প্রাপ্তি (প্রথম অধ্যায়) — পর্ব ২৪

লেখক: বিনতে ফিরোজ · বিভাগ: ইসলামিক · পর্ব ২৪ · ৪৫ পর্বের মধ্যে ২৪

বারান্দা আর ঘরজুড়ে পায়চারি করে চলেছে মাহিবা। লোকটা কখন আসবে? আর কখনই বা যাবে অসাধারণ সেই জায়গায়? উহ! কি উত্তেজনা!

তখনই বাইকের হর্ন শোনা যায়। এক হাতে বোরখা ধরে দৌড়ে সদর দরজা খুলতে যায় মাহিবা। আহমাদ আসার আগেই সিটকিনি খুলে রেখে রান্না ঘরে যায়। কিছু নাস্তা সাজিয়ে রেখেছিলো। হালকা ঠান্ডা পানির সাথে সেই নাস্তা এনে ঘরে রাখতেই ক্লান্ত মানুষটা প্রবেশ করে। সহাস্যে সালাম দেয় মাহিবা।

সারাদিন খাটুনির পর বাড়ি ফিরলে মন চায় না আর কিছু সে করে। আহমাদ ভাবে আজ মাহিবাকে বলবে অন্যদিন যাওয়ার কথা। কিন্তু মেয়েটাকে দেখতেই তার উত্তেজনা চোখে ভাসে। একদম তৈরি হয়ে বসে আছে। যেনো বললে এক্ষুনি যেতে প্রস্তুত। সাথে তৈরি হয়েছে তার শান্তির মাধ্যম হতে। মুখে শান্তির দুয়া, হাতে শান্তির উপকরণ। কি দারুন সংমিশ্রণ!

আবহাওয়া হলকা শীতমাখা হলেও হুট করে গরম লেগে যায়। আহমাদকে দেখে তার শ্রান্ত মুখ নজরে পড়ে মাহিবার। ভীষণ নরম কণ্ঠে সমীহ করে বলে,

- হাত মুখ ধুয়ে এসে কিছু খেয়ে নিন তো। একটু বাতাস লাগান গায়ে।

সম্মতি জানিয়ে ফ্রেশ হতে যায় আহমাদ। বের হতেই দেখতে পায় মেয়েটা তোয়ালে হাতে দাঁড়িয়ে। সে চাইলেই এটা হাতের কাছে রেখে দিতে পারতো। কিন্তু এ কয়দিনে এটা নিত্যকার্যে পরিণত হয়েছে। তার যেকোনো খুঁটিনাটি কাজও মেয়েটা বেশ আনন্দের সাথে করে। কেনো করে? তার ধারণা অনুযায়ী অন্যের কাজ বিশেষ করে স্বামীর কোনো কাজ করে দেওয়াকে আজকাল মেয়েরা অতিরিক্ত এবং বোঝা বলে বিবেচনা করে। তার ভীষণ কৌতূহল হয় শুনতে একই কাজে মেয়েটার এতো উচ্ছাস কেনো? ঠান্ডা পানিটা গলায় ঢেলে অন্তঃপুর শীতল করে আহমাদ বলে,

- আপনি এসব কেনো করেন?

- কোন সব?

মাহিবা পাশে দাঁড়িয়ে। যদি মানুষটার কিছু লাগে!

- এই যে, তোয়ালে এগিয়ে দেওয়া, জামাকাপড় এগিয়ে দেওয়া তাছাড়া আমার সব খুঁটিনাটি কাজ। এগুলো। কেনো করেন?

- নিজের কাজ নিজে করবো না তো কে করবে?

মাহিবার সহজ উত্তর।

- কিন্তু এগুলো তো আমার কাজ। আপনার না।

- আপনি আর আমি কি আলাদা?

