নির্বাসিত কৃষ্ণচূড়া — পর্ব ৩৭

লেখক: সাদিয়া তিন্তি · বিভাগ: রহস্য · পর্ব ৩৭ · ৪৭ পর্বের মধ্যে ৩৭

রাস্তার পাশের গাছগুলো হঠাৎ হাওয়ায় দুলে ওঠে, পাতার মধ্যে একটা ঝিরঝিরে শব্দ হয়। একটা গল্পের পরিণতি মাথায় নিয়ে তারা যেন অতীতে থমকে যায়।

হিয়া তখন হঠাৎ একটু থেমে দাঁড়ায়, তূর্যও থামে। সে আকাশের দিকে তাকায়, নির্বাক। সেখানে কোনো তারা নেই, কেবল ধোঁয়াটে এক শূন্যতা। ঠিক তখনই তূর্য তার হাতটা আলতো করে ধরে। নিঃশব্দে। এ যেন তূর্যের প্রথম স্পর্ধা। প্রথম স্পর্শ। হিয়ার জঞ্জালে ব্যস্ত মস্তিষ্ক যেন হঠাৎ অন্য এক অনুভূতিতে জমে ওঠে। তূর্য হিয়ার হাতটা একটু মজবুত করে ধরে ওর মুখোমুখি দাঁড়ায়। হিয়া নির্বাক তাকিয়ে থাকে শুধু। তূর্য হিয়ার চোখে অপলক তাকিয়ে বললো, “হিয়া…. কিছু গল্প মহলের জন্য, আর কিছু্ দাফন হয় স্বপ্নের পিরামিডে। তবে এসব গল্পের ভাজে আমি মরিচিকার চরিত্র মাত্র…।

কাহিনীর রুপ বদলাতে সত্যিই বেশি সময় লাগে না। কিছু মুহূর্তে বদলে যায় সমগ্র কাহিনীর ইতিহাস। শুধু মুখোশ গুলো খুলতে যতো সময় দেরি । মুখোশ খোলে কাহিনী বদলায়, নতুন গল্পের শুরু হয়। এটাই নিয়ম। আমি জানি প্রকৃতির বাস্তবতা এত সহজ গ্রহণযোগ্য নয়। আমাদের সামনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা সব গুলো জীবন বিদ্ধস্ত। এদের জীবনের গল্পে কেউই পূর্ণতা পায়নি অথচ গল্পটা পূর্ণতার হতেই পারতো..! এতো এতো অপূর্ণতার মাঝে আমি চাই না আরো একটা অপূর্ণতা যুক্ত হোক। এই শহুরে রাস্তায় অনেক স্মারকলিপি এবং সড়ক আমাদের অচেনা৷ এমন হাজারো সন্ধ্যায় স্মৃতি কুড়ানোর অনুমতি দিবি?”

তূর্যর কথার মাঝেই আষাঢ়ে আকাশের মেঘ ঝরে পড়লো। হিয়া বৃষ্টির স্পর্শে ছুটতে চাইলেও আঁটকে রইল। তূর্যর হাতে নিবদ্ধ হাতটার বন্ধনী আরো দৃঢ় হলো। হিয়া স্থির হলো। শহর ব্যস্ত নিজেদের গা বাঁচাতে। বৃষ্টির আচমকা হামলা রাস্তায় তোলপাড় শুরু করলো। এই তোলপাড়ে দাঁড়িয়ে আছে এক প্রেমিক যুবক আর অষ্টাদশী তরুণী। হিয়া ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না তার সঙ্গে হচ্ছেটা কি। তূর্য হিয়ার এমন আচমকিত মুখায়বক দেখে ওর হাতটা ধীরে ছেড়ে দেয়। সামান্য মৃদু হেসে বললো, “আষাঢ়ে কৃষ্ণচূড়া দেখেছিস? একদম রক্তবর্ন হয়। তোকে যেদিন সাদরে হৃদস্পন্দনের সমাচার শোনাবো সেদিন মনে করে কদম আনবো। এতো বেশি রুক্ষতা মানাচ্ছে না।”

হিয়া অপলক শুধু তাকিয়ে থাকে। শব্দরা যেন তাকে ছেড়ে অনেক দূরে পৌঁছে গেছে। তাদের ঘরে ফেরার সময় পেরোচ্ছে। তূর্য এবার একটা সিএনজি ডাকে। সিএনজির ছাদে টপটপ করে বৃষ্টি পড়ছে। চারপাশে শহরের কোলাহল ধুয়ে যাচ্ছে আষাঢ়ের জলধারায়। একটানা এই সাদা শব্দের ভেতর তূর্য আর হিয়া উঠে বসে সিএনজিতে।

