নির্বাসিত কৃষ্ণচূড়া — পর্ব ১৪

লেখক: সাদিয়া তিন্তি · বিভাগ: রহস্য · পর্ব ১৪ · ৪৭ পর্বের মধ্যে ১৪

হিয়া ঘরে ফিরে আসে। দরজাটা ধীরে বন্ধ করে দেয় পেছনে। ঘরের ভেতর আলো জ্বালানো, জানালার পাশে পর্দা হালকা দুলছে বাতাসে। বাইরে এখনও বৃষ্টি ঝরছে ধীরে, যেন কারও বিষণ্ণ সুর বাজছে অস্ফুটে।

সে ভিজা শাড়িটা গায়ে রেখেই চুপচাপ বসে পড়ে জানালার কাছের কাঠের চেয়ারে। বৃষ্টির ফোঁটা জানালার কাঁচে পড়ে টপটপ শব্দ করছে।

তার চুল থেকে জল টপকে পড়ে কাঁধ বেয়ে, আর শাড়ির ভাঁজে আটকে থাকা সেই কচি কৃষ্ণচূড়ার পাপড়িগুলো ধীরে ধীরে মুছে যেতে চাইছে।

হিয়ার চোখে কোনো জল নেই, কোন প্রকাশ্য দুঃখ নেই, তবু বুকের ভেতরটা ভার হয়ে আছে।

তূর্য চলে যাচ্ছে, এই ভাবনাটা যেন তার মধ্যে এক ধরণের শূন্যতা এনে দিয়েছে। কথা না বলা কোনো অনুভব, বুকে জমে থাকা একরাশ কিছু না বোঝা কষ্ট, সব মিলে কেমন এক দুঃখ দুঃখ অনুভব। হিয়া মাথা হেলিয়ে দেয় চেয়ারের পিঠে। চোখ বন্ধ করে। বৃষ্টির শব্দ, হৃদয়ের নিঃশব্দতা আর একটি অসমাপ্ত বিকেলের অনুভব। সব মিলিয়ে, সে কেবল অনুভব করে, তার তূর্য ভাই হয়তো সত্যিই অতিথি পাখি।

হিয়া নিজের সাথেই বোঝাপড়া করছে। হিয়ার কিশোরী মন কি বেশি বেহায়া হচ্ছে? হিয়ার মনে হচ্ছে এই কৃষ্ণবর্নের পুরুষটি পৃথিবীর সব সৌন্দর্য নিয়ে পালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। হয়তো প্রতিটা সৌন্দর্য আলাদা বর্ননায় বর্ননীয় হয়। তাহলে, কোই? হিয়া তার এই ছোট্ট জীবনে তার প্রেমিক পুরুষকে কল্পরাজ্যে যেভাবে সাজিয়েছে। এই পুরুষটা তো তেমন নয়। তাহলে হিয়ার মন কিসের প্রনয় পিপাসায় মগ্ন হচ্ছে?

হিয়া নিজেকে ভুল বোঝাতেও চাইছে না। মানুষ হয়তো তার স্বভাবের বিপরীত স্বভাবের মানুষে বেশি আটকায়। এটা কি নিয়ম?

হঠাৎ করেই দরজায় ঠক ঠক শব্দ। হিয়া এক ঝটকায় চোখ মেলে। দরজার ওপাশে মিম আর পিউ। বৃষ্টিতে ওরাও ভিজে গেছে।

পিউর গলা ভেসে আসে, “হিয়া আপি! দরজাটা দিয়েছিস কেন? খুল না!”

হিয়া তাড়াতাড়ি উঠে পড়ে। ভেজা শাড়িটা গায়ে লেগে আছে এখনও। তারপরও সে নিঃশব্দে ঘরের ভেতরটা একবার দেখে নেয়। মেঝেতে ভেজা শাড়ি থেকে টপকে পানি জমেছে, জানালার কাঁচ ঘেঁষে বই রাখা ছোট্ট টেবিলটায় ক’ফোঁটা জল এসে পড়েছে। সে তাড়াতাড়ি ঘরের কোণ থেকে শুকনো গামছাটা টেনে নেয়, কচি পা ফেলেই শুরু করে পানি মুছতে এরপর শাড়িটা খুব দ্রুত খুলে সালোয়ার সুটটা পরে নেয়।

মাঝেমাঝে দরজায় পিউর বিরক্ত গলা, “হিয়া আপি! আমরা একদম ভিজে আছি তো!”

