প্রাপ্তি (প্রথম অধ্যায়) — পর্ব ৪৫
লেখক: বিনতে ফিরোজ · বিভাগ: ইসলামিক · পর্ব ৪৫ · ৪৫ পর্বের মধ্যে ৪৫
তিন মাস একদমই কম সময় না। অন্তত একট মানুষের জীবনকে উলোট পালোট করে দিতে সময়টুকু যথেষ্ট। নব্বই দিনের এই সময়ে বদলেছে অনেক কিছুই। ছোট্ট ইশিকার বয়স প্রায় দশ মাস। মায়াবাড়িতে যেনো সে একটা মা পেয়েছে। মাহিবার যত্নে যে কেউ এক দেখায় তাকে ইশিকার মা বলতে বাধ্য। হারিয়ে যাওয়া বান্ধবীর নামধারী এই শিশুটিকে সে চোখে হারায়। সালেহা বেগম মাঝে মাঝে ভাবেন ভবিষ্যতে এই মেয়েকে ছাড়া তার পুত্রবধূ থাকবে কিভাবে?
আহমাদ এখন ব্যস্ত মানুষ। ইফাদ, তামিম এবং সে নিজেদের কেনো শেয়ার উচ্চ মূল্যে বিক্রি করে নতুন কাজে যোগ দিয়েছে। স্বনামধন্য এক গার্মেন্টস ফ্যাক্টরির অংশীদার হয়েছে। সেখানে কাজ চলছে পুরোদমে। তবে আহমাদ আরো কিছু করেছে। দুটো মালবাহী ট্রাক কিনে কয়েকজন বিশ্বস্ত মানুষের আন্ডারে পরিচালনা করছে। ইচ্ছা আছে এক্ষেত্রে আরো কিছু করার। তবে আপাতত এইসব দিয়ে তাদের মন্দ চলছে না। চিন্তা করেছে হাতে কিছু টাকা জমা হলেই আগে বিক্রি ক্রয়ে দেওয়া বাবার জমিটা কিনবে। নিশ্চয়ই আগের চেয়ে বেশি দামে কিনতে হবে। তবুও সে কিনবে। তারপরের চিন্তা আছে ঐ জমিতে অথবা অন্য কোনো জমি কিনে নিজেদের একটা বাড়ি তৈরি করা। এরপর আবার আফিয়ার বিয়ের চিন্তাভাবনাও করতে হবে। এই মুহূর্তে তাদের ভাড়া বাড়িতে থাকার সামর্থ্য আছে। তবে ইফাদ তাদের ছাড়তে চাচ্ছে না। তার মতানুযায়ী নিজেদের বাড়ি তৈরি করেই আহমাদের উচিৎ এই জায়গা ত্যাগ করা।
চোখ খুলে তাকায় আহমাদ। মায়াবাড়ির এই কক্ষটা এখনও তেমনই আছে। সেই দুঃসময়ের মতোই। চোখের পাতায় এখনও ভাসে এই কক্ষের দেওয়াল ধরে তার খুঁড়িয়ে হাঁটার দৃশ্য। হাসি খেলে যায় আহমাদের ঠোঁটে। বিছানাটা এখনও নিচে। তাড়াহুড়া করে আসায় তখন খাটের ব্যবস্থা করতে পারেনি ইফাদ। আর পরবর্তীতে আহমাদ করতেও দেয়নি। চলতে দিয়েছে এভাবেই। বেশ তো চলেছে। এখন সে সুস্থ। আল্লহর অশেষ রহমতে আয় করার মাধ্যম আছে। পরিবারের দায়িত্ব পালনের উপায় আছে। তবে মাঝ দিয়ে মাহিবা এবং আফিয়ার এক বছর ড্রপ গেছে। তবুও তাদের দুজনের আফসোস নেই। আহমাদের সুসময় ফিরে এসেছে এই তাদের কাছে ঢের। দরজার দিকে কারো ছায়া পড়েছে। একজন মানবী এক শিশু কোলে এদিকেই আসছে। চোখ বন্ধ করে চেয়ারে হেলান দেয় আহমাদ। কে আসছে সেটা তার জানা।
বাচ্চা মেয়েটা কথা বলার জন্য ঠোঁট নাড়ায়। মাহিবা চায় ইশিকা তাকে মা বলে চিনুক। বারবার নিজেকে ইশারা করে বলে মা ডাকতে। মেয়েটা দাঁতহীন মাড়ি নিয়ে কি সুন্দর করে হাসে! ঘরের দরজায় এসে দেখতে পায় আহমাদ চেয়ারে হেলান দিয়ে আছে। বসার ভঙ্গি দেখেই বোঝা যাচ্ছে এই লোক ঘুমের ভান করে আছে। দুষ্টু বুদ্ধি খেলে যায় মাহিবার মাথায়। ইশিকাকে কোলে নিয়ে পা টিপে আহমাদের সামনে এসে হাজির হয়। বাচ্চা মেয়েটার পা দুটো আহমাদের কোলের উপর রেখে অদ্ভুত এক শব্দ করে
- শশশশশশ! ইশু পাখি! হিসু করো তো। করো করো। শশশশশশ!
