নির্বাসিত কৃষ্ণচূড়া — পর্ব ২০
লেখক: সাদিয়া তিন্তি · বিভাগ: রহস্য · পর্ব ২০ · ৪৭ পর্বের মধ্যে ২০
হিয়া আঁতকে উঠে। হাত সরাতে যাবে, তখনই ফিসফিস করে ওর কানে কেউ বলে, “আমি তূর্য! চুপ!”
হিয়া বিস্ময়ে পেছনে ঘুরে তাকায়। অন্ধকারে একটা ছায়াময় মুখ। কিছুটা আলো পড়তেই বোঝা যায়, তূর্য সত্যিই এখানে! দুজনের চোখ আটকে যায় একে অপরের মুখে। এক মুহূর্ত চুপচাপ, তারপর হিয়া ফিসফিস করে বলে, “তূর্য ভাই আপনি এখানে?”
তূর্য পাল্টা প্রশ্ন করে, “তুই এখানে কেন?”
তারা দুজনই নিজের জায়গায় থেমে যায় এক মুহূর্ত, তারপর হঠাৎ হেসে ফেলে দুজনই। যেন সাথে সন্ন্যাসী সেজে চুরি করতে গিয়ে, ধরা পড়া দুজন চোর।
হিয়া হাসি আটকে বলে, “তুহুরা আর প্রকৃতির ব্যাপারে আর কিছু তথ্য পাই কিনা তাই খুঁজতে আসা?”
তূর্য হেসে বলে, "আমি ও এটাই ভেবে এসেছি। বেশি সময় এখানে থাকা যাবে না। আগে খুঁজতে থাক, যদি কিছু পাওয়া যায়।"
হিয়াও মাথা নেড়ে সম্মতি জানিয়ে কাজ শুরু করে। তূর্য এক কোণে কাঠের খাটের নিচে খুঁজতে শুরু করে, হিয়া পিউয়ের কাছে ফিরে যায়।
পিউ নিজেও তূর্যকে দেখে বিস্মিত। সবাই যেন একই পথের পথিক। তাই আর ভাবনা বাড়ায় না।
চিলেকোঠার বাতাস যেন এবার একটু গাঢ় হয়। জানালার ফাঁক গলে চাঁদের আলো এসে পড়ে পুরোনো কাঠের মেঝেতে। মেঝেতে ছায়া পড়ে চারদিকে অদ্ভুত এক ছন্দ তোলে। একটা পুরোনো দড়ির দোলনা এক পাশে দুলে উঠেছে, যেন কেউ সবে ছুঁয়ে দিয়ে গেছে।
এক কোণ থেকে হিয়া একটা পুরোনো কাঠের বাক্স টেনে বের করে। ওপরে ধুলোর আস্তরণ। এটা খুব সেকেলে ধরনের গয়নার বাক্সের মতো দেখতে। পুরনো একটা তালা ঝুলছে বাক্সটাতে।
হিয়া ধুলোমাখা বাক্সটার দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। একটুও না নাড়িয়ে শুধু চোখে মেপে দেখে। তারপর নিচু গলায় বলে, “পিউ, তূর্য ভাই… তোমরা একটু এসো তো।”
পিউ আর তূর্য দ্রুত হিয়ার ডাকে সাড়া দিয়ে ওর পাশে এসে দাঁড়ায়। হিয়া তখন টর্চের আলোটা বাক্সটার ওপর ধরে রাখে।
তূর্য নিচু হয়ে বাক্সটার চারদিক ঘুরে দেখে। সে গম্ভীর গলায় বলে, "তালাটা বেশ পুরনো, কিন্তু জং ধরেনি… মজবুত এখনো। আর বাক্সটার কাঠও শক্তপোক্ত। এটা সামান্য কিছু রাখার বাক্স না। আদিম যুগে এমন বাক্সে গয়না রাখতো।"
পিউ চোখ বড় করে ফিসফিস করে বলে, “এটা কি গয়নার বাক্স? গয়না লুকানো! ”
হিয়া আস্তে করে বলে, “যেটাই হোক, এটা এখানে খোলার ঝুঁকি নেওয়া ঠিক হবে না। তালাটা ভাঙতে হবে। জানোই তো, বড়দাদার ঘুম খুব পাতলা। ঘুম না এলে সিঁড়ি দিয়ে উঠেন-নামেন। যদি এখন এসে পড়েন…”
তূর্য মাথা নাড়ে, "এটা নিয়ে আমার ঘরে যাওয়াটা সেফ। ওখানেই খোলা যাবে।”
পিউ একটু শঙ্কিত গলায় বলে, “কিন্তু তালা খোলা তো হয়নি এখনো, এটা তো ভাঙতে হবে। নিচে গিয়ে ভাঙবে কিভাবে? শব্দে যদি সবাই উঠে যায়?”
