নির্বাসিত কৃষ্ণচূড়া — পর্ব ১১

লেখক: সাদিয়া তিন্তি · বিভাগ: রহস্য · পর্ব ১১ · ৪৭ পর্বের মধ্যে ১১

রাতটা যদিও খুব গভীর নয়, তবু চারপাশে এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা। আকাশজুড়ে ছেয়ে থাকা মেঘগুলো যেন কেবল অপেক্ষায়, এই বুঝি বৃষ্টি নামল! হাওয়ার মধ্যে ভিজে যাওয়া মাটির গন্ধের আভাস, আর বাতাসে হালকা শিহরণ।

ছাদের এক কোণায় তূর্য দাঁড়িয়ে ছিল, নিঃশব্দে। আঙুলের ফাঁকে জ্বলছে সিগারেট, হালকা ধোঁয়া আকাশে মিশে যাচ্ছিল মেঘের সাথে। চোখে একরাশ চিন্তার ছায়া, মুখে সেই চিরচেনা নীরবতা।

ঠিক তখনই হিয়া কোনো কারণ ছাড়াই ছাদে চলে এল। এ কি কাকতালীয়? তবে সে তো শুধু এসেছে আকাশের বাতাসটুকু গায়ে মেখে নিতে। তবে এটা কি নিছক বাহানা?

সে তূর্যকে দেখে থমকালো। কিন্তু তার মন জানতো তূর্যের উপস্থিতি।

তূর্যের চোখে হিয়ার উপস্থিতি ধরা পড়তেই সে চমকে উঠল, মুহূর্তেই সিগারেটটা মুঠোর ভেতর চাপা দিয়ে ছুঁড়ে ফেলল ছাদের এক কোণায়। নিঃশব্দে ধোঁয়ার শেষ রেখাগুলো মিলিয়ে গেল হাওয়ায়, আর সেই সঙ্গে ছাদের বাতাসটাও যেন হালকা শিহরে উঠল।

দুজনেই কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। চারপাশে কেবল মেঘলা রাতের নরম বাতাস, দূরের গলির হালকা কোলাহল, আর মাঝেমধ্যে বৃষ্টির প্রথম ফোঁটার গন্ধ ভেসে আসছিল। হিয়ার চুল বাতাসে এলোমেলো হয়ে মুখ ছুঁয়ে যাচ্ছিল, তূর্য এক মুহূর্তের জন্য অপলক তাকিয়ে রইল। যেন রাতটাও একটু থমকে গেল তাদের চারপাশে।

একটা নরম স্বরে তূর্য বলল, “আজ তো তোকে শহর দেখানো হল না… কাল বিকেলে তৈরি থাকিস।”

হিয়া মুচকি হাসল, চোখে একরাশ আলোর ঝিলিক নিয়ে আস্তে করে মাথা নাড়ল।

হিয়া তখন নরম স্বরে এগিয়ে এসে তূর্যের পাশে দাঁড়াল, ছাদের রেলিংয়ের উপর ভর দিয়ে তাকিয়ে রইল অচেনা, বৃষ্টিভেজা শহরের দিকে। বাতাসে চুল উড়ছিল, চোখে এক ধরনের স্থির ভাব।

হঠাৎ হিয়া ফিসফিস করে বলল, “তূর্য ভাই… আমার মনে হয় না, বড় দাদা মিথ্যে বলছে… বা উনার কিছু লুকানোর আছে। আমি যত শুনি, যত দেখি, তত মনে হয়… এ গল্পের খলনায়ক অন্য কেউ।”

তূর্য ওর দিকে তাকিয়ে এক মুহূর্ত চুপ করে রইল, চোখের কোনায় মৃদু হাসি, যেন এই মেয়েটা ধীরে ধীরে ওর ভাবনার অনেকটা ভাগ নিয়ে নিচ্ছে।

তূর্য এবার ধীরে ধীরে চোখ মেলে তাকাল দূরের আকাশে, যেন মেঘের আড়ালে হারিয়ে যাওয়া কোনো উত্তর খুঁজছে। তারপর নিচু গলায় বলল, “হিয়া… এখানে কে নায়ক, কে খলনায়ক, সেটা বের করা বড় কঠিন… চরিত্রগুলো তো একে একে হারিয়ে গেছে সময়ের স্রোতে। আর যারা এখনো বেঁচে আছে, তাদের সবার পেছনেই রয়ে গেছে কোনো না কোনো রহস্য… কেমন যেন একটা অদৃশ্য পর্দা, যেটা ভেদ না করলে সত্যি ধরা দেবে না।”

