প্রাপ্তি (প্রথম অধ্যায়) — পর্ব ৩০
লেখক: বিনতে ফিরোজ · বিভাগ: ইসলামিক · পর্ব ৩০ · ৪৫ পর্বের মধ্যে ৩০
অফিসের প্রায় প্রত্যেকটা মানুষের চমকিত, আশ্চর্য দৃষ্টি সিসিটিভি ফুটেজের দিকে। চমকের ঘোর কেঁটে গেলে সেথায় জায়গা করে নেয় ঘৃণার স্বচ্ছ প্রলেপ। ঘৃণা ভরে মুখ ফিরিয়ে নেয় সকলে। কারো কারো মুখ দিয়ে কটু কথাও বের হয়। সেদিনের সেই সহকর্মী ব্যক্তি বলে,
- ছি! লোকটা এতোটা নিচ! ছিহ!
কোণার টেবিলের মির্জা সাহেব নত কণ্ঠে বলেন,
- আমি এদের আগেই একসাথে দেখেছি। তবে ঘটনা যে এতদূর গড়িয়েছে সেটা কল্পনাই করতে পারিনি।
এসবের মাঝে হতভম্ব ম্যানেজার ভদ্রলোক। কেঁচো খুঁড়তে গিয়ে সাপ বের হওয়ার ঘটনা ঘটেছে তার সাথে। খুঁজতে এলেন কি আর বের হলো কি!
ঘটনা হলো উক্ত অফিসের বসকে ঘিরে। আহমাদের সাথে আরো একজন কর্মীকে একই কাজ দেওয়া হয়েছে। এবং বলা হয়েছে যার কাজ বেশি সুন্দর হবে পরবর্তী সুযোগ সে পাবে। বলা বাহুল্য সেই অপর কর্মী একজন মহিলা। বয়সে আহমাদের সমান অথবা কিছু ছোটো হতে পারে। সে যাই হোক,এই ঘোষণার পর থেকে সেই মেয়েটিকে বসের সাথে খুব বেশি দেখা যাচ্ছিলো যেটা একটু চোখে লাগার মতো। আহমাদ সেসব কানাঘুষার ধার ধারেনি। কি দরকার লোকের কাজে নাক গলিয়ে সময় নষ্ট করা? তার থেকে নিজের কাজে মন দেওয়া বেশি বুদ্ধিমানের কাজ! তবে আজ যেই দৃশ্য নিজ চোখে দেখেছে এর পর আর কোনোভাবেই তার মন থেকে সম্মান আসা সম্ভব না। পরিচ্ছন্ন কর্মী চলে যাওয়ার মিনিট খানেকের মাথায় বসের রুম থেকে বস এবং সেই মেয়েটি একত্রে বের হয়েছে। তখন রাত নয়টার কিছু বেশি। অফিস ছুটি হওয়ার প্রায় ঘন্টা চারেক পরের কথা। আহমাদ তার কিছু আগেই বিদায় নিয়েছে। ব্যক্তিগত কাজ শেষ করার জন্য তার সেই দেরি। তবে এক ঝলকে বস এবং সেই মেয়েটির বাহ্যিক অবস্থা যেটুকু পর্যবেক্ষণ করেছে, তাদের বের হওয়ার ভঙ্গি, হেঁটে চলার অবস্থা যেটা প্রকাশ করছে তাতে আর সন্দেহ নেই ঘটনা কোন পর্যন্ত চলে গেছে। মন থেকে ঘৃণা আসে তার। লোকটার বয়স প্রায় ষাট ছুঁই। বাবার বয়সী লোকটাকে আহমাদ এতোদিন যথেষ্ট সম্মান দিয়ে এসেছে। তবে তার সাথে লোকটার তেমন কোনো কাজ না থাকাতে নিজের ভেতরে লুকিয়ে রাখা পিতৃ স্বরূপ সম্মানটুকু আর বের হয়ে আসেনি। তবে আজ থেকে তার জায়গা আহমাদের মনে ঠিক কোন কোণায় রাখা হবে সেটা একটা ভাববার বিষয়।
আহমাদের মুখ লালাভ হয়ে উঠেছে। লজ্জায়, অস্বস্তিতে, ঘৃণায় সে এক পর্যুদস্ত অবস্থা বটে! চোখের পাতা বন্ধ হলেও যেনো মাত্র দেখা সেই কলুষিত দৃশ্য ভেসে উঠছে।
