নির্বাসিত কৃষ্ণচূড়া — পর্ব ০৩
লেখক: সাদিয়া তিন্তি · বিভাগ: রহস্য · পর্ব ০৩ · ৪৭ পর্বের মধ্যে ৩
হিয়া যেন ধীরে ধীরে নিজেকে হারিয়ে ফেলছে সময়ের পাতায় ঠিক ১৯৬৯ সালের সেই উত্তাল, আগুন জ্বালানো দিনগুলোর মাঝে। শহরের বাতাসে তখন বারুদের গন্ধ, গলির মোড়ে মোড়ে তরুণ কণ্ঠের স্লোগান, আর রাজপথ কাঁপানো জনতার ঢেউ। সেই তরঙ্গে যেন ক্রমেই ভেসে যাচ্ছে হিয়ার অন্তর, চোখের সামনে যেন খুলে যাচ্ছে এক ইতিহাসের জীবন্ত দৃশ্যপট।
গণঅভ্যুত্থানের আগুনে পুরো দেশ যখন দাউদাউ করে জ্বলছে, তখনই প্রকৃতির ডায়রিতে খুঁজে পাওয়া যায় আরও এক প্রকার অগ্নিস্নান। যেটা হয়েছিল তার ভেতরকার যন্ত্রণায়, সীমাবদ্ধতায়, আর নিঃশব্দ প্রতিবাদে।
আব্দুর রুশান মুহাম্মদের বন্ধু মহল একের পর এক যোগ দিচ্ছে আন্দোলনে। কারো নাম পত্রিকায়, কারো ছবি দেয়ালে, কারো গায়ে রক্তের দাগ। আর সেই রক্তের কালি দিয়ে ঠিক পাশের পাতায় প্রকৃতি লিখে যাচ্ছে তার মনের উত্তাল সময়কে। লিখছে, কিন্তু জানে। এই লেখা কোনো ব্যারিকেডে পৌঁছাবে না, কোনো পতাকায় ওড়াবে না।
তার প্রতিবাদ ছিল ঘরে বসেই ডায়রির পৃষ্ঠায়, কলমের অক্ষরে। পারিবারিক শৃঙ্খল ছিল পায়ে বেড়ির মতো। নারী শরীরের চারপাশে তখনো সমাজ গেঁথে রেখেছে অদৃশ্য প্রাচীর। সেই প্রাচীর ভাঙতে পারেনি প্রকৃতি, কিন্তু সে জানে তার কলমই একমাত্র মুক্তির অস্ত্র।
হিয়ার চোখ আটকে যায় এক পৃষ্ঠায়, যেখানে প্রকৃতি লিখেছে,
"আমি কী এই আগুন থেকে নিজেকে দূরে রাখতে পারি? রক্ত যখন রাস্তার জল হয়ে যায়, আমি কি জানালা বন্ধ করে বসে থাকি? আমার হৃদয় তো প্রতিটি গুলির শব্দে কেঁপে ওঠে। আমি কেন শুধু নারী হয়েই বাঁচি?"
এই প্রশ্নগুলো হিয়ার ভেতরেও ধাক্কা দেয়। সে যেন অনুভব করে, প্রকৃতির সেই নিঃশব্দ বেদনা, সেই গোপন আগুন, যা শব্দের সীমা পেরিয়ে এক আত্মার জ্বালায় পরিণত হয়েছিল।
পাতার পর পাতা এগিয়ে যায়, সময় এগিয়ে যায়। কিন্তু কিছু লেখা আর আগের মতো স্পষ্ট নয়। বহু অক্ষর ঝাপসা, কোনোটা আবার আর্দ্র কালি ছড়িয়ে একরকম অস্পষ্ট ধোঁয়াশায় মিশে গেছে। তবুও, হিয়া তার প্রতিটি ছেঁড়া বাক্য, ভাঙা শব্দকে পরম মমতায় আপন করে পড়ে চলে। যেন প্রকৃতির অপ্রকাশ্য যন্ত্রনাগুলো তার নিজের অনুভবেই দোলা দিয়ে যায়।
হিয়ার চোখ তখন অতীত আর বর্তমানের মাঝামাঝি কোথাও। প্রতিবাদী এক নারীর নিঃশব্দ কণ্ঠে, কোনো এক নিষিদ্ধ ভালোবাসার অলিখিত কবিতায়, আর এক গভীর আর্তনাদে, যেটা কেউ শুনতে পায় না। তবুও থেকে যায় ইতিহাসে। এই শেকলের ব্যর্থতা যেনো ঘিরে ধরেছিল, প্রতিবাদী এই নারী মূর্তিটাকে।
পৃষ্ঠার সাথে সময় এগোলো। কতো শব্দ যে মুছে গেছে তাও হিয়া পরম মমতায় তাদের আপন করে বুঝে চলেছে।
আবারও এক চুপচাপ আড়ষ্টতা হিয়ার চোখে মুখে। যেনো ডায়রির পাতার গা ছুঁয়ে তার শরীরেও নেমে এসেছে এক নিঃশব্দ ভার। সে একটু নড়ে বসে, চোখ মেলে তাকিয়ে থাকে পাতার ওপরে।
৬৯-এর ২৬ এপ্রিল, তাকে টেনে নিয়ে যায় একটি বিশেষ দিনে। সেই দিন, যেদিন গায়েব হয়ে গিয়েছিলেন আব্দুর রুশান মোহাম্মদ। হিয়া একটু নিঃশ্বাস নিয়ে পাতায় চোখ রাখে, যেন ধীরে ধীরে ঢুকে পড়ছে সেই দিনেরই কোনও দুঃস্বপ্নে।
কী অদ্ভুত!
