নির্বাসিত কৃষ্ণচূড়া — পর্ব ০৪

লেখক: সাদিয়া তিন্তি · বিভাগ: রহস্য · পর্ব ০৪ · ৪৭ পর্বের মধ্যে ৪

সকালের নরম রোদ জানালার কাচ ভেদ করে টেবিলজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। কাচের গ্লাসে ধরা কমলার রস, পাঁপড়ভাজা আর রুটি-সব্জির গন্ধে টেবিলটা যেন মুখরিত। বাংলাদেশের এক এক কোনে থাকা মানুষ গুলো এক টেবিলে বসা। পিউ বিষয়টা ভেবে যেন খুব মজা পেল। বাংলাদেশের টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত এক টেবিলে বসে সকালের চা খাচ্ছে সবাই!

চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে পিউ এবার কৌতূহলী মুখ করে প্রশ্ন ছুঁড়ল, “আচ্ছা বড় দাদা, তোমার নামটা একটু বেশিই আপডেট না? মানে, ইতিহাসে যত মানুষের নাম পড়েছি সব দাদু-দাদু টাইপের। রহিম, করিম, রফিক, হাশেম। আর তুমি? একেবারে 'রুশান'! নামেই যেন ফিউচার ঝিলমিল করে! এই নামের পেছনে কোনও গল্প আছে নাকি?”

আব্দুর রুশান মোহাম্মদ হালকা হেসে মাথা ঝাঁকালেন। তাঁর হাসি ছিল এমন এক অভ্যস্ত ধৈর্যের মতো, যা জীবনের বহুবার শোনা প্রশ্নকেও ভালোবাসা দিয়ে উত্তর দেয়।

“আছে তো! আসলে ব্যাপারটা অনেকটাই মজার। আমার বাবার খুব প্রিয় এক বন্ধু ছিলেন, উর্দুভাষী। খুবই আলাদা মানসিকতার মানুষ, একদম আলাদা ঘরানার। তাঁর নাম ছিল ‘রোশান’। মানে আলোকিত, দীপ্তিময়। আমার জন্মের সময় সেই বন্ধুই নাকি বাবাকে বলেছিলেন, ‘ভাইজান, ইস বাচ্চে কা নাম রোশান রাখো।’

বাবাও উৎসাহে নাম রেখে দিলেন রোশান। কিন্তু বাঙালির একটা চিরাচরিত অভ্যাস আছে তো ভাষা আর উচ্চারণ নিজের মতো করে নেয়। তো রোশান হতে হতে আমার নাম হয়ে গেল ‘রুশান’। আর ওদিকে বাবার ধর্মীয় অনুভূতি থেকেই যোগ হলো 'আব্দুর' আর 'মোহাম্মদ'। সেই থেকে আব্দুর রুশান মোহাম্মদ।”

পিউ হা করে শুনছিলো। এক সময় বলে উঠলো, “উফ! দারুণ! বড় দাদা, বেচারা পাকিস্তানি বন্ধু হয়তো শুধু তোমার নামই রেখেছিল তাই না!”

পিউয়ের কথার ইশারা বুঝে চারপাশের সবাই হেসে উঠলো। মিনু রহমান তো বলেই উঠলেন, "এই দস্যি মেয়ে আমার নামটি কি খারাপ!”

পিউ একসময় মুখে একটু দুষ্টু হাসি নিয়ে মিনু রহমানের দিকে তাকিয়ে বলল, “না না মিনু দাদু, তোমার নামও তো দারুণ আধুনিক! তোমার নাম কি কোনো তুর্কি সিরিয়ালের নায়িকাদের দেখে রাখা?”

মিনু চোখ গরম করে তাকালেও মুখে হাসি চেপে রাখতে পারল না। বলল, “তোর মুখের লাগাম খুলে দিলেই তুই রকেট হয়ে যাস, পিউ!”

সবাই আবার হেসে উঠল।

খাবার ধীরে ধীরে শেষ হতে লাগলো। একে একে সকলে চা শেষ করে হাত ধুতে উঠল। সকালের এই প্রাণখোলা আড্ডা আর হাস্যরস যেন একেকজনের মুখে রোদ্দুর হয়ে লেগে রইল।

হিয়া একটু ধীর পায়ে হাঁটতে হাঁটতে নিজের রুমে ফিরে এলো। দরজা আটকে দিয়ে হালকা একটা নিঃশ্বাস ফেলল। চারপাশের কোলাহল পেরিয়ে সে যেন আবার নিজের নিঃশব্দ জগতে ফিরে এসেছে।

সাইড টেবিলের ড্রয়ার খুলে আবার সেই ডায়েরিটা বের করল। ঠিক তখনই দরজায়- ঠক ঠক।

দরজার ওপারে ভেসে এলো এক পরিচিত কণ্ঠ, গম্ভীর কিন্তু মৃদু স্বর,

“ঘরের কোণে লুকিয়ে বসে থাকলে চলবে! এসো আমার ঘরে, সবাই মিলে একটু বসা যাক।"

চমকে উঠে হিয়া, তৎক্ষণাৎ ডায়েরিটা ড্রয়ারে ঢুকিয়ে দিল। এমনভাবে যেনো কেউ ওর ভেতরের সব গোপন কথা এক ঝলকে দেখে ফেলতে পারে ভয়ে। দরজা খুলতেই আব্দুর রুশান মোহাম্মদের মুখে সেই চিরচেনা মোলায়েম হাসি। বয়স তার চোখের কোণে ভাঁজ ফেললেও চোখে ছিল এক প্রশান্ত দীপ্তি।

“চলো, বাকিদেরও ডাকি।”বলতে বলতেই তিনি পিউ, আলিফ, মিম, তূর্য সবার নাম একে একে ডাকতে লাগলেন।

