প্রাপ্তি (প্রথম অধ্যায়) — পর্ব ২৮
লেখক: বিনতে ফিরোজ · বিভাগ: ইসলামিক · পর্ব ২৮ · ৪৫ পর্বের মধ্যে ২৮
- এম. এস. দের শেয়ারের একটা অংশ কিনসি। অনেক সস্তায় ওরা ছেড়ে দিলো বুঝলি?
- সস্তায় দিলো ক্যান? ঝামেলা নাই তো?
- আমিও ভাবছিলাম সেইটা। কিন্তু খোঁজখবর করে দেখলাম ওদের অভ্যন্তরীণ গোলযোগ। নিজেরা ফাঁকে পইড়া শেয়ার ছাইড়া দিতেসে। তামিমরেও বললাম কষ্ট হইলেও যদি একটু কিনে রাখতে পারে তাইলে কাজ হবে। আমার সিক্সথ সেন্স বলতেসে একটা কিছু হবে।
- কি বললো ও? কিনবে?
- বললো, "দেখি, কি করা যায়"।
- ও।
- দোস্ত!
- হুঁ!
- তুই কি কিনবি?
- আমি? কেমনে কি?
- দেখ না! আমার গাট ফিলিংস আসতেসে। একটা কিছু হবে।
- আরে আমি জবের ভিতরে আছি। এর মধ্যে আবার শেয়ার টেয়ার কি।
- উহ! থাকলি! দেখ না একটু পারিস নাকি!
- তোর যতো আবোল-তাবোল কথা। এতো টাকা আমি কই থেকে ম্যানেজ করবো এখন?
- তুই খালি নিয়ত কর। এক মাস টাইম আছে। খুব জোর দুই মাস। একটু দেখ ভাই।
- আচ্ছা রাখ তুই। দেখা যাবে সে।
ফোন রেখে দিল ইফাদ। নিজ ব্যবসা দাঁড় করানোর দারুন একটা সুযোগ সামনে এসেছে। তার মনে হচ্ছে সামনে কিছু একটা হবে। কার হবে, কি হবে এসব কিছু না বুঝলেও তার মন বলছে কিছু একটা হবে। কিছু একটা...
• • •
ইফাদের কথায় গুরুত্ব দিলো না আহমাদ। এই ছেলের কোনো সুদূরপ্রসারী চিন্তা নেই। হুটহাট সব কাজ! তার সামনে সুযোগ এসেছে নিজেকে তুলে ধরার। এই সুযোগ কাজে লাগাতে পারলে প্রমোশন নিশ্চিত। চমৎকার এই সুযোগকে হাতছাড়া করার কোনো মানেই হয় না।
খুব সংকোচের সাথে বন্ধুদের কাছে মাফ চাইলো আহমাদ। নিমন্ত্রণ জানিয়ে সেটা রক্ষা করতে না পারা যে কতোটা লজ্জার সেটা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে সে। কিন্তু বন্ধু মহল সেদিকে যেনো কোনো দৃষ্টিই দিলো না। শাস্তি হিসেবে এক পদ বাড়িয়ে রান্নার কথা বলে চলে গেলো সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়ে। মনে মনে কৃতজ্ঞ হয় আহমাদ। তার সংকোচ কাঁটানোর জন্য বন্ধুদের চেষ্টাটুকু তার বড়ো ভালো লাগলো।
• • •
- আমাকে কুরআন পড়া শিখাবে ভাবিমণি?
মাগরিবের নামাজ শেষে কুরআন পড়ে উঠলো মাহিবা। তখনই ঘরে আয়িশার প্রবেশ। বুকশেলফে সারি করে সাজানো বইয়ের দিকে তাকিয়ে হাসলো মাহিবা। সে নিজেই এই কথাটা আয়িশাকে বলতে চাইছিলো। পেছন ফিরে আয়িশাকে নিজের কাছে জড়িয়ে নিয়ে বিছানায় বসে। আদর করে বলে,
- কেনো শিখবে?
- তুমি কি সুন্দর করে পড়! আমার খুব ভালো লাগে শুনতে। আমিও শিখবো। তারপর ওরকম সুর করে পড়বো।
হাত নাড়িয়ে, ঘাড় দুলিয়ে কথা বলে আয়িশা। মেয়েটা যখন হাসে ঠোঁটের ডান কোণে ছোট্ট একটা ভাঁজ পড়ে। খুব ছোট! একদম এমনই একটা ভাঁজ পড়ে আহমাদ হাসলেও। চিকন, কোমল ঐ ভাঁজটুকু দেখলে বোধ হয় কচি কিশলয়ের শুভ্র পুষ্প মঞ্জরী। মাহিবার ছুঁয়ে দিতে সাধ জাগে। আচ্ছা ছুঁয়ে দিলে কি লজ্জাবতীর মতো নুইয়ে পড়বে? নাকি সূর্যমুখীর মতো ঘাড় উঁচিয়ে থাকবে?
