নির্বাসিত কৃষ্ণচূড়া — পর্ব ৩৩

লেখক: সাদিয়া তিন্তি · বিভাগ: রহস্য · পর্ব ৩৩ · ৪৭ পর্বের মধ্যে ৩৩

সময়ের যাত্রা আরো মিনিট কয়েক এগোয়। কারো কথায় হিয়ার কোন মনোনিবেশ নেই। সে বারংবার সময়ের সংখ্যা বদল দেখতেই যেন ব্যস্ত। আব্দুর রুশান মোহাম্মদকে যে-কোন বাহানা দিয়েই বের হওয়া সহজ ছিল‌। তবে আব্দুর রবিউল মোহাম্মদকে বাহানা দেয়াটা বেশ কঠিন লাগছে হিয়ার। সময়টা ৩টে ৪৫ এর ঘরে যেতেই, হিয়া মিমের দিকে তাকিয়ে পড়ে। মিমও হিয়ার মুখে নির্বাক দর্শকের মতো চেয়ে থাকে শুধু। হিয়া বেশ কিছু সময় হিসেব কষে, একটি দুষ্টু হাসি দিয়ে একটু জোরেই বলল, "মিম, চারটা বাজতে চললো, চল এবার রেডি হতে হবে তো। তূর্ণা আমাদের জন্য অপেক্ষা করবে তো।"

মিম বোকার মতো তাকিয়ে থাকে কিছু সময়। বেশ কয়েক প্রহর পেরোতেই মিমের মস্তিষ্ক যেন সচল হয়ে ওঠে। হিয়ার চোখে স্পষ্ট বুঝে যায় সবটা নাটক। মিমও সাথ দেয়, বলল, "দেখেছিস একদম ভুলে গেছি। আমাদের তো সাড়ে চারটায় যেতে বলেছিল তাই না?"

হিয়া সম্মতি দিয়ে বলল, "হ্যাঁ রেডি হতে হবে।"

উপস্থিত সকলেই এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে মিম আর হিয়ার মুখের দিকে। আব্দুর রবিউল মোহাম্মদ আর কৌতূহল না আটকাতে পেরে জিজ্ঞেস করলেন, "কোথায় যাওয়ার প্লানিং হচ্ছে?"

মিম কিছু বলবে তার আগেই হিয়া একটু জোর করে হেসে বলল, "আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের বান্ধবী তূর্ণা। ওর কিছু কেনাকাটা করার ছিল, তাই সবাই মিলে আজ বিকেলে বের হওয়ার প্ল্যানিং করেছিলাম। এই নিউমার্কেট অব্দি যাবো, কেনাকাটা করেই চলে আসব।"

আব্দুর রবিউল মোহাম্মদ কথা বাড়ালেন না। শুধু বললেন, "সন্ধ্যা নামতেই ফিরে আসবে। রাত যেন না হয়।"

হিয়া হেসে বলল, "এই যাবো আর আসব দাদা ভাই।"

কথোপকথনের সমাপ্তি টেনে হিয়া আর মিম নিজেদের ঘরের দিকে দৌড় লাগায়। ঘরে ঢুকেই দরজাটা বন্ধ করে মিম বলল, "দিলি তো আমাকেও ফাঁসিয়ে! এখন সারা বিকেল আমি করবোটা কি?"

হিয়া একটু নরম স্বরে বলল, "আমার হাতে কিছু করার ছিল না মিম। তুই বল, দাদা হুট করে চলে এসেছে। এখন আমি যদি এমন কোন বাহানা না দিতাম, তাহলে আমাকে বের হতেই দিত না। প্লিজ মিম আজকের মত একটু ম্যানেজ কর। আমি তূর্ণা, বাপ্পি ওদের ম্যানেজ করছি। তোরা প্লিজ একটু ক্যাম্পাস দিয়ে ঘুরিস। এরপর আমি যখন ফিরবো, তখন আবার তোকে কল করবো। একসঙ্গে বাসায় ফিরব। প্লিজ বোন আমার। একটু কনসিডার কর।"

মিম আর কোন বাহানা করল না। হিয়ার এমন করুন আকুতি দেখে, সে রাজি হয়ে গেল। হিয়াও কথা মতো তূর্ণাকে ফোন দিয়ে রাজি করালো। সব যেন প্লান মাফিক এগোলো।

