প্রাপ্তি (প্রথম অধ্যায়) — পর্ব ০১

লেখক: বিনতে ফিরোজ · বিভাগ: ইসলামিক · পর্ব ০১ · ৪৫ পর্বের মধ্যে ১

হরেক রকম ফুলের সুবাস মিলে মিশ্র একটা ঘ্রাণ তৈরি হয়েছে। সেই ঘ্রাণের আবহে পাল্টে গেছে পরিবেশের গম্ভীরতা। নাম না জানা আবহে তলিয়ে গেলেও অস্বস্তি গাঁয়ে কাঁটা হয়ে বিধছে মাহিবার। কয়েক ঘণ্টা পূর্বেই আহমাদের সাথে বৈবাহিক সম্পর্কে আবদ্ধ হয়েছে মাহিবা। লোকটার সাথে একবার নিয়মতান্ত্রিক দেখা হয়েছিলো। বাবা-চাচারা যথেষ্ট খোঁজ নিয়েছেন। ইতিবাচক ধারণা থাকলেও লোকটার সম্পর্কে বেশি জানাশোনা নেই মাহিবার। পারিবারিক বিয়েতে এটাই স্বাভাবিক। এতে অবশ্য মেয়েটার কোনো আক্ষেপ নেই। তবে মনের মাঝে একটা ভয়ভয় ভাব, অস্বস্তি, একটা শঙ্কা আছে বৈ কি! সাথে যুক্ত হয়েছে চিরচেনা আবাস ছেড়ে আসার কষ্ট। সবমিলিয়ে ভয়ঙ্কর রকম মিশ্র এক অনুভূতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে মেয়েটা। বিড়বিড় করে দুয়া পড়ে যাচ্ছে। হুট করে পড়তে থাকা দুয়ার দিকে খেয়াল হলো।

- লা ইলাহা ইল্লা আংতা সুবহানাকা ইন্নি কুংতু মিনাজ জোয়ালিমিন।

আচ্ছা সে এই দুয়া কেনো পড়ছে? সে কি এখন মাছের পেটে আছে নাকি! বুকভরা শঙ্কার মাঝেই মাহিবা ফিক করে হেসে ফেলে নিজ চিন্তায়। কক্ষের চারধারে চেয়ে দেখে। ছিমছাম গোছানো একটা ঘর। খাটের সাথেই একটা ড্রেসিং টেবিল, পাশে অ্যাটাচড বাথরুম। পশ্চিমে জানালার সাথে একটা টু সিটের সোফা। উত্তর দিকে একটা ওয়ার্ডরোব সাথে একটা রিডিং টেবিল। ব্যস! আহামরি না হলেও ঘরটা চট করে মাহিবার মনে ধরে যায়। আজ থেকে তারই ঘর কি না! মেয়েরা তাকে দিয়ে চলে যাওয়ার অনেকক্ষণ পার হয়েছে। ভারী শাড়ি পড়ে থাকার কারণে নিজের কাছেই অস্বস্তি লাগছে। কিন্তু কি আর করার! যার জন্য এত সাজ তাকে না দেখিয়েই তো আর খুলে ফেলা যাচ্ছে না! চিন্তার রাজ্যের নাবিক মাহিবার ধ্যান ভেঙে ঘরে প্রবেশ করে কেউ। নতুন ভুবন আবিষ্কারে মত্ত থাকা মেয়েটা চমকে ওঠে। কমে যাওয়া হৃৎস্পন্দনের গতি ফের বেড়ে যায়। ভয়ে হাত পা ঠাণ্ডা হয়ে আসে, গলা শুকিয়ে কাঠ হওয়ার জোগাড়। নিজের এত ভীত অবস্থায় মাহিবা নিজেই বিরক্ত। চেষ্টা করেও স্বাভাবিক থাকতে পারছে না। আশ্চর্য লোকটা কি বাঘ নাকি ভাল্লুক! এত ভয় পাওয়ার কি আছে! আহমাদ সামনে আসতেই অভ্যাসবশত নিজেকে লুকিয়ে ফেলার চেষ্টা করতেই খেয়াল হয় লোকটা তার জন্য বৈধ, যার কাছে কোনো আড়াল নেই, একটুও না। কথাটা মনে হতেই লজ্জায়,ভয়ে,অস্বস্তিতে আরো একটু গুটিয়ে যায় মাহিবা।

