নির্বাসিত কৃষ্ণচূড়া — পর্ব ৪০

লেখক: সাদিয়া তিন্তি · বিভাগ: রহস্য · পর্ব ৪০ · ৪৭ পর্বের মধ্যে ৪০

সময় পেরোয়। বাড়িতে স্বাভাবিকতা আসে। শুধু বদলায় না তুহুরার অস্বাভাবিকতা। সে যেন প্রকৃতি হয়ে উঠার এক প্রাণপণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে লাগাতার। তবে ঠিক হয়ে উঠতে পারছে না। প্রকৃতির ডাইরিটা তুহুরার জীবনে যেন অভিশাপের মতো নেমে আসে। তুহুরা নিজের স্বত্ত্বা ভুলে চলনে, বলনে একেবারে প্রকৃতিকে অনুসরণে নেমে যায়। ক্যালেন্ডারের তারিখ এগিয়ে দেশ স্বাধীন হয়। বাড়ি ফিরে আসে আব্দুর রুশান মোহাম্মদ। তবে সব থেকে ভয়ংকর ঘটনা ঘটে তখনই। তিনি ফিরেই, এই স্বাধীন বাংলায় প্রকৃতিকে খোঁজার এক যুদ্ধ ঘোষণা করে দেন। এ যেন তার নিজের সঙ্গে নিজের এক অদৃশ্য লড়াই। আব্দুর রুশান মোহাম্মদের এই বিধ্বস্ততা দেখে তুহুরা আরো ভেঙে পড়ে। নিজের খালুজানকে দেওয়া প্রতিজ্ঞা তার গলায় বাঁধা কাটার মত লেপটে থাকে। বারবার আব্দুর রুশান মোহাম্মদের অসহায়ত্ব নিজের চোখে না দেখতে পেয়ে সে বলতে চায় সব সত্য, কিন্তু বলতে পারে না। একই বাড়ির চার দেয়াল এর মাঝে যেন দুটি আলাদা যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। আব্দুর রুশান মোহাম্মদ তার প্রেয়সী প্রকৃতিকে আত্মহারা হয়ে খুঁজতে থাকেন আর অন্যদিকে তুহুরা বসে থাকে সেই প্রেয়সীর শেষ স্পর্শ নিয়ে। বাড়ির প্রত্যেকটা মানুষ যেন এক অসাধারণ অভিনয়ে লিপ্ত হয়ে পড়ে। সবাই নিজের জায়গায় নিজেকে সঠিক মেনে লুকিয়ে যায় সব সত্য।

ঋতুর পর ঋতু বদলে শীত এসে দরজায় থামে। সময়টা পেরিয়ে তিহাত্তরে থামে, তবে বাড়ির পরিবেশ বদলায় না। লেগে থাকে আব্দুর রুশান মোহাম্মদের সেই একই পাগলামি, তুহুরার সেই নিঃশব্দ হয়ে যাওয়া, বাড়ির প্রত্যেকটা মানুষের লুকোচুরি। আব্দুর রাজ্জাক মোহাম্মদ ঠিক করেন বাড়ির পরিবেশ বদলাতে হবে। আর তার এই পরিবেশ বদলের মুখ্য হাতিয়ার হয়ে দাঁড়ায় তুহুরা নিজে। তিনি ঘোষণা দেন তুহুরার বিয়ে দেবেন। সাধারণ অর্থে বাড়ির প্রত্যেকটা মানুষ রাজি হলেও তুহুরা নিজেই যেনো বেঁকে বসে। তবে তার এই বিবাহে অনিচ্ছুকতা প্রকাশের সাহস জোটে না। আব্দুর রাজ্জাক মোহাম্মদের ইচ্ছে তার বড় ছেলে আব্দুর রুশান মুহাম্মদের সঙ্গে তুহুরার বিয়ে দেবেন। তবে বাবার এমন অভিমতে আব্দুর রুশান মোহাম্মদ এক প্রকার গৃহত্যাগী হয়ে ওঠেন। ঠিক সেই একই মুহূর্তে আব্দুর রাজ্জাক মোহাম্মদের সামনে প্রকাশ পায় আব্দুর রবিউল মোহাম্মদের তুহুরার প্রতি গভীর অনুভুতি। এই সত্য জেনে আব্দুর রাজ্জাক মোহাম্মদ আর ভাবনা চিন্তায় আসেন না। তিনি পরিকল্পনা নেন তুহুরা আর রবিউলের বিবাহের। তার পরিকল্পনা অনুসারে বাড়িতে বেশ আয়জনের মাধ্যমেই সম্পূর্ণ হয় তুহুরা আর রবিউলের বিয়ে। আশ্চর্য রকম ভাবে এই বিয়েতে কোনরকম বাদ সাধে নি তুহুরা নিজে। যেন সে নিরবে মেনে নিয়েছে তার ভবিতব্য। সে মেনে নিয়েছে তার প্রকৃতি হয়ে উঠতে চাওয়ার অক্ষমতা অথবা আব্দুর রুশান মোহাম্মদের হৃদয়ের পথ নিষিদ্ধ। আর এসব না হলে সে নিজেকে তৃতীয় ব্যক্তি ভাবতে শুরু করেছে।