তূর্য বলে, “তালা পরে খোলা যাবে। ওটায় এতো শব্দ হবে না। ছোট একটা তালা। এগুলো এতো মজবুত হয় না। আপাতত বাক্সটা নিয়ে নিচে যাই। হিয়া, আমি সামনে, তুই পেছনে থাক। পিউ, তুই নিচের দিকটা দেখে নিস, কেউ যেন হঠাৎ উপরে না চলে আসে।”
পিউ বলে, "কেউ আসবে না। মিম নিচে পাহারা দিচ্ছে।"
তূর্য একবার গলা বাড়িয়ে আলিফকে ডাকে। আলিফ দরজার বাইরেই পাহারা দিচ্ছিল। তূর্য আলিফকে আগে যেতে বলে ঘরের দিকে। এরপর নিজের হাতে বাক্সটা তুলে হাটা শুরু করে। হিয়াকে বলে, "ঘরটা যেভাবে তালা দেয়া ছিল ঠিক সেভাবেই রেখে আসিস।"
হিয়া শুধু মাথা নাড়িয়ে সম্মতি দিয়ে তূর্যর পিছু চিলেকোঠা থেকে বেরিয়ে যায়। এর তালাটা আগের অবস্থায় ঠিকঠাক বসিয়ে দিয়ে, ধুলোমাখা দরজায় পায়ের ছাপটা হাতের আঁচলে একটু মুছে দেয়।
তূর্য ধীরে ধীরে বাক্সটা নিয়ে নিজের ঘরের দিকে এগিয়ে যায়। সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় তার পায়ে কোনও শব্দ যেন না হয়, এতে যেন তার সর্বোচ্চ সচেতনতা। হিয়া পেছনে পেছনে হাঁটে, মুখে কোনো শব্দ নেই শুধু চোখে একরাশ কৌতূহল।
ঘরে ঢুকেই তূর্য বাক্সটা টেবিলের ওপর রাখে। এদিকে পিউ নিজের ফোন থেকে মিমকে মেসেজ করে তূর্যর ঘরে আসতে বলে।
কয়েক মিনিটের মধ্যে মিম ঘরে ঢুকে পড়ে। মিমের মুখে বিস্ময়, চোখে আগ্রহ। এর কিছু সময় পর আলিফ দরজাটা ভালো করে ভেতর থেকে বন্ধ করে ঘরে ঢোকে। সবাই মিলে কাঠের ছোট বাক্সটাকে ঘিরে দাঁড়ায়। ঘরের একমাত্র টেবিলের ওপরে রাখা হয়েছে বাক্সটা। টেবিলের চারদিকে মৃদু আলোয় ওদের মুখগুলো অদ্ভুতভাবে আলোকিত। এছাড়াও সকলের চোখ চকচকে হয়ে উঠেছে জিজ্ঞাসা, উত্তেজনা আর অজানার হাতছানিতে।
তূর্য এক হাতে তালাটার মাথা স্পর্শ করে। সেটা ঠান্ডা, ধুলোয় ভর্তি, কিন্তু জং নেই। হিয়া নিচু হয়ে একটু ভালো করে দেখে বলে, “এখানে কিছু খোদাই করা আছে... খুব অস্পষ্ট...”
