নির্বাসিত কৃষ্ণচূড়া — পর্ব ৩৫

লেখক: সাদিয়া তিন্তি · বিভাগ: রহস্য · পর্ব ৩৫ · ৪৭ পর্বের মধ্যে ৩৫

স্বাত্ত্বকির কণ্ঠে তখন এক ধরনের চাপা ভার, যা হৃদয়ের গহীনতম কক্ষ থেকে উঠে আসে। তিনি যেন নিজের ভিতরটাকে ভেঙে ভেঙে খুলে দিচ্ছেন সাবধানে, কাঁপা হাতে, যেন সেখানে ধরা আছে বহু বছরের না বলা কথা, না বলা কান্না। তিনি আবার বলতে শুরু করলেন, “সেই সময়ের কথা মনে করলে এখনো শরীর কাঁপে… রাত তখন বারোটা পেরিয়েছে। চারদিকে নিস্তব্ধতা, শুধু মাঝে মাঝে যুদ্ধের শব্দ দূর থেকে ভেসে আসছে। হঠাৎ টেলিফোন বাজে। সেই রিংটা এতো ভয়ংকর! ওপাশে পিসিমার বাড়ির এক কাজের মেয়ে, খুব ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছিল, কাঁপা কণ্ঠে শুধু বলল, ‘... সব শেষ। সব শেষ।’ আমি প্রথমে বুঝতেই পারিনি। কিছুই বোঝার সুযোগ ছিল না।”

তিনি থেমে যান। তাঁর বুক থেকে এক অদৃশ্য ঢেউ উঠে আসে গলায়। তারপর যেন রুখে রুখে বললেন, “পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর আকস্মিক আক্রমণ… পুরো কোয়ার্টার ঘিরে ফেলে তারা। পিসি আর পিসেমশাই তাদের দুজনকেই সামনে থেকে গুলি করা হয়। সরাসরি, নির্মমভাবে… বলা হয়েছিল, তারা দেশদ্রোহী, উনারা নাকি মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য সাহায্য পাঠাতেন। কিন্তু…”

স্বাত্ত্বকি এবার চোখ নামিয়ে ফেলেন। তাঁর কণ্ঠ জড়িয়ে আসে, আর গলা বেয়ে নামতে থাকে অস্ফুট নিঃশ্বাসের মতো শব্দ। ঠোঁট কাঁপে, “বড়দি’ভাইকে...”

একটি দীর্ঘ মুহূর্ত নীরব থাকে কক্ষটা। ঘরের বাতাস পর্যন্ত যেন দাঁড়িয়ে পড়ে। শব্দ যেন ঠিক উচ্চারণ হয়েও হতে চায় না, “…তাকে গণধর্ষণ করে হানাদাররা। বারবার। আমার পিসিমার সাজানো-গোছানো সেই ঘর… চেনা উঠোন… সব রক্তাক্ত। আমি আর জ্যাঠা মশাই ছুটে যাই একেবারে পাগলের মতো। পিসিমার বাড়িতে পৌঁছে যা দেখলাম... আজও রাতের ঘুম কেড়ে নেয়।”

স্বাত্ত্বকি আরেকবার থামে। চোখ দুটো বন্ধ করে ফেলেন, যেন দেখতে পাচ্ছেন আবার সেই দৃশ্য। গলা শুকিয়ে যায়, ঠোঁট কাঁপে। তারপর আবার বলেন, “ঘরের সামনের বসার ঘরে পড়ে ছিল পিসি আর পিসেমশাইয়ের রক্তাক্ত নিথর দেহ। দেয়ালের রং, আসবাব সব কিছু যেন এক অচেনা রক্তপিপাসু বাস্তবতায় বদলে গিয়েছিল। আর ভিতরের ঘরের এক কোণায়… পর্দার আড়ালে, একটা পাটি বিছানো ছিল। ওখানেই গুটিশুটি মেরে পড়ে ছিলেন বড়দি’ভাই । সাদা শরীরটা যেন কেমন অস্বাভাবিক সাদা হয়ে উঠেছিল। সমস্ত রক্ত যেন হানাদার শকুনরা শুষে নিয়েছে।”