এরপর ধীরে ধীরে দৃশ্যপট বদলায়। শ্রোতা মহলে দীর্ঘ এক নিস্তব্ধতা নেমে আসে। সবার চোখ যেন একসঙ্গে আটকে যায় আব্দুর রবিউল মোহাম্মদের মুখে, যিনি এতক্ষণ এই ইতিহাসের প্রতিটি পাতা উন্মোচন করছিলেন এক নিঃশ্বাসে। সকলে নিঃশব্দ থাকলেও মাসুম সাহেব সকলের নিরবতা ভেঙ্গে জিজ্ঞেস করেন, “প্রকৃতির ডায়রির শেষ পাতায়... প্রকৃতি ঠিক কী লিখেছিলো? আত্মহত্যার কথা বলছিল তা বুঝলাম। তবে আর কি ছিল? ডায়রিটা দেখেই তো বোঝা যায় অনেক গুলো পৃষ্ঠা ছেঁড়া হয়েছে। শুধুমাত্র যে ওই একদিনের ঘটনাটা ছেঁড়া হয়েছে, তেমনটা তো মনে হয়নি।”

একটা চাপা উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে। প্রশ্নটা যেন বাতাসে ঢেউ তোলে। সবাই একসঙ্গে চুপ হয়ে যায়, কেউ নড়ে না, শুধু অপেক্ষা করে উত্তরের। আব্দুর রবিউল মোহাম্মদ কিছুক্ষণ চুপ থাকেন। তারপর ধীরে, গম্ভীর কণ্ঠে বলেন, “হ্যাঁ অনেকগুলো পৃষ্ঠা’ই টেনে ছিঁড়ে ছিলেন আব্বা। আমি জানিনা কি হিসাব করে ছিঁড়ে ছিলেন তিনি। তবে ডায়েরিটা ওভাবে পড়ে দেখার সুযোগ আমার হয়নি, শুধু বার কয়েক চোখ বুলাতে পেরেছিলাম। আব্বা আমাদের কাউকে ঠিক ভাবে পড়তেই দেননি। শুধু বোধহয় আব্বা, আম্মা আর তুহুরাই পরিষ্কার পড়েছিলো। এরপর আব্বাই তো নিজ হাতে সেই পাতাগুলো ছিঁড়ে সাথে সাথেই আগুনে পুড়িয়ে দিয়েছিলেন, সকলের সামনে।”

উপস্থিত কারো কোনও শব্দ নেই, কারও দৃষ্টিতে কোনও দোলন নেই। প্রত্যেকে যেন নিজ নিজ ভাবনার খোলসে গুটিয়ে গেছে। কথা বলার সাহস কারও নেই, যেন কেউ শ্বাস নিতে গেলেই ভেঙে যাবে এই ভারী নীরবতা। মাসুম সাহেব আবার সেই ভার ছেঁদ করেন। তাঁর কণ্ঠ এবার আর তীক্ষ্ণ নয়, বরং ধীরে জিজ্ঞেস করেন, “ডায়রির শেষ পৃষ্ঠাগুলো না হলে বুঝলাম কাকা পুড়িয়ে দিয়েছিলেন...। তাহলে প্রকৃতির শেষ চিঠিটা? সেটাও কি পুড়িয়ে দিয়েছিলেন?”

