নির্বাসিত কৃষ্ণচূড়া — পর্ব ২৪
লেখক: সাদিয়া তিন্তি · বিভাগ: রহস্য · পর্ব ২৪ · ৪৭ পর্বের মধ্যে ২৪
রাত তখন নিঃসঙ্গতার মোড়কে জড়ানো। শহরের প্রান্তে ছড়ানো বাতিগুলো নিভু নিভু আলো ছড়িয়ে দেয় জানালার পর্দায়। আব্দুর রুশান মোহাম্মদ বিছানায় বসে ডায়রিটা বুকের কাছে আগলে রাখেন, যেন সেটি শুধু কাগজ নয়, একটা জীবন্ত নিঃশ্বাস নেয়া বস্তু। পায়েলের শীতল ছোঁয়া এখনও আঙুলে পেঁচিয়ে আছে, অথচ তার চেয়ে ঠান্ডা এখন তার মনের ভিতর। শত প্রশ্ন, অগোছালো অনুমান, আর একরাশ অপরাধবোধ তাকে চেপে ধরছে।
রাতের গভীরতা বাড়ে। চাঁদ জানালার গ্রীলে মুখ লুকায়, আবার দেখে। সেই এক নিঃশব্দ সাক্ষী। আর তার সাথেই ভোর নামে। সময় পেরোয়।
আব্দুর রুশান মোহাম্মদ বুঝতেই পারেন না, এই মুহূর্তে তার কী করা উচিত। কী বলা উচিত। কাকে বিশ্বাস করা উচিত। মাথার ভেতরে তুহুরার শূন্য চোখদুটো, পায়েলের শব্দহীন কান্না, আর প্রকৃতির ডায়রির নীরবতা একসাথে মিলেমিশে গেছে। এই মুহূর্তে তিনি জানেন না, তিনি প্রশ্নের উত্তর খুঁজবেন, নাকি নিজেদের প্রশ্নবিদ্ধ জীবন থেকে সরে যাবেন এক পা করে। কিন্তু তার ঠিক বিপরীতে, জীবন তখনো ছুটে চলছে।
এদিকে ফরিদপুরের সকাল যেন প্রতিদিন একরকম সূর্য নিয়েই ওঠে, কিন্তু হিয়ার চোখে দিনগুলো পাল্টে যায়। বারান্দার মেঝেতে পা ঝুলিয়ে বসে থাকা এই একগুঁয়ে মেয়েটি এবার একটু থেমে যায়। অনেক প্রশ্নের উত্তর না পেয়ে, অনেক জেদের দ্বারে দ্বারে ধাক্কা খেয়ে, হিয়া এবার মাথা নিচু করে পড়ার টেবিলে বসে। গোপনে মোবাইল স্ক্রিনে ঢাকার কোচিংয়ের বিজ্ঞাপন আর ভিডিও দেখলেও, মুখে আর কিছু বলে না। তবে চোখ দুটো বলে, সে এখনো হাল ছাড়েনি।
মিমও তার মতো করেই স্বপ্ন বুনছে, তার থেকে অনেক দূরে। রাজশাহীর একটা কোচিং সেন্টারে ভর্তি হয়ে প্রতিদিন তার ব্যাগটা বোঝাই করে ফিরছে অঙ্ক, ইংরেজি আর বিগত বছরের মডেল প্রশ্নে। আর রাত হলেই গল্প জমায় হিয়ার সাথে।
তূর্য এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস আর লাইব্রেরি ঘেঁটে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। মাঝে মাঝে হিয়ার সাথে কথোপকথন চলে বার্তার মাঝে। তবে এসব রোজ নয়। দূরত্ব হয়তো গুরুত্ব কমিয়ে দিয়েছে।
আলিফ ব্যস্ত দ্বাদশ শ্রেণিতে উঠার ব্যস্ততায়। ধুলো পড়েছে তার কৌতূহলে। জীবন আবার পুরোনো গতিতে। আর, পিউ নতুন কলেজে ভর্তি হয়ে একদম নতুন জগতে। নতুন ইউনিফর্ম, নতুন বন্ধুবান্ধব, আর নতুন গল্প। তার উপন্যাস পড়া এখনো চলছে, প্রশ্ন থামেনি প্রকৃতি আর তুহুরাকে নিয়ে।
