নির্বাসিত কৃষ্ণচূড়া — পর্ব ৪৩

লেখক: সাদিয়া তিন্তি · বিভাগ: রহস্য · পর্ব ৪৩ · ৪৭ পর্বের মধ্যে ৪৩

সময় তার গতিতে আগায়। ধুলো জমে যায় পুরোনো সব জখমে। আব্দুর রবিউল মোহাম্মদ আজকাল বেশি সময়ই অসুস্থ থাকেন। শরীরটা যেন বয়সের তুলনায় অনেক বেশি ভেঙে গেছে তার। আব্দুর রুশান মোহাম্মদের বাড়িতে তালা ঝুলছে। ঘরবাড়ি আসলে কার? ইটপাথরের মহল কি মানুষ ছাড়া কখনো বাড়ি হয়? মিনু রহমান তার ছেলেদের নিয়ে ব্যস্ত। একই শহরের দুই প্রান্তে দুই ছেলের বাসায় তার নিয়মতান্ত্রিক জীবন চলছে।

হিয়া এখন তার জীবনের এক অন্য অধ্যায়ে ব্যস্ত। তার আকাঙ্ক্ষিত পুরুষ তাকে পেতে লড়ছে। জীবনটা বোধহয় খুব দ্রুতই বদলে যায়। যাকে এক নজরে সহ্য হতো না, সেই মানুষটাই একদম হুট করে চির আকাঙ্ক্ষিত মানুষ হয়ে ওঠে। এটাই হয়তো সময়ের খেলা।

সকলের জীবনই এগিয়ে চলেছে। তূর্য একেবারেই কর্পোরেট আইকন হয়ে উঠেছে। সে এই অপ্রিয় কাজেই প্রিয় নেশা খুঁজে পাচ্ছে। তার ছন্নছাড়া জীবন একেবারেই নিয়মে বাধা পড়েছে। নিজের কেবিনে বসে চুপচাপ ফাইলগুলো দেখছিল তূর্য। হিসাবের খুঁটিনাটি, বাজেট শিট, ইনভেন্টরি রিপোর্ট, এমনকি মার্কেটিং কনট্রাক্ট সবই গভীর মনোযোগে পড়ছে, বুঝছে, নোট নিচ্ছে। এটা তার রোজকার কাজ। এমন মনোযোগী তূর্যকে দেখে আরমান সাহেবও রোজ কিছুক্ষণ অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকেন। যেন এই ছেলেকে তিনি চিনতেই পারেননা। তিনি কখনোই আশা করেননি এমন তূর্যকে। তূর্য শুধু কাজ শিখে নিচ্ছে না, চারপাশে একটা পরিবর্তনের ছায়া এনে দিচ্ছে। সকাল হলেই সে পৌঁছে যায় অফিসে, সবথেকে আগে, আর বের হয় সবথেকে শেষে। কোন কাজ ফেলে রাখে না। কারো চাপে বিরক্ত হয় না। ফ্যাক্টরির ওয়ার্কার থেকে মেইন অফিসের সিনিয়র ম্যানেজার সবাই তূর্যর ভক্ত হয়ে উঠেছে। কোনো ওয়ার্কার অসুস্থ হলে, তূর্য তার ওয়ার্কশিফট নিজের হাতে তুলে নেয়। কোনো অর্ডার ডিলে হলে সরাসরি ক্লায়েন্টকে কল করে দুঃখ প্রকাশ করে, দ্রুত বিকল্প ব্যবস্থা করে দেয়। তার হাসি, তার সরলতা, তার তীক্ষ্ণ বুদ্ধি সব মিলে অফিসে যেন একটা নতুন প্রাণশক্তি যোগ হয়েছে। একের পর এক প্রজেক্ট বাড়তে থাকে। নতুন নতুন ক্লাইন্ট ও আসতে থাকে। অর্ডার বাড়ে, সবটা তূর্য এক দক্ষ ব্যবসায়ীর মতো সামলে ওঠে। আরমান সাহেব শুধু তূর্যকে দেখে আর গর্বে বুক ভরে শ্বাস নেন। আরমান সাহেব ছেলের প্রশংসা যতোটা না পঞ্চমুখ তার থেকে বেশি নূরজাহান বেগম। নূরজাহান বেগম বেশ হাস্যোজ্জ্বল এক চরিত্র। তিনি কিছুতেই কোন কথা পেটে চেপে রাখতে পারেন না। তারই স্বভাবের কারণে বর্তমানে বংশের প্রত্যেকটা মানুষ জেনে গেছে তূর্যের এমন পরিবর্তনসহ পরিবর্তনের কারণ। তবে তূর্যর পরম সৌভাগ্য যে, তার এই পরিবর্তনের সুনাম, হিয়ার পরিবার অব্দি এখনো পৌঁছায় নি।

