নির্বাসিত কৃষ্ণচূড়া — পর্ব ০৭
লেখক: সাদিয়া তিন্তি · বিভাগ: রহস্য · পর্ব ০৭ · ৪৭ পর্বের মধ্যে ৭
ভাবনারা হিয়াকে এবার অত্যাচার করছে। সে ঠিকঠাক কোনো বাহানাই জোগাড় করতে পারছে না। হিয়া বিছানার কোণে পা গুটিয়ে বসে, জানালার বাইরে তাকিয়ে আছে অপলক। অন্ধকারে শহরের শব্দ চাপা পড়েছে, শুধু মাঝেমধ্যে ভেসে আসছে দূরের গাড়ির হর্ণ আর রাতজাগা কুকুরের ডাক। তূর্যর শেষ কথাগুলো বারবার মনে পড়ছে, “তোকে নিয়ে যাওয়ার মত কোন বাহানা আমার কাছে নেই।”
হিয়ার মন যেন কেমন এক অস্থিরতায় ভরে ওঠেছে। তাকে যেতে হবে। এই যাত্রায় তার উপস্থিতি শুধু ইচ্ছা নয়, একটা দাবি। তূর্য তাকে ছাড়াই প্রকৃতির খোঁজে যাবে, এটা যেন কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না। হঠাৎ একটা হালকা বাতাস পর্দা দুলিয়ে দেয়। হিয়া চোখ বন্ধ করে নিঃশ্বাস টানে। ঠিক তখনই যেন মাথার মধ্যে কোথা থেকে একটা ছোট্ট বুদ্ধির আলো জ্বলে ওঠে। “মিম!” আশার মতো একটা নাম মাথায় ধাক্কা মারে।
হিয়ার চোখে মুহূর্তেই ঝিলিক দেয় একরকম আলো। সে বিছানা থেকে উঠে দাঁড়ায়, টেবিলের পাশের চেয়ারটায় বসে মিম ফোনে কিছু করছিল।
হিয়া মিমের দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলে, “হ্যাঁ... এটাও তো একটা উপায় হতে পারে। যদি মিমকে প্ল্যানে আনা যায়, যদি ওর বান্ধবী রাখা যায় বাহানার আড়ালে... তাহলেই আমি যেতে পারি তূর্য ভাইয়ের সাথে!”
গায়ে হালকা কাঁটা দেয় উত্তেজনায়। মনের ভেতরে একরকম তৃপ্তির ঢেউ বয়ে যায়। যেন কোনো অন্ধকার গলিতে হঠাৎ আলো জ্বলে উঠেছে। মুখে একরকম ছেলেমানুষি হাসি আসে, আবার মুহূর্তেই সেটা চাপা দিয়ে ফেলে। হিয়া মিমের দিকে এক পা এগিয়ে যায়, তারপর থেমে গিয়ে বলে, "মিম... একটা কথা বলবো?"
মিম ফোন থেকে চোখ তুলে তাকায়, "বল, কি হইছে?"
হিয়া একটু দ্বিধা করে, তারপর ধীরে ধীরে বলে,
"আমি কালকে চাঁদপুরে যাচ্ছি। তূর্য ভাইয়ের সাথে।"
মিম ভ্রু কুঁচকে বলে, "কি?! তূর্য ভাইয়ের সাথে? তুই? চাঁদপুর? হঠাৎ কেন?"
হিয়া গলা নিচু করে, যেন জানলার হাওয়াও না শুনতে পায় এমন গোপন স্বরে বলে,
“দিপ্তী দেবীকে খুঁজে পেয়েছেন উনি। প্রকৃতির বান্ধবী... তোর মনে আছে, যেইসব প্রশ্নের উত্তর আমরা খুঁজছিলাম?”
মিমের চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে যায়। হিয়ার চোখে এখন অদ্ভুত এক ঝলকানি। অভিযানের আগে এক ধরনের ঘোর।
মিম ধীরে বলে, “তাই তো বলি!.. এখন বুঝলাম কেন এত অস্থির হয়ে আছিস। কিন্তু তুই যাবি কিভাবে?
যাবি তো যাবি কিন্তু আমার মাথায় এই বিষয়টাই পরিষ্কার হচ্ছে না যে তূর্য ভাইয়ের মতো ওমন রগচটা লোকের সাথে তোর এতো সখ্যতা কিভাবে হলো!"
হিয়া হেসে বলে, “দেখ, তা যেভাবে হয়েছে, তা হয়েছে। এখন আমার চাঁদপুরে যাওয়ার একটাই উপায়, তাও তোর মাধ্যমে। তোর একটা বান্ধবী আছে না ঢাকায়? তমা? প্লিজ…. ওকে ম্যানেজ কর। কালকের দিনটা প্লিজ ওর বাসায় থাক। জাস্ট ভোর থেকে সন্ধ্যা অব্দি। প্লিজ মিম মানা করিস না। আমি বলব আমি তোর সাথে ওর বাসায় যাচ্ছি। একটা গেট টুগেদার আছে।”
মিম মুখটা একটু চিন্তায় ভরিয়ে বলে, “আচ্ছা... মানে বুঝতেই পারছিস। তুই আমাকে বলির বকরা বানাচ্ছিস! আর যদি বাড়ির কেউ ফোন করে, তোকে চায়?”
