নির্বাসিত কৃষ্ণচূড়া — পর্ব ৪৫

লেখক: সাদিয়া তিন্তি · বিভাগ: রহস্য · পর্ব ৪৫ · ৪৭ পর্বের মধ্যে ৪৫

সূর্য যখন তার আলোর চাদর মেলে দেয় জানালার পর্দায়, তখনও ঘরের ভেতর নিস্তব্ধতা। হিয়ার ঘুম ভাঙে পাখির কিচিরমিচির শব্দে। সে চোখ মেলে দেখে সে তূর্যর বুকের সাথে লেপ্টে আছে। তূর্য ঘুমে অচেতন।তার মুখে এক স্বর্গীয় প্রশান্তি। সে কখনোই তো এই মানুষটাকে এতো কাছ থেকে দেখেনি। মানুষ বুঝি এতো স্নিগ্ধ হয়? হিয়া অপলক তাকিয়ে দেখে যায় তার ব্যক্তিগত পুরুষটিকে। তূর্য হঠাৎ নড়ে ওঠে, ঘুমটা গভীর থেকে ভেঙেছে। হিয়া একটু সরে দেয়াল ঘড়ির কাঁটার দিকে তাকিয়ে সময় দেখে। সময় সকাল দশটা বেজে আটত্রিশ মিনিট‌। হিয়ার চোখ কপালে ওঠে। সে এক ঝটকায় উঠে চেঁচিয়ে বলল, “হায় আল্লাহ! সাড়ে দশটার বেশি বেজে গেছে!”

হিয়ার এমন হুলুস্থুল কাণ্ড দেখে তূর্য নিজেও ওঠে বসে। হিয়া তাড়াহুড়ো করে উঠে লাগেজ থেকে একটা লাল সুতি শাড়ি নিয়ে ওয়াশ রুমে চলে যায়। তূর্য বোকার মতো হিয়ার যাওয়ার পথে তাকিয়ে বসে থাকে। তার কোনভাবেই বোধ ক্ষমতায় আসে না হিয়ার এমন তাড়াহুড়োর কারন। মিনিট দশের মাঝেই হিয়া গোসল সেরে তার সদ্য ভেজা চুলে লাল শাড়িতে বেরিয়ে আসে ওয়াশরুম থেকে। তূর্য শুধু চুপচাপ দেখে যায় হিয়াকে। সকাল সকাল এমন দৃশ্যে সে একেবারে বাকরুদ্ধ হয়ে ঠায় বসে থাকে বিছানায়।

হিয়া তূর্যর এমন জমে থাকা দেখে তূর্যর কাছে এসে জিজ্ঞেস করে, "আপনার কি শরীর খারাপ লাগছে?"

তূর্য হিয়ার অবাধ্য ভেজা চুল গুলোকে আলতো ছুঁয়ে বলল, "আমি একেবারেই অপ্রস্তুত ছিলাম তোকে ভিজে চুলে নববধূর মতো লাল শাড়িতে দেখতে।"

হিয়া হেসে উঠে বলল ,"অভ্যেস করে নিন। এভাবেই এখন থেকে দেখতে হবে আপনার আমাকে। এখন তাড়াতাড়ি রেডি হন। বাড়ি ভত্তি মেহমান আর নতুন বউ বেলা ১০ টা অব্দি ঘুম। ছি ছি কি বাজে বিষয়।"

তূর্য ভ্রু কুঁচকে বলল, "কোন বাজে বিষয় নয়। ওরা যেন কেউ বিয়ে করেনি!"

হিয়া তূর্যর কথায় গুরুত্ব না দিয়ে তাড়াহুড়ো করেই রেডি হতে লাগলো। ঘরের এদিক থেকে ওদিকে ছুটতে গিয়েই নিজের শাড়িতে পা বেঁধে ঘরের মাঝে স্লিপ কেটে হুমড়ি খেয়ে পড়লো দেয়ালের উপর। সাথে দেয়ালের মাঝে গিয়ে মাথার এক পাশে প্রচণ্ড ধাক্কা খায় হিয়া। চেঁচিয়ে ওঠে সে, “আউচ্!”

তূর্য আচমকা পরিস্থিতি না বুঝে ছুটে এসে হিয়াকে ধরে। "ঠিক আছো তুমি। কি করে পড়লে!"