এই প্রশ্নটা শোনামাত্রই সবাই আবার তাকিয়ে যায় আব্দুর রবিউল মোহাম্মদের দিকে। তাঁর কপালে ভাঁজ পড়ে, ভ্রু নেমে আসে, মনে করতে চেষ্টা করেন কিছু। কয়েক মুহূর্ত চুপ থেকে, তিনি ধীরে মাথা নেড়ে বলেন, “না...না, চিঠিটা... তখন তো আব্বা পুড়াননি। আমার যতদূর মনে পড়ে, আব্বা সেদিন তুহুরার থেকে ডায়রিটা ছিনিয়ে নিয়েছিলেন। তারপর শেষ কয়েকটা পৃষ্ঠা একটানে ছিঁড়ে নিয়ে পুড়িয়ে দেন। কিন্তু চিঠিটা... সেটা তো তখন তুহুরার হাতে ছিল না। সেটা আম্মার হাতে ছিল বোধহয়! চিঠিটা শেষ তিনিই পড়েছিলেন।”

শ্রোতা মহলে চাপা গুঞ্জন উঠতে গিয়েও ওঠে না। সবাই একসাথে তাকিয়ে থাকে, নিঃশব্দে। আব্দুর রবিউল মোহাম্মদ এবার বলেন, “আম্মার কাছে থাকলে তো তার কাছ থেকে তুহুরার হাতেই যাওয়ার কথা ছিল। প্রকৃতির ডায়েরি যেখানে পাওয়া গেছে চিঠিটাও সেখানেই থাকার কথা।”

ঘরজুড়ে তখন এক অস্বস্তিকর স্পন্দন। আর এর মাঝেই দরজার কাছ থেকে আলিফ চেঁচিয়ে বলে ওঠে, “না না ওখানে শুধু ডাইরিটাই ছিল কোন চিঠি ছিল না!” কথাটা বলার সাথে সাথে সে সামান্য ঘাবড়ে যায়। এখানে গুরুজনদের মাঝে তার এমন অনধিকার প্রবেশটা বেমানানই বটে। তার উপরে আবার কথার জবাব দেয়া, এ-তো বেয়াদবি! আলিফ এসব ভেবেই মাথা নিচু করে আবার দরজার আড়ালে দৌড়ে চলে যায়।

মাসুম সাহেব আলিফের কথায় সায় দিয়ে বলেন, “চিলেকোঠায় চিঠিটা থাকলে রুশন যেদিন চিলেকোঠা পরিষ্কার করিয়েছে ওদিনই সেটা পাওয়া যেত। তারমানে চিলেকোঠায় চিঠিটা নেই। হয়তো কাকি তুহুরাকে দেন-ই নি চিঠিটা।”

তূর্য এতক্ষণ চুপ ছিল। চোখে গভীর মনোযোগ, যেন সে প্রতিটি শব্দের নিচে লুকিয়ে থাকা সত্যকে পড়ার চেষ্টা করছিল। কিন্তু এবার, তার কণ্ঠে এক বিরল ধীর জিজ্ঞাসা, যেন সুর নরম, অথচ প্রশ্নের ধার তীক্ষ্ণ, সে বললো, “আপনারও তো জানার কথা, সেই চিঠিটা কোথায় আছে? তুহুরাতো আপনার স্ত্রী ছিল। এই হিসেবে তো এইসব গোপন জিনিসে আপনারও প্রবেশাধিকারই ছিল, তাই তো?.... এই ডায়েরি এত গোপনে চিলে কোঠায় রাখা, এইসব তো আপনি জানতেন? জানতেন না?”

