প্রাপ্তি (প্রথম অধ্যায়) — পর্ব ১৫
লেখক: বিনতে ফিরোজ · বিভাগ: ইসলামিক · পর্ব ১৫ · ৪৫ পর্বের মধ্যে ১৫
কাজের সাগরে ডুব দিয়েছে আহমাদ। কারণটাও মাহিবার অজানা নয়। লোকটা নাকি নতুন কোনো প্রজেক্ট হাতে পেয়েছে আর এটা নিজেকে তুলে ধরার সুযোগ। সফল হলে সম্মানের সাথে বেতনের অঙ্কও বাড়বে বলে আশা করা যায়। সেই যে সন্ধ্যায় বাসায় এলো আর এখন বাজে রাত সাড়ে আটটা। বান্দা হুশ জ্ঞান ভুলে ফাইলের পর ফাইল দেখে চলেছে। মাহিবা বিরস মুখে কতক্ষণ বইয়ের পাতা উল্টায়। হিসাব বিজ্ঞানের কিছু বিষয় এতো জটিল লাগে মেয়েটার কাছে! উহ! এসব বিষয় সমাধান করার জন্য দরকার একটা শান্ত পরিশীলিত মন, যেটা এখন তার নেই। তাই খুব সুন্দর করে বইটা বন্ধ করে উঠে পড়ে সে। আহমাদের দিকে তাকিয়ে দেখে সে ঘাড় এখনো নিচুই করে রেখেছে।
- এই ঘাড় আর সোজা হলে হয়।
বিড়বিড় করে শাশুড়ির ঘরের দিকে চলে যায়। যেয়ে দেখে সালেহা বেগম আয়িশাকে পড়াচ্ছেন। আগ্রহী কণ্ঠে বলে,
- মা, আপনি রেস্ট নিন। আমি আয়িশাকে পড়াচ্ছি।
সরু চোখে তাকিয়ে সালেহা বেগম বলেন,
- কেনো? তোর পড়াশোনা নেই? যা পড়তে বস! আরেকটু পর খাবার দিবো।
উদ্বেলিত আয়িশা নিভে যায়। ভাবিমণির কাছে পড়া হলো না!
মুখ কালো করে আবার নিজের ঘরে চলে যায় মাহিবা। যাওয়ার আগে আফিয়ার ঘরের খোলা দরজায় উকি দেয়। এই মেয়েও পড়ছে। ধুর! ভাল্লাগেনা!
বারান্দায় যেয়ে কতক্ষণ এদিক ওদিক হাঁটাহাঁটি করে মেয়েটা। আবার ঘরে উকি দেয়। আবার কতক্ষণ হাঁটে। মনস্থির করে ঘরে ঢুকে আহমাদের পাশের সোফায় বসে। ঘাড় উচিয়ে দেখে নিশ্চল মানবের কাজকর্ম। গলা খাঁকারি দিয়ে আহমাদের মনোযোগ আকর্ষণের চেষ্টা করে। নাহ্! কোনো নড়চড় নেই লোকটার। শেষমেষ না পেরে মাহিবা বলে,
- শুনছেন?
- এইযে?
আশ্চর্য? কলম গালে লাগিয়ে ফাইলের দিকে তাকিয়েই আছে লোকটা। এক আঙ্গুল দিয়ে আহমাদের বাহুতে টোকা দিতেই আহমাদ ফিরে তাকায়। তার তাকানোর ধরণ দেখে খেই হারায় মাহিবা। বিব্রত হেসে বলে,
- ভালো আছেন?
ভ্রু কুঁচকায় আহমাদ। কোনো উত্তর করে না। ঠোঁট ভিজিয়ে মাহিবা আবার বলে,
- আপনার কাজ কখন শেষ হবে?
- আগামী সাত দিনে হবে না। ডিল কনফার্ম হলে তারপর শেষ হবে।
বহুক্ষণ পর আহমাদের শান্ত গম্ভীর কন্ঠটা যেনো মাহিবার বুকে ধাক্কা দেয়। ভারী শ্বাস টেনে মাহিবা বলে,
- কালকে আমাকে ভার্সিটিতে নিয়ে যাবেন?