হিয়া কোনো কথা বলার আগেই। তূর্য হিয়াকে পাঁজা কোলে তুলে নিয়ে বিছানায় বসায়। হিয়ার চোখে পানি, কপালের পাশে লালচে দাগ, মুহূর্তের মধ্যেই তা ফুলে ওঠে। আঘাতটা প্রচন্ড লেগেছে তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

“ওহ গড! মাথায় ফুলে গেছে! বস! আমি বরফ আনছি,” বলেই ছুটে যায় তূর্য। ফ্রিজ থেকে বের করে বরফ এনে কাপড়ে মুড়ে হিয়ার কপালে আলতোভাবে চেপে ধরে। হিয়া চোখে স্পষ্ট যন্ত্রণা, প্রচন্ড মাথা ঘুরছে তার। তূর্য একেবারে সারা বাড়ি মাথায় তুলে নেয় মুহুর্তে। বাড়ি ভত্তি মেহমান। সকলে পালা করে আসে আর আফসোস করে চলে যায়। তূর্য তাদের পারিবারিক ডাক্তারকে পর্যন্ত ডেকে নিয়েছে। নূরজাহান বেগম হলুদ দুধ, এটা ওটা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে ওঠেছেন। মিম চুপটি করে হিয়ার পাশে বসে আছে। আরমান সাহেব পর্যন্ত চিন্তিত হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। নূরজাহান বেগম হিয়ার মাথায় হাত দিয়ে খুব অসহায় হয়ে বলেন, “আহা রে! বৌভাতের আগেই বউয়ের মাথায় এমন চোট! কি লজ্জাজনক বিষয়! হিয়ার বাবা-মার কাছে আমি মুখ দেখাবো কি করে! বলবে একদিনের জন্যও মেয়েটাকে যত্নে রাখতে পারিনি।"

আরমান সাহেব নিজের স্ত্রীর মুখে এমন কথা শুনে বেশ উপহাস করে বলেন, "ঠিক বলেছো। সবাই ভাব্বে তূর্য বউ পেটায়।”

নূরজাহান বেগম ব্যপারটাকে একেবারে সত্য ভেবে ছল ছল চোখে তূর্যর দিকে তাকিয়ে বলেন, "না না। আমার ছেলেকে ওই শিক্ষা দিয়েছি নাকি! তাও যদি ভাবে!! ডাক্তার কখন আসবে?"

তূর্য মুচকি হেসে বলে, “উফ মা! আব্বু বললো আর তুমি মেনে নিলে? আব্বু মজা করছে তোমার সাথে।”

হিয়া অপ্রস্তুত হয়ে চোখ নামিয়ে ফেলে। ঠিক তখনই ডাক্তার এলেন, চেকআপ করলেন। সব একেবারে ঠিক আছে। বেশি ব্যথা হলে পেইনকিলার খেলেই চলবে। তূর্য তখনো বরফ ধরেই রেখেছে। হিয়াকে দেখতে সব থেকে শেষে এলেন মিনু রহমান। তিনি এসেই বলেন, "নিশ্চিত নজর লেগেছে। আমার মা বলতেন, নতুন বউদের নজর সহজে লাগে। হয়তো এজন্যই হয়েছে। এসো একটু ঝেড়ে দেই।"

মিনু রহমান পরম যত্নে দোয়া দুরুদ পড়ে ঝেড়ে দেন। হিয়া যেন পরিচিত মানুষদের আবার নতুন করে চিনছে। ঘণ্টাখানেকের ভেতর ঘরটা অনেকটা শান্ত হয়ে আসে। অতিথিদের ব্যস্ততা কমে আসে। সবাই একটু একটু করে নিচে নেমে যায়। শুধু হিয়া, একটু শুয়ে থেকে বিশ্রাম নেয়। তূর্য নিজেও হিয়াকে একটু বিশ্রাম নিতে দিয়ে ঘর থেকে বের হয়। বৌভাতের আয়োজনের অনেক কিছুই বাকি। সেসবের একটু খোঁজ খবর নেয়।

হিয়ার চোখ আধো ঘুম আর আধো ক্লান্তিতে বন্ধ, কিছু বলার মতো শক্তি নেই। প্রথমে একটুখানি ঘুমিয়েও পড়ে সে। কিন্তু তারপর হঠাৎ কী এক অস্বস্তিতে তার ঘুম ভেঙে যায়। শুয়ে শুয়েই ভাবতে থাকে, মাথায় যে ব্যথাটা হচ্ছিল তা এখন অনেকটাই কমে এসেছে। কপালের সাইডটা একটুখানি ফুলে আছে, কিন্তু যেভাবে আঘাতটা লেগেছিল তাতে তো এর চেয়ে অনেক বেশি হওয়ার কথা!