তূর্য জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ, তারপর নিচু গলায় বলে, “আজকের এই সত্যতা… এই সাক্ষাৎ। এগুলো যেন আপাতত কারো কাছে না যায়। এই ভয়ংকর বিষয়টা বড়দাদাকে জানালে আমরা সবকিছু সামলে উঠতে পারবে না। বুঝতে পারছিস, মানুষটা তার সমগ্র জীবন প্রকৃতির অপেক্ষায় কাটিয়েছেন।এই সত্যতা এক মুহূর্তের মাঝে সকল অপেক্ষাকে মিথ্যে করে দিতে পারে। তাছাড়া রহস্য আসলে কতটুকু খুলেছে সেটাও এখন সময়ের বিচার।”

হিয়া শুধু চুপ করে শোনে। তারপর ধীরে জিজ্ঞেস করে, “তাহলে আপনি কী করতে চাইছেন, তূর্য ভাই?”

তূর্য এবার স্থির চোখে হিয়ার দিকে তাকায়। তার কণ্ঠে তখন সিদ্ধান্তের দৃঢ়তা, আবার কোথাও এক নরম আবেগের রেখা, সে বলে, “আমি কালকেই দাদিকে ঢাকায় নিয়ে আসার ব্যবস্থা করছি। স্বাত্ত্বকি শুধু ইতিহাস নয়, উনিই উত্তর। আর আমি চাই তিন ভাইবোন, একেবারে একসাথে উনার সামনে দাঁড়াক। অতীতটা খুলে যাক। সত্যি বলতে...আর কত লুকোচুরি? আর কতটা সত্যি খণ্ডিত রেখে মানুষটা বাঁচবে?”

হিয়ার চোখ আবারো ভিজে উঠলো। খুব জড়ানো গলায় বললো, “সত্যটা আমিই মেনে নিতে পারছি না, বড়দাদা কি করে মানবেন! সব থেকে কষ্ট লাগছে এটা ভেবে যে, নিজের ভাই-বোন, পরিবার তারাই যদি ধোঁকা দেয় তবে মানুষ বিশ্বাস করবে কাকে। কারো কি বড়দাদার প্রতি মায়া হলো না? একবার সত্যটা সব জানাতেই পারতো! মানুষেরা তো কখনো মৃত মানুষের জন্য অপেক্ষা করে না। সব অপেক্ষা তো জীবিত মানুষের জন্য।”

সিএনজির আলো লাল আর সবুজ বাতির ছায়া ছুঁয়ে ছুঁয়ে চলেছে। তূর্য হিয়ার কথার কোন প্রতি উওর করে না। হিয়ার মুখেও আর কোনো শব্দ নেই, কিন্তু তার বুকের মধ্যে যেন এক অশান্ত ঝড়। তার ছোট্ট মস্তিষ্ক প্রচন্ড ব্যথিত। সে তো সেই কবেই প্রকৃতিকে নিজের মাঝে সমিয়ে নিয়েছিল। কিছুতেই যেন প্রকৃতির এমন পরিণতি মেনে নিতে পারছে না সে। ও জানতে চায় ডায়রির শেষ পৃষ্ঠাগুলোতে আদৌও কি ছিল। কেন এতো দূর্ভাগ্য। কেন সব পাপ তাদের, কেন.. কেন আর কেন? তবে উওর নেই। তূর্য জানে হিয়ার এমন তোলপাড়। তাই বোধহয় নিজের অনুভূতির একটা আংশিক উপস্থাপনের মাধ্যমে ওর মস্তিষ্ককে অন্য ভাবনায় আকৃষ্ট করতে চেয়েছিল। তবে সে এক প্রকার ব্যর্থ‌‌।

বৃষ্টির শব্দ আর সড়কের জলের ছপছপে ছন্দে মিলিয়ে যাচ্ছে তাদের অব্যক্ত তোলপাড়। হিয়া জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকে, চোখে এক বিষণ্ণ দৃঢ়তা। সিএনজি তখন শান্তিনগরের অলিগলি পেরিয়ে পুরান ঢাকার পথে এগিয়ে চলেছে। আষাঢ়ের বৃষ্টিতে শহর ধুয়ে যাচ্ছে এক ধুয়ো ধোয়া স্বপ্নের মতো। চারপাশে জ্বলজ্বলে ল্যাম্পপোস্টের আলো জলের গায়ে পড়ে গলে পড়ছে রঙিন ছায়ায়। তূর্য একবার হাত ঘড়ির দিকে তাকাতে গিয়েই চমকে যায়। তার কপালে ভাঁজ পড়ে। সময় রাত সাড়ে আটটা। পকেট থেকে ফোনটা খুব দ্রুত বের করে। পর্দায় আলো জ্বলে ওঠে, আর তখনই তার চোখ বড় হয়ে যায়, কপালে ভাঁজ গুলো আরো স্পষ্ট হয়। সে মৃদু স্বরে বলে, “৫৫টা মিসকল!.. মিম ৫৫ বার কল করেছে! ফোনটা মিউট ছিল… একবারও টের পাইনি!”