আব্দুর রুশান মোহাম্মদ বইটা হাতের মুঠোয় একটু শক্ত করে ধরলেন। মলাটে আঙুল বোলাতে বোলাতে যেন কোনো পুরোনো পথঘাট ছুঁয়ে দেখছেন, যেখানে শব্দেরা গল্প হয়ে উঠেছিল, আর গল্প হয়ে উঠেছিল স্মৃতির ঘ্রাণ। তাঁর চোখে তখন এক আশ্চর্য কোমলতা, যেন কোনো দৃশ্যমান বেদনা নয়, কিন্তু এক গহন আনন্দ।

“এটা আমার পড়া প্রথম উপন্যাস। সবার জীবনে সবকিছুর একটা প্রারম্ভ থাকে। ঠিক আমার উপন্যাস জগতে প্রবেশের হাতে করেছিল। তোমাদের কি মনে হয় আমি প্রথম থেকেই উপন্যাস প্রেমে ছিলাম? সমগ্র বই দেখছো এগুলো একটু একটু করে জমানো, সময়ের সাথে সাথে, বয়সের সাথে সাথে। জীবন আসলে কখন কোন অভ্যাস পরিবর্তন করে, পরিবর্ধন করে, তা আসলে জীবন নিজেই জানে।”

তার কণ্ঠে তখন এক অন্তর্লীন সুর, যেন সেই বইয়ের পাতাগুলোর মধ্যেই জড়িয়ে আছে তার জীবনের একটি অনুচ্চারিত অধ্যায়।

তূর্য, যে এতক্ষণ চুপ করে বসে ছিল, এবার হঠাৎ একটু নড়েচড়ে বসল। তূর্যর কাছে আব্দুর রুশান মোহাম্মদের এই কথাটুকু হয়তো বেশ আকর্ষণীয় লাগলো, “কিন্তু আপনি ধৈর্য কোথা থেকে জোগাড় করলেন? উপন্যাস যারা পড়ে তাদের অনেক ধৈর্য থাকা দরকার, হুট করে তারা উপন্যাস পড়ুয়া হয়ে যাওয়া যায় না।”

আব্দুর রুশান মোহাম্মদ হঠাৎই এক প্রাণখোলা হাসি হেসে উঠলেন। সেই হাসির মধ্যে ছিল স্মৃতির রোদেলা উষ্ণতা, আর একটু হালকা আত্ম-উপহাস।

“তা ঠিক বলেছ, বেটা! তোমার বয়সে আমিও ভাবতাম, উপন্যাস পড়া মানেই যেন বাড়াবাড়ি। হয়তো বাস্তব যখন কাঁটা দেয়, তখন কল্পনাই হয়ে ওঠে আশ্রয়।”

একটু থেমে, বইটা আরো শক্ত করে চেপে ধরে তিনি যেন ফিরে গেলেন কোন এক অসমাপ্ত অতীতে।

"‘নি:সঙ্গতার একশো বছর’, এটা তার সবচেয়ে পছন্দের উপন্যাস ছিল। অবহেলায় পড়ে ছিল আমার বুকশেলফের এক কোণায়, ধুলো জমা পাতার ভাঁজে। তারপর একদিন নিঃসঙ্গতা এমনভাবে আমাকে ঘিরে ধরল, যেন নিঃশ্বাস ফেলারও জায়গা ছিল না। তখন এই বইটাই হয়ে উঠলো আমার সঙ্গী। পাতার পর পাতা যেন কেউ আমার কাঁধে হাত রাখছে, চুপ করে পাশে বসে আছে।

সুখ খুঁজলাম শব্দের আড়ালে, পাতার নিচে লুকানো বাক্যগুলোয়। বিশ্বাস করো, যদি একবার শুকনো পাতায় সুখের ঘ্রাণ পেয়ে যাও, তাহলে সে আর কখনো তোমাকে ছেড়ে যায় না।”

হিয়া একটু চুপ করে থাকলো, তারপর চোখে একরাশ বিস্ময় নিয়ে বলল,

“তারমানে এই একটা উপন্যাস আপনাকে হাজারটা উপন্যাস পড়িয়েছে?”

আব্দুর রুশান মোহাম্মদ তাকালেন হিয়ার চোখে, আর একদম ধীর গলায় বললেন,

“ঠিক তাই। একটার ভিতরে লুকিয়ে ছিল হাজারটা পথ, আর আমি শুধু হাঁটতে শুরু করেছিলাম।”

আব্দুর রুশান মোহাম্মদ আর কোনো উত্তর দিলেন না। শুধু একটুখানি মৃদু হাসি মুখে ফুটে উঠলো, তাতে ছিল না কোনো রঙ্গিন উচ্ছ্বাস, ছিল নিঃশব্দ এক অভিমানী স্মৃতি।

ততক্ষণে পিউ হঠাৎই সবার আলাপে ঢুকে পড়লো, মুখে ছেলেমানুষী আগ্রহ,

“আজ কিন্তু প্রকৃতিদের এলাকায় যাবো! আর কিছু জানি না। তোমার সেই মন্টু মামা না ঝন্টু মামা! যেই হোক না কেন, তাঁর দোকানে চা খাওয়াতেই হবে আমাদের।”

আব্দুর রুশান মোহাম্মদের ঠোঁটের কোণে হাসির রেখা ঠেকলো ঠিকই, তবে সে হাসি যেন স্মৃতির ধুলোয় ম্লান হয়ে যাওয়া ছবি। চোখদুটো আচমকাই জ্বলে উঠলো—না, কোনো উচ্ছ্বাসে না, একধরনের কোমল শোকের আলোর মতো।

