প্রাপ্তি (প্রথম অধ্যায়) — পর্ব ০৩
লেখক: বিনতে ফিরোজ · বিভাগ: ইসলামিক · পর্ব ০৩ · ৪৫ পর্বের মধ্যে ৩
বাইশটা বছর যেই বাবা মায়ের সান্নিধ্যে বড় হয়েছে সেই বাবা মাকে ছেড়ে আসার কষ্ট, সন্তানতুল্য ছোট ভাইটাকে ছেড়ে আসার কষ্ট, নতুন পরিবেশের ভয় এবং যার হাত ধরে এই অজানায় পাড়ি জমালো তাকেই স্বামীরূপে না পাওয়ার কষ্ট মাহিবাকে একাকার করে দিচ্ছে। আহমাদের কথায় ভবিষ্যৎ ভাবতে বাধ্য হচ্ছে মাহিবা। এই রাতটা নিয়ে তার অনেক স্বপ্ন ছিলো, ভয় ছিলো। কিন্তু যেটার স্বপ্ন ছিলো, যার জন্য ভয় ছিলো তেমন কিছুই হলো না। উল্টো ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কায় পড়ে গেলো মেয়েটা। সারাজীবন ছেলেদের থেকে দূরত্ব তৈরি করে আসা মাহিবা ভাবছিল স্বামী নামক পুরুষটার সাথে সে সহজ হবে কিভাবে? কিন্তু এখন... শঙ্কা মিশ্রিত দীর্ঘশ্বাস ফেলে মেয়েটা। পরক্ষণেই ভাবে,"না, আমাকে হতাশ হওয়া যাবে না। মানুষটা তো খারাপ না। তার মাঝে মানবিকতা আছে।একজন মানুষের চিন্তা ভাবনা ভিন্ন হতেই পারে। কিন্তু বিয়ে নিয়ে তার এই বিরক্তিকে আমি শান্তিতে রুপান্তর করবো। আল্লাহ যখন তাকে আমার জীবনে পাঠিয়েছেন তার মানে সে আমারই। আমি পারবো ইনশাআল্লাহ। তুমি সহায় হয়ো আল্লাহ।" ভাবনার রাজ্যে ঘুরতে ঘুরতেই ঘুম নামে মেয়েটার দু'চোখে।
______________
অ্যালার্মের শব্দে ঘুম হালকা হয়ে আসে আহমাদের।এদিক ওদিক হাত বাড়িয়ে অ্যালার্ম বন্ধ করে সে। আড়মোড়া ভাঙতে যেয়ে হাত পড়ে নরম কিছুর উপরে। কিসের উপর হাত দিয়েছে চোখ বন্ধ করেই ভাবতে থাকে আহমাদ। আস্তে ধীরে নিদ্রা মগ্ন চোখ খুলে দেখে এক ঘুমন্ত নারীকে। যার বাহুর উপর বিচরণ করছিলো তার হাত। জীবনে প্রথম নিজ বিছানায় অন্য নারীকে দেখে ভ্যাবাচ্যাকা খেলেও পরে মনে পড়ে এটা তার সদ্য বিয়ে করা বউ। বউ? তার নিজের বউ? ভাবতেই কেমন একটু ভালো লাগলো না? নিজের খেয়ালে ডুবে থেকেই আহমাদ তার হাত মাহিবার বাহু থেকে মুখের দিকে নিয়ে যায়। ঘুমানোর সময় মেয়েটা হালকা গোলাপি রঙের একটা ওড়না পড়ে ঘুমিয়েছে। কপালের দিকের কিছু ছোট ছোট চুল চোখের দিকে এসে এলোমেলো হয়ে আছে। সেই চুলগুলোই খুব যত্ন নিয়ে সরিয়ে দেয় আহমাদ। দেখতে থাকে তার ঘুমন্ত বউকে। মেয়েটাকে দেখলে তার প্রথমেই মনে হয়, "মেয়েটা একদম বাচ্চা।" ঘুমাচ্ছেও কেমন বাচ্চাদের মত গুটিশুটি করে। আহমাদের হাতের ছোঁয়ায় একটু নড়েচড়ে আবার ঘুমিয়ে পড়ে মাহিবা। মাহিবা নড়তেই সংবিৎ ফিরে পায় আহমাদ। সে এতক্ষণ একটা মেয়ের দিকে মন্ত্রমুগ্ধের মত তাকিয়ে ছিলো। শুধু তাই নয়, মুখেও হাত দিয়েছিলো। ভাবতেই নিজের প্রতি নিজেই বিরক্ত হয় আহমাদ। কাল রাত থেকেই মেয়েটাকে দেখলে সে সব বিরক্তিকর কাজ করে যাচ্ছে। অন্য মেয়েদের যেখানে বিরক্ত লাগতো সেখানে এই মেয়েকে দেখলে কেমন অন্যরকম অনুভূতি তৈরি হচ্ছে তার হৃদকোঠরে। সেটা কি শুধুই তার বউ বলে? আর ভাবতে পারে না আহমাদ। ফজর নামাজ পড়ার উদ্দেশ্যে উঠে পড়ে। ওজু করে এসে দেখে মাহিবা এখনও ঘুমিয়ে। কাল রাতে দেখেছিল মেয়েটা নামাজ পড়ে। বেশভূষা দেখেও তাই মনে হয়েছে। তাই ডাকতে যায় তাকে। মাহিবার শিয়রে দাড়িয়ে আস্তে আস্তে ডাকে,
