নির্বাসিত কৃষ্ণচূড়া — পর্ব ০৬

লেখক: সাদিয়া তিন্তি · বিভাগ: রহস্য · পর্ব ০৬ · ৪৭ পর্বের মধ্যে ৬

গল্পটা যেন হঠাৎই অন্য গন্তব্যে বাঁক নিলো। এতদিন যা নিছক পুরোনো স্মৃতির ধুলোয় ঢাকা ছিল, সেটা এখন ঝড় তুলছে বাস্তবের ভিতরে। ডায়রির চুপ থাকা ভাষা হঠাৎ করে বিস্ফোরিত সত্যে রূপ নিলো। সেই সত্যে যেমন ভালোবাসা আছে, তেমনই আছে অপ্রকাশ, অসমাপ্ততা আর অসম্ভব একটা যন্ত্রণা।

তূর্য এতক্ষণ চুপ করে শুনছিল, কিন্তু এবার তার ভেতরে কী যেন এক নতুন কিছু জন্ম নিলো। এক অদ্ভুত আকর্ষণ। শুধু এই বাড়ির মানুষগুলোর প্রতি নয়, এই ইতিহাসের প্রতি, এই না বলা কাহিনীর প্রতি। তূর্যর হিয়ার দিকে তাকালেও তার কেমন অদ্ভুত এক নিয়মে মনে হয়, এই মেয়েটি হয়তো ঠিক তার মতো করেই অনুভব করছে এই গল্পে মোড়ানো বাস্তবতাকে। আব্দুর রুশান মোহাম্মদের অপ্রাপ্তি হয়তো তাদেরকে ঘিরে ধরলো। দিনটা কেমন এক ব্যর্থতার বোঝা দিয়ে গেল। বাড়ির সবাই নিশ্চুপ। কারো সাথেই কারো তেমন কথাবার্তা নেই। যেন চুপচাপ নীরবতার আন্দোলন চলছে। আব্দুর রুশান মোহাম্মদ তখন যে বসার ঘর থেকে উঠে গিয়ে নিজের ঘরে দোর দিলেন, তার আর দেখা মেলেনি সারাদিনে। একটা নিঃশব্দ, ভয়ংকর, ছমছমে রাত অতিক্রম হল।

সকালের আলো জানালা ভেদ করে ধীরে ধীরে ছুঁয়ে যায় তূর্যর চোখের পাতায়। সমগ্র বাড়ি তখনও ঘুমিয়ে। তূর্য চুপচাপ উঠে পড়ে।

তীব্র কৌতূহল আর একধরনের নীরব উন্মাদনা তাকে টেনে নিয়ে যায় আব্দুর রুশান মোহাম্মদের পুরনো বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে। সে চায় না আজ কেউ সঙ্গে থাকুক। আজ সে একা থাকতে চায় এই গল্পের গভীরে ডুবে থাকতে। তুর্য খুব সন্তপর্ণে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায় কাউকে না জানিয়ে।

সকালের নরম আলো তার শরীর ছুঁয়ে যাচ্ছে। আর সে ধীর পায়ে এগোচ্ছে, তার মস্তিষ্কের আবদারের পথে। তার মস্তিষ্ক কি আব্দুর রুশান মোহাম্মদের যন্ত্রণা নিজের করে নিয়েছে?

কেন করলো? এসব তো তার কাছে নিছকই ছেলে মানুষি মনে হতো। প্রেমের প্রতি তার বিতৃষ্ণা নেই, তবে এত গভীর ভরসাও নেই। কেন জানি, বরাবরই আব্দুর রুশান মোহাম্মদের এই প্রেমের গল্প তার কাছে অত্যাধিক বাড়াবাড়ি মনে হতো। তবে আজ কেন সেই বাড়াবাড়িতে সে নিজেই সায় দিচ্ছে? এসব উদ্ভট ভাবনা তূর্যকে বিরক্ত করল, তবে থামাতে পারল না।

বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে পা রাখতেই যেন সময় থেমে গেল। এখানে পুরনো গন্ধ আছে, তবে তার এই চত্বরের প্রতি আকর্ষণ নেই। সেখানে এসেছে, অন্য ঘটনার আকর্ষণে।

তূর্য হাঁটতে হাঁটতে একটা কোণে গিয়ে থেমে গেলো। সকালটা বেশ ভারী, তবে ক্যাম্পাসটা এই সকালেও পরিপূর্ণ। তূর্য তার ফোনটা বের করল। ফোনের নোটপ্যাডে টোকা আছে বেশ কিছু নাম। তার মাঝে প্রথম সারির একটা নাম-- প্রফেসর আজম শেখ। তৎকালীন বাংলা ডিপার্টমেন্টের একজন অধ্যক্ষ। প্রকৃতির ডায়েরি পড়ে জানা যায় তিনি প্রকৃতির বাবার খুব ভালো বন্ধু ছিলেন। একই সাথে আব্দুর রুশান মোহাম্মদের বাবারও খুব ভালো বন্ধু ছিলেন তিনি। এত বছর পর তার বেঁচে থাকার আশা করাটা বোকামি হলেও তার পরিবারের কারো তো বেঁচে থাকার আশা করাই যায়। আর এমন একটা মুহূর্তে কারো কাছে থেকে নতুন কোনো তথ্য জানাটা অসম্ভব হলেও চেষ্টা করাটা অবশ্য অসম্ভবের খাতায় পড়ে না।

সবকিছুর মাঝখানে তূর্য নিজেকে খুঁজে পায় আরেকভাবে। ভালোবাসা, প্রতিবন্ধকতা, সময় সবকিছু যেন এক রহস্যময় মোড় তৈরি করেছে তার ভেতরেও। সে ধীরে ধীরে ক্যাম্পাসের এক চায়ের দোকানে গিয়ে বসে। এক কাপ চা হাতে নিয়ে সে চুপচাপ বসে থাকে, গাছের পাতার নড়াচড়া দেখে। তূর্যের চোখে এখন কেবল ডায়রির সেই পুরনো পাতার অক্ষরগুলো ঘোরে, আর একটি নাম, প্রফেসর আজম শেখ।

তূর্য বাংলা বিভাগের সামনে এসে দাঁড়াল। বহুবছরের পুরোনো ভবন। দেয়ালের রঙ ফ্যাকাসে, জানালার কাঁচে ধুলো। তূর্য অফিস ঘরের দরজা ঠেলে ভেতরে ঢোকে। কিছু কাগজপত্রে ডুবে থাকা একজন মাঝবয়সী স্টাফ মাথা তোলে।

তূর্য গিয়েই বলে,

“আমি আসলে একজনকে খুঁজছি। আপনাদের এখানে সবচেয়ে পুরাতন কে আছেন?”

স্টাফটা চোখের চশমাটা টেনে ঠিক করে বললো,

“পুরাতন বলতে… মঞ্জু ভাই আছেন। প্রায় ৩০ বছর ধরে কাজ করছেন। ওই সামনে রেকর্ড সেকশনে পাবেন।”

তূর্য ধন্যবাদ দিয়ে এগিয়ে যায় রেকর্ড রুমের দিকে। সেখানে একটা টুলে বসে থাকা লালচে চোখের চুপচাপ একজন মানুষ মঞ্জু ভাই। তূর্য গিয়ে সৌজন্য আলাপ শেষ করে বলে,

“আমি আসলে একজন প্রফেসরের সম্পর্কে জানতে এসেছি। আমার দাদুর বন্ধু ছিলেন, তার ঠিকানাটা হলে খুব উপকার হতো। আপনি কি প্রফেসর আজম শেখকে চেনেন? বাংলা বিভাগের অধ্যক্ষ ছিলেন ১৯৭০ এর দিকে!”