কিছুক্ষণ ভেবে আহমাদ বলে,
- সাড়ে আটটার দিকে বের হবো। তৈরী থাকবেন।
আশান্বিত চোখে চেয়ে থাকা মাহিবার চোখের তারায় খুশির ঢেউ ওঠে। প্রফুল্ল কণ্ঠে উত্তর দেয়।
- ঠিকাছে।
আনন্দচিত্তে ব্যাগ গোছানো শুরু করে মাহিবা। তখনই আহমাদের ফোনে ইফাদের কল আসে। রিসিভ করতেই ছেলেটা জানায় আগামীকাল কিছু বন্ধুদের একটা ছোটো আড্ডা বসবে, আহমাদ যেনো উপস্থিত থাকে। বেশ বিরক্তির সাথে আহমাদ বলে,
- আমার হাতে যে এখন প্রজেক্টের কাজ তুই জানিস না? আমারে টানিস ক্যান আবার?
- তোরে ছাড়া আমার ভাল্লাগেনা দোস্ত! তুই না থাকলে ওখানে গেলে আমার নিজের এতিম এতিম লাগবে।
- উফ!
ফোনে বিরক্তি প্রকাশ করতে থাকা আহমাদের দিকে একবার তাকায় মাহিবা। লোকটা সবেতেই এতো বিরক্ত হয় কেনো!
- এমন করিস ক্যান? এক ঘন্টা থেকেই চলে যাইস।
- আচ্ছা। আসবো।
ফোন রাখতে উদ্যত হতেই ইফাদ ডাক দেয়।
- দোস্ত! দোস্ত! দোস্ত!
- কি? বল।
- কালকে যেনো আবার আফিয়ারে নিয়ে আসিস না। অতি উৎসাহী হয়ে ভাবিরেও আনিস না।
- আফিয়া যাবে কেন?
- ও তো আসবে না। তুইই তো নিয়ে আসছিলি আগেরবার। ঐ শালা শিহাবের নজর ভালো না। আর তুই শালা বলদ! নিজের বোনরে কোথায় নেওয়া যাবে কোথায় যাবে না এইটাই বুঝিস না। রাখ শালা!
ধমক দিয়ে কল কেটে দেয় ইফাদ। এদিকে আহমাদ তার ধমক না গুনলেও কথাগুলো তার কানে বাজে। তার বোনের দিকে কে কেমন নজরে তাকাচ্ছে এটা ইফাদ পর্যন্ত খেয়াল করেছে! তাহলে সে এতদিনেও বোঝেনি কেন! সেই ক্ষণে গতদিনের ঘটনা মস্তিষ্কে হানা দেয়। ডুবে যায় গভীর ভাবনায়।
- মাহিবা!
- হুঁ!
ঘাড় ঘুরিয়ে ছেলেটার দিকে তাকায় মাহিবা। আহমাদ এখনও হাতের ফোনের দিকে তাকিয়ে আছে।
- আপনি কি আফিয়ার সাথে একটু কথা বলবেন?
- কোন বিষয়ে?
- কালকের বিষয়টা নিয়ে...
ইঙ্গিত বুঝতে পারে মাহিবা। চোখ জ্বলজ্বল করে ওঠে। লোকটা আসলেই এগুলো বলছে!
- আপনি অনুমতি দিকে অবশ্যই বলবো!
- ন্যায্য বিষয়ে আমার অনুমতি দরকার নেই মাহিবা। যেটা আমি বুঝিনি সেটা আপনি বুঝেছেন। আমার বোনটাকে একটু বোঝাবেন প্লিজ!
আহমাদের অনুরোধ মাহিবার হৃদয়ে আঘাত হানে। স্পষ্ট বাস্তব বুঝতে পারে এতদিনের কাজে লোকটা অনুশোচনায় ভুগছে। এই অনুশোচনা কমাতে চায় না মাহিবা। কিছু কষ্টের অনুভুতি একটা সুন্দর সমাপ্তি আনে। তাহলে সেই কষ্টটুকু সহ্য করে নেওয়াই যায়!
ভরসা মাখা কণ্ঠে মেয়েটা বলে,
- আমি যথাসাধ্য চেষ্টা করবো। আপনি টেনশন করবেন না।
মলিন হাসে আহমাদ। আফিয়াকে বেশ ভালো করেই চেনা আছে তার। মেয়েটা কতটা মেনে নেবে সে জানে না। কিন্তু মাহিবাকে যদি অসম্মান করে কথা বলে?
- ও তো আপনার বোনের মতোই তাই না? ওর কথায় কষ্ট পাবেন না প্লিজ!
বোনের বিষয় উদয় হওয়ায় লোকটার কোমল দিক প্রকাশ পাচ্ছে। মাহিবা বেশ উপভোগ করে ব্যাপারটা। হেসে সম্মতি দেয়। সালেহা বেগমের কণ্ঠে ভাবনা থেকে বের হয় দুজন।
- মাহিবা আসবো?
