নির্বাসিত কৃষ্ণচূড়া — পর্ব ৩০

লেখক: সাদিয়া তিন্তি · বিভাগ: রহস্য · পর্ব ৩০ · ৪৭ পর্বের মধ্যে ৩০

সময় পেরোয় নিঃশব্দে। দিন গড়িয়ে সন্ধ্যা নামে আকাশে। আলোর ভাঁজে ধূসরতা মিশে গিয়ে গড়ে তোলে এক মায়াবী আবহ। জানালার কাচে হালকা আলো পড়ে, আর সেই আলোয় বসে থাকে হিয়া আর হিয়ান, দুজন দুই জগতের, অথচ একই ছায়ার নিচে জন্ম নেওয়া। আড্ডা থেমে গেছে অনেক আগে। পিউ মাত্র ঘর ছেড়ে আব্দুর রবিউল মোহাম্মদের ঘরে গেছে।

হিয়ান জানালার ধারে পা গুটিয়ে বসেছে, পাশে চায়ের মগে ধোঁয়া উঠছে ধীরে ধীরে। হিয়া পাশেই বসে আছে চোখে এক ধরণের প্রশান্তির ছায়া নিয়ে। সারা বাড়ি তখন নিশ্চুপ, যেন এই দুই ভাইবোনের মাঝে জমে থাকা নীরব কথারাই শুধু বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে। অনেক দিন তাদের কথা হয় না বিস্তারিত। বিশেষ করে হিয়ান পড়াশোনার জন্য শহর ছাড়ার পরই তাদের দূরত্ব আকাশ ছুঁয়েছে। হিয়ান হঠাৎ ব্যাগ থেকে একটা চকচকে কাগজে মোড়ানো বই বের করে বাড়িয়ে দেয় হিয়ার দিকে। সে খুব সাদামাটাভাবে বলে, “তোর গিফট।”

হিয়া অবাক হয়ে প্যাকেটটা খোলে। মোড়কের ভিতরে একটা বই, 'স্বরুপ সন্ধানী'। বইয়ের ক্ষেত্রে হিয়ার বাছবিচার নেই। যেন পড়তে পারলেই সুখ।

হিয়ান এক অদ্ভুত এক নরমতা নিয়ে বলে, "হিয়া এটা জীবনের এক অদ্ভুত মোড়। তুই স্বপ্নের খোঁজে বাড়ি ছাড়বি। নিজের জন্য লড়বি। অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে আগাবি। আমি চাই তুই সব সময় মনে রাখ তুই একা না। তোর সাথে তোর ছায়া হয়ে তোর ভাই আছে‌। তুই জানিস আমি বই পড়ি না। সারা রাজশাহী এক লাইব্রেরী থেকে অন্য লাইব্রেরী তোর বই খুঁজেছি। তবে মনে কিছুই ধরেনি, মনে হলো সব বই বাড়িতেই আছে। সব তোর পড়া। এটাই অন্য রকম লেগেছে তাই নিয়ে আসা।

হিয়ার চোখ জলে টলে ওঠে, সে নিচু স্বরে বলে, “তুমি জানতে আমি চান্স পেয়ে যাব?”

হিয়ান একটু হাসে। এরপর খুব ধীরে হিয়ার মাথায় হাত বুলিয়ে বলে, "হিয়া, আমার মনে হয়েছিল তোর পরিশ্রম বিফলে যাবে না। এখানে চান্স না পেলেও কোথাও না কোথাও তুই ঠিকই চান্স পেয়ে যাবি।”

হিয়া একটু জড়ানো গলায় বলে, “ভাইয়া তুমি তো এমন কথা বলো না কখনো…”

হিয়ান মৃদু হাসে, একটু থেমে বলে, “অবস্থা পরিস্থিতি শব্দের পরিবর্তন করে। আগে এমন পরিস্থিতি আসে নি তাই বলতে হয় নি। হিয়া ঢাকা একটা মায়া নগরী। চারপাশের রং আর রং। রঙিন চশমা পড়ে দুনিয়া দেখিস না‌। নিজের আদর্শে, নিজের নজরে, নিজের চোখে দুনিয়া দেখিস। যেখানেই মনে হবে তুই ক্লান্ত, সেখানেই তোর পাশে তোর ভাই আছে।"