স্বাত্ত্বকির গলা কাঁপে, কিন্তু তিনি থামেন না। “আমি তাকিয়ে ছিলাম তাঁর দিকে… তিনি তাকিয়ে ছিলেন এক ফাঁকা দৃষ্টিতে। মুখে কোনো অভিব্যক্তি নেই, তিনি কাঁদছিলেন না, ফাঁকা চোখে অদ্ভুত শূন্যতা দেখছিলেন। আমিও কাঁদতে পারছিলাম না, দৌড়ে গিয়ে ওনাকে জড়িয়ে ধরেছিলাম। কিন্তু তিনি এক বিন্দু জলও ফেলেননি। শরীর ছিঁড়ে ফেলা, তবুও মুখ ছিল শক্ত, অপ্রতিরোধ্য। যেন শেষটুকুও হার মানেনি সে।”

এই পর্যন্ত এসে স্বাত্ত্বকি আর এগোতে পারেন না। তাঁর গলা যেন ভেঙে যায়, বুক থেকে হু হু করে কান্না বেরোতে চায়, কিন্তু বছর বছর ধরে জমে থাকা শক্ত মুখাবয়ব তা থামিয়ে রাখে। হিয়া তখনো নিঃশব্দে বসে। কিন্তু তার চোখ ভিজে গেছে। ঠোঁট কাঁপছে, প্রতিবাদ করতে চায়, সময়কে থামাতে চায়, বিশ্বাস করতে চায় না কোনো কিছুই। সে দুহাতে নিজের হাঁটু চেপে ধরে বসে থাকে, যেন সমস্ত শরীরটা সামলে রাখতে চাইছে। তূর্য কিছু বলতে গিয়ে থেমে যায়। তার কণ্ঠ আটকে যায় গলার ভেতরেই। এতটা নির্মমতা। তার মতো একজন বাস্তববাদী মানুষের জন্যও সহ্য করা কঠিন।

স্বাত্ত্বকির কণ্ঠের ভার, যেন এক অতীত সময় সরে এসে তার চোখে এসে জমা হয়েছে। কিন্তু কান্না আসে না। শুধু কণ্ঠস্বরের নিচে যেন জমাট বেঁধে থাকে অসীম এক শোক, যে শোকের ভাষা নেই, মাত্রা নেই।

তিনি আস্তে আস্তে বলেন, “বড়দি’ভাই তখন… একদম নিশ্চুপ। না, কাঁদেনি সে। চিৎকারও করেনি। বরং এমন এক ধরনের স্থিরতা ওর মধ্যে আমি দেখেছিলাম, যা জীবনে আর কখনো কোনো মানুষের মধ্যে দেখিনি। যেন ভিতরটা জমে গিয়েছিল। হিম। পাথর। তার দিকে তাকিয়ে থাকলেও আমাদের কোনো ভাষা খুঁজে পাচ্ছিলাম না, কিছু বলার মতো শব্দ ছিল না। না আমার, না জ্যাঠা মশাইয়ের। কিছু সময় যেতে, সে নিজেই উঠে দাঁড়াল। নিঃশব্দে। ধীরে পা ফেলে গেল বসার ঘরের দিকে। সেখানেই পিসি আর পিসেমশায়ের লা শে র সামনেই বসেছিলেন জ্যাঠা মশাই। ওনার চোখে তখন শুধু কান্না, কিন্তু সে কান্নাও ছিল ধারালো অস্ত্রের মতো, নিজেকে কেটে যাচ্ছে প্রতি ফোঁটায়। জ্যাঠা মশাই এমন বিদ্ধস্ত অবস্থায় বড়দি'ভাইকে দেখে অনেকক্ষণ চুপ করে ছিলেন। বড়দি'ভাই জ্যাঠা মশাইয়ের পাশেই সোফায় বসে পড়লেন। জ্যাঠা মশাইও খুব ঠান্ডা কণ্ঠে বড়দি'ভাইয়ের মাথায় হাত দিয়ে বলেছিলেন, ‘চল, বাড়ি ফিরতে হবে।’