ঝট করে চোখ খুলে দাঁড়িয়ে পড়ে আহমাদ। মাহিবা তখন হাসিতে মেতে উঠেছে। ছুটির দুপুরের নরম রোদে মাহিবার প্রাণোচ্ছল হাসিটুকু কি সুন্দর লাগে আহমাদের কাছে! মুগ্ধতা একপাশে রেখে মেকী রাগ নিয়ে বলে,
- আমার প্যান্ট ভিজিয়ে দিলে কি হতো? খুব হাসি আসছে না?
- আর আপনি যে ঘুমের ভান করে আছেন তার বেলা?
- ভান করে থাকবো কেনো? চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে চোখ বন্ধ করে থাকা আমার জন্য নিষেধ?
- আচ্ছা সে যাক! আমি একটা কথা ভেবেছি বুঝলেন?
আহমাদকে টেনে বিছানায় বসায় মাহিবা।
- কি কথা?
- আমাদের ছেলে হলে তাকে ইশুর সাথে বিয়ে দেবো। ইশু আমাদের বউমা হবে! কি ভালো হবে না?
- আমার ছেলের বউ তার থেকে বড়ো হবে? সিনিয়র বউ! এর জ্বালা বোঝো তুমি?
- জ্বালা হবে কেনো? কোলে পিঠে মানুষ করে ফেলেছি। ছেলের জন্য একদম রেডি করে ফেলবো।
- আমার ছেলেমেয়ের কপালে তো দেখি সব সিনিয়র জুনিয়র ভরা। ইফাদ বলে ওর ছেলেরে আমার মেয়ের সাথে বিয়ে দিবে তখন আমার হবে জুনিয়র জামাই। আবার এখন সিনিয়র বউমা। বাহ দারুন!
- এই আপনার মেয়ে কি হয়ে গিয়েছে নাকি?
- তা ছেলেও কি হয়েছে নাকি?
- না হলেও বউমা ফিক্সড। তাই না ইশু পাখি?
বাচ্চাটার দিকে তাকালে দেখে সে ঘুমিয়ে গেছে। খোলা মুখের একপাশ দিয়ে লালা ঝরছে। সযতনে সেটুকু মুছে দিয়ে ইশিকাকে শুইয়ে দেয় মাহিবা। তারপর আহমাদের কাছে যেয়ে আদুরে সুরে বলে,
- শোনেন!
- বলেন!
আহমাদের বাহু পেঁচিয়ে ধরেছে মাহিবা। আবার বলে,
- শোনেন না!
- বলেন না!
- মায়াবাড়ির পাশে যে একটা বাড়ি বানালো দেখেছেন ঐটা?
- হ্যাঁ। আমরা আসার পরপরই তো বানানো শুরু করলো। এর ভেতর কমপ্লিটও হয়ে গেছে। টাকা থাকলে আর কি লাগে।
- বাড়িটা কি সুন্দর না? একতলা ছিমছাম! আমাদের এমন একটা বাড়ি হলে সুন্দর হয় না?