প্রশ্নটা ঘরের ভেতর ছড়িয়ে পড়ে এক অনুচ্চারিত অস্বস্তির মতো। আব্দুর রবিউল মোহাম্মদের মুখে তখন একরকম স্তব্ধতা নামে। চোখের দৃষ্টি কুয়াশার মতো অস্পষ্ট হয়ে যায়, তিনি ধীরে মাথা তুলে তাকান তূর্যর দিকে। চোখে এক ধরণের ক্লান্তি, কিন্তু ক্লান্তির চেয়েও বেশি কিছু এক বিষণ্ন স্বীকারোক্তির ছায়া। তিনি স্পষ্ট স্বরে বলেন, “তুমি কি মনে করো, বিয়ে মানেই সব জানা যায়? মানে একটা মানুষকে একদম ভিতর থেকে সম্পূর্ণটা কি জানা যায়? মানুষের হৃদয়ের একটা কোণা থাকে, যেটা সে কাউকেই কখনও দেখায় না। এমনকি যাকে সে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে, তাকেও না। আর এখানে তো তুহুরা আমাকে ভালোই বাসতো না। সারা জীবন শুধু ওর মনে জায়গা করে রেখেছিলো বড় ভাই। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত শুধু আব্বার কথা রাখতে আমার সঙ্গে একটা বিয়ে বিয়ে খেলায় মেতে ছিল। আমার সামনে থেকে সবকিছু অদৃশ্য করে রেখেছিল। তারপরও তার এই অনুভূতি কি আমার কাছে আদৌও অজানা ছিল!”

তিনি দীর্ঘ নিশ্বাস নেন। কণ্ঠটা এবার নির্লিপ্ত, কিন্তু সেই নির্লিপ্ততার নিচে যেন বিসর্জিত এক ব্যথার সুর বাজে, এবার তিনি একটু গভীর গলায় বলেন, “তবে তুহুরা আমাকে কখনও ঠকায়নি। ওর ভেতর একদম গোপনে একটা নদী ছিল, যেখানে আমি কখনও পৌঁছাতে পারিনি। আমি জানতাম এই ডায়েরির কথা, ও খুব যত্নে রাখতো তবে কখনও জিজ্ঞেস করিনি, কোথায় রেখেছে ও। আমি চাইনি জানতে। আসলে আমি ভয় পেতাম আমি ওর মধ্যে বড় ভাইয়ের জন্য যে গভীরতা অনুভব করতাম, আমি কখনো চাইতামই না সেটা ওর মুখে প্রকাশ হোক কোনদিন। হয়তো ও যদি কোনদিন মুখে স্বীকার করতো, আমি ওটা মেনে নিতে পারতাম না।"

আব্দুর রবিউল মোহাম্মদ থামলেন। উপস্থিত কারও মুখে কোনো প্রশ্ন নেই, আর কারও দৃষ্টিতে কোনো অবিশ্বাস নেই। শুধু এক তীক্ষ্ণ রাগ দৃশ্যমান হলো মিনুর রহমানের চোখে। তার চোখে সেই মুহূর্তে ঘন এক রাগের ছায়া খেলে যায়, যা আর দমন করা সম্ভব হয় না। তিনি হঠাৎই সামনের দিকে একটু এগিয়ে আসেন, কণ্ঠস্বরে চিরচেনা শীতলতা ভেঙে এবার তীব্র, উত্তপ্ত, করে বলেন, “মিয়া ভাই, এতটা নিষ্পাপ বানানোর চেষ্টা কইরেন না নিজেকে। দয়া করুন। আপনি যে তুহুরাকে ভালবাসতেন এটা আমি অস্বীকার করতে চাই না। তবে এই ভালোবাসায় সত্যতা কতটুকু ছিল সেটা আমার সন্দেহ আছে। আপনি নিজের মন মতো সাজিয়ে গেছেন যে তুহুরা আপা বড় ভাইকে ভালবাসতো। আমি এটা অস্বীকার করছি না যে তুহুরা আপা বড় ভাইকে ভালবাসতে না। কিন্তু আপনার সাথে বিয়ে হবার পর আমি কোন দিনও দেখি নাই যে তুহুরা আপা বড় ভাইয়ের মুখের দিকে অব্দি তাকিয়ে দেখেছেন।”

