নির্বাসিত কৃষ্ণচূড়া — পর্ব ৪২
লেখক: সাদিয়া তিন্তি · বিভাগ: রহস্য · পর্ব ৪২ · ৪৭ পর্বের মধ্যে ৪২
হিয়া হলে ফিরেই সবটা জানায় মিমকে। এতো লম্বা সময় পর হিয়ার মুখে এমন উজ্জ্বল সুখ দেখে মিম আনন্দে আত্মহারা হয়ে ওঠে। মিমের ধারণা মতে, প্রেম বোধহয় পাগলামির চরম সীমানা ঠিক করেই আসে। এই যে তূর্যর মতো এক গোমরা মুখো বাস্তববাদী মানুষকে একেবারে সাহিত্যিক প্রেমিক পুরুষ বানিয়ে ছেড়েছে। এ তো কম কিছু নয়!
তূর্য বাড়ি ফেরে গভীর রাতে। একেবারেই রাতের শেষ মুহূর্তে। ততোক্ষণে শহরটা ঘুমন্ত। তূর্যর মা নূরজাহান বেগম তখনো ছেলের অপেক্ষায় আধ ঘুমে থাকায় এ যাত্রায় তূর্য তার বাবা আরমানের খানের হাত থেকে কোন রকম রক্ষা পেল। আর সোরগোল না পাকিয়ে, তূর্য হালকা কিছু খেয়ে ঘুমিয়ে যায় সকালের প্রস্তুতিতে। ক্লান্তি চোখে নেমে আসে শান্তির ঘুম হয়ে। তার চোখ খোলে একেবারে মাঝ বেলায়। সকালের আলো তখন প্রখর হয়ে রৌদ্দুরকে ছুঁয়ে নিয়েছে। তূর্য ঘুম থেকে উঠে সোজা যায় তার মায়ের কাছে। নূরজাহান বেগম তখন রান্নাঘরে ব্যস্ত, কিন্তু ছেলের চোখ দেখে থমকে দাঁড়ান। একে বারে শাসনের গলায় বলেন, "আমার হয়েছে যত জ্বালা, যত দুনিয়ার ছন্নছাড়া মানুষ সব আমার সংসারে। তুমি যে গতদিন গায়েব, তোমার বাবাকে আমি জবাব দিতে দিতে পাগল হয়ে গিয়েছি। সকালেও একগাদা কথা শুনিয়ে তারপর বেরিয়েছেন।"
তূর্য চুপচাপ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে, তারপর মায়ের কথার মাঝেই মা'কে জড়িয়ে ধরে বলে, "তোমার ছন্নছাড়া ছেলে সংসারি হতে চাইছে। আমি হিয়াকে বিয়ে করতে চাই, মা।”
নূরজাহান বেগম ভুরু কুঁচকে তাকান, তিনি যেন কোন কিছুই হজম করতে পারছেন না। বিশ্বাসই করতে পারছেন না, তার ছেলে এখন ঠিক কি বলল। তিনি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করেন, “সকাল সকাল বাজে বকছো? হিয়া কোথা থেকে এলো? আর কোন হিয়া?"
তূর্য আর ভনিতা না করে সোজাসুজি বলে, "মেঝদাদার নাতনি হিয়া। মা প্লিজ। আমি কোন মজা করছি না, আমি সত্যি বলছি।"
নূরজাহান বেগম সকটা ঠিক নিতে পারেন না। তিনি চুলাটা বন্ধ করে বিষয়টা বোঝার চেষ্টা করেন। এরপর বলেন, "এত হঠাৎ করে এসব কী বলছিস? এখনো তো তোর পড়াশোনাই শেষ হয়নি। বেকার ছেলের সঙ্গে কে মেয়ে বিয়ে দেবে। হ্যাঁ?”