- সে তো সুন্দর। কিন্তু বাড়ির যেই আয়তন এতো জায়গা তো আমাদের জমিতে নেই।
- আমাদের জমি মানে? আপনি জমি কিনলেন কবে?
উঠে বসেছে মাহিবা। আহমাদের কথায় সে চমকে গেছে বোঝা যাচ্ছে।
- আরে না! জমি কিনিনি এখনও। আমাদের যেই জমিটা বিক্রি করে দিলাম ভাবছি ঐটাই আবার কিনবো।
- কেনো? ঐটাই কেনো?
- বাবার জমি ছিলো ওইটা। দাদার থেকে পাওয়া। তাই।
- ওখানেই বাড়ি করার ইচ্ছে আপনার?
- শুধু আমার না মায়েরও।
- ওহ!
হতাশ দেখায় মাহিবাকে। আহমাদের ঘাড়ে মাথা ঠেকিয়ে রাখে। পাশের নতুন বাসাটার নাম "চন্দ্রমল্লিকা"। এই নাম কেনো দিয়েছে কে জানে? বাড়ির বাগানে একটাও চন্দ্রমল্লিকা ফুল নেই। কিন্তু পরিবেশটা এত্তো সুন্দর লাগে তার কাছে! বড়ো বড়ো কিছু গাছ আছে এক পাশে। মায়াবাড়ির ছাদে উঠে দেখেছে। ওখানে ছোটো একটা দোলনাও আছে। যেমন বড়ো বাড়ি অন্তত আটটা রুম সেখানে আছেই। আরো কতো কি সে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখেছে! মানুষ এখনও থাকা শুরু করেনি। কবে আসবে কে জানে? এমন বাড়ি ঐ জমিতে হবে না। জমিটা সে দেখেছে। পাঁচ শতকের জায়গা। দু- তিন তলা দালান হয়তো করা যাবে তবে "চন্দ্রমল্লিকা" না।
ঘাড়ে মাথা ঠেকিয়ে রাখা স্ত্রীর বিষন্ন মুখের দিকে তাকায় আহমাদ। বুজে রাখা চোখের পাঁপড়িগুলো দেখতে বেশ সুন্দর লাগছে।
সপ্তাহখানেক পরের কথা। মাহিবা বায়না ধরে বাবার বাড়ি যাওয়ার। সেই যে বিয়ের পর গেলো আর যাওয়া হয়নি। মা বাবা এসে দেখে গেলেও শৈশব কাটানো জায়গাটায় আর যায়নি মাহিবা। শাশুড়ির কাছে বললে তিনি এক বাক্যে রাজি হন। ছোটো একটা মেয়ে। বিয়েই হয়েছে বা কয়দিন? এর মাঝে কতো ধকল সহ্য করে থাকলো! এখন একটু ঘুরে আসুক। আহমাদের কাছে বলার দায়িত্ব তিনি নেন। রাতে আহমাদ ফিরলে বিশ্রামের সময় মাহিবা বলে,
- কয়েকদিন ঐ বাড়ি থেকে ঘুরে আসি?
- কোন বাড়ি থেকে?
পাশ ফিরে জিজ্ঞেস করে আহমাদ। সালেহা বেগম তাকে আগে বলেছেন। মাহিবা সেটা জানেনা। দেখা যাক সে কি বলে।
- আমাদের বাড়ি থেকে।
আঘাত পায় আহমাদ। বৃষ্টির দিনের মনোমালিন্যে মেয়েটা বলেছিলো আহমাদের বাড়িই তার বাড়ি। তবে আজ এই কথা বলছে কেনো? আঘাতের প্রচ্ছন্ন রেশ কি এখনও কাটেনি? নিজেকে স্বাভাবিক রেখে সে প্রশ্ন করে,
- আপাতত আমাদের নিজেদের কোনো বাড়ি নেই তো!
- মানে বাবার বাড়ি আর কি! যাই?
- কতদিনের জন্য?