হিয়া আর কথা বলতে পারে না। হিয়ানের কণ্ঠের গভীরতা তার মনে শক্ত করে বাজে। এতটুকু ভরসাই হয়তো গভীর কিছু করে ফেলার শক্তি যোগায়। হিয়ার কাছে হিয়ান বরাবরই একজন চমৎকার মানুষ। আজ সে সুখী অনুভুতি করছে, এই চমৎকার মানুষের এই শক্ত শব্দের জোরে।

তারা দুজন চুপ করে বসে থাকে কিছুক্ষণ, নিঃশব্দে। বাইরে সন্ধ্যার আলো গাঢ় হতে থাকে। যেন এই ছোট্ট ঘরের এক কোণে বসে থাকা হিয়া আর হিয়ানের চারপাশে গড়ে উঠছে এক অদৃশ্য আশ্রয়।

সময় আরও খানিকটা এগোয়। ক্যালেন্ডারের পাতায় আসে সেই দিন, যেদিন হিয়া আর মিম প্রথমবার বিশ্ববিদ্যালয়ের চৌকাঠ পেরিয়ে পা রাখে। গাঢ় এক উত্তেজনা, নতুন শহরের হাওয়া, আর বুকভরা অজানা আশঙ্কা নিয়েই তারা দাঁড়ায় সেই দীর্ঘ প্রতীক্ষিত গেইটের সামনে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নামটা শুধু একটা প্রতিষ্ঠান নয়, এ যেন বাংলার বুকে জেগে থাকা এক ইতিহাস, যেখানে প্রতিটা দেয়াল নিঃশব্দে বলে যায় হাজারো স্বপ্নের গল্প। তবে আজ এ দেয়ালে হিয়া দেখছে অন্য কাহিনী। সে জড়িয়ে নিয়েছে তার জীবনের সাথে প্রকৃতির উপস্থিতি। সে চারপাশটা দেখে। পায়ের নিচে জমে থাকা গন্ধরাজের শুকনো পাতা, হালকা বাতাসে কাঁপতে থাকা কৃষ্ণচূড়ার ছায়া, সব মিলিয়ে যেন একটা সজীব কাব্য। সে যেন তার পর্যবেক্ষণ মেলাতে থাকে প্রকৃতির ডায়রির বর্ননার সাথে। তবে এসব তো সেসব নয়! সময় বদলেছে, যুগ বদলেছে, মানুষেরাও আর আগের কোথায়?

হিয়া সব যেন মেনে নেয়। সে বর্তমানে গা ভাষায়। হিয়া আর মিমের বাবা এসে ভর্তির পর্ব চুকিয়ে গেলেও তাদের আসা হল আজ প্রথম তাও নবীন বরনে। হিয়ার সংকোচ খুশি সব যেন নিজেরাই কাটাকুটি খেলছে তার সাথে। এ বিশ্ববিদ্যালয়ে সে প্রথম এসেছিলো আব্দুর রুশান মোহাম্মদের সাথে। তার স্মৃতিচারণের নেশায়। তবে আজ এসেছে নিজের অধিকারে। নিজের বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্যাগ নিয়ে। হিয়ার অনুভুতি যেন বাস্তবতায় সন্ধি খেলে।

হিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম দিনের সকালটা যেন এক নিজস্ব মরশুমে গড়ে ওঠা নতুন পৃথিবী। পুরো ক্যাম্পাস জুড়ে সাজ সাজ রব। নবীন বরণের অনুষ্ঠানটা হিয়ার কাছে বসন্ত উৎসবের মতন লাগলো। ঠিক শীতের তীব্রতা গিয়ে গরমের প্রখরতার আমন্ত্রণ জানানোর মতোই এটাও।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মিনার চত্বর থেকে শুরু করে টিএসসি পর্যন্ত সবখানে রঙিন ব্যানার, ফেস্টুন, আর লাল-নীল কাগজের ফুল। প্যাভিলিয়নের স্টেজে তখন চলছে শেষ মুহূর্তের কাজ। সিনিয়ররা ব্যস্ত, কেউ মাইক সেট করছে, কেউ পানির বোতল দিচ্ছে নবীনদের হাতে। এসব তোড়জোড়ে হিয়া আর মিমের জীবনে যুক্ত হয় নতুন আরো তিনটে চরিত্র। নতুন জীবনের নতুন বন্ধু। তৃনা, বাপ্পি আর রাহাত। এদের অবশ্যই বসন্ত বাতাসের প্রথম দোলার মতোই আগমন হলো। গোমরা মুখো, বাস্তববাদী, পড়ুয়া ধরনের ছেলে রাহাত অবশ্য মিমের কোচিং এর সহপাঠী। বন্ধুত্ব হয়নি কখনোই, তবে এই ভীড়ে পরিচিত মুখ দেখে সে যেন জড়তা কাটিয়ে বন্ধু নাম গ্রহন করলো অনায়াসে। এদিকে হাস্যোজ্জ্বল, অত্যন্ত রুপবতী শ্যাম কন্যা তৃনা কিভাবে যেন ভীড়ের মাঝেই খুঁজে নিয়েছে বন্ধুত্ব আর কনফিউজড, অতিরিক্ত হাইপার, সামান্য ভীতু বাপ্পি তৃনার স্কুলের বন্ধু। এদের মহল যেন জমে উঠলো একদম শূন্য থেকে।

নতুন দিন, নতুন জীবনের শুভারম্ভের শেষে তারা ঘরে ফেরে। হিয়া আর মিম দুজনেই এখন পুরানো ঢাকার এই শত বছর পুরনো আব্দুর রুশান মোহাম্মদের বাড়ির বাসিন্দা। এই দুই নতুন অতিথি নয়, যেন দুটো ফুল ফুটে উঠেছে আব্দুর রুশান মোহাম্মদের জীবনে। নিঃশব্দ বাড়িটা যেন নতুন রঙে জেগে উঠেছে। ওদের বিশ্ববিদ্যালয়টা এই বাড়ি থেকে খুব বেশি দূরে নয়। রিক্সায় মাত্র মিনিট দশ। ওদের জন্য এই শহরের কোলাহলের মাঝে সব যেন পূর্ব পরিকল্পিত ভাবে গোছানো। সব কিছুই যেন একটা নিখুঁত চিত্রনাট্য অনুযায়ী চলছে। শুরু হয়েছে নতুন যাত্রা, নতুন সুরে, নতুন মুখে।

তাদের নতুন জীবনের তুমুল তোড়জোড়, ক্লাসের চাপে সকাল-সন্ধ্যা দৌড়ঝাঁপ, লাইব্রেরির নিঃশব্দ গন্ধ, আর বন্ধুত্বের উচ্ছ্বাস, সব মিলিয়ে হিয়ার দিনগুলো এখন রঙিন, ঠাসবুনোটে ভরা। তবে এরই মাঝে, কোথাও যেন একটা খালি জায়গা থেকে যায়। হিয়ার মনে যেন এক নিঃশব্দ নদী প্রবাহিত হয়। এক অদৃশ্য জলছবির মতো তার মনের গহীনে এখনো বয়ে চলে রহস্যের জল। কল্পনার রং ছাপিয়ে বাস্তব জীবনের আলপনা আঁকছে যতই, তবুও কোথাও যেন একটা পর্দার আড়ালে রয়ে গেছে পুরনো জিজ্ঞাসা, এক অমীমাংসিত ব্যাখ্যার আকুতি।

হিয়া জানে, এই নতুন অধ্যায়ের মাঝে তার সেই পুরনো রহস্যরা ধুলো জমে যাচ্ছে। কিন্তু মনে মনে সে এটাও জানে, ওই ধুলোটাই সে নিজে। হাল ছাড়েননি সে, চির প্রত্যাশিত জীবনের সে প্রবেশ করে গেছে। এটা কি আদৌ তার স্বপ্ন ছিল, নাকি প্রকৃতির স্বপ্ন সে নিজের চোখে দেখেছে?

