নির্বাসিত কৃষ্ণচূড়া — পর্ব ২৯

লেখক: সাদিয়া তিন্তি · বিভাগ: রহস্য · পর্ব ২৯ · ৪৭ পর্বের মধ্যে ২৯

ঘরের বাইরে তখন সন্ধ্যা এসে জানালায় বসে পড়েছে। চুপচাপ। ঠিক যেমন তাদের কথার ভেতর জমে থাকা অজস্র না বলা গল্পগুলো। তূর্য ধীরে পা ফেলে নিজের ঘরের দিকে আসে। করিডোরটা নির্জন, নিঃশব্দে ঢেউ খেলে যায় বাতাসে। জানালার কাচে তখন সন্ধ্যার হালকা আলো, যেন এক অদৃশ্য চিঠির মতো ঝুলে আছে আকাশের কোণে।

ঘরের ভেতর ঢুকতেই তূর্যর চোখ যায় টেবিলের ওপর রাখা ফোনটার দিকে। চার্জার লাইন জড়িয়ে আছে। সে ফোনটা হাতে নিতেই ফোনের লক স্ক্রিনের উপর ভেসে ওঠে হিয়ার দুটো মিসকল। লক খুলে ফোনটার ভিতরে যেতেই স্ক্রিনের আলোয় তার চোখে পড়ে অপরিকল্পিত, অথচ অসম্ভবভাবে অনুভূতি জড়ানো গভীর মেসেজটা। মেসেজটি সেই দুপুরের শেষ ভাগেই হিয়ার কাছে পৌঁছে গেছে।

তূর্যর শরীরটা থমকে দাঁড়ায়। হৃদপিণ্ড যেন হঠাৎ করে এক বিট থেমে যায়। সে কপালে হাত রাখে। আঙুল বেয়ে থেমে থাকা ঘাম যেন সরে আসে নিঃশব্দে। সে চাইতো না, এই মেসেজটা চলে যাক... অন্তত এখন না, অন্তত এভাবে না।

তবে.. সে লিখেছিল কেন....?

হিয়া সাধারণত কল করে না। সে কল করার সাহস করেছে এটাই যেন বিশাল ব্যপার। তবে তূর্যর ভিতরটা টানটান হতে থাকে, একটা দোটানায়। সে বিছানার ধারে এসে বসে। একহাতে ফোনটা ধরে রাখে, আর অন্য হাতে মুখ ঢেকে ফেলে। ঘরের বাতাস ভার হয়ে উঠেছে। কোনো দিকেই ঠিকঠাক নিঃশ্বাস চলে না। তার মনের মধ্যে এখন চলছে একটা অদ্ভুত দ্বন্দ্ব, এটা কি একটা ভুল ছিল? নাকি একটা দীর্ঘদিন লুকিয়ে থাকা সত্যের অসাবধান স্বীকারোক্তি?

তূর্য অনেকক্ষণ মাথা নিচু করে বসে থাকে। তারপর যেন অদৃশ্য কারো ধাক্কায় উঠে আসে আঙুল, খুলে ফেলে মেসেজ অপশন। কীবোর্ডে হাত রাখতেই শব্দেরা জড়সড় হয়ে আসে, কিন্তু অবশেষে টাইপ করে ফেলে, "কল করেছিলি?"

একটু দেরি হয়। তূর্যর বুকের মধ্যে দুরুদুরু শব্দ বাজে। ঠিক তখনই স্ক্রিনে ভেসে ওঠে হিয়ার রিপ্লাই, "হ্যাঁ... আসলে আপনার দেয়া মেসেজের অর্থ বোঝার ছিল।"

তূর্য চুপ করে বসে থাকে কিছুক্ষণ। ভ্রু কুঁচকে তাকায় স্ক্রিনে। ভেতরের অস্থিরতা ঢেকে রেখে সে টাইপ করে, "ওসব এমনিতেই লিখেছি হিয়া। একঘেয়েমি থেকে। অত কিছু নয়... এতো গভীর কিছু না।"