তূর্য যে শুধু নিজের পরিবর্তন এনেছে এমনটা নয়। সে পরিপূর্ণ রুপে সক্ষম হয়েছে তার কিপটে বাবাকে ভাঙিয়ে একটা চার চাকার গাড়ি কেনাতে। ছেলের চাপে আরমান সাহেবের বুক ফেটে কষ্ট হলেও টাকার বান্ডিল ভাঙতে হয়েছে। আর না ভেঙে বা কি উপায়, ছেলে যে অনুমতি নিয়েছে এটাই তো বড়। অফিসের টাকা পয়সার সব হিসের তো তূর্যর‌ হাতে। সে যে একটা চারচাকা এনে সারপ্রাইজ করেনি তাই তো কতো!

এরকমই তূর্য রুপ বদলেছে অনেক কিছুর। তবে ধুলো চেপে গেছে তার নিজের সখের। এখন আর ক্যামেরা তার স্পর্শ পায় না। বাইক নিয়ে নিরুদ্দেশ ঘোরা হয় না। সত্য বলতে এসব সে এখন আর চায় না। তার মনও যেন সময়ের সাথে বড় হয়ে উঠেছে। সে এখন তার দায়িত্ব, কাজে গভীর মনোযোগি। কিন্তু তূর্য যতোই ভালো কাজ করুক। তার সাথে যেন গরু সম্প্রদায়ের একটা পুরাতন শত্রুতা আছে। যেদিনই সে ফার্ম পরিদর্শনে যায় সে দিনই তার সাথে একটা না একটা অঘটন ঘটে। কাদা মাটিতে গড়াগড়ি করে ফিরতে হয়। এই পরিস্থিতির জন্য এখন প্রায় সকলেই প্রস্তুত থাকে। তাও তূর্য মানিয়ে নেয়ার চেষ্টায় অটোল। তবে তূর্যর এই পরিশ্রমের অন্ধভক্ত হয়ে বসে আছেন আরমান সাহেব। ছেলের পরিশ্রম, দায়িত্ববোধ আর প্রগাঢ় একাগ্রতা দেখে তার বুকটা যেন প্রতিদিন একটু করে বড় হতে থাকে। আর ঠিক সেই কারণেই, কোনো ঢাকঢোল না পিটিয়ে, কারো সঙ্গে পরামর্শ না করেই, সকাল সকাল তার নতুন সদ্য নেয়া গাড়ির ড্রাইভার সমেত বেড়িয়ে পড়েন। এই খবরটা শুধু নিজের মা মিনু রহমানকে জানিয়ে দেন। কয়েক ঘন্টার লম্বা সফর শেষে আরমান সাহেব সরাসরি পৌঁছে যান আব্দুর রবিউল মোহাম্মদের বাসায়। বিনা নোটিশে একা আরমান সাহেবকে দেখে হিয়াদের বাড়ির সকলেই এক প্রকার চমকে উঠে। আরমান সাহেব তেমন মিশুক কিংবা বেড়িয়ে বেড়ানো মানুষ একদম নন। তিনি তার সমগ্র জীবনে এবাড়িতে এই নিয়ে তৃতীয় বার এলেন বোধহয়। আরমান সাহেব সোজা কথার মানুষ। তিনি এসেই সিদ্দিকী সাহেবের সাথে একেবারে পরিস্কার ভাবে কথা বলেন। তিনি অক্ষরে অক্ষরে জানিয়ে দেন তূর্যর অনুভূতি এবং তাদের এই অনুভূতিতে আগ্রহ। তিনি নিজে চান হিয়া যেন তার পুত্র বধু রুপেই তার ঘরে যায়। তাই তিনি নিজের ছেলের জন্য হিয়ার হাত চাইতে এসেছেন। এক প্রকার বিয়ের প্রস্তাব নিয়েই এসেছেন। হিয়ার বাবা মা রাজী হলে তিনি স্বপরিবারে আসবেন পাকা কথা দিতে।

