প্রাপ্তি (প্রথম অধ্যায়) — পর্ব ২২
লেখক: বিনতে ফিরোজ · বিভাগ: ইসলামিক · পর্ব ২২ · ৪৫ পর্বের মধ্যে ২২
বিকেলের নরম কোলাহলে চায়ের আসর জমেছে। আফিয়া ঘরে থাকতে চাইলেও তাকে টেনেটুনে নিজের ঘরে নিয়ে এসেছে মাহিবা। চারজন মিলে গল্প করছে। আয়িশা ক্ষণে ক্ষণে দেখছে আফিয়ার মুখটা। আয়িশার ভ্রু কুঁচকানো, চোখ সরু, কপালে দুটো ভাজ। ঠোঁট দুটো চেপে ধরে তাকালো মাহিবার দিকে। এদের কাহিনী কি? আজ সারাদিন এমন কোলে কোলে ঘুরছে কেনো? আয়িশার ভাবনার মাঝেই আফিয়ার গলা পাওয়া যায়।
- আম্মু!
- হুঁ! বল।
চায়ের কাপে চুমুক দিয়েছেন সালেহা বেগম।
- আমাকে একটা বোরখা কিনে দিতে হবে। লাইট কালারের, কালো বা এই জাতীয় ডার্ক হলে বেশি ভালো হয়। আর নো ডিজাইন, নো ফিতা।
মাহিবার ঠোঁটে মুচকি হাসি, দৃষ্টি কাপ থেকে উড়ে যাওয়া ধোঁয়ার দিকে। আয়িশা ভাবতে ব্যস্ত। ঘটনা কি? সালেহা বেগম চা আর গিলতে পারেননি। মুখভর্তি চা নিয়েই আফিয়ার দিকে তাকিয়ে আছেন।
- মুখের চা টা গেলো আম্মু।
কথামতো তাই করেন সালেহা বেগম। তিনি বিশ্বাস করতে পারছেন না আফিয়া এই কথা বলেছে।
- কি বললি?
- আমি যা বলেছি তুমি শুনেছো।
আফিয়া বরাবরই শান্ত শিষ্ট। ঠান্ডা তার স্বভাব। অনেকটা আহমাদের মতো। কে কি বললো এসব তার ভাবনায় কোনোদিনই স্থান পায়নি। আজও খেয়াল করলো না সালেহা বেগম কি পরিমাণ চমকে গিয়েছেন তার কথা শুনে। চায়ের কাপ সেই যে হাতে ধরে রেখেছেন তো রেখেছেনই। ধ্যান জ্ঞান যেনো খুইয়ে বসেছেন। তিনি ভাবতেই পারছেন না যেই মেয়েটা বিয়ের পরদিন মাহিবাকে শুধুমাত্র এই কারণে কটাক্ষ করেছিল যে তার পড়নে বোরখা ছিলো সেই মেয়েটাই আজকে নিজের জন্য বোরখা চাচ্ছে। সময় এতো দ্রুত পাল্টে যায়!
কলিং বেলের শব্দে আসর ভঙ্গ হয়। না যেতে চাইলেও যেতে হয় সালেহা বেগমকে। পিছু পিছু আয়িশাও যায়। কে এলো দেখতে হবে তো!
দুজনের প্রস্থানে মাহিবার মনোযোগ যেয়ে পড়ে আফিয়ার উপর। মেয়েটা নিবিষ্ট চিত্তে কিছু ভাবছে। তার ধ্যান ভাঙতে হাতের কাপটা শব্দ করে রাখে মাহিবা। কিন্তু না! সে মেয়ে ভেবে চলেছে তো চলেছেই।
- আফি!
বাহুতে হালকা ধাক্কা দেয় মাহিবা। পলক ঝাপটে মাহিবার দিকে তাকায় আফিয়া।
- হুঁ?
- কি ভাবছো?