- আগে যাই তো। থাকি কয়েকদিন। যাবো?
- ইচ্ছে যখন হয়েছে যেতে তো হবেই। নাহলে মনের ভিতর কেমন কেমন লাগবে।
দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে আহমাদ।
- তাহলে ব্যাগ গুছিয়ে নেই।
লাফিয়ে উঠে বলে মাহিবা।
শোয়া থেকে উঠে বসে আহমাদ বলে,
- গুছিয়ে নেই মানে? কালই চলে যাবে নাকি?
- হ্যাঁ! যতো তাড়াতাড়ি যাওয়া যায়।
- আমাকে ছেড়ে যাওয়ার এতো তাড়া?
- কি যে বলেন না! তাড়াতাড়ি গেলেই না তাড়াতাড়ি আসতে পারবো।
- হুহ! এসব কথায় চিড়ে ভিজছে না।
- তাহলে পানি ঢেলে দেই?
মাহিবার মুখে হাসির ফোয়ারা ছুটেছে। সেই হাসি দেখে মেয়েটাকে ছেড়ে থাকার কষ্ট বুকের মাঝেই চাপা দেয় আহমাদ। এই হাসি অটুট থাকুক।
তারপরের দিন সকালেই ইশিকা এবং আয়িশাকে নিয়ে রওনা দেয় মাহিবা। তাদের নিতে আসে মাহিবার বাবা। উচ্ছল মনে বেড়াতে যায় মাহিবা।
মাহিবা যাওয়ার দুই দিন পার হয়। এর মাঝে একটা ঘটনা ঘটে যায়। সদ্য তৈরি হওয়া "চন্দ্রমল্লিকা" বিক্রির বিজ্ঞপ্তি ছাপা হয়। বসবাস শুরু করতে না করতেই এমন বিজ্ঞপ্তির কারণ খুঁজতে গেলে আহমাদ জানতে পারে বাড়ির মালিক অ্যাকসিডেন্ট করেছে। অবস্থা আশঙ্কাজনক। দেশের বাইরে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। তাই তারা চাচ্ছে বাড়িটা বিক্রি করে দিতে। মায়াবাড়ির একদম পাশে হওয়াতে খোঁজখবর করতে বেশি অসুবিধা হলো না আহমাদের জন্য। মায়ের সাথে পরামর্শ করতে বসলো সে। সুপ্ত ইচ্ছা এবং পুরনো জমি কিনতে চাওয়ার কথা বললে সালেহা বেগম বলেন,
- তোর বাবার নামে জমিটা ছিলো ঠিকই কিন্তু না সে ওখানে থেকেছে না আমাদের থাকার কোনো জায়গা আছে। এমন যদি হতো তোর বাবা ওখানে বাড়ি করে থেকেছে তাহলে একরকম ছিলো। কিন্তু সেটা তো না। তোর মন চাইলে তুই সে জমি কিনতেই পারিস। কিন্তু মেয়েটা যখন শখ করে বলেছে আর আল্লাহ দিলে তোর সামর্থ্যও আছে তাহলে এটাই আগে কর।
মায়ের কথা নিয়ে গভীর ভাবে চিন্তা করে আহমাদ। তখনই মনে হয় এই দুই দিনে মাহিবা তাকে একবারও ফোন করেনি। সেই যে যাওয়ার পর কথা হলো তারপর রাতে কল দিলেও বলে সংযোগ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না, সকালে কল দিলেও বলে সংযোগ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। শ্বশুর, শাশুড়ির সাথে কথা বললেও রাগ করে মাহিবার সাথে কথা বলেনা। নিষ্ঠুর মেয়েটা তো ঠিকই তার সাথে কথা না বলে থাকতে পারছে। তাহলে সে কেনো পারবে না? কিন্তু মেয়েটার কথা ভাবতে ভাবতেই কখন যে তার নাম্বারে কল দিয়ে দেয় সেটা খেয়ালই করে না। ওপাশ থেকে নারী কন্ঠের হ্যালো হ্যালো শব্দে ধ্যান ভাঙ্গে।
- কেমন আছো?
