নির্বাসিত কৃষ্ণচূড়া — পর্ব ১৩

লেখক: সাদিয়া তিন্তি · বিভাগ: রহস্য · পর্ব ১৩ · ৪৭ পর্বের মধ্যে ১৩

দিনের এক রাশ ব্যর্থতা নিয়ে দাঁড়িয়ে তূর্য। সংশয় নামের অনুভূতিটা তূর্যকে আস্টে পিস্টে জাপটে ধরছে। এই সংশয়ের মেঘ গলে জল হলো নীল আকাশ দেখে। তবে তার এই আকাশ জলজ্যান্ত হেঁটে তার সামনে এসে দাঁড়ালো। নীল রাঙা শাড়িতে যে মেয়েটাকে সে দেখছে, তাকে সে হাজার শত বার এ ক'দিন দেখেছে। তার রূপ নকশা তূর্যর নখদর্পণে। তবে সেই একই আদলে আজ যে দাঁড়িয়ে তার সামনে, আসলেও তূর্যর সাথে তার কখনোই দেখা হয় নি। তূর্য কি শুধু আশ্চার্য হলো নাকি ঘাবড়ে গেল তা সঠিক বোঝা গেল না। তবে তূর্য তার চোখের সামনে হিয়ার এই রুপ দেখার কল্পনা স্বপ্নেও আনেনি।

তূর্য চোখ ফেরাতে পারছিল না। যেন চোখের পাতা নড়লেই কিছু অমূল্য হারিয়ে যাবে। হিয়ার পায়ের নিচে মাটি আছে কি নেই, তাও বুঝে উঠতে পারছিল না। রোদে ভেজা বিকেলের আলো ঠিক যতটা কোমল হতে পারে, হিয়ার উপস্থিতি তার থেকেও নরম, তার থেকেও রঙিন।

হিয়া এগিয়ে এসে দাঁড়ালো তূর্যের সামনে। চোখে একধরনের দ্বিধা, কিন্তু ঠোঁটে সেই চিরচেনা মুচকি হাসি। তূর্যর গলার কাছে কি এক অচেনা গরম জমা হতে লাগলো।

হিয়া বলল ধীর স্বরে, "তূর্য ভাই, আমি কিন্তু একদম সময়মতো বের হয়েছি।"

তূর্য একটু কাশলো, যেন নিজেকে ফিরে পাওয়ার চেষ্টা। সে বললো হালকা স্বরে, "আমি জানি,"

তারপর চোখ নামিয়ে বললো, "কিন্তু সময় যে আজ তোর মতো করে আসবে জানতাম না।"

হিয়া হাসল কিছু বললো না। শুধু তাকিয়ে থাকলো। রাস্তায় একখানা রিকশা দাঁড়িয়ে ছিল। তূর্য ইশারা করতেই সে কাছে এলো।

তারা দুজনে রিকশায় উঠলো। হাওয়া আজ অন্যরকম লাগছে। হিয়ার আঁচল উড়ে এসে তূর্যর কাঁধ ছুঁয়ে যাচ্ছে মাঝে মাঝে। আর তূর্য কোনো শব্দ করছে না, কিছু বলছে না। শুধু তাকিয়ে আছে সামনের রাস্তায়, আর মাঝে মাঝে চুপি চুপি হিয়ার ছায়ার ভেতর হারিয়ে যাচ্ছে।

রিকশার চাকা দুটো যেন সময়ের কোনো পুরনো কবিতায় ছন্দ তুলছে। ঢাকার ব্যস্ততা আজ যেন একটু তফাতে দাঁড়িয়ে আছে, একচিলতে শান্তি এঁকে দিচ্ছে ওদের চারপাশে। বিকেলের আলো ধীরে ধীরে সোনালি হয়ে আসছে, রিকশার ছায়ায় ঝরে পড়ছে গাছের পাতা, দোকানপাটের শব্দ যেন দূরের কোনো জাদুপুরীর আওয়াজ।

হিয়ার চোখ দুটো শহরের প্রতিটা রঙে বুঁদ হয়ে যাচ্ছে, ফুটপাতের গাছের নিচে বসা বাচ্চাগুলো, পুরোনো বাড়ির দেয়ালে জমে থাকা শ্যাওলা, রাস্তায় হেঁটে যাওয়া ব্যস্ত মানুষের মুখে মুখে ফুটে থাকা ছোট ছোট গল্প। আর তূর্য? সে তাকিয়ে আছে হিয়ার দিকে। শহর তাকে আজ কিছু বলে না, হিয়ার প্রতিটি নড়াচড়ার ভেতরেই সে খুঁজে পাচ্ছে নিজের হারানো দৃঢ়তা।