হিয়ার চোখে তখন আরেক ঝলক জেগে উঠল, ভয় নয়, বরং মিশ্রিত কৌতূহল আর আকর্ষণ। বাতাসটা যেন হঠাৎ আরো নরম হয়ে এল, দু’জনের নিঃশ্বাস একসাথে মিশে গেল। দূরের কোথাও বিদ্যুতের হালকা ঝলকানি ছায়া ফেলে গেল আকাশে। যেন সেই রহস্যময় রাতের সাক্ষী হয়ে।

হিয়া ধীরে ধীরে ছাদ থেকে নামল, পায়ের নিচে সিঁড়ির ধাপগুলো যেন নিশব্দ কবিতার মতো বাজছিল। তার মন তাকে বারংবার প্রশ্ন ছুড়ছে। এই রাত গুলো এতো হৃদস্পন্দন বাড়ানোর হয় কেন?

হিয়ার প্রশ্ন আরো বাড়ার আগেই, নিজের ঘরে যাওয়ার পথে, হিয়া দেখলো আব্দুর রুশান মোহাম্মদ তার নিজের ঘরে এই মধ্যরাতে আলো জ্বালিয়ে বসে আছেন।

হিয়া তার সমগ্র আঠারো বছর বয়সেও এই আব্দুর রুশান মোহাম্মদকে কোনদিন দেখেনি, হয়তো চিনতে পারেনি।

এটা কি কোন অপেক্ষা? আর কতো?

কি করে একটা মানুষ একটা মানুষের পিছে ছুটে তার সমগ্র জীবন পার করে দেয়?

এই শক্তির নামই কি ভালোবাসা?

হিয়া চুপচাপ আব্দুর রুশান মোহাম্মদকে দেখলো। তার বুকে জড়ানো প্রকৃতির ফেলে যাওয়া সেই শেষ ধ্বংস প্রায় ডায়রিটা। কিছু একটা নিঃশব্দে আউড়ে যাচ্ছেন তিনি। তার চোখে এক অতল তৃষ্ণা। এ কি প্রকৃতিকে আরেকটি বার ফিরে দেখার?

হিয়ার মাথায় এলো সেই লালনগীতি টা,

“তোমারে দেখিবার মনে চায়

তোমারে দেখিবার মনে চায়।

আরে, দেখা দিয়া শান্ত করো

নইলে আমার প্রান যায়…।”

এই গানের শব্দ গুলোই হয়তো আব্দুর রুশান মোহাম্মদের অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ।

হিয়া গানটাকে কবিতার ন্যায় আউড়ে নিয়ে নিঃশব্দে ঐ স্থান ত্যাগ করলো।

হিয়ার মাঝে এক অপ্রকাশিত তোলপাড়। সে ঘরে ফিরতেই, ঘরের হালকা আলোয় চোখে পড়ল মিম, বিছানায় আধশোয়া, চোখে ফোনের নীল আলো ঝলকাচ্ছে, আঙুলের ফস ফস শব্দে স্ক্রল করছে সোশ্যাল মিডিয়ায়। আর এক কোণে পিউ, কাঁথা গায়ে জড়িয়ে, হুমায়ূন আহমেদের অপেক্ষা উপন্যাসের পাতায় ডুবে আছে, যেন ঘরের সমস্ত কোলাহলকে দূরে সরিয়ে একা নিজের জগতে হারিয়ে গেছে।

হিয়া চুপচাপ একটুখানি হাসল। হিয়া ধীরে পা ফেলে জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। বাইরে রোডলাইটের ঝলমলে আলোতে ঝিকিমিকি করছে এক গাছভর্তি কৃষ্ণচূড়া, যেন রাতের নীল অন্ধকারেও আগুন ছড়িয়ে রাখছে আপন শাখায়। হিয়া চুপচাপ তাকিয়ে রইল, চোখের সামনে আলোর ছায়া আর ফুলের আন্দোলনে যেন সময় থমকে আছে।

তার মন চলে গেল দূরে, প্রকৃতি আর রুশানকে নিয়ে। প্রকৃতি আর রুশানের গল্পটা কি অন্যরকম হতে পারতো না?

কে জানে! জীবনটা গল্পের মতো কেন হয় না?

হিয়া মনে মনে হিসাব মেলাতে চেষ্টা করল, কোথায় গিয়ে কাহিনির স্রোত বাঁক নিয়েছে? কোন শব্দে কিংবা কোন ভুলে আজকের রাতটা এভাবে অলিখিত কাব্যের মতো আকাশের বুকে উড়ছে…?