হিয়ার বাবা সিদ্দিকী সাহেব হিয়ার বিয়ের প্রস্তাব শুনে একটু থমকে যান প্রথমে। তারপরে কঠোর চতুরতার সাথে তিনি বলেন, “তূর্য তো ঘরের ছেলে। ওর সাথে মেয়ে বিয়ে দিতে পারলে আমরাও নিশ্চিন্ত। তবে আরমান ভাই এভাবে তো আর কথা দিতে পারছি না। বোঝেনই তো আজ কালকার মেয়ে, আমি একটু পরিবারের সবার সাথে আলোচনা করি। হিয়ার থেকে মতামত নেই তারপর আপনাকে জানাই।”

আরমান সাহেব সম্মতিসূচক মাথা নাড়েন, তার চোখে ছিল দৃঢ়তা, কিন্তু কোনো জোরাজুরি নেই। তিনি এতোটুকু আত্মবিশ্বাসী যে তার ছেলের প্রপোজাল কিছুতেই ফেলতে পারবেন না সিদ্দিকী সাহেব। আরমান সাহেব যেভাবে গোপনে এসেছিলেন ঠিক সেভাবেই ফেরেন রাজশাহী।

এদিকে সিদ্দিকী সাহেব বেপক দ্বিধায় পড়েন, কি করবেন তিনি। হিয়া মাত্র অনার্স প্রথম বর্ষে পড়ছে। তিনি মেয়েকে আরো পড়াতে চান। তাছাড়া তূর্য ভালো ছেলে। নিজের ফুফাতো ভাইয়ের ছেলে। মেয়ে যদি নিজের পরিচিত ঘরে থাকে তাহলে এক প্রকার নিশ্চিন্তে থাকবেন তিনিও। সিদ্দিকী সাহেব তার স্ত্রী, ছোট ভাই এবং বাবা আব্দুল রবিউল মোহাম্মদের সাথে আলোচনা করেন।

আব্দুর রবিউল মোহাম্মদ একরকম আঁচ পেয়ে যান তূর্য হিয়ার ব্যপারে। প্রথম প্রথম তূর্যকে তার ইঁচড়ে পাকা মনে হতো। তার অবশ্য রাগ হওয়া উচিত, তার এত বছরের গোপন রহস্য ফাঁস করার পেছনে তো এই চরিত্রটারই সবথেকে বড় অবদান! কিন্তু কোন এক অজানা কারণে তিনি রাগ হতে পারেন না। তিনি এটুকু ভেবেই খুশি যে তূর্য একেবারেই তার মতন নয়। আর একারনেই হয়তো তার বড় ভাই আব্দুল রুশান মোহাম্মাদের খুব প্রিয় ছিল তূর্য। তাছাড়া তার বড় গুন সে সত্যের জন্য লড়ে। অবশ্যই সে তার আদরের নাতনিকে ভালো রাখতে পারবে। আর তার সত্য তূর্য সামনে না আনলেও কোন না কোনদিন এসেই যেত। অন্ততপক্ষে মৃত্যুর পরে আব্দুর রুশান মোহাম্মদের কাছে জবাব দিহিতার থেকে জীবন্ত অবস্থায় তিনি জেনে গেছেন তার সব পাপ, সেটাই যেন আব্দুর রবিউল মোহাম্মদের সৌভাগ্য। এই সৌভাগ্যে তিনি নিজের ঘাড়ে নিজের ভাইয়ের মৃত্যুর ভার নিয়েও বসে আছেন। এসব নিজের ভাবনা ছেড়ে আলোচনার মাঝেই আব্দুর রবিউল মোহাম্মদ একরকম কড়া ভাষায় বলেন, "দেখো সিদ্দিকী, তোমার যদি তূর্যকে পছন্দ হয়, তবে তুমি সরাসরি হিয়াকে প্রশ্ন করো, সে রাজি কিনা। আমার মনে হয় হিয়া রাজি হবে। আর যদি হিয়া সত্যিই রাজি থাকে তবে তো ভাবার কিছু নেই।"