একটা জায়গায় এসে হিয়া হঠাৎ বলল, "এই জায়গাটা সুন্দর।"

তূর্য উত্তর দিলো না, শুধু বলল, "চল, একটু দাঁড়াই এখানে।"

রিকশাও যেন বুঝে নিল কথাটা, ধীরে থেমে গেল। সামনেই ছিল একটা ছোট্ট চায়ের দোকান, তার পাশে লাল ইটের পুরোনো একটা বেঞ্চ।

তারা চুপচাপ নেমে গিয়ে সেখানে বসল। বাতাস একটু ঠান্ডা হয়ে এসেছে, চারপাশের আলো নিস্তরঙ্গ।

তূর্য বলল, "জানিস, এই শহরটা একেক মানুষের জন্য একেক রকম। জাদুর শহর কেন বলে জানিস এটাকে?"

হিয়া মাথা নাড়িয়ে অসম্মতি দেয়। তূর্য বলে, "এই শহরে সবাই চোখ ভর্তি স্বপ্ন নিয়ে আসে। কিছু স্বপ্ন পূরণ হয় আর কিছু রঙিন চশমার আড়ালে হারিয়ে যায়।"

হিয়া মুখ ঘুরিয়ে বলল, "আপনার কথা গুলো খুব গভীর!"

তূর্য শুধু হাসলো। আকাশ তখন গাঢ় নীল। শহরের আলো একে একে জ্বলে উঠছে, আর তূর্য আর হিয়ার গল্প ধীরে ধীরে মিশে যাচ্ছে সেই আলোর ভেতর।

রিকশা আবার চলতে শুরু করলো। এবার শহরের প্রতিটা মোড় যেন তাদের নাম ধরে ডাকছে, প্রতিটা বাতাসে একটুকরো কবিতা জড়িয়ে আছে, আর ওরা দুজন সেই কবিতার চরিত্র হয়ে ছুটে চলেছে। একটা বিকেলের মায়ায় মোড়া অনির্বচনীয় যাত্রায়।

রিকশা থামলো পুরান ঢাকার এক নিভৃতে কোণে, যেখানে ব্যস্ত শহরের কোলাহল ছাপিয়ে একটুখানি নির্জনতা আজও বেঁচে আছে। তূর্য হিয়াকে নিয়ে ঢুকলো 'আলিয়া রেডিং লাইব্রেরি'র পুরোনো লাল ইটের দরজা দিয়ে। বাইরে থেকে দেখতে যেমন ক্লান্ত কোনো ইতিহাসের শরীর, ভেতরে তেমনই নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে থাকা অসংখ্য গল্পের রাজ্য। এটা হিয়ার'ই আবদার অবশ্য। সে যেতে চেয়েছিল নীলক্ষেত, তবে তূর্য নিয়ে এলো অন্য বইয়ের রাজ্যে।

ভেতরে ঢুকতেই যেন এক অন্য সময়ের গন্ধ। পুরোনো কাঠের তাক, বইয়ের পাতার বিবর্ণ হয়ে যাওয়া গন্ধ আর নীরবতার মাঝখানে ছড়িয়ে থাকা শান্ত এক সংগীত। মাথার ওপরে লোহার চুড়ানো জানালা দিয়ে সোনালি আলো এসে পড়েছে পড়ার টেবিলের ওপর। বাতাসে কেবল কাগজ আর শব্দের ঘ্রাণ।

হিয়া নিঃশব্দে তাকাতে থাকে চারপাশে। তার চোখে বিস্ময়ের মতো কৌতূহল। সে ধীরে ধীরে এগিয়ে যায় বইয়ের তাকের দিকে, কখনো ছুঁয়ে দেখে, কখনো টেনে আনে কোনো পুরোনো কবিতার বই। তার আঙুল বোলাতে থাকে পৃষ্ঠার ওপর, যেন শব্দের ভেতর দিয়ে সময় ছুঁয়ে দেখছে।

তূর্য কিছু বলছে না। সে একটু দূর থেকে হিয়াকে দেখছে। তার চোখে তখন এক ধরনের প্রশান্তি। যা হিয়ার মতো মানুষের পাশে থাকলেই জন্ম নেয়।