মিম এগিয়ে এসে বলে, “কোথায় দেখি? এটা মনে হচ্ছে কোনো নাম... আরবি কি না কে জানে। উর্দু হতে পারে।”
তূর্য হালকা গম্ভীর গলায় বলে, “যদি এটা কারও গোপন ইতিহাস হয়, তাহলে আমরা যা ধরছি, তার চেয়ে অনেক গভীর কিছু থাকতে পারে ভিতরে।”
এক মুহূর্ত নিস্তব্ধতা। সবাই বাক্সের দিকে তাকিয়ে থাকে। একটানা কয়েক মুহূর্ত নীরবতায় কাটে। সবাই নিঃশ্বাস চেপে কাঠের বাক্সটার দিকে তাকিয়ে থাকে। ঘরের বাতাস ভারী হয়ে ওঠে অজানার গন্ধে। তূর্য হঠাৎ একটু সরে দাঁড়িয়ে আলমারির ওপর থেকে একটা পাতলা, চ্যাপ্টা স্ক্রুড্রাইভার তুলে আনে। সেটা হাতে নিয়ে তালার দিকে এগিয়ে যায়। “তালা ছোট, কিন্তু মজবুত,” সে নিচু গলায় বলে। “কিন্তু চেষ্টা করলে ভাঙা যাবে। শব্দ যেন বেশি না হয়, সবাই চুপ থেকো।”
সে আস্তে আস্তে তালাটার ফাঁকে স্ক্রুড্রাইভারটা ঢুকিয়ে চেপে ধরে। প্রথম ধাক্কায় তালা নড়ে না। তূর্য ধৈর্য ধরে আবার চেষ্টা করে। বাকিরা নিঃশব্দে তাকিয়ে আছে তার দিকে। একদিকে টান, আরেকদিকে চেপে ধরার কৌশলে সে তালাটাকে দুলিয়ে তুলে।
কয়েক মিনিটের মধ্যে তালার গায়ে চাপ পড়তে শুরু করে। একটা কর্কশ শব্দে তালাটা ছিঁড়ে পড়ে যায়। সবাই একসাথে একটু কেঁপে ওঠে।
পিউ ফিসফিস করে বলে, “ভেঙে গেছে!”
তূর্য ধীরে ধীরে তালাটা সরিয়ে টেবিলের একপাশে রাখে। এরপর বাক্সটার ঢাকনায় হাত রাখে। তার মুখে কৌতূহল আর উত্তেজনার মিশ্র ছায়া। সে নিচু গলায় বলে, “তোমরা রেডি?”
সবাই চুপচাপ মাথা নাড়ে। তূর্য বাক্সটার ঢাকনা তুলতে শুরু করে…পুরোনো কাঠের ঢাকনায় কেঁপে ওঠে একটুখানি শব্দ, আর সঙ্গে সঙ্গে একটা হালকা ধুলোর গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে ঘরের বাতাসে। সকলে যেন নিঃশ্বাস নিতে ভুলে যায় মুহূর্তটা ধরে রাখতে।
বাক্সের ভেতরের জিনিসগুলো ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়। প্রথমেই চোখে পড়ে অনেকগুলো খামে মোড়ানো চিঠি, যেগুলো স্পষ্টই কখনো পোস্ট করা হয়নি। প্রতিটাতে হাতের লেখা, মাঝে মাঝে ছিঁড়ে যাওয়া কাগজের প্রান্ত, কিছু খাম খুলে রাখা। কিছু চিঠি খোলা, ভাঁজ করা, কালি ঝাপসা হলেও কিছু শব্দ এখনো পড়া যায়। আর চিঠি গুলোর নিচে পড়ে আছে একটা রুপোলি পায়েল, পুরনো হলেও ঝকঝকে। পাশে একটা ছোট চাবি, কালচে হয়ে গেছে কিন্তু এখনও দৃঢ়।
চিঠিগুলোর পাশে একমুঠো কাঁচের চুড়ি। সবুজ, বেগুনি, আর হালকা গোলাপি। এত পুরনো হয়ে গেছে যে কিছু ভেঙে গেছে, তবুও বেশিরভাগই অক্ষত। একটা ছোট খোপার কাঁটা, পুরোনো ঢাকাই স্টাইলে, তাতে ধুলোর স্তর জমে আছে, কিন্তু সৌন্দর্য হারায়নি। আর বাড়তি পড়ে আছে কিছু সুকনো ফুলের পাপড়ি, সৌন্দর্য ঠিক এভাবে হারিয়েছে যে ধরা যাচ্ছে না ফুলের নাম।
হিয়া অবাক গলায় ফিসফিস করে, “এগুলো তো… কারও ব্যক্তিগত জিনিস…।”
মিম চোখ বড় করে বলে, “কেউ এমন চিঠি কেন আটকে রাখবে যেগুলো কোনদিন পোস্ট করা হয়নি…”
তূর্য চুপ করে থাকে, চোখে চিন্তার ছায়া। পিউ নিচু গলায় বলে, “কার? কার এই জিনিসগুলো? প্রকৃতি কি?”