এভাবেই, চোখের নিমিষে মাস কেটে যায়। জীবনের গতি থামে না। তার চাকা ঘুরতে থাকে আপন ছন্দে। সবাই নিজ নিজ কক্ষপথে। তাদের জীবনগুলো থামেনি, তাদের জীবন গুলো অতিমাত্রায় সাধারণ হয়ে উঠেছে।
এসবের মাঝে আব্দুর রুশান মোহাম্মদ থেকে যান ভিডিও কলে। কখনো তূর্যের ফোনে, কখনো হিয়ার মেসেঞ্জারে, কখনো গ্রুপ কলে।
মিম থাকে ফোন কলে, হিয়ার প্রতিদিনের পড়াশোনা, টপিক, ভুল-সংশোধন সব সে ট্র্যাক রাখে। যেন তার চেয়ে বেশি হিয়ার ফল নিয়ে তার দায়িত্ব। দুজনেই যেন এক গন্তব্য চায়।
আর... প্রকৃতি? সে নিজেই আছে হিয়ার মস্তিষ্কের ভিতরে। হিয়া যেন একটু একটু প্রকৃতিকে আরো ধারন করছে নিজের মাঝে। এখন সে জানে কি করে শাড়ি পড়তে হয়, চোখে কাজলের মাত্রা বাড়িয়ে কিভাবে চোখ ভরতে হয়। শিখে গেছে প্রকৃতির হাতের মালাই পায়েশ রান্না। এমন কি বাবাকে দিয়ে বায়না করে গড়িয়েছে রুপোর নুপুর। এ আয়োজন কি প্রকৃতি হয়ে উঠার নয়?
এদিকে, তুহুরা পিছিয়ে নেই। সে রয়ে গেছে প্রশ্নে।
ছবির ফ্রেমে, চিঠির ছেঁড়া পাতায়, কিংবা হঠাৎ করেই কোনো শব্দের মাঝে। তার শূন্য চোখদুটো যেন প্রতিদিন নতুনভাবে ফিরে আসে হিয়ার পড়ার টেবিলে, খাতার পাশে।
এভাবেই জীবন এগোয়। কারো ছুটে যাওয়া, কারো অপেক্ষা, কারো প্রতিজ্ঞা, আর কারো নীরব প্রতিবাদ মিলেমিশে এক হয়ে যায়। ক্লাস, কোচিং, কল আর কতশত অপেক্ষার ভেতর খুব সাধারণ জীবন। এক এক করে দিন গড়িয়ে আসে বিকেল। ঠিক এমন এক সোনালি বিকেলে, আকাশে কিছুটা ঝাপসা আলো, বাতাসে শুষ্ক গ্রীষ্মের গন্ধ। নিয়মমাফিক প্রকৃতি প্রেম ছেড়ে হিয়া ছোটে শহরের ব্যস্ততম কোচিং সেন্টারে।
তূর্য হঠাৎ হিয়াকে ম্যাসেজ করে। অবশ্য সে সব সময় হঠাৎ হঠাৎই মেসেজ করে হিয়াকে। তাদের কথা বার্তা খুব সীমিত, এই দু তিন শব্দে শেষ। তূর্য মেসেজে লিখেছে, "কোথায় আছিস?"
হিয়া তখন ক্লাসরুমে। মোবাইল সাইলেন্টে থাকলেও বারবার স্ক্রিন জ্বলে উঠছে। ক্লাস চলাকালীন চোখের কোণে তূর্যের নাম দেখে একটু অবাক হয়। হিয়া উত্তর দেয়, "কোচিংয়ে।"
তূর্যের উত্তর আসে সঙ্গে সঙ্গেই, "লোকেশন দে।"
হিয়া একটু বিরক্ত হয়। "কেন?" হিয়ার উওর বলতেই ওদিক থেকে স্পষ্ট ধমক আসে, "জাস্ট দে, হিয়া। প্রশ্ন করিস না।"
হিয়া লোকেশন পাঠিয়ে দেয়। ঠিক যেন কোথাও একটা অনিশ্চিত টানাপোড়েন তার ভেতরে। এরপর কয়েক মিনিটের নীরবতা। হিয়া আবার ক্লাসে মন দিতে চায়। কিন্তু মন যায় না। ঠিক তখনই একটা ম্যাসেজ আসে, "আমি তোর কোচিং সেন্টারের বাইরে।"
হিয়া চোখ কপালে তোলে। যে বিষ্ময় নিয়ে লেখে, "কি?! এখানে কেন?"