আব্দুর রবিউল মোহাম্মদ চুপ, মুখে কাঁপা হাসি, চোখে নিঃশব্দ আশ্চর্য। কিন্তু মিনু রহমান থামেন না। কণ্ঠে একরকম অজস্র দিনের জমে থাকা অভিমান, তিনি চোখের পানি আঁচলে মুছে আবার বলেন, “তুহুরার মনে বড় ভাই ছিল এইটুকু বললেই কি আপনি বাঁচেন? আপনার ভিতরে তো আমি কোনদিনও দেখিনি তুহুরার জন্য পাগলামি! আপনি ছিলেন সন্দেহে ভরা এক মানুষ। আপনি তুহুরাকে বিশ্বাস করেননি। আপনি চাইতেন সে যেন আপনাকে ভালোবাসে, কিন্তু মেনে নিতে নারাজ যে সে কোনদিন বড় ভাইকে ভালোবাসতো। অতীতটা চলে গেছিল, তুহুরা আপনাতে জড়িয়ে গিয়েছিল। কিন্তু আপনি সেটাকে আঁকড়ে না ধরে, আপনার আর তুহুরার বর্তমানটা নষ্ট করেছেন।”

তারপর মিনুর রহমানের কণ্ঠ হঠাৎ যেন নিচে নেমে আসে, কিন্তু তীক্ষ্ণতা এক বিন্দুও কমে না বরং আরও গভীর হয়। তিনি বলেন, “আপনি বরাবরই একজন ব্যর্থ মানুষ। একজন মেয়ে কি চায় জানেন? তারা চায় তার জন্য কেউ পৃথিবীর সবটা পাগলামি করুক। সবটা দিয়ে ভালোবাসুক। আর আমরা সেই সবটা পাগলামি দেখেছিলাম বড়ভাইয়ের চোখে প্রকৃতির জন্য। আমারও মনে হতো, কেউ একজন আমাকেও এত পরিমান ভালোবাসুক। আমার জন্যও ঠিক এই পরিমাণ পাগলামি করুক। তুহুরাও যদি এই একই চিন্তা নিজের মনের নিয়ে রাখতো, তবে এটা অন্যায় নয়। এটা তার চাহিদা ছিল। আর আপনি কোনদিনও ওকে শান্তি দেননি। তুহুরাকে সন্দেহ না করে, কোনদিন ওর মাথায় একটু হাত রাখতেন। ‌অন্ততঃ একটু বিশ্বাস রাখতেন। কিন্তু না।…আপনার ভালোবাসা ছিল এক ধরণের নিয়ন্ত্রণ…আর বড় ভাইয়ের ভালোবাসা ছিল মুক্ত, উন্মাদ, পবিত্র। আর আপনার মন ওই পবিত্রতায় বার বার ভয় পেয়ে যেতো।”

এক নিঃশ্বাসে বলে থেমে যান মিনু রহমান। ঘরজুড়ে আবারও স্তব্ধতা। আব্দুর রবিউল মোহাম্মদ যেন কিছু একটা বলতে গিয়ে থেমে যান। তার ঠোঁট কাঁপে কিন্তু কোনও কথা বের হয় না। এই ভারী নিস্তব্ধতা ছিঁড়ে আবারো চিৎকার করে উঠলেন মিনু রহমান, তাঁর কণ্ঠে অভিমানের ঝড়, চোখ ভর্তি জল। তিনি যেন নিজেকে সামলানোর বৃথা চেষ্টা আর করছেন না। তিনি ভাঙা গলায় বলেন, “দিনশেষে তুহুরা তার সব পাপ আপনার উপর দিয়ে চলে গেছে। আপনার হাতেই ভালোবাসার মূল্য চুকিয়ে গেছে। এখন আপনি একা বসে এই গল্পটা নিজের মতো সাজিয়ে বলছেন? প্লিজ, অন্তত ওকে নিয়ে নিজের মনগড়া কাহিনি বানাবেন না। তুহুরা কোনো গল্প ছিল না, সে ছিল একজন মানুষ! রক্তমাংসের, ভুলে-ভরা, ভালোবাসায় ভেজা একজন মেয়ে, যাকে আপনি বুঝতেই পারেননি! যাকে আপনি ভালবাসতেও পারেননি। যত্ন করে রাখতে পারেননি।”

ঘরের লোকজন হতবাক, চুপচাপ তাকিয়ে থাকে মিনুর দিকে। মাসুম সাহেব কৌতুহলী গলায় বলে ওঠেন, “রবির হাতে ভালোবাসার মূল্য চুকিয়ে গেছে মানে? কী বোঝাতে চাচ্ছিস মিনু?”