অপর দিকে আহমাদ তার রুমের এই অবস্থা দেখে বিরক্ত হয়ে খানিক। তার গোছানো ঘরটার কি দশা করেছে এরা! বিয়ে করার ইচ্ছে তার কোনোদিনই ছিলো না। তার কাছে বিয়ে মানেই একটা শেকলে বাধা পড়ে যাওয়া। নিজের নিত্য সাধারণ জীবনে উটকো ঝামেলা নিয়ে আসা যাকে নিজের ব্যক্তিগত কাজের কৈফিয়ত দিতে হবে, যেটা তার সবচেয়ে অপছন্দের। তার উপর মেয়েটা কেমন খ্যাত। না আছে পোশাক আশাকের শ্রী, না আছে কোনো স্মার্টনেস। বাইরের এই অবস্থা দেখেই মেয়েটার মুখ দেখার কোনো প্রয়োজন বোধ করেনি।তার সাথে বেশ অনেক মেয়েরই ওঠা বসা আছে কিন্তু কাউকে তো এরকম আনকালচার্ড দেখেনি। আর দেখলো যাকে তাকেই নাকি নিজের বউ বানাতে হলো। সিরিয়াসলি! মায়ের পছন্দেই আজ এই মেয়ে তার বউ। তার নিজের যে পছন্দের কেউ ছিলো সেরকমও না। ঐ যে কাউকে কৈফিয়ত দিতে তার ভালো লাগে না, এই জন্যই কোনো মেয়েকে নিজ জীবনে জড়ায়নি। বাবা ছাড়া এই মা-ই তাকে আর তার ছোট বোন দুটোকে কষ্ট করে মানুষ করে এসেছে। যেহেতু তার নিজের পছন্দের কেউ নেই আর মায়ের পছন্দ হয়েছে তাই সে হ্যাঁ বলে দিয়েছে। বাড়িতে এই দুইজন মিলেমিশে থাকলে তার জীবনে শান্তি আশা করা যায়।

কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে আস্তে করে মুখ উচু করে মানুষটাকে একটু দেখে নেয় মাহিবা। মনে মনে আওড়ায় "আমার বর"। ধীরে সুস্থে সালাম দেয়।

- আসসালামু আলাইকুম।

সালামের আওয়াজে ধ্যান ভাঙ্গে আহমাদের। তাকায় তার সদ্য বিবাহিতা স্ত্রীর দিকে। আর ওখানেই চোখ আটকে যায়। নিজের মনে নিজেই চমকে উঠে। আশ্চর্য মেয়েটা এতো সুন্দর! খ্যাত মেয়েরা এমন সুন্দর হয় নাকি? ওই চঞ্চল চোখ জোড়ায় তাকিয়ে যেনো যুগ পার করে দেওয়া যায়। মনটা একটু নরম হয়। ফার্স্ট ইম্প্রেশন ইতিবাচক হলো নাকি? কে জানে? সালামের জবাব নেয়।

- ওয়া আলাইকুমুস সালাম। নাম কি আপনার?

এরকম একটা প্রশ্নে অবাকের চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছায় মাহিবা। যাকে বিয়ে করলো তার নামটা পর্যন্ত জানেনা! আশ্চর্য! অতীব আশ্চর্য!

মাহিবার এমন চাহনিতে খানিক ইতস্তত করে আহমাদ বলে,

- ইয়ে আসলে খেয়াল নেই। ভুলে গেছি।

আহমাদের এমনভাবে কথা বলায় হাসি পায় মাহিবার। মুখ টিপে হেসে বলে,

- মাহিবা তারান্নুম।

মাহিবাকে এভাবে হাসতে দেখে হুট করেই কেমন অদ্ভুত অনুভুতি হয় আহমাদের। নাম শুনে বলে,

- মাহিবা। হুম সুন্দর নাম। আপনার সাথে আমার কিছু কথা আছে।

নতুন মানুষের মুখে নিজের নামটা যেনো ভারী সুন্দর শোনায় মাহিবার কানে। পরবর্তী কথায় নড়েচড়ে বলে,

-জী বলুন।

দরজা লক করে সোফায় আয়েশ করে বসে আহমাদ। সেন্টার টেবিল থেকে পানি খেয়ে গলাটা একটু ভিজিয়ে নেয়। অনেক কথা বলা লাগবে কি না!