তার কণ্ঠে অনুশোচনার ঝলক স্পষ্ট। এই দৃশ্য দেখে হিয়া হঠাৎ তার অন্যজগৎ থেকে জেগে ওঠে। সে নিজের ব্যাগে হাত ঢুকিয়ে ব্যস্তভাবে ফোনটা খুঁজে বের করে। ফোন হাতে নিয়েই দেখে, একেবারে নিঃসাড়, বন্ধ হয়ে আছে। হিয়া একটা চাপা হাঁফ ছাড়ে, "উফ!"

তাড়াহুড়ো করে ফোন অন করে। কয়েক সেকেন্ড যেতেই পর্দা জ্বলে ওঠে। ফোন অন হতেই একসঙ্গে বেশ কয়েকটা মেসেজের নোটিফিকেশনের ঢল নামে স্ক্রিনে। হিয়া তড়িঘড়ি মিমকে কল ব্যাক করে। ওপাশে ফোন ধরতেই শুরু হয় ঝড়। মিম চেঁচিয়ে ওঠে, “তুই পাগল নাকি হিয়া?! কোথায় তুই? এতক্ষণ ধরে তোকে খুঁজে মরছি! আমি রেস্টুরেন্টেই বসে আছি। অতিমাত্রায় বৃষ্টি শুরু হওয়ায় বাইরে বের হতে পারছি না। মেঝদাদা… ৬–৭ বার খোঁজ করে ফেলেছে! তোর ফোন বন্ধ। আমি কী বলবো সবাইকে? মিথ্যে বলে বলে মুখ ব্যথা হয়ে গেছে আমার।”

হিয়া বিষন্ন মুখ টিপে হাসে। মিমের বিরক্তিতে ভরা চিন্তিত কণ্ঠে একটুখানি শান্তির স্বরও আছে। তার রাগ যেন হিয়ার উপর চেঁচানোর জন্যই আটকে ছিল। হিয়া মিমের এমন ব্যবহারের সাথে পরিচিত। সে নিচু গলায় বলে, “তুই একটু বস… আমরা আসছি। খুব বেশি দেরি হবে না। একদম কাছাকাছি।”

ওপাশ থেকে মিমের বিরক্তি কিছুটা গলে যায় হিয়ার কণ্ঠে। একটা দীর্ঘশ্বাস শোনা যায়। মিনিট পাঁচেক পর সিএনজি মিমের দেয়া রেস্টুরেন্টের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। বৃষ্টি তখনো তার হিংস্রতা দেখাতে ব্যস্ত। ভিজে শহরে চেনা ঠিকানায় ক্লান্ত তারা স্মৃতি বয়ে ফিরে এসেছে যেন। চিরাচরিত নিয়ম অনুযায়ী মিম আর হিয়া আগে বাড়িতে ঢোকে। তূর্য অপেক্ষা করে সময় যাবার। তারা বাড়িতে ঢুকতেই বাইরের ঘন বর্ষনের থেকেও কড়া বর্ষন বর্ষে যায় হিয়া আর মিমের উপরে। আব্দুর রবিউল মোহাম্মদ শাসনের বাঁধনছাড়া শব্দ নিক্ষেপ করতে থাকেন লম্বা সময়। তবে হিয়ার এমন কাকভেজা রুপ দেখে যেই না থামতে যাবে তূর্য ঠিক তখনই প্রবেশ করে একেবারেই চুপচুপে ভিজে। সবার চোখ একসঙ্গে তার দিকে ঘুরে যায়। আব্দুর রবিউল মোহাম্মদ একটু চমকে ওঠেন অপ্রত্যাশিত তূর্যকে দেখে। তূর্য সালাম দেয় শুধু, আরো কিছু বলতে যাবে, তার আগেই আব্দুর রুশান মোহাম্মদ নরম হেসে আব্দুর রবিউল মোহাম্মদকে বলেন, “তোকে বলা হয়নি, তূর্য গত রাতেই এসেছে। ওর বিশ্ববিদ্যালয়ের একটা প্রজেক্টে কাজ করতেই ইমার্জেন্সি আসা।”

