নির্বাসিত কৃষ্ণচূড়া — পর্ব ২৭

লেখক: সাদিয়া তিন্তি · বিভাগ: রহস্য · পর্ব ২৭ · ৪৭ পর্বের মধ্যে ২৭

নগরের বুক জুড়ে সন্ধ্যা ধীরে ধীরে নেমে এসেছে, যেন ক্লান্ত সূর্যটা শহরের ঘাড়ে মাথা রেখে একটু জিরিয়ে নিচ্ছে। বাতাসে ধুলো, ভাঙা আলো আর একরকম অচেনা ভার। তূর্য বাইকের হ্যান্ডেল শক্ত করে ধরে এগিয়ে যায়। বাতাসে ধুলোর সাথে মিশে আছে এক ধরনের অচেনা ভার। যা তার কাঁধে পড়ছে না, কিন্তু তার ভেতরটা চেপে ধরছে।

বাড়িতে ঢুকেই সে সোজা নিজের ঘরের দিকে চলে যায়। কারো সাথে কথা নয়, চোখাচোখিও নয়। একটি অন্য জগৎ থেকে ফিরে আসা মানুষের মতো, যার ভিতরে এখনো গেঁথে আছে অন্য কোনো সময়ের আবেশ। দরজা ভেতর থেকে লাগিয়ে ব্যাগ খুলে ফাইলের খামগুলো বের করে টেবিলের ওপর রাখে। তারপর ধীরে ধীরে চলে যায় শাওয়ারের নিচে।

পানির ধারার মতো করে চিন্তারা তার মাথার ওপর দিয়ে বয়ে যায়। প্রতিটি ফোঁটার সাথে কেবল শরীর থেকে ক্লান্তি নয়, মন থেকে ভারও নামাতে চায়, কিন্তু পারে না। সেই পুরনো কাগজ, কিছু মুছে যাওয়া নাম, ধোঁয়াটে ঠিকানা, এবং এক অস্পষ্ট অতীত সব মিলিয়ে যেন একটা রহস্যময় ম্যাপ আঁকা হয়ে চলেছে তার ভিতরে। এক মুহূর্তে মনে হয় সে খুব কাছাকাছি, আরেক মুহূর্তে মনে হয় সবকিছু হাতছাড়া।

ফ্রেশ হয়ে আবার নিজের ঘরে ফিরে আসে তূর্য। টেবিলের হালকা বাতি জ্বলে উঠলে কাগজগুলো যেন এক এক করে জেগে ওঠে। সে ফাইল খুলে পড়ে, যেন একটা অদৃশ্য কোর্টরুমে বসে তদন্ত করছে প্রতিটি পৃষ্ঠা সাক্ষী, প্রতিটি নাম সাক্ষ্য। ঘরের নিস্তব্ধতা ঘন হয়ে ওঠে, বাতাস ভারী হয় কিন্তু তূর্যর ভেতর তখন এক অদ্ভুত শীতল দৃঢ়তা। এই কাগজগুলো কারো জানার দরকার নেই, এই সত্যগুলো এখন কেবল তার।

হঠাৎই সে উঠে দাঁড়ায়। একটা সিদ্ধান্ত কেমন করে যেন মগজের ভেতর ঝরনার মতো নেমে আসে। নিঃশব্দ, তীব্র। ধীরে পা ফেলে সে আব্দুর রুশান মোহাম্মদের ঘরের দিকে যায়।

দরজাটা সামান্য খোলা। ভিতরে টেবিলের পাশে বসে আছেন আব্দুর রুশান মোহাম্মদ, চোখে পুরনো চশমা, সামনে খুলে রাখা একটি ধূসর পৃষ্ঠার বই। চারপাশে বইয়ের গন্ধ, পুরনো কাঠের মৃদু শব্দ, আর নিঃশব্দে বয়ে চলা একটি জীবনের ইতিহাস।

তূর্য দাঁড়িয়ে থাকে কিছুক্ষণ। সেই দৃশ্যটা তার কাছে যেন অতীতের কোনো চিত্রপট এক জীবন্ত ক্যানভাস, যেখানে জীবন ও অপেক্ষা পাশাপাশি বসে আছে।

তূর্য কড়া নাড়ে না, কোনো শব্দও করে না। নিঃশব্দেই ঢুকে পড়ে ঘরের ভেতর। আব্দুর রুশান মোহাম্মদ চোখ তুলে তাকান, একটু বিস্ময় নিয়ে বলেন, “তূর্য? কিছু দরকার?”