চোয়াল নাড়ানো থেমে যায়। মুখের ভেতর খাবার চূর্নের প্রক্রিয়া বন্ধ হয় সেখানেই। হৃদ গহ্বরে একটা ধাক্কা লাগে। ফাঁটল ঘরে শক্ত-পোক্ত প্রাচীরটায়। কঠিন দেওয়ালের উচ্ছেদ অভিযানের মাধ্যমে নিজে সেখানে শিকড় গেড়ে দেওয়ার কি অদম্য প্রয়াস মেয়েটার! মেয়েটা কি জানে কি ভয়ঙ্কর শ্বাস আটকে দেওয়া একটা কথা সে বলেছে? উহু! জানে না। একদম জানে না। জানলে তো নিজের ইনহেলারটা আহমাদকে দিতো। বলতো, "নিন, ভালো করে শ্বাস নিন। এমন কথা আমি রোজ বলবো। দিনে চারবেলা করে। তখন আপনার কি হবে? এমন বুক বন্ধ করে বসে থাকবেন নাকি?"

আহমাদের শ্বাসরুদ্ধকর কথাটা যে বলেছে তার কোনো বিকার নেই। আলমারি ঘেঁটে ঘুঁটে জামা কাপড় বাছাই করছে সে। বেশ অনেকক্ষণ বাছাইয়ের পর একটা কালো রঙের পাঞ্জাবি হাতে নিয়ে দাঁড়ালো মাহিবা।

লোকটা এখনও খাবার হাতে নিয়ে সেভাবেই বসে আছে। কোনো নড়চড় নেই। মাহিবা ভয় পেয়ে গেলো।

- এই! আপনার কি হয়েছে? খারাপ লাগছে? তাহলে শুয়ে থাকুন। অন্য একদিন যাবো।

চমকে উঠে থমকে যায় আহমাদ। মেয়েটা কতক্ষণ ধরে গোছগাছ করে আছে সে জানেনা। তবে আন্দাজ করতে পারছে সময়ের হিসাব নেহাৎই কম নয়। সেই সবটুকু উত্তেজনা, আনন্দ শুধু আহমাদের ভালো লাগার অনুপস্থিতিতে বিসর্জন দিতে পারে মেয়েটা? আবার পানি খায় আহমাদ। নিজেকে শান্ত রাখা কঠিন হয়ে যাচ্ছে। বড়ো কঠিন!

ভীষণ করুন কণ্ঠে ছেলেটা বলে,

- আপনি এভাবে কথা বলবেন না প্লিজ!

- আপনার ভালো লাগছে?

অন্য কোনো কথায় আগ্রহ নেই মাহিবার। না আছে বোঝার চেষ্টা।

- হুঁ।

- আজ নাহয় থাক। অন্যদিন..

- না! আজই যাবো।

- ঠিক তো?

- হুঁ!

- তাহলে এটা পড়ুন না!

সন্দেহী কণ্ঠ নিমিষে পাল্টে আবদারে রূপ নেয়। আহমাদ চেয়ে দেখে হাতে ধরে রাখা কালো পাঞ্জাবিটা। মেয়েটার বোরখা কালো। ও কি ম্যাচিং করে পড়তে চাচ্ছে? বিনা বাক্যে মেনে নেয় আহমাদ। মস্তিষ্ক ভীষণ ক্লান্ত। পরপর এতো ধাক্কা সামলানো দুষ্কর!

খাবার দাবার গুছিয়ে রেখে আসতেই দেখে আহমাদ পাঞ্জাবির বোতাম লাগাচ্ছে। আয়নায় আহমাদকে দেখে মাহিবার মনে হয় এই মানুষকে নিয়ে রাস্তায় বের হওয়া যাবেনা। কোনোভাবেই না!

- আপনার ক্যাপ আছে?

- আছে। কেনো?

- বের করুন!

- আশ্চর্য! কেনো?

- আশ্চর্য পরে হবেন। আগে বের করুন।

নিজ ব্যাগ হাতিয়ে একটা মাস্ক বের করে মাহিবা। খেয়াল হয় লোকটা তো হেলমেট পড়ে থাকবে!