দিনের ব্যস্ততা শেষে প্রতিদিন রাতে এবাড়ির পুরোনো বারান্দায় দাঁড়িয়ে সে শহরের ল্যাম্পপোস্টের আলো দেখে, তখন তার চোখে আবার সেই আলোছায়ার খেলা জেগে ওঠে। মনে হয়, একটা প্রশ্ন ঘুরে বেড়াচ্ছে বাতাসে, তার অজান্তেই।‌

তূর্যের পাঠানো সেই কফি রঙের পাতার ডায়রিটা, আর সেই পালক লাগানো কলম, এখনো তার ড্রয়ারে ঠিকমতো রাখা। এই ডায়রির পাতাগুলো এখন ব্যস্ত হয়ে উঠেছে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের দিনপঞ্জিকা নিয়ে। নতুন জীবনের সাথে মানিয়ে নেওয়ার লড়াইয়ে দিন কাটছে হিয়ার।

তূর্যর অবস্থান শত মাইল পেরিয়ে অন্য শহরে। রাতের আকাশ বেশ মেঘলা। বৃষ্টি নামবে বলে পন করেছে। তূর্য চুপচাপ সিগারেটের ধোঁয়া উড়াচ্ছে মেঘের ভাঁজে। তূর্যর কাছে সব হিসেব সাধারণ লাগছে। তবে এই সাধারণের মাঝে কোথাও কোন এক সুতোর জট লেগে আছে যেটা সে খুঁজে পাচ্ছে না। সুতোর জট হয়তো খুলতে পারে একমাত্র স্বাত্ত্বকি। যাকে খুঁজতে এতো আয়োজন। তবে তাকে খুঁজে পাওয়া কি এতো সহজ! তাকে খুঁজে পাওয়া সহজ হলে এতোদিনে আব্দুর রুশান মোহাম্মদই খুঁজে বের করে নিতেন। কিন্তু হতেই পারে যে তিনি বের করতে চাননি….। তিনি তো কতো কি লুকিয়ে বসে আছেন নিজের মাঝে। এসব হিসেব কে রাখে..?

তূর্য আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে অপলক। রাতটা যেন নিজেই নিজেকে ভিজিয়ে নিচ্ছে। শহরের বাতাসে ভাসছে এক অনিশ্চিত প্রতীক্ষার গন্ধ। মেঘলা আকাশের নিচে তূর্য ধোঁয়ার রেশে নিজেকে গুটিয়ে নিচ্ছিল ঠিক তখনই ফোনটা কেঁপে ওঠে। স্ক্রিনে ভেসে ওঠে, নেহালের নাম।

একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস নিয়ে তূর্য কল রিসিভ করে। ওপাশ থেকে কণ্ঠটা চাপা উত্তেজনায় কাঁপছে,

"তূর্য, যাদের দু'জনকে তুই খুঁজতে বলেছিলি, তাদের মাঝে শঙ্খনীল সাহা, এখন ঢাকায়। উনার পিএস নিশ্চিত করেছে।"

তূর্য চোখ সরায় না আকাশ থেকে, শুধু কণ্ঠটা মৃদু হয়ে ওঠে, "তুই নিশ্চিত?"

নেহাল বলে, "হ্যাঁ, ওই নামের মানুষটাকে খোঁজার জন্য যতগুলো সূত্র প্রয়োজন সবগুলো কাজে লাগিয়েছিলাম। আজ দুপুরে এক পুরনো যোগাযোগের সূত্রে জানতে পারলাম, সে এখন ঢাকায় এসেছে তার অফিসের কাজে। তার পিএসকে অনেক অনুরোধ-উপরোধের পরে পরশুর জন্য অ্যাপয়েন্টমেন্ট জোগাড় করেছি। তুই যত তাড়াতাড়ি সম্ভব, ঢাকা আসার ব্যবস্থা কর। এই লোক আবার কলকাতায় ফিরলে কিন্তু কবে আসবে তার আর খোঁজ পাবি না।”

