নির্বাসিত কৃষ্ণচূড়া — পর্ব ০১
লেখক: সাদিয়া তিন্তি · বিভাগ: রহস্য · পর্ব ০১ · ৪৭ পর্বের মধ্যে ১
শহড় জুড়ে বৃষ্টির ঘনঘটা, বৈশাখের প্রথম বৃষ্টি। এই বৃষ্টিতে বাতাসে যে শুদ্ধ মাটির গন্ধ ভেসে বেড়ায় তা যেন প্রকৃতির দেয়া এক অমূল্য সুবাস। যতোদূর চোখ যায় কি অবিরাম ধারায় বইছে শুদ্ধ শীতল জলধারা। আকাশ যেন এক অদৃশ্য সঙ্গীর সঙ্গে অবিরাম খেলায় মত্ত, বৃষ্টির ধারায় সে লিখে চলেছে এক অপূর্ব কবিতা।
হিয়া মৃদু হাসে। জানালায় ঝাপটানো বৃষ্টির ফোঁটাগুলো বারংবার এসে ছুঁয়ে যাচ্ছে তার শুভ্র মুখ। সে তার ঠোঁটে এক নিঃশব্দ প্রাপ্তির হাসি নিয়ে ফিসফিস করে বলে ওঠে,
“তুমি এলে বৃষ্টি হয়ে,
শেষ গোধূলির আগে।
তোমার নামে আবেগ জমুক,
তপ্ত মেঘের কোলে।
গল্প জমুক আঙ্গুল জুড়ে,
এক মায়াবী চোখে,
তোমার গন্ধ লেপ্টে আছে
অবাধ্য এই ঠোঁটে।”
তার চোখের তারায় একরাশ প্রশান্তি খেলে যায়। মস্তিষ্ক তাকে তার অবাধ্য শব্দে আটকে নিচ্ছে। কিন্তু হিয়ার এই স্বপ্নবিলাস বেশি ক্ষণ স্থায়ী হলো না। হঠাৎই মায়ের কড়া কণ্ঠস্বর ঝাঁকি দিয়ে তুলল তাকে,
“সারা ঘরে পানি জমে যাচ্ছে, আর তুমি বৃষ্টি বিলাস করছো! সব ভিজে একাকার!”
হিয়া এক দমে জানালা বন্ধ করে দেয়, কিন্তু মনের জানালাটা খোলা থাকে বহাল তবিয়তে।
হিয়া ছন্নছাড়া, কিশোরী মন তার বেশ সেকেলে। রবীন্দ্রনাথ, জীবনানন্দ, হুমায়ূন আহমেদ সাহিত্যের উজ্জ্বল নক্ষত্রদের ছায়ায় সে নিজেকে জড়িয়ে রেখেছে পরম মমতায়। পড়ার টেবিলের একাংশ দখল করে আছে বইয়ের সারি, আর তার প্লে-লিস্ট ভরা রবীন্দ্রসংগীত, নজরুল আর লালনগীতিতে। এসব ছাড়িয়ে তার মন মাঝে মাঝেই আউড়ে নেয় নিজের মনের শব্দ গুচ্ছকে।
তার চিকন গড়নে লম্বা চুল রাখাও এই উপন্যাসের নায়িকা হবার নেশায়। অবশ্য এতে তাকে বেশ মানায়।
কথায় বলে না, সঙ্গ দোষে লোহা ভাসে। ঠিক তেমনি হিয়াও ভেসেছে তার দাদাভাই আব্দুর রবিউল মোহাম্মদের আশকারায়। তিনি তাঁর জাদু পুরোপুরি হিয়ার উপর চালিয়েছেন। শুধু তিনি বললে ভুল হবে। হিয়ার উপর আরেজনের জাদু আছে সেটাও বলা যায়। তিনি আব্দুর রুশান মোহাম্মদ। হিয়ার বড় দাদা ভাই। আব্দুর রবিউল মোহাম্মদের বড় ভাই। তাদের একমাত্র অন্ধ ভক্ত হিয়া।
বেশ অনেক দিন ধরেই আব্দুর রুশান মোহাম্মদের আসার কথা। তবে ফরিদপুরের এই কড়া শীতের ভয়ে তারিখ পেছাতে পেছাতে এই বৈশাখের আগমনী।
হিয়ার মা ঘরের পানি মুছে হিয়াকে কড়া গলায় শাসিয়ে গেলেন, “এবার একটু পড়তে বসো। সামনেই পরীক্ষা। তোমার বড় দাদা রওনা হয়ে গেছেন। তিনি আসার পরতো বই ও তোমাকে চিনবে না আর তুমিও বইকে চিনবে না।
আমার হয়েছে যতো জ্বালা।”
হিয়া শুধু মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো। হিয়ার মা একজন গৃহিণী তবে হিয়া মনে করে ওর মায়ের প্রকৃত কাজই টেনশন করা।
বাইরে তখনও ঝরছে বৈশাখের প্রথম বৃষ্টি। হিয়া বই খুলে বসে, কিন্তু তার মন পড়ে থাকে জানালার ওপারে, এক আশ্চর্য জগতে যেখানে বৃষ্টি মানে কবিতা, বাতাস মানে গল্প, আর জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত একেকটি অনবদ্য উপাখ্যান।
আজ কাল শহরের মাঝে গল্প উপন্যাস, বা টিভি শো ছাড়া তেমন এই যৌথ পরিবারের কনসেপ্ট দেখা যায় না। তবে হিয়া মনে করে এটাই তার পরিবারের সব থেকে সৌন্দর্য।
হিয়ারা দুই ভাই বোন। হিয়ার বড় ভাই হিয়ান বর্তমানে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়ন বিভাগের ছাত্র। আর হিয়া একাদশ শ্রেণীতে পড়ছে।
হিয়ার বাবা চাচা দুই ভাই। হিয়ার বাবা একজন সরকারি কর্মকর্তা এবং তার মা গৃহিণী আর ওর ছোট চাচা একজন আর্মি অফিসার। চাচি স্কুল শিক্ষিকা তাদের একটাই মেয়ে পিউ। এইবার এসএসসি, তবে তার পাশ করা নিয়ে সবাই সঙ্কিত।
