প্রাপ্তি (প্রথম অধ্যায়) — পর্ব ২৬

লেখক: বিনতে ফিরোজ · বিভাগ: ইসলামিক · পর্ব ২৬ · ৪৫ পর্বের মধ্যে ২৬

নিস্তব্ধ রাতের বুক চিড়ে টিক টিক শব্দ প্রতি দেয়ালে ধ্বনিত হয়ে চলেছে। কারো খুব সাবধানী পদচারণা চলছে সমগ্র ঘরজুড়ে। খানিক বাদে সেটা থেমে গেলো। খুব যত্ন মাখা কিছু শব্দের উৎপত্তি হলো। রিনরিনে সেই কণ্ঠস্বর হাওয়ায় ভেসে বেড়াতে লাগলো। অল্পক্ষণ, কিছুক্ষণ, বহুক্ষণ জুড়ে...

ঘুমের মাঝে পাশ ফিরলো আহমাদ। হাত ছড়িয়ে দিলেও অপর পাশে কোনো মানুষের অস্তিত্বের খোঁজ পেলো না। ঘুমের দৈর্ঘ্য পর্যাপ্ত হওয়ায় তৃপ্ত চোখ দুটো ঝাপসা আলো দেখতে চাইলো। চোখের শিরা তখনও লাল। পুরো চোখকে লালাভ রঙে পূর্ণ করে ফেলেছে। কিছু ফুলো ভাব যেনো চাহনির গাম্ভীর্যতার পরিমাণ বাড়িয়েছে। শুনশান নীরবতায় একটা আওয়াজ বারবার কানে বাজছে।

- ফাবি আয়্যি আলা ইরব্বি কুমাতু কাযযিবান।

ঘুমের রেশ নিয়ে হেলান দিয়ে বসলো আহমাদ। অপলক দেখতে লাগলো টেবিলে বসা মানবীকে। ছোট্ট একটা লাইট জ্বেলে খুব মিহি কণ্ঠে পড়ে চলেছে, সুর তাল লয়ের সংমিশ্রণে এক অসাধারণ পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। ঘোর লাগা এই পরিবেশ আহমাদকে নিয়ে গেলো নিকট অতীতে। অদ্ভুত সুর কানে নিয়ে চোখ বুজলো আহমাদ। মনের আয়নায় দেখতে থাকলো তার অল্পদিন আগের প্রতিচ্ছবি। মেয়েদের অসম্মান না করলেও তাদের প্রতি দৃঢ় অবিশ্বাস তার মনে জন্মেছিলো। অহেতুক নয়। সেই তিক্ত অতীতের রেশ থেকে এই অবিশ্বাসের জন্ম। চাইলেও নিজেকে সেই অবিশ্বাসের বেড়াজাল থেকে মুক্ত করতে পারেনি। নিজের সম্মান বিসর্জন গেলো যে ঘটনা থেকে সে ঘটনা তাকে বহুদিন তাড়া করেছে, বহুদিন! সে ভুলতে পারেনি এক ঘর লোকের সামনে তার নিচু মাথার দৃশ্য, ভুলতে পারেনি অশ্রাব্য সেই তিক্ত কথার সুর। ভুলতে পারেনি! তামিমের ঘটনার পর সে ভয় পাওয়া শুরু করলো। যখনই সালেহা বেগম বিয়ের কথা বলতেন তার চাপা পড়া ভয় লাফ দিয়ে নিজের অস্তিত্ব জানান দিতো। বহুদিন নিজের সাথে যু'দ্ধ করেছে সে। সে তো জানে সবাই এক নয়। তবুও! তবুও সেই একই কাতারের কেউ যদি তার সাথে জুড়ে যায়! তাহলে কিভাবে থাকবে সে? কিভাবে বাঁচবে! এই প্রশ্নগুলো প্রতিনিয়ত তাকে কুড়ে কুড়ে খেতো। অবশেষে হাল ছেড়ে দিয়ে সবটা রবের দিকে ঠেলে দিয়ে সে বললো,

- আমি পারছি না আল্লাহ। নিজের সাথে যু`দ্ধ করতে করতে আমি ক্লান্ত। তুমি আমার জন্য কিছু ঠিক করে দাও। তুমি যা দিবে আমি তো তারই মুখাপেক্ষী!

ব্যস! সেই বলে সে ক্ষান্ত হলো। আত্মসমর্পণ করলো। আর ভাবতে চাইলো না আহমাদ। তিক্ত স্মৃতি মনে করে নিজেকে আর কষ্ট দিতে চাইলো না। বেশ তো আছে সে! এমন কিছু সে পেয়েছে যেটা তার কল্পনাতেও ছিলো না।

- আপনি কখন উঠলেন?

লালাভ চোখ মেলে দৃষ্টি সামনে দিলো আহমাদ। ঘুম জড়ানো ভারী কণ্ঠে বললো,

- যখন আপনি নিজের আখের গোছাচ্ছিলেন।

লোকটা কি খোঁচা দিলো? বুঝলো না মাহিবা। বিব্রত হেসে বললো,

- আমি আপনাকে এখুনি ডাকতাম।

- কালকে আপনি প্রমিস করেছিলেন।

- ইয়ে.. মানে..

