নির্বাসিত কৃষ্ণচূড়া — পর্ব ১৯

লেখক: সাদিয়া তিন্তি · বিভাগ: রহস্য · পর্ব ১৯ · ৪৭ পর্বের মধ্যে ১৯

সন্ধ্যার আকাশটা ধীরে ধীরে গাঢ় নীল হতে শুরু করে। বাতাসে একধরনের আর্দ্রতা, আর দূর থেকে ভেসে আসে মসজিদের আজানের মৃদু ধ্বনি। তূর্য সারাদিন ঘরে বন্দি ছিল, মাথাটা ভার হয়ে আছে। সে একটু হাওয়া বদলের জন্য বাইরে বের হতে তৈরি হয়। পায়ে হালকা শব্দ তুলে বারান্দা পেরিয়ে নিচে নামতেই হঠাৎ করেই সে থমকে দাঁড়ায়। মিনু রহমানের ঘর থেকে এক অচেনা উত্তেজনার সুর ভেসে আসছে।

তূর্য ধির পায়ে এগিয়ে যায় দরজার কাছে। ভেতর থেকে ভেসে আসছে কোন গোপন আলোচনা। আব্দুর রবিউল মোহাম্মদের গলা খুব নিচু, অস্পষ্ট। তবে মিনু রহমানের কণ্ঠটা একটু জোরেই ভেসে আসে, "মিয়া ভাই, আমার নাম যেন কোনদিন না আসে... এই জীবনের শেষ পর্যায়ে এসে আমি চাই না আমার পাপ সবার সামনে খুলুক। অন্ততঃপক্ষে বড় ভাইয়ের সামনে তো নয়-ই। প্রকৃতির ডায়েরির সামনে এসে যতটুকু নাক কাটার তা কেটে গেছেও…..।"

তূর্য শিউরে ওঠে। তার গা ছমছম করে ওঠে যেন। সে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে, আর কোনো কথা শোনা যায় না। ঘরের দরজা বন্ধ, শব্দও হঠাৎ থেমে গেছে। তবু তূর্যর বুকের ভেতর শব্দ গর্জে ওঠে, দাদি... তার দাদি! তাঁর মুখে এমন কথা? কিসের পাপ?

তূর্য ধীরে ধীরে পেছনে সরে আসে, মাথার মধ্যে ঘূর্ণিপাক। সে নিজেকে প্রশ্ন করে, "তাহলে কি হিয়ার সন্দেহ সঠিক ছিল? এই পরিবারে সত্যিই কি এমন কিছু আছে যা সবাই লুকিয়ে গেছে? তবে কী সেই পাপ? কেন দাদি এত ভয় পায় সত্যি প্রকাশ পাওয়াকে? রহস্য কার! প্রকৃতি নাকি তুহুরার!"

সন্ধ্যার বাতাসে যেন এক অদৃশ্য ভার নেমে আসে। তূর্যর জন্য আজকের সন্ধ্যা কোনো সাধারণ সন্ধ্যা নয়, এটা যেন এক পুরনো ইতিহাসের দরজায় প্রথম ধাক্কা। সে বুঝে উঠতে পারছে না তার ঠিক কি করা উচিৎ।

তূর্য কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে সেখানেই। বুকের ভেতর যেন জমে থাকা বাতাসটা আটকে গেছে। মিনু রহমানের কথাগুলো কানে বাজে বারবার, “আমার নাম যেন কোনদিন না আসে… আমি চাই না আমার পাপ সবার সামনে খুলুক।”

তারপর হঠাৎই ঘরটা নিস্তব্ধ হয়ে যায়। যেন কথার পেছনে কফিন চাপা পড়ে যায়। তূর্য আর এগোয় না। হঠাৎ যেন তার পা টেনে রাখে ভয়, কিংবা অন্য কিছু, সে নিজেও জানে না কোনটা বেশি কাজ করছে। তূর্য চুপচাপ পেছনে ফিরে আসে। চারপাশে সন্ধ্যার নীল ছায়া আরও ঘন হয়েছে।