এবাড়িতে কর্তা হলেন আব্দুর রবিউল মোহাম্মদ। হিয়া বিশ্বাস করে তিনি আছেন বলেই এই বাড়িতে এতো সুখ। তবে, তার হৃদয়ের এক বিশেষ কোণ জুড়ে রয়েছেন আব্দুর রুশান মোহাম্মদ তার বড় দাদা ভাই। তিনি হিয়াকে নিখাদ স্নেহ করেন, আর হিয়ার মনের গহীনে তাঁর প্রতি এক গভীর ভালোবাসা, সম্মান ও দুর্বলতা কাজ করে।
প্রতিবারই যখন হিয়া আব্দুর রুশান মোহাম্মদকে দেখে, তার মনে এক অদ্ভুত বিশ্লেষণ শুরু হয়। হিয়ার মতে, এই সত্তরের ঘরের মানুষটি যৌবনে নিঃসন্দেহে অমিমাংসিত সৌন্দর্যের অধিকারী ছিলেন। যার সৌন্দর্য তার বার্ধক্যকে হারাতে পারে না সে অবশ্যই উপন্যাসের ডাকসাই সৌন্দর্যের খেতাব পাওয়ার যোগ্য।
হিয়া নিজের ভাবনায় ডুব দিলো না আর। টেবিল থেকে তার দিনপঞ্জিটি নিয়ে বসন্তের প্রথম বৃষ্টির স্মৃতি একপাতায় বন্দি করলো। তারপর ডায়েরিটি ড্রয়ারে রেখে জানালার কাচে আঙুল বুলিয়ে দিলো। বৃষ্টি যেন এখনো মনের ভেতরে ঝরছে।
ঠিক তখনই দরজায় উপস্থিত হলো পিউ, ভেজা চুল এলোমেলো, স্কুল ব্যাগ কাঁধে ঝুলে পড়েছে, আর চোখ-মুখ উজ্জ্বল উত্তেজনায়।
হিয়া পিউকে যতবার দেখে, ততবারই তার মনে হয়। সে যেন কোনো বাংলা সিনেমার আবেগপ্রবণ নায়িকা! যে মুহূর্তেই ইমোশনাল হবে, চোখের জল ফেলবে, আবার খানিক পরেই ভুলে গিয়ে নতুন গল্পে ডুবে যাবে। দিনভর প্রেমের উপন্যাস পড়ে, আর বাড়ির সবাইকে সেই গল্পের রোমান্টিক জ্ঞান বিতরণ করাই যেন তার নিত্যদিনের কাজ।
পিউ ব্যাগ রেখে, উচ্ছ্বাসে প্রায় লাফিয়ে উঠে বলল,
"হিয়া আপি! জানিস কি হয়েছে? আজ স্কুলে নতুন একটা বই পেয়েছি। কি দারুণ প্রেমের গল্প! তোকে শোনাবো!"
তারপর এক মুহূর্ত দম না নিয়েই যোগ করলো,
“ওহ্ হ্যাঁ। বড় দাদা ভাই আসছে শুনলাম। কি মজা হবে ভাব। আমি তো অনেক গুলো সুন্দর গল্পের নাম টুকে রাখবো।
দাদাভাই তো একবার গেলে আবার সামনে বছর। তাছাড়া কি আর দেখা পাওয়া যায় উনার।”
হিয়া হাসলো। “তোর না সামনে এসএসসি পরিক্ষা?”
“আপি! মায়ের মতো বকিস না তো। বড় দাদা কি রোজ রোজ আসে!”
হিয়া আর কথা বাড়ালো না। এটা প্রতিবার দাদা ভাই আসার একই কাহিনী। ভাই বোনদের ঈদ চলে আসে বড় দাদা ভাই বেড়াতে এলেই। আব্দুর রুশান মোহাম্মদ বেশ মিশুক। হইহই করে সারা বাড়ি মাতিয়ে রাখেন তিনি এবাড়ির ছেলেমেয়েদের সাথে। বয়সের চাপে মনের বাচ্চামি কখনোই ডাবিয়ে যায় নি তার।
বাইরে তখনও বৃষ্টি ঝরছে। বাতাসে বৈশাখের কাদা মাটির নতুন গন্ধ। হিয়া জানালার কাচে হাত রাখে, মনে মনে ভাবে এই বৈশাখ হয়তো এবারের মতো কিছু নতুন গল্প বুনবে, কিছু পুরনো অনুভূতির ধুলো ঝেড়ে দেবে।
বিকেলের গোধূলি পেরিয়ে সন্ধ্যা নেমেছে ধরণীতে। বর্ষন তার যতোটা জমা ছিল আবেগ তা সবটা বর্ষিয়ে শহরটাকে ডুবাতে বসেছে। অবশ্যই এতে যে পরিবেশটা তৈরি হয়েছে তা অবশ্য কোটি অর্থ ব্যয়েও আনা সম্ভব নয়।
হিয়ান বৃষ্টি মাথায় ছুটে গেছে মোড়ের দোকানে। ফিরে এসেছে ঝুড়িভর্তি সিঙ্গাড়া, সমুচা, আর যতোটা পেরেছে প্যাকেটে ভরে নিয়েছে। হিয়া নিজ হাতে তার বড় দাদার প্রিয় এককাপ কড়া আদা চা করেছে। পিউ ব্যস্ত মুড়ি মাখাতে। তাদের জম্পেশ আড্ডার সময় হয়েছে যে। এগুলো নতুন নয়। বড় দাদা এলেই তাদের এই মহফিল সেজে ওঠে। মাঝে মাঝে এতে যোগ হয় হিয়ার মা চাচিরাও।
তবে আজ আড্ডায় তাদের যোগদান নেই। আজ হিয়া, হিয়ান আর পিউ। আব্দুর রুশান মোহাম্মদ তার এই সমগ্র জীবন কাটিয়েছেন নিঃসঙ্গ। অবিবাহিত। এমনটা নয় যে এই ঘরে উপস্থিত ব্যক্তিবর্গ জানে না যে কেন তিনি বিয়ে করেননি। তারপরও ঘটনা খোলসা নয় কারো কাছে। যতোবার হিয়া, হিয়ান বা পিউ তার এই একাকীত্বের রহস্য সম্পর্কে জানতে চেয়েছেন। তিনি ততোবার উচ্চহাসি, কিংবা বিসন্নতায় এড়িয়েছেন।
তবে আজ আব্দুল রুশান মোহাম্মদ তার শ্রোতা মহলে তার কোন সাধারণ স্মৃতির এক ঝলক স্মৃতি চারণ করার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন না। তিনি আজ প্রকাশ করছেন তার সমগ্র জীবন।