হিয়া উঠে বসে, আলতো পায়ে ঘরের এক কোণে রাখা আয়নার সামনে যায়। তার মাথার পাশের ফোলা জায়গাটা ধীরে ধীরে আঙুল দিয়ে ছুঁয়ে দেখে। ফুলে আছে বটে, কিন্তু রঙ তো কালচে হয়নি, ফাটেনি, এমনকি রক্ত পর্যন্ত বের হয়নি! হয়তো তূর্যর সাথে সাথে দেয়া বরফের ফলাফল এটা।

হিয়া একটুক্ষণ দাঁড়িয়ে নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়ে থাকে। হঠাৎই তার মস্তিষ্কে উকি দেয় তুহুরা। হিয়া নিজের মাথায় ভালো করে দেখে জটিল ভাবনায় চলে যায়। তার মাথায় এতো জোরে লাগার পরও এই সামান্য ফোলা অংশ! তাহলে তুহুরার ঠিক কতোটা লেগেছিল যে স্পট ডেথ?

আব্দুর রবিউল মোহাম্মদের ভাষ্যে, দুজনের ঝামেলা হয়। সেই ঝামেলায় আব্দুর রবিউল মোহাম্মদ তুহুরাকে ধাক্কা দিয়ে বেরিয়ে যান ঘর থেকে। আর তুহুরার মাথা দেয়ালে লেগে আঘাতে তার মাথায় ফেটে যায়, প্রচন্ড রক্তপাত হয়, এরপর ব্রেন হ্যামারেজ। স্পট ডেথ।

হিয়ার চোখ ছোট হয়ে আসে। সে এগিয়ে সেই দেয়ালের কাছে যায় যার উপর সে হুমড়ি খেয়ে পড়েছিল। দেয়ালটার দিকে এক নজরে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলে ওঠে, "আমার শরীরের সমস্ত ভর সমেত আমি দেয়ালের উপর মুখ থুবড়ে পড়লাম। ঠিক এমন সাউন্ড হল, এমন ধাক্কা যে মনে হল মাথা ফেটে যাবে। কিন্তু কিছু না, এই সামান্য ফুলে গেছে। তাহলে তুহুরার সাথে কি সত্যিই এমন দুর্ঘটনা ঘটেছিল? নাকি ইচ্ছাকৃত কিছু?"

হিয়ার চোখের পাতা কাঁপে। গলা শুকিয়ে আসে। মনটা ধীরে ধীরে ভারী হয়ে ওঠে। তার একটা মুহূর্তের জন্য আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে খুব ছোট মনে হয়, খুব দুর্বল।

তুহুরার মৃত্যু…একটা "দুর্ঘটনা" নাকি একটা "অপরাধ"?

একটা তীব্র অস্থিরতা, অস্পষ্ট কাঁপুনি হিয়ার বুকের ভেতর চেপে বসে। তবে সে মুখে আনতে পারে না কথাগুলো। তার নিজের মাথায় লাগা আঘাত যেন এক অদ্ভুত প্রশ্নচিহ্ন হয়ে মাথার ভেতর ঘুরে ফিরে আসে। হিয়া ধীরে ধীরে বিছানার দিকে ফিরে আসে। একটু ক্লান্ত লাগে।

তবে শুধু শরীর নয়, এবার মনে... নতুন একটা দ্বিধা জন্ম নিয়েছে।

এটা কি কেবলই কাকতালীয়? নাকি… একটা দীর্ঘ সময় পর নতুন করে জেগে ওঠা সত্যের ইঙ্গিত?

হিয়া বিষয়টাকে গভীরে চেপে রাখে। এ যেন সঠিক সময় নয়। তার মন এক বিষণ্ণ স্তব্ধতায় আচ্ছন্ন হয়ে ওঠে। মনে হচ্ছে তার ভিতরকার পৃথিবীটা কেমন করে যেন বদলে যাচ্ছে চেনা ঘটনা, চেনা ব্যাখ্যাগুলো হঠাৎ করে নতুন রঙে ধরা দিচ্ছে। তবে আব্দুর রবিউল মোহাম্মদ যে অপরাধী এতে তার সঙ্কা নেই। হয়তো তার এমন ভেঙে পড়া রুপ দেখে হিয়ার মায়া হয়েছে। তাই তুহুরার মৃত্যুর দূর্ঘটনার আখ্যা দিতে চাইছিল। তাছাড়া ভুল হোক, দূর্ঘটনা হোক আব্দুর রবিউল মোহাম্মদই তো তুহুরার খুনি।

ঠিক সেই মুহূর্তেই দরজায় হালকা একটা শব্দ হয়। দরজার ফাঁক গলে উঁকি দেয় মিম। মিম হিয়াকে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বলে, "উঠেছিস? শরীর কেমন এখন?"

