নির্বাসিত কৃষ্ণচূড়া — পর্ব ৪৬

লেখক: সাদিয়া তিন্তি · বিভাগ: রহস্য · পর্ব ৪৬ · ৪৭ পর্বের মধ্যে ৪৬

আগামীকাল বৌভাতের অনুষ্ঠান। সেটার আয়োজনে এখনো বাড়িটা মেতে আছে। কানায় কানায় টুই টুম্বুর মেহমান, হিয়ার মাথায় আঘাত লাগার কারণে সবাই তাকে বিশ্রামের সুযোগ দিচ্ছে। তবে হিয়ার মস্তিষ্ক হিয়াকে বারংবার বিরক্ত করে চলেছে নতুন অগণিত প্রশ্নে। আঘাতটা যেন জরুরী ছিল। হঠাৎ হিয়া উঠে দাঁড়ায়। চোখে স্থির এক সিদ্ধান্ত। সে ফোনটা তুলে তার দাদা আব্দুর রবিউল মোহাম্মদকে কল করে।

ফোনটা একবার রিং হতেই ওপাশ থেকে পরিচিত কণ্ঠ ভেসে এলো, "হিয়া? কেমন আছিস?"

সেই কণ্ঠে অদ্ভুত এক নরমতা ছিল, যা বহুদিন ধরে নিঃশব্দে রেখেছিল হিয়া। হিয়া এক মুহূর্ত দম নিয়ে বলল, "ভাল আছি দাদাভাই। আপনি কেমন আছেন?"

আব্দুর রবিউল মোহাম্মদ খুশি হয়ে বলেন, "এই তো হিয়া। আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি। এতো দিন পর যে তুই আমার সাথে কথা বলছিস এতেই আরো ভালো হয়ে গেছি।"

হিয়া একটুও সময় নষ্ট না করে সরাসরি বলল, "দাদাভাই, আজ আমি আপনার কাছে কিছু প্রশ্নের উত্তর চাই। একেবারে সত্যি উত্তর, প্লিজ আমাকে না করবেন না।"

ওপাশটা এক মুহূর্ত থেমে গেল, যেন তিনি নিঃশ্বাস আটকে রেখেছেন। হয়তো তিনি যে কোন প্রশ্নের সম্মুখীন হবার প্রস্তুতি নিলেন। কিছু সময় পর আব্দুর রবিউল মোহাম্মদের গম্ভীর গলা শোনা গেল, "কি জানতে চাস, বল।"

হিয়া গলার স্বর নিচু করল, যেন কথাগুলো বাড়ির দেয়ালেও না শোনে, সে বলল, "প্রকৃতির ডায়রি সম্পর্কে দাদি, মানে মিনু দাদি কি কিছুই জানতেন না? বড় দাদার কাছে তিনি সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছিলেন ডায়রি সম্পর্কে।"

আব্দুর রবিউল মোহাম্মদ কিছুটা দ্বিধার সঙ্গে বললেন, "আমার জানা মতে না, মিনু জানতো না। এই বিষয়ে কিংবা প্রকৃতি আপার বিষয়ে কখনো কারো সঙ্গে কথা বলতে দেখিনি। আর আব্বার হুকুম মতে বাড়িতে যেহেতু বিষয়টা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ছিল। তাই আর ওই দিনের পরে কোনদিনও এ বিষয়ে কথা ওঠেনি।"

হিয়া এবার গলার স্বর আরও গম্ভীর করে জিজ্ঞেস করলো, "দাদাভাই… তুহুরার মৃত্যু কিভাবে হয়েছিল?"

এবার ওপাশের কণ্ঠ যেন চেপে আসে। আব্দুর রবিউল মোহাম্মদ একেবারে শান্ত গলায় বলেন, "হিয়া, এসব প্রশ্ন কি আজ খুব বেশি জরুরি? সবটাই তো জানিস। আমি সবার সামনে সেদিনই সব সত্য স্বীকার করে নিয়েছি। এর বাইরে আর কোন সত্য নেই।"

হিয়া থামেনা, একরকম কাতর অনুরোধ করে বলল, "প্লিজ দাদাভাই, আপনি শুধু এইটুকু বলুন, তুহুরার মৃত্যু কি আসলেই একটা দুর্ঘটনা ছিল?"

এইবার গলা ভিজে যায় আব্দুর রবিউল মোহাম্মদের। নীরবতার ফাঁকে এক দীর্ঘশ্বাস ভেসে আসে। তিনি বলেন, "তুহুরা আর আমার খুব ঝামেলা হচ্ছিল সেদিন। ওর কিছু কথা নিয়ে আমি খুব রেগে যাই। একেবারে ধাক্কাধাক্কি পর্যায়ে চলে যায়। আমি আমার অতিরিক্ত রাগ সামলাতে পারিনি… ওকে ধাক্কা দিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যাই।কিছুক্ষণ পরেই মিনু চিৎকার করে ডাকে। আমি দৌড়ে গিয়ে দেখি… তুহুরা নিথর হয়ে পড়ে আছে। রক্তে ভেসে যাচ্ছে চারপাশ। কীভাবে পড়ে গেল, মাথায় কি ভাবে লেগেছিল, আমি জানি না। শুধু জানি আমার ধাক্কার ফলাফল এটা। এরপর ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়ার আগেই… সব শেষ হয়ে যায়।"

হিয়ার গলা আটকে যায়, কিন্তু সে নিজেকে সামলে নেয়। ধীরে ধীরে বলে, "তা হলে এটা একটা দুর্ঘটনা… ঠিক আছে। তবে দাদাভাই, আপনি তুহুরা মারা যাওয়ার মাত্র ছয় মাসের মাথায় কেন বিয়ে করেছিলেন?"