আব্দুর রুশান মোহাম্মদ হাতে রাখা বইটি ধীরে ধীরে টেবিলে নামিয়ে রাখলেন। চশমাটি খুলে চোখ মুছলেন, যেন নিজেকে প্রস্তুত করছিলেন কোনো গভীর স্মৃতির আঁধারে ডুবে যাওয়ার জন্য। এক মুহূর্ত নীরব থেকে মৃদু হাসলেন, তারপর বলতে শুরু করলেন,
“সালটা ১৯৬৮, যতোদূর মনে পড়ে মঙ্গলবার, পহেলা বৈশাখের সকাল। আমার মামাতো ভাই আরিফ তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। আমি তখন ইন্টার পেরিয়ে অবসরে, বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি হয়েছি মাত্র। আরিফ আমাকে নিয়ে গিয়েছিল রমনা বটমূলের অনুষ্ঠানে, সেদিনই প্রথম দেখেছিলাম ‘প্রকৃতি’কে। সে ছিল মঞ্চে, তানপুরা হাতে। গান গাইতে এসেছিল। আরো বেশ কয়েকজন সাথে ছিল বোধহয় তবে কারো দিকেই নজর যায় নি।
প্রথমবার তানপুরার সেই সুর শুনে আমি স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলাম, যেন সময় সেখানে থমকে দাঁড়িয়েছে। প্রকৃতির সেই সুর, যেন বাতাসের সঙ্গে বয়ে আসা কোনো মোহময় মন্ত্র ছিল, সেই তানপুরার সুর আমার কানে আজও বাজে। অবশ্য তার ঐ সুর শুধু আমায় বাঁধে নি। তার মুখটা সৃষ্টিকর্তার কোন নিখুঁত কারুকার্য ছিল। পৃথিবীর সবথেকে সুন্দর হাসি মুখ। বিধাতা হয়তো নিজেও তার মতো আরেকটি সৃষ্টি করার কথা ভাবেননি।”
আব্দুর রুশান মোহাম্মদের কথায় শ্রোতা মহল স্তব্ধ। সকলে যেন প্রকৃতিকে নিজের চোখের সামনে স্পষ্ট দেখছে। প্রতিটি শব্দ এতো বেশি আকর্ষনিয়, সকলে মোহনীত হয়ে ডুবছে।
আব্দুর রুশান মোহাম্মদ আবার শুরু করলেন,
“দু’মাস কেটে গেল, বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন অধ্যায় শুরু হলো, আর প্রকৃতিকে আবার দেখার আশা ততদিনে হারিয়ে ফেলেছিলাম। নতুন পরিবেশ, নতুন মুখ সব মিলিয়ে একটা অচেনা দুনিয়ায় পা রেখেছি। আর এই অচেনা দুনিয়ায় সব নতুন মুখের মাঝে এসেছিল একটি প্রিয় মুখ, প্রকৃতি।
আমি বোকার মতো অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিলাম। আমার চোখ বিশ্বাস করতে চাইল না। কিন্তু সত্যি ছিল। সেও আমার মত বাংলা সাহিত্যে ভর্তি হয়েছে।
তার প্রতিদিন গাড়ি করে আসা, পরিপাটি পোশাক, চলনে-বলনে আভিজাত্যের ছাপ। সব মিলিয়ে বুঝতে বাকি ছিল না কারো যে, সে সমাজের এলিট ক্লাসের বাসিন্দা।
আর আমি?
আমি ছিলাম মধ্যবিত্ত পরিবারের বড় ছেলে, যার কাঁধে দায়িত্বের বোঝা। তবুও তার দিক থেকে মনকে সরাতে পারছিলাম না, রোজ এক নজরে তাকিয়ে থাকতাম।
এভাবেই যাচ্ছিল দিন। এভাবে করতে করতে ছয় মাস কেটে গেল।
স্বপন মামার দোকানের চা, রোজ আড্ডা আর তাকে চুপটি করে দেখা। বন্ধুরা প্রকৃতিকে নিয়ে খুব মজা নিতো।
অতো ভাল ছাত্রী ছিল না প্রকৃতি, তবে এটা বলতে হয় আমি খুব ভাল ছাত্র ছিলাম। তখন বাড়িতে পড়াশোনা নিয়ে খুব কড়াকড়ি ছিল, আমার বাবা ছিলেন হাইস্কুলের হেড মাস্টার, তার ছিল নিজেরই কিছু নিয়ম। খারাপ রেজাল্ট মানে বাড়িতে খাবার বন্ধ আর বাবার হাতের ধোলাই সে তো ফ্রি। এই ভয়ে ভালো রেজাল্ট হয়েই যেতো।
প্রথম পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট করার পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে এটা অন্ততপক্ষে প্রতিষ্ঠা করে দিয়েছিলাম যে আমি ভালো ছাত্র।
একদিন লাইব্রেরীতে বসে পড়ছিলাম। হঠাৎ প্রকৃতি এসে বলল,
‘আপনি কি আমাকে এই অধ্যায়টা বুঝিয়ে দিতে পারবেন।’
আমি কিছুক্ষণ অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম। ওর প্রশ্নের উত্তর কী দেব, ঠিক বুঝতে পারছিলাম না। কেমন যেন বিহ্বল হয়ে গিয়েছিলাম। হালকা কাশি দিয়ে চশমাটা ঠিক করলাম, তারপর তোতলাতে তোতলাতে বললাম, ‘বসুন আপনি।’
এরপর একদিন দুদিন কথা বাড়তেই থাকল, বন্ধুত্ব বাড়ল। আমরা একে অপরকে জানতে শুরু করলাম।
ঢাকা তখন গণঅভ্যুত্থানের কি একটা অবস্থা!