আব্দুর রুশান মোহাম্মদের কণ্ঠ শান্ত, স্বাভাবিক ও দৃঢ়। যেন সমস্ত অশান্তিকে দুধারে সরিয়ে মাঝখানে নিরাপদ একটা পথ তৈরি করে দিচ্ছে। নিজের ভাইয়ের থেকে গোপন করে নেন তূর্যর আগমনের কারণ। আব্দুর রবিউল মোহাম্মদ আর কিছু বলেন না। মিম, হিয়া আর সময় নষ্ট না করে দ্রুত তাদের ঘরের দিকে এগোয়।

হিয়ার মনের ভিতর এক বিশাল ঝড় চলছে। সে ঘরে গিয়ে এক মুহূর্ত সময় না নিয়ে একেবারে সোজা চলে যায় ওয়াশরুমের দিকে। মিম চুপচাপ দেখে, তার চোখে বিস্ময়। হিয়ার এমন হঠাৎ তাড়াহুড়ো সাধারণত হয় না। তার চলার ভঙ্গিতে যেন কেউ পালিয়ে যাচ্ছে, নাকি নিজের ভেতরে ফিরে যাচ্ছে। ওয়াশরুমের দরজা বন্ধ হতে না হতেই সাওয়ারের নিচে গিয়ে দাঁড়ায় হিয়া। ঝাঁঝালো ঠাণ্ডা জলের ধারায় সারা শরীর ভিজে যায়, কিন্তু সেই জলের চেয়েও বেশি কিছু ঝরতে থাকে তার ভিতর থেকে। মুখ নিচু করে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে, আর জলের শব্দের নিচে চাপা পড়ে যায় তার গলার কান্না। সাওয়ারের নিচে সে যেন নিজের ভিতরের সমস্ত অনুভূতি ধুয়ে ফেলতে চায়, স্মৃতি, বিশ্বাস, সত্যতা সব।

সময় গড়িয়ে যায়। অনেকটা সময় পার হলে মিম ওয়াশরুমের দরজায় হালকা কড়া নাড়ে,‌ “হিয়া… আর কতো গোলস করবি? পুরো ট্যাংকির পানি শেষ করেই বের হবি নাকি… ঠিক আছিস তো?”

মিমের কথায় ভেতর থেকে সাওয়ারের শব্দ থেমে যায়। কিছুক্ষণ পরে দরজা খোলে হিয়া। এই ঠান্ডা পানিতে লম্বা সময় ভিজে তার শুভ্র শরীর তুষারের মতো আরো বেশি শুভ্র হয়ে উঠেছে। হিয়া ওয়াশ রুমে থেকে বেরিয়ে সোজা ঘরের আয়নার সামনে বসে পড়ে। তার ভেজা লম্বা চুল বেয়ে টপটপ করে পানি পড়ছে, চোখ লাল আরো ফুলে গেছে। সে শুধু এক ধ্যানে তাকিয়ে থাকে সেই আয়নার দিকে, কিন্তু সে নিজের মুখ দেখতে পায় না। আয়নার কাঁচের ভেতর এক নিস্পন্দ, বিদ্ধস্ত মুখ… এ ঠিক প্রকৃতির মুখাবয়ব ভেসে উঠেছে। একই রকম ভেজা চুল, একই রক্তাক্ত চোখ আর নিরুত্তর এক অসীম শোক।

মিম আস্তে আস্তে এসে পাশে বসে। হিয়ার কাঁধে টাওয়াল রাখে, চুলের ভেজা পানি মুছিয়ে দেয় নিজের হাতে। তার মুখে এখন আর কোনো প্রশ্ন নেই, শুধু উদ্বিগ্ন নীরবতা। তবুও সে ধীরে জিজ্ঞেস করে, “হিয়া… কী হয়েছে? এমন করছিস কেন? কিছু বল…কিছু ভয়ংকর হয়েছে কি? আমার কিন্তু খুব টেনশন হচ্ছে।”

হিয়া কিছুই বলে না, বরং আচমকা মিমকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে। তার কাঁধে মুখ গুঁজে হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে। এমন কান্না যা কোনো শব্দে বলা যায় না। এই কান্নাটাই যেন এতক্ষণ তার ভেতরে জমে ছিল। মিম হতচকিত হয়ে পড়ে, তারপর নিজেও জড়িয়ে ধরে হিয়াকে।