তূর্য একটু হাসে এরপর বলে, “আমি জানি, এই সময়টাতে এমন বিয়ের আবদার অস্বাভাবিক। কিন্তু হিয়ার জন্য আমার যে অনুভব, সেটা মুহূর্ত নয়, সেটা স্থায়ী। আমি ওকে হারাতে চাই না। আর অনার্স শেষ হতে আরো এক বছর দেরি। আমি এতো অপেক্ষা করতে পারবো না। প্লিজ, তুমি আব্বুর সাথে কথা বলো। বিয়ে এতো আয়োজনের না হোক। তবে ও আমার নামে থাকুক। আমি জানি তুমি পারবে মা। কিছু একটা করো মা প্লিজ। ”
নূরজাহান বেগম ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকেন কিছুক্ষণ। তাঁর চোখে ধরা পড়ে ছেলের গভীর আকুতি। যে আকুতি কোনও কিশোরোচিত আবেগ নয়। তিনি একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলেন, “তুই জানিস তোর আব্বুর স্বভাব। এখনই যদি বলি, উনি একবারেই গর্জে উঠবেন।”
তূর্য চুপ করে থাকে। কিন্তু তার মুখে থাকে একরকম নিরব আকুতি। নূরজাহান বেগমের একমাত্র সন্তান তূর্য। তিনি তার জীবন দশায় তূর্যের কোনো আবদারই অপূর্ণ রাখেননি। আজকে তার চোখের এই আকুতিতেও তিনি একেবারে গলে যান। তিনি বলেন, “ঠিক আছে, আমি বলব। তবে তুই তোর আব্বুর কথায় কষ্ট পাবি না তো? তুই জানিস তোর আব্বু কেমন রগ চটা মানুষ। যদি কিছু উল্টো পাল্টা বলে দেয় তাও কিচ্ছু বলবি না। এই সত্ত্বেই কথাটা তুলবো।”
তূর্য মৃদু মাথা নেড়ে বলে, “কষ্ট পেতে এসেছি মা, হারিয়ে যেতে না। আমি সব ধরনের পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত।”
ছেলের এমন অস্বাভাবিক পাগলামিতে নুরজাহান বেগম একটু বেশিই ধাক্কা খান। তাও ছেলের আবদার। এই প্রথম কোন মেয়েকে নিয়ে তার ছেলের মাঝে এমন পাগলামী দেখছেন তিনি। তার ছেলে বড় হয়ে গেছে ভেবে নূরজাহান বেগম হেসে ফেলেন। সন্ধ্যায় আরমান সাহেব অফিস থেকে ফেরেন। কিছু সময় পেরোয়। রাতের খাবারের শেষে নূরজাহান বেগম নিজেই যান আরমান খানের কাছে ছেলের আবদার নিয়ে। তবে তূর্যের বিয়ের কথাটি তুলতেই আরমান খান কড়া চোখে তাকান, চেঁচিয়ে বলেন, “বিয়ে? এখনই? একটা অনার্স পড়ুয়া ছেলে বিয়ে করবে? কি ইনকাম আছে, কি সামর্থ্য আছে তোমার ছেলের? বউকে কি খাওয়াবে?”