ছাএ সমাজ ফুসে উঠেছিল, ১৯৬৯ সংগ্রামী জনতা শাসকগোষ্ঠীর দমন-পীড়ন ও সান্ধ্য আইন উপেক্ষা করে মিছিল বের করেছিল। মিছিলে পুলিশের গুলিতে মারা গেল মতিউর বোধহয়।
তখন জনতার রুদ্ররোষ, আইয়ুব সরকার আগরতলা ষড়যন্ত্র সবাইকে মুক্তি দিলো।
এই উত্তাল সময়ের মাঝে আমি প্রকৃতির এক নতুন রূপ আবিষ্কার করলাম। তার ভেতরেও ছিল আগুন, ছিল বিদ্রোহের তেজ। হয়তো এটাই ছিল সেই মুহূর্ত, যখন প্রথম বুঝলাম প্রকৃতি শুধু আমার ভালোবাসা নয়, আমিও তার কাছে বিশেষ কিছু। সেই উপলব্ধি আমার কাছে ঈদের খুশির মতো ছিল অপ্রত্যাশিত, কিন্তু তীব্র আনন্দের।
কিন্তু তারপরই এলো সবচেয়ে ভয়ঙ্কর সত্য। সেই সত্যের নামও প্রকৃতি।
এক মুহূর্তে যেন সবকিছু পাল্টে গেল। একদিন প্রকৃতির নামের শেষাংশ শুনে বুকের মধ্যে এক শীতল শিহরণ বয়ে গেল, "প্রকৃতি সাহা"।
আমার আর প্রকৃতির মাঝে একটা দেয়াল ছিল, যেটা গড়ে উঠেছিল সামাজিক শ্রেণিবিন্যাসের ব্যবধান থেকে। আমি মধ্যবিত্ত, আর ও অভিজাত পরিবারের মেয়ে। কিন্তু এই নতুন দেয়াল তার থেকেও বেশি কঠিন ধর্মের মোটা বাউন্ডারি।
প্রথম দেয়াল টপকে যাওয়ার ক্ষীণ আশা ছিল। মনে হয়েছিল, বন্ধুত্বের সেতু হয়তো দূরত্ব কমাবে। কিন্তু দ্বিতীয় দেয়াল? এটা অতিক্রম করার ক্ষমতা আমার ছিল না।
আমি পিছু হটতে শুরু করলাম। নিজেকে গুটিয়ে নিলাম। বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়া কমিয়ে দিলাম, বন্ধুদের আড্ডা এড়িয়ে চলতে লাগলাম। প্রকৃতি আমাকে খুঁজছিল। ও আমার বন্ধুদের কাছে বারবার আমার খোঁজ নিয়েছে, কিন্তু ওরা নিজেরাই জানত না আমি কোথায়, কী করছি, -ওকে আর কি বলবে।
সাতদিন এভাবে কেটে গেল।
হাঁপিয়ে উঠছিলাম। মনে হচ্ছিল, পুরো পৃথিবীটা যেন পানির নিচে ডুবে আছে, আর আমি নিঃশ্বাস বন্ধ করে বেঁচে থাকার চেষ্টা করছি। আর সহ্য হচ্ছিল না।
আমার এখনও মনে আছে ঐ দিন সোমবার ছিল, বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঠের মাঝখানে প্রকৃতিকে ডেকে ছিলাম, মাথায় এটাই ছিল যা হবে সবার সামনে হবে, আমায় থাপ্পড় মেরে চলে যাবে, চলে যাক। তারপরেও নিশ্বাস নেওয়ার জায়গা তো পাবো।
কোন কিছু চিন্তা ভাবনা করে যায়নি যে, আমার এই পদক্ষেপের পরবর্তীতে কি এর ফলাফল হবে। কোন কিছুই মাথায় ছিল না, মাথায় শুধু পাগলামি উঠেছিল যে হয়তো প্রকৃতিকে ছাড়া বেঁচে থাকা সম্ভব নয়।
হঠাৎ আমার বন্ধু মাসুম বলে উঠল, ‘আরে ব্যাটা তুই প্রকৃতিকে প্রপোজ করবি? এভাবে কিভাবে? প্রপোজ করলে কিছু তো দিতে হবে।’
আমি চুপ করে ওর দিকে তাকিয়ে রইলাম।
প্রপোজের জন্য কিছু দিতে হয় এই ভাবনাটা আমার মাথাতেই আসেনি।
আমার কাছে কিছুই ছিলনা তখন দেয়ার মত। আমি অতো কিছু চিন্তা করে ওখানে আসিনি, আমি তো এসেছি শুধু নিজেকে বাঁচাতে।
মনে মনে এটাই ভাবছিলাম যে, যেই কথাগুলো আমি প্রকৃতিকে বলবো তার উত্তর অনিশ্চিত।
সেখানে কিসের আশা আর কি-বা নিয়ে আসতাম?
মাসুমের কথাগুলো মনে গভীরভাবে আঘাত করল। চারপাশে তাকিয়ে দেখি, বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঠের মাঝখানে আমি একা দাঁড়িয়ে আছি, স্তব্ধ, কিংকর্তব্যবিমূঢ়। যেখানে মাঠের মাঝখানে স্তম্ভ হয়ে দাঁড়িয়েছিলাম। সেখান থেকে দৌড়ে চলে গেলাম ক্যাম্পাসের পেছনের কৃষ্ণচূড়া গাছের কাছে, রক্তের মতো লাল ফুল গুলো যেনো জ্বলছিল হীড়ের মতো, গাছের ডাল থেকে অনেকগুলো ফুল ছিড়ে নিলাম।
বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঠের মাঝখানে দাড়িয়ে সম্পূর্ণ মাঠটি দেখছিলাম, সবাই একবার করে আমাকে দেখে এদিক ওদিক দিয়ে চলে যাচ্ছে।
এরপরে এলো সেই চির প্রতিক্ষিত মুহূর্ত।
প্রকৃতি আমার সামনে এসে দাঁড়ালো, চোখের ভেতর দৃষ্টি ঝলমল করছিল তার।আমার মনে হচ্ছিল, ও কেঁদে ফেলবে অথবা রাগে আমার গালে সপাটে একটা চড় বসিয়ে দেবে।
আমার এখনো মনে আছে প্রকৃতি কিছু বলার আগেই আমি ওর হাতের ফুল গুলো গুঁজে দিয়ে বলেছিলাম, ‘দেখ, আজকে আমাকে শুধু বলতে দে। আমি জানি আমার উপরে অনেক অভিযোগ আছে। অনেকটা সাহস জমিয়ে আজ এখানে এসেছি। আমি শুধু এটাই বলতে চাই যে, তোকে ছাড়া বেঁচে থাকা সম্ভব নয়। অনেক দূরে চলে যেতে চেয়েছি কিন্তু পারিনি। এই ৭দিন নিজের সাথে লড়াই চালিয়ে এখানে এসেছি আজ।
আমি মুসলিম ঘরের ছেলে। সবাই যে আমাকে রামু কাকা বলে খেপায় এটা শুধুই মজা, আমার নাম নাম আব্দুর রুশান মোহাম্মদ। আমি জানি তোর আর আমার মাঝের দূরত্বের দেয়াল অনেক মজবুত। আমি শুধু মাত্র আমার মনের কথা জানালাম বাকি সব তোর উপর নির্ভর করে।’
আমি আশা ছেড়ে দিয়েছিলাম। কিন্তু পরের মুহূর্তেই প্রকৃতি আমার হাত শক্ত করে ধরে কেঁদে ফেলল। ‘তুই রামু বা রুশান যেই হোস, আমি আজ বাঁচাতে চাই, ভবিষ্যতে না।’
আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিলাম ওর মুখের দিকে, ওর কাজল পরা দুচোখ থেকে মোটামোটা পানির বিন্দু গড়াচ্ছিল, আমি এতো সুন্দর কখনও কেউকে দেখিনি।
প্রকৃতি তখনও আমার হাত শক্ত করে ধরে রেখেছে।
আর কি চাই আমার!