হিয়া সময় আর অপচয় না করে তৈরি হতে শুরু করে। আকাশে ছোঁয়ানো হালকা নীলাভ সারোয়ার কামিজটা তার খুব প্রিয়, কিন্তু আজকের দিনে পরাটা যেন অজান্তেই বিশেষ হয়ে উঠেছে। ঘরের আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল খোলা রাখে সে। চোখে হালকা কাজল টানে, ঠোঁটে একটুখানি গোলাপি রঙ। সাজটাও নরম, কিন্তু দৃষ্টিটা যেন কেমন ভারী হয়ে উঠেছে, তাতে অপেক্ষার ছায়া, উত্তেজনার ছাপ, আর একফোঁটা অভিমানও জমে আছে। খানিক সময় যেতেই হিয়া নিজেকে প্রশ্ন করে বসে, সে কি তূর্যর জন্য সাজছে? তবে উওর নেই। হিয়া যেন নিজের অজান্তেই ছুটছে অন্য এক গন্তব্যে।

এদিকে ঘড়িতে চারটা বাজতেই হিয়ার ফোনটা ভাইব্রেট করে ওঠে। স্ক্রিনে ভেসে আসে তূর্যের মেসেজ, “দশ মিনিটের মাঝে নিচে এসে দাঁড়া। আমি উপরে আসবো না।”

মেসেজটা পড়ে ফোনটা আবার রেখে হিয়া আরো এক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে থাকে আয়নার সামনে, নিজের চোখে নিজেকে যাচাই করতে করতেই বলে, "মিম তাড়াতাড়ি কর। তূর্য ভাই নিচে নামতে বলছে। উনি উপরে আসবেন না।"

মিম যেন এই অপেক্ষাতেই ছিল। সে নিজের পার্সটা হাতে নিয়ে বললো, "চল আমি তো রেডি।"

হিয়া মিমের দিকে একবার ভালো করে তাকিয়ে দেখে। মিম খুব সাদামাটা একটা কুর্তি পড়ে চুলগুলো কোন রকম মাথার উপর ম্যাসি বার্ন করেই রেডি। হিয়া নিজের মাথায় হাত দিয়ে বললো, "মিম আমরা নিচে পেঁয়াজ তরকারি কিনতে যাচ্ছি না। ঘুরতে যাবো বলেছি বাড়ির সবাইকে। ঠিক আছে আমি একটা কাজে যাচ্ছি কিন্তু তুই তো আসলেও ঘুরতে যাচ্ছিস।‌ অন্ততঃ একটু তো ভালো করে যা!"

মিম ভ্রু কুঁচকে বললো, "দেখ এই ঢের ভালো। এই গরমে মানুষ বাঁচে না মানুষের জন্য, আর এ এসেছে ভালো করে যাওয়া নিয়ে বলতে। দাঁড়া তোর মনের আশা পূরণ করতে চোখে সুন্দর করে কাজল দিয়ে নিচ্ছি, হবে তো তাহলে!

আর আমার ফোনের ক্যামেরা খুব জোস। যেভাবেই যাই সেলফি ঝাকানাকা আসবে, তাই সাজের এতো প্যারা নেই। আর যদি তাও ঝামেলা হয় তবে ফিল্টার তো আছেই। আধুনিক যুগে এই তো শান্তি আর শান্তি।"

হিয়া মিমের এমন কথায় শুধু হাসে। সে যেন নির্বাক। মিমের কাজল দেয়া শেষ হলে, আর কথা না বাড়িয়ে দুজনেই বেড়িয়ে পড়ে বাড়ি থেকে।

বাড়ির মেইন গেট পেরিয়ে একটু দূরে তূর্য অপেক্ষা করছে হিয়ার। মিম আর হিয়া গেট পেরিয়ে দেখে, চোখে সানগ্লাস, হাতে ফোন, গায়ে হালকা নেভি ব্লু শার্ট জড়ানো তূর্য দাঁড়িয়ে আছে অপেক্ষায়। মিম তূর্যকে দেখে মৃদু হেসে ফিসফিস করে হিয়াকে বললো, “তোরা কি প্লানিং করে একই রঙ পড়ে বেড়িয়েছিস নাকি?”