হিয়া বলে, “আমি সব ম্যানেজ করব। কিন্তু তুই যদি পাশে থাকিস, ওরা কিছু বলবে না। দেখ, ফোন দেওয়ার মতো শুধু দাদা ভাই ফোন দিতে পারে। কিন্তু দাদা ভাই ফোন দিলে সরাসরি আমাকে ফোন দিবে। শুধু ঝামেলা মিনু দাদু। মিনু দাদু যদি তোকে ফোন দিয়ে আমাকে চায় তুই আমাকে কনফারেন্স করে নিস।”
মিম কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। হিয়ার মুখে একরকম এক্সাইটমেন্ট, এমন কিছু পাওয়ার, জানার আগ্রহ, যেটা শুধুই আবেগ নয়।
অবশেষে মিম হাসে, “ঠিক আছে। আমি কালকে সকালে বের হব তোর সাথে। আর তুই চিন্তা করিস না। তমাকে ফোন দিয়ে কথা বলছি। কিন্তু প্লিজ টাইমলি ফেরত আসবি। নইলে আমরা তিনজনই ফাঁসবো।”
হিয়া তৃপ্তির নিঃশ্বাস ফেলে বলে, “তুই না থাকলে কিছুই হতো না মিম... তুই জানিস না, আমার মনে হচ্ছে এটা একটা নতুন যাত্রার শুরু!”
মিম চোখ টিপে বলে, “তুই কিন্তু একদম সিনেমার হিরোইনদের মতো ভাগার প্লান করেছিস। দেখ আমার ভাইকে হিরো বানিয়ে তার গলায় আবার ঝুলে পরিস না।”
হিয়া মুখ ভেংচি দিয়ে বলে, "তোর যে ভাই ওটা তুই রাখ। লম্বা ফাটা বাঁশ একটা।"
মিম উচ্চস্বরে হাসে শুধু। হিয়া জানালার দিকে তাকিয়ে আবার নিঃশ্বাস টানে। বাইরে রাত গভীর, কিন্তু তার চোখে ভোরের আলো ফোটার মতো একটা আত্মবিশ্বাস, একটা প্রতিজ্ঞা, প্রকৃতিকে খুঁজে পাওয়া অবধারিত।
আলোর আভা এখনও আকাশে মিশে ওঠেনি ঠিকভাবে। ঘরজুড়ে হালকা আঁধার, আর তার ভেতরেই হিয়া নিঃশব্দে তৈরি হয়ে নিচ্ছে। ধীরে ধীরে চুল বেঁধে নিচ্ছে, মুখে হালকা একটা শান্তির ছায়া। ভিতরে উত্তেজনা থাকলেও, বাইরে যেন সবকিছু নিঃশব্দ, নিয়ন্ত্রিত। মিমও প্রস্তুত। দুজনেই যেন নিঃশব্দ ষড়যন্ত্রে জড়িয়ে পড়েছে।
তূর্য আগে আগেই বেরিয়ে গেছে। হিয়া মিনু রহমানের ঘরের পাশ দিয়ে পা টিপে টিপে চলে আসে দরজার কাছে। মিম নিচু গলায় বলে, "দাদু কিন্তু হঠাৎ ঘুম থেকে উঠে পড়লে আমিই ফাঁসবো! হাজারটা প্রশ্ন করবে।"
হিয়া কানে কানে ফিসফিস করে, "চিন্তা করিস না, মিনু দাদু আজ রাতেই ঘুমের ওষুধ খেয়ে ঘুমিয়েছে। এখন উনি ঘুমের রাজ্যে, স্বপ্নেও ভাবতে পারবে না আমি চাঁদপুর যাচ্ছি! আর তুই তোর বান্ধবীর বাড়িতে গিয়ে তোর মাকে কল করে দিস একবার। এতে আগেই সমস্যা এড়ানো যাবে।"
দুজনেই হালকা হেসে ফেলে। হঠাৎ মোবাইল ভাইব্রেট করে ওঠে। তূর্যর মেসেজ, "ওয়েট করছি বাইরে।" হিয়া দ্রুত পায়ে আব্দুর রবিউল মোহাম্মদের কাছে যায়, "দাদা ভাই, আমি মিমের সাথে মিমের বান্ধবী তমার বাসায় যাই? সন্ধ্যার আগেই ফিরে আসব। ফোন রিসিভ না করলে দুশ্চিন্তা করো না, তমার বাসার নেটওয়ার্ক খারাপ।"
আব্দুল রবিউল মোহাম্মদ খবরের কাগজে মনোযোগ বজায় রেখে নিশ্চিন্ত কণ্ঠে বলেন, "সারাদিন থাকতে হবে কেন? কোন অনুষ্ঠান আছে?”
মিম পাশ থেকে বলে ওঠে, "হ্যাঁ ছোট দাদা, আমার বান্ধবীর ভাইয়ের এনগেজমেন্ট, আমাকে অবশ্যই থাকতে বলেছে। একা তো আসলে যাওয়া হয়নি কখনো তাই ভাবলাম হিয়া আমার সাথে থাকলে আমার একটু ভালো লাগবে। তুমি প্লিজ দাদিকে বলে দিও। ঘুমাচ্ছে এখন বিরক্ত করতে চাইছি না।"
আব্দুর রবিউল মোহাম্মদ যেন অনায়াসে মেনে নিলেন। "ঠিক আছে, সাবধানে থাকিস তোরা। বাড়ি ফিরতে যেন রাত না হয়। একটু দেরি হলেও কল করে জানিয়ে দিবে, আমি গিয়ে দরকার হলে নিয়ে আসবো। একা যেতে পারবি তোরা?"