-মাহিবা উঠুন। ফজরের আজান দিয়েছে। নামাজ পড়ে নিন।
-মাহিবা, মাহিবা উঠুন।
ঘুম ঘুম চোখে পিটপিট করে তাকায় মাহিবা। আহমাদ কে তার এত কাছে দেখে তড়াক করে লাফ দিয়ে উঠে বসে। আহমাদ মাহিবাকে এভাব উঠতে দেখ বলে
-আরে আস্তে! নামাজ পড়ার জন্য ডাকলাম।
কথাটা শুনতেই অদ্ভুত এক শান্তি খেলে মাহিবার মনে। তার ব্যক্তিগত পুরুষ তাকে ডাকছে নামাজ পড়ার জন্য।"লোকটা কত্তো ভালো।" ভাবতেই ঠোঁটের কোণে ভেসে উঠে নির্মল এক হাসির রেখা। যেই হাসি দেখে বুকে কাপন ধরে আহমাদের। দ্রুত চোখ সরিয়ে জায়নামাজ বিছিয়ে নেয় সে। আহমাদ কে বাসায় নামাজ পড়তে দেখে মাহিবা জিজ্ঞেস করে,
-বাসায় নামাজ পড়বেন?
-হ্যাঁ।
-তাহলে একটু দাড়ান, আমি অজুটা করে আসি। একসাথে পড়বো নামাজ।
বলেই ছুটে যায় ওয়াশরুমে।
এই মুহূর্তে এসে আহমাদ বুঝতে পারে মেয়েটা চঞ্চল। স্মিত হেসে মাহিবার জন্যেও একটা জায়নামাজ বিছিয়ে রাখে পেছনে। অজু করে এসে নিজের জন্যে জায়নামাজ বিছিয়ে রাখা দেখে প্রশান্তির হাসি হাসে মাহিবা। হিজাব পড়ে নামাজের জন্য দাড়ালে আহমাদ বলে,
-মুখ মুছবেন না?
হাত মুখ ধুয়ে এসে মুছতে মাহিবার ভালো লাগে না। এই ভেজা হাত মুখে বাতাস লাগলে যে ঠান্ডা ঠান্ডা লাগে এটা সে উপভোগ করে।তাই বলে,
-সমস্যা নেই। এমনিই ভালো লাগে আমার।
নতুন জীবনের নতুন সকালে কাতারবন্দী হয়ে নামাজ আদায় করে এক যুগল।
নামাজ শেষে মাহিবা নিজের আনা কুরআন থেকে সূরা আর রহমান তিলাওয়াত শুরু করে। অপর দিকে ক্লান্ত আহমাদ আবার ঘুমানোর প্রস্তুতিতে বিছানায় শোয়া মাত্রই শুনতে পায় মধুর কণ্ঠে তিলাওয়াত। বিস্ময়ে নিয়ে চেয়ে থাকে মাহিবার পানে। অনেক বেশিই বিস্মিত হচ্ছে সে আজকাল। প্রায় পনেরো মিনিট পর মাহিবা যখন তিলাওয়াত থামায় সংবিৎ ফিরে পায় আহমাদ।মনে মনে বলে, "মা শা আল্লাহ অসাধারণ"। নড়েচড়ে বলে,
-এই কুরআনটা কার?
মাহিবা ভেবেছিল আহমাদ হয়তো ঘুমিয়ে পড়েছে। আহমাদের কণ্ঠে পেছনে তাকায়। দেখে সে সম্পুর্ণ জাগ্রত। উত্তর দেয়,
- আমার। আমি বাসা থেকে নিয়ে এসেছি।
- আনার কি দরকার ছিলো? সবার বাসায়ই তো কুরআন থাকে।
- না সেজন্য না। আসলে আমি যখন প্রথম কুরআন ধরি আব্বু এইটা কিনে দিয়েছিলো।আমার জীবনের প্রথম কুরআন এটা তারপর তো কতই রং বেরংয়ের কুরআন কিনলাম কিন্তু এটার মায়া ছাড়তে পারি না। তাই নিয়ে এসেছি।আপনি কি রাগ করেছেন?