হিয়া একটা চেয়ারে বসে পড়ে একটি বই হাতে, চোখ ডুবে যাচ্ছে অক্ষরের মাঝে। তূর্য তখন ফোনটা বের করে। হিয়ার অজান্তেই সে ক্যামেরায় চোখ রাখে, আনমনে তুলে ফেলে একের পর এক ছবি। কখনো হিয়ার বই পড়ার মুহূর্ত, কখনো সে তাকিয়ে আছে দূরের জানালার দিকে, আবার কখনো পেছন থেকে তার খোলা চুলে আলোর খেলা।

প্রতিটা ছবি যেন নিজের ভাষায় কথা বলছে। তূর্যর দেখা হিয়ার একেকটা রূপ ধরা পড়ছে তাতে। সে জানে, আজকের এই বিকেলটা, এই লাইব্রেরির নিঃশব্দ গায়ে লেগে থাকা কাগজের গন্ধ সব মিলে এই মেয়েটার সাথে কাটানো সময় তার সবচেয়ে দামী স্মৃতি হয়ে থাকবে।

হিয়া তখনো জানে না তূর্য ঠিক এই মুহূর্তগুলো ধরে রাখছে। সে জানে না তূর্যর চোখে সে একটা জ্যান্ত কবিতা, যে কবিতা বইয়ের পাতায় নেই, শুধু হৃদয়ের ভেতর লেখা।

লাইব্রেরির ভেতরে বাতাস তখনও থমকে আছে, শব্দহীন। তূর্য যখন একমনে হিয়ার ছবি তুলছিল, হিয়া তখন নিঃশব্দে উঠে দাঁড়ায়। চারপাশে তাকিয়ে, ধীরে এগিয়ে যায় বুক শেলফের এক কোণে। যেখানে পুরোনো উপন্যাসগুলোর মাঝে দাঁড়িয়ে আছে তার প্রিয় লেখক হুমায়ুন আহমেদের কিছু বই।

চোখ আটকে যায় একটা বইয়ের মলাটে ‘অপেক্ষা’। হিয়া তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ, যেন এক নতুন অনুভূতির সাথে আবার দেখা হচ্ছে তার। বুকের মধ্যে কিছুটা আলোড়ন হয়, একটু অজানা, একটু হাসি। সে নিচু স্বরে দোকানের বৃদ্ধ লাইব্রেরিয়ানকে ডাকে, চোখের ইশারায় বলে দেয় বইটা চাই।

তূর্য কিছু টের পায় না। হিয়া ইচ্ছে করেই তাকে সেদিকে ফিরতে দেয় না। বইটা মোড়ানো হয় পুরোনো বাদামি কাগজে, যেন কোনো গোপন চিঠি। সে ব্যাগে রেখে দেয় নিঃশব্দে, বুকের খুব কাছে।

তূর্য তখন বলে, “চল এবার?”

হিয়া হালকা হাসে, বলে, “হ্যাঁ, চল।”

দুজন আবার বেরিয়ে আসে লাইব্রেরির লাল ইটের দরজা পেরিয়ে। বাইরে তখন আকাশ ধূসর। রোদ আর মেঘের খেলা থেমে গিয়ে নামছে একটানা ইলশে গুঁড়ি বৃষ্টি‌, মাঝারি নয়, ভারি নয়, শুধু নরম ছোঁয়ার মতো।

রিকশার ছাউনি আবার মাথার ওপর নেমে আসে, হিয়া আর তূর্য বসে পড়ে পাশাপাশি। শহর যেন ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে, ছুটন্ত নয়, শান্ত। হিয়া খুব আবদার নিয়ে বলে, "হুটটা থাক না! আজ একটু ভিজি।"

তূর্য হেসে হুটটা নামিয়ে দেয়। রাস্তাগুলো ধুয়ে যাচ্ছে বৃষ্টিতে, বাতাসে মাটির গন্ধ। শহরের ছায়ায়, বৃষ্টির ছোঁয়ায়, রিকশার হালকা কাঁপুনিতে, তাদের এই যাত্রা তখন হয়ে উঠছে আরও একটুখানি গভীর, আরও একটুখানি নিজস্ব।

তূর্য একটু ঝুঁকে হিয়ার দিকে তাকায়। তার চোখে একরাশ উষ্ণতা, মুখে একরকম প্রশান্ত হাসি। বৃষ্টির ফোঁটা তখন হিয়ার চোখেমুখে ঝিরঝির করে পড়ছে। হিয়ার চুল ভিজে কপালের পাশে লেপ্টে আছে। তূর্য নিচু গলায় জিজ্ঞেস করে, “তোর ফুল লাগবে?”