এই পাতায় এক নারী যে তার নিঃশব্দ দহনকে শব্দে রূপ দিয়েছে। এক গভীর প্রেমের মানুষ যখন হঠাৎ হারিয়ে যায়, তার অনুপস্থিতি তখন কেবল এক শূন্যতা হয়ে থাকে না, সে হয়ে ওঠে জীবনের কেন্দ্রীয় বিষাদ।
প্রকৃতি লিখেছে,
"আজও আমি ছন্নছাড়া। তোমার সেই পথ শূন্য, আজ শব্দহীন পায়ে গুম হয়ে গেছো তুমি পথিক। কোনো সংবাদ নেই, কোনো শব্দ নেই। যেন হাওয়ায় মিশে গেছে রুশান।"
হিয়ার গলা শুকিয়ে আসে। এই একাকিত্ব, এই শূন্যতা প্রাপ্তির আগের অপেক্ষার মতো। যেখানে না পাওয়ার নিশ্চিয়তা নেই, আবার পাওয়ার আশাটাও ধোঁয়াটে। যেখানে প্রতীক্ষা ছাড়া আর কিছু করার নেই, অথচ সেই প্রতীক্ষাও ধীরে ধীরে বিষ হয়ে ওঠে।
প্রকৃতির ভাষা বড়ো মায়াবী, সে প্রেমিকের অনুপস্থিতিকেও মমতায় ভরে লিখেছে।
"তাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখি না আজকাল। শুধু জানি, একদিন সে ফিরবে। অথবা, তার হেঁটে যাওয়ার শব্দটাই ফিরবে। আমিও ঠিক সেই শব্দ চিনে নেবো।"
এই বাক্যগুলো পড়ে হিয়ার মন কেমন করে ওঠে।
সে বুঝে ফেলে, এ কেবল প্রেমিক হারানোর যন্ত্রণা নয়, এ এক প্রেমিকাকে হারানোর গল্পও, যে প্রতিটি মুহূর্তে নিজের অনুভূতির চাদরে সেই মানুষটাকে ঢেকে রেখেছে, তবু বাস্তবে স্পর্শ করতে পারেনি।
এই ব্যাকুলতা, এই তীব্র আকুতি। হিয়া গভীর মমতায় আউড়ে নেয়, যেন প্রকৃতির সেই তীব্র অনুভব তার নিজের বুকেও ঢেউ তোলে। ডায়রির প্রতিটি পৃষ্ঠা যেন হিয়ার কাছে একটা সময়চিত্র।
যেখানে প্রেমের রঙ মিশে গেছে রাজনীতির উত্তাপে, আর শূন্যতার এই দহন একটা জাতির জাগরণের মাঝে নিঃশব্দে ছায়া ফেলেছে এক নারীর হৃদয়ে।
হিয়ার চোখ তখন জলে চিকচিক করে। সে একটানা তাকিয়ে থাকে পাতাটার দিকে, যেখানে লেখা নেই ‘শেষ’ কথাটি, তবু যেন এক অনন্ত অপূর্ণতার ইঙ্গিত স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এ এক ব্যাকুল প্রেমিকার প্রেমিক কে খোঁজার আকুতি।
প্রকৃতি ছন্নছাড়া হয়ে রুশান মুহাম্মদকে খুঁজেছে প্রতিটি পৃষ্ঠায়, প্রতিটি শব্দে তার ছায়া খুঁজে ফিরেছে। হিয়া চোখ নামিয়ে পাতার দিকে তাকালো। একটা চাপা হাসি ঠোঁটের কোণে খেলল। কিন্তু সেই হাসি যেন শুধুই আনন্দের ছিল না, তাতে ছিল এক অভিমান, এক বেদনার কোমল রেখা।
কেন হিয়া হাসলো?
হয়তো সে বুঝে ফেলেছে, প্রেমে পড়ার মানেই হলো নিজেকে হারিয়ে ফেলা। হয়তো প্রকৃতির প্রথম প্রেমের প্রথম ভাঙনটুকু আজ হিয়ার নিজের বুকেও দোলা দিয়ে উঠেছে। সে যেন প্রকৃতির সেই অনুভূতিগুলো কেবল পড়ছে না, বরং নিজের মতো করে অনুভব করছে, বুকের গভীরে গেঁথে নিচ্ছে।
যন্ত্রণার এই দীর্ঘ প্রহর কেটে গেল মে মাসের ২ তারিখে। হঠাৎই হিয়ার দৃষ্টি আটকে গেল ডায়রির একটা পাতার ভাঁজে। সেখানে নিঃশব্দে লুকিয়ে আছে কিছু শুকনো কৃষ্ণচূড়ার পাতা-- রং হারানো, তবুও অদ্ভুতভাবে প্রাণবন্ত। হিয়া নরম হাতে ছুঁয়ে দেখলো পাতাগুলো, যেন এক টুকরো প্রকৃতিকে স্পর্শ করছে সে এক প্রেমিকাকে, যে তার ভালোবাসাকে কবিতার মতো সংরক্ষণ করেছে পাতার পর পাতা।
হিয়া শুনেছিল প্রেম মানে যত্ন। তবে যত্নের বর্ননা কি এই শুকনো ফুল গুলো? শুকিয়ে যাওয়া কৃষ্ণচূড়ার এই পাতা কি শুধু একটা গাছের ডালপালা থেকে ঝরে পড়া স্মৃতি? না, এগুলো আসলে এক অদৃশ্য খেয়াল, যা একদিন কেউ হাতে রেখে বলেছিল, “এইটা তোর জন্য।”
যা একদিন খুব যত্ন করে ডায়রির পাতার ফাঁকে রেখে দেওয়া হয়েছিল, যেন ভবিষ্যতের কেউ এসে পড়লে জানে। এখানে ছিল ভালোবাসা, এখানে ছিল প্রতীক্ষা, এবং এখানেই লুকিয়ে আছে সেই প্রেম, যা হাজারো শব্দের চেয়ে বেশি কিছু বলে এক টুকরো পাতা হয়ে।
হিয়ার চোখ ঝাপসা হয়ে আসে, তার বুকের ভেতর তখন এক আশ্চর্য ঘূর্ণি। একদিকে যেমন প্রকৃতির প্রেমিকা সত্তাকে বুঝতে পারছে, অন্যদিকে নিজের নিঃশব্দ চাওয়া-পাওয়ার সঙ্গে তুলনা করেও কষ্ট পাচ্ছে।
হিয়া পাতাগুলো একটুখানি গুছিয়ে রাখে, যেন আর ভেঙে না পড়ে। এই তো, প্রেম আসলে এমনই। শুকিয়ে যাওয়া পাতার মধ্যেও যে ভালোবাসার সবুজ রং আজীবন লেগে থাকে।
হিয়া ঠোঁটের মিষ্টি হাসি নিয়ে ফুল গুলোতে আবার হাত বুলায়। প্রকৃতি ঐ পাতায় লিখেছে,
“পৃথিবীর সব সুখ কি এক গভীর যন্ত্রণা দিয়ে আসে? সুখেরা কি সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছে, যে যন্ত্রণা না দিয়ে তারা ধরা দেবে না?
