনো ডায়েরি, অনেক গুলো প্রশ্ন, আর তাদের চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকা। রুমটার বাতাস যেন আচমকা ভারী হয়ে গেল। এখন শুধু সময়ই বলে দেবে, এই ডায়রি সত্যি কী গোপন করে রেখেছে… আর কার কাছ থেকে।
আব্দুর রুশান মোহাম্মদ ডায়রিটার ওপর তাকিয়ে ছিলেন কিছুক্ষণ নিঃশব্দে। চোখের চশমাটা একটু নামিয়ে আনলেন। ঘরের প্রতিটি মানুষ অনুভব করল, ঘরের বাতাস কেমন থেমে গেছে যেন। ডায়রিটার পাতাগুলো এখনো কেউ উল্টায়নি, কিন্তু কেমন একটা অদৃশ্য ঝড় যেন ঘূর্ণায়মান, একটা পুরনো স্মৃতির ঘূর্ণিঝড়। ধীরে ধীরে তিনি ডায়রিটা তার কাপা হাতে নিলেন। ডায়রিটার প্রথম পাতা খুললেন। চোখের সামনে আসতে লাগল সেই পরিচিত হস্তাক্ষর। খুব যত্নে, খুব ভালোবাসায় লেখা প্রতিটি বাক্য যেন সরাসরি হৃদয়ে আঘাত করল তাকে। প্রথম পৃষ্ঠার প্রকৃতির নাম দেখেই হঠাৎ করেই আব্দুর রুশান মোহামদের বুক কেঁপে উঠল। মুখটা থমথমে, চোখের নিচে এক মুহূর্তে ছায়া নেমে এল। ঠোঁট কাঁপতে শুরু করল, যেন হাজার শব্দ আটকে আছে, কিন্তু বের হতে পারছে না।
"এই হাতের লেখা..." তিনি কাঁপা গলায় বললেন, "এই তো... এই তো ওরই..."
তার গলাটা একদম ভারী হয়ে এল, চোখ দুটো জলের কাচে ঝাপসা হয়ে গেল।
"আমি... আমি জানতাম না... আমি জানতাম না ও ডায়রি লিখত," তিনি ফিসফিস করে বললেন। "প্রকৃতি... ও তো সব কথাই নিজের মধ্যে রাখত। এই ডায়রি... এইটা তো... আমার কাছে? এই বাড়িতে... কিভাবে।"
হিয়া আর তূর্য দুজনেই নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে আছে। এই মানুষটার মুখের যন্ত্রণাটা কেমন ছুঁয়ে যাচ্ছিল ওদের বুকের ভেতরও। পিউ আর আলিফ বেশ সংকিত, নিশ্চুপ।
আব্দুর রুশান মোহামদ ডায়রিটা দু'হাত দিয়ে বুকে চেপে ধরলেন। তার গলাটা এবার ভেঙে এলো। বুকের ভেতর জমে থাকা কষ্টটা যেন একসাথে গলে পড়ে এল চশমার কাচে, গাল বেয়ে নিচে। ডায়রিটার পাতাগুলো আর খুললেন না তিনি। যেন তাতে লেখা প্রতিটি শব্দ এখন ছুঁয়ে দিচ্ছে এক একটা বেদনাময় অতীত।
তূর্য আস্তে করে বলল, "এইটা আপনারই প্রাপ্য ছিল। আলিফ আর পিউ শুধু খুঁজে পেয়েছে, প্রকৃতি হয়তো আপনাকেই ফিরিয়ে দিতে চেয়েছিল এইসব কথা।"
আব্দুর রুশান মোহামদ চোখ মুছে বললেন, "এটা এবাড়িতে কিভাবে? কবে থেকে?"
রুমের ভেতর তখন শুধু নীরবতা… স্মৃতির অক্ষরে, আর গভীর ভালোবাসার ছায়ায়।
আব্দুর রুশান মোহাম্মদের চোখে তখন আগুন জ্বলছে। ডায়রিটা শক্ত করে হাতে চেপে ধরে তিনি হঠাৎই উঠে দাঁড়ালেন, যেন মাটির নিচে আগ্নেয়গিরি ফেটে উঠছে তার ভেতরে। তূর্য আর হিয়া ভয়ে থমকে গেল। আব্দুর রুশান মোহাম্মদ এবার চাপা তবে খুব তিক্ষ্ন গলায় জিজ্ঞেস করলেন,
"এই ডায়রিটা কোথায় পেয়েছো তোমরা?"