মঞ্জু ভাই কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। চোখে-মুখে ভাঁজ পড়ে যায়।

“আজম শেখ? না ভাই, এমন কোনো নাম কখনো শুনিনি এখানে। আমি তো '৯৪ সাল থেকে আছি। এর আগের কাগজপত্রে‌ খোঁজ করে দেখতে হবে। তবে আমার যা মনে পড়ে, এমন নাম তো দেখি নাই। আপনি কি নামটা ঠিক করে বললেন?”

তূর্যর গলা শুকিয়ে যায়। এত বছর পর তো আসলেও কারো মনে রাখার কথা নয়। তবে সে স্পষ্ট জানে নাম এটাই। প্রকৃতি বারংবার লিখেছে নামটা। তূর্য হাল ছাড়ে না। সে এবার সরাসরি অফিস রুমে যায়, যেখানে পুরোনো রেকর্ড থাকে, শিক্ষক-অধ্যাপক, রেজিস্ট্রেশন ফাইল, সব। সেখানে কর্মরত এক বয়স্ক মহিলা কাগজপত্র উল্টে পাল্টে দেখেন। অনেকক্ষণ পর তিনি চশমা সামলে বলে উঠলেন,

“আপনি যে নাম বললেন, এমন কেউ আমাদের রেকর্ডে নেই। তবে… মুক্তিযুদ্ধের পরবর্তী সময় একটা নাম শোনা গিয়েছিল, আজম শেখ নামে। সমনের টিচার কোয়াটারে থাকতেন বোধহয। তবে তিনি তো যুদ্ধের সময় পরিবারের সাথে দেশ ছেড়ে চলে যান পাকিস্তানে। আর তখনকার যুদ্ধের সময় রেকর্ড পুড়ে গিয়েছিল অনেকটাই। সেইসময় যতো শিক্ষক বা কর্মচারী ছিল বাংলা ডিপার্টমেন্টের, তালিকা থেকে প্রায় সবার নামই মুছে যায়।”

তূর্য নির্বাক। এই অস্পষ্টতা, এই মুছে-ফেলা অতীত যেন এক নতুন অন্ধকার টেনে আনে। তূর্য ধীরে ধীরে অফিস রুম থেকে বের হয়ে আসে।

বাইরের আলো অনেক উজ্জ্বল, অথচ তূর্যর চোখে এখনো অন্ধকার জমে। মাথার মধ্যে কেবল ঘুরে ফিরে একটা প্রশ্ন, কোথায় লুকিয়ে আছেন প্রকৃতি!

তূর্য ক্লান্ত পায়ে ক্যাম্পাস ছাড়ে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরের চাঞ্চল্য সব কিছুই যেন তার কানে আসছে, কিন্তু মনে পৌঁছাচ্ছে না। তার ভেতরে কিছু একটা কাঁপছে… হালকা, নরম, অথচ স্থির না। সে হাঁটতে হাঁটতে প্রকৃতির বাড়ির দিকে রওনা দেয়। মুখে কিছু নেই, মনে এক রাশ অস্থিরতা। তার কদম তাকে কেন প্রকৃতির মহল্লায় নিয়ে যাচ্ছে, সে প্রশ্নের উত্তর সে জানতে চায় না। সে শুধু ভেসে চলেছে তার মস্তিষ্কের দিকনির্দেশনায়।

রাস্তার মোড়ে এসে দাঁড়ায় তূর্য। যেখানে একসময় ছিল সেই বিখ্যাত মন্টু মিয়ার চায়ের দোকান। সেখানে একটা ঝাঁ চকচকে কফিশপ। কাচে ঢাকা, এসিতে ঠান্ডা, কৃত্রিম হাসিতে ভর্তি। প্রকৃতি এই চায়ের দোকানের কথা বারবার উল্লেখ করেছে। তবে আব্দুর রুশান মোহাম্মদও এই দোকানের উল্লেখ করতে কোন কৃপণতা করেননি। তূর্য কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে। কফিশপের গ্লাসে তার প্রতিফলন পড়ে। নিজেকে দেখে সে যেন নিজেই চমকে যায়। সময় সব কিছু বদলে দিয়েছে, কিন্তু কেমন যেন একটা বেমানান পরিবর্তন। তূর্যর নজর এবার আটকায় তার সামনে থাকা বহুতলা ভবনের দ্বিতীয় তলায়। কোন এক যুগে এটাই তো প্রকৃতির ঘর ছিল! প্রকৃতির অস্তিত্ব আজ নিখোঁজ। তারপরও তূর্য অকারণে বেশ কিছু সময় এক ধ্যানে তাকিয়ে রইল।