কোনো বিষয় পেলে অফিস সেটা নিয়ে সরগরম থাকে। যেনো সুক্ষাতিসূক্ষ্ম বিশ্লেষণ চলে পুরো কর্মক্ষেত্র জুড়ে। কিন্তু আজ সেই কর্মক্ষেত্র স্তব্ধ। কারো মুখে কোন কথা নেই। কলম পড়ার শব্দেও যেনো আঁতকে উঠছে সকলে।
সেই ক্ষণে অফিসে প্রবেশ করেন বস এবং তার কিছু পরেই সেই মেয়েটি। আড় চোখে এই দৃশ্য সকলে দেখলেও কিছু বলার সাহস বা ইচ্ছে কোনোটাই হয় না। সকলে যথারীতি নিজ নিজ কাজ শুরু করলে কিছু সময় পর ডাক পরে আহমাদ এবং সেই মেয়ের। বিক্ষিপ্ত মস্তিষ্ককে শান্ত করে নিজের তৈরি করা কাজ নিয়ে বসের রুমের দিকে যায় আহমাদ। স্নায়বীয় উত্তেজনা দমিয়ে রাখার যথাসম্ভব চেষ্টা করে যাচ্ছে সে। পিছু আসা মেয়েটির দিকে কোনো ধ্যান দেয় না। অনুমতিপূর্বক রুমে প্রবেশ করলে কর্মকর্তা প্রথমে মেয়েটির কাজ দেখতে চান। আহমাদের সাথে কোনোরূপ কথা না বলে, তার কোনো কাজ না দেখেই বলেন,
- মারভেলাস! অসাধারণ কাজ করেছো! এমন কাজই তো আমি খুঁজছিলাম!
সলজ্জ মুখে মেয়েটি বলে,
- থ্যাংক ইউ স্যার!
আহমাদ ঘটনা বুঝতে সময় নেয়। নীরব অসম্মতির তোয়াক্কা না করে বলে,
- স্যার, আমার কাজটা?
- যোগ্য কাজ খুঁজে পাওয়ার পর আর সময় নষ্ট করার মানে হয় না মি. ইয়াসির। আশা করি বিষয়টা ক্লিয়ার। নাও ইউ মে লিভ।
স্পষ্ট প্রত্যাখ্যান। ফাইল বাড়িয়ে রাখা হাতটা শক্তির অভাবে কখন যে নেমে গেছে টের পায়নি আহমাদ। বুকের ভেতর কি যেনো জেঁকে বসে আছে। গলার কাছটা দলা পাকিয়ে যায়। ফিরতি পথে পা বাড়ালে চোখটা ঝাপসা হতে চায়। তার এতদিনের অক্লান্ত পরিশ্রম, প্রতিটা দিন ভোর সকালে ঘুম থেকে উঠে রাতে ঘুমানোর পূর্ব পর্যন্ত টানা কাজ করা। কতো শত পছন্দের কাজ রেখে কতো আশা নিয়ে এই ফাইলটা তৈরি করা। কতো উত্তেজনার পারদ উঁচু হয়েছিলো। সবটা এক লহমায় হারিয়ে গেলো। সবটা! লোকটা যদি ফাইলটা একবার দেখতো তাহলে বোধহয় এতোটা কষ্ট হতো না। ঘটনার মারপ্যাচ বুঝতে পেরে তার চিৎকার করে কাঁদতে মন চায়। ইচ্ছে করে সব লন্ড ভন্ড করে দিতে। কিন্তু নিজের ভাঙ্গা অবস্থা নাকি অন্যকে দেখাতে নেই? তাহলে নাকি লোকে আরো সুযোগ নেয়? সেই সূত্রের রেশ ধরে খুব শান্ত ভঙ্গিতে নিজের ডেস্কে যায় সে। হাতের কালচে রঙ্গা ফাইলে চেয়ে থাকে অপলক। সকালের ফুটেজের সাথে বর্তমানের অবস্থা মিলিয়ে সমীকরন সমাধান করতে বেশি কষ্ট করতে হয়নি তাকে। শেষ পর্যন্ত প্রমোশন পেতে এই পথ! খুব সন্তপর্নে, আস্তে ধীরে নিজের ব্যাগ গুছিয়ে রওনা দেয় দরজার দিকে। এখানে আর একদণ্ড থাকার ইচ্ছে, আগ্রহ, শক্তি কোনোটাই তার অবশিষ্ট নেই। তাকে চলে যেতে দেখে পাশের ডেস্কের সেই সহকর্মী ডেকে ওঠেন,
- ইয়াসির সাহেব! কই চললেন? আরে দাঁড়ান! যাহ! চলে গেলো?
