নির্বাসিত কৃষ্ণচূড়া — পর্ব ১৫

লেখক: সাদিয়া তিন্তি · বিভাগ: রহস্য · পর্ব ১৫ · ৪৭ পর্বের মধ্যে ১৫

রাতটা যেন তার মন মত কাটতেই চায় না। ঘড়ির কাঁটা এগোয়, তবুও হিয়ার মন যেন আটকে আছে একটা অদৃশ্য ভারে। চোখের পাতা ভারী হলেও ঘুম আর আসে না। বৃষ্টির শব্দে সারা রাত জানালার কাঁচে একরকম ছন্দ বাজে, আর হিয়া চুপচাপ সেই শব্দ শুনে যায়।

তার বুকের ভিতরে জমে থাকা অনুভূতিটা এক সময় ভারে পরিণত হয়। কেমন একধরনের দুঃখ গা ঘিরে ধরে। অথচ সেই দুঃখটা ঠিক কোথা থেকে এসেছে, তা সে জানে না।

কিসের দুঃখ এটা? কার জন্য?

সে ধীরে উঠে ড্রয়ারের ভেতর থেকে তার ব্যক্তিগত ডায়েরিটা বের করে। পাতাগুলোর গন্ধে, কলমের অচেনা উত্তাপে একটু যেন শান্তি পায়। চলতে থাকে কয়েক পাতা লেখা। এরপর কলম থামিয়ে হিয়া চুপ করে যায় কিছুক্ষণ। বাইরে তখনো ঝিরঝিরে বৃষ্টি। কোনো শব্দ করে না, শুধু একটা নিঃশব্দ আর্তি যেন বাতাসে ভেসে থাকে।

হিয়া ডায়েরির ভাঁজে হাত রাখে। একবার ফিরে তাকায় জানালার পাশে ঝিমিয়ে যাওয়া ফুলগুলোর দিকে। উঠে যায় সে ফুল গুলোর দিকে। একবার পরম যত্নে হাত বুলায় ফুলের নেতিয়ে পড়া শরীরে। ফুলের গুচ্ছ গুলোকে নিয়ে ফেরে আবার টেবিলে।

প্রথমে ফুলের গুচ্ছ থেকে আলাদা করে দু'তিনটে কৃষ্ণচূড়ার ফুল। আগুনরঙা, রোদে পুড়ে যাওয়া দুপুরের মতো রঙ তার, কিন্তু তবু যেন একটা কোমলতা লেগে আছে এই ঝিমিয়ে যাওয়া পাপড়িতে। হিয়া ফুলটাকে যত্নে পুরে দেয় পৃষ্ঠার ভাজে। কয়েকটা বাক্য লেখে শুধু, "প্রিয় কৃষ্ণচূড়া, তুমি থাকো এই গ্রীষ্মে জন্মানো বসন্তে। তুমি থাকো এক অমর যত্নে, না বলা অভ্যেসে। অজানা অনুভূতিতে আটকানো এক কৃষ্ণ পুরুষের নামে।"

পৃষ্ঠা উল্টায় হিয়া। দ্বিতীয় পৃষ্ঠায় দুটি সোনালু ফুল। সোনালী হলুদ, সূর্যের মতো উজ্জ্বল, তবুও এখন ম্লান হয়ে যাওয়া। "প্রিয় সোনালু, এ অবেলায় বসন্ত আনলে কেন?"

পাল্টে যায় পৃষ্ঠা, তৃতীয় পৃষ্ঠায় তিনটি জারুল ফুলের পাপড়ি। হালকা বেগুনি, যেন সন্ধ্যার রঙ, মৃদু গন্ধ ছড়ানো। "প্রিয় জারুল, শেষ শব্দ জমা থাক। তুমি এক স্নিগ্ধতা। তুমি এসেছো পৃথিবীর উষ্ণতম সময়ে সবথেকে গভীর শান্তি দিতে। দাও আরো সুখ দাও। "

এ যেন হিয়ার একটা গোপন সংগ্রহ, কারো অজান্তে গড়ে তোলা ছোট ছোট অনুভূতির জগৎ। পাপড়িগুলোর দিকে তাকিয়ে হঠাৎ তার মনে পড়ে, প্রকৃতি!