আলিফ গম্ভীর হয়ে বলে, "তুহুরারও হতে পারে কিংবা দাদির!"
ঘরে নেমে আসে এক পিনপতন নীরবতা। বাকি চিঠিগুলোর মধ্যে যে কয়েকটা খামছাড়া, সেগুলো একে একে খোলা হয়। ধুলোমলিন পাতাগুলো খুব সাবধানে ছোঁয়া হয়। কালির লেখা ঝাপসা, কাগজ কিছুটা ছেঁড়া, কিন্তু কাগজের প্রতিটি কোণ যেন কোনো না কোনো স্মৃতির ধারক। হঠাৎ, হিয়ার চোখ পড়ে ছড়ানো খোলা চিঠির এক কোণায় লেখা এক নামের ওপর, “শঙ্খ”।
হিয়া চিঠিটা হাতে তুলে নেয়। তূর্য এবার চিঠিটা হিয়ার থেকে নিয়ে পড়তে চেষ্টা করে, কিন্তু লেখাগুলো বেশিরভাগই অস্পষ্ট। তারপরও একটা নির্দিষ্ট অংশে শব্দগুলো একটু বেশি অস্পষ্ট, চিঠিতে যতোটুকু বোঝা যায় এটায় লেখা,
"শ্রদ্ধেয়া তুহুরা আপা,
সর্বাগ্রে আমার আন্তরিক সালাম গ্রহণ করিবেন। আপনার কল্যাণে এবং মহান প্রভুর অশেষ রহমতে আমি সুস্থ ও শান্তিপূর্ণভাবে দিন যাপন করিতেছি। আশাকরি আপনিও সৃষ্টিকর্তার রহমতে শান্তিতে ও সুস্থতায় আছেন। আমি ‘… (অস্পষ্ট) …”
আপাকে জানাইতেছি যে, আমি বর্তমানে কলিকাতার এক খ্যাতনামা মহাবিদ্যালয়ে ভর্তি হইয়াছি। এখন হইতে এইখানেই আমার শিক্ষাজীবনের পরবর্তী অধ্যায় আরম্ভ হইল। “…..(অস্পষ্ট)....” আপা, "....(অস্পষ্ট) ...." জীবনের এক দুঃসহ সময়ে আপনি যেভাবে আমার সহায় হইয়াছিলেন, তাহা আমি কোনদিন ভুলিবো না।
আপনি একদা বলিয়াছিলেন, “আমার সঙ্গে যোগাযোগ রাখিও চিঠি লিখিও।” আজ সেই আদেশ পালন করিবার জন্যই আপনাকে এই পত্র লিখিতেছি। “…. (অস্পষ্ট)....” আমার প্রতি আপনার যে ঋণ, তাহার যথাযথ প্রতিদান আমি কোনোদিন দিতে পারিব না, তথাপি আমার পক্ষ হইতে এই সামান্য প্রার্থনা ও কৃতজ্ঞতাই আপনার প্রতি চিরঋণস্বীকৃতির এক ক্ষুদ্র নিদর্শন।
আপনার মঙ্গল ও সুস্থতা কামনায় আমি সদা প্রার্থনা করি। আপনি যেন সর্বদা শান্তিতে, সম্মানে ও সুখে জীবন যাপন করেন, এই কামনা করিয়া পত্রের ইতি টানিতেছি।
ইতি,
আপনার চিরকৃতজ্ঞ,
শঙ্খ”
আর চিঠির পেছনে একটা পুরনো ঠিকানা, “কলিকাতা, বউবাজার, নর্থ কলেজ স্ট্রিট…” (বাকি অংশ অস্পষ্ট)।
মিম চোখ বড় বড় করে বলে, “তাহলে এই বাক্সটা তুহুরার?"