তূর্যর মুখে একটুখানি হাসি ফুটে ওঠে। সে হাসি অপ্রস্তুত নয়, ভাঙাও নয়, বরং একটা গভীর জমানো কিছু। এরপর সে ধীরে বলে, "শঙ্খ নামের যে ব্যক্তির থেকে তুহুরার কাছে যে চিঠি এসেছিল, সেই চিঠিটা চাই।"

রুশান মোহাম্মদের মুখে ছায়া খেলে যায়। কপালে ভাঁজ পড়ে না, কিন্তু চোখের মধ্যে জমে ওঠে এক স্তব্ধ বিস্ময়। স্বরের মধ্যে হালকা একটা কৌতূহল নিয়ে তিনি জিজ্ঞেস করেন, “হঠাৎ চিঠিটা কেন?”

তূর্য এক মুহূর্ত নীরব থেকে বলে, “বলার মতো কিছু না। শুধু একটু দরকার। ভাবছি শঙ্খকে যদি পাওয়া যেত।”

রুশান মোহাম্মদ কিছু বলেন না আর। একটানা তাকিয়ে থাকেন তূর্যর মুখের দিকে, যেন তার ভিতরে কীসের আঁচ পেতে চাইছেন। তারপর ধীরে, নিঃশব্দে, টেবিলের নিচে রাখা তুহুরার পুরনো কাঠের সিন্দুকটা খুলে দেন। সেখান থেকে খুব যত্নে খুঁজে খুঁজে তুলে আনেন একটা চিঠির খাম। খামটা বাড়িয়ে দেন তূর্যর দিকে। তূর্যও চুপচাপ সেটি হাতে নেয়। বুকপকেটে রেখে দেয় গভীর সতর্কতায়, যেন সেটা কোনো চিঠি নয়, বরং একটা পূর্ণ যাপন। একটা হারিয়ে যাওয়া সময়ের হৃদস্পন্দন। চোখে তার পুরোনো জেদের রেখা ফুটে ওঠে, সেই চেনা চাপা শপথ, যা কেবল নিজের ভেতরেই জ্বলে ওঠে, নিঃশব্দে।

সে বেরিয়ে যায় আব্দুর রুশান মোহাম্মদের ঘর থেকে। কোনো কথা নয়, কোনো ব্যাখ্যা নয়। শুধু একটামাত্র চিঠি। একটা নাম। একটা অসমাপ্ত অপেক্ষা। আর তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এক মানুষ, যাকে সত্য খুঁজতে হবে আলো ছাড়াই।

ঘরের দরজাটা পেছনে টেনে তূর্য ধীরে নিজের ঘরের ভিতরে ঢোকে। এ ঘরের জানালার কাঁচে ধুলো জমে আছে, বাতাসে পুরনো কাঠের গন্ধ। তুহুরার ঘরটাও যেন সত্য জানতে চায়। সব দিকে অদ্ভুত স্তব্ধতা। তূর্য টেবিলের ওপর রাখা ফাইলগুলোয় চোখ বুলিয়ে ধীরে বুকপকেট থেকে চিঠিটা বের করে।

চিঠিটার খামটা বেশ পুরনো, কাগজের গায়ে ছোপ পড়েছে, কোণাগুলো ক্ষয়ে গেছে। হালকা করে খুলে তূর্য ভেতরের পাতাটার ছবি তোলে। তারপর খামের উপরের অংশ, যেখানে প্রেরকের ঠিকানায় “কলিকাতা, বউবাজার, নর্থ কলেজ স্ট্রিট…” বাকি অংশ অস্পষ্ট, কিছু অক্ষর প্রায় মুছে গেছে তবুও কোথাও কোথাও হালকা ছাপ বেঁচে আছে। সেটারও একাধিক ছবি তোলে নানা অ্যাঙ্গেল থেকে।

তারপর সে ফোনটা হাতে নিয়ে বন্ধুবান্ধবদের একটা প্রাইভেট গ্রুপে ছবিগুলো পাঠায়। গ্রুপটা পুরনো বন্ধুদের,‌ এখানে যারা আছে তূর্যর জানা মতে এদের অনেকেই হ্যাকিং, ট্রেসিং, ইতিহাস খোঁজা বা কোনো প্রকার রহস্য খুঁজে বের করার খেলায় সবসময়ই আগ্রহী। ছোট বেলায় এদের সখ ছিল শার্লক হোমস হবার। তূর্য যে এসব মজায় মাতে নি এমনটা নয়।