তার ডায়রিরও তো প্রতিটা পাতায় ছিল এমনই যত্নে রাখা ফুল, পাতা, মুহূর্ত। হিয়া চমকে ওঠে নিজের ভেতরের এই মিল দেখে।

সে কি ধীরে ধীরে প্রকৃতি হয়ে যাচ্ছে?

তার মন অবাক হয়ে প্রশ্ন করে, “আমি কি প্রকৃতির মতোই হয়ে পড়ছি?

এভাবেই কি গড়ে ওঠে একটা গোপন পৃথিবী…?”

হিয়ার ভাবনার গভীরতার হালকা গন্ধ বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে। হিয়া নিজের অজান্তেই মৃদু হাসে। শুধু চোখের কোণে তখনো জলের রেখা জমে থাকে, অস্পষ্ট, অথচ খুব সত্য।

হিয়া ডায়েরির পাতায় মাথা রেখেই কখন যে বিছানায় এসে ঘুমিয়ে পড়েছিল, নিজেও বুঝতে পারেনি। বাইরে তখনো বৃষ্টি ঝরছিল নিঃশব্দ কান্নার মতো। পাতার মাথায় জমে থাকা না বলা শব্দের মতো ঝরে পড়ছিল একটানা। ঘুম ভাঙে আলো-আঁধারিতে, জানালার কাচে পড়া রোদ যেন মৃদু হাত বুলিয়ে দিয়ে বলছে,‌“ভোর হয়েছে হিয়া…”

চোখ মেলে হিয়া প্রথমে কিছুই বুঝতে পারে না, কোথায় আছে, এই আলো কাদের ঘরে!‌ তারপর ধীরে ধীরে ফিরে আসে স্মৃতি। আয়নার সামনে থেকে মিমের গলার আওয়াজ ভেসে আসে। সে ফোন কানে নিয়ে কারো কাছে জবাবদিহিতা করছে। আর অন্য হাতে চুল আঁচড়ে যাচ্ছে, কাঁধের ওড়না চেয়ারে পড়ে আছে। ফোনটা রেখে, তার কাঁধ বরাবর পড়ে থাকা চুলগুলোকে ঠিক করে নিলো।

হিয়া উঠে এসে মিমের পিছে দাঁড়িয়ে হালকা গলায় প্রশ্ন করে, “তুই কি যাওয়ার জন্য রেডি হচ্ছিস?”

মুখে ক্রিম মাখতে মাখতে মিম হালকা করে তাকিয়ে বলে, “আর যাওয়া! তূর্য ভাইয়ের তো ভীষণ জ্বর। সারারাত জ্বরে কেঁপেছেন। গতকাল বৃষ্টিতে ভিজে হয়তো জ্বর বাঁধিয়েছেন। ওনার তো বৃষ্টির পানিতে এমনিতেই এলার্জি…”

হিয়ার বুকের ভেতর হঠাৎ যেন কিছু একটা থমকে যায়। চোখের পেছনে হালকা একটা চাপা ঝড় শুরু হয়, কিন্তু মুখে কোনো শব্দ ফুটে ওঠে না। মিম তখনও কথা বলছে, কিন্তু হিয়ার কানে যেন সব আওয়াজ মুছে যেতে থাকে।

তূর্যর জ্বরের কারণ যে ঠিক তার পাগলামিটাই, এই সত্যটা হিয়া ঠোঁটে আনতে পারে না। কাল সারা বিকেল হিয়ার একরোখা আবদারেই তো তূর্য ছাতা ফেলে ভিজেছিল! হিয়া তো চাইলেই না বলতে পারত, কিংবা তূর্য নিজে ওর এলার্জির কথা বলতে পারতো। কিন্তু সে বলেনি। হিয়া শুধু বৃষ্টির মধ্যে দাঁড়িয়ে তূর্যের দিকে তাকিয়েছিল, একটা শিশুসুলভ আনন্দে।

হিয়া কোনো কথা না বলে চুপচাপ জানালার দিকে মুখ ঘোরায়। বাইরে বৃষ্টি থেমেছে, কিন্তু জানালার কাঁচে এখনো কিছু ফোঁটা রয়ে গেছে, যেন বৃষ্টির শেষ কয়েকটি কান্না। সেই ফোঁটাগুলোর দিকে তাকিয়ে হিয়ার মনে হয়,

"যদি আবেগ দিয়ে কাউকে ছুঁয়ে ফেলা যায়, তবে কি তা-ও ক্ষতিকর হয়ে ওঠে?"