শেষমেশ হিয়া একটা শীতল নিঃশ্বাস ফেলে, ভেতরের তোলপাড় অনুভবটাকে গিলে নিয়ে দরজার দিকে এগোয়। দরজাটা খুলতেই ঢুকে পড়ে মিম আর পিউ, দু’জনেই ভিজে, চুল ভিজে কপালে লেগে আছে।

পিউ ঢুকেই অভিমানী গলায় বলে ওঠে, “তুই দরজাটা দিলি কেন, হিয়া আপি। দেখ কি অবস্থা আমাদের। কিন্তু তুই ভিজেছিস কিভাবে?”

মিম এক ধাপ পিছিয়ে দাঁড়িয়ে হিয়ার দিকে তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ। তার চাউনি একটু ধীর, একটু গভীর, “সব ঠিক আছে তো?” তার প্রশ্ন নয়, বরং এক ধরনের বোঝা কথা।

হিয়া কিছু বলে না। শুধু হালকা একটা হাসি আনার চেষ্টা করে। হিয়ার ভেজা চুলের ওজন যেন এবার ওর বুকের ভেতরের ওজনের চেয়ে হালকা মনে হয়।

পিউ ঘরে ঢুকেই থমকে দাঁড়ায়। চোখ চলে যায় জানালার পাশে রাখা টেবিলটার দিকে। সেখানে ছড়ানো একগাদা কৃষ্ণচূড়া, জারুল আর সোনালু ফুল। রঙে রঙে ভরে গেছে চারপাশ। যেন এক টুকরো বসন্ত এসে বসে আছে বৃষ্টির দিনে।

পিউ চোখ বড় বড় করে বলে, “ইস! হিয়া আপি, এত ফুল! কোথায় পেয়েছিস এগুলো?”

হিয়া জানালার পাশে এসে দাঁড়ায়। জানালার গা ঘেঁষে ঠোঁটে হালকা ক্লান্তির হাসি। একবার মিমের সাথে চোখাচোখি হয় এরপর হিয়া বলে,

“আমি এনেছি। বৃষ্টিতে ভিজতে ইচ্ছে করছিল, তাই রাস্তার দিকে গিয়েছিলাম, ওখান থেকে এনেছি... ঠিক যেন আমার জন্যই রেখেছিলো কেউ।”

একটা কৃষ্ণচূড়ার পাপড়ি তুলে নেয় সে হাতে।

“এইজন্যেই তো ভিজে গেলাম, আর এখন মাথা ধরে গেছে। আর বকবক করিস না প্লিজ।”

পিউ আর কথা বাড়ায় না। চুপচাপ মিমের দিকে তাকায়। মিম ইশারায় বলে, “চল, শাড়ি চেঞ্জ করে নেই।”

দু’জনে চলে যায় কাপড় পাল্টাতে। ঘর আবার কিছুটা নিঃশব্দ হয়ে আসে। বৃষ্টি ধীর হয়ে এসেছে, কিন্তু জানালার পাশে ফুলগুলোতে টপটপ জল পড়ছে এখনও।

ঠিক তখনই বাইরে থেকে আওয়াজ, “হিয়া আপি...”

ভেজা গলার নিচু ডাক। হিয়া দরজার দিকে তাকায়। আলিফ দাঁড়িয়ে, হাতের ট্রেতে কয়েক কাপ ধোঁয়া ওঠা আদা চা। “তূর্য ভাইয়া বলেছেন তোমাকে এইটা দিতে।”

পিউ ওয়াশ রুম থেকে চুল মুছতে মুছতে বেরিয়ে বলে ওঠে, “আলিফ! রাশিদা খালারে একটু বলবে প্লিজ হিয়া আপির মাথা ব্যথা। আপি সহ আমাদের সবাইকে যেন একটু আদা চা দেয়।”

হিয়া হালকা হেসে, পেছনে পিউয়ের দিকে তাকায়। পিউ হিয়ার হাসি দেখে এগিয়ে এসে আলিফের হাতে আদা চা দেখে অবাক। পিউ ভেবেছিল আলিফ বরাবরের মত চা বানানোর হুকুম করতে এসেছে। তাই ওকেই চা আনতে পাঠানোর প্লানে ছিল। কিন্তু এ ছেলে সবার জন্য চা নিয়ে হাজির। হিয়া হাত বাড়িয়ে চা'য়ের ট্রে হাতে নেয়। আলিফ কোন কথা বলে না। পিউয়ের বিষ্মিত মুখের দিকে তাকিয়ে ট্রে রেখে চলে যায়।

