নির্বাসিত কৃষ্ণচূড়া — পর্ব ৪৪

লেখক: সাদিয়া তিন্তি · বিভাগ: রহস্য · পর্ব ৪৪ · ৪৭ পর্বের মধ্যে ৪৪

দিন গড়িয়ে অঢেল আকাঙ্ক্ষা, স্বপ্ন আর বাস্তবতার রঙ মিশে হাজির হয় সেই কাঙ্ক্ষিত দিন। শীতের একটা কড়া আভার সাথে ক্যালেন্ডারের পাতায় নভেম্বরের ৮ তারিখ। তূর্যর গায়ে হলুদ। বিয়ের উৎসব যেন তার প্রলেপ ফেলতে শুরু করেছে আলতো করে। গায়ে হলুদ হবে পুরোনো দিনের নীতিতে, ৮ তারিখ ছেলের বাড়িতে, ৯ তারিখ মেয়ের বাড়িতে আর ১০ তারিখে বিয়ে। তবে দূরত্বর কারনে শুধুমাত্র গায়ে হলুদের ডালা যাবে, অতিথি নয়।

আরমান সাহেব কিপটেমি করতে গেলেও নিজের মা, স্ত্রী আর ছেলের চাপে আর টাকা চেপে রাখতে পারছেন না। বাড়িটা সেজে উঠছে, নানা রঙের আলোক সজ্জায়। বেলি, গাঁদা, আর রজনীগন্ধার সুবাসে মুড়ে উঠেছে আধুনিক নিয়মে গড়া বাড়িটি। অন্যদিকে হিয়াদের বাড়ি জুড়েও চলছে রঙিন উন্মাদনা। সাজসজ্জায় কনেপক্ষ যেন বরপক্ষকে টক্কর দিতে ব্যস্ত।

তূর্যর বাড়িতে গায়ে হলুদের সকাল থেকেই চলছে বিয়ের ধুম ধাম। সকলে নেচে উঠেছে নতুন নতুন গানে। আলিফ তো বন্ধুদের নিয়ে তূর্যকে ঘিরে এমনভাবে নাচছে, যেন বিয়ে তারই। বড় ভাইয়ের বিয়েটা কোনমতে হতে পারলেই যেন ঘরে নতুন বউ এনে বলবে বাবা আমি বিয়ে করে নিয়েছি। আলিফের চোখে মুখে এমন খুশিই বিদ্যমান। এদিকে মিম মেকআপ করায় কোনো কৃপণতা করেনি। তার সঙ্গে তার বান্ধবীদের একটা লম্বা দলও একই মেকআপে মোড়ানো। যাদের চিনতে হলে, বোধহয় ডিএনএ টেস্ট করে চেনার প্রয়োজন আছে, যে আসলে কোনটা কে! বাড়ির মুরব্বিরাও অবশ্য মুখে এক পাত্তা প্রলেপ লাগিয়ে তৈরি। সন্ধ্যায় ঘটা করে হয় গায়ে হলুদের আয়োজন। সকলেই পালা করে হলুদ দিচ্ছে তূর্যকে। ছেলের গায়েহলুদের আসরে তদারকিতে কমতি রাখেননি। নূরজাহান বেগম তূর্যর গায়ে হলুদ লাগাতে এসেই একেবারে হলুদে লেপ্টে দেন ছেলেকে। আরমান সাহেব এমন অবস্থা দেখে মুখ গম্ভীর করে বলেন, “তুমি আর বড় হলে না। ছেলের গায়েহলুদের হলুদ তো দেখি শরীরের থেকে জামায় বেশি পড়ছে!”

নূরজাহান বেগম ভ্রু কুঁচকে বলেন, “তুমি কি এখানে বসে বসে কাপড় ধোয়ার হুইল পাউডারের হিসেব করছো? কিপটে লোক কোথাকার। ছেলেকে বিয়ে দিচ্ছি! একটু উল্টোপাল্টা না হলে হয় নাকি?”