হলুদ আলোয় ভেসে ওঠা বারান্দার পথটা ধরে সে হাঁটতে হাঁটতে ভাবে। হিয়া যদি এসব জানে, তাহলে আর নিজেকে আটকে রাখতে পারবে না।

সে জানে হিয়া কতটা আবেগপ্রবণ। তাছাড়া তার নেশা হয়ে উঠেছে প্রকৃতি। আর তুহুরা তো তার সন্দেহে রয়েছে।

তূর্য ঠিক করে, এখনই সব বলা যাবে না কাউকে। সে কোনো ভুল করছে না, বরং সাময়িক দমিয়ে রাখছে। আরো গভীরে তলিয়ে যাওয়া থেকে।

তূর্য বাইয়ে যাওয়ার চিন্তা বাদ দিয়ে ছাদের দিকে পা বাড়ায়। সিঁড়ির ধাপগুলো যেন একটু বেশিই অচেনা লাগে এই সন্ধ্যায়। ছাদে উঠে এসে দাঁড়ায় পূর্ব দিকে, যেখানে আকাশটা একটু খোলা। দূরের বারান্দা থেকে কোথাও ভেসে আসে শঙ্খের ধ্বনি, সঙ্গে কিচিরমিচির কিছু পাখির ডাক।

তূর্য চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে। প্রকৃতির ডায়রি, তার হারিয়ে যাওয়া, তুহুরার সত্যি, হিয়ার অদ্ভুত সব যুক্তি, আর এইমাত্র শোনা মিনু রহমানের গলায় পাপের স্বীকারোক্তি, সব মিলিয়ে যেন একটা দগদগে মোচড় পড়ে তার ভিতরে।

সে নিজেকে বলে, "এই গল্পটা এতদিন শুধু হিয়ার চোখ দিয়ে দেখেছি। এবার নিজেকে দেখতে হবে এক চরিত্র হিসেবে।”

তূর্য একমনে দাঁড়িয়ে থাকে। মাথার ভেতর চিন্তার ভিড়, প্রশ্ন, জট, সন্দেহ সব মিলে যেন অন্ধকার কোনো গোলকধাঁধায় আটকে গেছে সে। ঠিক তখনই পেছন থেকে আলিফের গলা ভেসে আসে, “এইখানে তুমি! খুঁজে খুঁজে শেষ... ফোনও ধরছো না।”

তূর্য হঠাৎ ঘোর কাটায়, আলিফের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসে। “ভাবছিলাম একটু বাতাস নেই, একটু ছাদটা দেখি। খুঁজছিস কেন?”

আলিফও পাশে দাঁড়িয়ে পড়ে, চোখে প্রশ্ন “তুমি না বাইরে যাবে বললে, তাই যেতে চাইছিলাম তোমার সাথে।”

তারই মাঝে সিঁড়ি দিয়ে ছাদের দিকে কাপড় তুলে নিতে আসে মিম। তূর্য মিমকে দেখে সামান্য উঁচু গলায় বলে, “এই মিম, হিয়াকে বলে দিস তো সবার জন্য চা করে নিয়ে ছাদে চলে আসতে। পিউকেও ডাকিস। কাল তো সবাই চলে যাবে, একটু বসা যাক সবাই মিলে।”

মিম থেমে যায়, ভ্রু কুঁচকে তূর্যের দিকে তাকায়। “তোমার শরীর এখন ভালো?”

তূর্য মৃদু হাসে, কণ্ঠটা কোমল হয়, “এখন ঠিক আছি। তাই ভাবলাম, আজ একটু থাকি সবাই মিলে। কে জানে আবার কবে এভাবে বসা হবে!”

মিম মাথা নাড়ে, কিছু না বলে সিঁড়ি বেয়ে নেমে যায়। আলিফ তূর্যের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ। পাশাপাশি দুই ভাইয়ের চোখে সন্ধ্যার আকাশ, কিন্তু মনে জমে থাকা গল্প একেকজনের একেকরকম।

মিম সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামে। ঘরের ভেতর নরম আলো, চারপাশে একধরনের নীরবতা। সে ধীরে ধীরে ঘরের সামনে এসে দাঁড়ায়। দরজাটা ভেজানো। হিয়ার নাকের ডগা পর্যন্ত চাদর তুলে শুয়ে থাকা দেখে মিম প্রথমে একটু থমকে যায়, তারপর হালকা ধাক্কা দিয়ে বলে, “হিয়া… শুনছিস? উঠ একটু।”

হিয়া চোখ কচলে উঠে বসে, কণ্ঠে অলসতা মেশানো, “কি হইছে?”