বেশ কিছুক্ষণ পরে হিয়ার কাঁপা কণ্ঠে ভেঙে ভেঙে বেরিয়ে আসে সব কথা। স্বাত্ত্বকির মুখে শোনা ইতিহাস, প্রকৃতির জীবন-মৃত্যু, চিঠির কথা, ঝুমকা, প্রাচি, ১৯৭১ সহ তুহুরার নীরবতা। একেবারে পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে সবটা বর্ণনা করে সে। সবটা বলে হিয়া যেন একেবারে নিঃশেষ হয়ে যায়। চোখে আর জল নেই, মুখে আর ভাষা নেই, শুধু বুকের ভেতর এক ভাঙাচোরা উপকূল। মিম নিজেও স্তব্ধ। শুধু তার চাহনিতে থাকে এক অভাবনীয় বিস্ময়। তার নিজের চোখও জলে ভিজে গেছে। সে নিজেও যেন মেনে নিতে পারছে না এই কঠিন সত্য। এ ঘটনার সঙ্গে সেও তো প্রথম থেকেই জড়িত। সে নিজের চোখেই দেখেছে আব্দুর রুশান মোহাম্মদের প্রকৃতির প্রতি তাজা অনুভূতি।

রহস্য হয়তো রহস্যের মতো মাটি চাপা থাকাটাই শ্রেয়। রহস্য ভাঙলে কিছুই আর আগের মত থাকে না। আর এই রহস্যের পিছের অপরাধি তো অনেকেই, নিজের আপন রক্ত। একটা মানুষ নিজের রক্তের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করবে কি করে?

রাতটা তখন নিঃস্তব্ধ এক অনুচ্চারিত ভারে ঢাকা। ছাদের ছাউনীতে বৃষ্টির শেষসুর টুপটাপ বাজছে। খাবারের টেবিলেও অনুপস্থিত হিয়া। বারংবার সকলে ডেকে গেলেও এক গাঢ় ঘুমের অভিনয়ে সকলকে তাড়াতে সক্ষম সে। তবে, হিয়া ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না তার শরীরটা বেশি ভারী, নাকি মনটা। আব্দুর রুশান মোহাম্মদের সম্মুখিন হতে চাইছে না হিয়া কোনভাবেই। হিয়ার মনের স্তব্ধ অনুভূতিরা বলছে, তিনি একবার হিয়ার দিকে তাকালেই জেনে যাবেন সকল সত্য। হিয়া লুকাতে পারবে না এতো বড় বাস্তবতা। এই দ্বিধা, এই অনিশ্চয়তা, এই আত্মদহনেই হিয়ার শরীর ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ে। রাতে যখন ঘরের আলো নিভে যায়, তখন হিয়ার শরীর থেকে তাপ ছড়াতে থাকে। প্রখর জ্বর এসে তাকে একেবারে কাবু করে দেয়। ঠোঁট শুকিয়ে যায়, কপাল জ্বলতে থাকে। সে নিজেও বুঝে ওঠে না ঠিক কতটা কাঁপছে। মাথার মধ্যে যেন কেউ গলিত সীসা ঢেলে দিচ্ছে। মিম এসে দেখে হিয়ার ঠোঁট ফ্যাকাশে, গাল জ্বলছে। চাদর সরিয়ে দেখে শরীরটা একেবারে গরম। সঙ্গে সঙ্গে জলপট্টি আনে, গা মুছিয়ে দেয়। ওষুধ খাওয়ানোর চেষ্টা করে, কিন্তু হিয়ার ঠোঁট নড়ে না। একবার চোখ মেলে আবার বন্ধ করে দেয়। মিম তখন এক মুহূর্ত থামে। কাকে ডেকে জ্বর সামলাবে এখন? এতো রাতে… মা নেই, ডাক্তার নেই… আছেন বৃদ্ধ দুজন মানুষ, আর থাকে কে? একবার ভেবে ওঠে তূর্যর কথা। হাত কাঁপে, তাও ফোনটা হাতে তোলে। কিছু না ভেবে শুধু একটা কল করে।

তূর্য ফোন ধরেই শোনে মিমের কণ্ঠে আতঙ্কের ধাক্কা, “হিয়ার প্রচন্ড জ্বর। কিছুতেই কমছে না। প্লিজ ভাইয়া তুমি একটু… এসে দেখো না।”