নরম গলায় বলা প্রশ্নটা যেন হিয়াকে তার নিজস্ব চিন্তার ভিড় থেকে একটু টেনে আনে। হিয়া ধীরে ফিরে তাকায়। তারপর বিছানার পাশে এসে বসে পড়ে। মিম এগিয়ে এসে পাশে বসে বলে, "এখন কেমন লাগছে? ব্যথা কমেছে?"

হিয়া মাথা নাড়ে। এক নিঃশ্বাসে বলে, "ঠিক আছি। তেমন কিছু না। একটু বিশ্রামেই ভালো লাগছে।"

হিয়ার গলায় অদ্ভুত স্বাভাবিকতা, কিন্তু চোখের গভীরে অভ্যন্তরীণ ঝড়ের রেশ এখনও দুলছে। তবু, নিজের তোলপাড় হওয়া মনস্তত্ত্বটা লুকোতে জানে সে।

মিম হিয়ার চোখে চোখ রাখে না। সে একটু অপ্রস্তুতভাবেই বলে ফেলে, "দাদি বলেছে, তোর শরীর যদি ভালো লাগে, তাহলে যেন একবার তার ঘরে যাস।"

হিয়া একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, "দেখেছিস? নতুন বউ বলে সবাই কত কথা বলার অপেক্ষায়… কারো সাথে একটু কথা বলবো, অতিথিদের সঙ্গে আলাপ করবো, সব উবে গেল। আমি মাথায় আঘাত নিয়ে পড়ে আছি ঘরে।"

মিম একটু হেসে কোমল গলায় বলে, "বিপদ কি কেউ নিজে ডেকে আনে রে? যা ঘটে, তা তো হঠাৎ করেই ঘটে। তুই এসব নিয়ে ভাবিস না। তোর কিছু হয়নি সেটাই তো বড় কথা। শরীর ভালো লাগলেই চল দাদির সাথে দেখা করে আয়।"

হিয়া আর দেরি করে না। দু’হাত দিয়ে চুলটা একটু গুছিয়ে নিয়ে উঠে দাঁড়ায়। তার চোখে এখন আর হতাশা নেই, বরং এক অভ্যন্তরীণ স্থিরতা, এক দৃঢ়তা যেন জমাট বাঁধছে। হিয়া বলে, "এখনই যাই। এখন, আমি একেবারেই ঠিক আছি। শরীর ভালো লাগছে।"

মিম একবার হিয়ার মুখের দিকে তাকায়। তারপর নিশ্চিন্তে হাসে। এরপর দুজনেই ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ে ধীর পায়ে। বাড়ির করিডোর পেরিয়ে নিচের দিকে যাবার সময়, তূর্য একরকম চেঁচিয়ে ওঠে, "তুই কেন উঠে এসেছিস? ব্যথা কমেছে?"

তূর্য এগিয়ে আসে তাড়াহুড়ো করে। বসার ঘরে সহ আশেপাশে উপস্থিত আত্মিয় স্বজন সকলেই মিটি মিটি করে হেসে ওঠে তূর্যর এমন অস্থিরতায়। হিয়া তূর্যর এমন অস্থিরতা কমাতে একটা মিষ্টি হাসি হেসে বলে, "আমি একদমই ঠিক আছি। আপনি এখন নিশ্চিন্তে থাকুন। দাদি দেখা করতে বলেছিলেন তাই ভাবলাম একটু ঘুরে আসি।"

তূর্য ভ্রু কুঁচকে বলে, "আমাকে ডেকে নিতি, একা কেন?"

মিম বাঁকা চোখে বলে, "একা মানে। এই যে আমি! এতো বড় একটা মানুষ নজরে পড়ে না।"

তূর্য চোখ ছোট করে বলে, "তুই নিজেকে সামলাতে পারিস যে হিয়াকে সামলাবি?"