ইতস্তত করে আফিয়া। বলা ঠিক হবে কি না ভাবতে থাকে। নিজ কৌতূহল মেটাতে বলেই ফেলে।
- ভাবি! আমি একটা জিনিস খেয়াল করেছি। আমাদের ক্লাসের কিছু মেয়ে একদম আপনার মতো করে বোরখা পড়ে। শুধু চোখ দুটো দেখা যায়। কিন্তু যেহেতু ক্লাসমেট, প্রতিদিন দেখা হয় সেই সুবাদে আমি ওদের চিনতে পারি। বেশ কিছুদিন আমি খেয়াল করেছি ওরা পার্কে, রেস্টুরেন্টে ঘোরে। এবং সেটা একা না। আর যেসব জায়গায় আমি ঘুরতে গিয়েছি প্রায় সব জায়গাতেই এরকম মেয়েদের দেখেছি ছেলেদের সাথে ঘোরে।
- হতেও তো পারে ছেলেগুলো তাদের নিজের লোক। হাজবেন্ড, ভাই বা এরকম কেউ?
- না ভাবি! কিছু কিছু হতে পারে। তবে মেজরিটি এরা না। আপনি খেয়াল করলে দেখবেন হাজবেন্ড ওয়াইফ ঘুরতে গেলে তাদের মাঝে বাহ্যিক একটা দূরত্ব থাকে। আই মিন চিপকা চিপকি টাইপ মনোভাব থাকে না। আবার ভাই বোন ঘুরতে বের হলেও কোনো ধরণের অশ্লীল অঙ্গভঙ্গি তারা নিজেদের মাঝে করে না। এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু আমি যাদের দেখেছি ওদের দেখলেই বোঝা যায় মেয়েগুলো থার্ড ক্লাস বয়ফ্রেন্ড নিয়ে চিপায় চিপায় ঘোরে।
শেষ কথাগুলো বেশ আক্রোশের সাথে বলে আফিয়া। মাহিবা এই বিষয়গুলো জানতো না। রাস্তায় বের হলে আশপাশ সে খুব একটা খেয়াল করে না। এজন্যে কতো বকাই যে সে খেয়েছে মালা বেগমের কাছে তার ইয়ত্তা নেই!
- তাও হতে পারে আফি!
দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে মাহিবা।
- আমি তো এটাই বলতে চাচ্ছি। যারা ওরকম পোশাক পড়ে তাদের নিশ্চয়ই পর্দার জ্ঞান আছে? তারা কিভাবে এমন.. মানে, কিভাবে কি?
- এটা আসলে পুরোপুরি ঠিক না। পর্দার পোশাক পড়লেই যে তার পর্দা সম্পর্কে পরিপূর্ণ জ্ঞান থাকবে এমন না। হতে পারে ওদের উদ্দেশ্য নিজেকে ঢেকে রাখা এই কারণে যে ঐ কাজ করার সময় যেনো তাকে কেউ চিনতে না পারে। আবার এমনও হতে পারে ওরা পর্দা সম্পর্কে জানে ঠিকই কিন্তু এই হারাম সম্পর্ক থেকে বের হয়ে আসতে পারছে না। আসলে কি জানো? ভালো জিনিসের নকল থাকে বেশি। চেহারা সুরত এক হলেও ভিতরে কোনো মিল থাকে না। পুরোই গোঁজামিল! কিন্তু তুমি নিজেকে ওদের সাথে তুলনা করতে যাবে না যেনো! তোমার তুলনা হবে তোমার নিজের সাথে। অতীতের তুমি আর বর্তমানের তুমি। আর হবে আমাদের আইডলদের সাথে। বুঝতে পেরেছো?
- হুঁ!
- এই মাহিবা! ওরা এসেছে। আয় একটু কথা বার্তা বলে যা।
সালেহা বেগমের ডাকে উঠে আসে মাহিবা। আজ যে প্রতিবেশীদের আসার কথা ছিলো সেটা তো সে ভুলেই গেছে!
ওড়নাটা আরেকটু টেনে মাথা ঢেকে নেয় মাহিবা। হাসিমুখে ড্রয়িং রুমে যেয়ে সকলকে সালাম দেয়। তিন জোড়া দৃষ্টি একত্রে নিক্ষিপ্ত হয় তার দিকে। পাশে সালেহা বেগম দাঁড়িয়ে। যেনো নীরব ইশারা, "আমি আছি তোর পাশে"!