সেই কথা শোনামাত্র তূর্য দ্রুত ছুটে আসে। মিম দরজা খুলেই রেখেছিল। তবে তূর্য দাঁড়িয়ে পড়ে হিয়ার ঘরের দরজার সামনে। এই দরজাটা সে কখনোই পেরোয়নি। কোনো কারণেই নয়, কোনো সুযোগেও নয়। এই পর্যন্ত এই বাড়িতে যতবার এসেছে, হিয়ার ঘর যেন ছিল একটা অস্পর্শিত অঞ্চল। কিন্তু আজ... এক অপ্রত্যাশিত প্রয়োজনীয়তা‌। তূর্য কিছুক্ষণ থমকে দাঁড়ায়।

তার ভিতরে একটা দ্বিধা, একটা কুয়াশা নিয়েই সে জোর করে ভিতরে পা রাখে।

ঘরটা নিস্তব্ধ। হালকা টেবিল ল্যাম্পের আলোয় হিয়ার মুখ দেখা যায়, পীতাভ, ক্লান্ত, নিঃশেষ। চোখ বন্ধ, ঠোঁট নীলচে। তূর্য আস্তে এসে পাশে বসে। মিম হাতের জলপট্টি এগিয়ে দেয়। তূর্য খুব ধীরে, একেবারে স্নেহভরে জলপট্টিটা কপালে রেখে দেয়। সে এবার প্রথমবারের মতো হিয়ার এত কাছ থেকে তাকিয়ে দেখে এমনভাবে, যেমনটা কখনো করেনি। কোনো প্রেমিকের চোখে নয়, না কোন সম্পর্কের চোখে শুধু দেখে একটা নিরঙ্কুশ ভরসার মতন করে। হিয়ার ঠোঁট অল্প নড়ে। একটা অস্পষ্ট শব্দ বেরোয়, “প্রকৃতি…।”

তূর্যের মুখে তখন এক গম্ভীর নরমতা। সে ফিসফিস করে, “শান্ত থাকো। কাল আমরা সব দেখবো, ঠিক করে দেবো সবকিছু। তুমি শুধু একটু ভালো হয়ে ওঠো। আমরা আছি তোমার পাশে।”

মিম একরাশ চিন্তা নিয়েই ঠায় বসা। একটু আড়ষ্টতা নিয়ে সে বলে, "হিয়া কোনভাবে প্রকৃতির অস্বাভাবিক অসমাপ্ততা মেনে নিতে পারছে না। ঘরে ঢুকেই কম করে হলেও ঘন্টাখানেক সাওয়ারে ভিজেছে।"

তূর্য খুব শান্ত স্বরে বলে, "আমার ধারণা ছিল এসব। ঘটনাটা যে এরকমভ হবে, এটা জানলে কখনোই হিয়াকে নিয়ে যেতাম না আমি।"

বেশ কিছু সময় নীরবতা চলে। মিম এবার ধীর কণ্ঠে জিজ্ঞেস করে," ভাইয়া, কালকে সত্যিই কি স্বাত্ত্বকি এ বাড়িতে আসবেন?"

তূর্য মাথা নাড়িয়ে সম্মতি দেয়, "হুম।"

মিম আবার প্রশ্ন করে, "আর দাদি?"

তূর্য বলে, "আলিফের সঙ্গে কথা হয়েছে আমার। কাল সকালেই আলিফ আর দাদি ঢাকার উদ্দেশ্যে বেরিয়ে যাবেন।"

মিম অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে, "তুমি কি সবটা বলে দিয়েছো?"

তূর্য মাথা নেড়ে বলে, "আমি কিছুই বলিনি, বড়দাদা দাদিকে ফোন দিয়ে বলেছেন, তাকে খুব দেখতে ইচ্ছে করছে। একরকম অসুস্থতার নাটক করেছেন। তিনি তো আর একা আসতে পারবেন না। তাই আমি আলিফকে বলেছি যাতে দাদিকে নিয়ে চলে আসে। এই ঘটনায় জড়িত প্রত্যেকটা চরিত্রের একসঙ্গে থাকাটা খুব জরুরী। রহস্যের ভাঁজে কত রহস্য লুকিয়ে থাকে সেটা আসলে বলা যায় না।"

মিম ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করে, "বড়দাদাকে তবে কি বলেছো? উনি জানে কাল স্বাত্ত্বকি আসবেন।"

তূর্য শান্ত গলায় বলে, "বলেছি শঙ্খনীল সাহেবকে দাওয়াত দিয়েছি আসার। তবে আসল পরিচয় উন্মুক্ত করি নি। আসলে, এতো সাহস নেই আমার।"