একটা সূক্ষ্ম পরিবর্তন খেয়াল করে আহমাদ। মা তার ঘরে অনুমতি নিয়ে ঢুকছে এবং অনুমতি মাহিবার থাকে চাইছে। বাহ! বউ শাশুড়ির সম্পর্কের উন্নতির ধারা চলমান আছে। গুড!
এগিয়ে যায় মাহিবা। পর্দা সরিয়ে হাসিমুখে বলে,
- আসুন মা!
আগ বাড়িয়ে বলেনা এ ঘরে ঢুকতে আপনার কোনো অনুমতি লাগবে না।
নিজের পাশ দেখিয়ে আহমাদ বলে,
- বসো মা!
সালেহ বেগম বসেন। এক এক করে দুজনের মুখের দিকে তাকিয়ে বলেন,
- শেফালী আপা দাওয়াত দিয়েছে। নতুন বউকে নিয়ে যেনো সবাই যাই। কাল কি যেতে পারবি?
শেষ প্রশ্নটা আহমাদের দিকে তাকিয়ে করেন।
- মাত্র বিয়ের ছুটি কাটালাম মা। প্রায় এক সপ্তাহ! এখনই আবার ছুটি নেওয়া যাচ্ছে না।
- তাহলে কি করবো?
- অন্য সময় যাবো বলে দাও।
- তোর অন্য সময় আমার জানা আছে। বিয়ের পর এমন কতো দাওয়াত থাকে! সেগুলোতে বছরখানেক পরে যায় নাকি!
- তাহলে তোমরা যাও। আমি তো আর নতুন কেউ না!
- তোর যতো এলোমেলো কথা! এই মাহিবা কি করি বল তো?
মা ছেলের কথা বেশ মনোযোগ দিয়ে শুনছিলো মাহিবা। মাঝে কথা বলা তার স্বভাবে নেই। বেশ ভেবে চিন্তে বলে,
- দাওয়াত কখন দিলো মা?
- এইমাত্রই ফোন দিলো।
- মা, আমরা বরং পরশু যাই। আমরা সবাই নাহয় দুপুরের পরে চলে যাবো। ততক্ষণে আমার ক্লাস শেষ হয়ে যাবে, আয়িশা আফিয়াও বাড়িতে চলে আসবে। আর উনি নাহয় অফিস শেষ করে সন্ধ্যায় গেলেন। তখন খেয়ে আমরা রাতে চলে আসবো? কি বলেন মা?
- দারুন হয়! কিন্তু কাল গেলে কি হবে?
- উনার মনে হয় কালকে অফিস শেষে কাজ আছে?
আহমাদের দিকে তাকিয়ে এই কথা বলতেই ছেলেটা বেশ চমকায়। সবদিক কি দারুন হ্যান্ডেল করে ফেললো মেয়েটা! বেশ তো!
- আচ্ছা তাহলে আমি আপাকে বলে দিলাম।
ভদ্রমহিলা বেশ খুশি। তার সংসারের দায়ভার নেওয়ার যোগ্য মানুষ চলে এসেছে। এখন উনি নিশ্চিন্তে অবসরে যেতে পারবেন!
•• •• ••
ভার্সিটির শান্ত চত্বরে মাহিবাকে নামিয়ে দেয় আহমাদ। সতর্কবাণী স্বরূপ বলে দেয়,
- এখানেই কোথাও বসে থাকুন। কোনো ফ্রেন্ড না আসা পর্যন্ত ক্লাসে যাবেন না।
- ঠিকাছে।
বাধ্য মেয়ের মতো ঘাড় নেড়ে সম্মতি দেয় মাহিবা।
- ক্লাস শেষ হবে কয়টায়?
- এগারোটার দিকে।
- আচ্ছা। রিকশা নিয়ে চলে যাবেন।
বলেই বেশ কিছু টাকা দিয়ে দেয় মাহিবার হাতে। মাহিবা দেখে দায়িত্বের পরিবর্তন। উহু! ঠিক দায়িত্ব না, কাঁধের পরিবর্তন। ঠিক এই কাজটাই তো এতদিন বাবা করতো!