“সেই চায়ের দোকান আর নেই, পিউ,” তাঁর কণ্ঠে নেমে এলো একান্ত এক বিষণ্নতা,

“সেই দোতলা বাড়িটাও আর দাঁড়িয়ে নেই। দোকানটা এখন আধুনিক কফি শপে রূপ নিয়েছে। সময় সবকিছু, ধুয়ে মুছে নতুন করে তুলেছে।”

এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা ছড়িয়ে পড়লো চারপাশে। কথা হঠাৎই কমে এলো। আড্ডাটাও যেন থেমে গিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাসে পরিণত হলো।

বাইরের দুপুরটা আরো গাঢ় হয়ে উঠলো, অথচ তাপটা ধীরে ধীরে হালকা হয়ে বিকেলের নরম বাতাসে গলে যেতে লাগলো। ঘরের ভিতর আলো-ছায়া মিলে তৈরি হলো এক অদ্ভুত আবরণ, ঠিক যেন স্মৃতির চাদরে ঢাকা পড়ে গেল সকালের প্রাণচঞ্চলতা।

আর সময়?

সে তো চুপিচুপি চলে যায়। দরজার ছায়া লঙ্ঘন করে, উঠোনের রোদের ভাঁজে চাপা পড়ে থাকে বাড়ির মানুষগুলোর নিত্যদিনের দিনযাপনের নিচে।

ঘড়ির কাঁটা তখন চারটা ছুঁয়ে পেরিয়েছে বারো মিনিট। রোদটা আর ঝলমলে নয়, তবু একরকম স্বর্ণালি আলোয় ভেসে যাচ্ছে ঢাকার পুরনো অলিগলি। সবাই মিলে পায়ে হেঁটে চলেছে পুরোনো এক ঠিকানার দিকে, যেখানে স্মৃতি আছে, গল্প আছে, আর আছে সময়ের জমে থাকা স্তর। হঠাৎ এক পুরোনো গলির সামনে দাঁড়িয়ে হিয়া থেমে গেল। মাথা একটু কাত করে চোখ মেলে তাকিয়ে বলল,

“এটাই তাহলে শ্যামাপ্রসাদ রায় লেন, লক্ষ্মীবাজার?”

তার কণ্ঠে ছিল না কৌতূহল, ছিল যেন একটি স্বপ্নের বাস্তব রূপে ফেরা, একটা অনুভব, যা শুধুই হৃদয়ের গভীর থেকে এসেছে।

সবাই কথাটা মৃদু শুনলেও, তেমন গুরুত্ব দেয় না।

তবে দুটো চোখ, দু'টি প্রাজ্ঞ, অভিজ্ঞ চোখ যেন হিয়ার কণ্ঠস্বরের মধ্যে সময়কে খুঁজে নেয়‌।

আব্দুর রুশান মোহাম্মদ থেমে একটু গম্ভীর স্বরে বলে উঠলেন,

“হ্যাঁ, শ্যামাপ্রসাদ লেন।”

হিয়ার বুকের ভেতর যেন হঠাৎ কিছু নড়ে উঠলো।

চোখের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা পুরোনো বাড়িটা এখন আর সেই আগের মতো নেই। সেই লাল ইটের দোতলা গড়নের পুরোনো বাড়িটা ভেঙে জায়গা করে নিয়েছে এক নিরস বহুতল ভবন। নির্মাণে আধুনিক, কিন্তু প্রাণহীন।

হিয়া জানে, এই বাড়িকে সে প্রকৃতির চোখে খুব চেনে। প্রকৃতি তার লেখা প্রতিটি শব্দ চয়নে নিখুঁত বর্ননা দিয়েছে এবাড়ির প্রতিটা ইটের।

প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি বাক্য যেন এই বাড়ির দেয়াল স্পর্শ করেই জন্ম নিয়েছিল।

হিয়া ভাবলো, সেই স্মৃতিগুলো কি হারিয়ে গেছে এই কংক্রিটের ছাদ আর টাইলসের নিচে?

তবে ভাবনা নিয়ে আগালো না আর। তারা ধির কদমে আগালো সেই চায়ের দোকানের দিকে। মন্টু মামার চা। যে দোকার বরাবর প্রকৃতির বারান্দা ছিল বোধহয়। কিন্তু বাড়িটার সামনের চায়ের দোকানের সংস্কারও এখন আধুনিক। হারিয়ে গেছে চায়ের অভিজাত্য। সেখানে দাঁড়িয়ে আছে চকচকে এক কফিশপ। মন্টু মামার ছেলে এখন সেসব সামলায়। দেয়ালে ক্যাপুচিনোর মেনু, আর কাঁচের জানালার পাশে অচেনা তরুণ-তরুণীর নিস্পৃহ হাসি।

হিয়ার মনে হলো, সময় কেবলই নিয়ে যায়, ফিরিয়ে দেয় না কিছুই।

সময় পেরোলো। আড়ষ্টতা কাটলো বোধহয়। গলিটা পেরোতেই আব্দুর রুশান মোহাম্মদ থেমে দাঁড়ালেন। মাথাটা একটু হেলিয়ে বললেন,

“চলো, তোমাদের একটা জায়গায় নিয়ে যাই। খুব স্পেশাল।”

হিয়া, তূর্য, পিউ তিনজনই একটু চমকে তাকালো। আব্দুর রুশান মোহাম্মদ মুখে যেন এক রকমের ছেলেমানুষি হাসি ফুটে উঠেছে। চোখ দুটোয় সেই চিরচেনা দীপ্তি, যেটা সময় ছুঁতে পারে না।