- শুধু এই জন্যে?
- হ্যাঁ।
- আচ্ছা বলো তো! তোমাকে যদি কেউ একটা চিঠি পাঠায়, খুব দুর দেশ থেকে। তোমার খুব আপনজন। তুমি কি করবে?
- চিঠিটা পড়বো।
- কেনো পড়বে?
- আমার জন্য চিঠি পাঠালো আর আমি পড়বো না? কি লিখেছে জানার জন্য পড়বো।
- আচ্ছা ধরো তোমার দাদাভাই! বহু দূরের কোনো দেশ থেকে তোমার জন্য একটা খাতা পাঠিয়েছে। পুরোটা লিখেছে তোমার জন্য। তোমাকে কিছু জায়গায় উপদেশ দিয়েছে, কিছু জায়গায় ভালোবাসার কথা বলেছে। এখন সেই খাতাটা হাতে পেয়ে তুমি কি করবে?
- তাড়াতাড়ি করে পড়বো!
- যদি অন্য ভাষায় লিখে পাঠায়? যেটা তুমি জানোনা?
- উমম.. তাহলে সেই ভাষাটা যে পারে তার কাছ থেকে শুনবো।
- গুড! আচ্ছা বারবার শুনতে ভালো লাগবে? আমাদের কোনো গল্প ভালো লাগলে সেটা আমরা বারবার পড়ি। এখন যদি কারো মুখে শুনি তাহলে কি সেরকম ভালো লাগবে? নাকি নিজে পড়লে বেশি ভালো লাগবে?
- নিজে পড়লে। আর মানুষের কাছে বারবার যাওয়াও যাবে না। মানুষ খুব বিরক্ত হয়।
ঠোঁট উল্টিয়ে, ভ্রু উঁচিয়ে মুখের কেমন একটা ভঙ্গি করলো আয়িশা। মাহিবার খুব ভালো লাগলো! চিবুকে টান দিয়ে বললো,
- তাই?
- হ্যাঁ।
- আচ্ছা, এখন যদি আল্লাহ তোমাকে কোনো চিঠি পাঠায়? যেটায় তোমার জন্য অনেক কথা লেখা আছে। সেই চিঠি তুমি পড়বে তো?
- পড়বোই তো!
- যদি অন্য ভাষায় হয়?
- ভাষাটা শিখতে হবে।
- আরে তোমার কি বুদ্ধি!
নিজ প্রশংসা শুনে ভালো লাগলো আয়িশার। ভাবিমণি তার প্রশংসা করেছে! একি চাট্টিখানি কথা!
- আল্লাহ কিন্তু একটা চিঠি আমাদের অলরেডি দিয়েছেন।
মাহিবার নিচু কণ্ঠের কথায় বিস্মিত হয় আয়িশা।
- তাই! কবে দিয়েছেন? আমার জন্য আছে?
মেয়েটা এতো ব্যাকুল!
- আছে তো! আমাদের সবার জন্য। অনেক আগে দিয়েছেন। চৌদ্দশ বছর আগে।
- ধুর! কি যে বলো না তুমি!
- সত্যি বলছি!
- দেখাতে পারবে?
- হ্যাঁ! পারবো তো!
- দেখাও দেখি!
শেলফে রাখা কুরআনের দিকে আঙুল দিয়ে ইশারা করে মাহিবা। চোখ পিটপিট করে তাকায় আয়িশা।
- ঐটা তো বই! চিঠি নাকি?
- যখন দিয়েছিলেন তখন চিঠির মতোই ছিলো, টুকরো টুকরো। সেই সব টুকরো একসাথে করে এখন এরকম বইয়ের মতো হয়েছে।
- তাই!
বিস্মিত আয়িশা।
- জি।
- তাহলে আমি পড়বো। বাংলা আছে না? আমি বুঝবো?
- বাংলা তো আছে। কিন্তু কি জানো? বাংলায় পড়ে ওরকম ফিলিংস পাওয়া যায় না!
- তাহলে?
- আরবী ভাষা শিখতে হবে!
- কতদিন লাগবে! ততদিন চিঠি পড়তে পারবো না?
- এটাই তো মজা! চিঠি সামনে আছে, কিন্তু পড়তে পারছি না। পড়লেই তো ফুরিয়ে যাবে। অবশ্য এই চিঠি ফুরাবার নয়। কিন্তু ভালো লাগবে।
- কোত্থেকে শিখবো আরবী?
হতাশ আয়িশা। কতো আশা ছিলো চিঠি পড়ার!
- আমি শেখাবো। শিখবে?