আজ সাত দিন পর রুশান বিশ্ববিদ্যালয়ে এসেছিল। ওকে খুন করতে মন চাইছিল আমার। কিন্তু হয়তো এই হারানোই এক পূর্ণতা আনার ছিল। রুশান আজ সারা বিশ্ববিদ্যালয়ের সবার সামনে আমাকে ভালবাসি বলেছে।
আমি কি এটাই চাইতাম?
ঈশ্বর কি আমার জন্য এটাই রেখেছিলেন?
কি সহজ স্বীকারোক্তি রুশানের। ‘আমি মুসলিম ঘরের ছেলে। সবাই যে আমাকে রামু কাকা বলে খেপায় এটা শুধুই মজা, আমার নাম নাম আব্দুর রুশান মোহাম্মদ। আমি জানি তোর আর আমার মাঝের দূরত্বের দেয়াল অনেক মজবুত। আমি শুধু মাত্র আমার মনের কথা জানালাম বাকি সব তোর উপর নির্ভর করে।’
আমি ওকে চিৎকার করে বলেছি, ‘তুই রামু বা রুশান যেই হোস, আমি আজ বাঁচাতে চাই, ভবিষ্যতে না।’
আমি সত্যিই বর্তমানে ভালো থাকতে চাই। দীপ্তি অনেক বুঝিয়েছে। এটা সম্ভব না। আমিও কি তা জানি না?
মানুষ হয়তো নিষিদ্ধ জিনিসের প্রতি গভীরভাবে আকৃষ্ট হয়। আমি যে মনের কাছে বাধ্য হয়ে আকৃষ্ট হচ্ছি।
তবে আমার প্রেম, আমার মনে ওর জন্য যত্নে রাখা আকুতি, কখনোই নিষিদ্ধ হতে পারে না।
সমাজ যতই নিষিদ্ধ রাখুক। বর্তমানে আমার কাছে এর থেকে বড় কোনো সত্যি নেই যে, আমি একটা মুসলমান ঘরের ছেলেকে আমার জীবনের সর্বস্য দিয়ে ভালোবাসি। আমি প্রচণ্ড ভালোবাসি।
আমি চাই বছর গড়িয়ে যাক। আজকের এই সতেজ কৃষ্ণচূড়া আমার এই প্রেম প্রনয়ের সাক্ষী থেকে যাক।”
হিয়ার চোখে কি জল এলো? এ কি প্রকৃতির সেদিনের চোখের উষ্ণতা?
হিয়া দীর্ঘ একটা নিঃশ্বাস ফেলে ডায়রির পাতাটা হাতে নিয়ে চাপা স্বরে বলল,
“দেখো প্রকৃতি...তোমার রেখে যাওয়া প্রেম-প্রণয়ের কৃষ্ণচূড়া আজও কেউ ঠিক তোমার মতো করেই আগলে রেখেছে। যুগ পেরিয়েও, কালের ধুলো জমলেও, তোমার সেই ভালোবাসার স্পর্শ এখনো রয়ে গেছে পাতায় পাতায়, পাতায় রাখা পাতায়।”
তার কণ্ঠে ছিল অদ্ভুত এক আবেগের ঘনতা, যেন সেই শব্দগুলো প্রকৃতির কাছে নয়, বরং তার নিজের হৃদয়ের গভীরে উচ্চারিত হচ্ছিল।ডায়রিটা ধীরে বন্ধ করে জানালার পাশে এসে দাঁড়াল হিয়া। রোড লাইটে দূরের কৃষ্ণচূড়ার ফুল গুলো স্পষ্ট। হিয়ার মনে হলো, ঐ সদ্য রাঙা কৃষ্ণচূড়া গুলো কি এই যুগান্তর পার করা কৃষ্ণচূড়াকে চেনে?