মনের মধ্যে জমে থাকা অপরাধবোধ আর ভয়ংকর অনুভূতির ভারে হিয়া চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে। কেবল বাতাস জানালার ফাঁক দিয়ে ঢুকে এসে ওড়নাটার প্রান্ত ছুঁয়ে দেয়, একটা অতৃপ্ত বিকেলের মতো। কিন্তু এ-তো সকাল!

হিয়ার মনে অদ্ভুত এক ভার যেন গলা টিপে ধরে। শব্দ না করে সে ধীরে পায়ে উঠে দাঁড়ায়।

তাকে এখন যেতে হবে। একটু দেখতে হবে। একবার…

সে সময়ের আগে পা ফেলে যায় তূর্যের ঘরের দিকে। শব্দ না করেই পৌঁছায় তূর্যের ঘরে। দরজাটা হালকা ঠেলেই সে থেমে যায়। ভেতরের দৃশ্যটা এক মুহূর্তে তার নিশ্বাস আটকে দেয়।

তূর্য বিছানায়, নিঃশব্দ ঘুমে মুখটা ফ্যাকাসে হয়ে আছে। কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম, বুকের ওঠানামা যেন খুব ধীর, ভারী। পাশেই বসে আছে আলিফ। চুপচাপ, চোখে ক্লান্তির ছাপ, তবুও একটা নিঃশব্দ দায়িত্ববোধে নিবিষ্ট।

ঘরের টেবিলের কোণে একটা ছোট পাত্রে জল। তাতে ভিজে রাখা কাপড়ের পট্টি, কিছু ঔষধ, আর ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা থার্মোমিটার। জ্বরের উষ্ণতা যেন কেবল শরীরে নয়, ছড়িয়ে পড়েছে ঘরের বাতাসেও।

হিয়া দরজার পাশে দাঁড়িয়ে থাকে, একদৃষ্টে তাকিয়ে। তার বুকের ভেতর দিয়ে হঠাৎ একটা আকুলতা চুইয়ে পড়ে, "তূর্য ভাই, আমি তো শুধু একটা বিকেলের আনন্দ চেয়েছিলাম… তুমি তার মূল্য এমনভাবে দিলে কেন?"

হিয়া চুপচাপ ঘরের এক কোণায় দাঁড়িয়ে, তূর্যের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। যেন সারা শরীর বৃষ্টি হয়ে যেতে চায়, কিন্তু সে নিজেকেই বেঁধে রাখে। একটা অপরাধী কিশোরীর মতো, যার অপরাধ কাউকে না বললেও চোখে পড়ে যায়।

আলিফ হিয়ার উপস্থিতি টের পেয়ে ধীরে মুখ তোলে। চোখে ক্লান্তি, কিন্তু গলার স্বরে একরকম নরম আশ্বাস থাকে। “আপু, ভেতরে এসে বসো…”

হিয়া ধীরে এগিয়ে যায়, শব্দ না করে খাটের কাছে এসে দাঁড়ায়। ঘরের বাতাসে জ্বর আর ওষুধের গন্ধ মিশে আছে, একধরনের কুয়াশার মতো ভার জমে।

আলিফ নিচু গলায় বলল, “শেষ রাত থেকেই জ্বর তূর্য ভাইয়ের। শরীরটা একদম গরম হয়ে উঠেছিল। আমি ভেবেছিলাম মিম আপুকে বা তোমাকে ডাকি, কিন্তু তূর্য ভাই কিছুতেই ডাকতে দিল না। বলল, ‘ঘুমাচ্ছে ওরা, ডাকিস না…’ ”

সে থামে একটু, তারপর আবার বলে, “আমি তো জানি উনার এই বৃষ্টির পানি থেকেই এলার্জি হয়। তাই তখনই ঔষধ খাওয়াই, জলপট্টি দিই। কিন্তু কিছুতেই কাজ হয়নি। শরীরটা আরো কাঁপছিল। তখন দাদি ফজরের নামাজের জন্য উঠেছিল। তিনিই তখন সব সামলেছেন। কাপড় পাল্টে দিয়েছেন, মাথায় পানি দিয়েছেন। তারপর ফজরের পর থেকে একটু ঘুমিয়েছে ভাই। এখনো ঘুম ভাঙেনি…”