হঠাৎ করেই কেমন একটা হাওয়া বয়ে যায়। তূর্যর গায়ে হালকা কাঁপুনি ধরে যায়। স্মৃতির ধুলোমাখা বাতাস যেন তার গায়ে চেপে বসে। কিছুক্ষণের জন্য নিঃশব্দ দাঁড়িয়ে থেকে, সে এগিয়ে যায়।

কোথায় যাচ্ছে ঠিক জানে না, শুধু জানে, এই গল্পের শেষ সে জানতে চায়। যদি সেই সত্য জঘন্য হয়, তবুও সে থামবে না।

তূর্য আর দাঁড়িয়ে থাকে না। একরকম ছুটে চলে যায় সেই বাড়িটা পেরিয়ে… যেন কিছু একটা তাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। হুট করেই মাথায় এক নাম এসে বাজে, --দিপ্তী দেবী মজুমদার। প্রকৃতির সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ এবং একমাত্র বান্ধবী। যাকে প্রকৃতি তার প্রতিটি পৃষ্ঠায়, গল্পে, মনখারাপের মুহূর্তে বারবার উল্লেখ করেছে। যাকে বলেছে ‘আমার নিজের মত আরেকজন’। যার বাড়ি ছিল প্রকৃতিদের বাড়ি ছেড়ে মাত্র দুই বাড়ি পরে।

তূর্য থমকে দাঁড়ায়। নিজেকে ধমক দেয়,

"দিপ্তী… হ্যাঁ, দিপ্তী তো জানে। দিপ্তী নিশ্চয়ই জানে কিছু। সে তো নিজের ঠিকানা দিয়ে গিয়েছিল প্রকৃতিকে।"

তারপরই দ্বিতীয় চিন্তা আসে, দিপ্তীর বাবার নাম! তাঁর নাম কী ছিল? এই প্রশ্ন এখন বিরক্তিকর হয়ে উঠেছে। সে জানে, দৈনিক ইত্তেফাকের একজন সাংবাদিক ছিলেন দিপ্তীর বাবা। একজন শক্তিশালী কলমচি। কিন্তু নাম?

"নাম খুঁজতে গেলে সময় যাবে, আর আমার কাছে এখন একটুও সময় নেই।" নিজেকেই যেন উত্তর দেয় তূর্য।

সে আশেপাশে চোখ বুলিয়ে দেখে। অনেকগুলো বাড়ি, অলিগলি, সকালের ব্যস্ততার আদলে মুড়ে আছে চারপাশ। গন্ধে ভেসে আসছে রান্না, পুরনো বইয়ের গন্ধ, আর মাটির ঠান্ডা। সে এলাকায় বৃদ্ধ মানুষদের খোঁজে। রাস্তার পাশে বসে থাকা একজন রিকশাচালককে জিজ্ঞেস করে। তিনি মাথা নাড়েন, চিনতে পারেন না।

তারপর এক চায়ের দোকানের বেঞ্চিতে বসে থাকা এক বয়স্ক মানুষ, যার চোখে ভারি চশমা, ধূসর দাড়ি, গালে বয়সের দাগ, তাঁর দিকে এগিয়ে যায় তূর্য।