সিদ্দিকী সাহেব বাবার কথায় সম্মত হয়। তিনি নিজে যেহেতু মেয়েকে এসব প্রশ্ন করতে দ্বিধা করছিলেন তাই তিনি রাবেয়া বেগমকে বলেন মেয়ের থেকে তার মতামত জানতে। আর মেয়েকে যেন তিনি পরিষ্কার বলে দেন যে, হিয়ার ইচ্ছেই শেষ ইচ্ছা। তার উপরে কোন জোর নেই। একেবারে সিদ্দিকী সাহেবের কথা মতো রাবেয়া বেগমও হিয়াকে কল করেন। এরপর সোজাসাপটা বলেন তূর্যর বিয়ের সম্মন্ধ এসেছে তার জন্য, সে কি রাজি কিনা। হিয়া এক রকম তব্দা খেয়ে যায়। তাকে তো তূর্য এ বিষয়ে কিছুই জানায় নি। তাও সে কিছু সময় ভেবে বিয়েতে মত দেয়।

সিদ্দিকী সাহেব আরমান সাহেবকে পরদিনই কল করেন। তখন রাজশাহীর আকাশ জুড়ে ঘন মেঘ জমছিল, আর তূর্য তার অফিস কেবিনে মাথা নিচু করে বাজেটের এক পৃষ্ঠা থেকে অন্য পাতায় ছুটে বেড়াচ্ছিল। ফোনটা রিসিভ করলেই ওপাশ থেকে ভরাট গলায় সিদ্দিকী সাহেব বলেন, “আরমান ভাই, আমরা রাজি। হিয়াও রাজি হয়েছে। এবার আপনি এসে কথাটা পাকাপাকি করুন।”

আরমান সাহেব চুপ করে কিছুক্ষণ ফোনটা হাতে রেখে ছেলের মুখের দিকে তাকালেন। তূর্য তখনো ব্যস্ত কাগজে-কলমে, খবরের কিছুই টের পায়নি। কিন্তু আরমান সাহেবের চোখে তখন এক চুপচাপ দীপ্তি। তিনি ছেলের হাসি মুখ দেখতে চান। এতো পরিশ্রম, পরিবর্তনের প্রাপ্তি দিতে চান। ফোনটা রেখে তূর্যর এই ব্যস্ততার মাঝেই তিনি বলেন, “ভাবছি তোমার বউটাকে এবার ঘরে নিয়ে আসি?”

তূর্য তার কাগজের থেকে মুখ তুলে বাবার দিকে তাকায়। তার ভ্রু জুগল কুঁচকে যায়। যেন এমন এক ব্যস্ততম দুপুরে সে খুব অবাস্তব কিছু শুনে নিয়েছে তার বাবার মুখ থেকে। সে জিজ্ঞেস করে, “আমি কি আপনার মতে আসলেই স্বাবলম্বী হয়ে গিয়েছি? বেকারের ট্যাগ মুছে গেছে?”