আলিফের গলাটা কাঁপে না, কিন্তু কোথাও যেন একটুকরো দায়বোধ থেকে যায় শব্দের আড়ালে।

হিয়া একটাও কথা বলতে পারে না। চোখটা স্থির তূর্যের মুখের ওপর পড়ে থাকে। যেন দেখতে চায়, একটু পরেই উঠে বসবে সে, হাসবে, বলবে।

কিন্তু এখন কেবল নিঃশ্বাসের ধ্বনি, আর নিস্তব্ধ ঘরের ভিতর দিয়ে ভেসে আসা একটা নরম দায়।

আলিফ একবার হিয়ার দিকে তাকায়, তারপর ধীরে উঠে দাঁড়ায়। তার চোখে একরকম বোঝাপড়ার ছায়া, যেন সে বুঝে গেছে এই মুহূর্তে দু’জনের মাঝে তার না থাকাই ভালো। বরাবরই হিয়া আর তূর্য তার চোখে সন্দেহের আরেক নাম। তাও সে নিজেই যেন এই সন্দেহের সত্যতা চায়। “আপু, আমি এক কাজ করি... দাদিকে একটু দেখি। উনি চা করছিলেন মনে হয়,” বলে একটা হালকা হাসি টেনে আলিফ দরজার দিকে এগোয়।

হিয়া তাকিয়ে থাকে ওর দিকে, কিছু বলার মতো হয়, কিন্তু শব্দ হয় না। শুধু মাথা নাড়ে আলতো করে। আলিফ দরজার কাছে গিয়ে একবার ফিরে চায়, তারপর চলে যায় নিঃশব্দে, যেন অল্প শব্দেও যেন এই ঘরের নিস্তব্ধতা না ভেঙে যায়।

ঘরে এখন হিয়া আর তূর্য। নিঃশ্বাসের ধীর আওয়াজ, মৃদু আলো, আর ছড়িয়ে থাকা ঔষধের গন্ধে ঘরটা যেন একধরনের অসম্পূর্ণ দুঃখে ভরে থাকে।

হিয়া ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে তূর্যের পাশের খালি চেয়ারে বসে। তূর্যের মুখটা ফ্যাকাশে, চোখদুটো বন্ধ। চুলগুলো এলোমেলো, কপালে ঘাম জমেছে। ওর এই অসহায় চেহারা দেখে হিয়ার বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে ওঠে। তারপরও কোন প্রতিক্রিয়া নেই। হিয়া শুধু বসে থাকে, তাকিয়ে থাকে। আর তার দায়ভরা অনুভুতি ছুঁয়ে থাকে নিঃশব্দে।

জানালার ফাঁক গলে আসা সকালের আলো একপাশ থেকে পড়ছে তূর্যের মুখে। সে তখনো ঘুমিয়ে, শরীরটা অল্প কাঁপছে, জ্বর হয়তো একটু কিন্তু পুরোপুরি নামেনি, তবুও আগের তুলনায় কম। হিয়ার দৃষ্টি আটকে থাকে তার নিঃশ্বাসের ওঠানামায়, যেন সেই নিঃশ্বাসে কোনো অদৃশ্য আশ্বাস লুকিয়ে আছে।

চেয়ারে বসেই হিয়া একসময় ঘরের দিকে তাকাতে শুরু করে। ওর চোখ পড়ে সেই থার্মোমিটারটার দিকে, জলপট্টি ভেজা তোয়ালেটার দিকে, আর একমুঠো ঔষধের পাশে রাখা আধখানা কাচের গ্লাসে। এরপর তার দৃষ্টি ধীরে ধীরে ঘরের একেকটা প্রান্ত ছুঁয়ে যায়, যেমন করে কেউ একটানা কোনো গল্প পড়ে চুপচাপ, মনোযোগ দিয়ে ।‌ ঘরটা আসলে কার ছিল, হিয়া জানে না। কখনো জিজ্ঞেসও করেনি। এঘরে তো ওর তেমন আসাই হয় না। হাতে গুনে এক’দুবার এসেছে বোধহয়। তাছাড়া এই বাড়িতে এতগুলো ঘর! প্রতিটা ঘরেই যেন একেকটা গল্প জমে আছে। এই ঘরটাও তার ব্যতিক্রম নয়।