তূর্যের জবাব আসে, "তোর থেকে একটা প্রশ্ন জানার ছিল। উত্তর নিয়েই চলে যাবো।"
এইবার হিয়ার মাথা পুরোপুরি গুলিয়ে যায়। ক্লাস চলছে, সময় এখনও ফুরায়নি। সে লেখে, "ক্লাস চলছে, তূর্য ভাই।"
তূর্যের উত্তর, "একদিন ক্লাস না করলে তোর চান্স আটকাবে না।"
হিয়া চুপ করে যায়। কী একটা অদ্ভুত অনুভূতি খেলে যায় বুকজুড়ে। গলার ভেতর কী যেন আটকে যায়। ঠিক বুঝে উঠতে না পারলেও সে আর কোনো মেসেজ না পাঠিয়ে ব্যাগ গুছিয়ে বেরিয়ে আসে। কোচিংয়ের লোহার গেট ঠেলে হিয়া যখন বাইরে আসে, তখন চারপাশে ঝাপসা আলো, অল্প বাতাসে উড়ে ওঠে তার মাথায় টানা পাতলা ওড়না। দরজার বাইরে রাস্তার ঠিক অপরপাশে দাঁড়ানো তূর্য। হাতে ফোন, চোখে কিছুটা উদ্বেগ, কিছুটা অস্থিরতা। তবে হিয়াকে দেখে এসব মুহূর্তেই মিলিয়ে যায়।
হিয়া একটা কালো সুতি কামিজ পড়া, চিকন গড়নে এটা নিখুঁত মানিয়েছে। গায়ের রঙের উজ্জ্বলতা এই পোশাকে যেন তীব্র আলো ছড়াচ্ছে। তার মুখে ক্লান্তির ছাপ, তবুও অদ্ভুত একটা মাধুর্য। মাথায় হালকা করে কাপড় টানা, কানের পাশে একটা ছোট্ট দুল দুলছে হাওয়ায়। যেন কোনো ক্লাসিক উপন্যাসের পাতার চরিত্র জীবন্ত হয়ে সামনে এসে দাঁড়িয়েছে।
তূর্য কিছু বলতে গিয়েও থেমে যায়। তার ঠোঁট কাঁপে, কিন্তু শব্দ জন্ম নেয় না। হিয়ার চোখে কিছুটা বিস্ময়, কিছুটা ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে আছে সে। হিয়ার মুখের প্রতিটা ভাঁজে, তূর্য বোকার মতো তাকিয়ে থাকে। সে যেন ভুলেই গেছে, সে কেন এসেছে। কী বলতে চেয়েছিল। শুধু চেয়ে থাকে হিয়ার মুখটার দিকে।
কিছু সময় পেরিয়ে যায়। তূর্য তার বাইকে হেলান দিয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে আরো খানিকটা, হিয়া সোজা কোচিং থেকে বেরিয়ে তূর্যের সামনে এসে দাঁড়ায়। তূর্য নিজের চোখ সরিয়ে বলে, "এখানে রাস্তায় কথা বলা যাবে না। অন্য কোথাও চল? তোকে একটা প্রশ্ন করার আছে।"
হিয়া ভ্রু কুঁচকে তাকায়। ওর যেন সব হিসেব গোলমেলে। তূর্যকে ওর শহরে যেন কোন ভাবেই সে মেনে নিতে পারছে না। তাও সে প্রশ্ন ছোড়ে, "আপনি এত দূরে শুধু আমাকে প্রশ্ন করতে এসেছেন? কি এমন প্রশ্ন…?"
তূর্য হালকা হাসে। "আছে, বাইকে উঠ। বলছি।"
হিয়া আরো একবার থমকে যায়। তার ছোট জীবনে সে এই একটা মাত্র যানে উঠতে খুব ভয় পায়। ওর মনে হয় এই বুঝি এক্সিডেন্ট হলো। হিয়া একটু ইতস্তত করে বলে, "এটা ছাড়া আর কোন উপায় নেই? আপনি বলুন কোথায় যাবেন, আমি রিক্সা নিয়ে নিচ্ছি।"
তূর্য কিছু বলে না। চুপচাপ তাকিয়ে থাকে শক্ত চোখে হিয়ার দিকে। হিয়া আরো কিছু সময় ইতস্তত করে, একটু খচখচ করে। এরপর অনেক সাহস জুগিয়ে উঠে পড়ে বাইকে। এমন না যে সে খুব সহজেই রাজি হয়ে গিয়েছে। কিন্তু আজকে সে যেন নিজেকেও ঠিক বুঝতে পারছে না, তার খুব ইচ্ছা হল এই ভয়টার সঙ্গেই পথ চলতে।
হিয়া উঠতেই, বাইক ছুটে চললো শহরের ব্যস্ত রাস্তা পেরিয়ে। মফস্বলের শহুরে ব্যস্ততা ছেঁড়ে তারা চলছে নিরিবিলি পথে। হিয়া চুপ। সে যেন সবখানে যেতে প্রস্তুত যেখানেই তূর্য তাকে নেবে। তার মন তাকে প্রশ্ন ছোড়ে শুধু, এ কি বিশ্বাস? নাকি অন্ধবিশ্বাস?