তূর্য একবার হাসে, তার লাস্ট টেক্সট ঠিক কতো সালে দেয়া এই গ্রুপে তার সন্ধান নেই। বছর দুয়েক এই গ্রুপটা আর সম্পূর্ণ নীরব। তাও পিছিয়ে গেলে চলবে না, তূর্য একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ছবি গুলো পাঠিয়েই লিখে দেয়, "দেখো তো কেউ সাহায্য করতে পারো কিনা। এই চিঠিটা প্রায় ৫০ বছরের পুরনো। শঙ্খ নামের একজন মানুষ লিখেছে। ঠিকানাটা হাফ-মুছে গেছে। বিশেষ করে ঠিকানা খুব প্রয়োজন। কেউ কি এটাকে ডিজিটালি ইনহ্যান্স করে পুরোটা পড়ার চেষ্টা করতে পারো? অথবা যদি কেউ চেনো এই লেখার ধরন বা লে-আউট, প্লিজ জানাও। খুব জরুরি। কিংবা এমন কাউকে চেনো কি, যে এইসব কাজ করে থাকে?‌ পুরনো লেখা গুলোকে সামনে নিয়ে আসে?”

বার্তা পড়ে কয়েক মিনিট নিশ্চুপ থাকে গ্রুপ। তারপর একে একে উত্তর আসতে শুরু করে,

আদিল নামে একজন লেখে, "তূর্য, আমি OCR সফটওয়্যারে দিয়ে দেখছি যদি কিছু করা যায়।"

আব্দুল হান্নান নামের একজন লিখেন, "দেখতেছি কিছু শব্দ শনাক্ত করা যায় কিনা। ছবি না দিয়ে মেইন চিঠিটা হাতে পেলে আরো ভালো হতো।"

জিকু নামের একজন লেখে, "ব্যাপারটা ইন্টারেস্টিং লাগছে। চিঠির কালি কি কালচে লাল? তাহলে ওটা fountain pen এর iron gall ink হতে পারে। তাতে কিছু ক্যামিক্যাল ইনহ্যান্সমেন্ট সম্ভব।"

তূর্য একটুখানি ভেবে নেয়। এরপর ফোনটা পাশে রেখে আবার চিঠিটার দিকে ফিরে যায়।‌ শব্দগুলো ছুঁয়ে দেখার মতো করে পড়ে।

রাত আরও গাঢ় হয়েছে। ঘরের ভিতর হালকা বাতাসে পর্দা একটু নড়ছে। তূর্য ফোনটা টেবিলেই রেখে দিয়েছিল, কিন্তু হঠাৎ স্ক্রিনে ভেসে ওঠে একটা নাম, মেসেজ করেছে, "জিহান কুবরিয়া"

তূর্য একটু অবাক হয়। জিকুর সাথে ওর ব্যক্তিগত ভাবে কথা হয় না সে অনেক বছর। বন্ধুত্ব স্কুলে বেশ ঘনিষ্ঠ ছিল। তবে সময়ের সাথে সাথে সেই বন্ধুত্বে পারদ জমেছে। মেসেজ ওপেন করে তূর্য পড়ে, "তূর্য ঠিকানাটা কি সিরিয়াস কিছু।"

এরপর আরেকটা মেসেজ আসে, "তুই হয়তো জানিস না, আমি গত দুই বছর ধরে ইউনিভার্সিটির অ্যাপ্লায়েড কেমিস্ট্রি ল্যাবে আছি। আমরা একটা রিসার্চ করছি হস্তলিখিত পুরনো দলিল বা ডকুমেন্ট থেকে মুছে যাওয়া লেখা কীভাবে ক্যামিক্যাল বা light-based method দিয়ে পুনরুদ্ধার করা যায়।"

তূর্যের চোখ স্থির হয়ে আসে স্ক্রিনে। জিকু আবার লেখে, "এই চিঠি দেখে আর তুই যেমন বললি যে চিঠির বয়স ৫০। আমার মনে হয় iron gall ink, fountain pen ink এমন কোন কলম দিয়েই লেখা। আর এধরনের কলমের কালি সময়ের সঙ্গে অক্সিডাইজ হয়ে ফেড হয়ে যায়, কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই কাগজের মধ্যে ক্যামিক্যাল ট্রেস থেকে যায়। আমরা সেই ট্রেস ধরেই UV বা IR লাইটে কাজ করি, সঙ্গে কিছু harmless reagent ব্যবহার করি যাতে কালি ফিরে আসে আংশিকভাবে।"