মিম হেসে বলে, “তূর্য ভাই বলেছে, সবার জন্য চা করে ছাদে যেতে। পিউকেও ডাকতে বলছে। কাল তো সবাই চলে যাবে, তাই একসাথে একটু বসা।”

হিয়ার ঘুমচোখ ধীরে ধীরে খোলে। তূর্যের নাম শুনে চোখে একটু আলোর রেখা খেলে যায়। সে বিছানা থেকে পা নামায়, “আচ্ছা, আমি চা করি। পিউ কোথায়?”

মিম জানালার দিকে ইশারা করে, “ও তো জানালার পাশে।”

হিয়া তাকিয়ে দেখে, পিউ জানালার পাশে বসে বাইরে তাকিয়ে আছে, কানে হেডফোন, একদম চুপচাপ। যেন সন্ধ্যার অন্ধকার ভেদ করে কিছু খুঁজছে।

হিয়া বলে, “তুই পিউকে ডাক, আমি চুলায় পানি বসাই।”

মিম মাথা নেড়ে চলে যায় পিউর দিকে, আর হিয়া নিঃশব্দে রান্নাঘরের দিকে পা বাড়ায়।

হুট করে আকাশটা মেঘলা হওয়ায় সন্ধ্যার আকাশে যেন এক ঘন কালো রাত নেমে এসেছে। আশেপাশে তাকিয়ে চোখে পড়ে, হালকা বাতাস বইছে, তবুও অস্বস্তিকর এক অনুভূতি কাজ করছে।

আলিফ বলে, “তূর্য ভাই, ছাদে তো অনেক অন্ধকার। সবাই মিলে ঘরে বসি?”

তূর্য একটু হাসে। “আচ্ছা, গিয়ে হিয়া, মিম আর পিউকে চা নিয়ে আমার ঘরে আসতে বল তাহলে।”

আলিফ এগিয়ে যায় নিচে রান্নাঘরের দিকে, আর তূর্য নিচে নেমে নিজের ঘরের আলো জ্বালায়, জানালাটা খুলে দেয়। ভেতরে একটা গাঢ় আরামদায়ক পরিবেশ তৈরি হয়।

কিছুক্ষণ পর, হিয়া, পিউ আর মিম ট্রেতে কাপ আর কেটলি নিয়ে তূর্যর ঘরের সামনে এসে দাঁড়ায়। মিম দরজায় নক করে, “তূর্য ভাই, আমরা আসছি।”

তূর্য দরজা খুলে দেয়। চারজনে গোল হয়ে বসে। মাটিতে মোটা কুশন পাতা, জানালার পাশে টেবিল। পিউ কাপগুলো সারি করে রাখে, মিম দুধ-চিনি মেশাতে সাহায্য করে, হিয়া চা ঢালে। সবাই চুপচাপ কয়েক চুমুক দেয়, যেন প্রতিটা চায়ে জমে থাকা দিনের গল্প খুঁজছে।

সবাই বেশ কয়েকক্ষণ নানা বিষয় নিয়ে কথা বলল। হিয়া শুধু চুপ করে থাকে কয়েক মুহূর্ত। তারপর চায়ের কাপটা একপাশে সরিয়ে বলে ওঠে, “আজকে বড় দাদা ভাইয়ের সাথে অনেকক্ষণ কথা হল বিকেলে। প্রকৃতিকে নিয়েই কথা বলছিলাম… আর তুহুরা… ওকে নিয়েও।”

পিউ একটু নড়েচড়ে বসে, মিমের চোখ বড় হয়ে যায়। আলিফ আর তূর্য শুধু তাকিয়ে থাকে হিয়ার দিকে। সারা বিকেলে যা যা কথা হলো সব অক্ষরে অক্ষরে হিয়া ধীরে ধীরে বলে যেতে থাকে। সকলে মনোযোগী হয়ে শুনতে থাকলো।

হিয়ার বলার শেষেই মিম চট করে বলে উঠলো, "তার মানে প্রকৃতি কলকাতায়? না না বারাসাতে?"