শেষটুকু নিজ মনে বললেও অফিসের সকলের কাছে ঘটনা পরিষ্কার। তারা তো অবোধ বালক নয়!
বাইক হাঁকিয়ে হাইওয়ের দিকে চলে আহমাদ। আকাশটা বেশ মেঘলা। বৃষ্টি হবে বোধহয়। তারও কি মন খারাপ? মন খারাপের স্মৃতি মুছে ফেলতে কালো মেঘ গুলোকে বৃষ্টিরূপে ঝড়িয়ে দেবে? তারপর দেখা যাবে স্বচ্ছ, ফকফকে নীলাভ আকাশ! বৃষ্টি শেষে রোদ! বাহ্! কি দারুন!
হুট করে বাইকে কি একটা সমস্যা হয়। বাইক চালানো থামিয়ে রাস্তার এক পাশে দাঁড়ায় আহমাদ। হেলমেট খুলে একপাশে রেখে সমস্যা খুঁজতে থাকে। তখনই পেছন থেকে কেউ ডাকে,
- আহমাদ ভাই!
নিজ নাম শুনে অবচেতন মনেই পেছনে তাকায় আহমাদ। চোখের পাতায় ধরা পড়ে এক সুশ্রী মেয়েলী মুখ। আদলে কিছু পরিবর্তন এলেও চেনা সেই মুখ এক বিশ্রী ঘটনা স্মরণে নিয়ে আসে। তৎক্ষণাৎ মুখ ঘোরায় আহমাদ। হা না কিছু উত্তর করে না।
আজকের দিনটা তার জন্য কি সে জানে না। একের পর এক অনাকাঙ্ক্ষিত দৃশ্য, ঘটনা, মুখের সম্মুখীন হয়ে চলেছে। সব আশা-আকাঙ্ক্ষা,উত্তেজনাকে গলা টিপে হত্যা করতে চাইছে যেনো।
- কথা বলবেন না?
ঘুরিয়ে নেওয়া মুখে ঘৃণার আভাস ঠিকই টের পায় মেয়েটি। অব্যক্ত যন্ত্রণা বোধ করে। লোকটার কি পরিবর্তন! তবে মেজাজ ঠিক তেমনি আছে। ঠিক সেদিনের মতো! একটা প্রশ্ন খুব জানতে ইচ্ছে করে। উশখুশ করতে করতে জিজ্ঞেস করেই ফেলে,
- আপনি বিয়ে করেছেন আহমাদ ভাই?
তাচ্ছিল্যের হাসি হাসে আহমাদ। পূর্ব পরিচিত কারো সাথে দেখা হলে মানুষ জিজ্ঞেস করে "কেমন আছেন" আর এই মেয়ের প্রশ্নের ধরণ দেখো! ঠিক এই মেয়ের মতোই। কঠিন কণ্ঠে অন্যদিকে চেয়েই উত্তর করে,
- হ্যাঁ!