ভারী স্বরে জিজ্ঞেস করে আহমাদ।
- আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি। আপনি কেমন আছেন?
- সে খবর না জানলেও চলবে।
মিইয়ে যায় মাহিবা। সাফাই দেওয়ার ভঙ্গিতে বলে,
- ইশু ফোনটা পানিতে ফেলে দিয়েছিলো। সার্ভিসিংয়ে দিয়েছিলাম তাই ফোন দিতে পারিনি।
- তোমাদের বাসায় আর কারো যে ফোন নেই সেটা তো জানতাম না!
কৌশলে কথা শোনায় আহমাদ। মিনমিন করে মাহিবা বলে,
- বাবা মায়ের ফোন থেকে কল দিতে লজ্জা লাগতো। তাই দিতে পারিনি.. সরি। আপনি রাগ করবেন না প্লিজ!
- না আমি রাগ করবো কেনো? আমি রাগ করার কে?
- সরি তো! আর এমন হবে না। সত্যি। যটটবার ওয়াশরুমে যাবো তার থেকে বেশি কল দিবো ইনশাআল্লহ্।
- আচ্ছা!
হাসি আটকানোর চেষ্টা করে আহমাদ। মেয়েটা এমন এমন কথা বলে! আহমাদের হাসিমুখ টের পায় মাহিবা। উৎফুল্ল কণ্ঠে বলে,
- জোরে একটা হাসি দিন তো। মু হা হা করে।
- এভাবে হাসলে ছেলেপেলে সব বিছানা ভিজিয়ে দেবে।
শব্দ করে হেসে ফেলে মাহিবা। হাসিমুখে আহমাদ জিজ্ঞেস করে,
- আমার বউমা কি করে?
- আপনার বউমা ঘুম। জানেন আমার ছোট্টবেলার একটা চুড়ি আম্মু ওকে পড়িয়ে দিয়েছে। কি সুন্দর লাগছে দেখতে! মা শা আল্লহ। আপনাকে ছবি দিবো। দেখবেন।
- বউমার ছবি নাহয় দেখলাম বউমার শাশুড়িকে কবে দেখবো?
- দেখবেন! আর কয়েকদিন যাক।
- আমার কথা তো তোমার মনেই পড়ে না! কি সুন্দর দিন কাটাচ্ছ!
আহমাদের সুরে প্রচ্ছন্ন অভিমান। ঠোঁট টিপে হাসে মাহিবা। সুর তুলে বলে,
- ভালোবাসো কি না বাসো বন্ধু? বাসো কি না বাসো বন্ধু? টেরাই করো আমারে, কত্তো ভালোবাসি তোমারে! বেবী আই লাভ ইউ এন্ড আই মিস ইউ! আজকে একা একা মিস করো কালকে দেখা হবে! ইয়েয়েয়েয়ে!
আহমাদ হতভম্ব। এটা কোন ধরণের গান? ওদিকে মাহিবা অট্ট হাসিতে ফেটে পড়েছে।
সপ্তাহখানেক পর মাহিবাকে নিতে আসে আহমাদ। বিনা নোটিশে। ব্যস্ত হয়ে পড়েন মালা বেগম এবং সাহেদ সাহেব। মাহিদ আহমাদের আগে পিছে ঘোরে। একদিন থেকে মাহিবাকে নিয়ে ফিরে যায় আহমাদ। গাড়ি থেকে নেমে মায়াবাড়ির দিকে না যেয়ে সোজা হাঁটতে থাকে আহমাদ। চোখে প্রশ্ন নিয়ে তার পিছু পিছু যায় মাহিবা। একটু দূরে অনেক মানুষ দেখা যাচ্ছে। ওখানে কি হয়েছে? কাছে গেলেই বুঝতে পারে এরা আর কেউ না তার পরিবার এবং মায়াবাড়ির ছেলেমেয়েরা। কিন্তু সবাই "চন্দ্রমল্লিকা"র সামনে কেনো? আহমাদকে প্রশ্ন করার সুযোগ পায় না মাহিবা। তার আগেই তাকে, আয়িশাকে, আফিয়াকে এবং সালেহা বেগমকে এক সারিতে দাঁড় করিয়ে দেয় আহমাদ। আফিয়া এবং শাশুড়ির মুখ হাসিখুশি দেখতে পায় সে। কিন্তু চমকে ওঠে তখন যখন সামনে বাঁধা লাল ফিতা কাঁ'টার জন্য তার এবং সালেহা বেগমের হাতে একটা কাচি তুলে দেওয়া হয়। শাশুড়ির ইশারায় ফিতা কাটলে সকলে হৈ হৈ করে ওঠে। তার মাথায় কিছু ঢোকে না। সবাই "চন্দ্রমল্লিকা"য় ঢুকছে কেনো? প্রশ্নের উত্তর পেতে বেশি সময় লাগে না। শাশুড়ির কাছে ঘটনার বৃত্তান্ত শুনে চোখে জল নিয়ে আহমাদের দিকে তাকায় মাহিবা। আহমাদ ভ্রু উচায়। তার ঠোটে কি সুন্দর হাসি খেলা করছে!