সময় যেন থমকে গেল, বাতাস গাঢ় হয়ে উঠল। প্রকৃতির চোখের গভীরে আমি এক নিখুঁত পৃথিবীর দেখা পেলাম, যেখানে ভালোবাসা ভাগ্যবানদের জন্য সংরক্ষিত। আমি প্রতিদিন নিজেকে জিজ্ঞাসা করতাম এত ভাগ্যবান কি আমি?
আজও স্পষ্ট মনে আছে, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের সরস্বতী পূজার সেই দিনটা।
প্রকৃতি বাসন্তী রঙের একটা শাড়ি পড়ে এসেছিল
সাধারণত ও নিজেই শাড়ি পরত, কিন্তু সেদিন ছোট বোন নাছোড়বান্দা ছিল তার হাতেই পরতে হবে! বোনের আবদার রাখতে প্রকৃতিও রাজি হয়েছিল, কিন্তু ফলাফল?
শাড়ির কুচি সবগুলো অগোছালো, প্রকৃতি একটা কদমও হাঁটতে পারছিল না। এক পা ফেলার আগেই মনে হচ্ছিল, এই বুঝি পড়ে যাবে!
আমি সামনে গিয়ে ওর কুচিগুলো ঠিক করে দিয়েছিলাম। ছয়টা কুচি… একটার পর একটা ঠিক করতে করতে মনে হয়েছিল, এই মানুষটার সারা জীবনটা আমি সামলাতে চাই।
সেই মুহূর্তটা ছিল নিখুঁত।”
আব্দুর রুশান মোহাম্মদ একটু থামলেন। দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
“ঐদিনই হয়তো প্রফেসর আজম শেখের নজর পড়েছিল আমাদের উপর।
আজম স্যার বাবার বন্ধু ছিল। ঐদিন আর কিছুই বাদ ছিল না, বাংলাদেশ রেডিওর দুপুর ১২টার সংবাদের মতো সব বলে দিয়েছিল।
তখন ঢাকা এমনিতেই নির্বাচনে গরম, তার উপর আমার বাড়িতেও গৃহ যুদ্ধ শুরু। বাড়িতে ঢুকতেই ছোট বোন মিনু দৌড়ে এসে বললো, ‘বড় ভাইয়া, আজম আংকেল এসেছিল, তোমার নামে অনেক কিছু বলে গেছে। আব্বা খেপে আছে আর দাদি সে তো সারাদিন নাকি পাপ মোচন করছে।’
আমি ঘাবড়ে গিয়েছিলাম কি না, মনে নেই। তবে বাবার চোখের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারছিলাম একটা ঝড় আসছে।
প্রথম প্রশ্নটাই বজ্রপাতের মতো নেমে এলো,
'মেয়েটা কে?'
আমি জানতাম, এখানে মিথ্যা বলার জায়গা নেই। সাহস সঞ্চয় করে বলে ফেললাম, 'প্রকৃতি।'
আব্বার গলার স্বর আরও কঠিন হলো, 'মেয়ে হিন্দু?'
আমার কণ্ঠ যেন আটকে যাচ্ছিল, তবু মাথা নিচু করে বললাম, 'জি, আব্বা।'
ঘরজুড়ে নিস্তব্ধতা নেমে এলো এক মুহূর্তের জন্য। তারপর যেন আগুন ছড়িয়ে পড়ল চারদিকে।
দাদি প্রথমেই চেঁচিয়ে বলে উঠলেন, 'এগুলো কি কস, বাইত্তে কোন বে-দ-ম্মি মাইয়া আনমু না!'
মা একটু নরম স্বরে বললেন, 'এই বয়সে এমন আবেগে সবাই জড়ায়। সময়ের সঙ্গে বুঝতে শিখবে, সব ঠিক হয়ে যাবে।'
বাড়ি সবার হাজার কথার মাঝে একদম চুপ হয়ে রইলাম। জানি, এখানে প্রতিরোধ মানে বোকামি। শুধু এক নিঃশ্বাসে তাকিয়ে রইলাম আব্বার চোখের দিকে।
রাতে রবি ঘরে এলো। অস্বস্তিতে কয়েকবার গলা খাঁকারি দিয়ে জিজ্ঞেস করল,
'সত্যি, প্রকৃতি আপার সঙ্গে তোমার সম্পর্ক?'
আমি আস্তে বললাম, 'হুম।'
রবি হাসল, চোখে বিস্ময়ের আভাস। 'তুমি জানো, আমাদের ডিপার্টমেন্টের সবাই বলে, প্রকৃতি আপার গলায় নাকি জাদু আছে!'
আমি মৃদু হাসলাম। 'আল্লাহ জানে।’
আমি হতাস ছিলাম কি না জানি না তবে প্রকৃতিকে খুব মনে পড়ছিল।
এরপর দু’দিন কেটে গেল, প্রকৃতি বিশ্ববিদ্যালয়ে এল না। অস্থির হয়ে উঠলাম। কী হলো ওর?
