নির্বাসিত কৃষ্ণচূড়া — পর্ব ২২
লেখক: সাদিয়া তিন্তি · বিভাগ: রহস্য · পর্ব ২২ · ৪৭ পর্বের মধ্যে ২২
হিয়া আর তূর্য একবার নিজেদের দিকে তাকায়। তূর্যর মুখে কথা আসে, আবার থেমে যায়।
সে বলতে চায়, দীপ্তি দেবীর ভাষ্যমতে, আব্দুর রুশান মোহাম্মদের বাবা প্রকৃতির সঙ্গে সরাসরি দেখা করেছিলেন। এমনকি তাদের বিয়ের আশ্বাসও দিয়েছিলেন।
কিন্তু তূর্য সিদ্ধান্ত নেয়, এখনই সব বলা ঠিক হবে না। কিছু কথা সময়ের জন্য অপেক্ষা করে।
হিয়া তখন একটুখানি চুপ থেকে বলে ওঠে, "বাক্সে শঙ্খ নামের একজনের চিঠিও আছে, যিনি কলকাতা থেকে তুহুরাকে চিঠি দিয়েছিলেন। আপনি এ নামের কাউকে চেনেন?"
আব্দুর রুশান মোহাম্মদ, চুপচাপ বসে ভাবতে থাকলেন। মস্তিষ্কে চাপ দিয়ে এ নামের কারো অস্তিত্ব মনে করতে পারলেন না। এরপর চিঠিটা দেখার জন্য খুঁজতে লাগলেন। তূর্য হাত লাগালো, দ্রুত চিঠিটা তুলে আব্দুর রুশান মোহাম্মদের হাতে দিলো। তিনি খুব নিখুঁত ভাবে খুঁটিয়ে দেখলেন। এরপর বললেন, "না।.... এ আমার পরিচিত কেউ না। তুহুরার কোন পরিচিত হয়তোবা।”
আব্দুর রুশান মোহাম্মদ সেই রুপোলি পায়েলটা হাতে নিয়ে গভীরভাবে দেখতে থাকেন। তার চোখে এক অন্যরকম উজ্জ্বলতা, যেন এই ক্ষুদ্র অলংকারের ভেতরেই পুরো একটা হারানো সময় ঘুমিয়ে আছে। চুপচাপ, ধীরে ধীরে তিনি পায়েলের লকটা ছুঁয়ে দেখেন। তার ঠোঁটের কোণে একটুকরো দুঃখমাখা স্মৃতি খেলা করে।
তূর্য আর হিয়া দুজনেই তখন নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে। কিছু বলার মতো শব্দ নেই, আবার অনেক কিছু বলার মতো অনুভূতি জমে আছে বুকের মধ্যে। দুজনেরই মনে হচ্ছে, তারা কোনো রহস্যের মাঝখানে এসে পড়েছে। যার শুরু বহু আগের, শেষ কোথায় কেউ জানে না।
ঠিক তখনই নিচতলার বসারঘরের দিক থেকে মিনু রহমানের গলা শোনা যায়, “তূর্য, হিয়া! নিচে এসো, ট্রেন মিস করে ফেলবো তো।”
হিয়া একটু চমকে ওঠে। তূর্য ধীরে এসে আব্দুর রুশান মোহাম্মদের সামনে দাঁড়ায়। এক মুহূর্ত চোখ মেলায় তার চোখের সঙ্গে। তারপর শান্ত গলায় বলে, “বড় দাদা, আমাদের আজ যেতেই হবে। কিন্তু একটা অনুরোধ করছি, আপনার ভাইবোনদের কিছু বলবেন না এখন। যা করবেন নিজের মতো করে করুন। আমার মতে পুরো চিলেকোঠাটা আবার একবার সার্চ করা দরকার। একটার পর একটা জিনিস সেখানের থেকেই পাওয়া যাচ্ছে… আমি মনে করি এই পুরো ঘটনার একটা স্পষ্ট ব্যাখ্যা দরকার। এবাড়িতে যা কিছু গোপন সব যেন চিলেকোঠায়।”
একটু থেমে তূর্য আরেকটু নিচু গলায় বলে,
“আমি আবার ফিরব। দিন দুয়েকের মধ্যেই। আপনার এই রহস্যের ভেদ যে আমাকে করতেই হবে!”