রবিউল মোহাম্মদের কণ্ঠ ভেঙে যায়, যেন অনেক পুরোনো কোনো পাপ আবার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। তিনি বলেন, "আমার আম্মার কসমের জন্য। আমি কখনো তুহুরার মৃত্যুর পরে বিয়ে করতে চাইনি। কিন্তু আম্মা তখন খুব ভয় পেয়ে গিয়েছিলেন। ভেবেছিলেন আমি বোধহয় বড় ভাইয়ের মতো সন্ন্যাসী হয়ে যাব। বড়ভাই তো বেপরোয়া ছিলেন, তার পরে পরিবারে আরেকটা ছেলেও যদি একই পথে হাঁটেন সেটা আম্মা সইতে পারতেন না। তাই… একরকম জোর জবরদস্তি করেই আম্মা আমাকে রাজি করান… তার বড় ভাইয়ের মেয়ের সঙ্গে বিয়ে দেন। আমি কিছু বলিনি। ওই সময়টায় আমি একদম শূন্য হয়ে গিয়েছিলাম।"

হিয়া একেবারে চমকে ওঠে, "তারমানে দাদি আপনার মামাতো বোন ছিলেন? তবে তো দাদি তুহুরার কথা সব জানতেন?"

আব্দুর রবিউল মোহাম্মদ কোন ভনিতা ছাড়াই বলেন, "না জানার তো কিছু নেই! তোর দাদি একজন অসাধারণ নারী ছিলেন। বোধহয় তার জন্যই আমি নিজেকে সামলে নিতে পেরেছিলাম। এই সত্য তোর দাদির সবটাই পরিষ্কার জানতেন। কিন্তু আমাদের লম্বা বৈবাহিক জীবনে কোনদিনও এক মুহূর্তের জন্যও সে তুহুরা কিংবা আমার ব্যর্থতার কথা তার মুখে অব্দি আনেনি‌।"

হিয়া একেবারে চুপ করে যায়। শব্দহীন হয়ে বসে থাকে। তাঁর চোখে যেন অদৃশ্য অক্ষরে লেখা হচ্ছে অতীতের অসমাপ্ত অধ্যায়গুলো। তার মস্তিষ্কে খেলে যায় সেই দিনের কথা, যেদিন প্রথম তুহুরার ছবি প্রকাশ্যে এলো‌। সেদিন মিনু রহমান বলেছিলেন তুহুরার বিষয়টা গোপন রেখেই তার দাদা ছয় মাসের মাঝে বিয়ে করে। এমনকি নতুন বউ তুহুরা সম্পর্কে কিছুই জানতো না। হিয়ার ভাবনায় বাঁধ দিয়ে, ওপাশ থেকে আব্দুর রবিউল মোহাম্মদ বলে ওঠেন, "তুহুরার মৃত্যুর পাপ আমার মাথায় আজও ঝুলে আছে হিয়া। হয়তো কেউ বিশ্বাস করবে না। লুকানো পাপ বাইরে এলে কে বা পাপির বয়ানের সত্যতা যাচাই করতে চায়!… কিন্তু আমি নিজেই নিজেকে আজও ক্ষমা করতে পারি নি, এটাই সত্য।"

হিয়া ফিসফিস করে শুধু একবার বলে, "আমি বুঝতে পারছি দাদাভাই…"

কিছু সময় থেমে হিয়া আবার জিজ্ঞেস করে, "শেষ একটা প্রশ্ন। তুহুরা মৃত্যুর পর তুহুরা প্রকৃতির ডায়রিটা কোথায় রেখেছিলেন সেটা কি আপনি জানতেন?"

আব্দুর রবিউল মোহাম্মদ সোজাসাপটা বলেন, "না। তুহুরা আড়ালেই রাখতো অনেক বিষয়। এমন কতো কিছুই তো আমি মিনুর থেকে জেনেছি। তাছাড়া তুহুরার মৃত্যুর পর আমার পরিস্থিতি এমন ছিল না যে এসব বিষয়ে আমি খেয়াল রাখবো। তারপর তুহুরা চলে যাবার পর, আমি মানুষিক খুব ভেঙে পড়ি। সময় যেতেই নতুন বিয়ে করেই বাড়ি ছেড়ে দেই। নতুন চাকরি, জীবনটাকে এক্কেবারে বদলে ফেলি। বলতে পারিস পুরোনো সব কিছু মুছে ফেলার চেষ্টা ছিল সেটা।"

হিয়া এবার একটু ভেবে জিজ্ঞেস করে, "মিনু দাদির থেকে অনেক কিছু জানতেন বলতে?”