একটা দীর্ঘ মিনিট পেরিয়ে যায়। তারপর হিয়ার রিপ্লাই আসে, "আপনি কি জানেন, আপনি আকাশের মেঘদলদের মত।

মনে হয় এই তো, আর একটু উঁচুতেই ছুঁয়ে ফেলা যাবে মেঘটাকে। তবে সবই অলিক কল্পনা... ছুঁতে গিয়েই টের পাই মেঘ ছিল না, ছিল শুধু হাওয়া।"

তূর্যর ঠোঁটের কোণে এক অদ্ভুত হাসি জন্ম নেয়। অল্প বিষণ্ণ, আবার খানিক আলোও যেন মিশে আছে তাতে। সে টাইপ করে, "তোর কাজলে মোড়ানো চোখের মতো তোর কথাগুলোও ভয়ংকর। ঠিক যেন গাঢ় কোনো অন্ধকার, যা আলো নিয়েও নিঃশব্দে গিলে ফেলে।"

মেসেজটা পাঠানোর সঙ্গে সঙ্গে একটা দীর্ঘ নীরবতা নেমে আসে স্ক্রিনে। দূর থেকে বোধহয় কোনো উত্তর আসবে না আর। হিয়ার যেন শব্দ হারিয়ে গেছে। স্তব্ধ। বেশ কিছু সময় পর হিয়ার রিপ্লে আসে, “তাহলে আপনার একাকিত্বের মাঝে অবাধে বিচরণ করছে আমার এই ভয়ংকর চোখ?”

তূর্য একটু তব্দা খায়। যেন নিজেই জড়িয়েছে নিজের কথার জালে। সে এবার কথা পাল্টে লেখে, “কাল বাড়ি ফিরবো। তোর তুহুরাকে চিঠি দেয়া সেই অপরিচিত শঙ্খের ঠিকানা পেয়েছি।”

হিয়ার রিপ্লাইটা আসতে খানিক দেরি হয়, কিন্তু তা যেন নিঃশব্দে তূর্যর ভেতরে এক চোরা ঢেউ বইয়ে দেয়। সে লিখেছে, “সত্যি পেয়েছেন? পুরো ঠিকানা?”

মেসেজটার শেষে যেন একটা না দেখা বিস্ময়ের চিহ্ন টের পাওয়া যায়। তূর্য এবার আর দেরি করে না। সে আঙুল ছুঁইয়ে টাইপ করে ফেলে, “হ্যাঁ, পুরো ঠিকানাটা। চিঠিটা থেকেই উদ্ধার হয়েছে।”

হিয়া সামান্য দেরিও না করে লেখে, “এখন কী করবেন আপনি? কলকাতায় যাবেন?”

স্ক্রিন জ্বলজ্বল করে ওঠে উত্তরের জন্য। তূর্য মুচকি হাসে। নিজের অজান্তেই। তারপর সে লিখে, “যাওয়া তো সম্ভব নয়। দেখা যাক কি করা যায়। তোকে জানাবো‌।"

স্ক্রিনের ওপারে তখন দীর্ঘ এক নিস্তব্ধতা। কোনো প্রতিক্রিয়া নেই তৎক্ষণাৎ, কিন্তু তূর্য জানে হিয়া পড়ছে, ভাবছে, আর হয়তো একটু বিষণ্ণতা চেপে রাখা হাসিতে রূপ দিচ্ছে। এরপর আর কোনো নতুন বার্তা আসে না। কথোপকথন নিঃশব্দেই শেষ হয়।

ঘরের বাইরে রাত নামতে থাকে চুপিসারে। জানালার ফাঁক দিয়ে চাঁদের আলো পড়ে তূর্যর ঘুমে ডুবে থাকা চোখে। একটা নিঃশব্দ রাত, অনেক কথার ভেতর দিয়ে জমে ওঠে। শহর ঘুমিয়ে পড়ে।