- আপনি তো হেলমেট পড়ে থাকবেন তাই না?

- না। বাইকের তেল শেষ। ভরে আনতে ভুলে গেছি। আর ঐ রাস্তায় গ্যারেজ নেই। তাই বাইক নেবো না।

- তাহলে এই মাস্ক পড়ুন!

- কি!

- ক্যাপটাও পড়বেন।

- কেনো?

হতবিহ্বল আহমাদ। এসব হচ্ছেটা কি!

- আমি সব ঢাকতে পারছি। আপনি এটুকু ঢাকতে পারবেন না?

গলার স্বরে রাগ মিশে আছে। আহমাদ টের পায়।

- আপনি রাগছেন কেনো?

- আপনি তুমি করে বলছেন না কেনো?

- ইয়ে.. রাগছো কেনো?

থেমে যায় মাহিবা। না ভেবে কথাটা বলে ফেলেছে। কিন্তু তার বহিঃপ্রকাশ যে এমন সুন্দর হবে সেটা কে জানতো? নরম প্রভাবক তার অন্তরের অভিব্যক্তি বের করে আনে।

- এগুলো পড়ে নিন না! তাহলে আপনাকে আর কেউ দেখতে পারবে না।

- আমাকে দেখলে কি হবে?

- আমার ভাল্লাগবে না!

থমকে যায় আহমাদ। কথার মর্মদ্ধার করতে বেশি কষ্ট করতে হয় না। বন্ধুমহলে শিহাব এবং ইফাদ সবচেয়ে সুদর্শন বলে খ্যাত। বিভিন্ন সময় প্রেম প্রস্তাব পাওয়ার ইতিহাসও তাদের আছে। নিজের চেহারা সম্পর্কে আহমাদ জানে। আহামরি কোনো ভাব তাতে নেই। অনেকের মাঝে চোখে লাগার মতো না হলেও নিজেকে তার চলনসই মনে হয়েছে। কিন্তু হঠাৎ এমন পরোক্ষ স্তুতি বাক্যের বিপরীতে কি বল যায় সে ভেবে পেলোনা। নিঃশব্দে পড়ে নিলো ক্যাপ আর মাস্ক। মাহিবা চেয়ে থেকে বিড়বিড় করলো,

- কি ঝামেলা! এখন দেখি আরো বেশি সুন্দর দেখা যায়!

আহমাদ শুনলো সেটা। তবে ভয় পেলো তার দুর্বল হৃদয়ের কম্পনের শব্দ মাহিবার কানে না যায়!

•• •• ••

রাস্তা পার হওয়ার সময় আহমাদের থেকে বেশ দূরে চলে যাবার সম্ভাবনা আছে। লোকটার লম্বা কদমের সাথে সে তাল মেলাতে পারছে না। আবার বলতেও পারছে না, "আপনি একটু ছোটো করে হাঁটতে পারেন না?" মান সম্মানের বিষয়। রাস্তায় খোয়ানোর ইচ্ছে তার নেই। বেশ কসরত করে প্রধান সড়কের সামনে এসে মাহিবা বলে,

- আপনার হাতটা একটু ধরি?

কণ্ঠে তার ক্লেশ। আহমাদ চোখ ঘুরিয়ে তাকায়। মেয়েটা হাপাচ্ছে। নিজ উদ্যোগে তার হাত ধরে আহমাদ। গাড়ি ঘোড়ায় ব্যস্ত সড়ক পার হতে হতে সেই হাত বন্ধনীর দিকে তাকায় মাহিবা। নিজের অন্য হাত দিয়ে সেটাকে আরো জোড়ালো করে। খুব করে চায় জীবন নদের পুরোটা সফরে বন্ধনীটা এমনই থাকুক।

•• •• ••

- আসসালামু আলাইকুম চাচা!

আজহার উদ্দিন ঘুমের ভারে নুইয়ে পড়েছিলেন। ধড়ধড়ফড়িয়ে উঠলেন বৃদ্ধ।

- কে কে?