আব্দুর রবিউল মোহাম্মদ বলেন, “মিনু আর তুহুরার সম্পর্ক খুব ভালো ছিল। দুজনই দুজনের কম বেশি সবই গোপন তথ্য জানতো। তুহুরা বড় ভাইয়ের প্রতি প্রচন্ড দূর্বল ছিল। এগুলো থেকে মিনু তুহুরাকে সরাতে চাইতো। এভাবেই অনেক কিছু আমার জানা।”

হিয়া ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল, “তবে কি তুহুরার মৃত্যুর দিনও কি মিনু দাদি আপনাকে কিছু বলেছিলেন সেই নিয়ে ঝামেলা?”

আব্দুর রবিউল মোহাম্মদ শান্ত স্বরে বলেন, “না। সেটা কোন কারন ছিল বলে মাথায় আসছে না।”

হিয়া এবার সোজা প্রশ্ন করে, “দাদাভাই, তুহুরার কাছ থেকে প্রকৃতির ডায়েরি চিলেকোঠায় কি করে গেল?"

আব্দুর রবিউল মোহাম্মদ বলেন, "হয়তো তুহুরাই রেখেছিল সবার আড়ালে গোপনে।"

হিয়া সাথে সাথে বলে, "না না না এক্কেবারে অসম্ভব। তুহুরার মৃত্যু ৭৫'এ। আর চিলেকোঠার ঘরটা তো তৈরি আশির দশকে। মানে তুহুরার মৃত্যুর ৫ বছর পর। তুহুরা তো তার মৃত্যুর ৫ বছর পর চিড়েকোঠায় ডায়েরি আর নিজের বাক্স, এগুলো রাখতে আসবে না।"

আব্দুর রবিউল মোহাম্মদ একটু ভেবে বলেন, "তুহুরার সব জিনিসপত্র চিলেকোঠায় হয়তো মিনু রেখেছিল আর না হলে বড় ভাই। যখন দোতলায় ছাদ আর চিলেকোঠার ঘরটা করা হয় তখন আমার পোস্টটিং সিলেটে ছিল। তোর দাদিকে নিয়ে তখন সেখানেই থাকতাম। মিনু আর বড়ভাই তখন ঢাকায় ছিল।"

হিয়া আরেকটু ভাবে। হিয়ার কাছে অনেক বিষয় যেন একেবারে পরিস্কার। সে সত্য চায়। হিয়া আর না ভেবে আব্দুর রবিউল মোহাম্মদকে বলে, "দাদাভাই, আমি যে আপনাকে এতসব প্রশ্ন করলাম এগুলো কাউকে বলবেন না আপাতত। কিছু একটা জটলা পেকেছে। এই জটটা খুলতে পারলেই হয়তো প্রকৃত রহস্যের সমাধান হয়ে যাবে।"

আব্দুর রবিউল মোহাম্মদ একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলেন, "তুমি নতুন সংসারে গিয়েছো হিয়া। বিয়ের মাত্র একদিন চলছে। যে সব অতীত দিন চলে গেছে ওগুলোকে ছেড়ে দাও। এসব নিয়ে আর পড়ে থেকো না।"

হিয়া শুধু সম্মতি দিয়ে বলে, "দাদা ভাই কাল তাড়াতাড়ি আসবেন। বৌভাতের অনুষ্ঠানের পর কিন্তু থেকে যেতে হবে আপনাকে এখানে। আমার জন্য একা মানিয়ে নেওয়া একটু কষ্টকর। আপনি থাকলে আমি স্বস্তি পাব।"

আব্দুর রবিউল মোহাম্মাদের চোখে এক চিলতে পানি চকচক করে উঠে। নাতনির সব অভিমান লম্বা সময় পর গলে জল হলো। আব্দুর রুশান মোহাম্মদের মৃত্যুর পর আজই প্রথম হিয়া আব্দুর রবিউল মোহাম্মদের সঙ্গে এতক্ষণ কথা বলল। তিনিও চনমনে হয়ে উঠলেন। রোগটা যেন ছেড়ে পালালো আব্দুর রবিউল মোহাম্মদকে। তাদের কথার সমাপ্তি ঘটে। হিয়া চুপচাপ বসে থাকে কিছুক্ষণ। ঘরটা নিস্তব্ধ, শুধু খাটের পাশে ঝুলে থাকা জানালার পর্দাটা মাঝে মাঝে বাতাসে হেলে পড়ে, আবার উঠে যায়। হিয়ার চোখদুটো ভরা গভীরতা, তবুও সে ধীরে উঠে এসে ফোনটা তুলে নেয়। মিমকে কল করে। মিম ফোন রিসিভ করতেই হিয়া বলে, "মিম, একটু আমার ঘরে আসবি?"