নূরজাহান বেগম শান্ত গলায় বলেন, “ছেলেটা খুব সিরিয়াস, বিয়ে না হয় পরে হোক, কথাবার্তাও তো বলে রাখা যায়।।”
নুরজাহান বেগমের কথা সম্পন্ন হতে না দিয়েই আরমান খান থামান তাঁকে। রুক্ষ স্বরে বলেন, “কথা যে বলব কিসের ভিত্তিতে কথা বলব? আমার ছেলে বেকার তোমার মেয়েকে আমার ছেলের গলায় ঝুলিয়ে দাও? আর, হিয়ার বাবা কি মাথায় ঘা খেয়েছে যে নিজের মেয়েকে একটা বেকার ছেলের হাতে তুলে দেবে? বিয়ে খেলনা না। আগে তোমার ছেলেকে নিজের পায়ে দাঁড়াতে বলো, তারপর এসে কথা বলুক। আমি নিজে গিয়ে হিয়ার বাবার থেকে হিয়াকে চেয়ে এনে দেবো। ধুমধাম করে বিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব আমার। তাছাড়া হিয়া আমাদের ঘরের মেয়ে, ছোটবেলা থেকে দেখছি তাকে। হিয়ার পরিবার ও ভালো। এখানে আমার না করার তো কোন মানে হয় না। ”
তূর্য পাশের ঘর থেকে তার বাবার কথা স্পষ্ট শোনে। একটা দাহ যেন ছড়িয়ে পড়ে তার ভেতর। সে কিছু বলে না, কিন্তু তার মুখ কঠিন হয়ে যায়। তার বাবার কথা যে নিছোকই ফেলনা, তেমনটা তো নয়। সে নিজেও বুঝতে পারছে তার বাবার কথাগুলো একেবারে স্পষ্ট সত্য। আর তাছাড়া হিয়ার বাবার কাছে গিয়ে রিজেক্ট হওয়ার মানেই হিয়াকে একেবারেই হারিয়ে ফেলা। তাছাড়াও তূর্য জানে, হিয়া এমন মেয়ে নয় যে কারও অসম্মতির ছায়া ডিঙিয়ে এগিয়ে আসবে। তাছাড়া তার আত্মসম্মান, তার বাবার প্রতি শ্রদ্ধা, তার নিজের একটা জগৎ আছে।
তূর্য শব্দহীন পায়ে পাশের ঘর থেকে উঠে যায় নিজের কক্ষে। দরজাটা বন্ধ করে সে চুপচাপ বিছানায় বসে পড়ে। বাইরের আকাশে হালকা চাঁদ উঠেছে, আলো এসে জানালার কাঁচ ছুঁয়ে যায়, কিন্তু তূর্যের চোখে কোনো আলোর ছায়া নেই। তার ভেতরের আলো যেন নিভে গেছে। সে এখন বুঝতে পারছে না তার ঠিক কি করা বা বলা উচিৎ। সে জানে কেউই তার বিপক্ষে নয়। আর না কেউ এখন পর্যন্ত তার শত্রু। তবে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর যাত্রাটা তো আর সহজ নয়। তূর্যর ভাবনায় ছেদ ঘটে হঠাৎ করেই দরজার কড়া নাড়ায়। তূর্য ভাবে তার মা এসেছে। তাই জোরেই বলে, "মা, এখন ভালো লাগছে না। একটু ঘুমাবো। পরে কথা বলছি।"
তূর্যের এই কথার কোন প্রতি উত্তর আসে না। দরজায় আবারো কড়া নাড়ায়। এবার ভেসে আছে একটা গম্ভীর স্বর, "তূর্য তোমার ঘুমের থেকে আমার সাথে কথা বলা বেশি জরুরি। দরজাটা খোলো।"
তূর্য বেশ অবাক হয়। তার বাবা এই সময়ে তার ঘরে এসেছে? এই মানুষটির সঙ্গে তূর্যর সম্পর্কটা যতটা না দূরত্বের, তার চেয়েও বেশি ভয়ের। তার বাবা তাকে প্রচন্ড ভালোবাসে এতে কোন সন্দেহ নেই। তবে মানুষটা বড্ড রাগি, জেদি আর বেশি চেঁচামেচি করে। এটাই বোধহয় দূরত্ব বাড়িয়েছে। তূর্য দ্রুত গিয়ে দরজা খুলে দেয়। আরমান সাহেবও ঘরে ঢুকে এক কোণে রাখা চেয়ারে বসেন। তূর্যের ঘরের চারপাশে একবার তাকিয়ে দেখেন ভালোভাবে। আরমান সাহেব লোক ভালো, তবে উচিতের তুলনায় একটু বেশিই কৃপণ। তবে সব খানে এই কৃপণতা দিয়ে ঠিক কুলিয়ে উঠতে পারেন না। তিনি এবার পরিষ্কার গলায় জিজ্ঞেস করেন, "তোমার পড়াশোনা কেমন চলছে? ফাইনালের আর কতদিন বাকি?"