আলিফ একটু ভিতু গলায় বললো, "চিলেকোঠায় ভাঙা আলমিরার ভেতরে একটা ছোট ড্রয়ার আছে তার ভিতরে একটা কাপড়ে মোড়ানো ছিলো এটা।"
"এই বাড়িতে এতবড় জিনিস লুকানো ছিল! কে করেছে? কেন করেছে?" জোর গলায় বলে তিনি দরজার দিকে পা বাড়ালেন।
ডায়রিটা তাঁর হাতে, চোয়াল শক্ত, মুখে ঝড়ের পূর্বাভাস। তিনি এক ধাক্কায় দরজাটা খুলে বেরিয়ে গেলেন। দ্রুত পায়ে নিচে নামতে নামতে তাঁর পেছনে ছায়ার মতো ছুটল উত্তেজনা। বাড়িটা যেন হঠাৎ কেঁপে উঠল এক অজানা গর্জনে। সারা বাড়ি তখন নড়েচড়ে বসেছে। কাজের লোকেরা থমকে গেছে, বাতাসটাও থমথমে। বসার ঘরের বড় সোফায় একে একে জড়ো হলেন সবাই, মিনু রহমানের চোখে চিন্তার গভীর রেখা, আব্দুর রবিউল মোহাম্মদ একটু দূরে দাঁড়িয়ে, মুখ গম্ভীর, আর মাঝে বসে আছেন আব্দুর রুশান মোহাম্মদ, চোখ রক্তাভ, হাতের ডায়রিটা কাঁপছে। তাঁর দৃষ্টিটা যেন একসাথে সব কিছুকে ছেদ করছে। সবাই নীরব। সেই নীরবতা এক এক করে গ্রাস করছে ঘরের প্রতিটি কোণা। একটা দম বন্ধ করা ক্ষণ, যেখানে শুধু আব্দুর রুশান মোহাম্মদের হৃদয়ের হুঙ্কার ধীরে ধীরে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে।
তিনি নিচু গলায়, কিন্তু আগুনমাখা স্বরে বললেন, "প্রকৃতির ডায়রিটা এ বাড়িতে কি করছে? এবাড়িতে কে চেয়েছে প্রকৃতির অস্তিত্ব চাপা পড়ে থাকুক?"
তাঁর কণ্ঠে এখন কান্না আর রাগ মিলেমিশে এক অজানা বেদনায় ঝরছে। মিনু রহমান মাথা নিচু করে আছেন, চোখে যেন হাজারো স্মৃতির কুয়াশা। আব্দুর রবিউল মোহাম্মদ চোখ সরিয়ে নিলেন। অস্বস্তি আর সংকোচের এক নিঃশব্দ ভাষা তাঁর চোখে। হিয়া আর তূর্য দরজার পাশে দাঁড়িয়ে আছে, যেন সাক্ষী এক বিস্ফোরণ মুহূর্তের। জানালায় পিছে লুকিয়ে শোনার চেষ্টা করছে পিউ আর আলিফ।
এই সকালে, এই বসার ঘর সাক্ষী থাকছে এক হারিয়ে যাওয়া ভালোবাসার রক্তাক্ত জাগরণে। যেখানে আব্দুর রুশান মোহাম্মদের হৃদয়ে জেগে উঠল এক অগ্নি-সম সমর… প্রকৃতির জন্য, নিজের জন্য, আর সত্যের জন্য।
এক নিরবতা বয়ে যাচ্ছে চারপাশে। যেন তুফান আসার আগের এক নিস্তব্ধতা।
আব্দুর রবিউল মোহাম্মদ হঠাৎ নড়েচড়ে উঠলেন। কণ্ঠস্বর খুলতে গিয়েই যেন আটকে গেল কিছু। তিনি কিছু একটা বলতে যাবেন, মুখটা একটু খোলেন ঠিক তখনই… মিনু রহমান এক ঠাণ্ডা অথচ দৃঢ় ভঙ্গিতে হাত তুলে বললেন,
“থামেন মিয়া ভাই।”
ঘরটা আবার নিস্তব্ধ। মিনু রহমানের গলার সেই স্পষ্ট অথচ কষ্টভরা সুরটা কানে বাজে সবার।তিনি ডায়রিটার দিকে তাকিয়ে বললেন ধীরে ধীরে, যেন একেকটা শব্দ জেগে উঠছে দীর্ঘকাল চাপা থাকা স্মৃতির ধুলোমাখা পাতা থেকে।
“এই ডায়রিটা… এই বাড়িতে এসেছিল ১৯৭১-এর এক বিকালবেলা…তারিখটা ঠিক মনে নেই আমার।”