মিমের চিন্তিত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল, “শরীর ঠিক আছে তো?"

হিয়া বলে, "সব ঠিক আছে, তুই তাড়াতাড়ি এ ঘরে আয়।"

মিম কথা না বাড়িয়ে ফোন রাখে। কিছুক্ষণের মধ্যেই হিয়ার ঘরে এসে পড়ে। মিমের চোখে স্পষ্ট বিস্ময়, "কি হইছে? এত সিরিয়াস কণ্ঠে ডাকলি কেন?"

হিয়া সোজা হয়ে বসে বলে, "একটা সাহায্য চাই। তুই কি কোনওভাবে দাদির আলমারির চাবিটা আনতে পারবি?"

মিম কপাল কুঁচকে তাকায়, “চাবি? কেন? কী করবি?”

হিয়া একটু থেমে বলে, "দাদির পুরনো কিছু চিঠি দেখতে চাই।"

মিমের কণ্ঠে এবার দ্বিধা আর কৌতূহল মিলেমিশে যায়। সে বিষ্ময় নিয়ে বলে, "চিঠি? তুই চিঠি দেখতে চাস কেন? ওগুলো সব পুরোনো। কোন কাজের না।”

হিয়া ধীরে ধীরে বলে, “দাদি তুহুরার ব্যাপারে কিছু জানতেন কিনা সেটা বোঝা দরকার। তুহুরা কি কখনও প্রকৃতির সম্পর্কে কিছু বলেছিলেন দাদিকে? এসব জানতে পারলে অনেক কিছু পরিষ্কার হবে।”

মিম মুখ টিপে হাসে, "এসব জেনে তুই করবি কি? তুহুরা, প্রকৃতি, ডায়েরি এইসব রহস্য তো মিটেই গেছে। এখন এতে কী আসে যায় যে, দাদি কিছু জানতেন, নাকি জানতেন না?"

হিয়ার গলা এবার রুক্ষ হয়ে ওঠে, "এতো প্রশ্ন করিস না। আগে বল তো, চিঠিগুলো দেখা যাবে কিনা?"

মিম একটু চুপ করে থাকে। হিয়াকে মিম প্রচন্ড ভরসা করে। হিয়া অহেতুক কোন সন্দেহ করার মেয়ে না। মিম সোজা বলে, “আলিফ পারবে।”

হিয়া বিস্মিত হয়ে বলে, "আলিফ?"

মিম এবার হেসে বলে, “হ্যাঁ। ও আগে দাদির আলমারি খুলে ফেলতো চাবি ছাড়াই। আগে তো দাদি ওর জন্য সব মিষ্টি জাতীয় জিনিসপত্র আলমারিতে লুকিয়ে রাখতেন। আলিফের তো জন্মগত ডায়াবেটিক, সেই ছোটবেলা থেকেই ওর চিনি জাতীয় কিছু খাওয়া নিষেধ ছিল। কিন্তু আলিফ তো চ্যাম্প! কেমন করে যেন খুলে ফেলতো দাদির আলমারি, আর চুপিচুপি খেয়ে নিতো।”

হিয়ার মুখে একটু হাসি ফুটে ওঠে, তবে সেটা দ্রুতই মিলিয়ে যায় গম্ভীরতায়। সে বলে, "পারফেক্ট, এমন কাউকেই দরকার। ওকে তাড়াতাড়ি ডেকে আন। তবে ওর পেটে কথা গোপন থাকবে তো?"

মিম হালকা হেসে মাথা নাড়ে। "আরে আমরা চোর হলে আলিফ একটা আস্ত ডাকাত। ওর পেট থেকে কথা বের করা অসম্ভব। আচ্ছা, আমি আলিফকে গিয়ে বলি এখনি। কিন্তু হিয়া… তুই কিন্তু খুব বেশি প্রেশার নিচ্ছিস এটার জন্য।”

হিয়া মৃদু কণ্ঠে শুধু বলে, “মিম, সবকিছুর একটা ভিত্তি থাকে। যদি সে ভিত্তি নড়ে যায়, তাহলে ইতিহাস নতুন করে লেখার দরকার পড়ে। আমি জানতে চাই এখানের ঠিক কোন ভিত্তি নড়েছিল।”

মিম হালকা চমকে যায়, তবে আর কিছু না বলে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যায়। হিয়া আবার জানালার পাশে এসে দাঁড়ায়। তার চোখে প্রশ্ন, জিজ্ঞাসা, আর একরাশ স্মৃতি সব মিশে এক বিষাদঘন নৈঃশব্দ্য।

মিম হিয়ার দিকে তাকিয়ে এক মুহূর্ত দম নিয়ে চলে যায় ঘর থেকে। কিছুক্ষণের মধ্যেই সে ফিরে আসে আলিফকে নিয়ে। হিয়া তখন চেয়ারে বসে ছিল। আলিফ আসার সাথেই ওর দিকে তাকিয়ে হিয়া বলে ওঠে, "আলিফ, তোমার সাহায্য দরকার। দাদির আলমারিতে কিছু পুরোনো চিঠি আছে। আমি জানতে চাই তুহুরা কখনো দাদিকে প্রকৃতির ব্যাপারে কিছু লিখেছিল কিনা। এই চিঠিগুলোই সেটা প্রমাণ করতে পারে।"

আলিফ শান্ত গলায় বলে,, " মিম আপি সব বলেছে। তবে আপি, বাড়িতে তো এখন এত মেহমান, এই সময়ে এটা করলে ধরা পড়ে যাবার চান্স বেশি। মেহমানরা গেলে করলে হতো না?"