হিয়া বলল, "বড় দাদা তো সেটাই বললেন। তিনি অবশ্য খুঁজতে গিয়েছিলেন কিন্তু পাননি।"

এবার তুর্য বলে উঠলো, "বড় দাদার ঘর থেকে সেই ডায়েরি এনেছো, যেখানে ওনার বন্ধুদের ঠিকানা লেখা আছে?"

হিয়া নিজের ফোনটা এগিয়ে দিয়ে বলে, "হ্যাঁ ছবি তুলে এনেছি। আরেকটা ছবি আছে, এটা বোধহয় ওনাদের কলেজের কোন একটা সময় তোলা বড়দাদার আলমারিতেই পেয়েছিলাম।"

সকালে উৎসুক চোখে হিয়ার ফোনের দিকে তাকিয়ে থাকে। খুব নিখুঁতভাবে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে ওই ছবিগুলো দেখতে থাকে। পিউ এক ধ্যানে তাকিয়ে বলে উঠে, "বড় দাদার এই যুবক বয়সের ছবিগুলোই খুঁজতে গিয়েই তো প্রকৃতির ডায়েরিটা খুঁজে পেয়েছিলাম চিলেকোঠায়!"

তূর্য আর হিয়া অবাক দৃষ্টিতে পিউয়ের মুখের দিকে তাকায়। তারা যেন কোন একটা সমাধান পেয়েছে আর না হয় সমাধানের রাস্তা। কিন্তু কেউই কোন কথা বলে না। তাদের আড্ডা আরো অনেক সময় চললো। সন্ধ্যার শেষে যখন রাত নামল তখন তারা আড্ডা ছেড়ে উঠল।

রাতের খাবারের টেবিলে আজ যেন অন্যরকম এক আবহ। সবাই একসঙ্গে বসেছে, তবুও যেন কারও মুখে বেশি কথা নেই। চোখে মুখে জমে থাকা একটা অজানা ব্যস্ততা।

কাল যেন সকলকেই ফিরতে হবে। সবাই চুপচাপ খাওয়া শেষ করে ধীরে ধীরে নিজেদের ঘরে চলে যায়। বাড়িটা যেন রাতের প্রথম প্রহরেই নিস্তব্ধ হয়ে পড়ে।

হিয়া ঘরে ঢুকে যেন চঞ্চল হয়ে উঠল। বিছানায় না গিয়ে সে ধীরে ধীরে ঘরের ভেতরে পায়চারি করতে শুরু করলো। মাঝে মাঝে থেমে যায়, তারপর আবার শুরু করে।

পিউ আর মিম দুজনেই চুপচাপ তার দিকে বোকার মতো তাকিয়ে থাকে। হিয়ার এই অস্থিরতা তারা আগে দেখেনি। পিউ ফিসফিস করে মিমকে বলে, “মিম আপি… হিয়া আপির আবার কি হলো?”

মিম শুধু মাথা নাড়ায়, যে সে জানেনা। এরপর সে একটা কুশন জড়িয়ে বসে থাকে, চুপচাপ।

ওপাশে, তূর্য নিজের ঘরে একা বসে। জানালাটা আধা খোলা, বাইরে জোনাকি উড়ছে। টেবিলে ছড়িয়ে আছে হিয়ার ফোন থেকে দেখা সেই ছবি আর ঠিকানাগুলোর বিস্তারিত।

আলিফ অনেকবার এসে বলে, “তূর্য ভাই… বলবে না কিছু? কী ভাবছো? আমি সাহায্য করতে পারি?”