•• •• ••
সুখ সময়ের পায়রা দ্রুত উড়াল দিয়ে চলছে। সময়ের গতি যেনো বেড়েছে হু হু করে। "চন্দ্রমল্লিকা"য় জায়গা করে নিয়েছে এক ঝাঁক ফুল যাদের সর্বদা যাতায়াত চলে মায়াবাড়িতে। ইশিকা নামের ফুলটা দুই বাগানের বাসিন্দা। সকলের মায়া, ভালোবাসা নিয়ে বেড়ে উঠছে মেয়েটা। নিচের মাড়িতে উকি দেওয়া দাঁত দুটো এখন তার অ'স্ত্র। যেই হা'মলা করতে আসুক না কেন ঐ এক অ'স্ত্রতেই সে কুপোকাত। মেয়েটাকে শুইয়ে রেখে মশারী টাঙিয়ে দেয় মাহিবা। তখন ঘরে আসে আয়িশা। মশারির ভেতরে ঢুকে বলে,
- এই যে বড়োলোকের বউ! আজকে আমি আপনার সাথে ঘুমাবো। অনুমতি আছে?
- জী! অবশ্যই আছে।
ইশিকাকে জড়িয়ে ধরে ঘুমিয়ে পড়ে আয়িশা। মিটিমিটি হাসে মাহিবা। মাহিবার উপর অভিমান হলেই মেয়েটা আজকাল এমন সম্বোধনে ডাকে। আজ তার অভিমান হয়েছে ইশিকাকে নিয়ে। কেনো মাহিবা তাকে বেশি আদর করে না এটাই কারণ। কিন্তু এখন সেই ইশিকাকেই কিভাবে জড়িয়ে ঘুমিয়ে আছে দেখো! প্রথম এই সম্বোধন শুনে রাগ করেছিলেন সালেহা বেগম। তবে মায়ের আড়ালে এই সম্বোধন করতে ভোলে না আয়িশা।
আয়িশাকে খুঁজতে আসে আফিয়া।
- ভাবি আয়িশা এখানে?
- ঐ যে দেখো!
হাসে আফিয়া।
- যার জন্য এতো রাগ তাকেই কোলে নিয়ে ঘুমাচ্ছে? পাগল মেয়ে। নিয়ে যাবো ভাবি? নাহলে আপনাদের আবার কষ্ট হবে।
- না থাকুক। নিতে হবে না। তুমি যাও ঘুমিয়ে পড়।
- আচ্ছা। ভাইয়ার আসতে বেশি দেরি হবে?