হিয়া আর মিম দুজনেই খুশিতে বলল, "হ্যাঁ পারবো। এখন যাই।"
এরপর তারা দুজনই বেরিয়ে গেল। হিয়া মিমের দিকে তাকিয়ে বললো, "এখনো সময় আছে, চাইলে পিছিয়ে যেতে পারিস।"
মিম হেসে বলে, "শুধু তুই সন্ধ্যার আগে বাড়ি ফিরিস তাহলেই হবে। তুই ঢাকায় পৌঁছে সবার আগে আমাকে কল করবি। আমি কিন্তু ঠিক তখনই তমার বাড়ি থেকে বের হবো।"
তারা দুজন গলির মোড়ের দিকে হেঁটে যায়। শহরের তখনো ঘুম ভাঙেনি ঠিকঠাক। তূর্য একটা রিক্সায় অপেক্ষা করছিল হিয়ার জন্য। এরপর হিয়া আর তূর্য রওনা হয় বাসস্ট্যান্ডের উদ্দেশ্যে।
লোকাল বাস। ঢাকা-চাঁদপুর এক্সপ্রেস। এই সকালে এর থেকে দ্রুতগামী আর কিছুই সম্ভব নয়। হিয়ার মনজুড়ে এখন অদ্ভুত এক ধ্বনি, উত্তেজনা, কৌতূহল আর এক টুকরো সাহস। জানালার পাশে বসে সে বাইরের দিকে তাকায়। চাঁদপুরের পথ, তার কাছে শুধু একটা গন্তব্য না, এটা তার নিজের একটা খোঁজ। নিজের ভেতরের প্রকৃতির হারিয়ে যাওয়া উত্তরগুলোর খোঁজ। আর বাসের জানালায় সেই আলোটা, ঠিক যেমনটা তার চোখে ছিল আগের রাতেও ভোরের আলোর মতো এক বিশ্বাস, এক যাত্রার শুরু।
কোলাহলে মাঝেও নিস্তব্ধতা। হিয়া আর তূর্য পাশাপাশি বসেও যেন দুজনেই তাদের নিজস্ব দুনিয়ায় আবদ্ধ। যা বহুদূর। দুজনের দুনিয়ার সিমানাও যেন দুজনেরই বেশ অপরিচিত। বাস ছাড়িয়ে গেছে অনেকখানি পথ। বাসটা কাঁপতে কাঁপতে এগিয়ে যাচ্ছে। জানালার ধারে বসে হিয়া চুপচাপ বাইরের দিকে তাকিয়ে থাকে। কুয়াশার মধ্যে রাস্তা, গাছের ছায়া, দূরের মাঠ সবকিছু এক অদ্ভুত কাব্যের মতো মনে হয়। তূর্য পাশে বসে, একহাতে সিটের হাতল ধরে রেখেছে, অন্যহাতটা কোলের উপর। সে মাঝে মাঝে হিয়ার দিকে তাকায়। হিয়ার চোখের নিচে হালকা ক্লান্তির রেখা, তবুও সেই মুখে এক নিরীহ শান্তি। তূর্য হঠাৎ নিচু গলায় জিজ্ঞাসা করল, "তোর খুদা পেয়েছে?"
হিয়া মুখ ফিরিয়ে মৃদু হাসল। "না তূর্য ভাই, ঠিক আছি।"
তূর্য আর কিছু বলল না। বেশ পথ পেরোলো। কিছু সময় পর বাসের ড্রাইভার বিরতি টানলেন। বাসের সবাই একে একে নিচে নামলো। তূর্য হিয়াকে একবার প্রশ্ন করলো শুধু, কিছু লাগবে কি-না। হিয়া অসম্মতি জানাতেই তূর্য নিচে নেমে এলো। দোকানের পাশে দাঁড়িয়ে বিস্কুট, চিপস, পানির বোতল আর একটা ছোট প্যাকেট চকলেট নিয়ে নিলো। ফিরে এসে চুপচাপ ব্যাগ খুলে সব জিনিস হিয়ার কোলের ওপর রাখল।
হিয়া অবাক হয়ে বলল, "এইসব কেন, তূর্য ভাই?"