আব্দুর রুশান মোহাম্মদ মাথা নাড়েন না, কিছু বলেনও না, শুধু একবার তাকান তূর্যের দিকে। সেই দৃষ্টিতে যেন আশীর্বাদ, কৃতজ্ঞতা আর দীর্ঘ এক অপেক্ষার প্রতিচ্ছবি মিশে আছে।
তূর্য আর হিয়া ধীরে পিছু হটে। পায়ের আওয়াজ যেন ধ্বনির ভেতর হারিয়ে যায়। পেছনে রয়ে যায় শুধু বৃদ্ধ মানুষটা। সবাই নিচে নেমে আসে। মিনু রহমান আর আব্দুর রবিউল মোহাম্মদ বারবার তাগাদা দিচ্ছেন। এক মুহূর্ত পর আব্দুর রুশান মোহাম্মদও নিচে চলে আসেন। চিরচেনা ভঙ্গিতে, যেন কিছুই হয়নি তবু তার চোখে আজ এক অদ্ভুত ধৈর্য আর গভীরতা। সবার সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলেন, সকলের মাথায় হাত রাখেন আশীর্বাদের ভঙ্গিতে।
সবাই একে একে ভাড়ার গাড়িতে উঠে পড়ে। আলাদা গাড়ির জানালা দিয়ে হিয়া আর তূর্য তাকিয়ে থাকে বাড়িটার দিকে। প্রশ্ন যেন তাদের মস্তিষ্ক দখল করে নিয়েছে। এবাড়ির রহস্যের যেন শেষ নেই।
গাড়ি দুটো দূরে চলে যায় তখনো বাড়ির দরজায় দাঁড়িয়ে থাকেন একা আব্দুর রুশান মোহাম্মদ।
গাড়িটি দৃষ্টিসীমার বাইরে চলে যেতেই আব্দুর রুশান মোহাম্মদের চোখের কোমলতা নিঃশব্দে কেটে যায়। তার দৃষ্টিতে জমতে থাকে এক অদৃশ্য কঠোরতা, যেন নিজের ভেতরে গড়ে তুলছেন এক অচেনা দেয়াল। বুকের ভেতর একটা চাপা অস্বস্তি চেপে বসে, যেন নিঃশ্বাস নিতেও কষ্ট হয়। তূর্যর শেষ কথাগুলো এখনও তার কানে বাজছে,
"আপনার ভাই-বোন কাউকে জানাবেন না।"
এই একটিমাত্র বাক্য তার হৃদয়ে কাঁটার মতো বিঁধে থাকে।
শুরু হয় এক নিঃশব্দ ঘূর্ণাবর্ত ভাই-বোনদের প্রতি জন্ম নেয় এক গাঢ় অবিশ্বাস, এই অবিশ্বাস যে আগে ছিল না এমনটা নয়। তবে এখন যেন তা প্রকাশ হবার রাস্তা মজবুত হয়েছে। কেনই-বা এ বাড়ি থেকেই একের পর এক হারিয়ে যাওয়া জিনিস পাওয়া যাচ্ছে? কেমন করে প্রকৃতির সেই পুরোনো ডাইরি, যেটি মিনু রহমানের হাতেই দিয়েছিল বলে জানা যায়। সেটা হারিয়ে আবার ফিরেও আসে এই বাড়িরই চিলেকোঠায়! তাও অর্ধ শতাব্দী পরে?