"আমি একজনকে খুঁজছি। এই মহল্লায় থাকতেন মুক্তিযুদ্ধের সময়। দৈনিক ইত্তেফাকের সাংবাদিক ছিলেন তিনি। তার একটা মেয়ে ছিল দিপ্তী নামের। এই এখানেই বাড়ি ছিল তাদের।"

বৃদ্ধ লোকটা তাকিয়ে থাকে একদৃষ্টে, তারপর খুব চেষ্টা করে মনে করার। হঠাৎ যেন স্মৃতির সিন্দুক খুলে যায় তাঁর চোখে। "তুমি কি মজুমদার কাকার কথা কইতেছো? সমরেশ মজুমদার? এই দিকেই বাড়ি আছিল। মাইয়া ছিল দুইটা কিন্তু নাম তো কইতে পারবো না।পোলা আছিলো কয়েকটা।"

বৃদ্ধ লোকটা একবার তার লাঠি তুলে সামনের দিকে নির্দেশ করেন।

"এই যে এদিকের গলি দিয়া যাও, ওগো বংশের লোকজন এখনো থাকে এখানে।"

তূর্যর বুক ধক করে ওঠে। এটা অপ্রত্যাশিত। সে ভাবেইনি এভাবে সহজেই বাড়ির নিশানা মিলবে।

তূর্য একবার আউড়ে নেয়, "সমরেশ মজুমদার।"

তূর্য ধন্যবাদ জানিয়ে বৃদ্ধ লোকটির কাছ থেকে বিদায় নেয়, কিন্তু ভেতরে যেন এক অদৃশ্য ঢেউ চলছে, 'সমরেশ মজুমদার'। এই নামটা তার ভেতর ছাপ ফেলে দেয়, যেন পুরনো কোনও দরজা খুলে যাচ্ছে এক নতুন উত্তরের খোঁজে।

সে লোকটার দেখিয়ে দেওয়া বাড়িটার সামনে এসে দাঁড়ায়। বাড়িটা একদমই জরাজীর্ণ নয়। মাঝারি সাইজের, ছিমছাম, ছাদে একটা পুরনো টিভি অ্যান্টেনা এখনো দাঁড়িয়ে আছে। যা একসময় পুরো পাড়ায় বিরাট কিছু ছিল। তবে আহামরি আধুনিক কিছু নয়, তবু চোখে লাগে এক ধরনের নিরব সৌন্দর্য। দরজার পাশে একটা নামফলক, রঙ মুছে গেছে অনেকটাই। তূর্য একটু নিজেকে গুছিয়ে নেয়, বুকটা টেনে ভরে নেয় হাওয়ায়, তারপর ধীরে ধীরে দরজায় টোকা দেয়। কিছুক্ষণ পরেই দরজাটা খুলে যায়। একটা ১৪-১৫ বছরের মেয়ে মুখ বাড়ায়। পরনে সালোয়ার কামিজ, হাতে একটা বই ধরা। তার চোখে একটু কৌতূহল, সামান্য দ্বিধা।

“আমি কি বাড়ির বড় কারো সাথে কথা বলতে পারি? একটু কথা ছিল,” তূর্য বিনীতভাবে বললো।

মেয়েটি চোখ মেলে একটু দেখে, তারপর বলে,

“মা’কে ডাকছি।” সে ঘরের ভেতরে হারিয়ে যায়।

কিছুক্ষণ পর বেরিয়ে আসেন এক নারী, ৪০ পেরনো বয়স, পরনে লাল সুতি শাড়ি, মাথা ভর্তি সিঁদুর, চেহারায় এক অমায়িক মায়া। চোখে বুঝেশুনে কথা বলার অভ্যেসের ছাপ।

“আপনি?” নারী কৌতূহলী চোখে তাকান।

তূর্য সামান্য ইতস্তত করে, তারপর বলে,

“আমি তূর্য। দিপ্তী রানী মজুমদার নামের একজনের খোঁজে এসেছি। উনি এই বাড়ির একসময়কার বাসিন্দা ছিলেন… সমরেশ মজুমদারের মেয়ে।”