আরমান সাহেব এক প্রকার হেসে পড়েন। তিনি বুঝে যান তার ছেলের এক প্রকার অভিমান হয়েছিল তার সেদিনের ওমন কথায়। আরমান সাহেব হেসে বলেন, “সে তুমি যেটা ভাবো ভাবতেই পারো। তবে এখন পাকাপাকি করা যাক? আমার হুট করে শখ জাগলো, এই শীতে তোমার বউর হাতে ভাজা পিঠা খাব। তাই ভাবছি যত তাড়াতাড়ি তোমার বউকে ঘরে আনা যায়।”

তূর্য এক মুহূর্তের জন্য স্থির। প্রথমে তার বাবার মশকরা ভাবলেও এবার তার গলা শুকিয়ে যায়। তার বুকের ভেতর যেন কোনো অজানা ঢেউ লেগে যায়। এটাই তো সেই দিন, যেদিনের জন্য এতো লড়াই। ঠিক এই মুহূর্তেই তূর্যর ফোনে হিয়ার নাম্বারটা ভেসে ওঠে, আরমান সাহেব দেখেও এমন ভান করেন যেন তিনি কিছুই দেখেননি। তূর্য ফোনটা রিসিভ করে ফিসফিস করে বলে, “অফিসে আছি বাবা….”

এটুকের মাঝেই হিয়া এক নাগাড়ে বলতে থাকে, “গতকাল থেকে কল করছি। একটা বার অন্তত কল তো ধরা যায়। আর আপনার সারপ্রাইজে আমি অত্যধিক অবাক। একেবারে আমাকে না জানিয়েই সরাসরি বিয়ের প্রস্তাব!”

তূর্য একেবারেই ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যায়। সে আরমান সাহেবের মুখের দিকে তাকিয়ে দেখে তিনি মিটিমিটি হাসছেন। তার চেহারা দেখে পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে, তিনি সমগ্র বিয়ের কথাবার্তা কনফার্ম করেই তাকে বলতে এসেছে, ‘এবার সময় হয়েছে চলো যাই বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে।’

তূর্য হিয়ার এসব কথায় কোন জবাব না দিয়ে গলাটা সামান্য পরিষ্কার করে বললো, “আমি একটু পরে কথা বলছি।”

হিয়াকে আর কোন কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে কলটা কেটে তার চেয়ার থেকে উঠে এগিয়ে গিয়ে আরমান সাহেবকে জড়িয়ে ধরে। আরমান সাহেব নিজেই যেন এমন পরিস্থিতির জন্য একেবারে প্রস্তুত ছিলেন না। তূর্য তাকে এভাবে শেষ জাপটে ধরেছিল, তাও‌ বোধহয় খুব ছোট্ট বয়সে। আরমান সাহেব খুশিতে একেবারে আত্মহারা হয়ে উঠেন। তিনি তূর্যকে তার বুকে জাপটে নেয়ার আশায় এই কাজটা করেননি। তিনি শুধু ছেলের হাসি মুখ চেয়েছেন। তবে এই সামান্য ঝাপটে ধরাটা যেন তার কাছে এক অনন্য প্রাপ্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বাবাদের ভালোবাসাটা একটু অদ্ভুত হয়। তারা আসলে কখনোই প্রকাশ করতে পারেন না, যে তারা সন্তানদের ঠিক কতটা গভীর ভালোবাসেন। তূর্য তার বাবার থেকে বরাবরই একটা দূরত্বের দেয়াল টানিয়ে রেখেছিল। তবে তার এই লড়াইয়ে এসে সে প্রকৃত রুপে বুঝেছে তার বাবা একজন অমায়িক মানুষ। এমন একটা মানুষ যাকে, বারবার শ্রদ্ধা করতে ইচ্ছে করে। যাকে গভীরভাবে ভালবাসতে ইচ্ছে করে। যার কাছে আজীবন ছোট্ট থেকে যেতে ইচ্ছে করে।

তূর্যর কাছে একটা ভয় ছিল। সে ভয়টা ছিলেন আব্দুর রবিউল মোহাম্মদ। তূর্য প্রথম থেকেই ভেবেছিল, হিয়ার বাড়িতে আর যেই রাজি হোক না কেন, হয়তো আব্দুর রবিউল মোহাম্মদ কোনদিনও মেনে নিতে পারবেন না তূর্য আর হিয়ার বিয়েটা। তবে খুব অপ্রত্যাশিতভাবে তিনিও যেন বড্ড রাজি। তবে এটাই কি তার নিয়তি? কিন্তু এসব চিন্তা বেশি আকৃষ্ট করতে পারে না তূর্যকে।