তূর্য স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল, "কিছু না খেলে মাথা ধরে যাবে, রাস্তাটা লম্বা।"
হিয়া মাথা নিচু করে হাসল। সেই হাসি তূর্যের চোখে এক অজানা কোমলতা রেখে গেল বোধহয়। তূর্য চুপচাপ ভাবলো, সে কি সত্যিই দায়িত্ব নেওয়া শিখে গেছে? একটু পর হিয়া প্যাকেট থেকে চকলেট বের করে। চোখেমুখে সেই চেনা শিশুস্বভাবের উচ্ছ্বাস, যেন পুরো দুনিয়ার সুখ লুকিয়ে আছে এই ছোট্ট চকোলেটের টুকরোয়। খুটখুট করে মোড়ক খুলে এক কামড় দিয়ে মুখে দিল, তারপর একটুকরো ভেঙে তূর্যের দিকে বাড়িয়ে ধরল।
তূর্য মাথা নাড়ল, হালকা হাসল। চোখের ইশারায় বোঝাল, “না, ধন্যবাদ। আমার লাগবে না।” হিয়া কাঁধ ঝাঁকিয়ে আবার নিজের মনোযোগ চকলেটের দিকে ফিরিয়ে নিল। চোয়াল নড়ছে, ঠোঁটের কোনায় গলে যাওয়া চকোলেটের ছাপ, আর একরাশ তৃপ্তির ছায়া মুখে।
তূর্য অবাক চোখে শুধু হিয়ার খাওয়া দেখে যাচ্ছে। এই মেয়ের নাকি খুদা পায় নি! তূর্য যেন মুহুর্তে হিয়ার সাথে মিল পেল ওর পোষা খরগোশ ছানা এলিজা’র। ওই একইভাবে তো গাজর, পাতা, ফল কচকচ করে সাবার করে। বিনা বিরতিতে তার দাঁত গুলোকে ব্যস্ত রাখে। একটার পর একটা মুখে পুরতেই থাকে আর তূর্য মন্ত্রমুগ্ধের মত দেখে।
তূর্যর চোখ নরম হাসিতে ভরে উঠল, সে মনে মনে ভাবে। “একটা মানুষ আর এক খরগোশের মধ্যে এত মিল কীভাবে হয়?”
হিয়ার দিকে তাকিয়ে মনে হলো, এ এক অদ্ভুত আশ্রয়। না কোনো দাবি, না কোনো অভিযোগ, না কোনো প্রশ্ন। শুধু একরকম বোবা সঙ্গ, নীরব প্রশ্রয়, আর মিষ্টি শান্তি।
“এই শান্তি কি মায়া? নাকি বিপদ? নাকি দুই-ই?” তূর্যর ঠোঁটে খেলে গেল এক দুর্বোধ্য হাসি। এ আবার কেমন প্রশান্তি…।
বাসের জানালা দিয়ে হাওয়া ঢুকছিল। হিয়া শীতল হাওয়ায় কাঁপল, মন্ত্রমুগ্ধের টানা দৃষ্টিতে বিরতি টানলো এই কাঁপন। তূর্যের হাত মস্তিষ্কের কোনো নির্দেশনা ছাড়াই আস্তে করে বাসের জানালা বন্ধ করে দিল।
হিয়া এবার নড়ে উঠল। বিস্কিটের প্যাকেট ছেড়ে এবার বাসের জানালায় তাকালো। তূর্য ওর খেয়াল করছে? এমন যত্ন, এমন নিঃশব্দ সুরক্ষা… !
এটা কি ওর নতুন চোখ? হিয়া তো কখনোই এই তূর্যকে দেখেনি। তূর্য তো ওর চোখে রগচটা, বিরক্তিকর, কম কথা বলা, স্বার্থপর, জংলি শাঁড়। তাহলে হিয়ার পাশে বসা এই পুরুষ কে!
দুজনেই এরপর চুপচাপ বসে রইল। তূর্য জানালার বাইরে তাকিয়ে, আর হিয়া তার পাশের দিকে, সেই নির্ভরতার দিকে। শব্দ নেই, কোনো প্রকাশ নেই, কিন্তু সেই নীরব মুহূর্তে তাদের দুই হৃদয়ের মধ্যে যেন এক কোমল বন্ধন গড়ে উঠছিল। যেটা হয়তো ভরসার শুরু ..... একরকম চুপচাপ অনুভব।
বাস থামলো চাঁদপুর বাসস্ট্যান্ডে। মানুষজন নেমে গেলো একে একে। হিয়া আর তূর্যও নেমে পড়লো। হিয়ার চোখে এখনো কুয়াশার আবছা রেখা, তূর্য বাস থেকে নেমেই বাইরে এদিকে ওদিকে তাকিয়ে দেখে, যেন কাউকে খুঁজছে।
হঠাৎ দূরে একটা গাড়ি চোখে পড়লো তূর্যের। সাদা রঙের, চকচকে, জানালায় হালকা কালো ফিল্ম। গাড়ির সামনে সাদা কাগজে বড় করে লেখা অধ্যাপক দিব্যেন্দু রায়। গাড়ির পাশে এক মধ্যবয়সী ড্রাইভার দাঁড়িয়ে আছে, পাঞ্জাবি-পায়জামা পরা, চোখে ভদ্রতা। তূর্য চুপচাপ ঘুরে দাঁড়াল। হিয়াকে বলল, "দীপ্তি দেবীর ছেলে গাড়ি পাঠিয়েছে, চল।”