নারীটি একটু মনে করার চেষ্টা করলেন। এর চোখের পাতায় চমক খেলে যায়।

“দিপ্তী পিসি মা?” একটা নরম হাসি আসে মুখে, যেন অনেক দিনের পরিচিত নাম।

“তিনি আমার পিসি শাশুড়ি হন। এখানে তো পাবে না তাকে বাবা। তিনি তো চাঁদপুরে থাকেন তার বড় ছেলের সাথে। অবশ্য এখন খুবই অসুস্থ তিনি। হাঁটাচলা করতে পারেন না তেমন। শুনেছি কিছুদিন আগে হাসপাতালেও নিতে হয়েছিল।”

তূর্যের চোখ গভীর হয়ে আসে।

“আমি কি তাঁর ছেলের মোবাইল নাম্বারটা পেতে পারি? খুব জরুরি ওনার সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে।”

নারীটি তূর্যর আকুলতা দেখে স্মিত হাসেন। এরপর মাথা নাড়েন।

“দিচ্ছি, একটু দাঁড়াও।”

তিনি ঘরের ভেতর চলে যান, আর ফিরে আসেন একটা ছোট ছেঁড়া নোটবুকে লেখা একটা নম্বর হাতে করে।

“এই যে, নাম্বারটা উনার ছেলে দিব্যেন্দুর। ফোন দিলেই ধরবে।”

তূর্য নম্বরটা নিতে নিতে বলে,

“আপনাকে অনেক ধন্যবাদ। এটা সত্যিই খুব দরকার ছিল।”

নারী হালকা মাথা নাড়েন।

“আশা করি আপনি যেটার খোঁজে এসেছো, সেটা পেয়ে যাবে।"

তূর্য চুপচাপ মাথা নাড়ে। তার ভেতরে একরকম অদ্ভুত অনুভূতি, ভয় আর আশার মধ্যেকার টানাপোড়েন। তার সামনে এখন আরেকটা দরজা, আরেকটা ফোনকল। যা হয়তো তাকে প্রকৃতির খুব কাছাকাছি নিয়ে যেতেও পারে।

তূর্য ফিরছে নিজের বাসায়, পা ভারী হয়ে এসেছে। মনেও একরকম নরম উত্তাপ, কিন্তু চোখে স্থিরতা। মাথার ভেতর ঘুরছে তার পরবর্তী পদক্ষেপ। বাড়িতে ঢুকতেই যেন একটা অদ্ভুত নীরবতা তাকে ঢেকে ফেলে। প্রতিটি দেয়াল নিঃশব্দ, যেন সবকিছু কানে আসছে, তবু অর্থহীন। সকাল থেকে মিনু রহমান খাবার হাতে আব্দুর রুশান মোহাম্মদের ঘরে আছেন। কী নিয়ে কথা হচ্ছে, সেটা বোঝার উপায় নেই। তূর্য সেদিকে মনোযোগ না দিয়ে সোজা নিজের ঘরে যায়। দরজা বন্ধ করে মোবাইলটা বের করে। দ্বিধা থাকলেও, সে এক মুহূর্ত আর দেরি করে না।

নাম্বারটি টাইপ করে ফেলে, 'দিব্যেন্দু রায়।'

দূর থেকে ফোন বেজে যাওয়ার শব্দ আসে, তূর্যের বুকের মাঝে ঢেউ তোলে। কয়েকবার রিং হওয়ার পরই ওপাশ থেকে একটা ভারী কণ্ঠ ভেসে আসে, “হ্যালো?”

তূর্য গলার স্বর স্বাভাবিক রেখে বলে,

“আমি তূর্য বলছি, ঢাকা থেকে। আপনি আমাকে চিনবেন না। আপনি দিপ্তী দেবী মজুমদারের ছেলে তো?”

ওপাশের কণ্ঠস্বর স্পষ্ট, “জি, আমি দিব্যেন্দু বলছি। আপনি আমার মা’কে চিনেন?”