এক মুহূর্তের জন্য চারপাশ নিঃশব্দ হয়ে যায়। তূর্যর হাতে ধরা সিগারেটটা ততক্ষণে নিঃশেষ। সে ধীরে পেছনে হেলান দেয় কাঠের চেয়ারটায়। বাতাস একটু ঠান্ডা হয়ে এসেছে, শহরের শেষ প্রান্ত থেকে যেন অচেনা সুর এসে কানে বাজে। তূর্য ধীরে বলে ওঠে, “একটা নাম থেকে কোন মানুষ তো পাওয়া গেল! লোকটা নিজেও জানেনা তাকে খুঁজতে কি কি করতে হয়েছে।”

নেহাল একটু চুপ করে থেকে উত্তর দেয়, "তোর কি মনে হয় সেই চিঠির সঙ্খ আর এই শঙ্খনীল একই ব্যক্তি?”

তূর্য হালকা হেসে বলে, "এসব আমি কিছু জানি না। আমি শুধু জানি আমি দু'জন ব্যক্তিকে খুঁজছি যাদের একজনের নাম শঙ্খ আর অপরজনের নাম স্বাত্ত্বকি। যারা দুইজন দু'টো ঘুমন্ত ইতিহাস উন্মোচন করতে পারে। হয়তো যেকোনো একজনকে পেলেই সব রহস্য সমাধান হয়ে যাবে। …কিভাবে যেন প্রকৃতি আর তুহুরা একে অপরের সাথে সংযুক্ত। এখানে সবই রহস্য।"

নেহাল মৃদু আওয়াজে বলে, "সে সব এখন সামনাসামনি এলেই জানা যাবে। তুই আসবি কখন?"

তূর্য নিশ্চুপ ভেবে বলে, "ভোরের প্রথম ট্রেন ধরব।"

ওপাশে নেহালের গলা একদম স্থির,‌ “ ঠিক আছে তোকে অ্যাড্রেসটা পাঠিয়ে রাখছি আমাকে জানাস আর কিছু করতে হলে।”

তূর্য প্রাপ্তির হাসি টেনে বলে, "এসে দেখা হচ্ছে।"

তাদের কথপোকথন আর বাড়ে না। ফোন কেটে যায়। আকাশে এবার সত্যিই বৃষ্টি নামে, নিঃশব্দ, কিন্তু গভীর। রাতটা যেন বৃষ্টির ছায়া মেখে ধীরে ধীরে ভিজে ওঠে। চারপাশ নিস্তব্ধ, কেবল জানালার কাঁচ বেয়ে জলের রেখা নেমে আসে ধ্বনিবিহীন দীর্ঘশ্বাসের মতো। তূর্য বিছানায় গা এলিয়ে দেয়, অথচ ঘুম আসে না। তার চোখের পাতায় ঘুরছে সমস্ত রহস্যের ঘুণধরা ইতিহাস। তূর্য নিজেকে প্রশ্ন করে, সে আসলে কি জানতে চায়? শঙ্খনীল সাহা আদতেই তুহুরার সেই চিঠির শঙ্খ, নাকি প্রকৃতির সাথে সম্পর্কিত কেউ! এই শঙ্খনীলকে খুঁজে পাওয়া গেছেই তো প্রকৃতির বাবার পুরাতন বিক্রিত সম্পত্তির কাগজাদি থেকে। প্রকৃতির বাড়ির কেউ কিভাবে সংযুক্ত হতে পারে তুহুরার সাথে? তূর্যর সব গুলিয়ে যাচ্ছে।‌ তার মস্তিষ্ক এসবের উদ্ধে জানতে চায়, মিনু রহমানের কি পাপ এসবের পিছে। এই রহস্যের পিছে তূর্য নিজের স্বার্থেই ছুটছে। সে জানতে চায় এই অপূর্ণতায় তার দাদীর অবদান কতটুকু।

প্রহর কেটে যায়। আধো ঘুম, আধো জেগে থাকা নিয়ে এক রাত শেষে, ভোরের কুয়াশা গলিয়ে রাজশাহী থেকে ঢাকার পথে রওনা দেয় তূর্য। এবারের যাত্রাও গোপনই বটে। ট্রেনের জানালা দিয়ে পেছনে পড়ে যায় পরিচিত দৃশ্য, আর তার হৃদয়ে জমা হয় একরাশ অজানা আশঙ্কা, যেভাবে জলের নিচে জমা হয় কাদার মতো ভারী, নিঃশব্দ।