হিয়া অবাক হয়ে এদিকে ওদিকে তাকায়। এরপর দুজনেই এগিয়ে যায় গাড়ির দিকে। তারা সম্পূর্ণ পৌঁছানোর আগেই, ড্রাইভার এগিয়ে এসে বিনয়ী স্বরে বলল, “আপনারাই হিয়া ম্যাডাম আর তূর্য স্যার তো? দিব্যেন্দু স্যার আমাকে আপনাদের নিতে পাঠিয়েছেন।”
তূর্য হেসে মাথা নাড়ল। ড্রাইভার দরজা খুলে দিলো। হিয়া কিছু বলতে যাচ্ছিল, তূর্য ইশারায় থামিয়ে দিল।
গাড়ি ধীরে ধীরে বাসস্ট্যান্ড ছেড়ে বেরিয়ে গেল। বাইরে মানুষের ভিড়, দোকানের আলো, চায়ের কাপে ধোঁয়া, সব পেছনে ফেলে। হিয়া জানালার পাশে বসে চুপচাপ বাইরে তাকিয়ে থাকে। তূর্য তার পাশের সিটে বসে ফোনে কিছু লিখছে। হিয়ার চোখে এবার ক্লান্তি নয়, একরকম অভিমত, একরকম অজানা উত্তেজনা।
কখন যে সেই বাসের কুয়াশার রাস্তা ফেলে, তারা এখন অন্য এক যাত্রায় পা দিয়েছে তা যেন গুনতে গুনতে শেষ।
দূরে আলোকিত অন্য এক শহর, গাড়ির তীক্ষ্ণ গতি, আর বুকের ভেতর এক নরম উষ্ণতা নিয়ে গাড়ি ছুটে চলল দীপ্তি দেবীর বাড়ির দিকে।
গাড়িটি শহরের ব্যস্ততা পেরিয়ে ধীরে ধীরে এক শান্ত, ছায়াঘেরা পাড়ায় প্রবেশ করে। সেখানে একটি পুরনো, অথচ রুচিশীল দোতলা বাড়ি, লাল ইটের দেয়াল, কাঠের জানালা, আর বারান্দায় ঝুলন্ত বোগেনভেলিয়ার গাছ। বাড়ির চারপাশে ছায়া ফেলে রেখেছে বড় বড় আমগাছ ও কাঁঠালগাছ, যেন সময় এখানে একটু ধীর গতিতে চলে।
তূর্য আর হিয়া সামান্য থমকালো। হয়তো সময়ের বেড়াজালে কৌতহলী মন জড়িয়ে পড়ছে সংকোচের আবেশে। এরপর দরজার কড়া নাড়লো। মুহুর্তেই দরজা খুলে দিলেন এক মধ্য বয়স্ক নারী। মুখশ্রী দেবী প্রতিমার মতো। হাস্যোজ্জ্বল মুখে তিনি বললেন, "তোমরাই হিয়া আর তূর্য, ঢাকা থেকে এসেছো।"
তূর্য সম্মতি জানাতেই তিনি খুব যত্নে তাদের এগিয়ে নিলেন। "তোমরা আমার শাশুড়ি মায়ের সঙ্গে দেখা করতে এসেছ। আমি উনার বড় ছেলে দিব্যেন্দু রায়ের স্ত্রী পল্লবী।"
নারীটির অমায়িক আচরণ যেন দুজনকে খুব আপন করে গ্রহণ করল। তিনিই ওদের নিয়ে গেলেন দীপ্তি দেবীর ঘরে। খুবই ছিমছাম ঘর, তবে এক গভীর রুচি সম্পূর্ণ ব্যক্তির রুচির বহিঃপ্রকাশ ঘরের চারকোণে। দেয়ালে ঝুলছে পুরনো ছবি, বইয়ের তাক ভর্তি সাহিত্য ও গবেষণার বই। জানালা দিয়ে দেখা যায় বাগানের নানা রকম ফুলের গাছ, আর ঘরটার বারান্দায় বসার জায়গা, সব মিলিয়ে এক স্নিগ্ধ পরিবেশ। তূর্য আর হিয়া এবার পর্যবেক্ষণ করে নিল দীপ্তি দেবীকে। আরাম কেদারায় অর্ধশোয়া অবস্থায় বসে আছেন তিনি। চোখগুলো বন্ধ হাতে শক্ত করে ধরে বুকে জড়িয়ে রেখেছেন ‘রামায়ণ’।
কক্ষে প্রবেশ করে নারীটি খুব মৃদু কন্ঠেই দীপ্তি দেবীকে ডাকলেন, "মা দেখুন আপনার অতিথিরা চলে এসেছে।"
দীপ্তি দেবী যেন এই শব্দ শোনার অপেক্ষায় চোখ বন্ধ করে বসে ছিলেন। এক ঝটকায় তিনি চোখ খুললেন। তার মুখে বয়সের ছাপ স্পষ্ট, তবুও চোখে মুখে এক উজ্জ্বলতা। হিয়া ও তূর্যকে দেখে তার মুখে এক প্রশান্তির হাসি ফুটে ওঠে, যেন বহুদিন পর হারানো কিছু ফিরে পেয়েছেন। তিনি বলেন, "তোমাদের জন্যই সেই কখন থেকে বসে আছি। এসো এসো ভেতরে এসো তোমরা।"
দীপ্তি দেবী যে এক অমায়িক রুপবতী সৌন্দর্যের অধিকারী ছিলেন তা যেন তার বার্ধক্যও লুকাতে ব্যর্থ। তার সাদা শাড়ির প্রতিটি ভাঁজে যেন এখনো তার পরিপাট্যের পরিচয় বহন করছে। তিনি একগাল হেসে বললেন, "রুশানকেও নিয়ে আসতে। কতো যুগ ওকে দেখি না….! তোমরা রুশানের নাতিনাতনি তো?"