শহর জুড়ে অক্টোবরের ধোঁয়াটে শীত ছুঁয়ে বেড়াচ্ছে। ক্যালেন্ডারের ২০ তারিখ ঠিক হয় হিয়ার বাড়িতে পাকা কথা বলার তারিখ। নির্ধারিত দিন সকালবেলায় গাড়ির বনেটে ধোঁয়া উঠতে না উঠতেই তূর্য আর তার পুরো পরিবার– বাবা, মা, চাচা, চাচি, মিম আর আলিফ সকলে একসাথে হিয়াদের বাড়ির দিকে রওনা হয়। সবার গায়ে পরিপাটি সাজ। মিনু রহমান তার প্রিয় মসলিন শাড়িটা বের করেছেন বহুদিন পর, ও বাড়িটা তো শুধু তার নাত বউয়ের বাড়ি নয়, তার নিজের ভাইয়ের বাড়িও যাচ্ছেন তিনি। তূর্য নিজে পরেছে হালকা বেইজ কালারের পাঞ্জাবি, চোখে ধীর প্রশান্তি। মনে অবশ্য এক অদ্ভুত অস্বস্তি। সব যেন এক্কেবারে নতুন। তবে এই নতুনত্বই তো সে চেয়েছে। সে তার আকাঙ্ক্ষিত নারীকে নিজের করে পেতে ছুটছে।

হিয়াদের বাড়ি আজ যেন একেবারে উৎসবমুখর। সোনালি পর্দা টেনে ঘর সাজানো হয়েছে, গন্ধে ম ম করছে রান্নাঘর। তবুও নতুন অতিথিদের পা ঘরের পড়তেই আয়োজন যেন পরিপূর্ণরূপে পূর্ণতা পায়। তবে তূর্য কিছুটা থমকে যায়। সবকিছু যেন একটু বেশিই নিখুঁত। দুটো পরিবার এক ছাদের নিচে নতুন জীবনের আয়োজনে মেতেছে। হিয়ান এবার তূর্যকে একটু বেশিই খাতির করছে। দু’ভায়ের সম্পর্ক তো বন্ধুর থেকেও কম নয়! তবে তার প্রিয় বন্ধুই তার থেকে লুকিয়েছে তার বোনের প্রতি এত গভীর দুর্বলতা। এই শোধ যেন সে আজ তূর্যর সে থেকে নিয়েই ছাড়বে। ঘরভর্তি হাসির ঝলক বয়ে যায়। দুই পরিবার মিলিয়ে এক ঘনিষ্ঠ, ছোট্ট অথচ হৃদয়ভরা অনুষ্ঠানেই মেতে ওঠে সবাই। সকলের চোখের আদুরে ছোট্ট হিয়া আজ যেন পরিপূর্ণ নারী রুপে এসে দাঁড়ায় সকলের সামনে। তার পরনের মেরুন জামদানি তাকে এতো বেশি আকর্ষণীয় এবং লাবন্যময়ী করে তুলেছে যা প্রকাশের বাইরে। তূর্য শুধু এক নাগারে দেখে যায়, তার সবথেকে দামি ফুলকে। সে তো এই স্নিগ্ধ ফুলটাকেই চেয়েছে, তবে এই রূপ তো কল্পনায়ও আসেনি! তূর্যর অনুভূতি যেন তূর্যকেই বিরক্ত করছে। তার এই ব্যক্তিগত নারীটি কি আসলেই এত অপরূপ সুন্দর? নাকি শুধু তার চোখেই ঘোর লেগে যায়! তূর্য কোনরকম টেনেটুনে নিজেকে সামলে নেয়। তবে তার চোখ সরছে না হিয়ার থেকে বিন্দুমাত্র।