জ্যাঠা মশাইয়ের এই কথায় বড়দি’ভাই কোনো ভনিতা করেননি। চুপচাপ মাথা নাড়ল। আমরা তিনজন একই ঘরে তখন। কিন্তু কেউই যেন কাউকে ছুঁতে চাচ্ছিলাম না। ছুঁয়ে না থেকেও কিভাবে যেন আমরা আবদ্ধ।”

স্বাত্ত্বকি হঠাৎ চুপ করে যান। তাঁর কণ্ঠে যেন কোনো অদৃশ্য স্মৃতি এসে আঁচড় কেটে গেল। তারপর আবার আস্তে করে বলেন, “বড়দি’ভাই ঘরে গিয়ে প্রথমেই সোজা বাথরুমে ঢুকে পড়ে। কিছু না বলে। আমাদের তখনো কিছুই আন্দাজ হয়নি। ভাবছিলাম, হয়তো নিজেকে সামলে নিচ্ছে। ৩০-৪০ মিনিট কেটে যায়। কোনো শব্দ নেই। আমি একবার দরজায় কড়া নেড়েছিলাম, কোনো সাড়া পাইনি। তারপর আবার এসে বসে পড়েছিলাম জ্যাঠা মশাইয়ের পাশে। বাথরুম থেকে বেরিয়ে ও ঘরের দরজা লাগায়ে দেয়।”

স্বাত্ত্বকির চোখে এবার এক অদ্ভুত বিষণ্ন দৃষ্টির ছায়া নামে, “শেষবার আমি ওকে দেখেছিলাম ভেজা শাড়ি গায়ে ঘরে ঢুকতে। খুব ধীরে আলমারি খুলে একটা গাঢ় মেরুন শাড়ি বার করল। তারপর দরজাটা... একটা কাঠের দরজা, ভারি, পুরোনো কাঠের। সেটাকে জোরে ঠেলে বন্ধ করল। দরজা লাগানোর সেই শব্দটা আজও কানে বাজে। যেন একটা চিরতরে আলাদা হয়ে যাওয়ার শব্দ ছিল সেটা।”

তিনি থেমে যান কিছুক্ষণ। তারপর গলাটা পরিষ্কার করে আবার বলেন, “প্রায় ঘণ্টাখানেক কেটে গেল। কোনো সাড়া নেই। আমরা শুধু ভাবছি, এখনই বের হবে… এখনই আসবে। কিন্তু না…

এক সময় যখন দরজায় কড়া নাড়তে নাড়তে হাত ব্যথা হয়ে গেল, আর কোনো শব্দ এল না ভেতর থেকে… তখন বাধ্য হয়ে দরজা ভেঙে ঢুকি।

কিন্তু সব শেষ।

বড়দি'ভাই আত্মহত্যা করেছিলেন....।

তার মেরুন শাড়ি, পরিপাট্যতা, লম্বা ভেজা চুল গুলো নির্দ্বিধায় ঝুলছিল এক সামান্য রশিতে।"

স্বাত্ত্বকি এবার এক মুহূর্ত চুপ করে থাকেন। চোখ মুছে নেন, তারপর বলেন, “সেই ঘরের টেবিলের উপর ছিল বড়দি'ভাইয়ের ডায়রি। পাশে রাখা তিনটা চিঠি। একটা আমার নামে। একটা রুশান ভাইয়ের নামে। আরেকটা... জ্যাঠা মশাইয়ের নামে।"