হিয়া ফিসফিস করে, "কলকাতা! শঙ্খ আবার কে?"
আলিফ পায়েলটা হাতে নিয়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে দেখতে বললো, “বাকি চিঠি গুলো না পড়ে কিছুই বলা যাচ্ছে না।”
পিউ মাথাটা চুলকে জিজ্ঞেস করলে, “চাবিটা দিয়ে কি খোলে, ভাবছো?”
চাবিটার দিকে তাকিয়ে তূর্য মাথা নাড়ে, “চাবি দিয়ে যাই করুক এই চিঠিগুলো পড়লে, মনে হচ্ছে অনেক কিছু খুলবে।”
হঠাৎ পুরো ব্যাপারটা যেন ধীরে ধীরে জট বুনতে থাকে। এক রহস্যময় তুহুরা, কলকাতার কলেজে ভর্তি হওয়া এক এক অজ্ঞাত চরিত্র শঙ্খ, অপ্রকাশিত চিঠির স্তূপ, রুপোলি পায়েল, কাঁচের চুড়ি।
চুপচাপ সবাই বসে আছে ঘরের ভেতর, সবাই যেন ইচ্ছাকৃতভাবে নিঃশ্বাস নেওয়া বন্ধ করে রেখেছে। বাক্সের সেই পুরনো ধুলোমাখা চিঠিগুলো একটা একটা করে যত্নে বাইরে আনছে।
খোলা চিঠিগুলোর মধ্যে বাকি চারটি চিঠি স্পষ্টভাবে মিনু রহমানের লেখা। তার হাতের লেখা এলোমেলো, কখনো খুব গুছানো আবার কোথাও কোথাও জলের দাগে ছড়িয়ে গেছে কালি। প্রতিটি চিঠিতে একটা দীর্ঘশ্বাস লুকানো আছে, একটা একাকিত্বের হাহাকার। সমগ্র চিঠিটা বোঝার উপায় নেই। সময়ের সাথে লেখাগুলো ঝলসে গেছে। কাগজটা নরম হয়ে ফেটে চিরে গেছে।
এক চিঠিতে লেখা মিনু রহমান লিখেছেন,
“প্রিয় তুহুরা বুবু,
তোমাকে লিখছি, ঠিক জানি না কেন, অথবা জানি বলেই লিখছি। মনে হচ্ছে, আর না বললে বুকটা ফেটে যাবে। রাজশাহীতে ভালো আছি বললে সেটা হবে চূড়ান্ত মিথ্যে। আসলে এখন “ভালো থাকা” বলতে কী বোঝায়, সেটাই যেন ভুলে গেছি। চারপাশে জীবন চলে, মানুষ হাসে, বাঁচে, কিন্তু আমি যেন সময়ের বাইরে পড়ে আছি একটা থমকে যাওয়া ঘড়ির কাঁটার মতো।
হাসান রুক্ষ হল কেন? সে আর কথা বলে না, না বলে থাকা তার নতুন অভ্যাস। আর আমি? আমি তো প্রতিদিন একটু একটু করে চুপ হয়ে যাচ্ছি। আমাদের সংসারটা এখন একটা বন্ধ জানালার মতো, যার বাইরে আলো আসে না, ভেতরে হাওয়া ঢোকে না। শুধু জমে থাকা শ্বাসরুদ্ধ একঘেয়েমি।
বুবু তুমি একদিন বলেছিলে "সব কষ্ট সময়ের সঙ্গে পাল্টে যায়।"
কিন্তু আজ বলতে ইচ্ছে করছে, আমার কষ্টটাই যেন সময় হয়ে গেছে। প্রতিটা মুহূর্তে, প্রতিটা নিঃশ্বাসে ওটাই চলমান, সেটাই একমাত্র স্থির সত্য। কষ্টটাই এখন ঘড়ির টিকটিকি হয়ে কানে বাজে, ঘুমের মধ্যে নিঃশব্দে হেঁটে আসে, আবার সকালেও পাশে শুয়ে থাকে।
চিঠিতে কিছুই ঠিকমতো বলা যায় না। কথাগুলো যতটা না অস্পষ্ট, তার চেয়েও বেশি অপর্যাপ্ত। চিঠির শব্দগুলো তো তোমার চোখের সামনে বসে বলা “তুমি”-র উষ্ণতা বহন করতে পারে না।
তুমি ছিলে আমার আশ্রয়… একমাত্র আশ্রয়। একসময় তুমি জানতেও না, তবু তুমি ছিলে আমার ভিতরের ঝড় থামিয়ে দেওয়ার মতো নিরাপত্তা। এখন? এখন তো কিছু নেই। কেবল এই কাগজটা…এই কাগজটাই আছে, আর আমি এই কাগজের প্রান্তে একা বসে কাঁপছি, ভেতরের সবটুকু নিঃসঙ্গতা দিয়ে তোমাকে ডাকছি।
ইতি
তোমার মিনু”
আরেকটাতে,
“তুহুরা বুবু,
তুমি কি আমাকে এখনো মনে রাখো?