সকলের উৎসুক দৃষ্টি হিয়াকে খুব অস্বস্তিতে ফেলছে। সে তূর্যর মুখের দিকে তাকিয়ে বলে, "আমি এখন একদমই ভালো আছি। আমার কোন অসুবিধা হচ্ছে না। দাদি ডাকছেন একটু দেখা করে আসি। সবাই তাকিয়ে আছে অদ্ভুতভাবে, এখানে এসব কথা বাদ দেন।"

তূর্য একবার এদিকে ওদিকে তাকিয়ে বলে, "তোর এত মানুষকে নিয়ে ভাবতে হবে না। চল আমিও তোর সঙ্গে যাচ্ছি দাদির ঘরে।"

এই বলে হিয়ার সাথে মিনু রহমানের ঘরের দিকে পা বাড়ায়। ঘরটিতে পা রাখতেই যেন এক পুরোনো সময়ের গন্ধ হিয়ার নাকে এসে লাগে। এ ঘরে সে বহু বছর পরে এলো। সেই কবে কোন ছোট বেলায় এসেছিল বোধহয়। ঘরটাতে আতরের হালকা ঘ্রাণে মিশে আছে ধুলোমলিন স্মৃতির ছায়া। স্তব্ধ একটা ঘর, চারপাশে বইয়ের তাকে বোঝাই করা পুরোনো বই, খাটের পাশে রাখা একটা ছোট সাইড টেবিলের ওপর ছড়িয়ে আছে কিছু এলবাম। মিনু রহমান তার নিজের বিছানায় কোলের ওপর একটা পুরোনো এলবাম নিয়ে বসে আছেন। তাঁর চোখজোড়া স্থির, স্মৃতি-বিহ্বল। ধীরে ধীরে পাতা উল্টে যাচ্ছেন। তাঁর আশেপাশে যেন একটা নিস্তব্ধ সময় জড়িয়ে আছে। মিম মিনু রহমানকে পুরোনো এলবাম দেখতে দেখে একেবারে দৌড়ে গিয়ে বিছানায় বসে বলে উঠল, "দাদি! তুমি পুরোনো এলবাম দেখছো? আমিও দেখবো! আমাকে একবার ডাকবে তো!"

তার গলায় খুশির সুর, আর চেহারায় সেই শিশুসুলভ উচ্ছ্বাস। মিনু রহমান‌ মিমের এমন বাচ্চামির সাথে পরিচিত। তিনি হেসে উঠে বললেন, "পুরোনো ছবি ছুলেও যেন শান্তি লাগে। যতো দিন যাচ্ছে ততো নতুন নতুন ছবি যুক্ত হচ্ছে। কতো শত সময় পেরিয়ে গেল! এই গুলোই তো দিন শেষে পড়ে থাকে।"

তূর্য আর হিয়া তখনো দাঁড়িয়ে। মিনু রহমান মুখ তুলে তাকিয়ে হিয়াকে দেখেন। তার চোখে এক মায়াভরা দৃষ্টি। তিনি হেসে বলেন, "এসো নাতবউ, এখন শরীরটা ভালো আছে তো?"

হিয়া সামান্য মাথা নোয়ায়, "ভালো আছি দাদি। এখন অনেকটাই সুস্থ বোধ করছি।"

মিনু রহমান এবার হাতের ইশারায় ডেকে বলেন, “এসো। দুজনে আমার কাছে এসে বসো।”

তূর্য আর হিয়া এগিয়ে এসে খাটের একটা পাশে জায়গা করে নেয়। কিছুক্ষণ পরে আলিফসহ আরও দুই-তিনজন খালাতো-মামাতো ভাইবোন এসে হাজির হয়। ঘরটা এক নিমিষেই প্রাণচঞ্চল হয়ে ওঠে, ঠিক যেন একটা ক্ষণস্থায়ী সময়-মেলা। এলবামের পাতা উল্টে চলেছেন মিনু রহমান। প্রতিটা পাতায় ছবি, প্রতিটা ছবিতে এক টুকরো অতীত। আব্দুর রুশান মোহাম্মদ, আব্দুর রবিউল মোহাম্মদ, তাদের ছোটবেলার অজস্র মুহূর্ত, পারিবারিক ভ্রমণ, ঈদের সকাল, জন্মদিনের কেক কাটা, আর সেই চিরচেনা পুরোনো বাড়ি।