এক মুহূর্তের জন্য থেমে যান মিনু রহমান। যেন তিনি মুখ ফুসকে বিপজ্জনক কোন শব্দ বলে ফেলেছেন। নিজেকে সামান্য সামলে তিনি বলেন, “তেমন কিছু না, কথার কথা বলেছি মাসুম ভাই। তুহুরা খুব ভালো একজন মানুষ ছিল। ওর মতো মানুষের মৃত্যুই তো পাপ। আসলে আমি তুহুরা আপার খুব কাছের একজন ছিলাম। বেশ ভালোবাসতাম উনাকে। মিয়া ভাইয়ের মুখে ওসব কথা শুনে নিজেকে সামলাতে পারিনি। তাই উল্টোপাল্টা বকে ফেলেছি।”

সকলেই আবারো চুপ। শুধু সন্দেহের নজরে মিনু রহমানের দিকে তাকিয়ে থাকে তূর্য। এই মৌনতা ভাঙে স্বাত্ত্বকি। সেও যেন এক গভীর কৌতুহলের মাথায় ঝিমাচ্ছে। তিনি আব্দুর রবিউল মোহাম্মদের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করেন, “তুহুরা আপার মৃত্যু কিভাবে হয়েছিল?”

এক নিঃশ্বাসে এই ছোট্ট প্রশ্নটা ছুঁড়ে দেয়া মাত্র, সারা ঘরে যেন হিম নেমে আসে। মিনু রহমান একটু ঘাবড়ে যান, চোখ নামিয়ে খুব দ্রুত কন্ঠে বলেন, “বাথরুমে পড়ে গিয়েছিল... মাথায় আঘাত..”

মিনু রহমানের কথাটা সম্পন্ন না করতে দিয়েই, তাঁর কথার মাঝখানে স্পষ্ট, ভারি কণ্ঠে আব্দুর রবিউল মোহাম্মদ বলে ওঠেন, “তুহুরার মৃত্যুর কারণ আমি। আমার দোষে…।”

সব চোখ মুহূর্তেই ফিরে যায় তাঁর দিকে।

তিনি ধীরে বলেন, “হ্যাঁ... ওর সব পাপ আমার। মিনু ঠিক বলেছে... আমি সন্দেহ করতাম। অকারণে, প্রতিদিন... আমি তুহুরাকে ভালোবাসতাম, কিন্তু বিশ্বাস করতে পারতাম না। আমি চাইতাম, ও যেন শুধু আমার হয়, এমনকি ও যেন আমার নিয়ন্ত্রণে থাকে। কিন্তু ভালোবাসা কি কখনো নিয়ন্ত্রণ করা যায়?”

তার কণ্ঠ আরও নিচু হয়ে আসে, যেন এক স্বিকারোক্তি। তাঁর চোখে হালকা জল এসে ভাসে, গলা কেঁপে ওঠে, তিনি বলেন, “বড়ভাইকে নিয়ে আমাদের রোজকার ঝগড়া লেগেই থাকতো। আমার সব সময় মনে হতো তুহুরার মনে বোধহয় এখনো বড়ভাইই আছেন। ও হয়তো বড়ভাইকেই চায়। সারা জীবন আমি ওকে চেয়েছি আর ও চেয়েছে শুধু বড়ভাইকে।

… আমি রাতের পর রাত তুহুরাকে কাঁদতে দেখেছি অনুসুচনায়। ও শুধু একটাবার বড়ভাইকে প্রকৃতির শেষটা জানাতে চেয়েছিল। তুহুরা বারবার বলতো, আমরা অন্যায় করছি। আমরা ধোঁকা বাজি করছি বড়ভাইয়ের সাথে। অপেক্ষা শেষ হলে বড়ভাই নাকি নতুন জন্ম পাবে। যেদিন তিনি জানবেন প্রকৃতি মারা গেছে তখনই প্রকৃতির অপেক্ষা শেষ হবে। আমি পাগল হয়ে উঠেছিলাম তুহুরার লাগাতার এসব কথায়। তুহুরা আব্বার কাছে ওয়াদা করেছিল যে কোনদিনও এই সত্য প্রকাশ করবে না। ও কোনদিনও বলেনি, কিংবা বলার চেষ্টাও করেনি। …