হিয়া দাঁতে দাঁত চেপে বললো, “একদম মজা নিস না। কোথায় একই রঙ, তূর্য ভাইয়ে ওটা নেভিব্লু আর আমার এটা স্কাই ব্লু।”

মিম আরো একটু মজা নিয়ে বললো, “আহহা রাগছিস কেন! তোদের কালার চয়েজ একেবারেই সেম। সে ব্লু’র আগে যাই থাকুক। ব্লু তো ব্লু’ই হয়।”

হিয়া আর কিছুই বলে না। শুধু রাগি কটমটে চোখে মিমের দিকে তাকায়। একটু এগোতেই তূর্যর নজর ওদের উপরে যায়। সে তাকাতেই তার চোখের ওপরের চশমাটা যেন আর কিছুই ঢাকা দিতে পারে না, সে হিয়ার দিকে তাকিয়ে থাকে অচেনা এক ঘোরে। হিয়ার চুলে হালকা হাওয়া লেগে লম্বা চুলগুলো ঢলে পড়ে বড্ডো অনমনে। চোখের পাপড়িতে কপালের কাটা চুল গুলো এসে পড়তেই হিয়া খুব যত্নে চুল গুলো সরাতে থাকে। তূর্যর চোখে এই মুহূর্তটা যেন আটকে যায়। সে হাঁটতে ভুলে যায়, কথা বলতে ভুলে যায়। শুধু একভাবে তাকিয়ে থাকে হিয়ার দিকে। মিম আর হিয়া তূর্যর একেবারে কাছাকাছি গিয়ে দাঁড়ায়।

হিয়া একটু মৃদু হেসে, নিজেকে খুব স্বাভাবিক দেখিয়ে বললো, “বেশি অপেক্ষা করালাম?”

হিয়ার কন্ঠস্বর কানে পৌঁছাতেই। তূর্য নিজের অবস্থান টের পেয়ে চোখ সরিয়ে ফেললো। ঠোঁটের কোণে টুকরো হাসি এনে বললো, “হুম...একটু। সমস্যা নেই চল।”

মিম তূর্য আর হিয়াকে বিদায় দিয়ে একটা রিক্সা নিয়ে ছোটে ক্যাম্পাসের উদ্দেশ্যে। তূর্য অগোচরে বারংবার ঘুরে ফিরে দেখে নেয় হিয়ার মুখটা‌। সে যেন স্বীকার করে ফেলছে হিয়াকে শুধু "মায়াবী" বলাটা একদমই কম পড়ে যাবে। সে আগে থেকেই উবার বুক করে রেখেছিল। মিম যেতেই গাড়িটা এসে দাঁড়ায় তাদের সামনের রাস্তায়, গাঢ় ধূসর রঙের সেডান, কাঁচ হালকা কালচে।

তূর্য পেছনের গেটটা খুলে দিয়ে হিয়াকে বসিয়ে নিজে বসে সামনের সিটে। হয়তো অভ্যাসের বাইরে হাঁটতেই চায় না সে আজ। তূর্যর মনে যেন অন্য এক অনুভূতি খেলতে শুরু করেছে। হিয়ার পাশে বসা মানেই যেন সে বুঝে ফেলবে ওর চোখের অস্থিরতা। দু'জনেই যেন দুজনের সাথে লুকোচুরি খেলার এক বিশেষ টুর্নামেন্ট ঘোষণা করছে। দুজনেই দুজনের প্রশ্নের দোর গোড়ায় দাঁড়ানো, তাও শব্দ নেই।

গাড়ি রওনা দেয়। রাস্তার দিকের আলো-ছায়া হিয়ার মুখে লেগে থাকে মাঝে মাঝে। সে চুপ করে জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকে। তূর্য লুকিং গ্লাসে আনমনে এক নজরে দেখছে শুধু ওর চোখ, ওর মুখের পাশে উড়ে যাওয়া চুল, আর কখনো কখনো গালের পাশ ছুঁয়ে ফেলা হালকা অভিমান।

তাদের আজকের গন্তব্য বনানীর একটা মাল্টিন্যাশনাল কর্পোরেশনের হেড অফিসে। সেটা এক বিশাল কাচঘেরা অট্টালিকা। শহরের জ্যাম, ক্ল্যাক্সনের আওয়াজ, ট্রাফিক সিগন্যালে দাঁড়িয়ে থাকা সেই সব ব্যস্ত মুখের পেছনে এই যাত্রা যেন আরও নিঃশব্দ হয়ে পড়ে। প্রায় তিরিশ মিনিটের মাথায় তারা পৌঁছায়। বিশাল গেট, চকচকে কাঁচ, এবং গেটে দাঁড়িয়ে থাকা বেশ কিছু সিকিউরিটি। পরিচিত নয় এমন মুখের জন্য জায়গাটা খানিকটা রূঢ়।