মাহিবা অবাক চোখে চারিপাশ দেখছিলো। শহর থেকে খানিক দূরে বেশ নিরিবিলি জায়গায় এসেছে ওরা। সামনে দালানের উঁচু উঁচু প্রাচীর পেরিয়ে চোখ যায় নামে। "মায়াবাড়ি"! কি সুন্দর! সেই ক্ষণে আহমাদের কথায় এদিকে তাকালে মানুষটার শিশুসুলভ কাজ নজরে পড়ে। এভাবে ডাকলে বুঝি লোকে ভয় পায় না?

- এই যে চাচা! আমি! আপনার নতুন মানুষ নিয়ে এসেছি!

ধরে রাখা হাত উঁচিয়ে দেখায় আহমাদ।

কুচকে যাওয়া চামড়ায় রোশনাই দেখা দেয়। ছানি পড়া চোখে ভাসে ঔজ্জ্বল্যের দ্বীপশিখা। চকচকে হাসি নিয়ে বৃদ্ধ হাজির হন।

- এইডা বউ মা বাজান?

- জি চাচা!

- আসসালামু আলাইকুম চাচা!

- ওয়ালাইকুম সালাম মা! ভালা আছো মা গো?

- আলহামদুলিল্লাহ চাচা। আল্লাহ্ ভালো রেখেছেন। আপনি কেমন আছেন?

- সেই তো! সেই তো! আল্লায় রাখছে ভালা মা গো!

বৃদ্ধের হাত নিশপিশ করে। কি যেনো করতে চায় লোকটা। কিন্তু অদ্ভুত জড়তা ঘিরে ধরে। আহমাদকে বলেন,

- বাজান! বউ মার মাথায় একটু হাত রাখো তো!

জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে আদেশ পালন করে আহমাদ। মাহিবার মাথার উপর রাখা সেই হাতের উপর হাত রাখেন বৃদ্ধ আজহার উদ্দিন। হাত বুলিয়ে দেন সস্নেহে। জীবনে না দেওয়া সবটুকু মমতা ঢেলে বলেন,

- বাইচা থাকো মা। খুব বাইচা থাকো! আল্লায় তোমগো সুখ্যে রাখুক! খুব ভালা রাখুক। কি খাইবা মা গো? চাচার কাছে কিছু চাও তো।

আপ্লুত হয় মাহিবা। দুয়ার ধরণ ও কৌশলে সম্মান আসে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা বৃদ্ধের প্রতি। নিঃসঙ্কোচে বলে,

- চিপস খাবো চাচা। হলুদ রঙের রিং চিপস!

- আইচ্ছা! যাও ভিত্রে যাও। আমি নিয়া আসি। কিছুক্ষণ থাকবা তো মা গো?

- থাকবো চাচা। ইনশাআল্লহ্!

- হ। সেই তো! সেই তো!

চোখ মুছতে মুছতে দোকানের দিকে পা বাড়ান বৃদ্ধ। আহমাদ অবাক হয়ে এতক্ষণ এদের কথোপকথন শুনছিলো। আজহার উদ্দিনের কাজে সে অবাক হয়েছে বটে।

- এটা কি হলো? চাচা এভাবে দুয়া করলো কেনো?

স্মিত হেসে মাহিবা বলে,

- আমার বেশভূষা দেখে চাচার মনে হয়েছে সরাসরি আমার গায়ে হাত দেওয়া চলেনা। তাই বৈধ মাধ্যম ব্যবহার করেছেন।

বিস্মিত হয় আহমাদ। অল্পক্ষণ ঘটে যাওয়া ছোট্ট ঘটনা তার চিত্তকে গভীর থেকে নাড়া দেয়।