তূর্য চুপ থাকে। শুধু একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছাড়ে। এরপর বেশ অনেকটা সময় পেরিয়ে তূর্য বলে, “না… এখন কিছু বলার সময় না, করার সময়।”

তূর্য গভীর চিন্তায় মগ্ন। তার ভেতরের অস্থিরতা সে কাউকে দেখাতে পারছে না। সে যেন এ কাহিনীর একটা চরিত্র হয়ে উঠেছে। সে এখন সত্যিই জানতে চায় মিনু রহমান তার কোন পাপের কথা বলছিল। সে পাপ কি তুহুরা নাকি প্রকৃতি?

তূর্য এই গল্পের নিজের ইচ্ছায় প্রবেশ করেনি। সময় তাকে জোরজবরদস্তি করে এই গল্পের চরিত্র বানিয়েছে। আর এখন সে এসব কিছুর শেষ দেখতে চায়। সে সমাধান চায়।

হিয়া বেশ অনেক্ষণ পায়চারি শেষে থামে, দাঁড়িয়ে পিউ আর মিমের দিকে তাকিয়ে বলে, “তোদের দুজনের একটু সাহায্য লাগবে। এখনই।”

পিউ চোখ কুঁচকে তাকায়, “এখন মানে? এত রাতে?”

মিম উঠে বসে, “কী হয়েছে হিয়া?”

হিয়া গলা নামিয়ে বলে, “আমি চিলেকোঠায় যেতে চাই… এখনই। ওখানে কিছু একটা আছে, আমি নিশ্চিত। প্রকৃতির ডায়েরিটাও তো পাওয়া গিয়েছিল চিলেকোঠায়। তাহলে হয়তো ওখানে আরেকটু খোঁজ করলে তুহুরা সম্পর্কেও কিছু পেতে পারি… অথবা এমন কিছু, যা আমাদের প্রকৃতির কাছাকাছি নিয়ে যেতে পারে।”

পিউ উদ্বিগ্ন গলায় বলে, “কিন্তু এত রাতে? বাড়ির কেউ টের পেলে তো ঝামেলা হবে!”

হিয়া বলল, “তাই তো তোদের সাহায্য লাগছে। পিউ, তুই আমার সঙ্গে চিলেকোঠায় চল। মিম, তুই একটু নিচে পাহারা দিবি। যদি কেউ উঠে আসতে চায়, কিছু একটা করে যেন থামিয়ে রাখতে পারিস।”

মিম দ্বিধায় পড়ে যায়। কিছুক্ষণ চুপ থেকে জিজ্ঞেস করে, “তুই নিশ্চিত তো হিয়া? যদি কিছু না পাস?”

হিয়া ধীরে মাথা নাড়ায়, “না পেলেও ক্ষতি নেই। কিন্তু না খুঁজে থাকলে পরে আফসোস হবে। আমি মনে করি, এখনও কিছু লুকানো আছে ওখানে। প্রকৃতি আর তুহুরার কাহিনী যে এতদিন চাপা পড়ে ছিল, তার মানে কেউ ইচ্ছা করেই এসব লুকিয়ে রেখেছে। সেটা খুঁজে বার করাটাই এখন আমাদের কাজ।”

পিউ আর মিম এবার একে অপরের দিকে তাকায়। তারপর মিম মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানায়, “ঠিক আছে, আমি নিচে পাহারা দিচ্ছি। ভাবিস না, কেউ এলেই কিছু একটা বলে, ম্যানেজ করব।”

পিউ তখন চুপচাপ হিয়ার পাশে এসে দাঁড়ায়,

“চলো আপি, তবে শুরু করা যাক।”

তারা নিঃশব্দে দরজাটা খোলে। মিম ধীরে সিঁড়ি ধরে নিচে নামে, তার চোখ-কান খোলা, যেন কোনো আওয়াজে সে তৎপর হতে পারে।

হিয়া আর পিউ ড্রয়ারের ভেতর থেকে একটা টর্চ বের করে, ধীরে ধীরে পা ফেলে ছাদের দিকে যায়। ছাদে উঠে চিলেকোঠার দরজার সামনে এসে থামে।

রাতের বাতাস থমথমে, চাঁদের আলো ছাদের এক কোণে ছায়া ফেলেছে। চারদিক নিঃশব্দ। পিউ হিয়ার কাঁধে হাত রেখে বলে, “চাবিটা আছে তো?”