তূর্য গাড়ি থেকে নেমেই ফোনে কীসব একটা দেখায় সিকিউরিটিকে। তারপর ব্যাগ থেকে বের করে ফাইলটা। তূর্য স্বর নিচু রেখেই বলে, “বিকেল পাঁচ টার অ্যাপয়েন্টমেন্ট আছে।”

সিকিউরিটি এক ঝলক দেখে, তারপর ওদের ভেতরে নিয়ে যায়। ভেতরে ঢুকতেই যেন অন্য এক জগতে পা পড়ে। শীতল বাতাস, নিঃশব্দ ফ্লোর, সামনে রিসেপশন ডেস্ক। রিসেপশনের সামনেই আবার পরিচয়, চেকিং, এবং নাম এন্ট্রি হয়। শঙ্খ সাহেবের অ্যাসিস্ট্যান্ট ফোনে কথা বলে নিশ্চিত হয়, তারপর বলে, “Sir is in a meeting. Please wait for a few minutes in the lounge.”

তাদের নিয়ে যাওয়া হয় এক ছোট্ট, কিন্তু রুচিশীল লাউঞ্জে। কাঁচের ওপারে দেখা যায় গাছ, শহরের ট্রাফিক আর দূরে আকাশে ভাসতে থাকা বিকেলের রোদ। তূর্য বসে পড়ে। হিয়া বসে, কিন্তু তার হাতদুটো জড়িয়ে থাকে নিজের ব্যাগের চারপাশে। ভেতরে চাপা উত্তেজনা, চাপা শ্বাস। সে জানে, এই বিকেলটা শুধু একটা সাক্ষাৎ নয়। এই বিকেলটাই হয়তো রহস্যের অনেক অজানা কুশল বিন্যাস বদলে দেবে।

তূর্য হিয়ার চেহারা অনেক্ষণ পর্যবেক্ষণ করে, একটু ঝুঁকে বলল, “নার্ভাস?”

হিয়া চোখ সরিয়ে জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল, " নার্ভাস না ঠিক, একটু বেশি এক্সাইটমেন্ট কাজ করছে।"

তূর্য আর কিছু না বলে শুধু তাকিয়ে থাকে। সামনে রাখা কাঁচের জার থেকে আলো পড়ে হিয়ার হাতে। তার নীল রঙের কামিজটা যেন আলোর মধ্যে একটু বেশি জ্বলছে।

ওরা অপেক্ষা করছে। বাইরে হালকা সুরে বাজছে একটি জ্যাজ মিউজিক। লাউঞ্জের নিঃশব্দ রেশ কেটে যাওয়ার আগেই সামনের এক সুদৃশ্য কাচের দরজা খুলে যায় নিঃশব্দে। একজন স্যুট-পরা অফিস অ্যাসিস্ট্যান্ট নরম কণ্ঠে বলল, “Mr. Shankho Nil sir will see you now. This way please.”

তূর্য হালকা মাথা নাড়ে, হিয়া একবার নিঃশ্বাস চেপে ধরে উঠে দাঁড়ায়। তারা দু’জন ধীর পায়ে হাঁটতে শুরু করে কর্পোরেট করিডরের নিঃশব্দ পথে। যেখানে কাচ আর কাঠ মিলেমিশে সৃষ্টি করেছে এক আধুনিক, মার্জিত সৌন্দর্য। দেয়ালে ঝুলে থাকা বিমূর্ত শিল্পকর্মগুলো যেন প্রতিটি পথচারীকে কিছু বলতে চায়, কিন্তু জোর করে কিছুই বলে না।

কয়েক কদম ফেলতেই, একটু পরেই তারা পৌঁছে যায় শঙ্খ সাহেবের কেবিনের সামনে। ভেতরে ঢুকতেই চোখে পড়ে এক অনন্য দৃশ্য। দেয়ালের একপাশজুড়ে বইয়ের তাক, আরেক পাশে বড় একটা কাচের জানালা। সেখানে আকাশের আলো ঢুকে পড়ছে প্রশান্তির মতো। ঘরের মাঝখানে রাখা দৃষ্টিনন্দন ডেস্ক, ডেস্কের একপাশে লেদারচেয়ার, আর আরেক পাশে বসার জন্য নিঃশব্দ আরামদায়ক সোফা।