সেদিন তুহুরার সাথে আমার প্রচন্ড ঝামেলা হয়। ঝামেলার বিষয়বস্তু ছিল বড় ভাই। তুহুরা মেনে নিতে পারছিল না বড় ভাইয়ের এই অসহায়ত্ব। বড় ভাই তখন শুধুমাত্র প্রকৃতিকে খুঁজতে ভারতে গিয়েছিলেন‌। তুহুরার মুখে বড় ভাইয়ের পক্ষে শত শত কথা শুনে আমি বিরক্ত হয়ে যাই। আমি ওর চরিত্র নিয়ে কথা তুলি। আমি ওকে বলি, ও এখন আমার স্ত্রী, ওর এখন আমাকে নিয়ে ভাবা উচিত আমার বড়ভাইকে নিয়ে নয়। ঝামেলাটা আরো বাজে বাজে শব্দ চয়নে গিয়ে মিলে যায়। এরপর ধাক্কা ধাক্কি পর্যায়ে পৌঁছায়। আমার হাতের ধাক্কায় ও পড়ে যায় দেয়ালের উপর। আমি ওর দিকে ফিরে না তাকিয়ে ঘর থেকে চলে যাই। দরজা খুলতেই দেখি মিনু বাইরে দাঁড়িয়ে রয়েছে। আমি ওর দিকে না তাকিয়েই এগিয়ে যাই। সাথে সাথেই মিনু ঘরের ভিতরে ঢোকে। সবটাই আড়ালে শুনেছিল সে। তবে ঘরে ঢুকেই ও চেঁচিয়ে ওঠে। মিনুর চেঁচানো শুনেই আমি ও ঘরে আবার ফিরে যাই। ঘরে একেবারে রক্তারক্তি অবস্থা। তুহুরা অবচেতন হয়ে শুয়ে আছে, তার চারপাশটা রক্তে ছড়িয়ে ছিটিয়ে গেছে। সাথে সাথেই ডাক্তার আনা হয়। তবে সে মৃত। তার পেটে তখন আমার তিন মাসের সন্তান। তুহুরা একটাবারও জানায়নি সে অন্তর্সত্তা। সব দায় নিয়ে চলে গেল।”

আব্দুর রবিউল মোহাম্মদ একটু থামেন। এরপর ধীরে বলেন, “মিনু জানতো, তুহুরার এই মৃত্যুর দায় আমার। জেলে যাওয়ার প্রচন্ড ভয় জন্মায় আমার। আমি মিনুকে বোঝাই, আব্বা বৃদ্ধ, বড় ভাইয়ের জন্য এমনিতেই বাড়ির অবস্থা ভালো না, আব্বা কিছুতেই মেনে নিতে পারবে না‌। খুনের দায় আমার। আর সবাই জানলে আমার জেল হবে এই খুনের দায়ে। কিন্তু আমি তো ইচ্ছে করে এ কাজ করিনি। এ তো ভুল, হুট করে হয়ে যাওয়া পাপ। আমি মিনুকে বোঝাতে সক্ষম হই। ও নিজেই আমাকে বাঁচাতে গল্প সাজায়। বাথরুমে পড়ে গিয়েছিল তুহুরা। দেয়ালে টানিয়ে দেয় ছবির ফ্রেম, যেন সব দাগ চোখের আড়াল হয়। তবে এখানের সব ঘটনা পরিষ্কার দূর্ঘটনা। … এই পাপই মিনু এতদিন তার বুকের মধ্যে আটকে রেখেছিল।।”

এই সবটাই যেন অপ্রত্যাশিত। দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে থাকা হিয়ার বুকের ভেতর বিস্ফোরণে দুমড়ে মুচড়ে যায়। এই স্বীকারোক্তি তার কানে পৌঁছাতেই সে আর নিজেকে আটকে রাখতে পারে না। ফুঁপিয়ে ওঠে, ডুকরে কেঁদে ওঠে, মুখে হাত চেপেও থামানো যায় না সেই কান্না। যেন তার বুক ফেটে যাচ্ছে, কান্নার সাথে যেন বেরিয়ে আসছে হৃদয়ের এক টুকরো। মিমের চোখ ভেজা থাকলেও নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু হিয়ার এমন কান্না শুনে সে নিজে আরো ভেঙে পড়ে। এই কান্না প্রতিবাদের না, কোনো প্রশ্নেরও না। এটা শুধু এক বিষাদে ডুবে যাওয়া এক জয়হীন, নিষ্ঠুর বাস্তবের সামনে হার মানা কান্না।