এই কথাটুকু বলেই স্বাত্ত্বকি থেমে যান। তাঁর চোখে এখন আর পানি নেই, কিন্তু তার হৃদয় যেন ছিন্নভিন্ন শব্দহীন এক কান্নায় রক্তাক্ত। ঘরটা এতটাই নিঃশব্দ যে, তূর্য আর হিয়ার নিঃশ্বাসের শব্দ পর্যন্ত পরিষ্কার শোনা যায়। তূর্যের মুখ শক্ত হয়ে গেছে। সে জানে না কী বলবে। তার চোখে ধোঁয়াশা, কণ্ঠে না বলা অসহায়তা। হিয়া তখনও নিঃশব্দ, কিন্তু তার চোখে বয়ে যাচ্ছে এক অদ্ভুত ঝড়। বুকের ভেতরটা যেন চেপে আসছে ভীষণভাবে। সে তার ঠোঁট চেপে ধরে, কিন্তু চোখের জল থামাতে পারে না। এই বাস্তবতা, এই নির্মমতা, এই সত্য সব কিছু যেন এক দুঃস্বপ্নের মতো মস্তিষ্কে আঘাত করে যাচ্ছে।

কেউ কিছু বলে না। কারণ কিছুই আর বলার মতো নেই। শুধু চারপাশে বয়ে যায় এক দগ্ধ ইতিহাসের নীরবতা। স্বাত্ত্বকি চোখের কোণায় জমে থাকা সেই পুরনো, শুকিয়ে যাওয়া স্মৃতির ধুলো ঝেড়ে ফেললেন অগোচরে। কাঁপা আঙুলে মুখটা মুছে নেন একবার। তাঁর মুখে তখন এক অদ্ভুত প্রশান্তি, যা দীর্ঘ বছর ধরে না-বলা কথার ভার বইতে বইতে গড়ে ওঠা রুক্ষতা ভাঙনের সুখ।

হিয়া এখনো মুখ নিচু করে বসে আছে, আর তূর্য যেন চোখের ভিতর খোঁজে কোনো উত্তর, যা এই অন্ধকার থেকে মুক্তি দেবে। কিন্তু স্বাত্ত্বকি তখন ফিরে গেছেন পেছনের সেই দিনে, তিনি যেন একজন ষাটের ঘরের বৃদ্ধ নন, বরং এক কিশোর।

তিনি ধীরে, খুব ধীরে বলেন, “আমাকে দেয়া চিঠিটা... আজ আর পুরোটা ঠিকঠাক মনে নেই। জানো তো, অতি যত্নেও বস্তু হারায়। কোথায় যেন অমূল্য রত্নের মতো গুছিয়ে রেখেছিলাম চিঠিটা। জায়গাটাও এখন আর মনে নেই।"

একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাসের পর, স্বাত্ত্বকি আবার বলেন,

“চিঠিটা অনেকটা এমন ছিল যে,

‘আমার ভাই,

তুই আমার বড্ডো আদরের। আমার এই আমানত তোর হেফাজতে করে গেলাম। এগুলো রুশানের কাছে পৌঁছে দিস। আমি এই গুরুদায়িত্ব তোর উপরে সপে গেলাম। ঐ মানুষটা বড্ডো ভালো। তবে আমার এই জন্ম ভালো না। শুধু অপূর্ণতা আর দূর্ভাগ্য। আমার শেষ চাওয়া পৃথিবীর সব সুখ ঐ মানুষটার হোক। আমার বাবাকে সামলে নিস। আমার সময় ফুরালো...।"

স্বাত্ত্বকি তখন চোখ বন্ধ করে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকেন। তিনি আবার বলেন, “আরো অনেক কিছু লেখা ছিল বোধহয়। চিঠিটার সঙ্গে রুশান ভাইয়ের ঠিকানা ছিল। বড়দি'ভাইয়ের নিজের হাতে লেখা। আমি তখনও বুঝিনি এই দায়িত্বটা কতটা ভারী। আজ মনে হচ্ছে, বয়সের তুলনায় দায়িত্বটা বেশি বড় ছিল, তাই বোধহয় পেরে উঠিনি।"