- দেখি দেখি! আমাদের পাশে এসে বসো তো!
হাসিমুখের সম্বোধনের বিপরীতে কাছে যায় মাহিবা। বসে তিনজনের পাশেই।
একজন সেই শুরু থেকেই তাকে পরোখ করছে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে। মাথা থেকে পা পর্যন্ত যে কতোবার দেখেছে সে ই বলতে পারবে। সেই মহিলা এবার বলে,
- ভাবি, বউ একটু বেশি খাটো না? আপনার ছেলে তো ভালোই লম্বা চওড়া আছে।
কথার ভাবে কটাক্ষ স্পষ্ট। গর্জে ওঠে আয়িশা,
- টিয়া আপু তো আমার ভাবির থেকেও খাটো। তাই কি হয়েছে?
বাঁকা চোখে তাকান মহিলা। তার মেয়েকে টেনে আনা হচ্ছে কথার মাঝে! বাহ!
সালেহা বেগম চোখ রাঙান। ইশারায় চুপ করতে বলেন আয়িশাকে। তবে সেই ইশারা মেয়েটা দেখলে তো!
- এসব কি আর আমাদের হাতে বলেন? আল্লাহ যেমন দিবে আমাদের খুশিমনে তাই মেনে নিতে হবে। তাছাড়া লম্বা চওড়া দিয়ে আর কি যায় আসে, মন কেমন এটাই বড়ো কথা।
মুখে হাসি টেনে জবাব দেন সালেহা বেগম। মাহিবার মন খারাপ করার কথা থাকলেও সে পরিবেশটা উপভোগ করছে। মনে হচ্ছে এটা একটা যু+দ্ধক্ষেত্র, তার দিকে কেউ কথার তীর ছুড়তে চাইলে আয়িশা সেদিকে সরাসরি বো/মা হা/ম+লা করছে, আর সালেহা বেগম সেটা রুখে দিয়ে বোঝাতে চাচ্ছেন, "এটা একটা শান্তিপূর্ণ আলোচনা। কোনো হা"না:হা-নি এখানে কাম্য নয়।"
- তা বড়ো মনের কি পরিচয় দিয়েছে শুনি? কি কি দিলো বাপের বাড়ি থেকে?
আরেকজন এতক্ষণ চুপ ছিলেন। হয়তো অপেক্ষায় ছিলেন তার প্রশ্ন করার পালা কখন আসবে।
- আস্ত একটা মেয়ে দিয়ে দিলো ভাবি! আর কি দেবে?
- মেয়ের ঘর সাজিয়ে দেবে না? উপহার বলেও তো একটা কথা আছে।
- না তেমন কিছু আমরা নিই নি।
- নেন নি? নাকি দেয় নি?
মুখ বাঁকিয়ে বলেন সেই মহিলা। মাহিবা একটু কষ্ট পায় বটে। বাবা মায়ের সম্বন্ধে ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্র কটু কথা শুনতেও কেউ নারাজ।
- ঘর সাজিয়ে দিতে হবে কেনো? আমাদের ঘরে কি কিছু নেই? আমরা সবসময় সাজিয়েই রাখি দেখেন না?
আয়িশার কথা বিপরীতে মহিলা বলেন,
- আরে এ সাজানো সে সাজানো না রে মেয়ে! আমার মেয়ের বিয়ে দেখেছিস না? তখন যে কতোকিছু দিয়েছি দেখিসনি? ফ্রিজ দিয়েছি, খাট, আলমারি সহ সব ফার্নিচার। তারপর জামাইকে একটা মোটর সাইকেল দিয়েছি। ওরা অবশ্য এতো কিছু চায়নি কিন্তু আমরাই দিয়েছি। এতে লাভই হয়েছে বুঝলেন ভাবি? মেয়ের খুব কদর করে ওরা। বড়ো গলায় কথা বলতেও যেনো ভয় পায়। জামাই তো ওর কথায় ওঠে আর বসে।
- কেনো ওরা কি ফকির? কিছু ছিলো না ওদের? একটা ফ্রিজও ছিলো না? আহারে!