-মন দিয়ে শুনবেন।মাঝখানে কোনো কথা না বললে খুশি হবো। আমার বলা শেষ হলে আপনি বলতে পারেন।

অতঃপর গলা ঝেড়ে বলা শুরু করে,

-আমি একটু ছন্নছাড়া গোছের মানুষ। একটু না বেশিই বলা চলে। ধরাবাঁধা নিয়ম আমার ভালো লাগে না। এজন্য বিয়ের প্রতিও কোনো আগ্রহ ছিল না। বলতে গেলে বিয়েটাই করতে চাইনি আমি।কিন্তু মায়ের কথা ফেলতে পারি নি। মা নাকি আপনাকে ভীষন পছন্দ করেছেন। অনেক দিন ধরেই আমার বিয়ের ব্যাপারে উনি চেষ্টা করে যাচ্ছিলেন। তবে আমার খামখেয়ালীপনার কারণে কোনো সম্বন্ধই বেশি দূর আগাতে পারেনি। কিন্তু আপনি মায়ের মনে কিভাবে এত জায়গা করে নিয়েছেন আল্লাহ্ই জানে। মা এবার আর আমাকে ছাড়লো না। যেহেতু ছোট থেকেই বাবাবিহীন জীবনে মা অনেক কষ্ট করেছেন আমাদের তিন ভাইবোনের জন্য তাই উনার জোরাজুরিতে এবার আর না করতে পারলাম না। বলতে পারেন মায়ের জন্যেই এই বিয়ে করা। আর আমার জীবনে বা আমার কোনো বিষয়ে কারো কাছে কোনো কৈফিয়ত দিতে আমি সবচেয়ে অপছন্দ করি। আশা করি আপনি আমার পার্সোনাল লাইফে হস্তক্ষেপ করবেন না। আমি আমার মত থাকবো, আপনি আপনার মত।

বিস্ময়ে হতবাক মাহিবা।চোখের কোণে জল চিকচিক করছে জীবনের এই পর্যায়ে সবচেয়ে বিশেষ মানুষের কাছ থেকে শোনা প্রথম বক্তব্যে। বাসর রাতে নিজের বরের কাছ থেকে এরকম কথা শুনতে হবে কল্পনাতেও সেটা আসেনি কখনো। কি বললো লোকটা? "আমার পার্সোনাল লাইফে হস্তক্ষেপ করবেন না"! মাহিবা কি তার পার্সোনাল লাইফের বাইরের কেউ? বাসর রাতের ভয়, জড়তা ছাপিয়ে এখন ভবিষ্যৎ নিয়ে ভয় হচ্ছে। এরকম লোকের সাথে কিভাবে জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত কিভাবে থাকবে যে কি না প্রথম দিনেই বলে, "আপনি আপনার মত থাকবেন আর আমি আমার মত"?

কোনো উত্তর না পেয়ে আহমাদ প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়,

-আপনি কি বুঝতে পেরেছেন?

সংবিৎ ফিরে পায় মাহিবা। জড়ানো কণ্ঠে বলে,

-জজী।

-আপনার কিছু বলার থাকলে বলতে পারেন।

হুট করে মাথায় দুটো প্রশ্ন আসে মাহিবার। চেপে না রেখে জিজ্ঞেস করে ফেলে,

-আপনার কি আমাকে পছন্দ হয় নি? আপনি কি এই বিয়ে মানেন না?