ঘরে আবারো এক নিস্তব্ধতার চাদর নেমে আসে। হিয়া চুপ করে বসে থাকে, তার চোখ বেয়ে নামতে থাকা জলের ধারা থেমে যায় না। তার ঠোঁট কাঁপে, বুকের ভেতরে একটা দগ্ধ চিৎকার গুমরে ওঠে, কিন্তু মুখে আসে না। তূর্যর চোখে তখন প্রবল বিস্ময় আর এক অনুচ্চারিত দায়বোধ। সে যেন ভাবতে পারে না, ভালোবাসার এমনও পরিণতি হতে পারে, যেখানে সব কিছু দিয়ে দিলেও কিছুই রক্ষা করা যায় না। নিজের গলা সামান্য পরিষ্কার করে তূর্য বললো, "বড় দাদার চিঠিতে কি লেখা ছিল বা ডায়রির শেষ পাতা গুলোতে। এ বিষয়ে কিছু বলতে পারেন?"

স্বাত্ত্বকি মাথা নাড়িয়ে বলেন, "না, সেসব খুলে দেখার স্পর্ধা দেখাইনি। বড়দি'ভাইয়ের চিঠিতে উল্লেখ ছিল তার শরীর দাফনের আগেই যেন এই ডায়রি সমেত চিঠি রুশান ভাইয়ের কাছে দিয়ে আসা হয়।"

তূর্য ভ্রু কুঁচকে বললো, "দাফন? দাফন কেন?"

স্বাত্ত্বকি ধীরে বলেন, "জ্যাঠা মশাইকে দেয়া চিঠিতে বড়দি'ভাই উল্লেখ করেছিলেন। ঐ চিঠিটাও পরিষ্কার মনে নেই, তবে কিছু বিষয় স্পষ্ট মনে আছে। বড়দি'ভাই লিখেছিলেন,

'বাবা,

আমি জানি, আমি অধর্ম করেছি। ধর্ম আর অধর্মের মাঝের পার্থক্য আমি এই শেষ মুহূর্তেও বিচার করতে পারছি না। পৃথিবী মিথ্যে বাবা। সব মিথ্যে। আমি তো শুধু বাঁচতে চেয়েছিলাম নিয়মের উদ্ধে গিয়ে। এটাই কি আমার ভাগ্য?

বাবা আমাকে ক্ষমা করে দিন। আমার জন্ম বৃথা। না সুখ, না সম্মান আর না আপনাকে পিতা হবার যথেষ্ট মর্যাদা দিতে পেতেছি। ঠাকুর আমাকে ক্ষমা না করুক। আমি মুসলিম ঘরের এক ছেলেকে নিজের জীবনের উদ্ধে ভালোবেসেছি। আপনি জানেন এ পাপ আমি করেছি। আর এই পাপের কোন অনুসূচনা আমার নেই। ভালোবাসা যদি অন্যায় হয়ে থাকে, আমি এই অন্যায়ের শাস্তি পেতে রাজি। এছাড়াও আমি জীবন থাকতে নরকের দেখা পেয়ে গেছি। নরপিশাচের খাদ্য হয়ে শরীরে ঘেন্না ধরে গেছে। এতো কলঙ্ক নিয়ে আর নিঃশ্বাস নেয়া যাচ্ছে না। শরীর পুরে যাচ্ছে যন্ত্রণায়। আমার জন্য প্রার্থনা করবেন। যদি পরজন্ম থেকে থাকে, তবে সে জন্মে কলঙ্ক আমায় না ছুঁক। আবার আপনার ঘরে আমার জন্মহোক। রুশানের প্রতি প্রণয় পাপ না হোক। আমার সব অপূর্ণ ইচ্ছে পূরণ হোক...।