এমন হাজারো প্রশ্নগুলো মাথার ভেতর ঘুরপাক খেতে থাকে, প্রতিটি প্রশ্ন যেন ধীরে ধীরে তার মস্তিষ্কের কোষে গেঁথে যায় স্পষ্ট, গাঢ় ও বিদ্ধকারীভাবে।
এখন আর কোনো কিছুই তাকে অবাক করে না, বরং প্রতিটি টুকরো টুকরো ঘটনার মাঝে সে খুঁজে ফেরে এক অদৃশ্য সূত্র, যা তাকে নিয়ে যেতে পারে এক নিষিদ্ধ অতীতের গহীনে। যেখানে ভালোবাসা, বিশ্বাস আর প্রতারণার সীমারেখাগুলো বহু আগেই মুছে গেছে।
তিনি ধীরে ধীরে ঘরে ফিরে এসে বসেন। চুপচাপ কিছুক্ষণ বসে থাকার পর পরিষ্কার গলায় ডেকে ওঠেন, “রাশিদা? আলী? এদিকে এসো তো।”
দুজনেই ছুটে আসে। এরপর তিনি পরিষ্কার গলায় বলেন, “চিলেকোঠায় চলো। এখনই।”
তারা একটু অবাক হলেও কিছু বলে না। তিনজন একসঙ্গে উঠে যায় চিলেকোঠায়। দরজাটা খোলার সঙ্গে সঙ্গে ধুলোমাখা গন্ধ আর স্মৃতির ভার ছড়িয়ে পড়ে। আব্দুর রুশান মোহাম্মদ দৃঢ় গলায় বলেন, “এই পুরো চিলেকোঠা খালি করো। একটাও জিনিস যেন বাদ না যায়। যা যা পাও, সব আমার কাছে নিয়ে আসো। আমি সব নিজে দেখবো।”
রাশিদা ও আলীও কথা মতো লেগে পড়ে কাজে। তারা খুব যত্ন করে তল্লাশি শুরু করে। বাক্সের পর বাক্স খুলে ফেলে, দেয়ালের খাঁজে খুঁজে দেখে, পুরোনো ট্রাঙ্ক, কাঠের আলমারি, ধুলো ঢাকা তাক, সব কিছু। যেন ঘরটাকে তারা নতুন করে জাগিয়ে তোলে।
একটা একটা জিনিস রাশিদা ও আলী এনে হাজির করে আব্দুর রুশান মোহাম্মদের সামনে। কোনোটা চিঠি, কোনোটা ছবি, কোনোটা পুরোনো নোটবুক, শুকনো ফুলের দলা, ভাঙা ব্রোচ, অদ্ভুত আঁকাবাঁকা হস্তাক্ষরে লেখা চিরকুট। আব্দুর রুশান মোহাম্মদও প্রতিটি জিনিস খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে থাকেন। চোখে তার সেই আগের কোমলতা নেই, আছে একরকম তদন্তের গভীরতা।
এদিকে চিলেকোঠা যেন এক নতুন রূপে আবির্ভূত হয়। রাশিদা ও আলী মেঝে থেকে শুরু করে জানালার ফ্রেম পর্যন্ত মুছে চকচকে করে ফেলেছে। পুরোনো পর্দা নামিয়ে ধুয়ে দেয়, নতুন বাতাস ঢোকে ঘরে।
চিলেকোঠার প্রতিটি কোণে যেন কোনো এক হারিয়ে যাওয়া কণ্ঠস্বর এখনও ঘুরে বেড়াচ্ছে, আর আব্দুর রুশান মোহাম্মদ নীরবে সেই কণ্ঠ শুনতে চেষ্টা করছেন। এখনো তার চোখে শুধু একটাই লক্ষ্য, প্রকৃতি।
তল্লাশি শেষ হয় বিকেলের আলো মিলিয়ে যাওয়ার আগে। রাশিদা ও আলী ক্লান্ত গলায় বলে, “আর কিছু নেই, বড় বাবু। যা ছিল, সব আপনার সামনে।”
আব্দুর রুশান মোহাম্মদ কিছুক্ষণ নীরব থাকেন। তার চোখ যেন এখনও কিছু খুঁজে ফেরে, যেন কিছু নেই, তাও কিছু আছে। তিনি একে একে টেবিলের ওপর রাখা পুরোনো চিঠি, ছবি, ডায়েরির খুচরো পাতা, সবই দেখেন আবার, বার বার। কিন্তু না, নতুন কিছু নেই। প্রত্যেকটা জিনিস যেন শুধুই অতীতের স্মৃতিচিহ্ন, যাদের থেকে এখন কোনো কার্যকর সূত্র বের করা অসম্ভব।
তিনি ধীরে ধীরে চেয়ারে হেলে বসেন। মুখে একটা হতাশ ভাব। নিজের মনে বলেই ফেলেন, “সবই স্মৃতি, কোনোটা সত্যি নয়। আর সত্যি যদি থেকেও থাকে, তার মুখ নেই, নাম নেই।”
রাশিদা বলে, “সব ফেলে দেবো?”