তবে এসব ভাবনাকে সে পাত্তা দেয় না। বাইক ছুটছে, হিয়া দুহাতে মুষ্টিমেয় করে ধরে রেখেছে তূর্যের শার্ট। চোখ তার জোর করে বন্ধ। তূর্য এ দৃশ্যের সাথে যে অজানা এমন নয়। বাইকের লুকিং গ্লাস হিয়ার মুখের দিকেই তাক করা। সে নিশ্চুপ দর্শক। তবে এ যাত্রা খুব দ্রুত সমাপ্ত হলো। বাইক থামলো ধলার মোড়ে। এটা পদ্মানদীর এক জমজমাট পাড়। এখানে পাড়টা খুব নান্দনিক ভাবে বাঁধাই করা। আশে পাশে বেঞ্চ পাতা। নদীর তীর ঘেঁষে গড়ে ওঠা সড়ু রাস্তা। আশেপাশে নদী ঘেষা জীবন যাত্রাও আছে মানুষের খুব সাধারণ। তবে এই পরিবেশ শান্ত।
বিকেলের আলোটা তখন ঠিক নিভু নিভু, যেন একটা বয়স্ক প্রদীপের শিখা। চারপাশ নিস্তব্ধ। কিছু মানুষের আনাগোনা চলছে তাও শান্ত। নদীর ধারে ছড়িয়ে আছে কচুরিপানার ভেলা, মাঝেমাঝে জল ছুঁয়ে যাওয়া বাতাসে ফেঁপে ওঠে ঢেউ। দূরে মাঝিদের নৌকা। নদীর বুক দিয়ে সোনালি রঙের রেখা কেটে চলে গেছে সূর্যের ছায়া। হিয়ার চোখে বিস্ময়, মুখে নীরবতা। এটা তার প্রথম দেখা দৃশ্য নয়, সে বড় হয়েছে এই নদীর দেশে। তাও চুপচাপ তাকিয়ে থাকে দূরে।
তূর্য একটা কাঠের বেঞ্চে বসে। শব্দহীন, খুব স্বাভাবিকভাবে। হিয়া কিছু না বলে ওর পাশেই বসে পড়ে। তূর্য একবার নদীর দিকে তাকায়, একবার হিয়ার চোখের দিকে। আবার নদীর দিকে। তারপর একটু হালকা গলায় বলে, "তোর শহরটা খারাপ না। একটা শান্তি শান্তি ব্যপার আছে।"
হিয়া এবার তূর্যের মুখের দিকে তাকিয়ে বলে, "আপনার রাস্তা ঘাট এতো পরিষ্কার মনে আছে কি করে? আমার যতোদূর মনে পড়ে, আপনি আমাদের বাড়িতে এসেছিলেন অনেক বছর আগে, তখন তো আপনি স্কুলে ছিলেন বোধহয়!"
তূর্য হাসে, "মাঝে দু'একবার আসা হয়েছে। গত বছর এক বন্ধুর বোনের বিয়েতে এসেছিলাম। মা বলেছিল তোদের বাড়িতে যেতে, কিন্তু আমি জানাতে নিষেধ করেছিলাম। এক বিয়েতে এসে এত হ্যাসেলের কোন মানে হয় না।
সে যাই হোক। শোন... একটা প্রশ্ন করব। খুব সিরিয়াস।"
হিয়া চোখ ছোট করে তাকায়, কিন্তু কিছু বলে না। তূর্য ধীরে বলে, "লম্বা চুলওয়ালা মেয়েরা নাকি প্রচুর ঝগড়ুটে হয়। এটা কি সত্যি?"