দমে যায় মেয়েটা। এতোদিন পরে অনাকাঙ্ক্ষিত সাক্ষাৎ তার মনে আশার এক সূক্ষ্ম প্রদীপ জ্বেলে দিয়েছিলো। দপ করে সেটা নিভে গেলো। মলিন মুখে ভগ্ন কণ্ঠে মেয়েটা বলে,
- আমার খবর জানতে চাইবেন না?
- ইচ্ছে নেই।
কি কঠিন স্বর! কঠিন সে উত্তর। বক্ষস্থলে চিনচিনে ব্যাথার অস্তিত্ব টের পায় মেয়েটা। এই কঠিন কণ্ঠের মানবের সামনে আর কিছুক্ষণ দাঁড়ালে আকাশের আগে তার চোখে বৃষ্টি নামবে। এখনই প্রস্থান নিতে হবে।
- ভালো থাকবেন। আর.. না কিছু না।
তড়িঘড়ি করে জায়গা ত্যাগ করে মেয়েটা। কিছু দূর যেয়ে ফেলে আসা অতীতের সেই মানুষটাকে আরেক ঝলক দেখে নেয়। চোখটা বুজে আসতে চায়। কেনো? কষ্টে নাকি অনুতাপে?
জোরে দম ছাড়ে আহমাদ। এই মুখের দর্শন এ জীবনে আর সে চায়নি। যে জন্যে অতি পরিচিত জায়গা ছেড়ে লোকান্তর হওয়া সে মুখটাকে আর কখনো সে দেখতে চায়নি। কখনো না! আজ একের পর এক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে চলেছে। মেজাজ আরো গরম হয়ে ওঠে। উত্তপ্ত মেজাজের লাভা যে কাউকে পুড়িয়ে দিতে সক্ষম।
বাইক ঠিক হলে সে জায়গা ত্যাগ করে আহমাদ।
•• •• ••
জানালার ধারে দাঁড়িয়ে আছে মাহিবা। আজ ভার্সিটিতে যায়নি। সকাল থেকেই আকাশটা গুমোট। সেই গম্ভীর ভাব যেনো হালকা হলো ঝড়িয়ে দেওয়া জলের মাধ্যমে। প্রায় আধা ঘন্টা হলো বৃষ্টি শুরু হয়েছে। আফিয়া, আয়িশা দুজনেই যার যার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। সালেহা বেগম আবহাওয়ার আরামে নিজ ঘরে যেয়ে একটু সুখ নিদ্রা নিয়েছেন। বাড়ি নিস্তব্ধ। মাহিবার ইচ্ছে হয় ঝড়ে পড়া জলের ফোঁটা গায়ে মাখতে। তবে সাহস হয় না। যদি আবার শ্বাস কষ্টের সমস্যা হয়? সে আবার আরেক ঝামেলা। থাক! কি দরকার? সবসময় সব ইচ্ছে পূরণ হবে এমন তো না।
গুড়ুম গুড়ুম ডেকে চলা গম্ভীর আকাশের কান্নার নিচে সেই মুহূর্তে বাড়ি ফেরে আহমাদ। নিচে তাকে আসতে দেখে চোখ প্রসারিত হয় মাহিবার। এই বৃষ্টির মাঝে, অসময়ে লোকটা এখানে কেনো? তড়িৎ তোয়ালে হাতে সদর দরজা খুলে দাঁড়ায়। মিনিট খানেকের মাঝে চলে আসে আহমাদ। যেই উৎফুল্ল, আগ্রহ নিয়ে লোকটা আজ সকালে বের হয়েছিলো মুখে এখন তার ছিটে ফোঁটাও নেই। মাহিবা দাঁড়িয়ে থাকলেও তাকে উপেক্ষা করে ঘরে চলে আসে আহমাদ। দরজা আটকে দ্রুত ঘরে যায় মাহিবা। বিছানায় চোখ বুজে বসে থাকা আহমাদকে বলে,
- আল্লাহ! এখানে বসেছেন কেনো? পুরো বিছানা ভিজে গেলো তো! দেখি উঠুন। উঠুন!