তূর্য বললো, "জ্বি আমি উনার বোন মিনু রহমানের নাতি আর হিয়া উনার ছোট ভাই আব্দুর রবিউল মোহাম্মদের নাতনি।"
দীপ্তি দেবীর চোখ আরো উজ্জ্বল হয়ে উঠল, "রবির নাতনি তুমি? তোমার দাদা রবি আমাদের কলেজের ছোট ভাই ছিল। কত স্মৃতি জড়িয়ে আছে সেই সময়ের সঙ্গে।
এখন আর সে বয়স নেই। মাঝে মাঝে সেসব দিনের কথা খুব মনে পড়ে। আরেকবার যদি…..।"
দীপ্তি দেবী এক গভীর আক্ষেপে তাকালেন। ঠিক তখনই এক মহিলা এসে ট্রে ভত্তি নাস্তা রেখে গেলেন। দীপ্তি দেবী এবার নিজের ভাবনা থেকে বেরিয়ে তূর্য আর হিয়াকে খাবারের দিকে ইশারা করে খেতে বললেন। এরপর জিজ্ঞেস করলেন, "তোমরা কিছু জানতে চাইছিলে, দিব্যেন্দু আমাকে বলেছিল। তবে ও পরিষ্কার বলতে পারছিল না। কি জানতে তোমরা এত দূর কষ্ট করে এলে?"
এবার তূর্য একটু নড়েচড়ে বসলো। এরপর গলা খাকারি দিয়ে বলল, "আসলে আমারা প্রকৃতি সম্পর্কে জানতে এসেছি। আপনি কি জানেন এখন প্রকৃতি দেবী কোথায় আছেন?"
মুহূর্তেই পরিবেশটা কেমন যেন থমকে গেল। দীপ্তি দেবী কেমনটা যেন নিভে গেলেন। "রুশানও এসেছিল, অনেক অনেক বছর আগে প্রকৃতির খোঁজে। এরপর অনেকদিন যাবত চিঠিও লিখতো আমাকে প্রকৃতির খোঁজ করতে। প্রতি চিঠিতে একটাই কথা, প্রকৃতির খোঁজ পেলে যেন সবার আগে ওকে জানাই।" দীপ্তি দেবীর চোখে জল জমলো।
তিনি একটু থামলেন। তার কপালের ভাঁজ দৃশ্যমান হলো, "প্রকৃতি একদম গায়েব হয়ে গেলো। এতটা স্বার্থপর ও কোনদিনও ছিল না। জীবনটা চলে গেল তাও একটা খোঁজ নিল না!"
তূর্য খুব নরম স্বরে জিজ্ঞেস করল, "আপনার সাথে প্রকৃতি দেবীর শেষ দেখা কবে হয়েছিল?"
দীপ্তি দেবী ঠিক এমন ভাবে জানালায় চোখ রাখলেন, যেন মনে হল প্রতিটি ঘটনা তার চোখের সামনে বর্তমানে দৃশ্যমান। "মুক্তিযুদ্ধের সময়….। দেশের পরিস্থিতি তখন ভয়ংকর। খু ন, ধ র্ষ ন, হ ত্যা সব খুব সাধারণ হয়ে উঠেছিল তখন। আমার বাবা তখন আমাকে আর আমার দিদিকে কলকাতায় পাঠিয়ে দেন, আমার মাসির বাড়িতে। যেদিন আমাদের যাওয়ার ট্রেন ছিল ঠিক তার আগের দিন প্রকৃতির সাথে আমার শেষ দেখা। আমি গিয়েছিলাম প্রকৃতির বাড়িতে, গৃহবন্দি তখন সে। রুশান আর প্রকৃতির বিষয়টা তখন বাড়িতে সবাই জানাজানি হয়ে গিয়েছিল। প্রকৃতি ঘর থেকে বের হতে পারতো না। তাই আমিই যেতাম দুবেলা করে ওর সাথে দেখা করতে। প্রকৃতি আমাকে জানিয়েছিল যে ওর বাবা ওদের নিয়ে খুব তাড়াতাড়ি কলকাতা চলে যাবে। আমি ওকে কলকাতার ঠিকানাও দিয়ে এসেছিলাম যাতে কলকাতায় গিয়ে আমাকে সবার আগে আমাকে চিঠি পাঠাতে পারে। কিন্তু কোন দিন চিঠি এলো না।"
নিরবতা অনিচ্ছাকৃত ভাবেই ছেয়ে গেলো সমগ্র ঘরে। “প্রকৃতি এদেশ ছেড়ে কখনোই যেতে চায় নি। শেষ যেদিন দেখা হয়, সেদিনও বলেছিল, ‘মরলে মরবে এ দেশে তাও কোথাও যাবে না।”
হিয়া এবার প্রথম বারের মতো মুখ খুললো। "প্রকৃতি কি ডায়রি লিখতেন?"