সকলে একসাথে হেসে ওঠে। আরমান সাহেব চুপ করে সরে পড়েন। তিনি যেন এতো খরচ পাতির মাঝেও পাই পাই বাঁচানোর চেষ্টায় ব্যস্ত। আয়োজন একেবারে ভরপুর চলে সারা রাত। নাচ,গান, হৌ-হুল্লোড় পরিপূর্ণ বিয়ের আয়োজন।

এদিকে পরদিনই হিয়ার বাড়িতে রঙের ছড়াছড়ি। কাচা হলুদের গন্ধে আচ্ছন্ন হয়ে ওঠে আলোকিত সন্ধ্যা। হিয়া খুব গাঢ় মেকআপে মোড়ানো। তার শরীরের সোভা পেয়েছে কাচা সদ্য ফোটা ফুলের অলংকার। এসব অবশ্য তূর্যর পাঠানো গয়না। তার ভাষ্যে, সে তার ফুলকে সব ফুলে মোড়া দেখতে চায়।

হিয়ার গালে আলতো সোনালি রঙ, ঠোঁটে মৃদু হাসি। সিদ্দিকী সাহেব এ নিয়ে চার পাঁচখান টিস্যুর প্যাকেট শেষ করেছেন গভীর আবেগে। অবশ্য মেয়ের বিয়ে দেয়া যেমনটা সুখের তেমনটা দুঃখের। বাড়ি ভত্তি একগাদা মেহমানে টুই টুম্বর।

হিয়া মাত্রই স্টেজে বসেছে। ফটোগ্রাফার ছবি তোলায় ব্যস্ত। ঠিক তখনই হিয়ান ছুটে এসে বললো, “চল, একটু জরুরি দরকার। এক্ষুনি। নিচে যেতে হবে।”

হিয়ার ভ্রু কুঁচকে যায়। সে জিজ্ঞেস করলো, “নিচে? এই সময়ে? কিছু হয়েছে?”

হিয়ার পাশে বসা পিউ কৌতুহলে জিজ্ঞেস করলো, "কি হয়েছে হিয়ান ভাই?"

হিয়ান রহস্যময় হাসিতে বলে, “পিউ এখনো তোর বোঝার বয়স হয়নি। হিয়া একটা কথাও বাড়াবি না। চুপচাপ চল।”

কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই হিয়াকে টেনে অনুষ্ঠান থেকে একটু দূরে এনে ছাদঘরের সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামিয়ে আনে হিয়ান। হিয়ার গায়ে তখনো কাঁচা হলুদ আর চন্দনের সুবাস।

নিচে নামতেই হিয়াকে এক মুহূর্তে থমকে দেয় সেই দৃশ্য…। সাদা পাঞ্জাবি পরে, মুখে কালো মাস্ক, বাড়ির বাইরে এক কোণে দাঁড়িয়ে আছে তূর্য। তার চোখে ঝরছে এমন এক অপলক চাহনি। হিয়ান হিয়াকে রেখে সেখান থেকে সরে যায়।

হিয়া বড় বড় চোখে তূর্যকে অপলক দেখে বলে ওঠে, “আপনি?! আপনি এখানে!?”

তূর্য মাস্ক সরিয়ে এক মিষ্টি হাসি দিয়ে সামনে এগিয়ে আসে। কোনো কথা না বলে হিয়ার গালের এক কোণে আলতো করে ছোঁয়ায় একটুখানি হলুদ। তারপর একদম মৃদু গলায় বলে, “আমার বউকে আমি ছাড়া সারা দুনিয়া হলুদ লাগাবে, এটা তো আমার সহ্য হয় না। তাই ভাবলাম, সবার আগে এই দাগটা আমার থাক।”

হিয়ার মুখে তখন অদ্ভুত বিস্ময় আর স্নিগ্ধ প্রশান্তির মিশেল। সে লজ্জায় জড়ানো গলায় বলে, “আপনি আসলেই পাগল... শুধু হলুদ লাগাতে রাজশাহী থেকে ফরিদপুর চলে এসেছেন?”

তূর্য হেসে বলে, “যেভাবে বলছিস যেন মঙ্গল গ্রহ থেকে এসেছি। দূরত্ব কোনো ব্যাপার না। আমার বউ আমার কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে ইম্পরট্যান্ট এখন। চুপ করে দাঁড়িয়ে থাক।”

হিয়া চুপ করে শুধু তাকিয়ে দেখতে থাকে তূর্যকে। তূর্য খুব কোমল ভঙ্গিতে কিছু দোয়া পড়ে তিনবার ফুঁ দেয় হিয়ার কপালে। এরপর বলে, “কারো নজর যেন না লাগে, তাই ঝেড়ে দিলাম..। এই তো, শেষ বার লুকিয়ে হলুদ লাগানো। কাল একেবারে তোকে নিতে আসছি ইনশাআল্লাহ। আমার জন্য তৈরি থাকিস, হিয়া।”