সেই ডেস্কের পেছনে বসে আছেন একজন ৬০ বছরের কাছাকাছি বয়সের ব্যক্তি। বয়সের সংখ্যা এমন হলেও তাঁর শরীরী ভাষায় কোথাও ক্লান্তির ছায়া নেই। বরং তাঁর চোখে-মুখে, গাল বরাবর হালকা পাতলা দাড়িতে, পরিপাটি চুল আর নিখুঁতভাবে পরা গাঢ় ধূসর সুটে এমন এক ব্যক্তিত্ব ফুটে উঠেছে, যা নিঃশব্দেই শ্রদ্ধা জাগায়। টাইয়ের নিখুঁত গিঁট, আঙুলে ধরা একটি কালো ফাউন্টেন পেন, সবকিছুতেই রুচির ছাপ। তিনি চোখ মেলে একবার হিয়ার দিকে তাকান, আবার তূর্যের দিকে‌। তাঁর কণ্ঠ গভীর, কিন্তু নরম। তিনি বলেন, “Please, বসুন। মনে হচ্ছে আমরা পরিচিত নই।"

তূর্য হালকা হাসে, মাথা নুয়ে বলল, "পরিচিত নই তবে পরিচয়ের গুরুত্ব অনুভব করেই পরিচয় হতে আসা। আমি অহিদুল ইসলাম তূর্য।"

শঙ্খ সাহেব মৃদু হেসে বলেন, "বসো তোমরা। আমার পিএ বলছিল, বেশ কয়েক মাস ধরেই তোমরা আমার অপেক্ষায় ছিলে। কোন বিশেষ কারন?”

হিয়া তখনও নিরব। কিন্তু তার চোখে ধরা পড়ে একধরনের বিস্ময়। এই মানুষটা যেন ডায়রির পাতায় লেখা কোনো চরিত্র, এখন বাস্তবে উঠে এসেছে। শঙ্খ তখন হাতের পেনটা ডেস্কে রেখে, পুরো মনোযোগ দিয়ে তূর্য আর হিয়ার দিকে তাকান। তিনি সোজা হয়ে বসে বলেন, “আমি অপেক্ষায় আছি। তোমরা শুরু করো।”

ঘড়ির কাঁটা সাড়ে পাঁচ ছুঁই ছুঁই করছে তখন। বিকেলের আলো জানালায় ঠিকরে পড়ছে।

তবু ঘরটা যেন এখন আলোয় নয়, কণ্ঠে, কথায়, কিছু অচেনা গল্পে আলোকিত হতে চলেছে।

তূর্য তার হাতের ফাইলের ব্যাগ থেকে ধীরে, পরিপাটি ভঙ্গিতে একটি খামে মোড়ানো চিঠি বের করে। তার চোখে এখন আর কোনো দ্বিধা নেই, বরং একধরনের পরিণত আত্মবিশ্বাস। সে চিঠিটা এগিয়ে দেয় শঙ্খ সাহেবের দিকে। এরপর পরিষ্কার আওয়াজে বলল, "ভাগ্য ক্রমে সারা বান তুহুরা'কে দেয়া আপনার এই একটা চিঠিই আমার কাছে আছে। বলতে পারেন এটা আমাদের একটা পরিচয়। তাছাড়া অন্য পরিচয় আব্দুর রুশান মোহাম্মদের বোন মিনু রহমানের নাতি আমি, এবং তার ভাই আব্দুর রবিউল মোহাম্মদের নাতনি এই যে হিয়া। অনেক অনেক প্রশ্নের স্তূপ জড় হয়েছে তাই আপনাকে খুঁজে বের করা মিস্টার স্বাত্ত্বকি।”

শঙ্খ সাহেব চিঠিটা হাতে নিতে নিতে যেন এক মুহূর্তের জন্য জমে যান। ঠোঁটের কোনে যে হাসিটা ঝুলে ছিল, সেটা একেবারেই মিলিয়ে যায়। চোখ কপালের দিকে উঠতে চায়, কিন্তু অভ্যাস তাকে সংযত রাখে।

“স্বাত্ত্বকি?” নামটা উচ্চারণ করে তিনি থেমে যান। যেন এই নামটা আজ অনেক বছর পর তার কানে পৌঁছালো। খুব চেনা, খুব আপন, অথচ এখন খুবই দূরের।