হিয়া মাথা নেড়ে বলে, "না আলিফ, আমার সব সন্দেহ এখনই মেটাতে হবে। এই মুহূর্তেই। কাল বৌভাত, তারপর সবাই চলে যাবে। এখনই উপযুক্ত সময়। প্লিজ, তুই সাহায্য কর।"

আলিফ একটুখানি গম্ভীর হয়ে যায়। তারপর চুপচাপ মাথা ঝাঁকায়, “ঠিক আছে, তবে একটাই সুযোগ আছে, দাদি যখন গোসলে যাবেন, তখনই কিছু করা যাবে। এর বাইরে সময় পাওয়া যাবে না। মেহেমান তো লেগেই আছে।"

হিয়ার মুখে চাপা হাসি, তীক্ষ্ণ চাওয়াতে চিরে ওঠে একরাশ অপেক্ষা। “ওটুকু সময়ই যথেষ্ট। যদি আমরা প্রস্তুত থাকি।”

সময় এগোয় পরিকল্পনা অনুযায়ী।দুপুর সাড়ে বারোটার কিছু সময় পর, মিনু রহমান ধীরে গোসলখানার দিকে পা বাড়ান। মিম তৎক্ষণাৎ মিনু রহমানের ঘরে গিয়ে মেহমানদের সরিয়ে নেয়। ঠিক তখনই আলিফ একটা চুলের পিন দিয়ে আলমারির লক খোলার চেষ্টা করে, একটু সামান্য চেষ্টার ফলেই তালাটা খুলে যায়। হিয়া সাথে সাথেই নিচু হয়ে একে একে ড্রয়ার খোলে। হুট করেই মিলে যায় প্রত্যাশিত চিঠি। প্রথমেই দেখা যায় কিছু হলুদ হয়ে যাওয়া অজস্র চিঠি। কত হাতের লেখা, কতটা না বলা গল্প যেন থেমে আছে সেখানে। চিঠির সংখ্যা অসংখ্য। এই সামান্য সময়ে পড়া সম্ভব না। তাই হিয়া আলিফকে বলে, "তুহুরা আর আমার দাদা মানে আব্দুর রবিউল মোহাম্মদ, এনাদের দেয়া চিঠি আলাদা করে ফেলো আর যেগুলো সন্দেহ মনে হয়‌ সেগুলোও।"

হিয়ার কথা মত হিয়ার হাতে হাত লাগিয়ে দ্রুত চিঠিগুলো আলাদা করে ফেলতে থাকে আলিফ। শুধু তুহুরার নয়, কিছু চিঠি আছে অচেনা নামেও তবে সবই যেন ঐ রহস্যময় সময়ের ছায়াপথে লেখা। চিঠিগুলো আলাদা করে গুছিয়ে একটা কাগজের ব্যাগ ভর্তি করা হয়। হিয়া ধীরে বলে, "আজকের মধ্যেই সব পড়ে ফেলতে হবে। কাল সকাল হতেই এগুলো আবার আলমারিতে রেখে দিতে হবে ঠিক যেভাবে ছিল।"

আলিফ হেসে বলে, “চিন্তা কইরেন না আপি, আমি আবার ঠিকমতো তালা লাগায়ে দিব। কেউ কিছু টের পাবে না।”

চিঠির খাম হাতে নিয়ে তিনজন ঘর থেকে বেরিয়ে যায় নিঃশব্দে। পেছনে পড়ে থাকে মিনু রহমানের নিখুঁতভাবে লুকানো রহস্যের কুঠুরি, যার তালা খুলে গেছে, বহু বছর পর।

হিয়ার চোখে আজ আর নিঃসঙ্গতা নেই, বরং গভীর এক অনুসন্ধান শুরু হয়েছে তার ভিতরে। সব ভেঙে পড়া ইতিহাসের ধুলো ঝেড়ে খুঁজে পাওয়ার প্রচেষ্টা নতুন কোন সত্যের।