এগিয়ে চললেন সরু একটা গলির ভিতর দিয়ে, যেটা হয়তো গুগল ম্যাপে নেই, কিন্তু তাঁর হৃদয়ের মানচিত্রে আঁকা আছে স্পষ্টভাবে। কিছুদূর হেঁটে তারা পৌঁছাল এক ছোট্ট দোকানের সামনে। সাইনবোর্ডে লেখা,

“গোপাল মিষ্টান্ন ভাণ্ডার –১৯৫২”

ঝাপসা রঙ, ফিকে হয়ে যাওয়া হরফ, আর কাঠের ফ্রেমে আঁকা রসগোল্লার ছবি। সবই বলছে, এই দোকান সময়ের কাছে মাথা নোয়ায়নি, বরং সময়কে নিজের রঙে রাঙিয়ে রেখেছে।

“এই দোকানটাই,” আব্দুর রুশান মোহাম্মদ গম্ভীর সুরে বললেন,

“আমার অনেক ম্মৃতি আছে এখানে। খুব ছোট, থাকতে বাবার সাথে আসতাম। মিস্টি মানেই গোপাল কাকার রসগোল্লা।”

দোকানের ভেতরে ঢুকতেই এক ধরণের চিনি-ভেজা গন্ধ, যার সঙ্গে জড়িয়ে আছে বয়সকে হার মানিয়ে নেয়া যুবক রুশানের রঙিন উপস্থিতি।

একজন বৃদ্ধ দোকানদার মুচকি হেসে বললেন,

“ওহ, রুশান ভাই! অনেক দিন পর!”

আব্দুর রুশান মোহাম্মদ বিনয়ের সাথে মাথা নুইয়ে হাসলেন,

“নাতি নাতনিদের নিয়ে এলাম। রসগোল্লা আর লুচি দিও। ”

চোখের কোণায় জল জমে উঠেছিল কিনা, সেটা কেউ দেখল না। তবে হিয়া দেখলো, এই পুরোনো দোকানটা যেন নিজেই এক ঐতিহ্য। কে জানে কতো বাচ্চার বৃদ্ধ হওয়া দেখেছে!

সবার সামনে ধীরে ধীরে এসে বসলো কয়েকটা মাটির প্লেট। তার ভেতরে গোলগাল, সাদা রসগোল্লা। টসটসে রসে ডোবা। তৃপ্তি আর নস্টালজিয়ার মিশেলে এক অদ্ভুত নীরবতা ছড়িয়ে গেল চারপাশে।

রোদ তখন ঢলে পড়েছে গলির ধুলোর ওপর।

সন্ধ্যার বাতাসে পুরোনো ঢাকার গলিগুলো যেন আরেকবার অতীত ছুঁয়ে ফিরছে। সবাই ধীর পায়ে ফিরে চলেছে বাসার দিকে। পিউ আর মিম গল্প করতে করতে পেছনে পড়েছে একটু, আলিফ আব্দুর রুশান মোহাম্মদের সাথে হেটে চলেছে অন্যমনস্ক। তূর্য হাটছে আড়াল হয়ে একমনে,আর হিয়া যেন হাঁটছে ঠিক শব্দের আন্দোলন নিয়ে। প্রকৃতির ডায়রির ঘুমন্ত শব্দের জীবন্ত রুপ দেখে হিয়ার আরো জানার তৃষ্ণা যেন আকাশ ছুইছে।

বাসায় ফিরেই হিয়া আর অপেক্ষা করতে পারল না। তার চোখে মুখে ছিল এক অদ্ভুত তাড়াহুড়ো, যেমনটা হয় খুব কাছের কারো চিঠি খুলে পড়তে যাওয়ার আগে।

ডায়েরিটা সে যত্ন করে ড্রয়ারের এক কোণা থেকে বের করল। সে ধীরে ধীরে পাতাগুলো উল্টাতে লাগল।প্রত্যেকটা শব্দে যেন সময় জমাট বেঁধে আছে।প্রকৃতির লেখাগুলো শুধু কাগজে আঁকা নয়,

হিয়ার বুকের ভেতরে ধীরে ধীরে ছায়া ফেলে যাচ্ছে।

হিয়া এবার সত্তরের পাতাগুলো পেরিয়ে পৌঁছাল একাত্তরের গহীনে। ডায়েরির পাতাগুলো যেন হয়ে উঠল সময়ের সেতু। প্রকৃতির শব্দচয়ন এতটাই স্পষ্ট, এতটাই জীবন্ত, যেন সে নিজেই চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছে সেই নিঃশব্দ দুপুরগুলোকে, যেখানে বাইরের পৃথিবী থেমে থাকলেও কারও হৃদয় স্পন্দন থেমে থাকেনি।

এই অধ্যায় একান্তই গৃহবন্দিত্বের। শব্দে শব্দে আঁকা প্রকৃতির একলা সময়, আর সেই নিঃসঙ্গ মুহূর্তগুলোর ফাঁকে ফাঁকে ফুটে ওঠা আব্দুর রুশান মোহাম্মদের স্থির, নিরব, অথচ গভীর উপস্থিতি। প্রতিটি বিকেল ঠিক চারটায় ঘড়ির কাঁটা যেমন সময় চেনে, ঠিক তেমনি মন চিনে ফেলে সেই নির্দিষ্ট পদধ্বনি। মন্টু মামার চায়ের দোকান ছিল রুশানের নিত্য গন্তব্য, কিন্তু প্রকৃতির জন্য, সেটা ছিল যেন অপেক্ষার চূড়ান্ত সংজ্ঞা।

ডায়েরির এক পাতায় লেখা,

“বাইরে যুদ্ধের হাহাকার, ভেতরে হৃদয়ের একটানা স্তব্ধতা। চারপাশে আতঙ্ক, কাঁটা তার, উর্দি আর রাইফেলের ঝড়। তবুও রোজ বিকেল চারটায়

রুশান চুপচাপ এসে বসে সেই চায়ের দোকানে।

চা খায়, কিছু বলে না, তবে তার চোখে থাকে ভাষাহীন আশ্বাস যেন বলে, ‘তুমি একা নও।’

কি অমায়িক, কি নিশ্ছল, কি উদার এক প্রেম!”