হিয়া ট্রে টেবিলে রেখে, এককাপ চা নিয়ে বসে পড়ে জানালার পাশের চেয়ারে। কাপ থেকে ভাপ উঠে আসে, ভিজে চুলের ফাঁকে গিয়ে লাগে।

এক ঢোক নিয়ে চোখ বন্ধ করে। গন্ধটা যেন একটা খুশির মতো।

হিয়া এক ঢোক চা খায়। উষ্ণ আদার তীব্রতা জিভ ছুঁয়ে বুকের ভেতর পর্যন্ত নেমে যায়। কাপে ঠোঁট ছুঁইয়ে চোখ বন্ধ করে সে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। বাইরের বৃষ্টি কমে এসেছে, কিন্তু জানালার ধারে কাচে জমে থাকা জলের রেখাগুলো এখনও ফোঁটা ফোঁটা করে গড়িয়ে পড়ছে, ঠিক যেন হিয়ার বুকের ভেতরের কথাগুলোর মতো স্পষ্ট নয়, কিন্তু থেমে নেই।

এই এক কাপ চা, এইটুকু আদরের ইঙ্গিত, হঠাৎ করে তূর্যর ছায়া হয়ে ওঠে হিয়ার চারপাশে।

তূর্য নিজে এসে কিছু বলেনি। কিন্তু এই চা… এটা কি নিছকই শিষ্টাচার? নাকি তার নিরব বিদায়ের আগে রেখে যাওয়া একফোঁটা স্নেহ?

নাকি হিয়ার দিকে চুপচাপ ফিরে তাকানো শেষবারের মতো?

হিয়া জানে না। সে শুধু জানে, এই কাপ চায়ে আজকে কোনও তাজা পাতা নেই।‌কিন্তু আছে একরাশ পুরনো অনুভব। তূর্যর আদলে গাঁথা এক ধরনের নৈঃশব্দ্য, যে নৈঃশব্দ্য কানে কিছু না বললেও হৃদয়ে অনেক কিছু বলে যায়।

সন্ধ্যে ছেয়ে গেছে ধরনীতে। হিয়া হাসে নতুন উষ্ণ অনুভুতিতে। তারপর সে চুপ করে বসে থাকে। তার মনে অযাচিত হাজার প্রশ্ন উঁকি দিচ্ছে। প্রকৃতিও কি এই একই অনুভূতির পথ অতিক্রম করে শেষ অসমাপ্ততায় পৌঁছেছে?

হঠাৎ বিছানার পাশ থেকে মিম আর পিউর চাপা কথাবার্তা ভেসে আসে। দূরে কোথাও আবার বৃষ্টি পড়তে শুরু করেছে।

হিয়া চুপচাপ চা শেষ করে কাপটা জানালার পাশে রাখা টেবিলটায় রাখে। জানালার কাচের ওপাশে কৃষ্ণচূড়া ফুলের গাছে যেন আরও গাঢ় হয়ে উঠেছে রক্তিম ছায়া।

হঠাৎ হিয়া নিচু গলায় মিমকে জিজ্ঞেস করে, “তোরা কি কালই চলে যাবি?”

মিম একটু থেমে যায়, তারপর মাথা হেলে বলে, “হ্যাঁ, কাল সকালেই যাবো। আমার ভার্সিটির ভর্তি কোচিং শুরু হবে, তাই বাবা খুব চাপ দিচ্ছে। আর তূর্য ভাইয়েরও সামনে পরীক্ষা।”

হিয়ার মুখ ফিরিয়ে বাইরে তাকায়। জানালার পাশে কৃষ্ণচূড়ার লাল টুকটুকে পাপড়ি ছড়িয়ে পড়ে আছে মেঝেতে। যেন বিদায়ের আগে ফুল ফোটানো শেষ অভিমান।

পিউ কিছুক্ষণ চুপ থেকে আস্তে করে বলে, “আপি, তুই ঠিক আছিস তো?”

হিয়া কিছু বলে না। সে শুধু হালকা মাথা নাড়ে। তার চোখের চাউনি চলে যায় আকাশের দিকে। এরপর ফোন তুলে মেসেজ লিখে তূর্যকে, "কাল কি যেতেই হবে?"