হিয়া চোখ বড় বড় করে ফেলে। ঠোঁট শক্ত করে দাঁতে দাঁত চেপে কিছু বলতে যাবে ঠিক তখনই তূর্য খুব সিরিয়াস মুখ করে বলে, "আমি কিন্তু বলিনি। তোর প্রিয় হুমায়ূন আহমেদ বলেছে।"
হিয়া থেমে যায়। মস্তিষ্কের রাগ মস্তিষ্ক থেকে উবতে শুরু করে। মুখটা একটু নরম হয়, কিন্তু চোখে সেই চিরচেনা জ্বালা। হিয়া ফিসফিস করে বলে, "এই লাইন তো 'অপেক্ষা' বইয়ের..."
তূর্য একটু নিচু গলায় বলে, "সে যেখানেরই লাইন হোক, তোর হুমায়ূন আহমেদ বলেছে এটা কনফার্ম। এবার তুই বল ঘটনা সত্য কিনা? তোর মতো লম্বা চুলের মেয়ে আমি খুব কম দেখেছি।"
হিয়া তাকিয়ে থাকে নদীর দিকে। বুকের ভেতর কিছু খেলে যায়। বাতাসে তার মাথার কাপড় ওড়ে। তূর্য চুপচাপ, তার দিকে তাকিয়ে। আর নদী বয়ে চলে, ঠিক তাদের মতো নিস্তরঙ্গ, অথচ গভীর।
তূর্য এবার খুব ধীর গলায় বলে, "হুমায়ূন আহমেদ অবশ্য এটা ঠিক বলেছে, মানুষের বেঁচে থাকার জন্য অপেক্ষা নামের ব্যাপারটি খুব প্রয়োজন।"
হিয়া এবার তূর্যের চোখের দিকে তাকায়, "তূর্য ভাই উপন্যাসটা কেন পড়লেন? মানে ঠিক কিভাবে?"
তূর্য হেসে বলে, "তোর কি কোন ভাবে আমাকে অশিক্ষিত মনে হয়? মনে হয় যে আমি বাংলা পড়তে জানি না?
কিভাবে পড়বো আর! চোখ দিয়ে দেখেছি মুখ দিয়ে পড়েছি।"
হিয়া তূর্যের এই মশকরা গুরুত্ব দেয় না। তার চোখ তূর্যের চোখে কিছু লুকোচুরি দেখতে পায়।
এ কেমন অস্থিরতা?
হিয়ার কি খুশি হওয়া উচিত? হিয়া জানে তূর্য তার সম্পূর্ণ জীবনে কোনদিন উপন্যাসের মলাট অব্দি ছুঁয়ে দেখেনি। ও আশা করেনি তূর্য ওর দেয়া উপহারটাও ছুঁয়ে দেখবে। তবে এ ছেলে তো সমগ্র উপন্যাস মুখস্থ করে ওর সাথে এসে দাঁড়িয়েছে। হিয়ার ভাবনা গুলো যেন, খোলা পৃষ্ঠার মত তূর্যের চোখে দৃশ্যমান। তূর্য হালকা হাসলো, এরপর বললো, "আমার প্রশ্ন কিন্তু ঠিক একই জায়গায়, উত্তর না নিয়ে কিন্তু ফিরছি না।"
হিয়া এবার ভ্রু কুঁচকে বলে, "আপনি শুধু একটা প্রশ্ন করতে রাজশাহী থেকে এত ঘন্টার রাস্তা পাড়ি দিয়ে ফরিদপুর এসেছেন? আপনি তো পাগলের থেকেও বড় পাগল!"
তূর্য হাসে, "সে আমি যাই হই। তুই স্বীকার কর তুই ঝগড়ুটে। উওর নিয়ে বাড়ি যাই।"
হিয়া নাক ফুলিয়ে বলে, "হুমায়ূন আহমেদ কোন পীর ফকির ছিলেন না। উনি একজন সাধারন মানুষ ছিলেন। উনার সব কথা যে সত্যি হবে তার কোন মানে হয় না!
সত্যি হলেও হতে পারে! তবে আমি একদমই ঝগড়াটে নই।"
তূর্য এবার জোরে হেসে ওঠে, যেন সে হিয়ার এই উওর জানতো। সেই হাসির রেশ বাতাসে বয়ে চলে। ধীরে ধীরে তা মিশে যায় নদীর গর্জনে, সূর্য ডুবে যাওয়ার ঠিক আগমুহূর্তের নিস্তব্ধতায়।
হিয়া মাথা নিচু করে বসে থাকে কিছুক্ষণ, তারপর বলে, "আপনি ঠিক কবে থেকে এমন হলেন তূর্য ভাই? আগে তো এত কথা বলতেন না। এখন তো দেখি একেবারে উপন্যাসের মতো কথা বলেন!"