তুমি কি এখনো কখনো পুরনো দিনের কথা ভাবো, যেমনটা আমি প্রায়ই ভাবি?
আজ অনেক কষ্টে এই চিঠিটা লিখতে বসেছি। জানি না ঠিকঠাক তোমার হাতে পৌঁছাবে কিনা, বা তুমি আদৌ পড়বে কিনা। তবুও লিখছি। কারণ এই ক’টা শব্দ না বললে আমার ভেতরটা যেন হাঁপিয়ে উঠবে। মনে হয় বুকের মধ্যে একরাশ কষ্ট জমে আছে, যা কাউকে বলা যায় না। শুধু তোমাকেই বলা যেত।
হাসান এখন আর আগের মতো নেই, বুবু। সে যেন দিনে দিনে আরও অচেনা হয়ে উঠছে। আগের মত হাসি নেই, কথাও বলেনা তেমন। ওর চোখে আমার জন্য আর কোনো উষ্ণতা খুঁজে পাই না। মাঝে মাঝে মনে হয়, আমি এই সংসারে আছি ঠিকই, কিন্তু যেন অদৃশ্য হয়ে গেছি। আমি তার পাশে থাকি, অথচ সে বুঝতেই চায় না।
সে কি আমার অস্তিত্বটাই ভুলে গেছে?
তুমি যেদিন আমাকে সবুজ শাড়িটা দিয়েছিলে, মনে আছে? তুমি হেসে বলেছিলে, “এই শাড়িটা পরলে তোকে রানীর মতো লাগবে।” সেই শাড়িটা এখনো আমার আলমারিতে তুলে রাখা। মাঝে মাঝে একা একা বের করে দেখি, ছুঁয়ে দেখি, একটু চুপ করে বসে থাকি তার পাশে। শাড়িটা যেন তোমার স্পর্শের মতো, যেন সেই দিনগুলোর একটা টুকরো এখনও আমার সঙ্গে থেকে গেছে।
এখন ভাবি, বাবার বাড়ি থেকে যেদিন চলে এলাম, সেদিনই বুঝি আমার ভালো দিনগুলোও চলে গেল।
প্রতিদিনের ঘোরলাগা এক একঘেয়ে জীবন, যেখানে রঙ নেই, উষ্ণতা নেই, এমনকি কারো চোখেও আমি নেই। ছোট ছোট কথার অভাবে বুঝি মানুষ ভেতর থেকে খসে পড়ে।
ইতি
তোমার মিনু”
মিম নিচু গলায় বলে, "দাদি তাহলে দাদা ভাইয়ের সাথে সুখী ছিলেন না?”
পিউ ধীরে ধীরে বলে, “সেটা তো স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে।”
পর পর বাকি চিঠি গুলোও শেষ হলো। তূর্য আবার চাবিটার দিকে তাকিয়ে থাকে। প্রতিটা চিঠি চিৎকার করে মিনু রহমানের অসহায়ত্ব প্রকাশ করছে। যে অসহায়ত্ব তিনি শুধু মাত্র প্রকাশ করেছিলেন তুহুরার কাছে। তাহলে তুহুরার অসহায়ত্বের প্রকাশ কোথায়?
কার কাছে?
_______________
চলবে......❤️