তূর্য যেন ফোন হাতেই বসে ছিল। সাথে সাথেই ওপাশ থেকে রিপ্লে আসে, "থেকে যাবো?"

হিয়া চোখ তুলে একবার ফুল গুলো দেখে নেয়। এরপর লেখে, "আপনি চলে গেলে প্রকৃতির রহস্যের সমাধান কিভাবে হবে?"

তূর্য লেখে, "ওটা চিন্তা করিস না। প্রকৃতিকে খুঁজব বলেছি তো খুঁজেই বের করবো।"

হিয়া হাসে, "এতো সহজ হলে কি বড় দাদা এতো দিনে খুঁজে পেতেন না?"

তূর্য নিরব। এরপর কয়েক মিনিট পর রিপ্লে দেয়, "মানুষ খুঁজতে চাইলে সৃষ্টিকর্তাকে ও খুঁজে পায়। আর এ তো সামান্য মানুষ। দেখা যাক কি হয়। আসলেও বড় দাদা খুঁজতে চেয়েছেন কিনা এ উওর কে দিতে পারে?"

হিয়া এবার রেগে ওঠে, "আমি দিতে পারি এই উওর। মানুষের চোখ কখনো মিথ্যা বলে না। আমি বড় দাদার চোখে প্রেম, ভালোবাসা, যন্ত্রণা দেখেছি। আর যে মানুষ একটা মানুষের নামে তার সমগ্র জীবন উৎসর্গ করে দিয়েছে তাকে কিসের সন্দেহ!"

তূর্য এবার রিপ্লে দেয়, "ঠিক আছে ভুল হয়েছে। দেখা যাক কি হয়।”

ঠিক তখনই দরজার পাশ থেকে রাশিদার কণ্ঠ ভেসে আসে, “মামুনিরা সবাইকে এখনই বড় বাবু ডেকেছেন, এক্ষুনি যেতে বলেছেন।”

হিয়া চুপচাপ উঠে দাঁড়ায়, মুখে কিছু না বলেই ধীরে ধীরে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। পিউ আর মিম তাকে অনুসরণ করে।

হিয়া ধীরে ধীরে পায়চারি করে এগিয়ে যায় রুশান মোহাম্মদের ঘরের দিকে। মাথার ভেতর অনেক প্রশ্ন, অনেক অব্যক্ত অনুভূতি।

সবাই ধীরে ধীরে এসে বসে রুশান মোহাম্মদের ঘরে। ঘরটায় তখন গাম্ভীর্য আর স্নিগ্ধতার এক অদ্ভুত মিশেল। জানালার বাইরে থেকে রোড লাইটের ভেজা আলো এসে পড়ছে তার সাদা পাঞ্জাবিতে, যেন একটা নরম আভায় তিনি জ্বলজ্বল করছেন।

তিনি চোখে চশমা এঁটে সবাইকে একবার চোখ বুলিয়ে বলেন,‌ “তোমরা সবাই বসো। আজ তোমাদের কিছু বলার ছিল।”

সবাই নিরবে বসে পড়ে। হিয়া আর তূর্য দুই প্রান্তে, মাঝে মিম, পিউ আর আলিফ।

রুশান মোহাম্মদ একটু থেমে বলেন, “প্রকৃতির ডায়েরিটা ফিরে পাওয়াটা ছিল অনেক বড় ব্যাপার। আমি জানি না, তোমরা ঠিক কীভাবে কী করেছো... তবে আমি মনের গভীর থেকে তোমাদের প্রত্যেকের প্রতি কৃতজ্ঞ। তোমাদের অসংখ্য ধন্যবাদ।”

তার কণ্ঠের গভীরে এক ফোঁটা কম্পন শোনা যায়, কিন্তু তিনি নিজেকে সামলে নিয়ে বলেন,

“তোমাদের কাল থেকেই ফিরতে হবে জানি... এই বাড়িটা আবার একা হয়ে যাবে। প্রতিবারই যেভাবে হয়ে আসে, আবার সেভাবেই নিঃশব্দ হয়ে যাবে বারান্দাগুলো, ছাদটা। তবে তোমাদের এই উপস্থিতি এই বাড়িকে কিছুদিনের জন্য আবার জীবন্ত করে তুলেছিল।”