ঘরের পশ্চিম পাশে একটা পুরনো পড়ার টেবিল। মাথায় খানিক ঘষা লেগে উজ্জ্বল হয়ে যাওয়া, কাঠের সেই বাদামি রঙের নিস্তরঙ্গ স্পর্শে হিয়ার হৃদয়ে নেমে আসে সেকেলে সময়ের ঘ্রাণ। পাশে একটা পুরোনো খাট, কাঠের খোদাই করা মাথাল। খাটের গায়ে পাতলা একটা কাঁথা, তাতে সূক্ষ্ম নকশার ছাপ। সেখানেই তূর্য এখন ঘুমে। ঘরের উত্তর দিকে দাঁড়িয়ে আছে এক পুরনো আলমারি, যেন বহু বছর ধরে সেখানে দাঁড়িয়েই কোনো অপেক্ষা করে যাচ্ছে। তার পাশে এক কোণে রাখা ড্রেসিং টেবিল, আয়নার নিচে কাঠের খুদে ড্রয়ারগুলোর হাতলগুলোও বেশ পুরনো ধাঁচের। দেয়ালের যে লাইটটা, তার সাদামাটা টিনের শেডে ধুলো জমেছে, কিন্তু এই ধুলোও যেন এই ঘরের চরিত্রের অংশ।

হিয়া মনে মনে ভাবে, এই বাড়ির সবচেয়ে সুন্দর বিষয়ই বুঝি এই পুরনোগন্ধ। আধুনিকতার চমক এখানে নেই, আছে সময়ের মলিন ছোঁয়া, আর তার মাঝেই এক অদ্ভুত উষ্ণতা।

চোখ ঘোরাতে ঘোরাতে হঠাৎ দেয়ালের ওপর নজর পড়ে কিছু ছবির ফ্রেমে। দূরে, আলমারির পাশে দেয়ালের এক কোণে টাঙানো সেগুলো। আগেও সে দেখেছে কি-না, মনে করতে পারলো না। হিয়া কী এক অদৃশ্য টান ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায়। পা টিপে এগিয়ে যায় দেয়ালের দিকে, যেন অতীতের কোনো নিঃশব্দ পায়ে হেঁটে যাচ্ছে সে। ছবিগুলোর দিকে হিয়া তাকিয়ে থাকে, এক দৃষ্টিতে। যেন ছবির ভেতর থেকে কেউ তাকে ডেকে নিচ্ছে অতীতের গভীরে। ছবিগুলো পুরনো, খুব পুরনো। সাদা-কালো ভাবটাই প্রথম চোখে পড়ে, আর অস্পষ্টতা যেন সেই প্রাচীনতার সাক্ষী। ছবির কাগজগুলোর কোণ ভাঁজ খেয়ে গেছে, কিছু কিছুতে ফাটল ধরেছে, তবুও তাতে আটকে আছে এক জীবনের বহু গহীন মুহূর্ত। এখানে মোট তিনটে ছবির ফ্রেম, প্রতিটা ফ্রেমে অনেকগুলো মুখ, অচেনা, অজানা। সেইসব মুখে কখনো আনন্দ, কখনো গম্ভীরতা। এখানে শুধু একটা মাত্র মুখ তার পরিচিত, আর সেটা আব্দুর রবিউল মোহাম্মদের। আর একটা ফ্রেমে মাত্র একটা ছবি, যেখানে একা একটা মেয়ে কানে একটা ছোট সাদা ফুল গোঁজা, যেটা সাদা হলেও ছবির রঙহীনতায় সে এক অদ্ভুত কোমলতায় ধরা পড়েছে। চুলগুলো খোঁপা করে বাঁধা, গালে হালকা টোল, ঠোঁটের কোণে এক অপার অমলিন হাসি।

হিয়ার বুকের ভেতরটা কেমন যেন চেপে আসে।‌ "এটা কি… মিনু দাদি?" নিজের মনেই প্রশ্নটা ছুঁড়ে দেয় সে।

ছবিটার হাসির রেখায় কোথাও যেন এক অবর্ননীয় সুখ আছে। তবুও হিয়া দ্বিধায় পড়ে যায়। "কিন্তু এটা তো মিনু দাদির ঘর নয়। তাছাড়া ছবির মেয়ের গালে যে গাঢ় তিল তা তো দাদির মুখে নেই!"

তাহলে......?

______________

চলবে......🖤