- একটু পরেই চলে আসবে বললো। ফোন দিয়েছিলো।
- আচ্ছা।
আহমাদ আসে তার বেশ কিছুক্ষণ পর। ইফাদ আর সে একসাথেই যাওয়া আসা করে। তাকে খেতে দিয়ে নিজেও বসে মাহিবা। খাওয়া শেষে সাদা কাগজে মোড়ানো একটা বক্স এনে দেয় আহমাদের কাছে।
- কি এতে? ভারী লাগছে।
- খুলে দেখুন।
আহমাদের কাছে যেয়ে বসে মাহিবা। বক্সের ঢাকনা খুলতেই অনেকগুলো হাজার টাকার নোট সামনে আসে। কিছু বেঁধে রাখা আবার কিছু জড়সড় করে রাখা। বিস্মিত হয়ে আহমাদ বলে,
- এ তো অনেক টাকা মনে হচ্ছে। কার টাকা?
লজ্জিত মুখে মাহিবা বলে,
- আমার।
আরো অবাক হয় আহমাদ।
- তোমার? কতো টাকা এখানে? এতো পেলেই বা কোথায়?
- গুণে দেখুন। অনেকদিন আমি গুনিনি।
গুনতে শুরু কর আহমাদ। মাহিবা বলে,
- গত পাঁচ বছর ধরে গুছিয়ে চলেছি। মাঝখানে মোহরের টাকা যোগ করে অনেক হয়েছিলো। তারপর আবার আপনাকে দিয়ে দিলাম। গত কয়েকমাস ধরে তো আপনি আবার ফেরত দিচ্ছেন। এক লাখ হওয়ার কথা।
টাকা গোণা শেষ হলে মাহিবার দিকে অবাক চোখে চেয়ে আহমাদ জিজ্ঞেস করে,
- এক লাখ এখনও হয়নি। তবে হতে আর বেশিদিন লাগবেনা। এই মাসের ভেতরেই হয়ে যাবে আশা করা যায়। কিন্তু তুমি এতো টাকা এভাবে রেখে দিয়েছো কেনো? এভাবে কেউ ক্যাশ রাখে?
- একটা উদ্দেশ্য নিয়ে রেখেছিলাম।
- কি উদ্দেশ্য?
আহমাদের আরো কাছে এসে তার দুহাত আকড়ে নরম কণ্ঠে মাহিবা বলে,
- আমার অনেক দিনের শখ হজে যাবো। একবার হলেও মক্কা মদীনায় ঘুরে আসবো। সেই নিয়তই এই টাকা জমানো। এটার কথা আপনাকে অনেক আগেই বলতে চেয়েছিলাম। কিন্তু পরিস্থিতি তেমন ছিলো না। এখন আল্লহর রহমতে আপনার আয়ের উৎস আছে। আমাদের একটা বাড়ি আছে। এবার দেখুন না আমরা হজে যেতে পারি নাকি!
নীরবতা পালন করে আহমাদ। কিছুক্ষণ পরে বলে,
- মাত্রই বাড়িটা কিনলাম। হাতে তেমন টাকা নেই যে সবাই মিলে যাবো। এই বছরে সম্ভব না। আগামী বছরের মধ্যে চেষ্টা করলে কিছু করা যেতে পারে। তখন না হয়.. কি বলো?
মলিন মুখে মাহিবা বলে,
- সামর্থ্য না থাকলে তো আর কিছু করার নেই।
স্ত্রীকে বুকে টেনে, কপালে উষ্ণ পরশ দিয়ে আহমাদ বলে,
- শ্বশুর শাশুড়িকেও বলো টাকা গোছাতে। এক বছরের মাথায় সবাই নাহয় একসাথেই যাবো। কি বলো?
চমকে দেওয়া কথাটা শুনে মলিনতা যেনো কোথায় দৌড়ে পালায়। উৎফুল্ল কণ্ঠে মাহিবা জিজ্ঞেস করে,
- সত্যি!