তূর্য নিজের মনে কথা একবার সাজিয়ে নেয় তারপর বলে, “আমি আপনার মায়ের বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধু আব্দুর রুশান মোহাম্মদের নাতি বলছি। আসলে বড় দাদার থেকে আপনার মায়ের ব্যাপারে জেনেছি। আপনার মা প্রকৃতি সাহা’র বান্ধবী ছিলেন। আমি আসলে আপনার মায়ের সঙ্গে একটু দেখা করতে চাই, একটু কথা বলতে চাই। এটা কি কোনভাবে সম্ভব হবে?"

ওপাশের কণ্ঠ হালকা স্তব্ধ হয়, তারপর উষ্ণতা নিয়ে ফিরে আসে, “মা একটু অসুস্থ, বুঝতেই পারছেন বয়স হয়ে গেছে। কিন্তু বিশ্বাস করুন মা সবসময় তার বিশ্ববিদ্যালয়ের সবকিছু নিয়ে গল্প করতেই থাকেন। এত বয়স হয়ে গেছে, এখনো যেন তার কাছে এক ভালোবাসা হয়ে রয়ে গেছে তার বিশ্ববিদ্যালয়। আমি প্রকৃতি দেবী আর আব্দুর রুশান মোহাম্মদের নাম শুনেছি মায়ের কাছে। মা এখন আমার সঙ্গে চাঁদপুরে থাকেন, আপনি হয়তো শুনেছেন। মায়ের সঙ্গে দেখা করতে হলে আপনাকে চাঁদপুরে আসতে হবে। আপনি কি এখানে আসতে পারবেন?”

তূর্যর গলায় অনিচ্ছুক এক তীব্র দৃঢ়তা। তূর্য খুব দ্রুত জবাব দেয়। “হ্যাঁ, অবশ্যই আসতে পারবো। আমি খুব দ্রুত দেখা করতে চাই। আপনার সমস্যা না হলে, আমি কালই রওনা হব।”

ওপাশ থেকে এক অভিভূত গলায় দিব্যেন্দু রায় বললেন।

“ঠিক আছে, আমি ঠিকানা আর লোকেশন পাঠিয়ে দিচ্ছি। আমার নম্বরটা সেভ করে রাখবেন। আপনার জন্য অপেক্ষা করব। আপনি আসলে মা খুব খুশি হবেন।”

কলটা কেটে যায়। কিন্তু তূর্যর মনে একধরনের হালকা আলো জ্বলে ওঠে। সব পাজল যেন একেক করে মিলে যেতে চাইছে। সে এবার বিছানায় বসে পড়ে। চোখটা একটু বন্ধ করে, তারপর গলা ছেড়ে ডাকে, “আলিফ… একটু আসবি?”

আলিফ পাশের ঘর থেকে আসে। দরজার দিকে তাকিয়ে বলে, “কি হয়েছে?”

তূর্য খুব স্বাভাবিক গলায় বলে, "একটু হিয়াকে আমার ঘরে আসতে বলতো, তাড়াতাড়ি।"

আলিফ মুচকি হেসে চলে যায়। তূর্য ফিরেও তাকায় না ওর দিকে। কিছু সময়পর হিয়া এসে দাঁড়ায় দরজায়। তূর্য উঠে দাঁড়ায়, একবার জানালার দিকে তাকায়, যেন দৃষ্টির ভেতর প্রকৃতি।

হিয়া চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে দরজার কাছে। তূর্য তার দিকে তাকিয়ে হালকা হাসে। তারপর বিছানার পাশে রাখা চেয়ারে বসে। এরপর বলে, “বস, তোর সাথে একটু গুরুত্বপূর্ণ কথা আছে।”

হিয়া কপাল কুঁচকে ঘরে ঢোকে, “কি হয়েছে?”