তূর্য ধীর গলায় বললো, "ফাইনাল ইয়ার চলছে। এখনো ফাইনাল পরীক্ষা দেরি আছে। সদ্য তো উঠলাম।"
আরমান সাহেব এবার কোন ভনিতা না করে বলেন, "ভালো, তবে তো এখনো অনেক দেরি। সেসব বাদ দাও। তোমার মায়ের সঙ্গে আমার কি কি কথা হয়েছে আমি জানি তুমি স্পষ্ট সবকিছু শুনেছ। সে বিষয়ে নতুন করে তোমাকে বলতে চাইছি না। আমি এখানে একটা প্রপোজাল নিয়ে এসেছি। আমি চাই তুমি এখন থেকে অফিসে যাতায়াত শুরু করো। আমার সঙ্গে ব্যবসায় মনোযোগী হও। ডেইরি ফার্মটা আমি একা টানতে পারছি না আর। তুমি আমার সাথে থাকলে, আমার সাহায্য হয়ে যাবে আর আমি নিশ্চিন্তে থাকব ব্যবসা নিয়ে। তাছাড়া এ সময়ে তোমার শরীর থেকে বেকারত্বের নামটা মুছে ফেলার সবথেকে সহজ উপায় আমার সঙ্গে অফিসে যাওয়া। আমি জানি, তোমার এই ব্যবসায় আগ্রহ নেই। গরু-দুধ-খামার এগুলো নিয়ে তো তোমার ছোটবেলা থেকেই বিতৃষ্ণা। তবে আমি চাই তুমি শুরু করো, অন্তত চেষ্টা করো, ব্যবসাটা বুঝে ওঠো। একবার শিখে নিলে তারপর যদি ভালো না লাগে, নিজেই নতুন কিছু শুরু করবে। আমি বাধা দেব না।”
তূর্য চোখ ছোট ছোট করে ফেলে। তার বাবা যেভাবে তার ব্যবসা আর অফিসের বর্ণনা দিচ্ছেন, যেন মনে হচ্ছে কোন মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির মালিক তার বাবা। তারপরও তূর্য কিছুই বলে না। আরমান সাহেব এবার নরম গলায় বলেন, “তুমি যদি তোমার ঘাড় থেকে বেকারত্বের ট্যাগ লাইন টা সরাতে পারো, তবে আমি নিজে গিয়ে ধুমধাম করে হিয়ার সাথে তোমার বিয়ে দিয়ে নিয়ে আসবো। তবে সেটা ছ’মাস পরে নাকি ছ’বছর পরে তা নির্ভর করবে তোমার ব্যবসায়ীক কিংবা ক্যারিয়ারের উন্নতির উপর। হিয়া আমার ভাইয়ের মেয়ে, এভাবেই তো আমি শূন্য হাতে তার মেয়েকে চাইতে পারি না। তোমার কাছে অনেক সময় আছে ভেবেচিন্তে আমাকে জানাও।”
এইটুকু বলেই আরমান সাহেব উঠে দাঁড়ান। একটুও অপেক্ষা না করে তিনি বেরিয়ে যান তূর্যর ঘর থেকে। তূর্য নির্বাক হয়ে বসে থাকে। তার বাবা যে সুযোগে তিন ছক্কা খেলে চলে গেলেন সেটা আর তূর্যর বুঝতে বাকি নেই। তূর্য সারা জীবন তার বাবার ব্যবসা থেকে দৌড়ে পালিয়েছে। তার কাছে ডেইরি ফার্ম মানেই বাজে গন্ধ, কাদা, গরুর