বিকেলের নরম আলো হিয়ার ঘরের জানালায় এসে পড়ে চুপচাপ। রোদটা যেন ইচ্ছে করেই ধীরে ধীরে প্রবেশ করছে, হিয়ার অস্থির হৃদয়ে সামান্য প্রশ্রয় দেওয়ার আশায়। মেহমানদের কোলাহল এখন খানিকটা স্থির, দুপুরের খাবার-দাবার শেষে সবাই হয় বিশ্রামে, নয় গল্পগুজবে ব্যস্ত। এই ফাঁকেই হিয়া তার নিজের ঘরে এসে পড়ে। ড্রয়ার থেকে চিঠির প্যাকেটটা বের করে। একটা একটা করে চিঠি বিছানার ওপর সাজিয়ে রাখে। কিছু চিঠির শেষে তুহুরার নাম, কিছুতে আব্দুর রবিউল মোহাম্মদ লেখা। চিঠির কাগজগুলো পুরনো হলেও, তাদের শব্দে যেন এখনো আগুন জ্বলছে। হিয়ার মনোযোগ এতটাই নিবিষ্ট হয়ে পড়ে পড়ায়, সে খেয়ালই করে না কখন ঘরের দরজাটা খুলে তূর্য ঢুকে পড়েছে। তূর্য কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে দেখে, তারপর ধীরে এগিয়ে আসে। চিঠির স্তূপ দেখে ভ্রু কুঁচকে যায় ওর। তূর্য জিজ্ঞেস করে নিচু গলায়, “এগুলো কী?”

হিয়া একটু চমকে তাকায়, তারপর ধীরে বলল, “দাদির আলমারিতে পাওয়া চিঠি। তুহুরা আর দাদাভাইয়ের লেখা। আমি জানতে চাইছিলাম, প্রকৃতির ব্যাপারে দাদি জানতেন কিনা। মনে হচ্ছে, জানতেন… অনেক কিছু।”

তূর্য কিছুক্ষণ স্তব্ধ দাঁড়িয়ে থাকে। এরপর ধীরে বসে বলল, “মানে? তুই দাদির আলমারি খুলেছিস? দাদির চিঠি তো দাদি কাউকে দেখতে দেন না।”

হিয়া মাথা নিচু করে বলল, “আলিফ আর মিম সাহায্য করেছে। তুহুরা তো দাদিকে চিঠিতে সব লিখতেন। সেক্ষেত্রে দাদি প্রকৃতির ব্যপারে জানতেন কিনা এটা নিয়ে কিছুটা সন্দেহ ছিল, এখন প্রমাণও পেয়ে যাচ্ছি।”

তূর্য একটু বিরক্ত স্বরে বলল, “হিয়া, আমাদের বিয়ে হয়েছে মাত্র একদিন। এখনো কিচ্ছু গুছিয়ে ওঠা হয় নি। আগামীকাল আমাদের বৌভাত। বৌভাতের লোকজন বাড়ি ভরা… আর তুমি এই ধরনের বিষয় খুঁড়ে খুঁড়ে বের করছিস? ব্যপারটা সবার সামনে আসলে দাদি, বাবা, মা কেউই এটা ভালোভাবে নেবে না। তুই বুঝতে পারছিস?”

হিয়া চোখ নামিয়ে চুপ করে যায়। কয়েক সেকেন্ড চুপ থাকার পর বলল, “জানি, কিন্তু … মিথ্যে আর কতো বছর ঘুমাবে? যার যতোটুকু দায় তার ততোটুকু নেয়া উচিত।”

তূর্য জিজ্ঞেস করে, “এই সন্দেহ কেন এলো তোর মাথায়?”

হিয়া তূর্যকে সকালের মিনু রহমানের ছবির এলবাম দেখতে গিয়ে যে তার মনে যে, সন্দেহ জেগেছে তার বিস্তারিত ব্যাখ্যা সমেত বলে। তূর্য কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে ধীরে একটা চিঠি তুলে নেয়। হিয়া এরিয়ে যায় তার প্রধান সন্দেহের কারন। তূর্য চিঠি গুলো খুলে পড়তে পড়তে বলল, “তুই জানিস আমি তোর পাগলামি পছন্দ করি… কিন্তু এটা এখন পাগলামি না, একধরনের বিপদ। তবুও… যেহেতু তুই থামবি না, তো দেখি তোর দৌড় কতদূর।”

হিয়া হাসে, সে বিশ্বাস করে এই মানুষটাকে তার পাশে সে সবসময় পাবে। তূর্য হিয়ার পাশে এসে বসে পড়ে, চিঠির স্তূপে চোখ রাখে দুজনেই। একটা চিঠি, তারপর আরেকটা। শব্দের ভেতর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে দুজনেই কতশত পুরনো ক্ষত দেখতে পায়, তার হিসেব মেলে না। চিঠিগুলোতে পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে, তুহুরা মিনু রহমানের সাথে একেবারে নিয়মিত চিঠি চালাচালি করতেন। তারা একজন আরেকজনের গল্প জানতেন, গোপন ব্যথাও। তুহুরা খুলে লিখেছেন তার অনুভূতির কথা, প্রকৃতির গোপন সত্যতে তার দায়বদ্ধতা এবং প্রকৃতির ডায়েরির খুঁটিনাটি।

আরও চমকে ওঠে তূর্য যখন পড়ে তুহুরার এমন একটা চিঠি যেখানে সে মিনু রহমানকে সংসারে মানিয়ে নেয়ার বোঝাচ্ছে। তূর্য মুখ তুলে চায় হিয়ার দিকে। “মানে, দাদি সংসার ছেড়ে যেতে চেয়েছিলেন?”