হিয়া থমকে যায়। “ফুল?” তার কপালে ভাঁজ পড়ে, চোখে বিস্ময়ের রেখা। “এখন?”

তূর্য কোনো উত্তর না দিয়ে হঠাৎই রিকশা থামিয়ে দেয়। “তুই বস, আমি একটু আসছি।”

এই বলে সে ভিজে রাস্তায় নেমে পড়ে, ছুটে যায় এক দিকের গলির দিকে। হিয়া ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে তাকিয়ে থাকে তার পেছনে। বৃষ্টির পর্দার ভেতরে তার ছায়া ধীরে ধীরে মিলিয়ে যায়।

ঝিরি বৃষ্টি সবকিছু ভিজিয়ে দিয়েছে। গাছের শাখা প্রশাখা দিয়ে টপটপ করে পানি পড়ছে। হিয়া সোজা হয়ে বসে, চারদিকে তাকায়। কোনো দিকেই তূর্যকে দেখা যায় না। তার বুকের ভেতর একটা অজানা অস্থিরতা তৈরি হয়। সে একবার রিকশার বাইরে উঁকি দেয়, একবার আকাশের দিকে তাকায়। বৃষ্টি আরও নরম হয়ে এসেছে, কিন্তু তূর্য নেই।

ঠিক তখনই, তার চোখের সামনে এসে দাঁড়ায় তূর্য। হাত ভরা একগুচ্ছ রঙ। জলভেজা দুই হাত জুড়ে সে তুলে ধরে, কৃষ্ণচূড়া, সোনালু, আর জারুল।

রাস্তায় কোথাও পড়ে থাকা, গাছ থেকে ঝরে পড়া, কিছু নিজের হাতে ছিঁড়ে আনা ফুলের গুচ্ছ। ভিজে গেছে সব, কিন্তু রঙ হারায়নি।

কৃষ্ণচূড়ার টকটকে লাল, যেন হিয়ার গালে লেগে থাকা রক্তিম লজ্জা। সোনালুর ঝুলন্ত হলুদ ছায়া, যেন কোনো হারানো দুপুরের আলো। আর জারুল, রঙ যেন মেঘলা দিনের বুকে এক ফোঁটা স্বপ্ন।

তূর্য এগিয়ে এসে বলে, “তোর জন্য। বৃষ্টি, শহর আর তুই। এই সময়টা মনে রাখার জন্য।”

হিয়া একমুহূর্ত কিছু বলতে পারে না। তার চোখে জল গড়ে ওঠে কিনা, তূর্য জানে না। তবে এই বৃষ্টিভেজা ফুলগুলো তখন কেবল ফুল নয়। তা হয়ে উঠেছে এক নিঃশব্দ কল্পনা, একটা অনুভূতির শরীর, যা বলা যায় না, শুধু অনুভব করা যায়।

হিয়ার কোলের ওপর তূর্য ফুলগুলো রাখে, আর হিয়া সেই মুহূর্তে জেনে যায়। এই শহরের প্রতিটা রঙ, প্রতিটা গন্ধ, প্রতিটা বৃষ্টি-ভেজা বিকেল, তার পাশে ব্যক্তি জীবন্ত এক সুখ। অষ্টাদশীর মনে কি নতুন কোনো অনুভূতির শুভারম্ভ হল? এটাই কি তবে সেই সুখ!

রিকশা ধীরে ধীরে এসে দাঁড়ায় বাসার সামনে। বৃষ্টি তখনও থামেনি, কিন্তু যেন একটু ক্লান্ত হয়ে এসেছে। শহর যেন দম ফেলে নিচু স্বরে গান গাইছে। তূর্য আর হিয়া দুজনেই ভিজে গেছে, চুল-জামা ভেজা, চোখদুটো জ্বলজ্বল করছে।

তবু কোনো ক্লান্তি নেই তাদের মধ্যে, শুধু একটা অদ্ভুত প্রশান্তি। রিক্সা থেমে গেলে হিয়া একটু চুপ করে বসে থাকে। তারপর ধীরে ধীরে তার ব্যাগ খুলে সেই বাদামী খামে মোড়া বইটা বের করে। হুমায়ূন আহমেদের ‘অপেক্ষা’। বইটার খামে জল লেগে কিছুটা নরম হয়ে গেছে, তবু একরকম কোমল সৌন্দর্য এখনো ছড়িয়ে আছে তার চারপাশে।

হিয়া বইটা তূর্যের দিকে বাড়িয়ে দেয়। হালকা করে হাসে। “শুভ জন্মদিন, তূর্য ভাই। আমি জানি আপনি বই পড়েন না। আর আমি আশাও করবো না, আপনি এই বইটা পড়বেন। বাবা সব সময় বলে মানুষকে সবসময় নিজের প্রিয় জিনিসটা উপহার হিসেবে দিতে হয়। এই বইটা আমার সবথেকে প্রিয়। তাই ভাবলাম আমার প্রিয় বইয়ের ভাগ আপনাকেও দেই।”

তূর্য স্তব্ধ হয়ে যায়। তার ঠোঁট কাঁপে, কিন্তু কোনো শব্দ বেরোয় না। “তুই...তুই জানিস আমার জন্মদিন?”