লম্বা যাত্রা শেষে, দুপুরের ঢাকায় নেমে শহরের ব্যস্ততা তাকে কিছুক্ষণে গিলে খেতে চায়, তবে তূর্য থামে না। ঘণ্টাখানেকের ভেতর সে পৌঁছায় হিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের গেইটে। এ যেন তার অপরিকল্পিত গন্তব্য। সে তো সোজা আব্দুর রুশান মোহাম্মদের বাড়ির দিকে যেতে চেয়েছিল, তবে পথ আটকালো কি করে?

হিয়া ক্যাম্পাসেই, বর্তমানে তার জীবনের সব থেকে বিরক্তিকর ক্লাসের শেষ বেঞ্চে বসে তৃণার সাথে বিশেষ অহেতুক আলোচনায় ব্যস্ত। তূর্য চায়ের টং দোকানে এককাপ চায়ের সাথে একটা সিগারেট ধরায়। আঙুল একটুখানি থেমে থাকে, তারপর ফোনটা বের করে টাইপ করে, "তোর ক্যাম্পাসের চা এতোটাও জঘন্য না।"

ফোনটা হিয়ার হাতেই ছিল। মেসেজটা আসতেই সে সাথে সাথেই সিন করে। মেসেজটা ছোট হলেও হিয়ার বুঝে উঠতে সময় লাগে খানিকটা। বার তিনেক মেসেজটা পড়ে হিয়া টাইপ করে, "আপনি কি বলতে চাইছেন আপনি আমার ক্যম্পাসে?"

তূর্য হাসে, গরম চায়ের কাপ পাশে রেখে টাইপ করে, "খুব চা খেতে ইচ্ছে করছিল, তাই ভাবলাম আজ তোর ক্যাম্পাসের চা ট্রাই করা যাক।"

হিয়া নিজের মাথা চাপড়ে বলে, "তূর্য ভাই আপনি কি আগে থেকেই পাগল ছিলেন নাকি নতুন হয়েছেন? লোকেশন বলুন দ্রুত।"

তূর্য আসলেও নতুন পাগল। আগে এমনটা কখনোই তার দ্বারা হয়নি। আজকাল হয় খুব। তূর্য একটু দুষ্টু হেসে লেখে, "এইখানে জটলা বাঁধা রাস্তার দুপাশে ফৌজের মত দাঁড়িয়ে দালান গুলি। মাঝে মাঝে দুচারটে গাছ– যেন সৈনিকের হাঁটুতে হেলানো সবুজ রাইফেল। ছাদে উঠে গেছে রেস্তোরাঁ। আধখানা শহর ঢেকে দেওয়া ধূসর রেললাইন, ঘণ্টায় মেট্রো আসে ছয়টি। আর জীবন ফেঁসে যায় সিগনালে। সেসব এড়িয়ে ছোট্ট টং দোকানের রঙ চায়ের কাপে ধোঁয়া উড়ছে। আমি ও নিঃশব্দে চায়ের কাপে প্রহর গুনছি।"

হিয়া বড্ডো বাহানায় ক্লাস থেকে বের হয়। ঠিক তখনই তূর্যের এমন মেসেজ দেখে দাঁত কিড়মিড় করে ওঠে। প্রচন্ড রাগে সে রিপ্লে করে, "আমি ক্লাসের বাইরে দাঁড়ানো। হেঁয়ালি করছেন কেন? তাড়াতাড়ি বলুন কিন্তু কোথায় আছেন।"

তূর্য যেন সফল। হিয়াকে রাগিয়ে সে নিজে খুব মজা পাচ্ছে যেন। এ রাগে আর ঘি না ঢেলে তূর্য এবার এড্রেসটা সুন্দর করে বুঝিয়ে বলে দেয়।

আকাশ তখনও মেঘলা, তবে বৃষ্টির ধারা থেমেছে।

_________________

চলবে........ ❤️