রাতটা ধীরে ধীরে তার অদৃশ্য চাদর মেলতে মেলতে সরে গেল আকাশ থেকে। মেঘ ভেজা বাতাসে ভোরের প্রথম আলো যেন আঙুল ছুঁয়ে ছুঁয়ে নামল শহরের গায়ে। পাখিদের ডাক একে একে ফোটাতে লাগল ঘুমন্ত প্রকৃতির চোখ, আর দূরের গলিতে মিলিয়ে যাওয়া রাতের নিস্তব্ধতায় ভাঙন ধরিয়ে নতুন দিনের আগমনী গান বেজে উঠল।

সূর্য একটু একটু করে মাথা তুলতেই সকাল হলো। ঘরের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ল ফিকে হলুদ আলো, আর সেই সাথে ফোনের রিংটোনে কেঁপে উঠল হিয়ার সকাল।

হিয়ার আব্বুর ফোন। প্রথম সময় কয়েক কুশল বিনিময় করলেন। এরপর বাড়ির সবার খবরাখবর নিলেন। এরং অবশেষে কড়া গলায় বললেন, “এবার বাড়ি ফিরে আয়। তোর কলেজের ভর্তি পরীক্ষা সামনে, কোচিং ক্লাস শুরু হবে।”

হিয়া যেন জবাববে সম্মতি দিতে চাইছে না। তাও বাধ্য মেয়ের মত নরম গলায় সম্মতি দিলো। কিন্তু ব্যাপারটা এখানেই থামল না। হিয়ার বাবা সরাসরি ফোন করলেন আব্দুর রবিউল মোহাম্মদকে। হিয়ার বাবা রাগি মানুষ হলেও, নিজের বাবার কাছে তিনি একেবারেই ভেজা বেড়াল। তাও হিয়াকে বাড়ি ফেরার ফর্মান জারি করতে সক্ষম তিনি।

হিয়ার ছোট মস্তিষ্কে যেন বাড়ি ফেরা আটকানোর এক অলিখিত লড়াই শুরু হল।

সকালের রোদ তাপদাহে পরিণত হওয়ার সাথে সাথেই হিয়ার মন খারাপের মেঘ জমতে শুরু করল। বারান্দার এক কোণে বসে একবার ফোনের দিকে তাকায়, একবার দূরের আকাশে। বাবা-মা ফোনে তাড়া দিচ্ছে, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি আর কোচিংয়ের।‌ কিন্তু হিয়ার মন পড়ে আছে এই পুরোনো গন্ধে মাখা রহস্যের জাদুর শহরে।

সকালটা যেন কিছুতেই শেষ হতে চাইছিল না, প্রতিটি মিনিট টেনে টেনে পার হচ্ছিল। মিম আর পিউ মেতে আছে নিজেদের জগতে, আর হিয়া চুপচাপ জানালার ধারে বসে। বারবার মনে মনে হিসাব করছে। কীভাবে বাবাকে বুঝিয়ে আর দু-একদিন এখানে থেকে যাওয়া যায়? কীভাবে দাদুকে রাজি করানো যায়?

হিয়ার মুখে হঠাৎ এক আলো ছায়ার খেলা ফুটে উঠল, যেন কোনো দুষ্টু বুদ্ধি মাথায় এসেছে। জানালার ধারে দাঁড়িয়ে রৌদ্দুরে ঝকমক করা কৃষ্ণচূড়ার দিকে তাকিয়ে সে মনে মনে ঠিক করল, ঢাকা ছাড়বে না, অন্তত এখনই নয়। তার দাদাভাই, যে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছেন, সেখানেই তো সে থাকতে চায়।

হিয়া মনে মনে ফিসফিস করে হাসল, “কোচিং এখানেই করব, ভর্তি এখানেই, পড়াশোনা এখানেই…”

শুধু একবার দাদাকে বোঝাতে পারলেই হবে, কারণ সে জানে, দাদাকে একবার রাজি করাতে পারলে, বাবার বকাঝকা, মায়ের চিন্তা‌ সবই এক নিমেষে উবে যাবে।

সকালটা ধীরে ধীরে দুপুরের কড়চায় গড়িয়ে এসেছে। দেয়ালে ঘড়ির কাঁটা তখন ২টার ঘরে দাঁড়িয়ে ক্লান্তভাবে হাঁপাচ্ছে। রোদটা আর আগের মতো তীব্র নয়, একটু নরম, একটু ঝিম ধরা। কিন্তু হিয়া এখনো নিজের বিকেলে বের হওয়ার কোনো উপযুক্ত কারণ খুঁজে পায়নি। একেকটা বাহানা মনে আসছে, আর পরক্ষণেই ফেলে দিচ্ছে যেন একেকটা বাতিল চিঠি। আচ্ছা, তূর্য ভাইয়ের সাথে শহর ঘুরতে তার বাহানা কেন প্রয়োজন? সোজা শহর ঘোরার কথা বললে বাড়ির সব গুলো মানুষ পিছু নেবে তাই! হিয়া কি একাকী ঘুরতে চায়? তবে কেন?