সকালটা ঠিকঠাক আলো ফোটানোর আগেই ফজরের শেষ মুহূর্তে তূর্য বিদায় নেয় আব্দুর রুশান মোহাম্মদের বাড়ি থেকে। যাত্রাটা লম্বা, আর তাকে যেতেই হবে, সে ফিরেছে তার শহরে। তার ক্লাস চলছে, বর্ষপঞ্জি এগিয়ে যাচ্ছে নিঃশব্দে। কিন্তু সে তো সব ফেলে, সব থেকে ছুটি নিয়েই ঢাকায় ছুটে এসেছিল, শুধু রহস্যের সন্ধানে। তবুও খালি হাতে নয়, ফিরছে কিছু সমাধান নিয়ে।

সময় গড়িয়ে চলে, এ রহস্যের ঠিকানার খোঁজে তূর্য যতই এগোয়, ততই এক অদ্ভুত অন্ধকারে গা ডুবিয়ে ফেলে সত্য। এ যেন পূর্ব পরিকল্পিত লুকোচুরি। নেহালের চেষ্টাও থেমে নেই, পুরোনো কলকাতার মানচিত্র, স্থানীয় লোক খোঁজা, এমনকি স্থানীয় দালাল ধরে পর্যন্ত খোঁজ চালানোর চেষ্টা করেছে। কিন্তু সবটাই যেন কুয়াশার ভিতর হাতড়ে বেড়ানোর মতো। সব থেকেও যেন কিছুই নেই। সব যেন সময়ের কাল কুঠুরিতে আটকে গেছে নিষিদ্ধ নিয়মে।

তবুও… তূর্য হাল ছাড়ে না। নিয়ম করে গুটি কয়েক চিঠি পাঠায় ওই ঠিকানায়। পৌঁছায় কি না, সে জানে না। তবে চিঠির সংখ্যা বাড়তে থাকে। সময় পেরোতে থাকে। দিন যায়। তিন দিন, সাত দিন, দশ দিন… কোনো চিঠি ফেরে না। কোনো অচেনা নম্বর ফোন দেয় না। সব যেন শান্ত, স্বাভাবিক।

এই সময়ের তোলপাড়ে জীবন কোথাও থেমে থাকে না। হিয়া আর মিম, দু’জনই ঢুকে পড়েছে এক ভিন্ন যুদ্ধক্ষেত্রে। ভর্তি পরীক্ষা। রুটিনে বাঁধা সকাল, বিছানায় ছড়িয়ে থাকা বই,

মাথায় এলোমেলো চুল গোঁজা, চোখের নিচে ক্লান্তির ছাপ, আর ক্যালেন্ডারে মার্ক করা পরীক্ষার দিন। দুজনেই নিজস্ব ব্যারিকেডে নিজেদের মতো যুদ্ধ লড়ছে। সবার দূরত্ব বেড়েছে। যে যার জায়গা থেকে নিখোঁজ। মস্তিষ্কের প্রশ্নের খাতায় ধুলো জমেছে।

সময় নিঃশব্দে পায়ের আঙুলে হেঁটে যায়। জৈষ্ঠ্যের ছোঁয়া শহরজুড়ে নতুন গন্ধ এনে দেয়, আর সকাল গুলো অচেনা আশ্বাসে ভরে ওঠে। রুটিনে বাঁধা সকালগুলো এখন আর আগের মতো নয়, চোখের নিচের কালি আছে, কিন্তু সেখানে ক্লান্তির চেয়েও বেশি জেগে থাকে প্রতীক্ষা।

দিন পেরোয়। ঘুমহীন রাতের ঘাম, অসমাপ্ত নোট, কাগজে লেখা আত্মবিশ্বাস আর ভয় মিশ্রিত উত্তর... সবকিছুর শেষে একদিন সেই মোড় আসে, যেখানে প্রশ্নপত্র জমা দেওয়া হাতদুটো হঠাৎ হালকা হয়ে যায়। আর এক নতুন অজানা শূন্যতা এসে ঘিরে ধরে তাদের। হিয়া আর মিমের ভর্তি পরীক্ষার যুদ্ধের শেষ দাগ কাটে। ভয়, সঙ্কা আর চোখ ভরা স্বপ্ন নিয়ে সময় ফুরোয়। পরীক্ষা শেষ, পড়ে থাকে ফলাফল।