খাওয়া-দাওয়ার পরে শুরু হয় আংটি বদলের ছোট্ট আয়োজন। সোনার পাতলা আংটি, তাতে খুব ছোট্ট একটা হীরে বসানো। তূর্য প্রায় হাজার খানেক আংটিকে অবহেলা করে এই আংটিটা খুঁজে এনেছে। তূর্য হিয়াকে আংটিটা পড়াতেই, হিয়ার চোখে জল টলমল করে ওঠে। তূর্য ধীরে তার চোখের দিকে তাকায়, খুব নিঃশব্দে বলে, “চোখের জল যা ফেলার এ বাড়ি থেকে ফেলে নাও। আমি শুধু তোমার নয়, তোমার কাজলের দায়িত্ব নিচ্ছি। অন্ততঃ যতদিন নিঃশ্বাস চলবে, ততোদিন দুঃখে কাজল ছড়াবে না। তবে সুখে ছড়ালে সেটা অন্য বিষয়, সেখানে তূর্য দায়বদ্ধ নয়।”

হিয়া তূর্যর কথায় সকলের মাঝেই তার বড় বড় চোখে তূর্যর গভীর চোখ দুটোতে তাকিয়ে পড়ে। চোখে শুধু শব্দ নয়, খুব গভীর প্রণয় লুকিয়ে আছে। উপস্থিত সকলের কথা বার্তা এগোয়। এবার কথা পৌঁছায় বিয়ের তারিখে। তবে সেখানেই যেন দ্বন্দটা বাঁধে। আরমান সাহেব সোজাসাপটা কথা বলা মানুষ, তিনি চান তার পুত্রবধূকে যতো দ্রুত সম্ভব ঘরে তুলতে। তবে এখানে বেগড়া দেন সিদ্দিকী সাহেব। তার ভাষ্যে, হিয়া মাত্র অনার্স প্রথম বর্ষে পড়ছে, আর একটু পড়াশোনা হোক। তারপরে ধুমধাম করে বিয়ে দেওয়া যাবে। এখন যেহেতু বিয়ের সব কিছু ঠিকঠাকই হয়েছে এত জলদি তো কোন কিছুর নেই।

এক মুহূর্তে ঘরের বাতাস যেন ভারী হয়ে আসে। আরমান সাহেব ঠাণ্ডা গলায় বলেন, “বিয়ের সাথে পড়াশোনার কি সম্পর্ক? হিয়া যেভাবে পড়ছে, সেভাবেই পড়বে। ওর পড়াশোনায় ওকে কেউ বাধা দেবে না। আর তূর্য তো ছোট বাচ্চা ছেলে না যে হিয়ার বইখাতা ছিড়ে ফেলবে।”

আরমান সাহেবের এমন রসিকতায় সকলে হেসে ওঠে। তবে সমস্যা যেন সমস্যায় আটকে থাকে। এই সমস্যা সমাধানে এইবার তূর্য শান্ত ভঙ্গিতে উঠে দাঁড়িয়ে সিদ্দিকী সাহেবের কাছে এগিয়ে গিয়ে বলে, “চাচা, আমি কথা দিচ্ছি, হিয়ার পড়াশোনার শেষ দিন পর্যন্ত সব দায়িত্ব আমার। ও যতদূর পড়তে চাই সবটা ওর ইচ্ছে। আপনি কখনো এটা নিয়ে ভাববেন না যে হিয়া আবদ্ধ, আমি চাই হিয়া মুক্ত হোক। ওর স্বপ্ন অনেক বড় হোক, সমগ্র আকাশ জুড়ে উড়ান হোক।”

তূর্যর এই কথায় সিদ্দিকী সাহেব একেবারে পরিতৃপ্ত হয়ে ওঠেন। তূর্যর প্রতিজ্ঞার মতো দৃঢ় কথাগুলো ছড়িয়ে পড়ে ঘরের চারপাশে। আব্দুর রবিউল মোহাম্মদের চোখে ধরা পড়ে প্রশান্তি, যেন একটা সুদীর্ঘ সংশয় কাটলো অনেকদিন পর। সব আলোচনার পর একরকম মেঘ কেটে আকাশ ঝকঝকে হয়ে আসে। সিদ্ধান্ত হয়, আসছে নভেম্বরের ১০ তারিখে তূর্য হিয়ার বিয়ে। হাতে মাত্র কুড়ি দিন। অপেক্ষার এই কুড়ি দিনই হয়তো এখন জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়সীমা। দুই পরিবারেই ব্যস্ততা যেন দিগন্ত ছুঁতে চায়। এক এক করে শুরু হয় তালিকা লেখা, কাকে দাওয়াত যাবে, কে কী পড়বে, কোন ফুল দিয়ে ঘর সাজানো হবে, মেনুতে থাকবে কী, আর সবচেয়ে বড় কথা, হিয়ার গায়ে হলুদের হলুদটা কোন পিসে সবচেয়ে সুন্দর মানাবে।