ভেতরে ঢুকতেই নিত্যকার হল্লা সৃষ্টি হয়। তবে আজ যেনো তাতে একটি বৈচিত্র্য আছে। মেয়েগুলো আহমাদের তেমন ধার ঘেষে না। দেখলেই মনে হয় ধমকাবে। তবে ছেলেদের দলটা আসতেই আহমাদ হাসান এবং নাফিমকে চোখ রাঙিয়ে ইশারা করে। আজ কোনো ফাইজলামি চলবে না! ছেলে দুটো হাসে। দুষ্টুমি মাখা হাসি। সেই ক্ষণে ইফাদ তার নির্ধারিত কক্ষ থেকে অর্ধেক শরীর বের করে বাইরের অবস্থা দেখে নেয়। চেঁচিয়ে বলে,

- দোস্ত! তোর রাক্ষসী বোন আসছে নাকি!

- ইফাদ! ভালো করে কথা বলে!

- সরি ভাই! আপনার ছোটো বো-মা সরি বইন আসছে?

- না। ঘুমায়।

বিড়বিড় করতে করতে কাছে আসে ইফাদ।

- যাক! বিশ্ব শান্তি পাচ্ছে।

এতো ছেলেদের মাঝে সংকোচ বোধ করে মাহিবা। আহমাদের পেছনে লুকিয়ে পড়ার চেষ্টা করে। ইফাদ আসতেই মেয়েটার এমন জড়সড় অবস্থা দেখে আহমাদকে ধমক দেয়।

- বলদ! ভাবিরে এখানে এমনে দাঁড় করায় রাখছিস ক্যান? যা চাচীর কাছে নিয়ে যা!

থতমত খায় আহমাদ। ধমক দেওয়ার কাজটা তার কি না! যেতে যেতে সন্তপর্নে মাহিবাকে বলে,

- সরি!

অবাক চোখে মানুষটাকে দেখে মাহিবা। ছোট্ট একটা সরিতে তার এতো ভালো লাগছে কেনো?

নাজমা বেগমের কাছে মাহিবাকে বুঝিয়ে দিয়ে সেখান থেকে প্রস্থান নেয় আহমাদ।

নাজমা বেগমের চোখ টলমল। হন্তদন্ত তার ভাব। কি রেখে কি করবেন দিশা পাচ্ছেন না। তার মানিকের বউ এসেছে। এ তো যে সে নয়!

- চাচী! আমার কাছে এসে বসেন তো! এতো ছুটোছুটি করতে হবে না।

মুখের আবরণ সরিয়ে বলে মাহিবা।

সংকোচে ভুগছিলেন মহিলা। মেয়েটাকে একটু স্নেহ দিতে গেলে যদি নাক সিটকায়? তাহলে তার যে বড়ো লাগতো! সেসময় মাহিবার এমন জড়তাহীন ব্যবহারে আস্কারা পান তিনি। মেয়েটাকে বুকে জড়িয়ে নিয়ে মাথায় চুমু খান। পিঠে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলেন,

- আমার মানিকের বউ! অ বউ! তোমারে কি বইলা ডাকি কও দেখি?

অকৃত্রিম মায়ার রাজ্যে যেনো এসে পড়েছে মাহিবা। এদিক ওদিক সবদিকেই মায়ার মেলা। উপচে উপচে পড়ছে সবখানে। চট করে তার মনে হয় মন খারাপের দিনে এখানে এসে একটু মায়া কুড়িয়ে নিয়ে যাবে। মনের ঝাঁপি খুলে সেথায় রেখে দেবে। খারাপ মন নিমিষেই ভালো হয়ে যাবে না?

- আপনার যা ভালো লাগে চাচী।

- আমার তো বউ কইতেই ভালো লাগে মা!

- তাহলে তাই সই।

- অ বউ! আমারে একটু আম্মা কইয়া ডাকবা গো? আমার বড়ো স্বাদ! মানিকের বউ আমারে আম্মা ডাকে!

- উনাকে আপনি মানিক ডাকেন আম্মা?