এটার পর আরেকটা মেসেজ, "তোর চিঠিটার ছবিগুলো আমি ভালো করে দেখেছি। কালির ধরন, কাগজের গঠন আর লেটারের ফোল্ডিং দেখে মনে হচ্ছে এটা late 60s বা early 70s-এর দিকে হতে পারে। আমাদের কাছে একটা mini-spectral scanner আছে, যেটা microscopic residue detect করতে পারে। তুই চাইলে কাল সকালেই চিঠিটা নিয়ে আসতে পারিস।"

তূর্যের বুকের ভেতরে যেন কেমন একটা চাপ তৈরি হয়। এতদিনের অজানা একটা রাস্তা এবার সত্যিই খোলা যাচ্ছে মনে হয়। সে ফোনের স্ক্রিনে ভেসে থাকা মেসেজের দিকে তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ, তারপর চিঠিটার খামটা আবার হাত দিয়ে স্পর্শ করে।

এরপর তূর্য জিকুর মেসেজের রিপ্লাই করে, "অনেক অনেক ধন্যবাদ জিকু। আসলেই এই ঠিকানাটা খুব দরকার। আমাকে তোর ল্যাবের এড্রেসটা পাঠিয়ে দে। কাল সকালেই আমি চলে আসবো।”

স্ক্রিনে কিছুক্ষণ নীরবতা। তারপর জিকু মেসেজের মাধ্যমে ঠিকানা পাঠিয়ে দেয়। সাথে লেখে, “কাল কিন্তু তুই কফি খাওয়াবি। শুধু কাজের বাহানা নয় তূর্য… সময় নিয়ে আসিস। কতো বছর দেখা হয় না ভাব! আড্ডা হবে।”

তূর্য একটুখানি হেসে ফেলে। এত বছর পরও জিকুর কথার ভঙ্গিমা একটুও বদলায়নি। সেই স্কুল জীবনের মতোই, বন্ধুত্ব, দায়বদ্ধতার এক আশ্চর্য ভারসাম্য ওর মাঝে। আসলেই মানুষ বোধহয় একটা সামান্য পদক্ষেপের কারণে আটকে থাকে। আমাদের কত পুরনো বন্ধু এদিকে ওদিকে ছড়িয়ে আছে, খোঁজ নেয়া হয় না। আমরা আটকে থাকি রোজকারের ব্যস্ততায়। তূর্য হাসে। জিকুর সাথে কাজের বাহানায় কথা হলেও, যেন তূর্যের অনুভব হয় সে পুরোনো দিন পেয়ে গেছে।

সে মেসেজটা একবার চোখ বুলিয়ে আবার ফোনটা নামিয়ে রাখে। তারপর ধীরে ধীরে খাটের পাশে রাখা সাইড টেবিলের দিকে এগিয়ে যায়। সেখানে এক কোণায় ছোট একটা কাঠের ট্রে, তার উপর রাখা কিছু বই আর কলম, পাশে একটা ছাই রঙা মোমবাতি।

তূর্য খুব সতর্ক হাতে বুকপকেট থেকে সেই পুরনো চিঠিটার খামটা বের করে। একবার চোখের সামনে ধরে রাখে কিছুক্ষণ, যেন কাগজের প্রতিটি আঁচড় তাকে কিছু বলছে, ডাকছে কোথাও। তূর্য সব কিছু গুছিয়ে রাখে। এটা‌ যেন একটা প্রমাণ, একটা চিহ্ন, আর একটা অসমাপ্ত ইতিহাসের সূত্র। সব যেন মিলবে সময়ের বেড়াজাল থেকে বেরিয়েই।

হালকা বাতাসে পর্দা আবার নড়ে ওঠে। জানালার বাইরে একটা রাতজাগা পাখির ডাক ভেসে আসে। শহরের নিঃশব্দ ভঙ্গুরতা আর তূর্যের বুকের গুমোট আশঙ্কা সব মিলিয়ে এক নিবিড় মুহূর্ত তৈরি হয়। তূর্য একটু পেছনে হেলে খাটে বসে। মাথা ঠেকিয়ে দেয় দেয়ালে। চোখ বুজে ফেলে ধীরে ধীরে।