হিয়া ধীরে মাথা নাড়ে, “এটা তো তুহুরার থেকে পাওয়া চিঠি গুলোতেই বুঝেছিলাম। আরও খুঁজে দেখতে হবে। তবে একটা জিনিস পরিষ্কার, দাদি বড়দাদাকে যা বলেছেন, তার পুরোটাই সত্য ছিল না। উনি অনেক কিছুই চেপে গিয়েছিলেন।”

তূর্য ধীরে বলে, “এই সম্পর্কগুলো আগুনের মতো, হিয়া। যতই পুরোনো হোক, ছাই থেকে ধোঁয়া উঠে আসতেই পারে। তুই নিশ্চিত, এই আগুনের মুখোমুখি হতে চাস?”

হিয়া চুপ করে থাকে কিছুক্ষণ। তারপর বলল, “আমি যদি মুখোমুখি না হই, তাহলে এই আগুনে অনেক নির্দোষ ও জ্বলে শেষ হয়ে যেতে পারে।"

তূর্য তার দিকে তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ। দুই নবদম্পতি বসে থাকে অতীতের স্পর্শে, এক যুগের ফাঁকে ঝুলে থাকা কিছু না বলা কথার সঙ্গী হয়ে। সবগুলো চিঠি পড়া শেষ হলে একটা ভার নামে, একরকম কোমলতা মুছে গিয়ে এখন যেন এক ধরনের মৌন চঞ্চলতা ঝরে পড়ছে বিকেলের হাওয়ার সঙ্গে। হিয়া ও তূর্য চুপ করে বসে থাকে বেশ লম্বা সময়।

তুহুরা আর আব্দুর রবিউল মোহাম্মদের লেখা অক্ষরগুলো তাদের কাছে এখন শুধু চিঠি নয়, বরং একটি আদিম, নির্মম বাস্তবতা। সম্পর্কের রক্তাক্ত দাগ, স্বীকার না-করা ব্যথা, এবং এমন কিছু সত্য, যা প্রকাশ পেলেই কাঠামো নড়ে যেতে পারে একটি গোটা পরিবারের।

হিয়ার ঠোঁট কাঁপে। গলা শুকিয়ে আসে। সে ধীরে বলে, “আমার মনে হয়, এই চিঠি গুলোর রহস্য শুধু দাদিই সমাধান করতে পারেন।”

তূর্য কিছুক্ষণ চুপ থেকে হঠাৎ উঠে দাঁড়ায়। মুখে কঠিন সংকল্প নিয়ে সে বলল, “চল। এক মুহূর্ত দেরি নয়। এখনই জিজ্ঞেস করি।”

হিয়া কিছুটা চমকে ওঠে। তার কণ্ঠে দ্বিধার ছায়া, “না… না, আমার মনে হয় না উনি সব স্বীকার করবেন। এভাবে সোজাসাপটা প্রশ্ন করলে উনি রক্ষা পেতে চেষ্টা করবেন। আমাদের এমনভাবে প্রশ্ন করতে হবে যাতে উনি নিজে থেকে স্বীকার করতে বাধ্য হন।”

তূর্য ঘুরে হিয়ার দিকে তাকিয়ে বলল , “তুই কি বলতে চাস?”

হিয়া চোখ তুলে সোজা তাকায়, গলায় অভূতপূর্ব দৃঢ়তা, "আমি প্রশ্ন করতে চাই। চোখে চোখ রেখে জানতে চাই কতটা সত্য তার ভেতর আছে।”

তূর্য বিরক্ত ভঙ্গিতে বলে, “হিয়া, তুই এই বাড়ির নতুন বউ। আমি চাই না তোর ফেস ভ্যালু খারাপ হোক এই বাড়িতে।…”

হিয়া হালকা হেসে বলে, “সত্য জানতে চাইলে যদি কারো ফেস ভ্যালু খারাপ হয়ে যায়, তবে আমি সেই পরিমাণ খারাপ হতে রাজি আছি।”

তূর্য ঠোঁট চেপে ধরে বলল, “না…., প্রশ্ন আমিই করব।”

হিয়া তূর্যর দৃঢ়তাকে ভাঙতে চায় না। সে বলল, “ঠিক আছে, তবে প্রশ্ন আপনিই করুন... কিন্তু প্রশ্ন এখানে আরেকটা আছে।”

তূর্য ভ্রু কুঁচকে তাকায়, “আরেকটা? কী?”

হিয়ার কণ্ঠ একটুকু কাঁপে, কিন্তু চোখে নিঃসীম স্থিরতা নিয়ে বলল, “তুহুরার মৃত্যু কিভাবে হয়েছিল?”

তূর্যের মুখ থমকে যায়। যেন হঠাৎ স্তব্ধ হয়ে যায় তার ভেতরের সব শব্দ। সে স্পষ্ট বলল, “ওটা তো পরিষ্কার। মেঝ দাদা তো স্বীকার করে নিয়েছেন সব। আবার নতুন কি!”