বিদ্যুৎ চমকের মতো চমকে যান নাজমা বেগম। মেয়েটা এক কথায় তাকে "আম্মা" ডেকেছে। না প্রশ্ন করেছে, না তার উত্তর দিয়েছে। কি যে ভালো লাগে তার! তড়িৎ আলিঙ্গনের বাঁধন দৃঢ় করেন।

- ডাকি বউ! আমার একখান পোলা আছিলো। মানিক নাম কইরা। ছুডুবেলাত মইরা গেছে বউ। তোমার স্বোয়ামীরে দেখলেই আমার পোলার কথা মনে লাগে। তাই ডাকি। আমার মানিকের বউ!

নাজমা বেগমের বুকে পড়ে ঘ্রাণ টেনে নেয় মাহিবা। শাড়ির আঁচল থেকে কেমন একটা মায়া মায়া ঘ্রাণ আসছে। কিসের ঘ্রাণ? আম্মার ঘ্রাণ! তাইতো!

- আমার আরো দুইডা পোলা আছে বউ। একবার খুব অসুখে পড়লাম। কেউ রাখতে চাইলো না। হাসপাতালে ভর্তি কইরা আর খোঁজ খবর নেয় না। তোমার চাচায় খুব কষ্ট পাইলো। রাগ কইরা আর গেলো না। আমি কইলাম যাইবা কই? কয় যেইদিক চক্ষু যায় সেইদিক যামু। রাগের কথা! পরে কেমনে কেমনে আল্লায় মানিকরে দিলো বউ! কইতে পারি না।

বৃদ্ধার চোখে মুখে লুকিয়ে রাখা কষ্ট দেখে মাহিবা। নিজের কোলের ছেলেরা তাকে আর খোঁজেনি। জানতে চায়নি জন্মদাত্রী মা কোথায় আছে, কেমন আছে। জানতে চায়নি বৃদ্ধ পিতার খোঁজ। এ শোক বুঝি ভোলার মতো?

সন্তর্পনে নাজমা বেগমের চোখ মুছে দেয় মাহিবা। ভরসা মাখা কন্ঠে বলে,

- এখানে আপনার কতো ছেলেমেয়ে আম্মা! আল্লাহ নিয়ে নিলে তার চেয়ে বেশি করে পুষিয়ে দেন।

- ঠিকই কইসো বউ!

হাসে মাহিবা।

- অ বউ! আমার এই চুরি দুইখান পড়ায় দেই বউ? সোনা তেমন নাই। তোমার চাচায় গড়াইয়া দিসিলো সেই কবে! নিবা মানিকের বউ?

কণ্ঠে যেনো কি ঢেলে দেওয়া! মাহিবা ভাবে নাজমা বেগমের কাছে অবশ্যই মায়ার কৌটো আছে। বলার আগে কথাগুলো সেই কৌটোতে ডুবিয়ে নেন। কথার ভাঁজে ভাঁজে মায়া ঝরে পড়ে! হাত থেকে মোজা খুলে এগিয়ে দেয়। উপহার গ্রহণের নীরব সম্মতি।

কি খুশি হন নাজমা বেগম। তার চকচকে হাসির কাছে চাঁদের কিরণ হার মানবে কি? অবশ্যই মানবে!

গল্প করে করতে দরজায় চোখ গেলে মাহিবা দেখতে পায় মেয়েদের একটা দল লুকিয়ে আছে সেথায়। স্নেহ মিশিয়ে মেয়েটা তাদের ডাকে।

- এদিকে এসো! ওখানে কি?

সকলেই এগিয়ে আসে। কেউ খুশি হয়ে কেউবা ভয়ে ভয়ে। দূর ছাই করবে না তো?

স্বল্প সময়ের মাঝেই মাহিবা মিশে যায় মায়াবাড়ির মায়ায়। ডুবে যায় তাদের সাজানো স্বপ্নরাজ্যে। সেই আনন্দময় মুহূর্তে আহমাদ এসে দোরে কড়া নাড়ে।

- হাসপাতালে যেতে হবে মাহিবা! আর্জেন্ট!

চলমান.