হিয়া মাথা নাড়ে। একটুও ভণিতা করে না। তার কণ্ঠে একধরনের ধরা পড়ে যাওয়া কোমলতা, যা কেবল আবেগ জানে, হিসাব জানে না। এবার হিয়া আবার বলতে শুরু করে, “তূর্য ভাই... আপনি পৃথিবীর সবথেকে সুন্দরতম সময়ে জন্মেছেন। কৃষ্ণচূড়া, সোনালু আরো কতো রঙে... এ কারণেই হয়তো আপনি নিজেই একটা ফুলের মতো সুখ। আপনাকে অঞ্জনদত্তের একটা গান উৎসর্গ করা যেতো। তবে গানটা তিনি একটা নারী চরিত্র ‘মালা’র নামে লিখেছিলেন। তাই আর ১২ই মে জেনেও, উৎসর্গ করা হলো না।”

তূর্য কিছু বলে না। শুধু তাকিয়ে থাকে হিয়ার চোখে। তার চোখে মিশে যায় পৃথিবীর সব রঙ।

হিয়ার কথাগুলো তখন শহরের এক কোণে জমে থাকা জলের মতো নিঃশব্দে গড়িয়ে পড়ে তূর্যর হৃদয়ে। তূর্যের মন আউড়ায়, সুখ মানে হয়তো শুধু আভিজাত্য কিংবা বাড়াবাড়ি নয়। সুখ মানে কারও চুপিচুপি মনে রাখার অভ্যেস, সুখের ভাগ দেয়ার সাহস।

হিয়া ব্যাগটা গুছিয়ে নিয়ে ধীরে ধীরে রিকশা থেকে নামতে যায়। বৃষ্টিতে পা ভিজে যাচ্ছে, শাড়ির আঁচল চুপচুপে, কিন্তু তবুও তার মুখে একরকম নির্ভার প্রশান্তি।

রিক্সা ছেড়ে দু'পা রাখতেই, পেছন থেকে তূর্যের গলা আসে, “হিয়া…”

হিয়া থমকে যায়। ধীরে ফিরে তাকায়। চোখে এক চিলতে জিজ্ঞাসা। তূর্য হালকা হেসে বলে, “আমি কাল চলে যাচ্ছি।”

এক মুহূর্ত যেন স্থির হয়ে যায়। হিয়ার চোখে ঝলকে ওঠে বিস্ময়। “চলে যাচ্ছেন? হঠাৎ? কেন?”

তূর্য একটু দৃষ্টি ফেরায় আকাশের দিকে। তারপর নিচু গলায় বলে, “আমি তো অতিথি পাখি, হিয়া। সময় হলেই ফিরতে হয়। এখন ঘরে ফেরার পালা।”

হিয়ার ঠোঁট কাঁপে কিছু বলার জন্য, কিন্তু তার আগেই তূর্য ঠেলে দেয় একরকম হালকা হাসি, “মিমরা আসছে, তাড়াতাড়ি ঘরে ফিরে চেঞ্জ করে নে।

আমি মিনিট পাঁচেক পর ফিরছি।”

হিয়া তাকিয়ে থাকে তার দিকে, চোখে একরাশ কথার ভিড়, যেগুলো আর বলা হয় না। বৃষ্টির ফোঁটার মতো কিছু অনুভব হয়, যা ঝরে পড়ে বুকের মধ্যে।

তবুও সে মাথা নাড়িয়ে একটুকরো মুচকি হাসি ছুঁড়ে দেয় তূর্যের দিকে। তারপর ধীরে ধীরে পেছন ফিরতে ফিরতে বলে, “অতিথি পাখি!”

আর তূর্য?

সে বসে থাকে রিক্সার উপর, হাতে একখানা বই, বুক ভরা নীরবতা, আর চোখে ঝিরঝির করে নেমে আসা একরকম মেঘলা বিকেল।

_________

চলবে.........❤️