হিয়া নিজের মাথার ফোলা অংশ দেখিয়ে বলল, "আপনি বলুন, যদি ধাক্কা লেগেও কেউ পড়ে যায় তবে কতোটা আঘাত লাগবে? এর থেকে বেশি? একটা মানুষের সমস্ত শরীরের ভার দিয়ে যদি কাউকে ধাক্কা দেওয়া হয় তবেই তো মাথা ফেটে রক্তপাত হবার কথা তাই না? না হলে সমান দেওয়ালে এমন তো লাগার কথা নয়?"

তূর্য একটু ভেবে বলল, "তবে মেঝদাদার ধাক্কাতে মৃত্যু কি কিভাবে সম্ভব?"

হিয়া বলল, "দাদাভাই যেটুকু জানেন, তিনি সেটুকু বলেছেন। তিনি অস্বীকার করেননি যে তিনি ধাক্কা দেননি। তবে দাদা ভাইয়ের বর্ণনা অনুসারে, যে ধাক্কার বর্ননা আছে সেই ধাক্কায় ব্রেন হ্যামারেজ হওয়ার কথা নয়।"

তূর্য একেবারে শান্ত হয়ে তাকিয়ে থাকে হিয়ার মুখের দিকে। হিয়া আস্তে ধীরে তার আর আব্দুর রবিউল মোহাম্মদের সমস্ত কথোপকথন তূর্যকে জানায়। তূর্য এবার আরো শান্ত হয়ে যায়। এসব যেন তার ভাবনার বাইরের প্রশ্ন। সে তো কল্পনাও ভাবেনি এসব। তবে, সত্যিই তো! সামান্য আঘাতে মৃত্যু কিভাবে সম্ভব? তূর্য এবার গম্ভীর ভাবে বলল, "এবার তবে দাদিকে গভীর ভাবে প্রশ্ন করতে হবে!"

হিয়া কিছু বলতে যায় তবে তূর্য থামিয়ে দেয়। হিয়ার চোখে পড়ে, তূর্য হঠাৎ যেন কোনো দ্বিধা ছাড়াই শক্ত পায়ে উঠে দাঁড়ালো। চোখে রক্তাক্ত প্রশ্ন, মুখে স্থিরতা। তূর্যর এই রূপ সে আগেও দেখেছে কিন্তু আজকেরটা আলাদা। আজ তূর্য যেন সত্যের এক নির্ভীক অভিযাত্রী।

হিয়া বলল, “এখন? বাড়িতে তো অনেক মানুষজন…”

তূর্য হিয়ার চোখের দিকে তাকিয়ে ধীরে বলল, “সঠিক সময় বলতে কিছু নেই, হিয়া। পৃথিবীতে সব বসে থাকলেও, সময় বসে থাকে না।”

হিয়া চুপ করে যায়। তার চোখের কোণে একফোঁটা আলো যেন কেঁপে ওঠে। সে জানে, আর কোনো পেছনে ফেরার রাস্তা নেই। তূর্য ঘর থেকে বেরিয়ে যায় সোজা মিনু রহমানের ঘরের দিকে। ঘরটাও পূর্ণ মানুষের চেনা মুখে কেউ কথা বলছে, কেউ সেমাই খাচ্ছে, কেউ পুরোনো গল্প ঘাটছে। তূর্য দরজার চৌকাঠে দাঁড়িয়ে বলল, “আমি একটু আলাদা করে কথা বলতে চাই, দাদির সঙ্গে।”

ওর গলায় এমন কিছু ছিল, যা প্রশ্ন নয়, আদেশ। ঘরের লোকেরা একে একে চুপ করে তাকায়, তারপর কারও মুখে না বলে, কারও মৃদু হাসি দিয়ে, ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যেতে থাকে। হিয়া দরজার বাইরে এসে দাঁড়ায়, অস্থির পায়ে। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে তার চোখ ঘন হয়ে আসে ভাবনায়। এমন সময় মিম এগিয়ে আসে।

মিম ফিসফিসিয়ে বলে, “হিয়া? কি হয়েছে?”

হিয়া চমকে তাকায়। মিমের চোখে চিন্তা। হিয়া আস্তে বলে, “আমার সন্দেহ সঠিক। চিঠি গুলোতে স্পষ্ট দাদির দায়বদ্ধতা লেখা। তিনি সব জানতেন প্রকৃতির বিষয়ে।”

মিম আর কিছু জিজ্ঞেস করে না। পাশে দাঁড়িয়ে যায় নিশ্চুপ। দুই তরুণী একসাথে দাঁড়িয়ে থাকে, দরজার ওপারে যেন এক মহাকাব্য শুরু হচ্ছে এমন এক অচেনা নীরবতায়। তূর্য তখন দরজা টেনে বন্ধ করে দিলো ওদের মুখের উপর। ঘরের ভেতরে কেবল তূর্য আর মিনু রহমান। বাইরের কোলাহল নিঃশব্দ পরে রইলো বাইরেই।

_______________

চলবে.... ❤️