ডাক। তবে এটাই তাদের সংসার চালানোর একমাত্র উপায়। প্রথমে অবশ্য তার বাবা মাত্র পাঁচটা গরু দিয়ে ব্যবসা শুরু করেছিলেন এখন সেই পাঁচটা গরু শতাধিকে পরিণত হয়েছে। তবে তাদের ফ্রাম আর মিল্ক ফ্যাক্টরি সেটা সম্পূর্ণই তার বাবার দক্ষ পরিচালনায় বছরের পর বছর চলছে। এটা তাদের কোন পারিবারিক ব্যবসা নয়। ছোটবেলা থেকেই তার বাবা ছিল একজন ছন্নছাড়া পড়া চোর মানুষ। এই চুরি বিদ্যা মহাবিদ্যা যদি না খাও ধরা, সেই ধরা তিনি খেলেন এসএসসি পরীক্ষার পর। তার মা মিনু রহমান শত প্রচেষ্টার পরও ছেলেকে আর পড়াতে পারলেন না। কিন্তু আরমান সাহেব বুদ্ধিমান এবং বিচক্ষণ মানুষ হবার কারণে শুরু করেন নানান রকম ব্যবসা করা। সে ব্যবসা বদলে বদলে শেষ পর্যায়ে এসে থাকে এই গরুর ব্যবসায়। আর এই ব্যবসাটাই বেড়ে হয়ে দাঁড়ায় তাদের ফ্যাক্টরি। যেখানে এখন আরমান সাহেবের অধিনে কাজ করে হাজার হাজার মানুষ।
তূর্য বেশ লম্বা সময় তার বাবার এই অফারের কথা ভাবতে থাকে। কারন সে জানে, এই সুযোগ সে হারালে শুধুই হিয়া নয়, সে হারাবে নিজেকে। আর এই দেশে চাকরি মানেই তো সোনার হরিণ। তাছাড়া হিয়ার বাবা চাচারা নিজেরাই সরকারি চাকরিজীবী, তাদের কাছে যেন-তেন চাকরি নিয়ে দাঁড়ালে, মেয়ে তো দূরে থাক, বাড়িতেও উঠতে দেবেন না। তূর্য তার ভাবনার অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়ায়। বাইরের আলোয় তার মুখটা স্পষ্ট নয়, কিন্তু চোখ দুটো এক অদ্ভুত সিদ্ধান্তে চকচক করছে। তবে সে স্থির হয় ।
সকালটা যেন অন্যরকম। আজকের আলোটা আরও উজ্জ্বল, বাতাসটা আরও হালকা মনে হয় তূর্যর কাছে। সাদা শার্ট, গা ছোঁয়া কালো প্যান্ট, হাতে ঝুলানো কোট আর পরিপাটি করে আঁচড়ানো চুলে সে এসে দাঁড়ায় ব্রেকফাস্ট টেবিলের পাশে। চোখে-মুখে দৃঢ়তা, অপেক্ষায় কেবল তার বাবার। নূরজাহান বেগম চমকে যান ছেলেকে এমন পোশাকে দেখে। বিস্ময়ে জিজ্ঞেস করেন, "এতো সকালে সেজেগুজে? কোথাও যাচ্ছো নাকি?"
তূর্য শান্ত স্বরে বলে, "অফিসে যাচ্ছি মা। আব্বুর সঙ্গে।"
নূরজাহান বেগম শুকনো মুখেই বেসম খান ছেলের এ কথা শুনে। তিনি না বুঝে আবার জিজ্ঞেস করেন, “কি বললি, কোথায় যাচ্ছিস?”