হিয়ার চোখে জল এলো না, তবে চোখের ভেতরে ভিজে উঠল সময়। প্রকৃতির ভালোবাসা কোনো প্রকাশ্য চিঠি নয়, তা এক গোপন ব্যাকরণ। যার ব্যঞ্জনা শুধু অনুভব করা যায়, বলা যায় না।

হিয়া মনে মনে বলল, “এ কেমন প্রেম? না বলা, না চাওয়া, তবুও এতটা গভীর, এতটা নিঃস্বার্থ?”

চায়ের কাপের ধোঁয়ার ভেতর দিয়ে হয়তো প্রকৃতি রোজ রুশানের ভালোবাসা দেখছিল। কোনো দাবি ছিল না, প্রতিশ্রুতিও না, শুধু এক অনন্ত উপস্থিতি।

আর হিয়া, সেই ডায়েরি হাতে বসে আছে, প্রতিটা শব্দ ছুঁয়ে ছুঁয়ে পড়ে যাচ্ছে এক অসমাপ্ত ভালোবাসার অলিখিত ইতিহাস।

হিয়া ডায়েরির পাতাগুলো আস্তে আস্তে উল্টে চলেছে। কালির গন্ধে ভিজে থাকা সেই পুরোনো পাতাগুলোর ভাঁজে সময়ের শ্বাস লুকিয়ে আছে।

একেকটা বাক্য যেন একেকটা নিঃশব্দ বিস্ফোরণ। মনের ভিতরে ছড়িয়ে দিচ্ছে হাহাকার,

ভালোবাসা, হারানোর ক্লান্ত আর্তি।

ডায়েরির শেষদিকের পাতায় কালি কিছুটা ঘোলাটে, আলগা অক্ষর, অস্পষ্ট হাতের লেখা।

তবু শব্দগুলো যেন কান্নার মতো স্পষ্ট। ভাঙা গলায় লেখা, তবুও মনে হয় হৃদয়ের গহীন থেকে উঠে এসেছে।

প্রকৃতি লিখেছে,

"নিজের সাথেই যুদ্ধ ঘোষণা করেছি আজ। বাইরের বিষ্ফোরণ যে আমার অন্তর জ্বালিয়ে দিচ্ছে!

ছোট কাকা বাবু মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। বাবা এতে নারাজ। স্বাত্ত্বকি মা হারা ছেলে। এখন যদি বাবাটার ও যুদ্ধে কিছু হয়ে যায় তবে কি হবে? এই চিন্তাই হয়তো বাবাকে আরো মগ্ন করছে। বাবা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন আমাদের সবাইকে নিয়ে চিরকালের মত কলকাতায় চলে যাবেন।

চিরতরে।

সকালে দিপ্তী এসেছিল। ওর মাসিমনির ঠিকানা দিয়ে গেলো। কাল ভোরের ট্রেনেই নাকি ওরাও কলকাতায় ছুটবে ‌।

দেশের যা পরিস্থিতি এতে মৃত্যু ছাড়া বাতাসে আর কোন গন্ধ নেই। সে যাই হোক আমি কিছুতেই যাবো না।

আমি কিছুই বলিনি প্রথমে। তবু ভিতরে ভিতরে একটা ঝড় উঠছিল।

আমি বোঝাতে চেয়েছিলাম… বুঝিয়েওছিলাম

আমি এই শহরটাকে ছেড়ে কোথাও যেতে চাইনা।

আমি ঠিক পালাইনি। মুক্তি চাইছি। রুশানের কাছে পালিয়ে যাই নি। আমি সুখ আর স্থায়িত্ব খুঁজতে গিয়েছিলাম সন্ধ্যায়। মাসুমকে ওদের আড্ডার জায়গায় পেয়েছিলাম বলে ঠিকনা খোজা সহজ হলো। কিন্তু আমার জীবনটা কি এত সহজ?

রুশান মুক্তিযুদ্ধে যাচ্ছে। যাবেই। এই দেশকে স্বাধীন কে করবে যদি ওরা না যায়। আমি চাই কাকা বাবুও যুদ্ধে যাক, দেশ মাকে নিয়ে আসুক। আমরা কি দেশের ভাড়াটিয়া নাকি!

আমি রুশান কে শুধু বলেছি আমাকে নিয়ে পালিয়ে চলো। কিন্তু রুশান মুক্তিযুদ্ধে যাচ্ছে আর এক বীরের সাথে আমি পালাতে বরাবরই প্রস্তুত। কিন্তু এবার বীরের জন্য অপেক্ষার পালা।

আমি খুব শান্তভাবে ফিরে এসেছি। কিন্তু ঘটনা কি এত শান্ত ছিল?

ফেরার পথে বাবার বড়দা ভাই দেখে নেন। তারা ভেবেছেন আমি পালিয়েছি কিংবা পালানোর চেষ্টা করছি। আর তাই গৃহবন্দী থেকেও বড় কারাবন্দিতে পরিণত হলাম। আমি কারাবন্দী হয়ে সমগ্র জীবন কাটিয়ে দিতে পারি কিন্তু তারপরও কিছুতেই আমি এই দেশ ছেড়ে যাব না।

আমি জানি একবার রুশানকে ছেড়ে, এই দেশ ছেড়ে যদি আমাকে যেতে হয় আমার কাছে ফেরার কোন রাস্তা থাকবে না।

আমি এখানেই থাকবো এখানেই।"

শেষ!