মাহিবা শেষ প্রশ্নটা বেশ ভয়ে ভয়ে করলো। কেননা আহমাদ তার শ্বশুর বাড়ি থেকে কিচ্ছু নেয়নি। মহিবার বাবা উপহারের কতা বললেও সরাসরি সে নাকচ করে দিয়েছে।তার বক্তব্য, মেয়ে দিয়েছে এটাই অনেক আর আমার যা আছে তাই দেখে যদি আসতে চায় তাহলে আসবে নাহলে না। উপহার নামের একটা কিচ্ছুও আমি নিবো না।
আহমাদ শান্ত কণ্ঠে উত্তর দেয়,
-না, রাগ করার কি আছে।
আহমাদের শান্ত কণ্ঠে যেনো একটু আশকারা পেলো মাহিবা।
-আচ্ছা একটা কথা বলি?
-বলুন।
- আমি বেশ কিছু বই কিনেছিলাম কলেজে থাকাকালীন সময় থেকে। বেশিরভাগই আমার জমানো টাকায় কেনা। আজকে তো আমাদের ঐ বাসায় যাওয়ার কথা। আসার সময় কি আমি ওই বইগুলো আমার সাথে আনতে পারি?
কোনো বাচ্চা যেভাবে কিছুর বায়না ধরে মাহিবার অনুরোধ আহমাদের কাছে তেমনই লাগলো। এমনভাবে বললে কি কেউ না করতে পারে? আহমাদও পারলো না।নরম কণ্ঠে বললো,
-আনতে পারেন।
মাহিবা যেনো আকাশের চাঁদ হাতে পেলো। উচ্ছসিত কণ্ঠে বলল,
-জাঝাকাল্লাহু খইর।
আহমাদ ভ্রু কুচকে বললো,
-মানে?
হাসিমুখেই মাহিবা উত্তর দেয়,
- এর মানে হলো আল্লাহ আপনাকে উত্তম বিনিময় দান করুক।এইযে আপনি আপনার ঘরে আমার বইগুলোকে জায়গা দিবেন তার বিনিময়ে আল্লাহ আপনাকে উত্তম বিনিময় দেন এই দুয়া করলাম। দুয়াটা সুন্দর না?
বই আনার অনুমতি পেয়ে মাহিবার যেনো উচ্ছাসের শেষ নেই। আনন্দটা খেয়াল করলো আহমাদ। দুয়াটাও ভালো লাগলো তার কাছে। অনেক সময় এমন হয় কারো কোনো উপকারে ধন্যবাদ বলতে আমাদের ভালো লাগে না। কারণ তার উপকারটাই এমন। এর বিনিময়ে যেনো কিছু দিতে পারলে আমরা শান্তি পাই। সেক্ষেত্রে এই দুয়ার থেকে উত্তম আর কি হতে পারে যে আমি তার জন্য আল্লাহর কাছে উত্তম বিনিময় চেয়ে দিলাম? আহমাদেরও ভালো লাগলো বিষয়টা। আস্তে বললো,
-সুন্দর।
মাহিবা খেয়াল করলো তার বরটা বেশি কথা বলেনা। কাল রাত থেকেই দেখলো। এখন মনে হচ্ছে মানুষটা ক্লান্ত বেশ। কেমন আস্তে আস্তে কথা বলছে। নরম কণ্ঠে সে জিজ্ঞেস করে,
-আপনার কি ক্লান্ত লাগছে? এক কাপ চা এনে দেই?
অনাকাঙ্ক্ষিত মানুষের থেকে কাঙ্ক্ষিত কথা শুনে চমকায় আহমাদ। থমকায়ও খানিক। মেয়েটা তাকে বুঝে ফেলছে কিভাবে? কাল রাত থেকেই দেখছে। চা খেতে মন চাইলেও ভদ্রতার খাতিরে বলে,
- আপনি তো এখানে নতুন। আপনার কষ্ট হবে। থাক সমস্যা নেই।একটু ঘুমালেই ঠিক হয়ে যাবে।
লোকটা তার কষ্টের কথা ভাবছে! কথাটা মাহিবার কাছে এতই ভালো লাগলো মনে হলো যেনো এটুকু কথার বিনিময়ে যেকোনো কষ্ট সে হাসিমুখে বরণ করে নিতে প্রস্তুত। আবারো হাসি ফুটলো তার চঞ্চল কায়ায়। চঞ্চল কণ্ঠেই বললো,
- নতুন তো কি হয়েছে। আস্তে আস্তে চিনে যাবো ইনশাআল্লাহ। এখন থেকেই নাহয় চেনার মিশন শুরু করি।বাইরে কেউ না কেউ তো আছে। উনাদের কাছে শুনে নিবো।আমার একটুও কষ্ট হবে না। আপনি পাঁচ মিনিট অপেক্ষা করুন। ঘুমাবেন না কিন্তু হ্যাঁ? আমি যাচ্ছি।
কথা শেষেই উচ্ছল পায়ে ঘর থেকে বের হলো মেয়েটা। আহমাদ খেয়াল করলো মাহিবা যখন বললো "আমার একটুও কষ্ট হবে না" তখন যেনো মেয়েটার মুখে সর্বসুখী ভাব ছিলো। আশ্চর্য! ওর কষ্টের কথা বললো বলেই এত খুশি? মনে হলো এর বিনিময়ে সে এভারেস্টও জয় করতে পারে!
চলমান.