ঘরের বাতাসটা যেন হঠাৎ ভারী হয়ে গেল। তিনি একটু থেমে নিঃশ্বাস নিয়ে আবার বললেন,
“স্বাত্ত্বকি দিয়ে গিয়েছিল ডায়রি টা।
বড় ভাই আপনি কিচ্ছু জানেন না। আপনি জানেনই না যে আপনি যুদ্ধে যাওয়ার পর বাড়িতে আরও কি কি হয়েছে। আমার সাথে কি হয়েছে।”
সবাই স্তব্ধ। আব্দুর রুশান মোহাম্মদের মুখটা ঘোরে গাঢ় হয়ে ওঠে। চোখ দুটো যেন আরও ভারি হয়। আব্দুর রবিউল মোহাম্মদ এবার হিয়া আর তূর্যের দিকে ইশারা করে ঘর থেকে চলে যেতে বললেন।
মিনু রহমানের চোখ চকচক করছে। পঞ্চাশ উদ্ধো বয়স্ক নারীটি যেনো ষোলো বছর বয়সের কিশোরি রুপে ফিরলেন।
তার কণ্ঠস্বর ক্রমশ নিচু হয়ে আসে, যেন প্রতিটা শব্দেই এক একটা সময় ধসে পড়ছে। চোখে জল ঝিলমিল করছে, তবু উচ্চারণে স্পষ্টতা। কঠিন এক স্বীকারোক্তির দৃঢ়তা।
“স্বাত্ত্বকি…! আপনি জানেন না ওর কথা। আর আমি নিজেও জানতাম না, ও যে প্রকৃতি আপার ভাই ছিল। আমরা একসঙ্গে পড়তাম স্কুলে, চঞ্চল ছিল, প্রাণবন্ত ছিল, আর আমি!
খুব ভালো লাগত ওকে আমার। প্রেম ছিল আমাদের.......।।”
একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেললেন মিনু রহমান। মনে হলো যেন সেই নিঃশ্বাসে আটকে থাকা বহু বছরের চাপা কান্না উঁকি দিল।
““আপনি যখন যুদ্ধের ময়দানে গেলেন, সেই সময়টায়… দেশের অবস্থা তো জানেনই। আব্বা হানাদারদের ভয়ে আমার বিয়ের জন্য উঠে পড়ে লেগেছিলেন। আর এর মাঝেই সবার সামনে আসে আমার আর স্বাত্বকির বিষয়টা। স্বাত্ত্বকির ধর্ম যে হিন্দু, এই পরিচয়টাই যেন ছিল আমাদের পাপের মতো! আব্বা আর দেরি করলেন না। রাতারাতি হাসানের সঙ্গে আমার বিয়ের আয়োজন করে ফেললেন। একপ্রকার জোর জবরদস্তিতেই বিয়েটা দেয়া হয় আমার”
তিনি থেমে গলায় একটু কাঁপন সামলান, তারপর আবার বলেন, “বিয়ের ঠিক দুই দিন পর স্বাত্ত্বকি এসেছিলো এই বাড়িতে। সারা দিন বাইরে দাঁড়িয়ে ছিল নিঃশব্দে। বিকেলে আমি গিয়েছিলাম... শেষবারের মতো দেখা করতে। কোনো কথা হয়নি আমাদের মাঝে। ও শুধু একটা খাম আমার হাতে তুলে দিয়ে বলেছিল 'আর কখনোই দেখা হবে না। এটা রুশান ভাইয়ের আমানত। শুধু মাত্র উনার হাতেই দিও। বড়'দি ভাইয়ের ডায়রি এটা। ভালো থেকো।’ এরপর চলে গেলো।”
তার চোখ দুটো এবার আর আটকাতে পারে না। কান্না নামলো নিরবধি নদীর মতো।
“ডায়রিটার কথা আমি কাউকে বলি নাই। আমি শুধু স্বাত্বকির হাত থেকে ডায়রিটা নিয়ে ঘরের টেবিলের উপর রেখেছিলাম। এরপর দাদি আম্মা ডেকেছিল শুধু শুনে এসেছিলাম। পাঁচ থেকে ছয় মিনিটের একটা বিরতি। এর মাঝেই ডায়রিটা কিভাবে যেন গাযেব হয়ে গেল। সারা বাড়ি আমি তন্য তন্য করে খুঁজেছি। কোথাও নাই।