দীপ্তি দেবী এবার ভেজা চোখে হাসলেন, "ডায়রি ..! ওর ঘরে ছোট একটা সিন্দুক ছিল। সেখানে তাকে তাকে সাজাতো ছিল অনেক গুলো ডায়রি। ওর জীবনের সব ঘটনা অক্ষরে অক্ষরে লিখতেই হবে ওর। এমন পাগল ছিল ও। তবে ঐ ডায়রি গুলো পড়ার সৌভাগ্য কখনো কারো হয় নি। প্রকৃতি কে সবসময় বলতো, ‘আমি সময়কে আটকে রাখছি পাতার ভাজে। বুড়ো হয়ে গেলে স্মৃতিশক্তি যখন কমে যাবে তখন এগুলো পড়ে পড়ে সুন্দর মুহূর্ত গুলোকে মনে করবো’।”
তূর্য একটু চমকালো কি? তূর্য প্রশ্ন ছুড়লো, “রুশান দাদা কি জানতেন প্রকৃতির ডায়রি লেখা সম্পর্কে?”
দীপ্তি দেবী এবার তূর্যর মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন, “কেন জানবে না! আমার যতোদূর মনে পড়ে প্রকৃতিকে রুশান একটা ডায়রি উপহার ও দিয়েছিল। পাতা শেষ হবার ভয়ে, প্রকৃতি কখনো ঐ ডায়রিতে কলমের আঁচড় ও কাটে নি।”
তূর্য আর হিয়া মুহূর্তেই থমকে গেল। নিঃশব্দ এক ভয় আর বিস্ময়ের রেখা দু’জনের চোখে আঁকিবুঁকিতে ফুটে উঠল। দুজনেই একে অপরের দিকে তাকিয়ে রইল, যেন চোখের ভেতর প্রশ্নগুলো আরও গাঢ় হয়ে উঠছে। হিয়ার মনে তখন ঘূর্ণিঝড়ের মতো ঘুরতে থাকল সেই প্রশ্ন, তাহলে কেন আব্দুর রুশান মোহাম্মদ অস্বীকার করেছিলেন প্রকৃতির ডায়রি সম্পর্কে? মানুষ কখন অস্বীকার করে? ত্রিধারা উত্তর মাথায় বাজতে লাগল—এক. যখন সে জানে না। দুই. যখন জানে, তবু স্বীকার করতে চায় না। তিন. যখন সত্যিই মনে নেই।
কিন্তু… আব্দুর রুশান মোহাম্মদ কি সত্যিই এমন মানুষ, যে এত সহজে ভুলে যেতে পারে? সেই ভাবনার স্রোতকে আর বেশি দূর ভাসতে না দিয়ে তূর্য নীরবতা ভেঙে ফেলল, গলায় এক ধরণের দৃঢ়তা নিয়ে বলল,
“প্রকৃতির পরিবারের অন্য কেউ আছে? কোনো ভাই, বোন, দূর সম্পর্কের আত্মীয়, যে কেউ?”
দীপ্তি দেবীর মুখে তখন একধরনের শূন্যতার ছায়া। তিনি নিঃশ্বাস ফেলে বললেন,
“না, কেউ নেই। সবাই… সবাই সব ছেড়ে গেছেন। কলকাতায় চলে গিয়েছেন। এমনকি ওদের সেই বাড়িটাও দখলদারের হাতে চলে গেছে। একবারের জন্যও কেউ আসেনি দখল বুঝতে। একবারের জন্যও না…”
তূর্য গভীর দৃষ্টি নিয়ে আবার প্রশ্ন করল, “আর ওদের ব্যবসা?”
দীপ্তি দেবী কিছুটা দুঃখ মিশ্রিত কণ্ঠে উত্তর দিলেন,
“সব বিক্রি হয়ে গেছে। নিউমার্কেটে ওদের শাড়ির দোকান ছিল… মনে হয় নাম ছিল ‘ভাগ্যলক্ষ্মী বস্ত্রালয়’। সেটাও ওর দাদারা বিক্রি করে চলে গেল। কেউ পেছনে ফিরে তাকাল না। কোনো খোঁজ রাখেনি। কোনো সম্পর্ক টিকিয়ে রাখেনি। এমনকি প্রকৃতির বাবার সঙ্গেও আমার বাবার সম্পর্ক খুব ভালো ছিল… তবুও একবারও… একবারও যোগাযোগ করল না। কেমন করে যেন… একেবারে হাত গুটিয়ে নিল ওরা। এ দেশ থেকে, এ দেশের মানুষদের থেকে, প্রতিটি সম্পর্কের থেকে।”
তার কণ্ঠে তখন অনুরণিত হচ্ছিল এক অদ্ভুত বিষণ্ণতা। “কী জানি… কিসের এত অভিমান…”
ঘরটিতে তখন নেমে এলো এক নিঃশব্দ শোক। বাতাসে যেন ভেসে বেড়াল অদৃশ্য এক দীর্ঘশ্বাস।সবার মাঝে এই একটা শব্দ যেন ঘুরে ফিরে বাজলো। ‘কিসের এতো অভিমান?’
তূর্য অনুভব করল, প্রতিটি উত্তর তাকে আরও গভীর কোনো অজানা রহস্যের দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে, যেখানে ইতিহাস, সম্পর্ক আর অভিমানের কাহিনি জড়িয়ে আছে এক দুর্বোধ্য জালে।
এবার তূর্য খুব আর শান্ত গলায় বলল, “আমরা রুশান দাদার বাড়ির চিলেকোঠায় প্রকৃতির ডায়েরি পেয়েছি। আপনি কি কোন ভাবে বলতে পারবেন প্রকৃতির ডায়েরী এবাড়িতে কি করে এলো?”