তিনি তাকান হিয়ার দিকে, তারপর মিমের দিকে।

“তোমাদের সামনে অনেক বড় পথ, অনেক স্বপ্ন। পড়াশোনায় মন দাও, ভালো করে তৈরি হও। নিজের স্বপ্নের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হও, নিজেদের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলো। তোমাদের জীবনের এইধাপটা সবথেকে সুন্দরতম ধাপের মধ্যে একটা।”

একটা নরম নীরবতা নেমে আসে ঘরজুড়ে। হিয়ার চোখে জল টলমল করে ওঠে, কিন্তু সে দ্রুত মুখ ঘুরিয়ে নেয়। মিম নিঃশব্দে মাথা হেঁট করে বসে থাকে।

রুশান মোহাম্মদ এরপর আলিফ আর পিউর দিকে তাকিয়ে বলেন,‌ “তোরা তো দস্যি হলেও আমার খুব প্রিয়। দস্যি পানা ছাড়িস না।”

রুশান মোহাম্মদ এবার চোখ সরিয়ে তূর্যের দিকে তাকান। একটু থেমে তার দিকে তাকিয়ে যেন পুরনো কোনো মুখ খুঁজে ফিরছেন। আলো-আঁধারের ভেতরেও তাঁর দৃষ্টিতে স্পষ্ট এক ধরনের মায়া।

তিনি নিচু গলায় বলেন, “তূর্য... তুই ঠিক হাসান ভাইয়ের মতোই হয়েছিস।”

সবাই চুপচাপ তাকিয়ে থাকে। তূর্যও কিছুটা বিস্ময় আর অনিশ্চয়তা নিয়ে বৃদ্ধর চোখে চোখ রাখে। “তোর দাদু একজন অসাধারণ মানুষ ছিল। অমায়িক, সংবেদনশীল, অথচ ভেতরে খুব শক্ত। তোর চোখে, তোর আচরণে আমি উনাকে বারবার দেখতে পাই।”

তূর্য এবার মাথা নিচু করে। এমন কিছু বলার ছিল না যেন, অথচ অনেক কিছু জমে উঠেছে। ঘরের ভেতর তখন আর কিছু শোনার ছিল না। শুধু বাতাসে যেন একটু বেশি ভারী হয়ে উঠেছে অনুভূতির সুর।

রাত ধীরে ধীরে আরও গভীর হয়। ঘরজুড়ে আড্ডার সুর কিছুটা হালকা হলেও, কারও কারও ভেতরটা ভার হয়ে থাকে। পুরনো গল্প, ছোট ছোট হাসি, আর নিঃশব্দ দৃষ্টিবিনিময়ে সময় এগিয়ে চলে। একসময় রুশান মোহাম্মদ বললেন, “চলো এবার সবাই বিশ্রাম নাও। ভোরে তো আবার অনেক কিছুর প্রস্তুতি নিতে হবে, তূর্য, মিম, আলিফ তোমাদের তো যেতেও হবে।”

সবাই ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায়। মিম পিউ আলিফ একে একে বিদায় নিয়ে নিজেদের ঘরে চলে যায়। তূর্য একটু পেছনে থাকে, আর হিয়া পেছন থেকে তাকিয়ে থাকে তার দিকে। বাইরে তখন বৃষ্টির শব্দ ঘনিয়ে এসেছে। জানালার কাঁচে টিপ টিপ করে বৃষ্টি পড়ছে। হিয়া ধীরে দরজা বন্ধ করে নিজের ঘরে আসে। খাটে বসে জানালার কপাট খুলে দেয়। বৃষ্টির ছাঁটে তার গালটা একটু ভিজে ওঠে। সে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকে অন্ধকারে ঝরতে থাকা বৃষ্টির দিকে। মনে মনে বলে ওঠে, “আরো বৃষ্টি হোক… রাতটা যেন খুব ধীরে কাটে…”

তারপর নিজেকেই প্রশ্ন করে, “কেন চাইছি এত বৃষ্টি? যেন কাল সকালে কেউ যেতে না পারে?”

তার বুকের ভিতরটা কেমন হালকা হালকা কাঁপতে থাকে। “আমি কি চাই… তূর্য ভাই থেকে যাক?”

বৃষ্টির শব্দের ভেতরেও সে নিজের হৃদয়ের এই স্বীকারোক্তিকে স্পষ্ট শুনতে পায়। তবে উত্তরটা তখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। শুধু বাইরে টুপটাপ শব্দ করে ঝরে পড়ছে না-বলা কথাগুলোর মতো বৃষ্টি।

_______________

চলবে.......🖤