হিয়ার মনে হলো ঐ সদ্য ফোটা কৃষ্ণচূড়ার দল যেন চুপ করে তাকিয়ে আছে তার দিকে, যেন তারা জানে সবটা, যেন তারা চিনে ফেলে সেই পাতার ভাঁজে লুকোনো প্রেম, যা অনেক যুগ আগেও এক নারী রেখে গিয়েছিল নিঃশব্দ ভালোবাসার প্রতীক হয়ে।
তার দৃষ্টি কৃষ্ণচূড়ার দিকে স্থির, তারা হিয়ার প্রশ্নের জবাব দেয় না, তবে বাতাসে দুলে ওঠা একেকটা ফুল যেন উত্তর হয়ে ফিরে আসে। তারা জানে। তারা জানে প্রেম কখনো মরে না, সে রয়ে যায় কারো যত্নে রাখা পাতায়, কারো চোখে ওঠা জলকণায়, বা এমনই কোনো জানালার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা কারো নিঃশ্বাসে।
হিয়ার বুক জুড়ে তখন কেবল নিঃশব্দ ভালোবাসা, যা ভাষাহীন হয়ে উঠেও নিজের সব কথা বলে ফেলে। আর সে বুঝে যায়, কিছু ভালোবাসা শুধু মানুষে সীমাবদ্ধ থাকে না, তারা ছড়িয়ে পড়ে পাতায়, গন্ধে, বাতাসে, এমনকি গাছের পাতার মধ্যেও।
প্রেম বাতাসে মিশে গেল। যেন ধূপের মতো ধীরে ধীরে চারপাশে ছড়িয়ে পড়ল এক অদৃশ্য আবেশ। শীতল বসন্তের কোমলতা পেরিয়ে গেল, তারপর এল রুক্ষ গ্রীষ্ম, তারপর বর্ষার ভারী কুয়াশা ভেজা দিন, সব ঋতুই একে একে তাদের পালা শেষ করল। আর হিয়া, এই সব পেরিয়ে, ডায়রির পাতায় যেন ছুঁয়ে দেখল প্রকৃতি আর রুশানের নিঃশব্দ প্রেমের উত্তাপ। ছায়া আর আলোয় মোড়া একটা যাত্রা, যা শুরু হয়েছিল ১৯৬৯ সালের কোনো এক নিঃসঙ্গ দিনে, এগিয়ে এসে থামল ১৯৭০-এর ঘোরলাগা সন্ধ্যায়।
বছরের হিসেব বদলে গেল, ডায়রির কালি একটু ফিকে হয়ে এল, কিন্তু অনুভব? তা যেন আরো গাঢ় হয়ে উঠল হিয়ার হৃদয়ে। এতদিন ধরে জমে থাকা শব্দেরা এবার এক নতুন মোড়ে এসে দাঁড়াল। হঠাৎই ডায়রির ভাঁজে ভেসে উঠল একটা নাম, “রামু”
বেশ কয়েকদিনের যাত্রা শেষে সামনে এলো আব্দুর রুশান মোহাম্মদের রামু নামের আসল রহস্য। হিয়া অজান্তেই হাসলো।
প্রকৃতি লিখেছে, “মানুষ এখনো ভুতে কি করে ভয় পায়। রুশান কি বদ্ধ পাগল!
আরো বছর দুই আগের ঘটনা হবে। সেদিন ২১শে ফেব্রুয়ারির আগের রাত। রুশান ও তার বন্ধুরা ওদের কলেজের শহীদ মিনার সাজানোর কাজে ব্যস্ত ছিল। রাত গভীর হতে সবার মধ্যে এক ধরনের রহস্যময়তা কাজ করছিল। কাজের ফাঁকে কেউ একজন হঠাৎ বলে উঠল,
‘জানিস, আমাদের কলেজে এক সময় এক দারোয়ান ছিল, রামু কাকা। একদিন হুট করে মারা যান তিনি। তারপর থেকে, মাঝেমধ্যে গভীর রাতে কলেজের গেটে তাকে বসে থাকতে দেখেছে অনেকে।’
রুশান হেসে উড়িয়ে দিয়েছিল কথাটা। রুশানের দৃঢ়তা দেখেই দুষ্টু বুদ্ধি এসেছিল ওর বন্ধুদের মাথায়। কাজ শেষ হতে হতে রাত অনেক হয়ে গিয়েছিল।
সবাই বিদায় নিল, রুশানও বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিল।
কলেজের ফটকের কাছে এসে সে আচমকা থমকে দাঁড়াল। অন্ধকারের মধ্যে একটা ছায়ামূর্তি কালো চাদর মুড়িয়ে বসে আছে! হঠাৎ সেই ছায়াটি কর্কশ স্বরে বলল,
‘বাবা রুশান, একটু পানি খাওয়াবে?’
স্বরে এমন এক করুণ অনুরোধ ছিল যে রুশান দ্বিধা না করে পাশের কল থেকে এক গ্লাস পানি নিয়ে এগিয়ে দিল। সে নির্ভয় ভাবে জিজ্ঞেস করল, ‘কে আপনি?’
কালো চাদর ঢাকা সেই অবয়ব হঠাৎই বিকট হাসিতে ফেটে পড়ল। ঠান্ডা এক কণ্ঠে ছায়াটি বলল, ‘আমি রামু কাকা গো!’
ভয়ে রুশানের পা যেন শেকলে বাঁধা পড়ে গেল। শরীর অবশ হয়ে এল তার। কিন্তু পরমুহূর্তেই প্রবল আতঙ্কে সে দৌড়ে পালাল।
পরের তিন দিন রুশান প্রচণ্ড জ্বরে কাবু হয়ে শুয়ে ছিল। এরপর থেকে বন্ধুরা ওকে রামু কাকা বলেই রাগাতো। আর তখন থেকে এখন পর্যন্ত বেচারার নাম রামুতে পরিনত হবার পথে।”
হিয়া একটু সংকিত হলো। তার প্রতিক্রিয়া কি হওয়া উচিত? তার কি হাসা উচিত নাকি! সে একবার চোখ বন্ধ করে নিজেকে ধাতস্থ করলো। এরপর আবার পাতার পর পাতা বদলালো।
হিয়া’র সামনে শুধুমাত্র কিছু মানুষিক অক্ষরের মূর্তি নয়, বরং এক জীবন্ত স্মৃতির রেখাচিত্র। জীবনের রূপরেখা, যার প্রতিটি খণ্ডে আব্দুর রুশান মোহাম্মদের গল্পের অনুরণন। তবে, যেই পর্বটি এখন তার সামনে উন্মোচিত, তাতে কি এখনো কারো কোন পরিচয় বাকি? প্রকৃতি এবং রুশানের মূর্ত সত্যই যে এভাবে উঠে এসেছে এটাই যেন এক অদ্ভুত সিঁড়ি।
সত্তরের বসন্ত। এক শীতের আগমনী, যে আগমনী নতুন বছরকে হাতে তুলে দেয়, ঠিক তেমনি বসন্তের প্রথম বৃষ্টির আগমনীও ফিরিয়ে এনেছিল এক অন্য রূপের প্রেম।
১৭ ফেব্রুয়ারি, ১৯৭০।
প্রকৃতি লিখেছে, “কথায় আছে, বাড়ির কাছে তীর্থ থাকলে মানুষ ধর্মের পথে চলে না। আমারও তাই। হাঁটতে হাঁটতে বাড়ি থেকে বুড়িগঙ্গা নদী পর্যন্ত চলে যাওয়া যায়, কিন্তু সেই নদীর তীরে গিয়ে কখনো এভাবে যাওয়া হয়নি।
ক্লাস ফাঁকি দেয়ার সাহস কখনো পাইনি, অথচ আজ, আজ যেন আকাশের মতো ডানা মেলে উঠতে চাচ্ছিলাম। রুশান আমাকে নিয়ে গিয়েছিল বুড়িগঙ্গার তীরে, নৌকায় ভাসাতে। আমি যে সুখে অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছিলাম, তা কি বুঝতে পারছিলাম?