আর তারপর... যেন স্বপ্ন ছুঁয়ে ফেলে তাদের। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নামটা এখন স্বপ্ন কিংবা আকাঙ্ক্ষা থেকে বেরিয়ে হয়ে ওঠে ভবিষ্যতের ঠিকানা। হিয়া আর মিমের আলাদা বিভাগে ঠাঁই হলেও সুখ এটাই যে গন্তব্য একই চৌকাঠ।

ফলাফল প্রকাশের সাথে সাথেই যেন একটা ছোটখাটো উৎসব হয়ে ওঠে। ঘরে ঘরে ছড়িয়ে পড়ে আনন্দের ঢেউ। হিয়ার বাবা দাদা নিজেরাও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাএ। তাদের খুশিটা যেন নষ্টালজিয়ার সাথে মিলে মিশে একাকার হয়ে ওঠে। আব্দুর রুশান মোহাম্মদ নিজে ভিডিও কলে যুক্ত হন এই খুশিতে। তিনি জানেন, হিয়া নিজের জিদে জয় করেছে এই স্থান। ওর মনে এই অতীত আকর্ষণের প্রতি শুদ্ধতম অনুভূতিই ওকে এ শক্তি দিয়েছে।

এদিকে মিমের বাড়িতেও উল্লাস। তাদের কাছে এ যেন অসম্ভব কিছু যা মিম সম্ভব করেছে। মিম বরাবর বড্ড ফাঁকিবাজ তার ইন্টারের রেজাল্টের হালও সোচনীয়। তাই বাড়ির মানুষ তেমন আশা রাখেনি। কিন্তু মেয়ে যেন শেষ দানে কিস্তিমাত দিয়ে হাজির। তার বাড়িতে এখন এই উৎসব চলছে পুরোদমে। বাবা চাচা দিয়ে ঘর বোঝাই। এ যেন যুদ্ধ জয় করে ফেরা সৈনিক।

সব যেন স্বপ্ন পূরণের আয়োজনে জিতে যাওয়ার উল্লাস। তবু এর মাঝে একটা নিরব, অনুচ্চারিত শূন্যতা থেকে যায় হিয়ার ভেতরে। তূর্যের সাথে বিগত একমাসে কোনো কথা হয়নি তার। তূর্য অবশ্য চরম পর্যায়ের রুক্ষতা রেখেছে। ভর্তি পরীক্ষার আগে কোন রকম যোগাযোগের অনুমতি সে দেয় নি। হিয়ার মনের ছোট একাংশ হয়তো তার এই জয়ের ভাগিদার তূর্যকেও করছে।

তবে তূর্য যেন জানতো হিয়া চান্স পেয়েই যাবে। হিয়ার মস্তিষ্কে অবাধে ঘুরতে থাকে তূর্যের বলা সেই শেষ কথাটা, "রেজাল্টের দিন উপহার পেয়ে যাবি, আপাতত আমার উপহার আমাকে আর কল বা মেসেজ করবি না। শুধু পড়তে থাক। আমি আছি।"

হিয়া আনমনে হাসে। তার ফোনটা অনেকটা দূরে। অন্তর্গত শব্দেরা চুপ। তবুও চান্স পাওয়ার খবরটা কেমন করে যেন প্রথমেই তূর্যকেই বলতে ইচ্ছে করে। সে ফোনটা তুলে নেয়। মেসেজ অপশন খুলে টাইপ করে, “রেজাল্ট এসেছে। চান্স হয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে।”

একটা দীর্ঘ মুহূর্ত… তারপর তূর্যর রিপ্লাই আসে, “জানি।”

তারপর আরেকটা, “খুশি এখন?”