ধোঁয়া উড়ানো বাইকের পানে চেয়ে থাকে মাহিবা।
•• •• ••
ক্লাস শেষে রিকশার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছে মাহিবা। পেছনে তাকিয়ে বিরক্তির শ্বাস ফেলে। ছেলেটা পিছু ছাড়ছেই না। উফ! তক্ষুনি ফোনে কল আসে। কলদাতার নাম দেখতেই ঠোঁটের কোণে হাসি ভীড়ে। যদিও এখানে হাসির মতো কিছু নেই!
- আসসালামু আলাইকুম!
- ওয়া আলাইকুমুস সালাম। ক্লাস শেষ?
- জি।
- কোথায়?
- রিকশার জন্য দাঁড়িয়ে আছি।
- অপেক্ষা করুন। আমি আশেপাশেই আছি।
কল কাটতেই নিজের প্রতি আহমাদের অপ্রকাশিত আগ্রহ টের পায় মাহিবা। লোকটা কি ধীরে ধীরে তার প্রতি দূর্বল হচ্ছে?
আহমাদ বাইকসহ সামনে দাঁড়াতেই ধ্যান ভঙ্গ হয় মেয়েটার।
- এতো তাড়াতাড়ি! কোথায় ছিলেন?
বিস্মিত কণ্ঠের বিপরীতে স্বাভাবিক থাকে আহমাদ।
- পাশেই। একটা কাজের জন্য অফিস থেকে বের হতে হয়েছে। উঠুন। না! দাঁড়ান! হেলমেট পড়ে নিন।
হেলমেট হাতে নিতেই এতক্ষণ পিছু নেওয়া ছেলেটা ডেকে ওঠে।
- মাহিবা! দাঁড়াও!
ভেসে আসা কণ্ঠের দিকে তাকায় আহমাদ। সরু চোখে দেখত থাকে ছেলেটাকে। মাহিবাকে ডাকছে কেনো ছেলেটা? ফের মাহিবার দিকে তাকাতেই দেখে অপ্রস্তুত মেয়েটাকে।
- আমার সাথে কথা বললে সমস্যা! আরেক লোকের সাথে এক বাইকে গেলে কোনো সমস্যা নেই! বাহ!
দুজনের দিকে চেয়ে বেশ ভারী গলায় আহমাদ বলে,
- কি সমস্যা?
- কে হয়?
মাহিবার দিকে ভ্রু নাচিয়ে জিজ্ঞেস করে ছেলেটা। মাহিবা এক দুঃসাহসী কাজ করে ফেলে। এই ছেলে পিছুই ছাড়ছে না। বললেও বিশ্বাস করে না। ভালো হয়েছে আহমাদ এসেছে।
আহমাদের হাত ধরে উৎফুল্ল কণ্ঠে বলে,
- আমার না হওয়া বাচ্চার বাবা!
চকিতে তাকায় আহমাদ। হেলমেটের আড়ালে রয়ে যায় তার হতভম্ব চোখ জোড়া।
ছেলেটাও বেশ ঝটকা খেয়েছে বোঝা যাচ্ছে।
- তুমি সত্যিই বিবাহিতা?
- জি।
- কিন্তু তোমার প্রোফাইলে যে লেখা সিঙ্গেল?
- আপডেট করা হয়নি।
বাইকে উঠতেই আহমাদ গম্ভীর কণ্ঠে বলে,
- মাইসেলফ আহমাদ ইয়াসির। ডোন্ট ওয়ান্ট টু সি ইউ এগেইন। শালা অন্যের বউয়ের দিকে চোখ দেয়!
শেষটুকু নিজেই বিড়বিড় করে আহমাদ। হতভম্ব ছেলেটাকে ভার্সিটি চত্বরে রেখে চলে যায় এক দম্পতি।
পেছন থেকে হালকা হাসির শব্দ পায় আহমাদ। তার মেজাজ এখনও গম্ভীর।
- বিয়ে হওয়ার পরও সিঙ্গেল বোর্ড ঝুলিয়ে রাখার মানে কি? আবার পরিচয় দেওয়া হচ্ছে "না হওয়া বাচ্চার বাবা "!
লজ্জা পায় মেয়েটা। তখন হুট করে বলে দিয়েছে বলে কি এখন খোটা দিবে? আবার সম্বোধনহীন কথা! লোকটা রেগে আছে। মিনমিন করে মাহিবা বলে,
- আজকেই ম্যারিড স্ট্যাটাস দিবো। আপনাকে ট্যাগ করবো?
কোনো উত্তর দেয় না আহমাদ। মাহিবা ধরে নেয় নীরবতাই সম্মতির লক্ষণ!
চলমান.