রাতটা যেন খুব ধীরে কেটে যায়। তূর্য কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছিল, বুঝতেও পারে না। ঘুমটা গভীর নয়, তার মস্তিষ্কের মাঝে জমেছে হাজার কাটাকাটি খেলা।

সকালটা আসে খুব স্নিগ্ধভাবে। জানালার ফাঁক গলে আলো এসে তূর্যের ঘরজুড়ে পড়ে, আর সে ধীরে উঠে দাঁড়ায়। একটা নতুন দিন শুরু হয়েছে, তবে তূর্যর হাতে আর বেশি সময় নেই। তাকে আবার ফিরতে হবে তার ঠিকানায়। সে তো সমাজ লোক সকলকে লুকিয়ে এখানে চুপটি করে রহস্য খুঁজছে। আজকের দিনটাই শুধু তার হাতে। তূর্য এসব নিয়ে ভাবে না আর, খুব নিরবে তৈরি হয়। একটা ছোট ব্যাগে চিঠিটার খাম, নোটপ্যাড, আর একটা কলম রাখে। বাইকের চাবি নিয়ে বেরিয়ে পড়ে। শহর তখনও পুরোপুরি জেগে ওঠেনি, তবু রাস্তায় ছিটেফোঁটা ব্যস্ততা ছড়িয়ে পড়ছে।

ঘড়িতে তখন সকাল ৮টা ৫৫ মিনিট, তূর্য পৌঁছে যায় জিকুর ইউনিভার্সিটির ল্যাব বিল্ডিংয়ে।

তূর্য দরজার সামনে দাঁড়াতেই ভেতর থেকে দরজা খুলে যায়। জিকু দাঁড়িয়ে, মুখে চওড়া হাসি, গায়ে ল্যাবকোট, গলায় ঝুলছে চোখের চশমা। সে যেন আজ ভোরে ভোরে সকলের আগে এসেছে শুধু তূর্যর জন্য। জিকু তূর্যকে দেখেই এগিয়ে জড়িয়ে ধরে। তূর্য খানিকটা অপ্রস্তুত হলেও পুরনো বন্ধুকে নিজেও জাপটে ধরে। জিকু প্রসন্ন হয়ে বলে “তোকে এক যুগ পরে দেখলাম।”

তূর্যও হেসে ফেলে, “ লম্বা বছর কেটে গেছে বন্ধু।”

দুই বন্ধুর চোখে এক মুহূর্তের জন্য কেবল স্মৃতি খেলে যায়।‌ ছোটবেলার বিকেল, বইয়ের পাতা, সাইকেলের দৌড় আর রহস্য গল্পের পাতায় হারিয়ে যাওয়া তারা। এরপর জিকু তূর্যকে ভেতরের কক্ষে নিয়ে যায়। ভেতরে ঢুকে তূর্য চেয়ারে বসে চিঠিটা জিকুকে বের করে দেয়। জিকু চিঠিটা হাতে নিয়ে খুব সাবধানে পড়ে। এরপর বলে, “ঠিক যেমন ভেবেছিলাম। কালিটা পুরোনো iron gall ink, কাগজে এখনো মাইক্রো-রেসিড্যু আছে। কিন্তু এইটা delicate কাজ। কেমিক্যাল লাগানোর আগে স্ক্যান করব UV আর IR light-এ। তারপর একটা সফটওয়্যারে image enhance করব। যতটুকু লেখা এখনো শোষিত হয়ে আছে, তার ধাঁচ ধরার চেষ্টা করব।

কিন্তু চিঠিটা কার? কাল গ্রুপে বললি খুব ইমারজেন্সি… কাকে খুঁজতে চাচ্ছিস এত বছরের পুরনো ঠিকানা?”

তূর্য হাসে। এরপর বলে, “সে লম্বা ঘটনা। বলতে পারিস খুব অসম্ভবের মাঝেই চিঠিটা পেয়েছি। শুধু চিঠির মালিককে পেলেই চলে।”

জিকু বলে, “অনেক পুরোনো, এই ঠিকানায় আসলেও এখন কেউ থাকে কি-না সেটাই খোঁজার। কিন্তু আগে ঠিকানাটা পাওয়া তবে জরুরি।”

তূর্য একটুখানি মাথা নাড়ে। চুপচাপ বসে থাকে সে। জিকু এবার রুমের একপাশে রাখা আধুনিক এক ডেস্কের দিকে এগিয়ে যায়। টেবিলে রাখা ছোট একটা UV-IR Dual Light Scanner অন করে। তারপর গ্লাভস পরে খুব ধীরে সেই চিঠিটাকে ওপরে রাখে।