হিয়ার চোখ জলের মতো ভিজে ওঠে, সে উত্তর দেয়, “খুব খুশি।”

তারপর কিছুক্ষণ চুপচাপ প্রহর কাটিয়ে তূর্যর রিপ্লে আসে, “ঠিক দুপুর ২টায় একটা পার্সেল যাবে। ওটা তোর চান্স পাওয়ার উপলক্ষে গিফট।

পছন্দ হলে জানাস।”

হিয়া থমকে যায়। তার বুকের ভেতরটা কেমন যেন মোচড় দিয়ে ওঠে। সে ঘড়ির দিকে তাকায়। দুইটা বাজতে বাকি পনেরো মিনিট। হিয়ার হৃদয়জুড়ে এক অদ্ভুত কৌতূহল, একচিলতে আলো, আর এক ছায়া জমে ওঠে। এতো জলদি গিফট? সেই রাজশাহীতে বসে এই ফরিদপুরে সে এতো দ্রুত গিফট ম্যানেজ করলোই বা কিভাবে! তাহলে কি সে আগে থেকেই প্রিডিকশন করে রেখেছিল?

এই মুহূর্তেই এক প্লেট মিষ্টি খেতে খেতে পিউ রুমে প্রবেশ করলো। পিউ কিছুক্ষণ হিয়াকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলো। হিয়া তারা দুই হাত দিয়ে নিজের ফোনটা চেপে ধরে বিছানার একটা কোনায় বসে আছে। হিয়া নিজের ভাবনায় এতটাই মগ্ন যে পিউ এখানে এসেছে সেটা হিয়া বুঝতেই পারেনি। পিউ হিয়ার খুব কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করে, “কে আপনি তুই কি ধ্যান করছিস?”

হিয়া চোখ ছোট করে তাকিয়ে বলে, “ধ্যান কেন করবো। একটা গিফট আসবে, মানে পার্সেল। তার অপেক্ষা করছি।”

পিউ বড় বড় চোখ করে বললো, “ইস তোরই তো ঈদ চলছে, সবাই তোকে গিফট দিচ্ছে। জানিস আব্বুও মা'কে বলছিল, তোকে নিয়ে যাতে মার্কেটে যায়। তোর যা মন চায় সেটা কিনে দেয় যেন মা। ইস তোর মত এরকম দিন আমার যে কবে আসবে!”

হিয়া হাসে। পিউ জিজ্ঞেস করে, “কিন্তু গিফট টা কে দিচ্ছে? আর কি পাঠাচ্ছে?”

হিয়া কিছু বলতে যাবে তার আগেই দরজায় কলিংবেলের আওয়াজ। হিয়া অবাক হয়ে পিউর দিকে তাকায়। বাড়ি ভর্তি মানুষ। হিয়া জানে না পার্সেলের উপর কোন নাম লেখা কি-না। এতো মানুষের ভিড়ে অন্য কেউ দরজা খুলুক এটাও সে চায় না। সে খুব অস্থির হয়ে এগিয়ে যায় দরজার দিকে, হিয়ার এ অস্থিরতা দেখে পিউও হিয়ার পিছে ছুটে যায়। বসার ঘরে বাবা, দাদা, চাচা সকলে একসাথে আড্ডা রত। হিয়ান গতকালই বাড়িতে ফিরেছে বোনের রেজাল্ট দেবে তাই। সেও ডাইনিংএ ব্যস্ত খাবার নিয়ে। সকলকে এড়িয়ে হিয়া ছুটে যায় মেইন দরজায়। পিউও গিয়ে ওর ঠিক পেছনে দাঁড়ায়।

দরজার বাইরে এক ডেলিভারি ম্যান, হাতে ধরা ছোট্ট একটা বাক্স। সম্পূর্ণ বাক্সটা সাদা পলিতে মোড়া। হিয়া পার্সেলটা রিসিভ করে। পিউ কিছুই বলে না। হিয়া চুপিসারে পার্সেলটা নিয়ে এক দৌড়ে নিজের ঘরে চলে যায়। পিউও পিছু যায় হিয়ার। পিউয়ের মনে অজস্র প্রশ্ন, তবে সব সে অপ্রকাশ্য রাখে।

ঘরে গিয়ে হিয়া সাদা প্যাকেটটা খুলতেই ভেতরে বাদামি রঙের কাগজের বাক্স বেরিয়ে আসে। তার উপর তূর্যর হাতের লেখায় ছোট্ট এক চিরকুট, “আমার পক্ষ থেকে তোর নতুন যাত্রার জন্য।”