নদীর জল, বাতাস, আর চারপাশের প্রকৃতি যেন আমাদের ভালোবাসার গোপন সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। রুশান কখনোই আমার প্রশংসা করেনা।
এটা কি খুব স্বাভাবিক?
আচ্ছা আমাকে কি ওর সুন্দর মনে হয় না?
হতেই পারে!
হয়তো প্রেমিক পুরুষেরা নিজের নারীর প্রশংসা করতেই সবথেকে বেশি কৃপণতা করে। তবে রুশান বরাবরই অদ্ভুত এক আবেশে তাকায়। রুশান হয়তো জানে না ওর ঐ চোখের আবেশে আমি হারিয়ে যাই। বেশ কিছু সময় আজ আমাদের মাঝে নিরবতা ছিল। আর নিরবতা ভেঙেই রুশান আমার চোখে তাকিয়ে বললো, ‘প্রকৃতি, তুমি জানো, এই নদী আমাদের মতোই, কখনো শান্ত, কখনো উত্তাল, আবার কখনো অমীমাংসিত। তবে এতসব ভারী শব্দের মধ্যে প্রাপ্তি কি জানো, সুখ। তোমার চোখ নদীর থেকেও গভীর, তবে আমার নেশা তোমার এই কালো কাজলে’।
আমি বোধহয় থমকেছিলাম। শব্দচয়নে এতো গভীরতা কেন?
আমি আমার সব সাহিত্যের ভাষা হারিয়ে বসেছি যেন। আমি শুধু নদীর শীতল জলকে ছুঁয়ে ওর নজরের গভীরতা ছুয়েছি।
কি ছন্নছাড়া কথা তাই না? আমাদের কি আজ আবার প্রেম স্বীকারোক্তি করা উচিত ছিল?
রুশান শুধু বলেছে, ‘তোমার শরীরের একটা অদ্ভুত গন্ধ আছে। তীক্ষ্ণ ভাবে আঘাত করে আমার প্রেমিক মনকে।‘
আমিও বলেছি, ‘শুধু গন্ধ?’
রুশান কি অমায়িক হাসলো। তারপর, তার পকেট থেকে বের হলো একটা রুপোলি নুপুর। কি যত্নে পা ছুঁল আমার। হয়তো এই অলংকারটারই কমতি ছিল আজ।
এটা কি প্রথম প্রেমের প্রথম উপহার?
না...না... প্রথম উপহার তো নয়!”
পাতা ফুরালো। লেখাটাও শেষ। হিয়া একটা দীর্ঘশ্বাস নিলো। এবাড়ির এঘরের জানালা দিয়ে যে মাঠটা দেখা যায় এরপর কয়েক বাড়ি পেরোলেই হয়ত বুড়িগঙ্গা নদী। গত দুই বছর আগে যখন এ বাড়িতে এসেছিল তখন আব্দুর রুশান মোহাম্মদ তাকে নিয়ে গিয়েছিল। প্রকৃতির পাতায় তোলা অনুভূতির কাছে, হিয়ার সেই দেখা নদী যেন খুব শূন্য মনে হচ্ছে। আসলেই কি প্রেম কোন মায়া হয়?
হিয়ার কাছে হিসেব নেই জীবনে সে কতগুলো উপন্যাসের বই শেষ করেছে। কত রাত জেগে জেগে মায়ের বকা খেয়ে পর্যন্ত উপন্যাস পড়েছে। শেষবার যখন ‘শেষের কবিতা’ শেষ করল, কি আবেগ যে তাকে ঘিরে ধরেছিল!
তবে প্রকৃতির শব্দচয়নে এ কেমন অনুভূতি! বাস্তবতা কি নির্মম ভয়ংকর সুন্দর!
অনুভূতিগুলো আরো জমাট বাঁধলো, পাতার পর পাতা আবারও হিয়া বদলাতে লাগলো। অনুভূতি গাঢ় হল- প্রেম, অপেক্ষা, প্রাপ্তি।
হিয়া খোঁজ রাখলো, কবে কোন কোকিল প্রকৃতির জানালায় প্রেম ছড়ালো। প্রকৃতির গীতবিতান হারালো কেন। প্রকৃতির ছোট কাকার ছেলে স্বাত্ত্বকি বাবার হাতে কি নিয়ে মার খেলো। দিপ্তী কেন অভিমান করে দিন দুয়েক কথা বন্ধ রাখলো। তানপুরার তার কে ছিড়লো।
এগুলো হিয়ার কাছে বেশ অসাধারণ লাগলো। কেমন এক সাজানো গোছানো উপন্যাস।
তবে পাতা উল্টাতেই হিয়ার হাতে মাখলো ধুসর রঙের কিছু গুঁড়ো গুঁড়ো পাউডার।
তারিখ- ২৫ মার্চ ১৯৭০
হিয়ার মাথায় এলো না এই গুঁড়ো পদার্থ ডায়রির ভাঁজে কিভাবে এলো! ধারণা শুধু সামান্য সরিয়ে গুটি গুটি অক্ষরে লেখাগুলোকে পড়লো।
প্রকৃতি লিখেছে,- “এই রঙিন আবির যত্নে থাক। প্রতি বছর এখানে সময়ের সাথে রঙ ও জমাবো। আজকের দোল উৎসবে রুশানের আসা একদমই অপ্রত্যাশিত।
দোল তো প্রেমের উৎসব। আমার কৃষ্ণ তাই কি মনের টানে রঙ মাখাতে এলো? একটা দমকা হওয়ার মতোই এলো। চারপাশে হাজার শত মানুষ, অগণিত ভিড়ের মাঝে হাত টেনে এক অপ্রত্যাশিত প্রশ্ন, ‘প্রকৃতি ভালোবাসো আমায়?”