ঘরের মধ্যে একটা পিন পড়লেও যেন শব্দ হবে না এমন নিঃস্তব্ধতা। কারো চোখে কোনো ভাষা নেই, মুখে কোনো কথা নেই। এক একজন যেন আস্ত একটা পাহাড় বয়ে বেড়াচ্ছে কাঁধে, কিন্তু কারো মুখ খুলবার সাহস নেই। এইসব ঘটনার ওজন এত বেশি, যে সেখানে শব্দ হারিয়ে যায়।

ঠিক সেই মুহূর্তে, আব্দুর রুশান মোহাম্মদ নিঃশব্দে উঠে দাঁড়ান। তার মুখে কোনো অভিব্যক্তি নেই একদম নিস্তেজ, শীতল। চোখে পানি নেই কিন্তু চোখ শুকিয়ে গেছে, হাজার বছর কাঁদার পর যেমন হয়। সে কাউকে না দেখে, কিছু না বলে একদম নিঃশব্দ পায়ে বসার ঘর পেরিয়ে চলে যায় নিজের ঘরের দিকে। তার হেঁটে যাওয়া যেন একটা যুগের প্রস্থান যেখানে ভালোবাসা, বিশ্বাস আর অব্যক্ত প্রত্যাশা ধুয়ে গিয়েছে এক চিরস্থায়ী নিস্তব্ধতায়। তাঁর পেছনে কেউ ডাকে না, কেউ থামায় না। কেউ কিছু বলার মতো অবস্থায় নেই। সবাই যেন কাঁটার মতো গেঁথে গেছে নিজেদের জায়গায় নড়া সম্ভব নয়, না মনের, না শরীরের। এই ঘরে এখন কেবল একটি জিনিস আছে একটা অপরাধবোধে ডুবে থাকা সময়, যেটা আর কোনোদিন আগের মতো হবে না।

মাসুম সাহেবের চোখে যেন আগুন জ্বলে উঠেছে। এতক্ষণ অবধি তিনি ধৈর্য ধরে শুনছিলেন, গভীর মনোযোগে, নির্বাকভাবে। তবে এখন আর থামতে পারেন না নিজেকে। ভেতরের জমে থাকা বিস্ফোরণ বেরিয়ে পড়ে তাঁর মুখ দিয়ে। তিনি দাঁড়িয়ে পড়েন চেয়ার ঠেলে, যেন ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিচ্ছেন গোটা বাস্তবতাকেই। মুখ ঘুরিয়ে ফেলে তাকান আব্দুর রবিউল মোহাম্মদের দিকে, চোখে অবিশ্বাস আর প্রতারিত হবার গভীর ক্ষত। কণ্ঠ কাঁপে তাঁর, কিন্তু সেটা দুর্বলতায় নয়, ক্ষোভ। তিনি চেঁচিয়ে বলেন, “এমনও হয়? ঘৃণা করছে আমার একটা খুনির চোখে এমন আবেগ দেখে। তোমাদের পাপের তো ষোলকলা পূর্ণ হয়ে গেছে। আর কোন স্বীকারোক্তি বাকি আছে? থাকলে তাও করে ফেলো।”

মাসুম সাহেবের কণ্ঠ এতটাই ক্ষিপ্ত যে, তাঁর দিকে কেউ চোখ তুলে তাকাতেও পারে না। তিনি মুহুর্তে ফিসফিস করে ওঠেন, “রুশানের জন্মই যেন ওর বড় দূর্ভাগ্য।”

আব্দুর রবিউল মোহাম্মদ চুপ থাকেন। তার চোখে লজ্জার ছায়া নেই, বরং এক গা-ছাড়া ক্লান্তি জমে আছে। তিনি মুখ তুলে মাসুমের চোখে চোখ রাখেন না, যেন সেই দৃষ্টির ভার সইতে পারছেন না।

______________________

চলবে...... 💔