হিয়া পকেট থেকে একটা পুরোনো চাবি বের করে দেখায়, “বড়দাদার আলমারি থেকে নিয়েছিলাম, ওটাই চিলেকোঠার চাবি।”

পুরনো জং ধরা তালাটা একটু কষ্ট করে চাপ দিতেই খুলে যায়। দরজাটা ধীরে ধীরে খোলা হয়। ধুলো, পুরোনো কাঠ আর নস্টালজিয়ার গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে চারপাশে। হিয়া ধীরে টর্চ জ্বালিয়ে ভেতরে পা রাখে, পিউ তার পেছনে।

মেঝেতে ছড়ানো পুরোনো পত্রিকা, ছেঁড়া কাগজের স্তুপ, কিছু হলুদ হয়ে যাওয়া কাপড়। আলমারির এক কোণ থেকে বেরিয়ে আসে কৌটো ভর্তি চাবি, কাঠের ট্রাংক, ছেঁড়া নোটবুক সবকিছু যেন কালের সাক্ষী। এ বাড়িটা পুরনো হলেও বেশ ঝকঝকে তবে কেন যেন শুধুমাত্র এই চিলেকোঠাই একটা আবর্জনা। যুগের পর যুগ বোধহয় কেউ ঠিকঠাক পরিষ্কার অব্দি করেনি।

পিউ আর হিয়া সময় নষ্ট না করে দুইজন দুই দিক থেকে খুঁজতে শুরু করে। তাদের অনুসন্ধান সে সবকিছু যা কিছু দেখলেই তাদের সন্দেহ হওয়ার মত। অনুসন্ধান শুরু হয় সেই পুরনো ভাঙ্গা আলমারিটা থেকে, যেটার ড্রয়ারে কাপড়ে মোড়ানো প্রকৃতির ডায়েরিটা খুঁজে পেয়েছিল পিউ আর আলিফ।

চিলেকোঠার দুটো কক্ষ। একটায় পুরোনো আলমারি, ভাঙা খাটের কাঠামো, আর ছেঁড়া জানালার পর্দা সহ নানা অকেজো জিনিস পত্র। অন্যটায় ছড়ানো বাক্স, ট্রাংক, আর মাঝখানে কাঠের একটা টেবিল, যেটার পায়া খসে পড়েছে। ছাদের নিচু অংশে কোথাও কোথাও জং ধরা লোহার রড বেরিয়ে আছে। বাতাসে ধুলোর গন্ধের সাথে পুরোনো দুঃখ-কষ্ট মেশানো এক অদ্ভুত ভার।

হিয়া পুরোনো আলমারিটার একেকটা ড্রয়ার খুলে দেখছে। পুরোনো জামাকাপড়, কিছু বিবর্ণ ফাইল…. হঠাৎই হিয়া একটা পেরেক ঠোকার আওয়াজে থেমে যায়। হিয়া ভাবল বুঝি পিউ কিছু পেল।

অন্যদিকে পিউ একটা টিনের বাক্সের মুখ খুলে একে একে কাগজ আর চিঠি বের করে দেখছে। তাতে কিছু নাম না-থাকা রেজিস্টার, কয়েকটা পুরোনো ছবি। পিউ যখনই হিয়াকে ডাকতে যাবে, ঠিক তখনই হঠাৎ একটা মৃদু পায়ের শব্দ।

হিয়া টর্চটা নিঃশব্দে নিভিয়ে ফেলে। সে নিঃশ্বাস বন্ধ করে শোনে, পায়ের শব্দ যেন অন্য ঘরের দিক থেকে আসছে। পিউও শব্দটা শুনে থেমে যায়।

হিয়া ধীরে ধীরে শব্দের উৎসের দিকে এগিয়ে যায়। হাতে থাকা টর্চটা আবার জ্বালাতে যাবে ঠিক তখনই পেছন থেকে একটা হাত এসে হিয়ার মুখ চেপে ধরে!

__________

চলবে.......🖤