- মানে এখন শাস্তি পেতে হবে।

- কি শাস্তি?

- অন্য একটা সূরা পড়ুন। না দেখে।

চোখ বন্ধ করলো আহমাদ। এখন কিছু সময় ভালো যাবে।

ভেবে ভেবে সুর সরল মাহিবা। রিনরিনে সেই স্বরে বলতে শুরু করলো,

- ইয়াসিন। ওয়াল কুরআনিল হাকিম।.......

বিশ মিনিট যাবৎ পড়তে থাকলো মাহিবা। পড়তেই থাকলো। মাঝে মাঝে কিছু আয়াতে এমনভাবে সুরের ঝঙ্কার বাজলো, কেঁপে উঠলো আহমাদ। ঝাঁকি দিয়ে উঠলো ভেতরটা। অদ্ভুত এক শক্তি, অদ্ভুত এক অনুভূতি জেঁকে ধরলো তাকে।

আহমাদকে চুপ থাকতে দেখে মাহিবা বলে,

- আমার পড়া শেষ। ঘুমিয়ে গেলেন?

- না।

- এখন উঠুন। নাহলে আবার কাজ শেষ করতে পারবেন না।

- হুঁ।

দুই রাকাআত নামাজ পড়ে কাজে বসলো আহমাদ। দুই পাতা উল্টাতেই সামনে পেলো ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপ সাথে দুটো বিস্কুট। মুখ নিচু করেই হাসলো সে। মেয়েটা তাকে ঋণী করে ফেলছে। এই ঋণ সে মেটাবে কি দিয়ে?

অফিস যাবার কালে আহমাদ ওয়াশরুম থেকে বের হলে তাকে দেখে সূক্ষ্ম অভিমান জন্মে মাহিবার মনে। আয়নার সামনে তৈরি হতে থাকা মানুষটার পাশে যেয়ে দাঁড়ায় সে। তাকে দেখে ভ্রু উঁচায় আহমাদ।

- আপনি কি?

- কি মানে?

- আপনি কি?

- মানুষ! এসব জিজ্ঞেস করছো কেনো? ভার্সিটিতে যাবে না?

- যাবো না। আমি যা জিজ্ঞেস করি তাই বলুন। আমিও তো মানুষ। তাহলে আপনার আর আমার মধ্যে পার্থক্য কি?

- তুমি মেয়ে আমি ছেলে। এই তো!

- আপনার মুখ দেখুন আর আমার মুখ দেখুন। আপনার কপাল আছে, আমারও কপাল আছে। আপনার দুটো চোখ আছে আমারও আছে। আপনার নাক, মুখ, গাল আছে, আমারও আছে। তাহলে পার্থক্য কি থাকলো?

- কি আশ্চর্য! দেখলেই তো বোঝা যায়। আমার চুল ছোটো তোমার লম্বা..

- আমি শুধু মুখের কথা বলছি, মুখমণ্ডল। আপনার চেহারা আর আমার চেহারা পাশাপাশি রাখলে কি দিয়ে পার্থক্য করবেন? কিছুই নেই।

ভাবুক হয়ে পড়লো আহমাদ। মেয়েটা মাঝে মাঝে এমন কথার জালে ফাঁসিয়ে দেয়! চেহারায় হাত বোলাতে বোলাতে বলে,

- তোমার তো দাঁড়ি হয় না। আমার হয়..

- হলেই বা কি? আপনি তো কেঁটে কুঁটে সব ফেলে এসেছেন!

কথার ভাঁজে লুকিয়ে থাকা অভিমানের উত্তাপ টের পায় আহমাদ। ধরতে পারে এসব কথার মূল উদ্দেশ্য।

- দাঁড়িগুলো বড়ো হয়ে গেছিলো। তাই কাটলাম। আবার উঠে যাবে তো।

অভিমানী চোখে চেয়ে রইলো মাহিবা। না কোনো যুক্তি দেখালো না কোনো কথা বললো। চেয়েই রইলো। খানিক বাদে বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে চোখের দিকে আঙুল দেখিয়ে বললো,

- আপনার..আপনার ঐ চোখ দুটো আমার! বুঝেছেন? ঐ চোখ দিয়ে অন্য মেয়ের দিকে তাকালে আপনার খবর খারাপ আছে! বুঝেছেন?

বশীভূতের মতো মাথা নাড়ায় আহমাদ। আশ্চর্য! মেয়েটার হলো কি!

•• •• ••

শুক্রবার সকালে আয়িশার সাথে চুক্তিতে যায় মাহিবা।

- আয়িশু! আসো একটা খেলা করি।

- কি খেলা?