- তুমি পারো?
- ঐ একটু পারি।
- তাহলে আজকে থেকেই শিখবো!
- আজ না! প্রতিদিন সকালে ফজর পড়ে। ঠিকাছে?
- অতো সকালে?
- সকালেই তো মাথা ফ্রেশ থাকে, পড়া তাড়াতাড়ি মুখস্থ হয়!
- আচ্ছা। তাহলে কালকে সকাল থেকে শুরু করবো।
- ইনশাআল্লহ্!
- আমি আম্মুকে চিঠির কথা বলে আসি!
দৌড়ে যায় আয়িশা। ছোট্ট প্রাণের এই চঞ্চল গতি মাহিবার কি যে ভালো লাগে!
• • •
খুব ভোরে উঠে কাজ করা আহমাদের নিত্য রুটিন পরিণত হয়েছে। ঘুম থেকে উঠে আগে দুই রাকাআত নামাজ পড়া। তারপর কাজ করা। ফজরের নামাজ সেড়ে ফের কাজে বসা। এর মাঝে একদিন মাহিবা আবদার জুড়ে বসলো হাঁটতে যাওয়ার। সে নাকি সকাল হওয়া দেখবে। আহমাদ প্রস্তাব নাকচ করে দিলো। সকাল প্রতিদিনই হচ্ছে। এতে নতুন কি আছে যে আজ ঘটা করে দেখতে হবে? পরামর্শ দিলো বেশি ইচ্ছে হলে যেনো আফিয়াকে নিয়ে ছাদ থেকে ঘুরে আসে। মাহিবা অবশ্য সেটা করলো না। তিন তলায় ভাড়াটে আছে। তারা নাকি খুব ছাদে যাওয়া আসা করে। শাশুড়ি সালেহা বেগমের থেকে কথায় কথায় শুনেছে। তাই আর ওদিকে যাওয়া হলো না। বিরস বদনে কাজ পাগল ঐ লোকটার দিকে চেয়ে একটা বই হাতে নিলো। অনেক দিন বই পড়া হয় না। আজ একটু পড়া যাক।
•• •• ••
মনোযোগী কাজের মাঝে বিঘ্ন ঘটলে বিরক্ত হয় আহমাদ। তবে সবার উপর দেই বিরক্তি দেখানোর উপায় নেই। পাশের ডেস্কের সহকর্মী ডাকছে। বিরক্তি চেপে হাসি মুখে সেদিকে তাকায়।
- ইয়াসির সাহেব! ভালো আছেন?
- জি আলহামদুলিল্লাহ। ভালো। আপনার কি অবস্থা?
- আমি তো আপনার অবস্থা দেখে কাহিল। এতো কাজ যে করছেন ভাবি ঝাড়ি টারি দিচ্ছে না?
- মানে?
- আমার তো মনে হয় আপনি বাড়ি যেয়েও এভাবেই কাজ করেন। তা মিয়া নতুন বউ রেখে এতো কাজ করলে একটু ঝাড়ি খাওয়া স্বাভাবিক। না খাওয়াটাই বরং অস্বাভাবিক। আপনার কি অবস্থা?
বিব্রত হাসে আহমাদ। তার সাথে সব অস্বাভাবিক কাজ হচ্ছে তাহলে?
- ব্যাপার দেখেছেন?
সহকর্মীর ফিসফিসানি আওয়াজে অবাক হয় আহমাদ। এখানে ফিসফিস করে বলার কি আছে?
- কি ব্যাপার?
ভ্রু কুঁচকে প্রশ্ন করে সে।
- আজকাল ঐ ম্যাডামকে বসের সাথে খুব বেশি দেখা যাচ্ছে। ঐ যে কোনার টেবিলে মির্জা সাহেব আছে না? উনি বললেন ম্যাডাম নাকি একেবারে বসের সাথে বাড়ি যান। সেই সবার পরে! জল মন হচ্ছে বহুদূর গড়িয়েছে!
বিরক্ত হয় আহমাদ। এমন আলোচনা তার বরাবরই অপছন্দ। বিরস মুখে বলে,
- ওহ!
- আরে ওহ্ কি বলেন! দেখুন আপনার সব খাটুনি বানে ভাসিয়ে ম্যাডাম ফুড়ুৎ করে কাজ পেয়ে যাবেন।
- দেখা যাক কি হয়।
নিজের ওপর বিশ্বাস আছে তার। যে খাটুনি সে খাটছে সেসব নিশ্চয়ই বিফলে যাবে না? কিছু না কিছু ফল তো পাবেই। তার দৃঢ় বিশ্বাস প্রজেক্টের কাজ সেই পাবে। শুধু সঠিক সময়ে নিজেকে তুলে ধরার অপেক্ষা!
চলমান.