তূর্য চোখ ছোট ছোট করে বলল, “অফিসে যাচ্ছি অফিসে।”
নূরজাহান বেগম খুশিতে দুহাত তুলে আল্লাহকে শুকরানা জানাতে শুরু করেন। এরপর একে একে কলের পর কল করে বংশের সকলকে জানিয়ে দেন তূর্যর অফিসে যাবার সংবাদ। বাপের বাড়ি থেকে শশুর বাড়ি, শাশুড়ি, বান্ধবী কেউই যেন বাদ যান না। তূর্য শুধু বোকার মতো তার মায়ের দিকে তাকিয়ে থাকে। তার এই সিন্ধান্তের এমন প্রতিক্রিয়া হতে পারে তা যেন কোন ভাবেই সে মেনে নিতে পারছে না।
তূর্যর এই ভয়ংকর প্রতিক্রিয়ার মাঝেই আরমান সাহেব ডাইনিংরুমে এসে পড়েন। নূরজাহান বেগম ফোন রেখে পরম হাসি হাসি মুখে তাকিয়ে থাকেন আরমান সাহেবের মুখের দিকে। তূর্যের এই পরিপক্ক রুপ আর নূরজাহান বেগমের আল্লাদ দেখে তার চোখেও বিস্ময় ফুটে উঠে। তার ছেলের এই প্রস্তুতি তাঁকেও চমকে দেয় বেশ। মুখে কিছু না বললেও ভেতরে একটা স্বস্তির ঢেউ বয়ে যায়। তবে চোখে মুখে পরিষ্কার আবেগ লুকিং তিনি বলেন, "তাহলে তুমি আমার প্রপোজালে রাজি?"
তূর্য চেয়ার টেনে বসে বললো, "ভাবলাম নিজেদের ব্যবসা। কি দরকার অবহেলা করার। যাই, আপনারও সাহায্য হবে।"
এ ছেলে ভাঙবে তাও মচকাবে না। তূর্য যে কি জন্য রাজি হয়েছে অফিসে যেতে, তা তো আর বুঝতে বাকি নেই আরমান সাহেবের। তবে তার মতে, প্রেম থেকে যদি ভালো কিছু হয় তবে প্রেমও ভালো। তিনি কোন প্রতিক্রিয়া দেন না।
সকালের নাস্তা শেষে তূর্য বেরিয়ে পড়ে আরমান সাহেবের সাথে। রাজশাহীর শহরতলির একটু বাইরে, বড় রাস্তাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে থাকা বিশাল ভবন, তূর্যর প্রথম গন্তব্য। তিনতলা মেইন অফিস বিল্ডিং, নামটা ঝকমকে স্টিলের অক্ষরে লেখা, "KHAN DAIRY & AGRO INDUSTRIES LTD." সিঁড়ি ভেঙে ওপরে উঠতেই সে যেন ঢুকে পড়ে অন্য এক জগতে।
রিসেপশন, কনফারেন্স রুম, ম্যানেজমেন্ট ডেস্ক, একের পর এক ডিপার্টমেন্ট। কর্পোরেট পরিবেশ, মানুষের গাম্ভীর্য, পরিপাটি ইউনিফর্মে ঘুরে বেড়ানো কর্মচারীরা, সবকিছুই তূর্যকে স্তব্ধ করে দেয়। তার ধারণা ছিল, ছোটবেলায় সে যেমন কাঁদা মাটির পরিবেশ দেখেছিল সেই একই পরিবেশ এখনো পাবে। অথচ এখানে তো একেবারে সিস্টেমেটিক কর্পোরেট মডেল।
আরমান সাহেব তাকে পরিচয় করিয়ে দেন ফাইন্যান্স বিভাগের সিনিয়র ম্যানেজারের সঙ্গে। আরমান সাহেব তূর্যর ঘাড়ে হাত দিয়ে বলেন, "এই জায়গাটা আমি তোমার জন্য রেখেছিলাম। এবার এটা তোমার জায়গা। এনারা তোমাকে সব কাজ শিখিয়ে দেবেন।"