হিয়ার হৃদপিণ্ডের শব্দ যেন মুহূর্তে দ্বিগুণ হয়ে যায়। পিউ অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে বাক্সটার দিকে। হিয়া বাক্সটা খুলতেই চোখে পড়ে একটা ছোট আরেকটা বাক্স। ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে একটি ফাউন্টেন পেন, কালো ও কপার রঙের সংমিশ্রণে তৈরি এক অনন্য সৌন্দর্য। কলমের গায়ে অদ্ভুত সব কারুকাজ, যেন কোনো প্রাচীন গল্পের অলঙ্করণ, কলমের পেছনে লম্বা একটা সাদা পালক, সত্যিকারের কোনো পাখির পালক বোধহয়, সৌন্দর্য এতটাই নিখুঁত যে, এক মুহূর্ত হিয়া কেবল তাকিয়ে থাকে কলমটার দিকে। এ যেন শত শত বছর পিছে ফেলে আসা কোন রাজ বার্তা লেখার কলম। কলমের বাক্সের নিচে মাঝারি একটি ডায়রি, কফি রঙের পাতায় তৈরি। পাতাগুলো গাঢ় রং, প্রতিটি পাতার কিনারায় হালকা ছাপা প্রাচীন রচনার নকশা, যেন একটি অপ্রকাশিত জীবনের গল্প লিখে যাওয়ার জন্য অপেক্ষা করছে।

হিয়া তব্দা খেয়ে তাকিয়ে থাকে। তার ঠোঁট কেঁপে ওঠে। একটা মানুষ একটা মানুষকে নিয়ে কি পরিমান গবেষণা করলে তার মনের মতো কিছু পাঠাতে পারে..? হিয়া কলম হাতে নিয়ে চুপসে থাকে।

পিউ হাত বাড়িয়ে ডায়রিটা হাতে নিয়ে বলে, "হিয়া আপি, এর পৃষ্ঠা গুলো তো আসল গাছের পাতা দিয়ে করা। এগুলো মেশিনে নয় হাতে বানানো। আমার বান্ধবী জুঁই আছে না… ওর কাছে দেখেছিলাম আমি।"

হিয়া জিজ্ঞেস করে, "মানে?"

পিউ বলে, "মানে, এই ডায়রির পৃষ্ঠা গুলো হাতে বানানো কাগজ। যেগুলো সরাসরি গাছের পাতা থেকে মেশিনারি সিস্টেমে না গিয়ে হাতে তৈরি করা হয়। আগের যুগে যখন মেশিন ছিল না তখন কাগজ এভাবে তৈরি করা হতো। এগুলো এখন তো খুঁজেই পাওয়া যায় না। জুঁই ওর মামার থেকে নিয়েছিল, ওর অবশ্য খুব পুরাতন ছিল। কিন্তু তোমাকে এগুলো কে দিয়েছে?"

হিয়া ধীরে বলে, "তূর্য ভাই দিয়েছে। এডমিশনে পাশ করার জন্য গিফট।"

পিউ ফিসফিস করে বলে, "রেজাল্ট তো পেলেই ঘন্টা খানেক... এত তাড়াতাড়ি উনি রাজশাহী থেকে ডায়রি আর কলম পাঠিয়েও দিলো...?

অসম্ভব। এগুলো ফরিদপুরে আসতেই তিনদিন লাগবে। আর খুঁজে খুঁজে কিনতে আরো সপ্তাহ খানিক…

তাহলে তূর্য ভাই আগে থেকেই জানত তুমি চান্স পেয়ে যাবে?”