দীপ্তি দেবী এক অদ্ভুত বিস্মিত চোখে তাকালেন, “প্রকৃতির ডায়েরি চিলেকোঠায়?”
তূর্য বলল, “হ্যাঁ আর শেষ কতগুলো পৃষ্ঠা কেউ ইচ্ছে করে ছিড়ে নিয়েছে এমন। আমরা যতদূর জানি, রুশান দাদার বাড়ির কেউই তো চাইতো না যে প্রকৃত আর দাদার সম্পর্কটা আগাক। তাহলে ও-বাড়িতেই কিভাবে গেল ডায়রি?”
দীপ্তি দেবী এবার যেন বেশ সঙ্কিত হলেন, “ডায়েরি কি করে গিয়েছে সেটা বলতে পারবো না। হতেই পারে প্রকৃতি নিজেই রুশানকে দিয়েছে। তবে তোমাদের এই কথা কে বলেছে যে রুশানের বাড়ির কেউ মেনে নিয়েছিল না ওদেরকে?”
তূর্য আর হিয়া যেন থমকে গেল। তাদের মুখে কোনো উত্তর নেই, শুধু এক ধরনের বোবা বিস্ময়। সেই নীরবতার ভেতরেই দীপ্তি দেবীর কণ্ঠ ধীরে ধীরে বয়ে গেল, যেন বহুদিনের চেপে রাখা কোনো স্মৃতি অবশেষে ফাটল খুঁজে বেরিয়ে আসছে।
দীপ্তি দেবী বলতে শুরু করলেন, কণ্ঠে হালকা এক কুয়াশার আস্তরণ।, “আমি কলকাতা যাওয়ার দিন দুয়েক আগের ঘটনা হবে হয়তো। রুশানের বাবা আর রবি প্রকৃতির সাথে দেখা করতে গিয়েছিল। সেদিন আমি প্রকৃতির সাথে দেখা করতে গিয়েছিলাম তখন হয়তো সন্ধ্যা। প্রকৃতি খুব খুশি ছিল, কি যে উচ্ছ্বাস! এক শিশুসুলভ সুখ। আমায় জড়িয়ে ধরে সে কি উৎসব ওর!
তিনি থামলেন, যেন তখনকার সেই মুহূর্তে ফিরে গেলেন। তারপর বললেন, “প্রকৃতি আমাকে বলেছিল, রুশানের বাবা নাকি কথা দিয়েছে, রুশান যুদ্ধ থেকে ফিরলে তাদের বিয়ে দিয়ে দেবে। আমি অবাক হয়ে তাকিয়েছিলাম ওর দিকে। আমার মস্তিষ্ক স্পষ্ট জানত, এ কোনোভাবে সম্ভব নয়। কিন্তু ওর মুখের সেই দৃঢ়তা, সেই চোখের বিশ্বাস আমাকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল। যেন সত্য-মিথ্যার সব সীমা পেরিয়ে ও এক নিজস্ব জগতে দাঁড়িয়ে পড়েছিলাম। ও আমাকে বারবার বোঝাতে চাইছিল, সেই প্রতিশ্রুতি সত্য, একদম সত্য।
আর রুশানের বাবা কিছু একটা শর্ত দিয়েছিল বোধহয়। আমি অনেকবার জিজ্ঞেস করেছিলাম কি শর্ত, তবে প্রকৃতি মুখ খুলেনি। সেদিন থেকেই ও আরো দৃঢ়ভাবে গেড়ে বসেছিল যে ও কোনভাবেই কলকাতায় যাবে না।”
তিনি চুপ করে গেলেন। ঘরের বাতাসে নিস্তব্ধতার মধ্যে জমে উঠল এক অদৃশ্য চাপ। গল্পের ভাঁজে যেন আরও অনেক অজানা গল্প ঢেকে আছে, এক একটি কথা যেন এক একটি রহস্যের মুখোশ পরে বসে আছে।
হিয়া আস্তে করে প্রশ্ন করল, কণ্ঠে কৌতূহল মিশ্রিত এক আবছা শঙ্কা, “এ কথা কি বড় দাদা জানতেন?”
দীপ্তি দেবী নিঃশ্বাস ফেললেন। তার মুখের রেখাগুলো আরও গভীর হলো, চোখের নিচের ভাঁজ যেন অতীতের ক্লান্তি বহন করছে। তিনি মৃদু গলায় বললেন, “এটা তো আমি বলতে পারবো না। তবে… না জানার মতো কিছু তো ছিল না।”
তূর্য এবার কথা বলল, তার কণ্ঠে যেন শীতল যুক্তির শিহরণ, “সব কথাই যেখানে প্রকৃতি নিজের ডায়রিতে লিখতেন… সেই প্রকৃতি, যে নিজের প্রতিটি অনুভব কাগজে মেলে ধরেছিল… সেখানে এই দিনের কোনো উল্লেখ নেই কেন? নাকি… এই কথাগুলোও কেউ ছিঁড়ে নিয়েছে?”
তার কথায় এক রহস্যময় আঁধার নেমে এলো ঘরে। যেন এক অজানা হাত এসে প্রকৃতির সেই ডায়রির পাতা উল্টে, ছিঁড়ে, লুকিয়ে রেখেছে কোনো অন্ধকার বাক্সে।
_____________
চলবে......❤️