হিয়ার ঠোঁটে কাঁপা কাঁপা হাসি, চোখে টলমল জল। সে কিছু বলতে যায়, কিন্তু তূর্য এরইমধ্যে আবার মুখে মাস্ক তুলে পিছন ফিরে হাঁটতে শুরু করে। কোনো নাটক নেই, কোনো অতিরিক্ত আবেগের বাহুল্যও নয়। শুধু একটি নিঃশব্দ ভালোবাসা, যার রঙ একটুখানি হলুদ আর গভীর নির্ভরতা। তূর্য চলে যায়, হিয়ার চোখে রেখে যায় এক অনুচ্চারিত প্রতিজ্ঞা, "কাল থেকে, তোমার হাতটা আমি আর কখনও ছাড়বো না।”

হিয়ান সাথে সাথেই বেরিয়ে আসে। হিয়া হিয়ানকে প্রশ্ন করে, “ভাইয়া উনি কি এখনই আবার রাজশাহীতে চলে যাবে?”

হিয়ান হেসে বলে, “তূর্য একটা সাইকো। ওর কথা বাদদে। তুই তোর হলুদ ইন্জয় কর।”

হিয়া আর কথা বাড়ায় না। হলুদের স্টেজে বসে। পালাক্রমে চলতে থাকে হলুদের অনুষ্ঠান। হৌ-হুল্লোড় মিলিয়ে পরিপূর্ণ আয়োজন।

তবে সময় যে পাগলা ঘোড়া। ছুটে ছুটে নিয়েই আসে সেই প্রতিক্ষিত দিন, ১০ নভেম্বর। আজ সূর্যও একটু ধীরেসুস্থে উদিত হয়েছছ, আলোটাও একটু বেশিই কোমল। আকাশের রঙও বোধহয় অন্যরকম। আকাশটা একটা আবছা লালচে আভা মেখে যেন জানিয়ে দিচ্ছে, এই দিনটি আর পাঁচটা সাধারণ দিনের মতো নয়। আজ তূর্য আর হিয়ার বিয়ে। হিয়ার হাতের মেহেদির গাড় রঙে তূর্যর নাম জমে উঠেছে। অপেক্ষা শুধু এই নামের বৈধতার।

ফরিদপুরের অভিজাত এক কমিউনিটি সেন্টার আজ যেন রূপকথার রাজপ্রাসাদ। দরজার মাথায় ঝুলছে সোনালি-লাল ফুলের মালা, ঝাড়বাতিতে জ্বলছে মৃদু আলো, যার প্রতিফলনে প্রতিটা ফুল যেন প্রাণ পাচ্ছে। চারদিক সাজানো রজনীগন্ধা, অর্কিড আর লাল গোলাপে‌র শান্ত মিশেলে। ঠিক যেন কোনও রাজকন্যার আগমনের অপেক্ষায় প্রতিটি দেয়াল সেজে উঠেছে। ফুলের সুবাসে হলটা যেন এক ঘোরলাগা মায়াবী বাগান। মাঝখানে বিয়ের মঞ্চটা, গাজর রঙা কাপড়ে মোড়ানো, পেছনে ফিনফিনে ঝালরের মতো ঝুলছে রূপালী পর্দা। ঠিক মাঝখানে রাখা হয়েছে রাজ সিংহাসনের মতো দুটো চেয়ার। তাছাড়া একপাশে আলাদা করে ফুলের পর্দা দিয়ে আড়াল করা দুটো আসনও সাজানো হয়েছে গুছিয়ে।

তূর্য আজ নিজেকে সাজিয়েছে সাদা ও সোনালি বর্ডারের শেরওয়ানিতে। মাথায় রাজকিয় পাগড়ি, গলায় তাজা গোলাপের মালা। কিন্তু এসবের চেয়ে চোখে-মুখে যে জ্যোতি সেটা অন্য কিছু। তবে আজকে তূর্য একটু কাঁপছে। একেকটা মিনিট তার কাছে যেন একেকটা যুগ। তার হাতের তালু ঘামছে, বুকের ভিতরটায় একটা ব্যাকুলতা ছটফট করছে। ঘড়ির সময় ঠিক দুপুর ২ টার ঘরে যেতেই সে তার বউ নিতে পৌঁছে যায় বরযাত্রী সমেত। ফটোগ্রাফার সাহেব একেবারেই বিরক্ত করে তোলেন তূর্যকে ছবি তুলতে তুলতে। সকলেই উপস্থিত তবে বউ এখনো এসে পৌঁছায় নি। তূর্য এতে একটুও বিরক্ত নয়। সে বরং আজ তার নববধূর জন্য অপেক্ষা করতে চায়। কিন্তু এই অপেক্ষা দীর্ঘ হয় না। একেবারে হুট করেই গেট খুলে যায়। আর তার মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে হাটতে হাটতে ঢোকে হিয়া। তাকে দেখে এক মুহূর্তের জন্য যেন সময় থেমে যায় তূর্যর। লাল টুকটুকে বেনারসীর আঁচলে যেন জ্যোৎস্না লেগে আছে। খোপায় গোঁজা বেলির মালা থেকে ছড়িয়ে পড়ছে নেশাক্ত ঘ্রাণ, হাত ভর্তি গাঢ় মেহেদির একাংশ লুকিয়ে রেখেছে অসংখ্য চুড়ি। কপালে টিকলি, নাকে ঝুলছে সোনার নথ, আর চোখে!... এই কাজল ভত্তি মায়াবী চোখে যেন এক সমুদ্র।