হিয়া কিছু বলে না। ওর গলা জড়িয়ে আসে। সে জানে না কী বলবে, জানে না কী ভাবে অনুভব করবে। সে শুধু ধীরে ধীরে পিউয়ের হাত থেকে ডায়রিটা নিয়ে পাতা উল্টিয়ে দেখে। হিয়ার ভেতরটা হালকা হয়ে যায়। একটা অদ্ভুত শান্তি, এক নিঃশব্দ বন্ধন, আর এক গভীর উপলব্ধি।

হিয়া ডায়রিটার ভাঁজে চোখ বুলিয়ে খুব আস্তে, নিঃশব্দে হাসে। আঙুলের স্পর্শে যেন পুরোনো কালের ধুলো গড়িয়ে পড়ে। হঠাৎ করে ফোনটা নিঃশব্দে কেঁপে ওঠে। স্ক্রিনে ভেসে ওঠে তূর্যর নাম। হিয়া তড়িঘড়ি করে আনলক করে। একটা মেসেজ।

“আমি পঞ্জিকার হিসেবে চলি না। কালতিথি সব সময় সারথি হয়। পঞ্জিকা আর তিথি সময়ের হাতেই থাকবে। আমি সাহস করেও বিরোধিতা করতে পারি না। তাইতো মন চাইলো ঘন পৌষে তোর স্বপ্ন পূরণের ভাগিদার হই। তবে কেন যেন এবার পঞ্জিকার হিসেব কষেই পক্ষ রাখলাম। এসব নতুন তবে অগ্রহণযোগ্য নয়।

হিয়া… জীবন বদলায়। বদলায় গন্তব্য, ইচ্ছে, এমনকি সত্যও…।

সে সব বদলাক, তুই বদলাস না। একই থেকে যা শড়ৎ হেমন্ত আর মাঘের শীতেও। তোর চোখের মায়া না কমুক। তোর পায়ের অলংকার যত্নে থাক। তোর কলম থামাস না, স্বপ্ন যেন না ফুরায়। তোর চোখে যেরকম এক টুকরো নীল হাওয়া থাকে, ঠিক তেমনি রয়ে যাক। তোকে গোছানো বড্ড মানায় হিয়া। তুই এলোমেলো হলে, এই শহর পথ হারাবে। তুই শুধু ডানা মেলে ধর, এখন সমগ্র আকাশটা তোর। ক্লান্ত হলে জানাস। শহর জুড়ে আবার বৃষ্টি নামাবো।”

হিয়ার শ্বাস আটকে যায় এক মুহূর্তের জন্য। সে চুপ করে বসে থাকে, ফোনটা শক্ত করে ধরে। বার বার পড়ে মেসেজটা। প্রতিটা লাইনে হৃদয়ের কোথাও যেন আটকে থাকে। এ অন্য কোন তূর্য। এর ভাষা শক্ত তবে গভীর। তবে হিয়ার কাছে সব নতুন।

পিউ অবাক হয়ে বলে, “কী লিখেছে?”

হিয়া কিছু বলে না। মুখে এক টুকরো নিঃশব্দ হাসি, চোখে হালকা ঝাপসা। হিয়া বারংবার মেসেজটা পড়ে। ধীরে, খুব ধীরে। প্রতিটা শব্দ যেন গেঁথে যায় বুকের গভীরে। তবু এর চেয়ে সম্পূর্ণ উপহার, এর চেয়ে পরিপূর্ণতা হিয়া আগে কখনোই অনুভব করে নি।

মানুষ তার অনুভবের দাস। অথচ অনুভব তো কোনো বাঁধনে থাকে না। সে জলের মতো, ঢেউয়ের মতো, কিংবা কোনো নিঃশব্দ সন্ধ্যার মতো, যাকে স্পর্শ করা যায় না, কিন্তু যার ভার গায়ে লেগে থাকে অনেকক্ষণ। বর্তমানে তূর্য আর হিয়া যেন দুই প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা দুটি নিঃশব্দ প্রতীক্ষা। দুজনের মাঝে কোনও সংজ্ঞা নেই, নেই কোনো নাম দেয়া সম্পর্কের দাগ। আছে কেবল অনুভূতির স্তরবিন্যাস, যার একটা সুর আছে, গন্ধ আছে, কিন্তু কোনো উচ্চারণ নেই।

হিয়া ডায়রির পৃষ্ঠায় হাত রাখে। নতুন সঙ্গীর মতো আগলে ধরে এই নির্জীব চিরজীবন্ত পৃষ্ঠা গুলোকে।

____________

চলবে..... 🖤