আমি যেন মহা সমুদ্রের মাঝে পড়লাম। এমন মুহূর্তে এমন প্রশ্ন! সমগ্র জগৎ যেন থেমে গেল এক পলকের জন্য। আমার পরিবার, আত্মীয়স্বজন, পরিচিত আর অপরিচিত মুখগুলোর ভিড়ে আমি গুটিয়ে গেলাম। আড়ষ্ট হয়ে, বুক ধুকপুক করতে করতে আমি মাথা নাড়লাম— ‘হুম’...
রুশান মুঠো ভর্তি আবির, আমার মুখে আস্তে আস্তে ছুঁইয়ে দিলো। কোনো কথা নয়, কোনো ব্যাখ্যা নয়। শুধু রঙ লাল, রক্তিম, আবেগভরা।
তারপর সে হেঁটে চলে গেলো, আর আমি দাঁড়িয়ে রইলাম স্তব্ধ, অপলক, কোনো এক ভালোবাসার পাগলামিতে বন্দি হয়ে।
এটাই কি ভালোবাসার পাগলামী?
এখনো আমার সমগ্র মুখে সে আবীর প্রেমের সোভা ছড়াচ্ছে। কিছু সোভা এই পাতায় ও ছড়াক। রক্তিম এ আবীর লেপ্টে থাক এক অপ্রত্যাশিত পাগলামীর নামে।”
হিয়ার ঠোঁট আবার প্রসারিত হলো। হাতে লেপ্টে থাকা ধূসর পদার্থ গুলো নাকের কাছে নিয়ে গন্ধ নেয়ার চেষ্টা চালালো। বেশ বিভৎস ময়লাটে গন্ধ হয়ে গেছে। সময় কি সুন্দর চক্রান্ত করে লাল আবীরের রং শুষে ধূসর রঙে ছেড়ে দিয়েছে।
আবারো বদলালো আকাশ। কেটে গেল মাস, বেশ কিছু অস্পষ্ট শব্দে আটকে গেল হিয়া। গল্প আগাচ্ছে তার নিজ গতিতে। প্রকৃতি যেন হিয়ার মাঝে এক নতুন জীবন নিয়ে বসবাস শুরু করল। হিয়া খানিকটা অস্বস্তিতে পড়ে গেল। বুকের ভেতর হালকা দোল খেতে লাগল চিন্তার ঢেউ। তার প্রতিক্রিয়া কী হওয়া উচিত—সে বুঝে উঠতে পারল না। একপাশে একরাশ বিস্ময়, অন্যপাশে এক বিনীত লজ্জা। তার কি মৃদু হাসতে হবে? না কি গম্ভীর হতে হবে? সে যেন নিজেকেই খুঁজে পাচ্ছে না এক মুহূর্তে।
চোখের পাতা দু’টো ধীরে নামিয়ে আনলো হিয়া।
চোখ বন্ধ করে নিঃশ্বাস ফেললো এক গভীর শান্তিতে। বাইরের কোলাহল থেকে নিজেকে একটু গুটিয়ে নিল সে, ভেতরের হাওয়াটাকে স্থির করল যেন।
মনে মনে বলল, “ধীরে হিয়া, অনুভব করো প্রতিক্রিয়ারও তো একটা হৃদয় আছে।”
চোখ খুলল সে, এক নতুন স্বচ্ছতায়। চোখেমুখে এখন আর সংকোচ নয়, একটা বোঝাপড়া, এক চিমটি সংবেদনশীলতা, আর এক বিনয়ী আত্মস্থতা।
এরপর শুরু হলো অরাজকতার এক দীর্ঘ, গা ছমছমে অধ্যায়। দেশ যেন বারুদের স্তূপে দাঁড়িয়ে আছে। চারপাশে আগুন, ধোঁয়া, ধ্বংস আর মৃত্যুর বিভীষিকা। রাস্তায় রক্তের দাগ,
ঘরের ভেতরেও আতঙ্কের ছায়া।নির্বাচনের নামে চলছে প্রতারণার খেলা, রাজনীতির রঙে রাঙা হয়ে যাচ্ছে মানুষের বিশ্বাস।
এই কোলাহলের মাঝেও হিয়ার মনে চলছিল এক অন্য রকম ঝড় প্রকৃতির অনুভব, তার অক্ষরে গাঁথা প্রেম, তার অপূর্ণ অপেক্ষা, আর আব্দুর রুশান মোহাম্মদের রহস্যে ঘেরা যাত্রা।
ডায়রির পাতায় পাতায় আঁকা ছিল সেই অশান্ত সময়ের ছায়াপট, যেখানে ব্যক্তিগত প্রেম মিশে গেছে জাতির ইতিহাসের ধারায়।
হঠাৎ করেই ফজরের আজানের ধ্বনি ভেসে এল জানালার ফাঁক গলে। আলো আসেনি তখনও, কিন্তু সেই মধুর সুরে যেন হিয়ার নিদ্রাহীন চোখে ফিরল হুশ। সে অবাক হয়ে তাকাল চারপাশে।
রাতটা কোথায় গেল? কিভাবে এত দ্রুত কেটে গেলো পুরোটা?
হিয়ার মনে হলো,
“প্রকৃতি কি কেবল এক নারী? নাকি এক যাদুকরী মায়া?”