এরপর জানতে পারলাম আজম স্যার কথা গুলো শুধু আমার বাড়িতেই বলেননি,প্রকৃতির বাড়িতেও বলেছেন। প্রকৃতির বাবা ওর বিশ্ববিদ্যালয়ে আসা বন্ধ করে দিয়েছেন।
সে-ই শুরু আমার প্রকৃতির এলাকায় আনাগোনা। প্রতিদিন মন্টু মামার দোকানে বসে থাকতাম, চায়ের কাপে ঠোঁট ছোঁয়াতাম, কিন্তু চা ঠান্ডা হয়ে যেত—কাপের পর কাপ চলতো।
প্রকৃতি প্রতিদিন বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকত, আর আমি নীচে। কিছু বলতাম না, শুধু চেয়ে থাকতাম—দুই জোড়া চোখে জমা হতে থাকত শত কথার গভীরতা।
এরই মাঝে ঢাকা হয়ে উঠল অগ্নিগর্ভ। গোলাগুলি, মৃত্যুর সংবাদ, শহরজুড়ে এক ভয়ানক আতঙ্ক।
বুদ্ধিজীবীদের হত্যা শুরু হলো। আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভাগীয় প্রধানকে নির্মমভাবে হত্যা করা হলো। রেডিওতে বারবার শোনা যাচ্ছিল মৃত্যুর সংবাদ। বেড়িয়ে পড়েছিল মুক্তি বাহিনী।
আমার ভেতরের রক্ত গরম হয়ে উঠল। এখানে চুপ করে বসে থাকা যায় না।
আমি মাসুম আর বিল্লাল মিলে সিদ্ধান্ত নিলাম—
সবার আগে দেশকে বাঁচাতে হবে।
বাড়িতে সিদ্ধান্ত জানালাম।
এক মুহূর্তে কান্নার রোল পড়ে গেল।
কেউ আমাকে যেতে দিতে চাইছিল না। মা বারবার কেঁদে ফেলছিলেন, মিনু কেঁদে কেঁদে আঁকড়ে ধরেছিল হাত। কতো ভাবে সবাই কতো কিছু বোঝালো।
আমি চুপ ছিলাম আর আব্বাও একটা কথাও বলেনি।
হঠাৎ সবাই যখন বাবাকে আমার সিদ্ধান্ত বদলানোর জন্য বলছিল, বাবা গম্ভীর কণ্ঠে বলে উঠলেন— 'রুশানের মা, যাও, মিষ্টি নিয়ে আসো। তুমি তো রন্তগর্ভা!'
আমি স্তব্ধ হয়ে আব্বার দিকে তাকালাম।
এক মুহূর্তে মহল একদম ঠান্ডা হয়ে গেলো, আমি অবাক হয়ে আব্বার দিকে তাকিয়ে ছিলাম।
আব্বার রক্তাক্ত চোখ, মুখে এক প্রাপ্তির হাসি নিয়ে আমার কাঁধে হাত রেখে বললেন, 'তুমি দেশের জন্য যাচ্ছ। বিজয়ী হয়ে ফিরে আসো আমার বীর। আর ফিরে এলেই তোমাকে তোমার প্রিয় উপহারটা দেবো।'
আমার কাছে পৃথিবীর সবথেকে গম্ভীর মানুষ ছিলেন আব্বা কিন্তু ঐ দিন আমার মনে হচ্ছিল আমার শক্তি সে।
সেই সন্ধ্যায়, হুট করে প্রকৃতি এসে দাঁড়াল আমার বাড়িতে। মাসুমের সাথে এসেছিল। মাসুমের চোখেমুখে এক ধরণের অস্বস্তি, যেন বেচারা খুব বড় বিপদেই আছে। তাও বাড়ির সবাইকে এড়িয়ে আমায় প্রকৃতির কথা জানায়। আমি আর প্রকৃতি বাড়ির পিছন দিকটায় পুকুরপাড়ে একটা পুরনো বেঞ্চ, সেখানে গিয়ে বসলাম। চারপাশে গাঢ় অন্ধকার নেমে এসেছে, শুধু দূরের কোনো জানালা থেকে ফেরা হালকা আলো আর ঝিঁঝিঁ পোকার একটানা শব্দ।
প্রকৃতির চোখে যেন এক গভীর, নিঃশব্দ কুয়াশা। সে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল, তারপর ধীরে মুখ তুলল। তার কণ্ঠটা ফিসফিসে, কিন্তু তাতে একরাশ সিদ্ধান্তের কঠোরতা মিশে ছিল,
“আমাদের কলকাতা চলে যেতে হবে, রুশান। বাবা আর দাদা ঠিক করেছে… আর এখানে ফিরবো না কোনোদিন।”
আমি কিছু বললাম না। প্রকৃতি তাকিয়ে রইল, আমি শুধু তার চোখের গভীরতায় হারিয়ে যাচ্ছিলাম। সন্ধ্যার নিঃসাড় হাওয়ায় তার কাঁধ থেকে আঁচলটা একপাশে সরে যাচ্ছিল, আর আমার চারপাশটায় যেন হঠাৎ করেই শূন্যতা ঘনিয়ে এলো।
তখনও জানতাম না, ওই সন্ধ্যায় আমরা কেবল সময়ের নয়, ভালোবাসারও এক মোহরেখা অতিক্রম করছিলাম।।'
আমার বুকের ভেতর যেন একটা ধাক্কা লাগলো। নিশুতি রাতের নিস্তব্ধতায় প্রকৃতি হঠাৎ থেমে দাঁড়াল। চোখে যেন এক সমুদ্র কথা জমে আছে, অথচ ঠোঁটে আটকে আছে শুধুই শব্দের জঞ্জাল। খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে হঠাৎ এক নিঃশ্বাসে বলে উঠল,
"আমাকে নিয়ে পালিয়ে চলো!"
আমি স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকলাম। সেই কিশোর প্রেমিকের চোখে তখন আর স্বপ্নের ঘোর ছিল না—ছিল এক কঠিন সংকল্প, এক অনিবার্য যাত্রার পূর্ব মুহূর্তের রুদ্ধ চাওয়া। আমি ওর চোখে চোখ রেখে ধীরে বললাম,
"আমি দেশ বাঁচাতে যাচ্ছি, প্রকৃতি!"
প্রকৃতির মুখে ছায়া নেমে এল। ওর চোখের পাতা ভিজে উঠল এক অশ্রুভারে, যেন চোখ নয়, বয়ে চলেছে এক ব্যথার নদী। হাতের উল্টো পাশে চোখ মুছতে মুছতে ও জিজ্ঞেস করল,
"তুমি... মুক্তিবাহিনীতে যাচ্ছ?"