হিয়ার চোখ ধীরে থেমে যায় একটি ছবির উপর, চোখ আটকে যায়। ছবিতে দেখা যাচ্ছে, মিনু রহমানের পুরো পরিবার তার বাবা, মা, দাদি সহ আব্দুর রবিউল মোহাম্মদ, আব্দুর রুশান মোহাম্মদ তারা তিনজন পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছেন। তাদের পেছনে ঝাপসা একতলা বাড়ি, দোতলায় মাথার উপর টিনসেডের ছাউনির ছায়া।

হিয়া ছবিটার দিকে তাকিয়ে থাকে খানিকক্ষণ চুপচাপ। তারপর মিনু রহমানকে জিজ্ঞেস করে, "এটাই তো পুরান ঢাকার বাড়িটা?"

মিনু রহমান হালকা হাসেন। স্মৃতিতে ভেসে যেতে যেতে বলেন, "হ্যাঁ, ছবিটা বোধহয় ১৯৭০ সালের দিকে তোলা। এখনো কি জীবন্ত হয়ে আছে ছবিটা।"

হিয়া মিনু রহমানের কথায় গুরুত্ব না দিয়ে আবার প্রশ্ন করে, "তাহলে কি বড় দাদা দোতলায় ছাদ করেছিলেন?"

মিনু রহমান ছবিতে নিজের হাত বোলাতে বোলাতে বলেন, "হ্যাঁ। আব্বা বাড়িটা এই পর্যন্তই করেছিলেন, নতুন তখন উপরের তলায় ঘর তোলা হয়। পরে বড় ভাই, আশির দশকে দোতলায় কয়েকটা ঘর বাড়িয়ে ছাদ দেন। এখন যেটা দেখছো, তার বেশিরভাগই বড়ভাইয়ের হাতের গড়া।"

হিয়া আর কিছু বলে না। চুপ করে থাকে। এক অদ্ভুত স্তব্ধতা তাকে ঘিরে ধরে। ছবির পেছনের টিনসেডটা যেন কোনও এক চাপা সত্যের প্রতীক হয়ে তার মনে দাগ কাটে।

হঠাৎ আলিফ বলে ওঠে, "এসব ছবিতে তুহুরা নেই কেন, দাদি?"

ঘরটা খানিকক্ষণ নিস্তব্ধ হয়ে পড়ে, সকলের চোখে একই প্রশ্ন। মিনু রহমান দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, "ওর খুব একটা শখ ছিল না পরিবারের সবকিছুর মধ্যে থাকতে। আমার দাদিও তেমন পছন্দ করতেন না। তুহুরাও একটু আলাদা ধাঁচের মেয়ে ছিল। তাই সকলের সাথে তেমন ছবি নেই। অল্প কিছু ওর নিজের কাছেই ছিল।"

একধরনের অস্বস্তিকর কৌতুহল ভেসে বেড়াতে থাকে হিয়ার চোখে-মুখে। মিনু রহমান তখন এলবামের পেছনের দিকে হাত বুলিয়ে বলেন, "আমি সব সময় সবকিছু যত্নে রাখতে ভালোবাসি। কতো বছরের পুরোনো এসব ছবি! প্রতিটা পাতায় একটা করে গল্প লুকিয়ে আছে। এগুলো দেখলেই মনে হয়, চোখ খুলে ফেলেছি অতীতের একটা জানালায়।"

মিম খিলখিল করে হেসে বলে, "জানিস হিয়া, দাদি তো তার পুরোনো সময়ের সব চিঠিও যত্ন করে রেখে দিয়েছেন! কাউকে কখনো দেখতে দেন না। আলমারিতে বন্ধ করে রেখেছেন।"

এই কথায় হঠাৎই মিনু রহমান কড়া গলায় বলে ওঠেন, "তুই তুকারি করছিস কেন? হিয়া এখন তোর বড় ভাইয়ের বউ, তোর ভাবী। অন্তত সবার সামনে তাকে সম্মান দিয়ে 'ভাবী' বলে ডাকবি।"

মিম হঠাৎ থতমত খেয়ে যায়, "ওহ, মানে… হ্যাঁ দাদি… ভাবীই বলবো…"