মাহিবাকে যে আহমাদের এখন পছন্দ হচ্ছে না তা না। এখন কি? মেয়েটাকে তো সে দেখেইনি! পোশাক আশাকের অবস্থা দেখে সেদিন আর চোখ তুলে তাকানোর ইচ্ছায় জাগেনি। কিন্তু এই মুহূর্তে, প্রথম সাক্ষাতে এই মেয়েটাকে দেখে পূর্বের ধারণা একটু হলেও পাল্টায় সে। মেয়েটার সম্পর্কে যে ধারণা সে ইতঃপূর্বে করেছে সেটা কী মুখের উপর বলে দেওয়া যায় নাকি? আর বিয়ে যখন করেই নিয়েছে মানবেনা কেনো?

-না সেরকম কিছু না। বিয়ে করার মনমানসিকতা আমার ছিল না। কিন্তু যখন বিয়েটা যখন হয়েই গিয়েছে মানবো না কেনো? অবশ্যই মানি।

আরেকটা প্রশ্ন মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে মাহিবার। বলবে কি না ইতঃস্তত করলে আহমাদ বিষয়টা খেয়াল করে। বলে,

- আর কোনো প্রশ্ন থাকলে করতে পারেন।

মাহিবা মিনমিন করে জিজ্ঞেস করে,

-আপনার জীবনে কি কেউ আছে?

কথার ধরন দেখে হাসি পায় আহমাদের। প্রশ্ন শুনে ইঙ্গিত বুঝতে পেরে বলে,

- না। ঐ যে বললাম কৈফিয়ত দিতে ভালো লাগে না তাই কাউকে জীবনে জড়াইনি।

স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে মাহিবা। একটু থেমে বলে,

- ওহ আচ্ছা।

ভারী পাথর যেনো বুক থেকে সরে যায়। যাক ঝামেলা বেশিদূর গড়ায়নি। বেশ কিছুক্ষণ ভেবেচিন্তে মাহিবা প্রস্তাব দেয়,

- তাহলে কি আমরা বন্ধু হতে পারি?

নিজের ধারণা করা খ্যাত নামক মেয়েটির থেকে এমন কথায় বিস্মিত আহমাদ। বিস্ময়ে নিয়েই বলে,

- মানে?

- আপনি তো বিয়ে করতে চাইতেন না নিজের জীবন কারো সাথে বেধে ফেলতে হবে বলে। বিয়ে করলেও আপনার কথা শুনে মনে হচ্ছে না আপনি আমাকে নিজের জীবনসঙ্গী ভাবতে প্রস্তুত। কিন্তু জীবনের সাথে জীবন যখন এক সুতোয় গেঁথেই গেছে তাহলে আমাদের মাঝে একটা সহজ সম্পর্ক থাকা দরকার। তাই বলছি আমরা কি বন্ধু হতে পারি?

মেয়েটার কথা বলার ভঙ্গিটা দারুন লাগলো আহমাদের। কথাগুলোও সুন্দর। "জীবনের সাথে জীবন যখন এক সুতোয় গেঁথেই গেছে" কথাটা কি একটু বেশি সুন্দর শোনালো না?

চিন্তার রাজ্য থেকে বেড়িয়ে সে উত্তর দেয়,

-হ্যাঁ, সেটা হওয়াই যায়।

- ধন্যবাদ।

-তাহলে ফ্রেশ হয়ে এসে শুয়ে পড়ুন। আজকে সারাদিন নিশ্চয়ই আপনার উপর দিয়ে ধকল গেছে অনেক?

প্রশ্ন শুনে মাহিবা ভাবে, "লোকটা খারাপ না।চিন্তাধারা একটু উল্টাপাল্টা আর কি।" সম্মতি দিয়ে লাগেজ থেকে জামাকাপড় নিয়ে ফ্রেশ হতে যায়। আহমাদ চলে যায় অন্য ওয়াশরুমে ফ্রেশ হতে। পথের ভিন্নতা কি এখানেই শুরু হলো?

চলমান.

(বার্তা: যে গল্পটা লিখবো বলে ভাবছিলাম এটা সেটা নয়। ওই গল্পটা লিখতে হলে আমাকে আরো একটু পড়তে হবে, আরেকটু গুছিয়ে নিতে হবে। ততদিনে অন্য একটা চলতে থাকুক?

একদিন পরপর এটার পর্ব আসবে ইনশাআল্লহ্।)