তূর্যর চোখ স্থির। বুকের ভেতরটা ধক করে ওঠে। তূর্য হিয়ার এই রূপ স্বপ্নেও কল্পনা করেনি। হিয়াকে বউ বেশে কল্পনা করে তূর্য যে ছবি মস্তিষ্কে এঁকেছিল সেই রুপ যেন আজকের রুপের কাছে তুচ্ছ। তূর্য অস্পষ্ট আউড়ে নেয়, “তুমি আমার স্বপ্ন থেকেও সুন্দর। আমার স্বপ্নপুতুল।”

হিয়া একেবারে কাছে এসে চোখ তুলে তাকায় তূর্যের দিকে। সেই এক ঝলকেই তূর্যর হৃদয়টা যেন ছড়িয়ে পড়ে তার পায়ের নিচে। এত দীর্ঘ জমে থাকা ভালোবাসা, পাগলামি, অধীরতা সব কিছু মিলেমিশে তার চোখে একটাই কথা বলে, “তুই আমার। আজ থেকে, শুধু আমার।”

তূর্যর এই অনুভূতিতে আবার এসে ফোড়ন কাটে ফটোগ্রাফার সাহেব। তার এক প্রকার জোরপূর্বক অত্যাচারের পরেই বিয়ের মূল পর্ব শুরু হয়। মুখোমুখি ফুলের পর্দার দুপাশে বসানো হয় তূর্য আর হিয়াকে। কাজী সাহেব এসে কাবিননামা পড়েন। তূর্য হিয়ার পাশেই তাদের মা-বাবা, আত্মীয়-স্বজন, সবাই তাকিয়ে আছে। হিয়া এই পর্যায়ে এক রকম কাঁপছে। এটা ঠিক ভয় কি-না সেটা হিয়া জানে না। তবে মিম হিয়ার সঙ্গ ছাড়ে নি। শক্ত করে হিয়ার একটা হাত নিজের মুঠোয় রেখেছে। কাজী সাহেব কবুল বলতে বললেই। তূর্যর কণ্ঠে ধরা পড়ে উত্তেজনা, সে খুশির সাথে একটানা তিনবার বলে চলে, “আলহামদুলিল্লাহ কবুল।”

হিয়া আরেকটু কাপে... চোখে টলটলে জল, সামান্য চুপ থেকে নিজের বাবার চোখে তাকায় হিয়া। তিনি চোখে ভরসার ইশারা করতেই হিয়া একে একে তিনবার বলে, “কবুল।”

একসাথে উচ্চারিত তিনটি শব্দে গাঁথা হয় জীবনের সবচেয়ে মধুর বন্ধন। হলঘর যেন তখন একজোড়া হৃদয়ের মিলনের পবিত্র সাক্ষী। বিয়ে পড়ানোর পর হিয়াকে তূর্যর পাশে এনে বসানো হয়। আবারো হাজির ফটোগ্রাফার সাহেব বিরক্ত করতে। কয়েক মুহূর্ত বিরক্ত শেষে তিনি বিদায় হন। এবার জমে ওঠে পরিবার, সবাই ছবি তুলছে, হাসছে, গল্প করছে। এতো ভিড়ের মাঝেই তূর্য এক মুহূর্তের জন্য হিয়ার কান পর্যন্ত মুখ এনে বলে, “বলেছিলাম না, আপনাকে আমার সম্পূর্ণ নিজের করে চাই। আপনি আমার সেই ফুল , যার মূল্যের কাছে আমার জীবন তুচ্ছ।”