মিম এবার চুপ হয়ে যায় একেবারে। তূর্য ধীরে জলপট্টির বাটি মিমের হাতে ফিরিয়ে দিয়ে উঠে দাঁড়ায়। মৃদু স্বরে বলে, “আমি একটু রুম থেকে ওষুধ নিয়ে আসি। এই ঔষধটায় কাজ হবে না। আমার কাছে হাই পাওয়ারেরটা আছে। জ্বরটা এত বেশি... আর দেরি করা উচিত না।”

মিম চুপচাপ মাথা নাড়ে। সে জানে, এই মুহূর্তে তূর্যই ভরসার শেষ আশ্রয়। মিম হিয়ার শুক্ন মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে শুধু। হিয়ার মায়াবী মুখে এখন শুধু অবসন্ন ছায়া।

তূর্য নিজের ঘরে ফিরে যায়। অন্ধকার ঘরটায় টেবিল ল্যাম্প জ্বালিয়ে একে একে কেবিনেট খুলে ওষুধ বের করে, গ্লাসে পানি ঢালে। হাতদুটো কাঁপে সামান্য, হয়তো বৃষ্টিতে ভেজার জন্য নয়, হয়তো হৃদয়ের ভিতর জমে থাকা এক অদ্ভুত অনুভূতি থেকে। হাত ভর্তি করে নিয়ে সে আবার ফিরে আসে হিয়ার ঘরে। আস্তে ঘরে পা রাখে যেন শব্দ না হয়, যেন এই ঘরের নিঃশব্দতা ভেঙে না যায়। এই একটুখানি কোমলতা যাতে ছিন্ন না হয়। হিয়া তখনো আধা-চেতন, শরীরটা মোটা কাঁথার নিচে গুটিয়ে আছে, চোখ দুটো আধখোলা, যেন কল্পনা আর বাস্তবের সীমানায় ভেসে চলেছে।

তূর্য পাশে বসে মিমের দিকে ইশারা করে বলে, “ওকে একটু সামলে বসিয়ে দে, আমি ওষুধ দিচ্ছি।”

মিম হিয়াকে ধীরে উঠিয়ে ধরে। তূর্য ওষুধ এগিয়ে দেয়। কোন রকম ঔষধ খেয়ে হিয়া আবার ঢলে পড়ে বালিশে। তূর্য তার কপালে হাত রাখে। তাপ এখনো প্রচণ্ড, কিন্তু আগের থেকে সামান্য কম। মিম টাওয়াল ভিজিয়ে কপালে রাখে আবার। সময় পেরোয়, ঘরের বাতাস ধীরে ধীরে ভারমুক্ত হতে থাকে। বৃষ্টির শব্দ তখন অনেক দুর্বল, শহর যেন নিঃশব্দে ঘুমিয়ে পড়েছে। জ্বরের উত্তাপ ধীরে নেমে আসে মধ্যরাত নাগাদ। হিয়ার শ্বাস-প্রশ্বাস তখন স্বাভাবিক, মুখেও কিছুটা রং ফিরে এসেছে। তূর্য উঠে দাঁড়ায়। মিমকে বলে, “ও এখন একটু ভালো। আমি ও ঘরে যাচ্ছি। তুই দরজা খোলাই রাখ। আমি জেগে আছি, কোন সমস্যা হলে ডিরেক্ট আমাকে গিয়ে ডাকবি।”

মিম চুপচাপ মাথা নাড়ে। তূর্য নিজের ঘরে ফিরে যায়, কিন্তু তার চোখে আর ঘুম আসে না। জানালার পাশে বসে শহরের রাত দেখতে থাকে। বাইরে তখনো একটানা স্যাঁতস্যাঁতে বৃষ্টি। আকাশ অন্ধকার, যেন পৃথিবীর সমস্ত গোপন কথা গিলে রেখেছে। তূর্যের চোখে শুধু হিয়ার মুখ ভাসে… সেই নিঃশেষ, পীতাভ মুখ…। তার ঘরে তখন ঘড়ির কাঁটা শব্দ করে চলছে, ঠিক যেমন স্মৃতি চলে নিঃশব্দে, একা। তূর্য জানে, কাল যা আসছে তা সহজ নয়। মুখোমুখি হবে অনেকগুলো সত্য। খসে পড়বে অনেক গুলো মুখোশ। সে শুধু চোখটা চুপচাপ বন্ধ করে ভাবতে করতে থাকে। সব ঘটনার মাঝখানে মিনুর রহমানের পাপ ঠিক কোনটুকু, কোন পাপের কথা তিনি তার ভাই আব্দুর রবিউল মোহাম্মদকে বলছিলেন। তবে কি সেই পাপ এটাই, প্রকৃতির রেখে যাওয়া সেই ডাইরির শেষ পৃষ্ঠা গুলো নির্মমভাবে ছিড়ে ফেলা? নাকি পাপ এটা, কোনদিনও আব্দুর রুশান মোহাম্মদকে সত্য জানতে না দেওয়া?