তূর্য সকলের সাথে কথা বলে, পরিচিত হয়। এরপর পরিদর্শনে বের হয়, ফ্যাক্টরি সাইটে। আধা ঘণ্টার রাইডে পৌঁছায় বিশাল ফ্যাক্টরি চত্বরে, যেখানে মিল্ক প্রোসেসিং, প্যাকেজিং, কোল্ড স্টোরেজ সব এক ছাদের নিচে চলছে। তূর্যের চোখ জুড়ে বিস্ময়। এত বড় সাম্রাজ্য, অথচ এতদিন সে তা বোঝেইনি। তার অবশ্য বোঝার কথা নয়। তার বাবা যে একজন নাম করা হাড্ডি কিপটে তা কি কারো জানতে বাকি আছে? তার বাইক কেনার জন্য তাকে সাত দিন না খেয়ে থাকতে হয়েছে। তাও টাকা নেই বলে আরমান সাহেব কতো না অভিনয় করেছিলেন। এরপর তার প্রিয় ক্যামেরাটা, সেটাও তো তার বাবার পা ধরে ঝুলে ঝুলে কেনা। একাংশের টাকা তাও তার মায়ের দান। তূর্য একবার চোখ বাকা করে তাকায় আরমান সাহেবের দিকে। এই অফিস আরমান সাহেবের অধিনে চাকরিরত অফিসাররা আসেন দামি দামি গাড়িতে আর আরমান সাহেব আসেন অটো কিংবা রিক্সায়। তূর্য নিজের মাথায় একবার হাত চাপড়ায়। পৃথিবীতে মানুষ এতো কিপটেও হয়!
সময় বাড়ে, তূর্য এসব চিন্তা বাদ দিয়ে এখন এগোয় ফ্যাক্টরির পিছনের ফার্মে। এবার অবশ্য তার ধারনা বাস্তবে মিললো। এটাই তার কল্পিত সেই জায়গা, যেটা সে ছোটবেলায় দেখেছে। সারি সারি ডরু বাঁধা, সাথে এলোমেলো গরুর গন্ধ, গোবর, ঘাস আর কাঁদা চিটচিটে পরিবেশ। ছোটবেলায় সে এখানেই একবার গরুর দাবড়ানিও খেয়েছিল। সেই ভয়েই তো আর এদিকে পা বাড়ায়নি। তূর্যর এই ভাবনা শেষ হতে না হতেই এক কর্মচারীর হাত থেকে একটা গরু ছুটে এসে লাগিয়ে দিল ধাক্কা তূর্যকে। নিচে কাদা মাটি হওয়ায় নিজেকে সামলাতে ব্যর্থ হয়ে তূর্য সোজা মুখ থুবড়ে পড়লো কাঁদায়। হাতের কোট লেপ্টে যায় কাদায়, নাকে আঘাত লাগে হালকা, সারা মুখে কাঁদায় মাখো মাখো অবস্থা। তূর্য এক মুহূর্তের জন্য সকে চলে যায় যেন। কর্মচারীরা দৌড়ে আসে। আরমান সাহেব এগিয়ে এসে ছেলেকে ধরেন। আশেপাশের লোকেরা তাকিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে, কেউ কেউ হাসছে, কেউ বিস্মিত। এ যেন এক অপ্রত্যাশিত ঘটনা। প্রথম দিনেই মালিক সাহেবের ছেলে কাঁদা মাটিতে গড়াগড়ি খাচ্ছে। তূর্য রাগও করতে পারছে না, আবার ছোট বাচ্চাদের মত হাত পা চুড়ে কান্নাও করতে পারছে না। এটা অবশ্য তার এ বয়সে যায় না।