- সত্যি।
এর পরের এক বছর আহমাদের জন্য খুব পরিশ্রমের হয়। কিন্তু তার নিয়ত আল্লহর পছন্দনীয় হওয়ায় সেটা পূরণ হয়। এ পর্যন্ত গোছানো সব টাকা এক করে পাঁচ জনের হজে যাওয়ার ব্যবস্থা করে। ওদিকে সাহেদ সাহেব এবং মালা বেগমও নিজেদের জীবনে গোছানো সবটা দিয়ে তিনজনের হজের সরঞ্জাম গোছান। বিষয়টা খুব কষ্টকর হলেও কিভাবে যেনো সবটা ঠিক হয়ে যায়। ইফাদ প্রথমে যেতে না চাইলেও পরে কি ভেবে শেষ মুহূর্তে টিকিট বুকিং করে ফেলে। স্বপ্নকে সত্যিই হতে দেখে মাহিবা। প্লেনের জানালার ধার ঘেঁষে যাওয়া আসনে বসে আহমাদের হাত শক্ত করে ধরে আপ্লুত কণ্ঠে বলে,
- প্রশংসিত ব্যক্তি! আপনি কি কিছু দেখতে পারছেন?
স্ত্রীর হাত উল্টো আকড়ে আহমাদ বলে,
- আমার জীবনে উত্তম প্রভাব বিস্তারকারী, ভুল নির্মূলকারী এবং শিকড় গেড়ে নেওয়া রমণী যে আমার জীবনের সেরাদের সেরা প্রাপ্তি তার স্বপ্ন বাস্তবায়ন হতে দেখছি।
চোখ বন্ধ করে মাহিবা। এক ফোঁটা অশ্রু মুখের আবরণ শুষে নেয়। সেই মাহেন্দ্রক্ষণ আসে। কালো গিলাফের উদ্দেশ্যে উড়োজাহাজ যাত্রা করে।
সমাপ্ত.
( আলহামদুলিল্লাহ! আলহামদুলিল্লাহ! দীর্ঘ পঁয়তাল্লিশ দিনের একটা সফর শেষ হলো। আল্লহর অশেষ রহমতে গল্পটার শেষ নামাতে পেরেছি।
লেখালেখির জগতে আমি নতুন। একদমই নতুন। কিন্তু পাঠকদের যে অভাবনীয় সাড়া আমি পেয়েছি সেটা স্পষ্টতই আমার রবের অনুগ্রহ। আলহামদুলিল্লাহ। আমি আহামরি কিছু লিখতে পারি না। না পড়লে যে বিরাট কিছু মিস হয়ে যাবে এমনও না। তবে আমার ইচ্ছা থাকে অন্তত এমন কিছু না লেখা যাতে পাঠকের সময় নষ্ট হয়। আলহামদুলিল্লাহ আমার পাঠকগণও শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত আমার সাথে ছিলেন। কয়েকজনকে আমি এই গল্পের মাধ্যমে এতোটা চিনে ফেলেছি যে গল্প লিখতে বসলেই মনে হয়, "ওরা কি বলবে? ঐ আপু কি কমেন্ট করবে?" নতুন লেখিকাদের গল্পের কমেন্টে ভরপুর থাকে "নাইস" আর "নেক্সট" কিন্তু আলহামদুলিল্লাহ আমার পাঠকগণ এক দুই লাইন হলেও এমন কিছু বলে গেছেন যে আমি পরবর্তী গল্প লিখতে উৎসাহ পেয়েছি। এই গল্পটা অনেক ক্ষেত্রেই আমার জন্য প্রথম অভিজ্ঞতা বয়ে এনেছে। অনেক ভুল ত্রুটি আপনাদের চোখে পড়তে পারে। আবার কিছু ভালোলাগার অংশও থাকতে পারে। অনুরোধ থাকবে যারা গল্পটা পড়েছেন তারা আমার ছোট্ট গ্রুপে একটা রিভিউ লিখে আসবেন। কমেন্টে অবশ্যই বলবেন তবে গ্রুপে বললে সেটা সংরক্ষিত থাকবে। আমি দেখে নিতে পারবো কোন জায়গাটা পাঠকের পছন্দের, কোন জায়গাটায় ভুল হয়েছে। ভালো খারাপ যেমনই লাগুক নিজের মতো করে দু এক লাইন জানানোর অনুরোধ রইলো। সকলে ভালোবাসা জানবেন আহমাদ এবং মাহিবার পক্ষ থেকে❤️