আমি মাথা নেড়ে বললাম,
"হ্যাঁ, আমি, মাসুম আর বিল্লাল। কাল ভোরেই রওনা হবো।"
প্রকৃতির কণ্ঠ মুহূর্তে পাল্টে গেল, যেন বিষাদের ভিতরেই জন্ম নিল এক অগ্নিশপথ।
"দেশকে স্বাধীন করেই ফিরবে, কথা দাও!"
আমি এক গভীর নিঃশ্বাস নিয়ে ওর মুখের দিকে তাকালাম। মনে হল, ভালোবাসা শুধু দুটি হৃদয়ের সংলাপ নয়, ভালোবাসা এক অব্যক্ত সংগ্রাম, এক অদৃশ্য আত্মত্যাগ, যা কখনো দেশপ্রেম হয়ে ফুটে ওঠে।
আমি ওকে জিজ্ঞেস করলাম,
"তুমি অপেক্ষা করবে আমার জন্য?"
প্রকৃতি হালকা হাসল। চোখে এক অপার্থিব প্রশান্তি, এক অনন্ত আশ্বাসের দীপ্তি।
"আমি এক যুদ্ধজয়ী বীরের জন্য অপেক্ষা করব।"
চলে যাওয়ার আগে, ধীরে কাছে এসে বলল,
"যদি পারো, আমাকে একটা চিঠি লিখতে ভুলো না, শুনেছো?"
আমি একটু থেমে বললাম,
"তুমি তো পিসির বাড়ি যাবে, ওখানে ঠিকানা তো আমার জানা নেই?"
প্রকৃতি রহস্যময় এক হাসি হেসে বলল,
"ভালোবাসা ঠিকানা খুঁজে নিতে জানে, চিঠি ঠিক পৌঁছে যাবে।"
শেষবারের মতো ও আমার চোখে চোখ রাখল। তারপর এক অনুরোধের মতো, এক শেষ চাওয়ার মতো বলল,
"তোমার একটা ছবি দেবে আমায়?”
আমি বিস্ময়ে তাকিয়ে রইলাম ওর দিকে। গলা থেকে কোনো শব্দই যেন বেরোল না। তারপর কিছুটা গলায় কাঁপন এনে বললাম,
"কী করবে?"
প্রকৃতি মৃদু হাসল, কিন্তু সেই হাসিতে যেন চাপা ছিল অগণিত আবেগের ঢেউ।
"তুমি যখন থাকবে না, ছবিতে তোমায় খুঁজব… যেমন তুমি রোজ রাতে আমার ছবি দেখো।"
আমি থমকে গেলাম। বুকের ভেতর কেমন একটা কেঁপে উঠল।
"তোমায় কে বলল?" আমার কণ্ঠে ছিল নিঃশব্দ চমক।
প্রকৃতি চোখ নামিয়ে ধীরে ফিসফিস করে বলল—
"ভালোবাসা………"
সেই একটিমাত্র শব্দ যেন সব নিঃশব্দতাকে কাঁপিয়ে দিল। ওর কণ্ঠে যে গভীরতা, যে মায়া, তার কোনো ভাষা হয় না। এরপর প্রকৃতি চলে গেল। একদম চলে গেল।
এরপর আমি যুদ্ধে চলে গেলাম। তারপর শুরু হলো জীবন ও মৃত্যুর কুয়াশাচ্ছন্ন অধ্যায়। লড়াই, রক্তপাত, আর প্রতিটি মুহূর্তে মৃত্যুর ছায়া! কখনো গুলির শব্দে কেঁপে উঠত আকাশ, কখনো আহত সহযোদ্ধার আর্তনাদে ভারী হয়ে উঠত বাতাস। এভাবেই নয়টি দীর্ঘ মাস কেটে গেল, যেন শতাব্দীর মতো দীর্ঘ।
যুদ্ধের ময়দানে আমরা হারালাম বিল্লালকে। না, না বিল্লাল না, আমাদের বীর শহীদ বিল্লাল!
নয় মাস পর এক ভোরে, বিজয়ের সূর্য মাথায় নিয়ে, স্বাধীন দেশের লাল-সবুজ পতাকা হাতে
আমি আর মাসুম বাড়ি ফিরলাম।
স্বাধীনতার উচ্ছ্বাসে যখন চারদিক ডুবে আছে, আমি পাগলের মতো ছুটে গেলাম প্রকৃতিদের বাড়ির দিকে। কিন্তু বাড়িটি ছিল শূন্য। একেবারে নিঃস্ব, ধ্বংসস্তূপের মতো পড়ে আছে।
পাড়ার মানুষদের জিজ্ঞেস করলাম, কিন্তু কেউ নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারল না।
কেউ বলল, 'ওরা কলকাতায় চলে গেছে।'
কেউ বলল, 'পাকিস্তানিদের হাতে ওদের পুরো পরিবারই মারা গেছে।'
আর কেউ বলল, 'ওর বাপ তো রাজাকার ছিল, দেশ স্বাধীন হয়েছে, ওরা কি আর ফিরবে?'
আমি পাগলের মতো পুরো শহর তন্নতন্ন করে খুঁজলাম। বন্ধুবান্ধব, পরিচিত কাউকে বাদ দিইনি। কিন্তু কেউ জানে না প্রকৃতি কোথায়!
এক বন্ধু শুধু বলল, 'ওদের বাড়িতে পাকিস্তানিরা হানা দিয়েছিল, শুনেছি কেউই বেঁচে নেই।'”
আব্দুর রুশান মোহাম্মদ আবার থামলেন। তার ভেজা চোখ মুছে বেশ সময় নিজেকে ধাতস্থ করলেন, একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “লড়াই করে স্বাধীন বাংলা তো এনেছিলাম কিন্তু প্রিয়তমাকে আর খুঁজে আনা হল না।”
শ্রোতা মহলের সবাই নীরব।এক আকাশ নিস্তব্ধতা যেন ঢেকে রেখেছে পুরো ঘরটাকে। বাতাস থেমে গেছে, শব্দ হারিয়ে ফেলেছে ভাষা। কেউ কাঁদছে না, তবুও ভিজে উঠেছে প্রতিটি মানুষের চোখ। প্রকৃতিকে যেন শুধু আব্দুর রুশান মোহাম্মদ হারাননি। সদ্য হারিয়ে উঠেছে, হিয়া, পিউ আর হিয়ান।
এরপর কী হয়েছিল? প্রকৃতি কি আর ফিরে এসেছিল? তারা কি কখনো আবার দেখেছিল একে অপরকে? এই প্রশ্নগুলো যেন ঝড় তুলল সবাইর ভিতরে। কিন্তু কেউ উচ্চারণ করল না, শুধু কণ্ঠনালির গহীনে আটকে রইল সেই একটিমাত্র প্রশ্ন, "এরপর?”