হিয়া চুপচাপ শোনে। ছলছলে চোখে তূর্যর চোখে তাকিয়ে থাকে। তূর্যর চোখও চকচক করে ওঠে। সে হিয়ার হাতটা শক্ত করে ধরে ফিসফিস করে বলে, “আজ থেকে, আপনার হাতটা আর কোনোদিন ছাড়ব না। কোনোদিন না। ইনশাআল্লাহ।”

হিয়া শুধু চুপটি করে দেখে যায় তূর্যর এই শুদ্ধতা। খাওয়া-দাওয়া সহ বাকি সব আয়োজনের মাঝেই বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হতেই বিদায়ের প্রহর দরজায় এসে দাঁড়ায়। হিয়ার চোখে জল এবার সব বাঁধ ভাঙে। এই জলের মানে যেন হাজার শব্দ দিয়েও বোঝানো যায় না। এ জল খুশির, ভালোবাসার, বেদনার, আর একটু ভয়েরও। হিয়া কান্নায় একেবারে ভেঙে পড়ে। মুখ ঢেকে ফেলে তার লাল আঁচলে। তাকে জড়িয়ে একেবারে বাচ্চাদের মতো কাঁদতে থাকে পিউ। এক পাশে দাঁড়িয়ে তার মা কাঁদছেন নিঃশব্দে, অন্যদিকে হিয়ান দাঁড়িয়ে আছে মুখ শক্ত করে, যেন চোখে জল এলেও তা কাউকে দেখাতে চায় না। এই সব ঘটনা দেখে মিম নিজেও চোখের পানি সামলে উঠতে পারে না। সে নিজেও কেঁদে কেঁদে হয়রান। হিয়ার বাবা এগিয়ে আসেন তূর্যের দিকে। অনেকগুলো মুহূর্ত তার চোখের গভীরে, যেন এক জীবন হিসেব করে দেখছেন। তারপর নিজের মেয়ের কাঁপতে থাকা হাতটা তূর্যের হাতে তুলে দিয়ে বলেন, “আমার সবচেয়ে বড় সম্পদ তোমার হাতে তুলে দিলাম, তূর্য। ভালো রেখো ওকে। শুধু সুখে নয়, দুঃখে আরও বেশি করে পাশে থাকো।”

তূর্যর মুখ থমথমে। কণ্ঠ ভারী। সে গভীর ভরসায় বলে, "আমি কথা দিচ্ছি, হিয়ার চোখে কোনোদিন কষ্টের জল আসবে না। ওর হাসিই আমার পৃথিবীর সবচেয়ে বড় শান্তি। আর এই হাসিমুখের দায়িত্ব আজ থেকে আমার।”

আব্দুর রবিউল মোহাম্মদ কিছুই বলেন না, সোজা তূর্যকে জড়িয়ে ধরেন। এরপর বলেন, "আমার হিয়ার যত্ন নিও। খুব আদরেরও আমার।"

তূর্য তাকেও আসস্ত করে সাদরে। বিদায়ের পালা চুকিয়ে তারা বেরিয়ে পড়ে রাজশাহীর উদ্দেশ্যে।

এক লম্বা পথ পাড়ি দিয়ে নববধূকে নিয়ে তূর্য যখন নিজের বাড়ির দরজায় পৌঁছে, তখন রাত যেন এক অপার জ্যোৎস্নায় ভরে গেছে। গেটের দুই পাশে সাজানো ঝাড়বাতিতে আলো জ্বলছে, মাথার উপর ঝুলছে রঙিন কাগজের লণ্ঠন। বাড়ির বারান্দায় পা রাখতেই আয়োজনের মৃদু শব্দ বেজে ওঠে, যেন ঘটা করে জানিয়ে দেয়, এই বাড়িতে আজ এক পরীর আগমন হয়েছে।

ভেতর থেকে একে একে বেরিয়ে আসেন অনেকে। নূরজাহান বেগম এবং মিনু রহমানের অপেক্ষা যেন শেষ হলো। নূরজাহান বেগম হিয়া আর তূর্যর একেবারে মুখোমুখি দাঁড়ান। তার মুখে প্রশান্তি আর গর্ব মিলেমিশে এক অনির্বচনীয় হাসি। তার হাতে পিতলের থালা, তাতে রয়েছে নানা পদের মন্ডা মিঠাই আর একটা রূপার চাবির ছড়া।