তূর্য ধীরে বলে, “আমি চাঁদপুর যাচ্ছি কাল। দিপ্তী দেবীর সাথে দেখা করতে।”

হিয়ার চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে যায়, “চাঁদপুর? দিপ্তী দেবী? প্রকৃতির বান্ধবী দিপ্তী দেবী?

তূ... তূর্য ভাই আপনি তাকে কোথায় পেলেন? আর কিভাবে?

তূর্য রহস্যময় হাসি হাসে। এরপর নিঃশ্বাস টেনে নেয়, তারপর সবটা খোলসা করে বলে, দিপ্তী দেবীকে খুঁজে পাওয়া, তার ছেলে দিব্যেন্দু রায়ের সঙ্গে ফোনে কথোপকথন, দিপ্তী দেবীর অসুস্থতা, সব মানে সব খুলে বলে।

হিয়া কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। আশ্চার্যতা যেন ওকে জমিয়ে দিয়েছে। তূর্যর চোখে বোকার মতো তাকিয়েই থাকলো হিয়া। ওর মন ওকে প্রশ্ন করছে- ‘এটা কি এতোই সহজ ছিল।’ তারপর চোখ সরিয়ে জানালার বাইরে তাকিয়ে বলে,

“আপনি একা যাবেন ভাবলেন কীভাবে? আমি যাচ্ছি আপনার সাথে।”

তূর্য একটু অবাক হয়ে তাকায়, “তুই যাবি?”

হিয়া দৃঢ় গলায় বলে, “হ্যাঁ। আপনি একা খুঁজে পেয়েছেন ঠিক আছে, তার মানে এটা না যে আপনি একা যাবেন। আমি যাবোই। প্লিজ তূর্য ভাই আমাকে নিয়ে যান। প্লিজ… প্লিজ… প্লিজ...।”

তূর্য চুপ করে কিছুক্ষণ হিয়ার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। তার চোখে দৃঢ়তা আর কোমলতা একসাথে জ্বলজ্বল করছে। তারপর একটুও না হেসে বলে, “হিয়া, আমি কাউকে এই অনুসন্ধান সম্পর্কে জানাতে চাইছি না। একটু নিজেই সত্য খোঁজার চেষ্টা করছি। জানতে চাইছি প্রকৃতি কোথায়। তোকে নিয়ে গেলে বাসার সবাইকে কি বলবো? আর তোর মনে হয় এই অজানা শহরে তোকে কেউ ছাড়বে কোন যোগ্য বাহানা ছাড়া? আর আপতোত তোকে নিয়ে যাওয়ার মত কোন বাহানা আমার কাছে নেই।”

হিয়া বেশ চিন্তায় পড়ে যায়, কিছু সময় চুপ করে ভাবে। এরপর বলে, "আমি যদি ঠিকঠাক বাহানা বের করতে পারি, তাহলে আমাকে নিয়ে যাবে তো?

তূর্য বাঁকা হাসে, "ঠিক আছে নিয়ে যাবো। তবে সারাদিন ট্রাভেল করতে পারবি তো? গিয়ে আবার ফেরত আসবো কিন্তু। ভোরে গেলে বিকেল বা সন্ধ্যা হবে ফিরতে।

আমার বাইকটা এখানে থাকলে অবশ্য তোকে সময় ফিক্সড বলতে পারতাম। তবে কিছু করার নেই, এখন বাসেই যেতে হবে।"

হিয়া মাথা নাড়িয়ে সম্মতি দেয়। এরপর বলে, "ভাগ্যিস আপনার বাইকটা নেই। তাহলে তো আমার যাওয়াই হতো না। আমি বাইকে বসতে পারি না।"

তূর্য হাসলো। "যা এখন তোর বাহানা প্রস্তুত কর। নইলে আর তোর কাল যাওয়া হচ্ছে না।"

হিয়া মাথা ঝাঁকায়। চোখে একরকম আলো খেলে যায়, যেন ভেতরে জমে থাকা শত প্রশ্নের জবাব হাত বাড়ালেই মিলবে।

_________

চলবে....♥️