একটি ডায়রি, একটুকরো অক্ষর, কীভাবে এতটা সময় তাকে ঘিরে রাখলো! একটানা রাতভর পড়ে যাওয়া, কখনো চোখে জল, কখনো ঠোঁটে মুচকি হাসি। তবুও ক্লান্তি নেই, বিরক্তি নেই, ছিল কেবল এক নিবিষ্ট মুগ্ধতা।
হিয়া থামেনি। পাতার পর পাতা উল্টে চলেছে সে,
কখন যে ৭০-এর পাতাগুলো পার হয়ে গেছে সে নিজেই টের পায়নি। প্রতিটি লাইন যেন তাকে টেনে নিয়ে গেছে এক অদৃশ্য সময়-গহ্বরে, যেখানে প্রেম, দেশপ্রেম, প্রতিবাদ, হারিয়ে যাওয়া, সব মিশে আছে এক অনন্য কাব্যিকতায়।
আর তখনই হিয়া বুঝল, এ শুধু ইতিহাস নয়, এ এক হৃদয়ের আন্দোলন। যেখানে প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি রেখা একটি সময়ের সাক্ষ্য, একটি প্রেমের শপথ, একটি নারীর নিঃশব্দ প্রতিজ্ঞা।
সেই পৃষ্ঠাগুলোর গন্ধে, রঙে, শব্দে হিয়া আবিষ্কার করল নিজেকেও এক নতুন চোখে, এক নতুন হৃদয়ে।
এভাবে সূর্য ওঠার আগেই, ডায়রির আলোয় তার ভেতরের রাতও শেষ হয়ে এল।
শীতের প্রথম প্রহর এলো প্রেমের এক অন্তিম পর্ব নিয়ে। দেশের গুমড় অবস্থা ১৯৭১ এর জানুয়ারির ৩১ তারিখ রবিবার শুক্লপক্ষের পঞ্চমী তিথিতে সরস্বতী দেবীর আগমনী। বিশ্ববিদ্যালয় সেজে উঠলো দেবী আগমনীতে।
বাসন্তী শাড়িতে যে নারী মূর্তিকে রুশান দেখেছিল সে এখন হিয়ার চোখের সামনে স্পষ্ট। যার মোটা বিনুনি কোমড় ছেয়ে গেছে। কপালের মাঝ বরাবর একটা কালো নজর টিকা। শুকনো গড়নের লক্ষ্মী প্রতিমার মতো দেখতে মুখশ্রী। চোখের ঘন পাপড়ি কোন চিত্রকারের ব্যক্তিগত শিল্প।
হিয়া হাসলো। না তার হিংসে হচ্ছে না। আসলেও সৃষ্টি কর্তার কি সুন্দর সৃষ্টি এই প্রকৃতি।
প্রকৃতি লিখেছে, “আজ সরস্বতী পুজোর সমগ্র সাঁজ টাই রুশানের জন্য। ইচ্ছে ছিল নিজেই শাড়ি পড়ে বের হব। তবে প্রাচী খুব জেদ করেছে, আজকে নাকি সে আমাকে শাড়ি পরিয়ে দেবে। ছোট মানুষ, নতুন নতুন শাড়ি পড়া শিখেছে।
কি করে আটকাই তার জেদ?
তবে আজ মন মতো সেজেছি। কপালের মাঝ বরাবর একটা কালো টিপ নিয়েছি। চোখ ভত্তি কাজল নিয়েছি, রুশানের খুব প্রিয় আমার এই কালো চোখে ভরে ভরে কাজল দেওয়া। চুলটাকে আর কি করি? বেনুনি না করেও পারছিলাম না!
অন্য কোন ভাবে চুল ভালোই লাগে না যে আমাকে।
স্বার্ত্ত্বকি আমাকে দেখেই বলছিল-’দি’ভাই তোকে তো একদম নায়িকাদের মত লাগছে।’
তবে ওসব কেন আমি হতে যাবো? আমি প্রকৃতিই ঠিক আছি।
সেজেগুজে এতো সময় অপেক্ষা করা যায়?
দীপ্তি রানী এখনো এসে পৌঁছায় নি। ঠাকুর জানে কি তৈরিটাই না হচ্ছে।
সময় চলে যাচ্ছে যে!”
হিয়া শেষ লাইনটা আবার আউড়ে নিলো। “সময় চলে যাচ্ছে যে।”
পৃষ্ঠা উল্টাতেই ফিরে আসার ঘটনা যে ঘটনা হিয়া জানে। এটাই তো! সেই দিন যেদিন প্রকৃতির শাড়ির ছ’টা কুঁচি রুশান মোহাম্মদ নিজ হাতে ঠিক করে দিয়েছিলেন। হিয়া হাসলো।
প্রকৃতি লিখেছে, “পৃথিবীর সব থেকে সুন্দরতম দিন কি সবথেকে জঘন্যতম কুৎসিত রাত নিয়ে আসে?
আজকের দিনটা কত রঙিন ছিল! রুশান আর আমি জীবনে সবথেকে সুন্দরতম সময় একটা সময় কাটিয়েছি আজ।
প্রত্যেকটা নারীর সব থেকে বড় সৌভাগ্য হয়তো একজন যত্নশীল ও দায়িত্ববান পুরুষ পাওয়া।
রুশান একজন আদর্শ যত্নশীল আর দায়িত্ববান পুরুষ। কি পরম যত্নে সব অগোছালোকে গুছিয়ে নেয় সে।
আমার মত অগোছালো একটা মানুষকে যত্নে আদর করে গুছিয়ে নেয়।
কিন্তু প্রফেসর আজম স্যার কি কাজটা ঠিক করেছেন?
কি দরকার ছিল বাড়িতে এসে এতগুলো কথা বলার?
বাবা আর দাদা’ভাইকে আমি বোঝাতে পারলাম না কোনভাবেই।
আমি তো তাদের সন্তান। আমার থেকে কি বাইরে একজন তৃতীয় ব্যক্তির বলা কথায় বেশি ওজন?
বাবা তো মুখের উপর বলে দিলো অনেক পড়াশোনা হয়েছে আর না থাকো গৃহবন্দী।
গৃহবন্দী!
আমার ভালোবাসার শেষ পরিণতি কি গৃহবন্দী হবে?”