তূর্য আর হিয়ার দিকে তাকিয়ে নুরজাহান বেগম মৃদু কণ্ঠে বলেন, “বাড়ির লক্ষ্মীকে আজ বরণ করতে কখন থেকে দাঁড়িয়ে আছি। মেয়েটার মুখ একেবারে শুকিয়ে গেছে।”

এসব কথায় আরমান সাহেব কড়া গলায় বলেন, "আহা সময় নষ্ট করো না। যা করার তাড়াতাড়ি করো। অনেক লম্বা জার্নি করে ফেলেছে সবাই।"

নূরজাহান বেগম আর সময় নষ্ট না করে, হিয়াকে এক টুকরো মিষ্টি খাইয়ে বলেন, “আজ থেকে এই বাড়ি তোমারও ঠিক ততটাই যতটা আমার। এই ঘরের প্রতিটা দেয়ালে তোমার হাসি যেন প্রতিধ্বনিত হয়, মা। সংসার বেঁধে রেখো।”

হিয়া সাথে সাথে সালাম করে নুরজাহান বেগমকে। নুরজাহান বেগম হিয়ার আঁচলে রুপোর চাবির ছড়া বেঁধে দিয়ে বলেন, "আজ থেকে তূর্যর সাথে ঘরের দায়িত্ব তোমার।"

হিয়া একটু হকচকিয়ে যায়। নুরজাহান বেগম হেসে বলেন, "আরে ভয় পেয়ো না। এটা এ বাড়ির নিয়ম। ঘরে নতুন বউ এলে এভাবে রুপোর চাবির ছড়া দিয়ে বরন করতে হয়।"

হিয়ার সাথে মিম আলিফ সকলে হেসে ওঠে। হিয়াকে সাদরে সম্মানের সাথে ঘরে বরন করা হয়। আরো সামান্য কিছু নিয়মের পর, খাবারের পর্ব চুকিয়ে হিয়াকে নিয়ে যাওয়া হয় তূর্যর ঘরে। তূর্যর ঘরটা একেবারেই শান্ত। ফুলে ফুলে মেতে উঠেছে চারপাশ। ঘরটা একেবারে স্বপ্নের মতো সাজানো। বিছানায় রক্তলাল গোলাপের পাপড়ি ছড়ানো, চারদিকে টিউলিপ আর অর্কিডের তোড়া, মৃদু আলোর স্নিগ্ধতা চারপাশে ছায়া ফেলে রেখেছে। একটা ছোট সাদা ল্যাম্প জ্বলে, যার আলো পড়ে হিয়ার মুখে আরও কোমল, আরও নিরীহ লাগছে তাকে।

বেশ লম্বা সময় সকলে হিয়ার সাথে থেকে ওকে একা রেখেই সকলে বেরিয়ে পড়ে তূর্যর ঘর থেকে। বাতাসে হিয়ার খোঁপার বেলি ফুলের ঘ্রাণও জায়গা করে নিয়েছে, জানালার বাইরে এক নিস্তব্ধ পূর্ণিমার আলো। এসবের মাঝেই হিয়ার বুকে এক প্রগাঢ় ভয় উঁকি দিতে থাকে। এ ভয়টা ঠিক কিসের তা যেন সে পরিষ্কার বুঝে উঠতে পারছে না। তার হৃদস্পন্দন তার আয়ত্তের বাইরে ছুটছে। সে বসে আছে মাথায় ঘোমটা টেনে, একদম চুপ। তার বুকের ভিতর ঢিপঢিপ শব্দ, নিজেই শুনতে পাচ্ছে মনে হয়। সে জানে, তার জীবন একেবারেই বদলে গেছে। কিন্তু তারপরও জীবন বদলের অজানার আগ্রহে যতটা উত্তেজনা থাকার কথা, তার চেয়ে অনেক বেশি ভয়। ঠিক তখন, দরজাটা নরম শব্দে খোলে। হিয়ার মনের এই তোলপাড়ের অবস্থা আরো বেগতিক হলো তূর্যর প্রবেশে। হিয়া আরেকটু কুঁকড়ে গেলো। যেন এবার নিজের অনুভূতিকে সামলে উঠা দায়। তূর্য ধীরে ধীরে ঘরে ঢোকে। তার চোখে চঞ্চলতা নেই, আছে এক অদ্ভুত প্রশান্তি। যেন এই ঘর, এই বাতাস, এই মেয়েটা সবকিছু শুধু একান্ত তার, ব্যক্তিগত। সে এক পা এক পা করে এগিয়ে এসে হিয়ার সামনে বসে। দু'হাত বাড়িয়ে আলতোভাবে হিয়ার ঘোমটা সরিয়ে দেয়। হিয়া এক ধাক্কায় যেন বাস্তবতায় ফিরে আসে। তার চোখে একরাশ অপ্রস্তুতি। সে কাঁপছে, সত্যিকারের কাঁপছে।

তূর্য একটু হেসে ফেলে। সে হেসে বলে, “তুই ভয় পাচ্ছিস, হিয়া? তুই কি ভাবছিস আমি ঘরে ঢুকেই বাংলা সিনেমার ভিলেনদের মতো তোর উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে বলবো, ‘ভালোবাসা দিবি কিনা বল?’”