ঘরজুড়ে এক মুহূর্তের নিস্তব্ধ হাসি ছড়িয়ে পড়ে। তূর্য মুচকি হেসে হিয়ার দিকে তাকায়। হিয়াও সামান্য হেসে মাথা নিচু করে। কিন্তু তার মনের ভিতর আবার জটলা পেকেছে নতুন প্রশ্ন। তূর্য কিছু একটা আঁচ করতে পেরেছে তবে প্রকাশ করে না। দুপুরের আলো ছড়িয়ে পড়েছে রোদের মতো, যেন এক অনাহূত উষ্ণতা সবার ভেতর ছুঁয়ে যাচ্ছে। হঠাৎই মিনু রহমান খাট থেকে একটু উঠে, খাটের পাশে থাকা কাঠের আলমারিটার দিকে এগিয়ে যান। তাঁর হাতে সময়ের ভার, চোখে এক অদ্ভুত স্থিরতা। চাবির গোছা ঘুরিয়ে আলমারির নিচের খোপটা খোলেন তিনি। সেখানে ছিল একটা নীলচে কাপড়ে মোড়া ছোট বাক্স। বাক্সটা বের করে ধীরে ধীরে খুললেন। ভিতরে একটা মোটা, ভারী পুরনো ধাঁচের বালা, নকশা কাঁটার কাজ, মাঝখানে ছোট্ট একটা পান্না বসানো। তিনি বাক্সটা হিয়ার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলেন,‌ "এটা আজ থেকে তোর। এই বালাটা আমি আমার শাশুড়ির কাছ থেকে পেয়েছিলাম, বিয়ের পর।"

সবাই বালাটা দেখে চমকে যায়। আজকাল এমন নিখুঁত কাজ তেমন দেখা যায় না। হিয়া বাক্সটা হাতে নিয়ে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। অদ্ভুত একটা ওজন। মিনু রহমান হিয়ার দুহাতে পরম যত্নে বালা দুটো পড়িয়ে দেন।

মিম নিজের চোখ‌ গুলো বড় বড় করে বলে, "দাদি তোমার আরেকটা বালা আছে না! আমি কিন্তু সেটা জানি। ওটা কিন্তু আমাকে দেবে। আলিফের বউয়ের জন্য রেখে দিও না!"

আলিফ মুখ ভেংচি কেটে বলে, "না...না.. দাদি ওটা আমার বউয়ের। বাড়ির দুই বউ তোমার দুটো বালা পড়ে ঘুরে বেড়াবে কি ভালো লাগবে দেখতে! আর আপু পরের বাড়ি চলে যাবে। ওকে দিলে বালাও পরের বাড়ি চলে যাবে‌।"

মিনু রহমান এই দুই ভাই বোনের ঝগড়া দেখে নিজের মাথায় নিজের হাত রাখেন। এরপর বলেন, "তোরা দুটোই খুব নির্লজ্জ হয়েছিস। খুব বিয়ে করার সখ জেগেছে না তোদের?"

মিম আর আলিফ দুজনেই একেবারে চুপ হয়ে যায়। একটুপরে ফিসফিস করে হিয়ার কানের কাছে গিয়ে বলে, "ভাবি তুমি দেখে নিও ওই বালাটা আমার বউয়েরই হবে।"

হিয়া হেসে উঠে। তবে তার মনে যেন একটা কাটা বিঁধে আছে। যা হিয়াকে লাগাতার বিরক্ত করছে। সবাই ধীরে ধীরে একে একে মিনু রহমানের ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। তূর্য আর হিয়াও নিজেদের ঘরে ফিরে আসে। দরজা লাগিয়ে তূর্য সোজা হিয়ার মুখের দিকে তাকায়। তারপরে জিজ্ঞেস করে, "কিছু কি হয়েছে তোর?"

হিয়া ধীরে শ্বাস নিয়ে বলে,"কিছু জায়গায় নতুন করে খটকা লাগছে। আসলে সকালে যখন মাথাটাই লাগল তখন থেকে খটকাটা শুরু..."

তূর্য কপাল কুঁচকে তাকায়, কিন্তু কিছু বলার আগেই নিচ থেকে তাড়াহুড়ো করে আলিফের গলা ভেসে আসে, "তূর্য ভাই! একটু নিচে আসেন তো! একজন লোক আপনাকে খুঁজছে!"

তূর্য দাঁত চেপে বলে, "আবার কে এলো! হিয়া বস, আমি একটু দেখে আসি, তুই চিন্তা করিস না। পরে এসে কথা বলি।"

তূর্য বেরিয়ে যায়। হিয়া ধীরে বিছানায় বসে পড়ে।

_____________

চলবে....🌸