হিয়াও নামটা শুনে তূর্যর মুখের দিকে এমনভাবে তাকিয়ে থাকে যেন তার চোখ দিয়ে বেরিয়ে আসছে শুধু স্বাত্ত্বকি নামের জড়তা। তূর্য হিয়ার দিকে ফিরে এক ঝলক শান্ত চোখে তাকায়, যেন হিয়ার অজস্র প্রশ্নের উত্তর সে অনেক আগেই তৈরি করে রেখেছে, শুধু বলার সময় হয়নি।

শঙ্খ সাহেব চুপ করে চিঠিটার দিকে তাকিয়ে থাকেন কিছুক্ষণ, তারপর তার গভীর দৃষ্টি চলে যায় তূর্য আর হিয়ার দিকে। গলার স্বর নিচু, কিন্তু তীক্ষ্ণ, তিনি প্রশ্ন ছোড়েন, "কি করে খুঁজে পেলে আমাকে? এ তো অসম্ভব!"

তূর্য শুধু হাসে। শঙ্খ সাহেব ধীরে ধীরে চিঠির খাম খোলে। তার আঙুল কাঁপে না, কিন্তু চোখের নিচে হালকা এক রক্তচাপের ছায়া খেলা করে। চিঠির কাগজ খুলে প্রথম লাইন পড়তেই তার মুখ বদলে যায়। চোখে হালকা জল, ঠোঁটে বিস্ময়ের রেখা। শুধু একটা শব্দ তার ঠোঁট থেকে বেরিয়ে আসে নিজের ইচ্ছেতেই, “তুহুরা আপা…”

তিনি চেয়ারে গা এলিয়ে দেন, চোখ বুজে ফেলেন এক মুহূর্ত। যেন তার স্মৃতির দরজা খুলে গেছে হঠাৎ। কাচের জানালায় বিকেলের আলো তখনও নরমভাবে এসে পড়ছে, কিন্তু কেবিনটা যেন হঠাৎ অতীতের কোনো সময়ে ঢুকে পড়েছে।

তারপর, শঙ্খ সাহেব ধীরে চোখ খোলেন, একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে ওঠেন, “অনেক বছর কেউ আমাকে এই নামে ডাকে না। স্বাত্ত্বকি আমার ডাকনাম। তবে বয়স বাড়লে ডাকনাম যেন মিলে যায় অন্য সব সম্মোধনের ভাঁজে। তাছাড়া এই নামে এখানে আর কেউ চেনে না আমাকে, তোমরা কি করে খুঁজে বের করলে আমাকে?"

তূর্য হেসে বলল, "সহজ ছিল না। তবে মন থেকে চাইলে সবই করা যায়। বেশ লম্বা সময় আপনাকে খুঁজছিলাম। বলতে পারেন এই চিঠিটার জন্য আপনাকে পাওয়া সহজ হয়েছে। এছাড়া কেউই জানতো না যে স্বাত্ত্বকির আসল নাম শঙ্খনীল সাহা। গতকালের আগের দিন পর্যন্ত আমি নিজেও আপনাদের দুজনকে দুটো আলাদা মানুষ হিসেবে ভেবে এসেছি। বলতে পারেন সবটাই ভাগ্য।"

শঙ্খ সাহেব তার কৌতুহল যেনো থামাতে পারছেননা। তিনি নিখুঁতভাবে চিঠিটা দেখতে থাকেন। এদের কথপোকথনের মাঝে হিয়া যেন অহেতুক অস্তিত্ব। তার মুখ ফ্যাকাশে। এই মানুষটা যে তুহুরার চিঠির প্রেরক, সেটা জানতো সে, কিন্তু স্বাত্ত্বকি নামটা যে এতখানি আবরণে ঢাকা ছিল, সেটা সে কল্পনাও করেনি।

শঙ্খ সাহেব চিঠিটায় একবার হাত বুলিয়ে শান্তভাবে জিজ্ঞেস করেন, "তুহুরা আপা কেমন আছেন এখন?"

একটু থেমে তিনি হিয়ার দিকে তাকিয়ে বলেন, "তুমি তাহলে তুহুরা আপার নাতনি?"

হিয়া কিছু বলতে যাবে তার আগেই তূর্য বলে, "তিনি অনেক আগেই মারা গেছেন।"

শঙ্খ সাহেবের চোখের কোণে জমে থাকা অতীত যেন। খানিকটা আঘাত পায়। চোখটা চকচকে হয়ে ওঠে।

_____________

চলবে....... 🥀