একট কাগজে নিজের নাম এবং আয়িশার নাম লেখে মাহিবা। দুইটা নামের নিচেই দ এবং ই লিখে দাগ দেয়। আয়িশাকে বলে,

- শোনো! দ তে হলো দুরূদ আর ই তে ইস্তেগফার। তুমি দশবার দুরূদ পড়লে দ এর নিচে একটা দাগ দিবে আবার দশবার ইস্তেগফার পড়লে ই এর নিচে একটা দাগ দিবে। এভাবে আমিও আমার নামের নিচে দিবো। মাগরিবের নামাজ পর্যন্ত এমন চলবে। তারপর নামাজ পড়ে দেখবো কার দাগ বেশি হলো। যার দাগ বেশি হবে সে জিতবে। তুমি জিতলে তুমি যা খেতে চাইবে সেটা তোমাকে খাওয়াবো আর আমি জিতলে আমিও এমন কিছু চাইবো সেটা তোমাকে দিতে হবে। ঠিকাছে?

উৎফুল্ল হয় আয়িশা। দারুন খেলা তো!

- ঠিকাছে ভাবিমণি!

শুরু হয়ে গেলো খেলা। ড্রয়িং রুমে সোফার উপরে কাগজ কলম রাখা হলো। আয়িশা সেখানে বসেই নিজের নামে নিচে দাগ দিয়ে ভরে ফেলার চেষ্টা করতে থাকলো। মাহিবা নারাজ। সে রান্না করবে আর আয়িশা এখানে বসে জিতে যাবে? হবে না। তাকে ঘরে পাঠিয়ে দিলো। বললো এসে এসে যেনো দাগ দিয়ে যায়। মাহিবাও সমান তালে পড়তে থাকলো। যখন যখন সে ভুলে যায় আয়িশার দৌড় দেওয়া দেখে মনে পড়ে যায়। সেও আবার পড়তে থাকে।

সালেহা বেগম, আফিয়া, আহমাদ সকলেই দুজনের এই দৌড়াদৌড়ি খেয়াল করলো। উৎসুক হয়ে কাগজখানাও দেখে গেলো। আফিয়া এক পাশে নিজের নামও লিখে দিলো। খুশি হলো মাহিবা। মেয়েটা আস্তে আস্তে আপন হয়ে যাচ্ছে। সকাল গড়াতে না গড়াতেই আহমাদকে ঠেলে গোছলে পাঠিয়ে দিলো। বের হলে তাকে তৈরি করার দায়িত্ব নিলো। সব শেষ করে আতর লাগানোর সময় নিজে নিজে বললো,

- এখন দাঁড়ি থাকলে কি সুন্দর লাগতো না? সাওয়াবও হতো। নিষ্ঠুর লোক! ঠাস করে কেঁ/টে ফেলে দিলো!

হেসে ফেললো আহমাদ। কাল থেকে মাহিবা একটু পরপর তার গালের দিকে তাকাচ্ছে। যেনো কি না কি হয়ে গেছে!

- দাঁড়ি থাকলে কতো সুবিধা জানেন? সবসময় সাওয়াব হতেই থাকবে। যদি সুন্নত পালনের নিয়ত থাকে আর কি! মরে গেলে আল্লাহকে দেখাতে পারবেন। বলতে পারবেন, "আল্লাহ, তোমার নবীর সুন্নত হিসেবে এই দাঁড়ি রেখেছিলাম। এই দাঁড়ির উসিলায় হলেও আমাকে মাফ করে দাও।" আরো সুবিধা আছে। একটু বুড়ো বুড়ো লাগবে। মানুষ আর নজর দিবে না। অনেক সুবিধা!

আর দাঁড়ালো না মাহিবা। দৌড়ে চলে গেলো। হাসতেই থাকলো আহমাদ। মেয়েটা পাগল!

গোছল শেষে নতুন পাট ভাঙ্গা একটা শাড়ি পড়লো মাহিবা। নিজে নিজে যতটা সাজা যায় সাজলো। দারুন দেখে একটা সুগন্ধি মাখলো। আয়িশা এসে দেখে বললো,

- ভাবিমণি! তোমাকে কি সুন্দর লাগছে! মা শা আল্লহ!

লাজুক হেসে মাহিবা জিজ্ঞেস করলো,

- তোমার দাদাভাইয়ের ভালো লাগবে তো?

- লাগবে না মানে? লাগতেই হবে! নাহলে বুঝতে হবে দাদাভাইয়ের সমস্যা আছে।

সহাস্যে আয়িশাকে কাছে টেনে নিলো মাহিবা।

- আসো তোমাকেও সাজিয়ে দেই।

- আজ কি ভাবিমণি?

- কই কিছু না তো!

- তাহলে সাজছো কেনো?

- এমনি। শুক্রবার তাই।

- হুহু! আজকে দাদাভাই বাসায় না এই জন্য! আমি বুঝিনা ভেবেছো?

- আহা! খুব বোঝা শিখেছেন আপনি!

- আজকে দাদাভাই অজ্ঞান হয়ে যাবে ভাবিমণি! বেশি সুন্দর জিনিস মানুষ নিতে পারে না বুঝেছো?

- আপনি বুঝলেই হবে ননদিনী।

কলিং বেলের শব্দে দরজার কাছে যায় আয়িশা। টুপি হাতে ঘরে ঢুকতেই থমকে যায় আহমাদ। বুকের ভেতর লুকিয়ে থাকা মাংসপিন্ড দামামা বাজিয়ে নিজের অস্তিত্বের জানান দিচ্ছে!

চলমান.