এরপর?

কোথায় এর পরের পৃষ্ঠা?

কেন কেউ ছিঁড়েছে এমন নৃশংসভাবে?

কে এতটা সাহস করলো এই কাহিনির কফিন বন্ধ করতে?

হিয়ার চোখ ছলছল করছে। ডায়েরির পাতায় নয়, ঠিক নিজের বুকের উপর কান্না জমে উঠছে।

প্রকৃতিকে কি সত্যিই জোর করে কলকাতায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল?

নাকি সে থেকেছিল এই শহরে, কোনো গোপন জানালার পাশে, রুশানের ফেরার আশায়?

প্রশ্নের দাবানলে পুড়ে যাচ্ছে হিয়া। তার দম বন্ধ হয়ে আসছে। গৃহবন্দী প্রকৃতি নয়, গৃহবন্দী হয়ে উঠেছে হিয়া নিজেই।

প্রকৃতির হারিয়ে যাওয়া পৃষ্ঠাগুলো যেন তার নিজের শ্বাস কেড়ে নিচ্ছে। ডায়েরির অক্ষরে শুধু ইতিহাস নয়, ভেঙে পড়া এক নারীর আত্মদহন, এক ভালোবাসার অনন্ত প্রতীক্ষা, এক যুদ্ধের নিষ্ঠুর জবাব। এই ডায়েরি এখন শুধু প্রকৃতির নয়, এটা হিয়ারও হয়ে গেছে।

হিয়ার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে। ঘরটা হঠাৎ করে চারদেয়ালে বন্দি এক ধোঁয়াটে বিষ। ডায়েরিটা তার বুকের ওপর যেন পাথরের মতো চেপে বসেছে। ও আর সহ্য করতে পারল না।

দৌড়ে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে। সিঁড়ি ভাঙতে ভাঙতে ওর মনে হচ্ছিল, প্রতিটা ধাপ যেন সময়ের বিপরীত স্রোতে ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে ওকে,

যেখানে প্রকৃতি, রুশান, যুদ্ধ… আর এক হাহাকার এখনও বেঁচে আছে। ও ছাদে উঠে এল।

গা ছমছমে হাওয়া বইছে, চাঁদের আলো ছড়িয়ে পড়েছে সাদা ফসফোস ফ্লোরে। আর সেখানেই, কিনারায় দাঁড়িয়ে তূর্য। এক হাতে সিগারেট, অন্য হাতে স্তব্ধতা। ধোঁয়ার সরল রেখা চাঁদের দিকে ছুঁড়ে দিচ্ছে বারবার।

হিয়া দাঁড়িয়ে পড়ল।

কি আর, তূর্যকে অপ্রত্যাশিত লাগলো না। তবে তাও হিয়া দাঁড়িয়ে গেল। তূর্য তাকালো ওর দিকে‌। দৃষ্টিতে কোনো চমক নেই, যেন স্বাভাবিক সব। তবু কিছু বলল না।

হিয়া পিছিয়ে ফিরতে চাইল, চোখ সরিয়ে পা বাড়ালো।

"ছাদে এসেছিস কি চলে যাওয়ার জন্য?"

তুর্যর কণ্ঠ শীতল, কিন্তু গম্ভীর। কথাটা হিয়াকে পেরেকের মতো বিঁধে দেয়।

"না তূর্য ভাই… আপনি এখানে, তাই আর কি…" গলার স্বর কাঁপে, মুখটা ঘুরিয়ে নেয়।

চাঁদের আলোয় তুর্য ভালো করে তাকিয়ে নিল হিয়ার চোখের দিকে। "তুই কাঁদছিস?"

হিয়ার বুক যেন ধক করে ওঠে। "না… ঠিক না…" শব্দগুলো বাতাসেই হারিয়ে যায়।

তুর্য ইশারায় ওকে ডাকে কাছে। হিয়া ধীর পায়ে এগিয়ে যায়, যেন কোন মন্ত্রে বাঁধা পড়েছে।

"তোর কি আমার সাথে কথা বলতে মানা?" তুর্যর স্বরে অভিমান নেই, আছে একটা সরল প্রশ্ন।

হিয়া এবার প্রতি উত্তর করল না চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলো। আজকের তূর্যকে যেন প্রথমবারের মতো দেখছে। কোনো খোলস নেই, কোনো মুখোশ নেই, শুধু ধোঁয়ার মাঝে দাঁড়িয়ে থাকা একটা রক্তমাংসের মানুষ।

তূর্য সিগারেটটা শেষ করে পায়ে পিসে নিলো। "বল শুনি তোর কান্নাকাটির কারণ কি? ছ্যাকা খেয়েছিস! নাকি কোন ছেলে ঘটিত অন্য কাহিনী?"

হিয়া চোখগুলো বড় বড় করে তূর্যর মুখের দিকে তাকিয়ে পড়ল। হিয়া যে তূর্যকে চেনে তার মুখে তো এতো কথা কখনো ছিল না। সে তো ছিল শান্ত নদী। হিয়া চোখ সরিয়ে বলল, "কেন ছ্যাকা খাওয়া ছাড়া কি মানুষের মনে দুঃখ থাকতে নেই?"

তুর্য এবার সত্যি হাসল। সেই হাসি যেন কুয়াশার ভিতর দিয়ে আসা কোনো পুরনো বিকেলের মতো। হিয়া অবাক হল, তূর্য হাসতেও জানে!

তারপর আবার নিরবতা। হিয়ার ছোট্ট মস্তিষ্ক বারবার প্রকৃতিকে সমাধান করতে ব্যর্থ হচ্ছে এই ব্যর্থতা ওর নিজের? নাকি পরিস্থিতি ওকে বারবার ব্যর্থ করছে?