হিয়া বাঁকা চোখে তাকায়, ভ্রু কুঁচকে যায় অল্প। কিন্তু ঠোঁটের কোণেও খেলে যায় লাজুক একটা হাসি। তূর্য অপলক চেয়ে থাকে হিয়ার মুখের দিকে। তারপর একটু দুষ্টু ভঙ্গিতে বলে, “আমি যদি তোর কপালে একটা চুমু খাই, তুই কি তবে অজ্ঞান হয়ে যাবি?”

হিয়া একটাও শব্দ করে না, শুধু তাকিয়ে থাকে। চোখে মিশে আছে লজ্জা। তূর্য এবার তার পকেট থেকে ছোট একটা রূপার নুপুর বের করে। সেই নুপুরটা হিয়ার পায়ে নিজ হাতে পরিয়ে দিয়ে বলে, “হাতের বিয়ের আঙটিটা আর এই নুপুর, এ দুটো কখনোই খুলবি না। বাকি গয়না, ইচ্ছে হলে পড়িস, না হলে না। কিন্তু এই দুটো তোর গায়ে থাকবেই। ধরে নে, এটা আমার চিহ্ন। তোর প্রেমে পড়া এক পাগলের স্বাক্ষর।”

হিয়া এবার একটু লাজুক হাসে। এই মানুষটা তার চেনা জগতের বাইরের কেউ। এতটা স্নিগ্ধ, অথচ এতটা গভীর! হিয়ার চোখে আর সেই কাঁপুনি নেই। সে যেন কোথাও একটা নিরাপত্তার আশ্রয় পেয়ে গেছে। তূর্য এবার আস্তে হিয়ার কপালে একটা চুমু খায়। তার ঠোঁট ছুঁয়ে যায় হিয়ার কপালের ঠিক মাঝখানে। এরপর ধীরে বলে, “আমি তোর সঙ্গে জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত থাকতে চাই, হিয়া। তোর আর আমার বিচ্ছেদ যেন শুধুই আমার মৃত্যু হয়। আর এই পৃথিবীর কোনো কারণ যেন আমাদের আলাদা করতে না পারে। এটাই আল্লাহর কাছে চাহিদা।”

হিয়া এবার কিছু বলার জন্য ঠোঁট খুলতেই তূর্য আলতো আঙুল রেখে দেয় তার ঠোঁটে। খুব নরম গলায় বলে, “চুপ একদম। এখনো ভারি গয়না শাড়ি পড়ে বসে আছিস, যা এখন। একেবারে ফ্রেশ হয়ে, ওযু করে আসবি। এতো অপ্রাপ্তির মাঝে যে পূর্ণতা আজ পেয়েছি, তার শোকরানা আদায় না করে নতুন জীবন শুরু করব না আমরা।”

হিয়া এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ। চোখ বড় হয়ে যায় বিস্ময়ে। হিয়ার কাছে মুহুর্তেই তূর্য শুধু স্বামী না, সে যেন এক পুরুষত্বের শ্রেষ্ঠ রূপ হয়ে ওঠে। যে প্রেমে, যত্নে, ইবাদতে জীবনের মানে খোঁজে। হিয়া চুপচাপ উঠে যায়। ড্রেসিং টেবিলের টুলে বসে প্রথমে গয়না খুলে রাখে। পরে ধীরে খোঁপায় হাত দিতেই তূর্য চেঁচিয়ে বলে, “দাঁড়া আমি সাহায্য করছি।”