তূর্য মুচকি হেসে বলে, "আগের থেকে বদলাই নি। শুধু যাদের সামনে চুপ করে থাকা চলে না, তাদের জন্য কিছু কথা বলা শিখছি।"
হিয়া একটু থেমে থেকে আবার বলে, "আপনি কি আসলেই শুধু এই প্রশ্নটাই করতে এসেছেন?"
তূর্য গভীরভাবে নদীর দিকে তাকায়। তারপর ধীরে ধীরে বলে, "তোর শহরের নদীটাকে মিস করছিলাম। তাই ভাবলাম একটু সময় কাটিয়ে যাই।"
হিয়ার মুখে কেমন একটা অদ্ভুত হাসি খেলে যায়। সে জানে এই ছেলে কখনো সোজা কথার উত্তর, সোজাসাপটা দিতে পারে না। হিয়া মাথা নাড়ে, তারপর বলে, "আপনি খুব অদ্ভুত জানেন। কেমন জানি হিসেব করেও, হিসেব মেলানো যায় না ঠিক। কোথাও একটা গড়মিল থেকেই যায়।"
তূর্য হেসে বলে, "তুই জটিল ভাবিস। সব হিসেব এতো জটিল নয় হিয়া। জীবনটা সহজ সমাধান, আমরা এই সমাধানকে টেনে হিচড়ে জটিল করতে চাই।"
নদীর পাড়ে বাতাস ধীরে ধীরে ঠান্ডা হতে শুরু করে। কচুরিপানার গায়ে আলো পড়ে একধরনের স্বর্ণাভ ছায়া তৈরি করে। দু’জনের মাঝখানে নীরবতা, কিন্তু সে নীরবতাও যেন কথার চেয়ে কম নয়।
তূর্য হঠাৎ বলে ওঠে, "এখান থেকে ঢাকায় ফিরবো সোজা।"
হিয়া অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে, "ঢাকা?"
তূর্য মাথা হেলায়, "হ্যাঁ। বড় দাদার বাসায় যাবো। উনাকে কথা দিয়েছিলাম।"
হিয়া কিছুক্ষণ চুপ থেকে সরাসরি জিজ্ঞেস করে বসে, "আপনি কি কিছু জানতে পেরেছেন? মানে প্রকৃতি বা তুহুরা সম্পর্কে?"
তূর্য একটু নড়েচড়ে ওঠে। মুখে একটু অনিশ্চয়তা খেলে যায়। তারপর নিজেকে সামলে নিয়ে বলে, "আমি কিছুই জানি না। কিন্তু জানাটা জরুরি। যে গল্প শুরু হয়েছে তার সমাপ্তি টানা জরুরি...।"
হিয়া এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে তূর্যের চোখে। যেন কিছু খুঁজে বের করতে চায়। কিন্তু কিছুই বোঝা যায় না। হিয়া ধীর গলায় বলে, "একবার আমাদের বাড়ি থেকে ঘুরে গেলে হতো না?"
তূর্য চোখ সরিয়ে নেয়। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে নিচু গলায় বলে, "বাড়িতে প্রজেক্টের বাহানা দিয়ে বেড়িয়েছি। কেউ জানে না গন্তব্য কোথায়। গোপন থাক এ যাত্রা। এখানে যদি কিছু মেলে তবে সব গোপনেই মিলবে।"
হিয়া বুঝে যায়, এই কথার গভীরে কিছু আছে। তবুও সে আর প্রশ্ন করে না। তূর্য উঠে দাঁড়ায়। হিয়া ধীরে ধীরে উঠে পড়ে ওর পাশেই। সন্ধ্যার আলো নদীর গায়ে শেষবারের মতো ছড়িয়ে পড়ছে। দূরে আজানের ধ্বনি ভেসে আসে। তাদের ছায়া দুটো বেঞ্চের পাশে পড়ে আছে পাশাপাশি। দুটো ভিন্ন জীবনের চেনা ছায়া, যাদের মাঝে কেবল সময় আর সাহসের দূরত্ব।
তূর্য হেলমেট পরে বাইকে উঠে পড়ে। তারপর হিয়ার দিকে তাকিয়ে বলে, "চল, তোকে বাসার কাছে নামিয়ে দিয়ে তারপর বের হবো।"
হিয়া চুপচাপ বাইকে উঠে বসে। এই যাত্রাটা নীরব তবে শব্দহীন নয়।
________________
চলবে......❤️