আহমাদের দিক থেকে কোনো সাড়া আসে না। তাকে টেনে ধরে উঠিয়ে মাথা মুছিয়ে দিতে থাকে মাহিবা।
- আজ এত তাড়াতাড়ি এলেন যে? অফিসের কাজ সব ঠিকঠাক হয়েছে?
তৎক্ষণাৎ সে বিশ্রী ঘটনা স্মরণের আসে। ছিটকে মাহিবার হাত সরিয়ে দিয়ে নিস্পৃহ কণ্ঠে বলে,
- আমাকে একা থাকতে দিন।
সম্বোধনের পরিবর্তন টের পায় না মাহিবা। খেয়াল করে না গম্ভীর হয়ে থাকা আহমাদের মুখশ্রী।
গটগট করে বারান্দায় চলে যায় আহমাদ। মাহিবা থতমত খায়। এমন ব্যবহার আহমাদের থেকে এই প্রথম কি না! বুঝতে পারে না কেমন অভিব্যক্তি প্রকাশ করা উচিত। বেশ কিছুক্ষণ পেরিয়ে গেলেও যখন আহমাদ ঘরে আসে না তখন বেশ সাহস সঞ্চয় করে বারান্দায় যায় মাহিবা। নিশ্চুপ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা আহমাদের পাশে যেয়ে বলে,
- আপনি তো একদম ভিজে গেছেন। তাহলে চলেন ছাদে যাই! তিন তলার ওরা বাসায় নেই। এই সময় কেউ ছাদেও যাবে না। যাবেন?
কথা বলেনা আহমাদ। সে নীরব, নিস্তব্ধ!
আহমাদের নীরবতা যেনো আশকারা দেয় মাহিবাকে। সাহস আসে মনে। সেই সাহসকে সঙ্গী করে আস্তে ধীরে আহমাদের এক হাত আকড়ে ধরে দুহাত দিয়ে। সেথায় টান বসিয়ে বলে,
- চলেন একটু বৃষ্টিতে ভিজে আসি। বৃষ্টির ঠান্ডা পানি মাথায় লাগলে মাথা একদম ঠান্ডা হয়ে যাবে! তাহলে দেখ...
কথা শেষ হয় না। কোথাও বিদ্যুৎও চমকায় না। তবে চমকে যায় মাহিবা। যখন শক্ত হাতের কঠোর স্পর্শ তার কোমল চিবুকে পড়ে থমকে যায় মেয়েটা। ঝিমঝিম করা জায়গাটা তাৎক্ষণিক হরতাল ডেকে সঙ্গী সাথী জড়ো করে ফেলে। ফলস্বরূপ পাতলা চামড়ার আস্তরণ ভেদ করে দেখা যায় লালাভ বর্ণের আভা। অজান্তেই নিজের বাম হাত চলে যায় আঘাতের দরুন হালকা গরম হওয়া বাম গালে। বিনা নিমন্ত্রণে জেঁকে আসা অশ্রুদের সমন করার বোধটুকু হয় না মাহিবার।
চড়টা যেনো ছিলো ঝড় শুরু হওয়ার সংকেত। খুব অগোছালোভাবে শুরু হয় সে ঝড়। আহমাদের বাক্যবাণ যেনো আকাশে ডাকা মেঘেদের থেকেও ভয়ঙ্কর। ঐ যে ওরা ডাকছে। গুড়ুম... গুড়ুম...
- বলেছিলাম আমাকে একা থাকতে দিন। বলিনি? একটা সেকেন্ড একা থাকার মতো নেই। যখন দেখো সবসময় আমার পিছে পিছে! আপনার কি আর কোনো কাজ নেই? বিয়ে করে ফেলেছি বলে মাথায় উঠে বসে আছেন! আশ্চর্য!
হৃদস্পন্দনের গতি ঠাহর করার চেষ্টা করে মাহিবা। না, টের পাওয়া যাচ্ছে না! মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতার সাথে সাথে কি হৃদপিন্ডও অবসরে গেলো নাকি? আশ্চর্য!