আমি কি বলতাম, এই ডায়রির কথা আপনাকে বড় ভাই। বলেন আপনি। আমি হারাইনাই ডাইরিটা, যেন নিজ থেকে গায়েব হয়ে গেছে। কে সরিয়ে ছিল আমি জানিও না। এখন অব্দি।”
ঘরজুড়ে নেমে আসে ঘন স্তব্ধতা। বাতাস থমকে দাঁড়ায়, যেন শব্দ করাও অসম্মান।
আব্দুর রুশান মোহাম্মদ ধীরে ধীরে ডায়রির দিকে তাকান। চোখের ভেতর জমে থাকা সমস্ত অতীত আজ যেন ধুয়ে দিতে চায় সেই একটুকরো খাতা। তার মুখ গাঢ় ছায়ায় ঢাকা, চোখ দুটো লালচে হয়ে উঠছে। মনে হচ্ছে, সত্তরের দশকের না বলা কথারা যেন আজ একযোগে ধেয়ে এসেছে তার হৃদয়ের দরজায়, কাঁপিয়ে তুলেছে ভেতরের সমস্ত দেওয়াল।
ঘরজুড়ে নেমে আসে এক অচেনা নীরবতা, নরম অথচ ভারী। যেন বাতাসের গায়েও কেউ শোক জড়িয়ে দিয়েছে।
আব্দুর রুশান মোহাম্মদ কোনো শব্দ করেন না। তার দৃষ্টি তখনো ডায়রির পাতায় আটকে আছে। সেই কালো হরফগুলোয়, যেগুলো যেন একেকটা আগ্নেয়গিরির মতো বিস্ফোরিত হচ্ছে বুকের ভেতর। চোখ দুটো ক্রমশ লালচে, কিন্তু অশ্রু নেই, শুধুই জ্বলন্ত স্তব্ধতা।
তিনি ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ান। কাউকে না তাকিয়ে, কিছু না বলেই ঘর থেকে বেরিয়ে যান। পায়ের শব্দটুকুও যেন চেপে আসে এই গুমোট নীরবতার ভিতর। তার পদক্ষেপ মিলিয়ে যায় দূরের করিডরে।
পেছনে কেবল নিঃশব্দে ফেলে যান জমাট এক শোক। শোকের নাম হয়তো ‘অপূরণ’, হয়তো ‘প্রতীক্ষা’, কিংবা ‘না বলা ভালবাসা’।
ঘরের ভেতর মিনু রহমান বসে আছেন নিথর হয়ে। চোখে তখনও জল ঝুলে আছে, ঠোঁটের কোনা কেঁপে উঠছে। হঠাৎ করেই এক চিড় ধরা নিঃশ্বাসে তার ভেতরটা ফেটে যায়।
কান্নাটা এবার বেরিয়ে আসে থেমে থেমে। নিস্তব্ধ কান্না, অথচ প্রতিধ্বনি হয় চারদিকে। যেন হৃদয়ের সব পাথর ফুঁড়ে বেরিয়ে আসছে এক জীবনের দাহ। আব্দুর রবিউল মোহাম্মদ চোখ নিচু করে বসে থাকেন। কোথাও তাকাতে পারেন না। কোনো শব্দ নেই, কেবল এক অনুচ্চারিত ইতিহাস ঘরের চার দেয়াল ঘুরে বেড়াচ্ছে, ডায়রির পাতার গন্ধে ভিজে যাচ্ছে বাতাস।
ঘরের বাইরের চারটা মানুষও যেন জমে গেছে সত্যর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। হয়তো গল্পের এই মোড়টা বেশ অনাকাঙ্ক্ষিত। অগ্রহণযোগ্য। ডায়রি এবাড়িতে আসার রহস্য ভেদ হলো, তবে শেষ পাতায় কি ছিল যা এভাবে ছেঁড়া হয়েছে? যা গোপন করতে চাওয়া হয়েছে। প্রকৃতি চাইতো রুশান এই ডাইরিটা পড়ুক। আর ঠিক একই সময়ে অন্য কেউ চাইতো, যে রুশান এই ডায়রিটা না পড়ুক।
যে-ই ডায়রিটা মিনু রহমানের থেকে গায়েব করুক না কেন, সে তো সমগ্র ডায়রিটাই ধ্বংস করতে পারতো। তবে কেন শুধু শেষ পাতা গুলোই এভাবে অদৃশ্য করেছে? সমগ্র ডায়রিটা নয় কেন?
চলবে.......❤️