হিয়া একেবারে চমকে ওঠে তূর্যর চেঁচানো তে। তূর্য এগিয়ে এসে একটা একটা করে ক্লিপ খুলে সুন্দর করে খোঁপা থেকে ফুল গুলো ছাড়িয়ে খোঁপাটা খুলে দেয়। সে এতো আলতো ভাবে চুল গুলোকে ছোঁয় যেন এটা তার ব্যক্তিগত। হিয়া ছুলে যদি কিছু হয় সেই সংশয় যেন তূর্যর চোখে ভেসে উঠেছিল সামান্য। তবে হিয়া এই প্রতিক্রিয়া একেবারে এড়িয়ে উঠে যায় ওয়াশরুমে। হিয়া বিশ্বাস করতে শুরু করেছে যে, সে স্বামী রুপে একটা অদ্ভুত চরিত্রকে পেয়েছে। হিয়া বিয়ের শাড়ি ছেড়ে একটা সুতি কামিজ পড়ে ঘরে আসে। তূর্য ততোক্ষণে নিজের শেরোয়ানি বদলে নিয়েছে। হিয়া ঘরে আসতেই সেও গিয়ে ওযু করে ফেরে। একই মজলিসে আগে পিছে নিয়ম অনুযায়ী তারা নামাজে দাঁড়ায়। তারা দু’রাকাত নফল নামাজ আদায় করে। হিয়া সিজদায় কেবল একটিই প্রার্থনা করে, “হে আল্লাহ, এই মানুষটা যেন আমার হয় শুধু দুনিয়ায় না, জান্নাতেও।”

তূর্যর প্রার্থনাও শুধু হিয়াকে জড়িয়েই। এ যেন এমন এক পূর্ণতা যা তাদের ভাগ্যে খুব গোপনে রাখা ছিল। নামাজ শেষে তূর্য আর হিয়া পাশাপাশি বসে সাজানো খাটের একটা কোনায়। বেশ লম্বা সময় কেউ কিছুই বলে না। কিন্তু নিস্তব্ধতার মধ্যেও যেন অজস্র শব্দ মিশে আছে, ভালোবাসা, আস্থা, নতুন জীবনের প্রতিজ্ঞা। ঘরের হালকা আলোয় তাদের ছায়া পড়েছে একে অন্যের গায়ে, যেন একে অপরকে একেবারে মুছে দিয়ে একটাই ছায়া হয়ে গেছে তারা। তাদের চোখে আর সেই চঞ্চলতা নেই, আছে প্রশ্রয়, অদম্য স্নেহ। হয়তো তূর্য কিছু বলার শব্দ খুঁজছিল। সে বেশ লম্বা সময় চুপ থেকে হিয়ার হাতে হাত রেখে বলল, “হিয়া আমি চাই তুই আমার আয়না হ। আর আমি তোর আকাশ হবো। আমার মা বড্ডো ভালো মানুষ। তারপরও সে তোর শাশুড়ি। তার মেয়ে হয়ে উঠিস। মনে রাখিস, পৃথিবীর কেউ না থাকুক, আমি তোর জন্য সব সময় আছি। তুই শুধু আমার দায়িত্ব না। আমার ভালোবাসা।"

হিয়ার চোখ জলে চিকচিক করে ওঠে। এই মানুষটা যেন তার জীবনের সব প্রাপ্তির পূর্ণতা। হিয়া মৃদু স্বরে বলল, “আমার আপনি থাকলেই চলবে। আপনি শুধু বদলে যাবেনা কথা দিন।”

তূর্য হিয়ার মাথায় হাত রাখে। তারপর একেবারে আলতো করে কাছে টেনে নেয় বুকে। এ তো প্রথম আলিঙ্গন।

তূর্য খুব ক্ষীণ স্বরে বলল, “হিয়া সময় বদলায়, জীবন বদলায়। আমরা বদলাবো কতোটা জানি না। তবে আমার যতো রুপ বদলাক, সব রুপেই যেন আমার তোর প্রতি মোহ, প্রেম, আকর্ষণ আর ভালোবাসা একই থাকে, এটাই প্রার্থনা‌ আর চাহিদা।”

হিয়া একেবাই লুকিয়ে পড়ে তূর্যর বুকের মাঝে। রাতটা কাটে খুব শান্তিতে। কোনো জোর নেই, তাড়া নেই। শুধু একে অন্যের মধ্যে ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাওয়া। মাঝে মাঝে তূর্য হিয়ার কপালে, চিবুকে চুমু খায়। হিয়া কখনো হেসে ফেলে, কখনো চোখ বুজে থাকে লজ্জায়। পৃথিবীর সব রঙ, সব ছায়া যেন এসে মিশে যায় এই ঘরের দেওয়ালে। হিয়া ছোট্ট পুতুলের মত তূর্যর বুকে ঘুমিয়ে যায় পরম আবেশে।

_______________

চলবে..... ❤️