বিপরীত মানুষের থেকে কোনো উত্তর না পেয়ে অদম্য গতি লাভ করে আহমাদ। আবারও বলা শুরু করে।
- বিয়ের দিন আমাদের মাঝে কি কথা হয়েছিলো? আপনি থাকবেন আপনার মতো আর আমি আমার মতো। রাইট? তাহলে? আমার সব কিছুতে আপনি কেনো নাক গলাতে আসেন? নিজের কাজ করতে পারেন না? বৃষ্টিতে ভিজবেন তো নিজে গিয়ে ভিজুন না! আমাকে নিয়ে টানাটানি করছেন কেনো? নিজের বাড়িতে একটা সেকেন্ড শান্তিমতো থাকার উপায় নেই। যখন দেখো এটা সেটা বলতেই আছে। উফফফ! আচ্ছা আপনি কয়েকটা দিন নিজের বাড়ি যেয়ে থাকেন না কেনো? যান না! কিছু দিন বেড়িয়ে আসুন। আপনারও ভালো লাগে। আমারও ভালো হয়। রোজ রোজ এই ঘ্যান ঘ্যান আর আমার ভালো লাগে না! অসহ্য!
কথা শেষে প্রস্থান নেয় আহমাদ। সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মূর্তি মানবীকে খেয়াল করে না। খেয়াল করলে দেখতে পেতো মেয়েটা ঠোঁট চেপে কান্না আটকানোর ব্যর্থ চেষ্টা করে চলেছে। কষ্টে রাঙা হয়ে যাওয়া মুখখানি নামাতে নামাতে থুতনি বুকে ঠেকিয়ে ফেলেছে। অসহায়ের মতো দাঁড়িয়ে থাকতে না পেরে শক্তিহীন পা দুটোকে ছুটি দিয়ে বসে পড়ে মাহিবা। কি বলে গেলো লোকটা? "নিজের বাড়ি"! এটাই তো তার বাড়ি! সে কোথায় যাবে? কেনই বা যাবে? সে ঘ্যান ঘ্যান করে? সে অসহ্য? অদ্ভুত প্রশ্নগুলো কিলবিল করতে থাকে গোটা মস্তিষ্ক জুড়ে। স্বাভাবিক ধ্যান লোপ পেয়েছে বহু আগেই। একটু হুশে আসতেই বুঝতে পারে আহমাদের অনুপস্থিতি। লোকটা নেই। কোথায় গেলো? বারান্দা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে দেখতে পায় বাইকটা নিজ জায়গা স্বগর্বে দখল করে আছে। যাক তাহলে রাগের মাথায় বাইক নিয়ে বের হয়ে যায়নি। স্বস্তি বটে! তবে স্বাভাবিকভাবে সে ভাবতে পারে না অনেক কিছুই। কথার আঘাতে মনের সুকোমল জায়গায় বেশ কিছু ছিদ্র তৈরি হয়েছে। এগুলো পূরণ হবে কি দিয়ে? হাবিজাবি অনেক চিন্তা মাথায় নিয়ে সন্তর্পনে ছাদের দিকে পা বাড়ায় মাহিবা। তিন তলা ফাঁকা। কোনো জনমানবের অস্তিত্ব নেই। বৃষ্টির দাপট মাথায় নিয়ে মেহেগুনি গাছের ডালপালা দিয়ে ঘেরা ছাদের এক পাশে যেয়ে বসে। রেলিংয়ে হেলান দিয়ে শূন্যে দৃষ্টি দিয়ে তাকিয়ে থাকে, অপলক। গাছের ডালগুলো যেনো মায়ার ছায়া দিয়ে লোক চক্ষুর অন্তরালে লুকিয়ে রাখে দুঃখ বিলাসী মেয়েটাকে। মেয়েটা ভুলে যায় তার শ্বাস কষ্ট আছে। ভুলে যায় ঠান্ডায় তার কষ্ট হয়, খুব কষ্ট....
চলমান.