আলো জ্বলে ওঠে। কক্ষটা যেন হঠাৎ একটু নিস্তব্ধ হয়ে যায়। তূর্য গন্তব্যহীন এক পথে ছুটছে সে জানে। তবে তাও সে সমাধান চায়। প্রকৃতি আর তুহুরা দুজনেই এক পৃষ্ঠার এপাট আর ওপাট। দুজনেই রহস্যের গভীরে আটকে আছে। আর সারা পৃথিবী যেন তাদের রহস্যে ডুবিয়ে রেখেই খুশি। তবে তূর্য ছুটছে পৃথিবীর বিপক্ষে।

স্ক্যানারের নীলচে আলো ধীরে ধীরে কাগজের গায়ে নেমে আসে। সেই আলোতে পুরনো কালি নতুন করে জেগে ওঠে, মাঝে মাঝে অক্ষরের রেখা স্পষ্ট, কোথাও ভেঙে গেছে, কোথাও আবার হালকা ছাপ রেখে গেছে।

জিকু নিঃশব্দে মনোযোগ দিয়ে কাজ করছে। একেকটা ফ্রেম ধরে ধরে স্ক্যানার রিডিং নিচ্ছে। তার চোখে স্নায়ুবিজ্ঞানীর মতো ধৈর্য, মুখে একাগ্রতা, এবং মনে এক ধরনের দায়িত্ব। তূর্য চুপচাপ বসে, জিকুর প্রতিটা মুভমেন্ট পর্যবেক্ষণ করছে।

হঠাৎ, স্ক্রিনে একটা অংশে কিছু অক্ষর ভেসে ওঠে। "...নর্থ কলেজ স্ট্রিট, বউবাজার, কলকাতা – 700073, চিত্রাঙ্গদা হাউস, তৃতীয় লেন"

জিকু মৃদু গলা তুলে বলে, “পেয়েছি! তোর চিঠি হারিয়ে যাওয়া ঠিকানা পেয়েছি।!”

তূর্যের বুকের ভেতর কেমন যেন করে ওঠে সে চেয়ার থেকে উঠে ছুটে যায়। জিকু তারপর একটা ডেস্কে গিয়ে খুব ধীরে একটি সাদা কাগজ টেনে আনে। স্পষ্ট অক্ষরে পুরো ঠিকানাটা লিখে দেয়,

"নর্থ কলেজ স্ট্রিট, বউবাজার, কলকাতা – 700073 চিত্রাঙ্গদা হাউস, তৃতীয় লেন।"

জিকু তূর্যের হাতে কাগজটা দিয়ে বলে, “এইবার যদি এই চিত্রাঙ্গদা হাউস এখনো থেকে থাকে, তাহলে কিছু সূত্র তো পাবিই। চেষ্টা করে দেখ‌।”

তূর্য চুপচাপ কাগজটা হাতে নেয়, যেন ধরে আছে এক অমূল্য চাবি, যে চাবি খুলে দিতে পারে বহুদিনের গোপন এক দরজা। তার চোখ খুশিতে চমকিত হয়ে ওঠে। তূর্য ভাবেওনি যে এই ঠিকানাটা এত সহজে খুঁজে পাওয়া যাবে। সে একরকম খুশীতেই জিকুকে জাপটে ধরে।

জিকু হাসে, একটু কাঁধে চাপড় মেরে বলে, “তুই এত খুশি হচ্ছিস যেন মনে হচ্ছে তোর প্রেমিকার ঠিকানা পেয়েছিস। আমার কিন্তু গল্পটা শোনার জন্য এক্সাইটমেন্ট বাড়ছে। এত পুরনো ঠিকানা আর তুই এত খুশি।”

তূর্য বলে, “ আগে সব রহস্যের সমাধান করি, এরপর একদিন জমিয়ে আড্ডা দেবো। তারপর সবটা জানাবো। আপাতত একটু ধৈর্য ধর।”

তূর্যের এই কথার পর জিকুও আর তূর্যকে জোরাজুরি করেনা। এরপর বেশ অনেকক্ষণ তাদের আড্ডা চলে নানা বিষয়ে। চায়ের কাপ ফুরোয় পর পর কয়েকটা।

__________

চলবে....🧐