হিয়া কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকল। ছাদের হাওয়া যেন একটু থেমে গিয়েছে, কিন্তু ওর ভেতরটা ঠিকই ঝড়ের মতো তোলপাড় করছে। হঠাৎ বুকের ভেতর জমে থাকা কথাগুলো আর আটকে রাখতে পারল না।

"তূর্য ভাই…" ওর গলা এবার নিঃসঙ্কোচ, স্থির।

"আপনার কি মনে হয়, প্রকৃতি বড় দাদাকে কেন ছেড়ে গিয়েছিল? হঠাৎ কোথায় গায়েব হয়ে গেল? কেউ কেন কিছু জানে না!"

তূর্য মাথা ঘোরায় না। যেন আগেই আঁচ করেছিল প্রশ্নটা। কিছুটা বিরক্ত, কিছুটা ক্লান্ত স্বরে বলে ওঠে,

"আবার প্রকৃতি! তোদের এই প্রকৃতি আর রুশান শুনতে শুনতে আমি পুরো পেকে গেছি। ঘরে ঢুকলেই কেউ না কেউ এই টপিক টেনে আনে।

৫০/৫২ বছর আগের ঐ চরিত্রটাকে গিয়ে দেখ

বাচ্চা-কাচ্চা, নাতি-নাতনি নিয়ে দিব্যি সুখে সংসার করছে। আর বড় দাদা দেবদাস হয়ে বসে আছে। আর তোরাও পেয়েছিস একটা গল্প, সেটা নিয়েই সারাদিন চর্চা।"

হিয়ার তূর্যের কথা একদমই পছন্দ হলো না। তবুও সে একটুও পেছালো না। বরং ঠোঁট শক্ত করে বলল, "হ্যাঁ আপনি একাই সব জানেন। আর প্রকৃতি তো কোন গল্পের চরিত্র নয়, একটা জলজ্যান্ত মানুষ। আপনি জানেন আলিফ আর পিউ গতদিন চিলেকোঠায় প্রকৃতির ডায়েরি পেয়েছে।"

তূর্যের মুখের অভিব্যক্তি এবার পাল্টাল। সে ঘুরে তাকাল হিয়ার দিকে। ঠোঁটের কোণে এক তীব্র কৌতূহল।

"প্রকৃতির… ডায়েরি? চিলেকোঠায়? হাস্যকর না? রুশান আর প্রকৃতির প্রেম যদি এতটাই গভীর ছিল, তাহলে-- প্রেমিক কেন প্রেমিকার ডায়েরি চিলোকোঠায় ফেলে রাখবে?"

হিয়া যেন নিজের খটকার সঙ্গে তূর্যের শব্দের মিল পেল। নিজেকে এবার আর ধরে রাখতে পারল না, কণ্ঠে চাপা উত্তেজনা।

"আমারও তো সেটাই প্রশ্ন! সব থেকে অদ্ভুত বিষয় কি জানেন? ডাইরির শেষ অনেকগুলো পৃষ্ঠা কেউ ছিঁড়ে নিয়েছে। খুব জোর জবরদস্তি করে ছিঁড়েছে।"

তূর্য এবার প্রকৃতির গল্পে বেশ ইন্টারেস্ট পেল। ""এবাড়িতে কারও ডায়েরি, আর সেটা ছেঁড়া? এখন তো সত্যি ইন্টারেস্টিং লাগছে।

ডায়েরিটা আমাকে দিস। আমিও একটু দেখতে চাই…"

হিয়া এবার তার চিরচেনা চাঞ্চল্য নিয়ে বলল,

"তূর্য ভাই ডাইরিতে সম্পূর্ণ প্রেম কাহিনী লেখা। শুধু প্রেম কাহিনী না প্রকৃতির সমগ্র জীবনী। কিন্তু প্রকৃতি কোথায় সেটার উত্তরটা হয়তোবা শেষ পাতাই ছিল। আর কেউ জোর করে ওটাই ছেড়ে নিয়েছে। একবার ভাবুন, প্রকৃতির ডায়েরি এই বাড়িতে কি করছে?"

ছাদে যেন এক মুহূর্তের জন্য সব থেমে গেল। চাঁদের আলো নরম করে নামছিল তূর্য আর হিয়ার গায়ে। বাতাস হালকা একটা কান্না চাপা দেওয়ার মতো নিস্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। হিয়ার কণ্ঠে উচ্চারিত প্রশ্ন গুলো যেন নিশুতি রাতের বুক চিরে ছড়িয়ে পড়তে লাগল ধীরে ধীরে।

তূর্য থেমে গেছে। মুখে কোনো শব্দ নেই, চোখে এক অচেনা ভাবনা। হয়তো এই প্রথম সে প্রকৃতিকে নতুন করে ভাবছে, একটা মানুষের মতো, একটুখানি কৌতূহল নিয়ে, সামান্য ব্যথা নিয়ে।

হিয়া আচমকা সিঁড়ির দিকে ছুটে গেল। দৌড় যেন সময়কে ছুঁয়ে যাচ্ছিল। এক মুহূর্ত পর, হাঁপাতে হাঁপাতে ফিরে এসে হাতে তুলে দিল সেই পুরোনো, ধুলো মাখা ডায়েরিটা।

তূর্য ডায়েরির মলাটে আঙুল বুলিয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকল। আর তখনই, হিয়া প্রথমবার তূর্যকে একটু ভিন্নভাবে দেখল। এটা ভালো লাগা নয়, আবার আগের মত বিরক্তি কিংবা রাগও নয়। এটা... অন্যরকম।