তিনি মাথা নাড়েন, “না, কিছু ফেলবে না। সব আবার যত্ন করে তুলে রাখো। ঠিক যেখানে ছিল, ঠিক তেমনভাবেই। শুধু একটা কাজ করো… কাঠের বাক্সটা এদিকে টেবিলের উপরে দিয়ে যাও। বাকি কিছু নয়।”
আলী কাঠের বাক্সটা টেবিলের উপর তুলে দিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়।
আব্দুর রুশান মোহাম্মদ ধীরে ধীরে হাত বাড়িয়ে কাঠের বাক্সটার ঢাকনাটা তোলেন। পুরোনো কাঠের গন্ধে যেন একসঙ্গে শত বছর পুরোনো গল্প উঠে আসে। ভিতরে গুছিয়ে রাখা ছোট ছোট খাম, কিছু হলুদ হয়ে যাওয়া কাগজ, আর কিছু কাঁপা হাতে লেখা চিঠি।
তিনি একটির পর একটি চিঠি তুলে নিতে থাকেন। প্রতিটি খামে খুব যত্নে আবেগ তুলে রাখা। এসব যত্নের আবেগ কখনো আব্দুর রুশান মোহাম্মদ পর্যন্ত পৌঁছায়নি।
তিনি প্রথম চিঠিটা বের করেন। কাগজ নরম, ভাঁজে ভাঁজে ছিঁড়ে যাওয়ার উপক্রম। কাঁপা কাঁপা হাতে লেখা। এরপর দ্বিতীয় চিঠিটা, তারপর আরেকটা....
এভাবেই পর পর প্রতিটা চিঠি খুব যত্নে আগলান। চিঠিগুলো যেন একেকটা সময়ের বুকচেরা দলিল। ভালোবাসা, অভিমান, অসহায়ত্ব আর অদ্ভুত এক নিঃসঙ্গতার ছাপ স্পষ্ট প্রতিটা শব্দে।
আব্দুর রুশান মোহাম্মদের চোখ কঠিন হয়ে ওঠে। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলেন। তিনি কি জানতেন তুহুরার এই অনুভূতি, অস্বীকার তো করা যায় না! তিনি তো আরো কতো কিছুই জানতেন তবে সে জানাতে আর এগোতে চাননি। এড়িয়ে গেছেন এমন কতো কি!
আব্দুর রুশান মোহাম্মদ ধীরে ধীরে বাক্সটা বন্ধ করেন। মুখে শূন্যতা, কিন্তু চোখে আগুন। তিনি চোখ বন্ধ করে শুধু সময়কে পিছিয়ে নেন। ক্যালেন্ডার যেন পঁচিশ ছাড়িয়ে উনসত্তরে ঠেকলো।
________
চলবে.... ❤️