এসব ভাবনা ছেড়ে হিয়া হঠাৎ এক তীব্র সিদ্ধান্ত নিয়ে সে দৌড়ে চলে গেল ঘরের ভেতরে, যেন হঠাৎ কিছু মনে পড়েছে। দরজা ঠেলে ঢুকতেই চোখে পড়ল, মিম বিছানার কোণে বসে একটা ছোট বাক্সের চারদিকে কাগজ মুড়িয়ে নিচ্ছে, একেবারে মনোযোগে। সোনালি ফিতা আর গোলাপি স্টিকার ছড়ানো বিছানায়।

হিয়া একবার তাকিয়ে দেখে নিল বাক্সটা, কিন্তু ওর মাথা এখন অন্য চিন্তায় ভরা। সে মিমের কাজে খুব একটা গুরুত্ব না দিয়ে গম্ভীর গলায় বলল, "শোন, আমাকে একটা জরুরি কাজের বাহানা বানিয়ে দে। বিকেলে তূর্য ভাই শহর দেখাতে নিয়ে যাবে বলেছে।"

মিম চোখ তুলে তাকাল, ওর মুখে সেই পুরোনো দুষ্টু হাসিটা দেখে একটু কৌতূহল নিয়ে বলল, "আবার কি রে! প্রেম নাকি রহস্য? সত্যি বলতো তুই আর তূর্য ভাই আসলে কি খিচুড়ি পাকাচ্ছিস? "

হিয়া হেসে বলল, "এইবার রহস্য প্রেম কিছু না। শুধু শহর দেখতে চাই। আগে প্ল্যান দে।"

মিম ভ্রু কুঁচকে বললো, "আমাকে চাপা দিস না। অন্য দিন হলেও বিশ্বাস করতাম যে সত্যি বলছিস তবে আজ না।"

হিয়া একটু চমকে বললো, "কেন আজ আবার কি এমন?"

মিম একটু বিস্মিত হয়ে বললো, "নাটক করছিস? তুই তূর্য ভাইয়ের ফেসবুকে এড নেই?"

হিয়া বিরক্তি নিয়ে বললো, "তোর সাথে নাটক কেন করবো! যেটা বলবি পরিষ্কার বল। আর না আমি উনাকে কখনো রিকোয়েস্টই দেই নি। উনিও দেন নি।"

মিম মাথায় হাত দিয়ে বললো, "হায় রে! আজ কতো তারিখ জানিস? মে মাসের ১২ তারিখ। আজ আমাদের শ্রদ্ধেয় বড় ভাই জনাব তূর্য সাহেবের জন্মদিন।"

হিয়ার মুখটা এক নিমেষে ফ্যাকাশে হয়ে গেল। চোখে-মুখে যেনো বিস্ময় আর অপরাধবোধ একসাথে এসে থাপ্পর মারল। মনে মনে যুদ্ধ শুরু হল তার, তূর্য ভাইয়ের জন্মদিন! আর সে কিনা কিছুই জানে না? গতরাতেও তো আচমকা ছাদে কথা হলো কত সময়। একটা ছোট্ট জন্মদিনের শুভেচ্ছা তো তিনি অবশ্যই ডিজার্ভ করেন।

মিম এবার একটু নরম স্বরে বললো, "তূর্য ভাই কি তোকে তার জন্মদিন উপলক্ষে ঘুরতে নিয়ে যাচ্ছে?"

হিয়া বড় বড় চোখে তাকিয়ে বললো, "না না। আমি আরো দু'দিন আগে ঘুরার আবদার করেছিলাম। উনি বলেছিলেন গতকালই নিয়ে যাবে তবে গতদিন তো মাসুম দাদু এলেন বিকালে তাই আর হলো কোথায়! তাই আজ ঘুরতে যাওয়ার কথা।"

মিম হাসলো। "তার মানে কাকতালীয় বিষয়। তুই যদি চাস, এই গিফটটা তুই দিয়ে দিস। আমি কিছু মনে করবো না। বরং ভালোই লাগবে। তূর্য ভাই সারপ্রাইজও হয়ে যাবে।”

হিয়া বাকরুদ্ধ। নিজের গালে নিজেরই ধমক দেয় মনে মনে। এই এতটা উদাসীন হওয়ার কথা ছিল? তূর্য ভাই তো এতদিন ধরে তার পাশে থেকেছে, রহস্যে ছায়া হয়ে, সাহসে আগুন হয়ে! এমন একজন মানুষের জন্মদিন সে ভুলে গেল? অবশ্য ভুলার প্রশ্ন কোথা থেকে আসছে! ও তো জানতোই না যে জন্মদিন কবে।

____________

চলবে....... 🖤