নূরজাহান বেগম তো রীতিমতো তূর্যর বিয়ের স্বপ্ন দেখছেন দিন-রাত। তার একমাত্র সন্তানের বিয়ে। তিনি কি করবেন না করবেন তাতে মেতে উঠেছেন। বাড়ির প্রতিটা মানুষ ব্যস্ত। আর আরমান সাহেব? তিনি নিজও একজন নীরব আয়োজক। ছেলের জীবনের সবচেয়ে সুন্দর দিনে কোনো খুঁত রাখবেন না, এই অঙ্গীকারে দিনরাত কাজ করছেন। তবে সবথেকে কষ্টকর বিষয় তার জন্য যে গাটি গাটি টাকা পাখি হয়ে আকাশে উড়ে যাচ্ছে। তিনি তো রীতিমত একবার তূর্যকে বলেই ফেলেছেন, “কি দরকার ছিল এত ঘটা করে আয়োজনের! পালিয়ে বিয়ে করে বউ নিয়ে আসতে, আমি একটু বাংলা সিরিয়ালের মেলো ড্রামা করে গ্রহণ করে নিতাম। অন্তত আমার লাখ লাখ টাকা গুলো তো বেঁচে যেত!”

তূর্য তার বাবার কথায় শুধু হাসে। তবে তার বাবার এই করুন দশা দেখে দুঃখের বদলে প্রশান্তি বেশি পায়। অন্ততঃ এই কিপটে লোকের পকেট তো ভাঙছে। এদিকে নুরজাহান বেগম নিজের স্বামীকে এভাবে দুহাতে ভাঙতে দেখে, তার জীবনের সকল ইচ্ছে মিটিয়ে নেন একেবারে। বউয়ের গয়না থেকে শাড়ি নেয়ার সাথে নিজের জন্যও কেনাকাটা করে নেন।

অন্যদিকে হিয়ার বাড়িতে চলছে মহা আয়োজন। এত দ্রুত বোনের বিয়ে দেয়াতে হিয়ান সামান্য খচ খচ করলেও, বরটা যেহেতু তূর্য তাই আর আপত্তি রাখে না। পড়াশোনার সুবাদে তার স্থায়ী ঠিকানা তো রাজশাহীতেই। বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে থাকলেও সপ্তাহে এমন কোন ছুটি এখনো যায় নি যেখানে নুরজাহান বেগম নিজে না ডেকেছে হিয়ানকে। তাছাড়া তার বেশি সময় ঠিকানাই তূর্যদের বাড়িতে। সেই বাড়িতে নিজের বোন বউ হলে সে যেন নিশ্চিত। অন্ততঃ মায়ের অভাব কখনোই বোধ করতে দেবেন না নুরজাহান বেগম। আর তূর্য বরাবরই হিয়ানের মন মতো। হিয়ান এখন, নিজের একমাত্র ছোট বোনের বিয়েতে সকল দায়িত্ব নিজের ঘাড়ে তুলে মহা ব্যস্ত।

বিয়ের এই কুড়ি দিনের কাউন্টডাউনে এখন আর কেবল শাড়ি, গয়না কিংবা অতিথি তালিকার গল্প নেই। বরং প্রতিটি ক্ষণ যেন হয়ে উঠেছে এক নিরব প্রত্যয়ের জায়গা। দুইটি জীবন, দুইটি পরিবার আর এক নতুন এক যাত্রা।

_______________

চলবে.....💝