হিয়ার চোখে তখনো আবেগের দীপ্তি। যেন চোখের পাতায় জমে আছে এক শতাব্দীর গল্প। তার চাউনি ঝিমিয়ে পড়া আগুনের মতো, গভীর, আলো মাখা।
পাশ থেকে ধীরে ধীরে নড়ে উঠলো পিউ। তার চোখে এখনো ঘুমের কুয়াশা। বিছানার এক কোণে উঠে বসে খানিকটা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল,
"আপি... তুই সারা রাত ঘুমাস নি?"
হিয়ার ধ্যান ছিন্ন হলো। যেন শব্দে শব্দে জড়ানো এক জাদু ভেঙে পড়লো বাস্তবতার জগতে।
বালিশের নিচে রাখা ফোনটা বের করে একবার চোখ বুলিয়ে নিলো, ৮টা ৪৫ বাজে। বাহিরে সকাল পেরিয়ে যাচ্ছে, অথচ হিয়ার মনে হয় যেন রাত এখনও শেষ হয়নি।
আজকের সময় কোথায় গেলো!!!
সে ধীরে ডায়রির পাতাগুলো বন্ধ করল, যেখানে ভালোবাসা রঙ ছড়িয়েছে নিঃশব্দে, ব্যথা মেখেছে নিঃশ্বাসে। সেই ডায়রিটা সযত্নে রেখে দিল সাইড টেবিলের উপর।
চোখে একরাশ ক্লান্তি, কিন্তু ঠোঁটে মৃদু এক হাসি, বলল,
“ঘুম... আসেনি পিউ।
প্রেমের কিছু রাত থাকে, না ঘুমানোর জন্য। আজ ঠিক সেরকম একটা রাত কেটে গেল প্রেম, প্রতীক্ষা আর পুরনো শব্দে রাঙানো।
পিউ কিছু বলল না। চুপচাপ তাকিয়ে থাকলো হিয়ার দিকে যেন সে নিজেই এক জীবন্ত উপন্যাস।
পিউ এবার পুরোপুরি উঠে বসল। চোখ বড় বড় করে হিয়ার মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, “আপি তুই কাঁদছিলি?”
হিয়া মুখ ফিরিয়ে নিলো, গলায় একটা বিরক্তির সুর এনে বলল, “বোকার মত কথা বলিস না। সারারাত ঘুমাইনি চোখ দিয়ে এমনি পানি পড়ছিল।”
তবু চোখের কোণায় জমে থাকা সেই জলরেখা পিউ ঠিকই দেখে ফেললো। হিয়ার কণ্ঠে যতই দৃঢ়তা থাকুক, সে কি পিউর চোখ এড়াতে পারল?
ঠিক বোঝা গেল না পিউ বিশ্বাস করলো কি না।
তবে প্রশ্ন থামলো না।
পিউ এবার একটু দুঃসাহস নিয়ে জানতে চাইল, “ডায়রিটা কার আপি? তুই কি পুরোটা পড়েছিস?”
হিয়ার চোখে এক মুহূর্তের চুপচাপ ঢেউ খেলে গেল। ডায়রির পাতায় যা লেখা, তা তো কেবল শব্দ নয়। তা এক নারীর জীবনের অলিখিত প্রেমকাব্য, তার অন্তরের নিঃশব্দ উচ্চারণ,
তার রুশানের জন্য আগলে রাখা এক-একটি মৌনতাপূর্ণ আর্তি।
পিউ এমনিতেই প্রকৃতি নামের মালা জপেছে সারা বছর। আর যদি কোনোভাবে সে জানতে পারে এই ডায়রিটা প্রকৃতির… তাহলে তো সত্যিই আনন্দের আতিশয্যে মসজিদের মাইকেও উঠে যাবে খুশির ঘোষণা দিতে!
“সাবধান, এলাকাবাসী! প্রকৃতির ডায়রি পাওয়া গেছে!”
হিয়া একটুখানি হেসে ফেলল ভেতরে ভেতরে।
হিয়া একটু ভাবলো। তারপর বললো, “এটা অযথা আজগুবি কথা বার্তা লেখা জিনিস পত্র। কোন ছোট বাচ্চা কাচ্চার হবে।”
কণ্ঠের স্বরটা ছিল নিরাসক্ত, কিন্তু চোখের গভীরে কিছু একটা খেলা করছিল। পিউ হয়তো বুঝে গেল হিয়া ইচ্ছে করেই এড়িয়ে যাচ্ছে। তাই আর জোর করল না। চুপচাপ থাকলো, যেন হিয়ার সেই না-বলা কথার প্রতি এক ধরনের সম্মান দেখাল। হিয়া নিজের মুখের কথাগুলো মনে করে একটু হেসে ফেলল। সে জানে এ কথা কতটা মিথ্যে। এই ডায়রির প্রতিটি শব্দ যে কতটা পরিণত, কতটা আবেগমথিত, তা কেবল তার হৃদয় জানে।
তবুও, নিজের মনকে প্রবোধ দেওয়ার জন্য এমন একটা যুক্তি দিতে হয়, যেন আবেগের অতলে নিজেকে আর না ফেলতে হয়। ধীরে ধীরে সে ডায়রিটা তুলে নিয়ে সাইড টেবিলের ড্রয়ারে রেখে দিলো। আড়াল করলো, যেমন কেউ খুব গোপন কিছু বুকে রেখে দেয়। দেখা যায় না, কিন্তু ফেলে দিতেও পারে না।
হিয়ার মনে হলো, এখন আর এই পাতাগুলো পড়ার মতো অবস্থা নেই তার। ডায়রির প্রতিটি পংক্তি যেন একেকটা ডুবে যাওয়া রাত আর সেই রাতে সে একাই সাঁতার কাটে। তাই সকালটা মিটে গেলে, পৃথিবী যখন আবার স্তব্ধ হয়ে পড়বে,
তখনই সে ফিরবে ডায়রির কাছে একান্ত নিঃসঙ্গতা আর নিঃশব্দ ভালোবাসায়।
চলবে.....❤️