তূর্যের চোখে এক অদ্ভুত আলো, যেন কুয়াশার আড়ালে লুকিয়ে থাকা কোন চেনা অথচ অচেনা গল্প সে দেখতে পাচ্ছে। রহস্য আসলে এমনই এক জিনিস, যা মানুষকে তার পেছনে ছুটতে বাধ্য করে। মানুষ চায় না তবুও তার দিকে হাত বাড়িয়ে দেয়। রহস্য এমন এক জাল, যেখানে মানুষ নিজের অজান্তেই বন্দী হয়ে যায়। সেই বন্দিত্বে ভয় থাকে, অথচ তার মাঝেই এক অদ্ভুত আকর্ষণ, অভ্যন্তরের টান। হিয়া অনুভব করল, হয়তো তার জীবনেও সেই জালটা ছড়িয়ে গেছে।

হয়তো তূর্যও এই রহস্যের গল্পের এক চরিত্র হয়ে উঠছে।

তূর্য ডায়েরির মলাটটা নাড়াতে নাড়াতে হঠাৎ হিয়ার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,

"এই ডায়েরিটার কথা আর কে কে জানে?"

হিয়া ধীরে মাথা নাড়ল, চোখে ছিল একরাশ গুরুত্ব।

"কাউকে বলি নাই। আলিফ আর পিউ ডাইরিটা আনলেও ওরা জানে না এটা কার ডায়রি। আজ শুধু আপনাকেই বলেছি।"

তূর্য গভীরভাবে হিয়ার মুখের দিকে তাকাল, যেন ওর ভিতরের অনুভব পড়তে চাইছে। তারপর মাথা হেলে বলল,

"ঠিক আছে। তাহলে তুই আর কাউকে কিছু বলিস না।" একটু থেমে, ডায়েরিটা হাতে শক্ত করে ধরল তূর্য।

"আমি আগে ডায়েরিটা পড়ি। তারপর দেখি কী করা যায়। যত কিছুই হোক, কোনো কিছু যেন সময়ের সাথে মিশে হারিয়ে না যায়।"

চাঁদের আলো এবার তূর্যের চোখে একটা অদ্ভুত দীপ্তি ফেলে দিল। হিয়া ঠিক বুঝে উঠতে পারল না, সেটা উত্তেজনার, না অন্য কোনো আবেগের। তবে তূর্যের এই রুপটা একেবারেই নতুন। এমনটা নয় যে তূর্য আগে কথা বলত না, কিংবা সবসময় ভয়ংকর ব্যবহার করত। তবে সে বরাবরই শান্ত আর প্রচন্ড রগচটা স্বভাবের ছেলে। কখনোই তার সাথে এভাবে দাঁড়িয়ে দু'দণ্ড কথা বলা হয়নি হিয়ার। হয়তো আড়ষ্টতা, ভয় আর কিছুটা সংকোচ। তবে আজ যেন সব আকাশের মেঘদলে উড়ে গেছে। শান্ত নজরে তোর জন্য চোখে তাকিয়ে হাসলো। হয়তো জীবনে প্রথমবার নিজেকে মানুষ চিনতে ভুল প্রমাণ করার খুশিতে হাসলো।

তূর্য একবার তাকিয়ে দেখলো তবে বরাবরের মতোই গুরুত্ব দিলো না।

এরপর দুজনেই ধীরে ধীরে নেমে গেল ছাদ থেকে। তূর্য ডায়েরিটা হাতে চেপে ধরে নিজের ঘরে চলে গেল। আর হিয়া… চুপচাপ দরজা খুলে ঢুকে গেল নিজের ঘরে।

কিন্তু ঘুম কি সহজে ধরা দেয় এমন রাতে‌? বিছানায় শুয়ে থেকেও হিয়ার মনে হচ্ছিল, ঘরটা যেন ঠিক আগের মতো নেই। আলো নিভানো অন্ধকারের মধ্যেও একরকম চাপা আলো, একরকম উত্তাপ জমে আছে দেয়ালের গায়ে গায়ে। প্রকৃতির ডায়েরির শেষ পাতা গুলোর ছেঁড়া দাগ যেন চোখের সামনে ভেসে উঠছে বারবার। যেন কোনো চিঠি অপঠিত থেকে গেলে, মনে যেমন অস্থিরতা জেগে ওঠে, ঠিক তেমনই।

কেন ছেঁড়া? কে ছিঁড়েছে? শেষ পাতায় কী লেখা ছিল? প্রকৃতি সত্যিই কি হারিয়ে গিয়েছিল, না লুকিয়ে ছিল মাত্র? নাকি এখানে যে ঘটনা দেখানো হচ্ছে তার কিছুই না! বাস্তবতা কি একদমই ভিন্ন?

প্রশ্নের পর প্রশ্ন হিয়ার মাথায় কেবল ঘুরপাক খেতে লাগল। গল্প নয়, এটা যেন বাস্তব। আর সেই বাস্তবতার অসমাপ্ততাই আজ রাতে হিয়ার নিঃশ্বাস চেপে ধরছে। একটা অসমাপ্ততা, যেটা অবাধ্যভাবে তার ভাবনার প্রতিটি কোণায় ঢুকে যাচ্ছে। আর সেই রহস্যের জাল, সে চাইলেও এড়িয়ে যেতে পারছে না। হয়তো এটাই রহস্যের আসল খেলা। মানুষ চায় না, তবু রহস্য তাকে টেনে নিয়ে যায়। একটা অজানা শেষ, যার পেছনে না ছুটে উপায় থাকে না।

হিয়া জানে, ঘুম আজ আর আসবে না। তাও ঘুমের বৃথা চেষ্টা চালিয়ে যায়। কিন্তু ফজরের আগ মুহূর্তে ঘুম পড়ে থাকে তাদের রাজ্যে নিতে সফল হলো।

চলবে.... ♥️