তূর্য উঠে একরকম ছোটখাটো গোসল সেরে নেয় এই কাঁদা পরিষ্কার করতে গিয়ে। তূর্য আজ যেন নিজের পরিহাসে নিজেই মজা পাচ্ছে। ভেতর থেকে সে জানে, এই কাজ তার জন্য না। এই পরিবেশ তাকে মানায় না। তবু আজ তার নিজের মনের চেয়ে বড় হয়ে উঠেছে এক অনুভব, হিয়া। আর মানিয়ে নেয়া। তবে হিয়ার সাথে তারতো প্রখর প্রেম নেই! প্রনয় নেই, তাও কি এক অদ্ভুত আকর্ষনে তূর্য তাকে পেতে সবটা করে যাচ্ছে। সূর্য নিজের ভাবনায় নিজেই হেসে পড়ে। এই ভিজে শরীরে সোজা একটা ভিডিও কল লাগায় হিয়াকে। সে জানে হিয়ার কাছে বিষয়টা ব্যাপক হাস্যকর হবে। কিন্তু তূর্য এখন চায় হিয়ার ওই মাদকতা ময় হাসিটা দেখতে। কয়েকবার রিং বাজতেই ভিডিও কলটা হিয়া রিসিভ করে, এটাই বোধহয় তাদের প্রথম ভিডিও কল। হিয়া তার ক্যাম্পাসে হাঁটছে, পাশেই মিমও আছে, দুজন একই ফ্রেমে। হিয়া শুধু ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে থাকে ভিজে যাওয়া তূর্যর দিকে। তূর্য একগাল হেসে বলে, “মিম, দূরে যা তো। তোর ভাই আর ভাবি কথা বলবে। লজ্জা করে না কবাবের হাড্ডি হতে?”
মিম চুপসে যায়। তবে ভারি মজাও পায় তূর্যর এমন কথায়। তাই সে বলে, “খুব ভুল হয়ে গেছে ভাইয়া তোমরা কথা বলো আমি একটু সামনে এগোই।”
মিম দ্রুত হেঁটে সামনে এগিয়ে যায়। হিয়া অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে, “এতো ভিজলেন কি করে? তাও আবার এই পোশাকে।”
তূর্য পেছনের ক্যামেরা অন করে গরুর খামারটা দেখায়। এরপর বলে, “আপনাকে বিয়ের প্রস্তুতিতে নেমেছি। বাবা বলেছেন কোন বেকার ছেলের সম্মন্ধ নিয়ে তিনি তার ভাইয়ের বাড়িতে যাবেন না। তাই সাবলম্বী হচ্ছি। প্রথম দিনেই গরুর গুতোয় একেবারে অক্কা পেয়ে যাচ্ছিলাম। এরপর কোন রকম কাদা মাটিতে গড়াগড়ি খেয়ে বেঁচে ফিরেছি। তাই ভাবলাম আপনাকে একবার আমার পরিস্থিতিটা দেখাই।”
হিয়া জোরে হেসে ওঠে তূর্যর এমতা অবস্থা দেখে। তূর্য নিজেও হেসে ওঠে। হিয়া আগে থেকেই জানতো তূর্যর বাবা এমন কোন শর্তই দেবেন। কারণ হিয়ার নিজের বাবার কাছেও কোন বেকার ছেলের সম্বন্ধ কখনো গ্রহণযোগ্য হতো না। তবে এখন যেন হিয়া স্বস্তি পায়। তূর্যর এতসব আয়োজন শুধুমাত্র হিয়াকে পাবার। যেকোনো মেয়ের নিজেকে যথেষ্ট পরিমাণ সৌভাগ্যশালী ভাবতে কোন ছেলের এই সামান্য ইফোর্ট টুকুই যথেষ্ট। তাদের কথা বেশি সময় চলে না। আরো কয়েকজন লোকের সাথে পরিচয় পর্ব বাকি থাকায় সেখানে যেতে হয় তূর্যকে।
এখানে এমন ভিজে শরীরে তূর্য আর বেশি সময় না থেকে বাসায় ফিরে আবার তৈরি হয়ে বিকেলে অফিসে ফিরে যায়। তূর্য তার নিজের জন্য বরাদ্দ করা ক্যাভিনে বসে। আরমান সাহেব তাকে কাজ নিরবে বুঝিয়ে দেন। তূর্য ধৈর্য্য ধরে সব কাজ একে একে বুঝে নেয়।
______________
চলবে.... ❤️