আমাকে অগ্নি দেবেন না। আমি সমাধিস্থ হতে চাই। শহরের কোন কৃষ্ণচূড়ার নিচে আমাকে সমাধিস্থ করিয়েন। আমি মৃত্তিকায় আটকে থাকতে চাই। আমার অগ্নি মুখে মুক্তি চাই না। আমার নামের কবর এই বাংলায় থাকুক। জেনে রাখুন, এটাই আমার শেষ ইচ্ছে। আমাকে দাফনের আগেই আমার ডায়রি আর চিঠি রুশানের কাছে পাঠিয়ে দেবেন। ভালো থাকুন বাবা। আপনার পাপি মেয়ে হাজার কলঙ্কে লেপ্টে মুক্তি নিচ্ছে।'”

স্বাত্ত্বকির কণ্ঠ হঠাৎ থেমে যায়। বুকের ভেতর যেন একটা দীর্ঘশ্বাস আটকে পড়ে আছে বহু বছর ধরে, ঠিক সেই চিঠির মতো। তারপর আবার মুখ তুলেন তিনি। চোখ দুটো এবার একেবারে শিশুর মতো কাঁচা। সেখানে ক্লান্তি নেই, কেবল গভীর এক শূন্যতা। তিনি ধীরে বলেন, “বড়দি’ভাই... জানতো কোথায় গেলে ওর মুক্তি মিলবে। যে কলঙ্কয়ের তার শরীরে লেপটে দিয়েছিল, তা যেন সে গ্রহণ করতে চাইনি। সে যেন জন্মেছিল যন্ত্রনা পেতে। সব মুক্তির পথ সে নিজেই বেছে নিয়েছিল। তাই হয়তো জ্যাঠা মশাইয়ের উদ্দেশ্যে সেই চিঠিতে লিখেছিল, ‘আমি অগ্নি চাই না। আমি বাংলার মাটির মধ্যে ঘুমাতে চাই। আমার নামের কবর থাকুক এই দেশে।’”

স্বাত্ত্বকি থেমে যান এক মুহূর্তের জন্য। তারপর ঠোঁট কামড়ে ধরে বলেন, “আমি সেদিন, সেই ভোরবেলায়, হাতে করে ডায়রি আর চিঠি নিয়ে পৌঁছে গিয়েছিলাম রুশান ভাইয়ের বাড়ির উদ্দেশ্যে। ঠিকানাটা পরিচিত লেগেছিল, কিন্তু আমি জানতামই না যে মিনু রুশান ভাইয়ের বোন। আমি রবি ভাইকে চিনতাম মিনুর ভাই হিসেবে। রুশান ভাইকে চিনতাম উনার ক্রিকেট খেলার জন্য। পাড়ার সব টুর্নামেন্টের চ্যাম্পিয়ন ছিলেন তিনি। জীবনটা কতোটা অদ্ভুত সেদিন বুঝেছিলাম। … মিনুর কাছে ডায়রি আর চিঠিটা দিয়ে এসেছিলাম আমি।"

স্বাত্ত্বকির কণ্ঠ থেমে যায়, কিন্তু তার চোখে তখন উথলে ওঠা জল আর মুখে যন্ত্রণার রেখা। তূর্য তখনো একদৃষ্টে তাকিয়ে। সে যেন ঠিক করতে পারছে না, এই ভালোবাসা একটা গল্প নাকি এক অসমাপ্ত ইতিহাস। হিয়া এখন আর কাঁদছে না, কিন্তু চোখ ভিজে আছে। তার যেন মেনে নিতে কষ্ট হচ্ছে এই নির্মম বাস্তবতা। এই নিঃশব্দতার মধ্যে হঠাৎ তূর্য ধীরে কণ্ঠে বলে ফেলে, “…এসবের মধ্যে... তুহুরা কোথায় ছিল? মানে আপনি তুহুরার সাথে কি করে পরিচিত হলেন?”

তুহুরার নামটা শুনে স্বাত্ত্বকি যেন এক মুহূর্তের জন্য বর্তমান থেকে আবার পেছনে ফিরে যান। তার মুখে তখন এক অন্যরকম ছায়া। তিনি আস্তে, গলা নামিয়ে আউড়ে নেন, “তুহুরা আপা...”

______________

চলবে.........💔