তবে এ পাপ তো শুধু একমাত্র মিনু রহমান করেন নি..! এ পাপের দায়ভার তো সকলের। আর হিসেব মতে সব থেকে বেশি দায়ভার তুহুরা আর আব্দুর রবিউল মোহাম্মদের। তারা তো স্বচক্ষ সাক্ষী।

রাতটা যেন অনন্তকাল দীর্ঘ হয়ে দাঁড়িয়েছে, নিঃশব্দ, ভারমুক্ত নয়, বরং আত্মগ্লানিতে ঢেউ তোলে এমন এক দগ্ধ শূন্যতায়। শহরের বুকে বৃষ্টির ধারাও থেমে গিয়েছে একসময়, কিন্তু তূর্যর ভিতরের ঝড় থামেনি। জানালার কাঁচে গলিয়ে রাখা কপালটায় হালকা শীতলতা জেগে ওঠে। আর মনে গেঁথে রয়েছে হিয়ার মুখটা। চোখ বন্ধ করলেই ওই মুখ, ওই নিঃশেষ চাহনি। ঘড়ির কাঁটা একেক করে রাত্রির পাতা উল্টে চলে। তূর্য প্রায় প্রতি ঘণ্টায় একবার করে মিমকে মেসেজ করে জানতে চায়, “জ্বর কি আর এসেছে?”

“চোখ খুলেছে?”

“শ্বাস স্বাভাবিক?”

মিমও দায়িত্ব নিয়ে প্রতিবার জানায়, “একটু একটু করে কমছে ভাইয়া। চোখ খুলছে, কিন্তু কথা বলছে না।”

নিজ ঘরের বিছানায় তূর্য শুয়ে থেকেও শোয় না। যেন শরীর রাখে মাটিতে, মন দাঁড়িয়ে থাকে জানালার ধারে। মনে মনে বারবার গুনে চলে, কতগুলো সত্য আছে যা বলার মতো নয়, কতগুলো পাপ আছে যা ক্ষমার অযোগ্য। তূর্য একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। তার চোখের নিচে ক্লান্তির ছাপ। এক ফোঁটা ঘুম না আসা চোখে সে জানালার বাইরে তাকিয়ে দেখে পুরান ঢাকার ভোর। ময়লা আলো, কুয়াশার মত ধোঁয়া, ছাদের কার্নিশে কাকের কাকলি। একটা নতুন সকাল। একটা নতুন সত্যের মুখোমুখি হওয়ার সকাল।

মিম নিজেও সারারাত ঘুমোতে পারেনি। চোখে তার অবসাদ, তবু ভিতরে নিরব প্রস্তুতি আজ কিছু ঘটতে চলেছে। আর হিয়া? সে তখনো অর্ধজাগ্রত। কিন্তু গত রাতের তূর্যর উপস্থিতির কথা সে টের পেয়েছে, তার ছোঁয়ার উষ্ণতা, তার চুপ থাকা কথা, সব অনুভব করেছে নিঃশব্দে। তবে মুখে কোন শব্দ উচ্চারণ করেনি।

মেঘে ঢাকা রাতের শেষে একটা ম্লান সূর্য মাথা তোলে, যেন আলো দিয়ে নয়, এক ধরনের গোপন সংকেত দিয়ে জানান দেয়। ভোরের আলো ছড়ানোর আগেই অবশ্য হিয়ার জ্বরের খবর ছড়িয়ে পড়েছে সমগ্র বাড়িতে। ফজরের নামাজের সময় সবার আগে জানেন আব্দুর রুশান মোহাম্মদ। এরপর একে একে সকলে। রাতে তাদের তলব করা কেন হয়নি এ নিয়ে চলে বড্ডো বকাঝকা। তবে হিয়া বর্তমানে প্রখর উত্তাপ থেকে মুক্তি পেয়েছে তাই আর এই শাসন দীর্ঘ হলো না। বিছানায় হেলেই তার সকাল পেরোলো। মিম বড্ডো খেয়াল রাখলো, হিয়ার। মাঝে তূর্যর যে খোঁজ নেয় নি তেমন নয়। তবে সে বেশ আধো উড়ন্ত, এই আছে এই নেই।

________________

চলবে..... 💔