সবাই একদম চুপ। ঠিক তখন আব্দুর রুশান মোহাম্মদ পকেট থেকে বের করলেন সাদাকালো এক ছবি।
একটি চিএকল্পের মতো সুন্দর এক নারী।
আব্দুর রুশান মোহাম্মদ ছবিটাকে হাত দিয়ে ছুয়ে নিলেন, তার অস্পষ্ট নজর আটকে রইল সাদাকালো স্থীর চিত্রে, তিনি মৃদু স্বরে বললেন, “এই চিরজীবন্ত ছবিটা নিয়ে জন্মান্তর কাটানো যায়।”
এরপর ঘর জুড়ে এক পশলা নিরবতা।
পিউ নিজের চোখের জল মুছে বলে উঠলো,
“ বড় দাদা আপনি নতুন কাউকে কেনো খোঁজেন নি?”
আব্দুর রুশান মোহাম্মদ গভীর ভালোবাসা মেশানো কণ্ঠে বললেন,
“প্রেম আসে কিন্তু ভালোবাসা বারবার আসে না ………….”
এরপর… চারপাশে নেমে এল এক গা ছমছমে নিস্তব্ধতা। শ্রোতা মহলের নিঃশ্বাস পর্যন্ত যেন থমকে গেল। ঘড়ির কাঁটা কেবল একটানা শব্দ করে চলেছে, আর আব্দুর রুশান মোহাম্মদের চোখ… সেই চোখের গভীরে যেন ভেসে আছে
এক হারিয়ে যাওয়া প্রেমের ছায়া। এক অতল নিঃসঙ্গতা, যার কোন প্রান্ত নেই, নেই কোন ব্যাখ্যাও।
তাঁর ঠোঁট আর কিছু বলল না, তবু সারা দেহভঙ্গিমা যেন বলে উঠছিল, ‘সব বলা যায় না, কিছু কিছু অনুভব শুধু বয়ে বেড়াতে হয়।’
হিয়া মনে মনে একবার আউড়ে নিলো, “খুব জানতে ইচ্ছে করছে, প্রকৃতি কোথায় উবে গেল?”
প্রকৃতি আদৌও কি উবে গেল নাকি গভীর রহস্যে এক নাই হয়ে যাওয়া চরিত্রে লুকিয়ে পড়লো।
এই প্রশ্নটা যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গেল না বরং ছড়িয়ে পড়ল চারপাশে, ছুঁয়ে গেল প্রতিটি শ্রোতার হৃদয়।
কিন্তু প্রশ্ন এখানেই কোথায় তাহলে প্রকৃতি?
একটি মানুষ হারিয়ে যেতে পারে, কিন্তু একটা পরিবার তো আর উবে যাবে না! একটা চিঠির ঠিকানা বদলাতে পারে, কিন্তু মানুষ কোথায় যাবে?
যে মেয়ে একদিন সমাজ, রীতিনীতি, এমনকি ধর্মের প্রাচীর পেরিয়ে এসে ভালোবাসার হাত ধরতে দ্বিধা করেনি, সে কি এত সহজে পরিস্থিতির শিকার হয়ে একেবারে অচিহ্ন, একেবারে অনুপস্থিত হয়ে যেতে পারে?
প্রকৃতি কি শুধুই সময়ের সাথে বয়ে যাওয়া কোনো চরিত্র? নাকি সে-ই সেই পৃষ্ঠার ওপারে লুকিয়ে থাকা সত্য, যাকে কেউ স্পর্শ করতে চায় না? নাকি সে এমন এক যন্ত্রণার নাম, যার অস্তিত্ব স্বীকার করলেই ভেঙে পড়ে হৃদয়?
তবুও প্রশ্নটা থেকে যায়, প্রকৃতি কোথায়?
আড্ডা শেষ হলো। চায়ের কাপগুলো ঠান্ডা, কথাগুলো ঝিমিয়ে পড়েছে। ঘড়ির কাঁটা রাতের দিকে এগোচ্ছে, আর বাড়ি জুড়ে নেমে এলো এক অদ্ভুত, গা ছমছমে নিরবতা। যেন সময় নিজেই থমকে দাঁড়িয়ে ভাবছে, প্রকৃতির গল্পটা কি এখানেই শেষ?
নাকি… এটা এক অন্য গল্পের সূচনা?
হিয়া কারো সঙ্গে আর কথা বলল না। সে চুপচাপ নিজের ঘরে ঢুকে গেল। ঘরটা অন্ধকার নয়, তবুও তার ভেতরে কিছু একটা অদ্ভুত ভার, কিছু একটা যন্ত্রণা কাঁপছে বাতাসে।
হিয়া জানালার পাশে এসে দাঁড়াল। রাতের আকাশে পূর্ণিমা নেই, তবুও চাঁদের আলো ঠিকরে পড়ছে তার চোখে, যেখানে ঘুম নেই, আছে কেবল এক অকারণ উদ্বেগ। একটা অচেনা কষ্ট বুকের ভেতর ঢেউ তুলছে, যার উৎস সে বুঝে উঠতে পারছে না।
হঠাৎ ড্রয়ার খুলে সে বের করল তার রঙিন মলাটে মোড়া দিনপঞ্জিটা। সে লিখতে শুরু করল তার মনের দমবন্ধ হয়ে আসা সব কথা। ডায়েরির শেষ লাইনে হিয়া লিখল, “প্রকৃতির কি জানতেও পারলো না তার খোঁজে একটা রুশান পাগল প্রায়...?”
ততোক্ষণে পিউ গভীর ঘুমে। বাতাস জানালার পর্দা উড়িয়ে দিল হঠাৎ। দূরে কোথাও কুকুর ডাকছে। আর ঘরের ভেতর, এক অসম্ভব নিস্তব্ধতা।
প্রশ্ন ঘুরে ফিরে ঐ এক বিন্দুতে আসলেও প্রকৃতি কোথায়?
সে সংসার পেতে এখন তো বোধহয় বৃদ্ধ প্রায়!
আসলেই কি?....
চলবে.......