আয়িশার কথায় হতভম্ব হয়ে যায় সেই মহিলা। আয়িশার মুখ তখনও ভার। মানুষের কতো কষ্ট! একটা ফ্রিজও নাকি নেই! সেই সব কষ্ট যেনো ভর করেছে আয়িশার মনে। সালেহা বেগম হাসি চেপে রাখার চেষ্টা করছেন। এখন হাসলে হবে না। তার উচিৎ মেয়েকে কষে একটা ধমক দেওয়া। কিন্তু কথা হলো তিনি বুঝতে পারছেন না মেয়েকে কি বলা উচিত? কথা তো মন্দ বলেনি! গলার স্বর ভারী করার চেষ্টা করেন। আয়িশাকে বলেন,
- বড়োদের কথার মাঝে এতো কথা বলে না! ঘরে যাও আয়িশা।
মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে অবস্থা সুবিধার লাগেনা আয়িশার কাছে। চুপচাপ সরে যায় সে। যেতে যেতে ভাবতে থাকে কিছু উল্টাপাল্টা বলেছে নাকি!
শাশুড়ির প্রচ্ছন্ন ইশারায় নাস্তা আনতে যায় মাহিবা। সে সময় মাহিবা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হয় সালেহা বেগমের কাছে। তৃপ্তিময় হাসি দিয়ে তিনি বলেন,
- জীবনে কোনো ভালো কাজ করেছে আমার আহমাদ। এজন্যেই এমন মেয়ে আল্লাহ দিয়েছে। আমার সংসার নিয়ে আর কোনো চিন্তা নেই ভাবি। আলহামদুলিল্লাহ!
- তেমন হলেই ভালো।
মাহিবা নাস্তা পানি নিয়ে আসতেই প্রথম মহিলা কথা বলেন, যিনি মাহিবাকে ডেকে কাছে বসিয়েছিলেন।
- শাড়ি পড়তে পারো না মা? নতুন বউ মানুষ। শাড়ি পড়লে কি সুন্দর লাগে!
কথার ভাঁজে স্নেহ খুঁজে পায় মাহিবা। বিপরীতে শ্রদ্ধা চলে আসে অবচেতন মনেই।
- পড়ি আন্টি। কিন্তু সবসময় পড়ে থাকতে পারি না। আসলে এখনও ভালো করে সামলাতে পারি না তো তাই।
- এতো বড়ো সংসার যে সামলাতে পারবে সে শাড়িও সামলাতে পারবে।
মাহিবার থুতনিতে হাত রেখে বলেন মহিলা। হাসে মাহিবা।
- ইনশাআল্লহ্, চেষ্টা করবো আন্টি।
কথা বার্তা চলতে চলতেই মাগরিবের আজান দেয়। সকলেই বিদায় নেন নিজ নিজ বাড়ির উদ্দেশ্যে। বেশ কিছুক্ষণ পর আহমাদ ফেরে। নিত্যদিনের রুটিন অনুযায়ী সকল কাজ করতে থাকে। ওয়াশরুম থেকে বের হতেই দেখতে পায় মাহিবা এদিক ওদিক কি যেনো খুঁজে চলেছে। অস্থির হয়ে আছে।
- কি খুঁজছেন?
- আমার ফোনটা! কোথায় যে রাখলাম!
- কল দিলেই তো হয়!
- তাইতো! আপনার ফোন থেকে একটু দিন না!
বিব্রত হাসে মাহিবা। এমন অস্থির হলে কি মাথায় বুদ্ধি আসে নাকি!
ফোন দেয় আহমাদ। মিনিট না পেরোতেই আয়িশা আসে দৌড়ে দৌড়ে,
- ভাবিমণি আশ্চর্য ফোন দিয়েছে! আশ্চর্য ফোন দিয়েছে!
তড়িৎ দরজার দিকে তাকায় মাহিবা। আয়িশা ততক্ষণে মাহিবার পাশে। হাতে ফোন।
- আশ্চর্য কে ভাবিমণি?
চোখ মুখ খিচে ধরে মাহিবা! গেলো! সব মান সম্মান এবার গেলো!
চলমান.