প্রাপ্তি (প্রথম অধ্যায়) — পর্ব ২০
লেখক: বিনতে ফিরোজ · বিভাগ: ইসলামিক · পর্ব ২০ · ৪৫ পর্বের মধ্যে ২০
এদিক ওদিক করছে আফিয়া। সারাদিনের সমস্ত ঘটনা একত্রে যেনো মেয়েটার মাথায় গন্ডগোল বাঁধিয়ে দিয়েছে। চোখ বন্ধ করে ঘুমানোর চেষ্টা করতেই একে একে সেসব চিত্রপট ধরা দেয় চোখের পাতায়। সি এন জি থেকে নামার পর ভাড়া দেওয়ার সময় নিজ হাতে লোকটার অযাচিত স্পর্শ। এতদিন এই ঘটনাকে নিতান্ত তুচ্ছ করে দেখলেও আজ লোকটার দৃষ্টি সে খেয়াল করেছে। সেটা কোনো স্বাভাবিক দৃষ্টি ছিলো না। গাড়ি থেকে নেমে শেফালী বেগমের বাড়ি পর্যন্ত যেতে সে রাস্তার প্রতিটা পুরুষের দৃষ্টি পড়ার চেষ্টা করেছে। কেউ হাঁটছে নিজের মতো করে। কেউ তাকালেও তার নিজ গতিতে ফিরে যাচ্ছে। কিন্তু একটু পর পর যে ক্ষুরধার দৃষ্টি তার প্রত্যেক অঙ্গ পরোখ করার চেষ্টা চালিয়েছে এটা সে বুঝেছে। বেশ বুঝেছে। পাশ দিয়ে চলে যাওয়া কোনো মেয়ের দিকে তাকাচ্ছে না এমন পুরুষ বোধহয় ম্যাগনিফাইং গ্লাস দিয়ে খুঁজে বের করতে হবে। তবে কোনো মেয়েকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে এমন পুরুষের বোধ করি অভাব হবে না। রাস্তায় নামা প্রতিটা পুরুষের কাজই বোধহয় এই। বিচলিত বোধ করে আফিয়া। তার মানে তার এই ছোট্ট জীবনে এ পর্যন্ত সে কতো পুরুষের এমন দৃষ্টির শিকার হয়েছে? আজ দুপুরের কথা চিন্তা করে মেয়েটা। সে আর মাহিবা পাশাপাশি বসে ছিলো। কিন্তু ছেলেটার চোখ একবারের জন্যেও মাহিবার দিকে যায়নি। যদিও হিমেল আফিয়ার মুখের দিকে তাকিয়েই কথা বলছিলো এবং সরল দৃষ্টিতে সেটা নিষ্পাপ বটে। কিন্তু ছেলেটা মাহিবার সাথে কথা বলতে একদমই আগ্রহী ছিলো না। কেনো? ভাবতে ভাবতে একটা জিনিস সে উদ্ভাবন করে। মাহিবার চোখ ছাড়া কিছুই দৃশ্যমান ছিলো না। তাহলে ছেলেটা দেখবে কি? আসলেই তো! চমকে যায় আফিয়া। তাহলে কি মাহিবা সব লালসাভরা দৃষ্টি এড়িয়ে যেতে পারে? তার দিকে কোনো নোংরা চোখের দূর্গন্ধময় দৃষ্টি ধেয়ে আসে না? আশ্চর্য! কি সুন্দর নিরাপত্তার আবরণ! এজন্যেই কি মেয়েটা এই আবরণের জন্য যে কারো সাথে লড়ে যায়? শুধুমাত্র নিজেকে পবিত্র রাখার উদ্দেশ্যে? তারপরই হেনার সৌন্দর্য্য সম্পর্কে সেই উক্তি মনে পড়ে। এই সৌন্দর্য্য আসলে কার জন্য? আছে বলেই কি বিলিয়ে দিতে হবে? নিজ দেহে মাখিয়ে নিতে হবে অসহ্য সব দৃষ্টি?
ভাবনার অতলে যেতেই নিদ্রার দল তাকে টেনে নিয়ে যায়। ক্লান্ত, গোলমেলে মস্তিষ্ক হাল ছেড়ে নুইয়ে পড়ে। শ্রান্তির ভারে বন্ধ হয়ে যায় চোখের পাতা।
•• •• ••
মায়ের কাছে অনুমতি নিতে এসেছে আহমাদ। তবে এখনও বলেনি। কেনো বলতে এতো দ্বিধা তৈরি হচ্ছে সে নিজেই জানে না। আগে তো কখনো এমন হয়নি!
- কি রে! কিছু বলবি?
- মা!
- বল শুনছি।
- মা! ইফাদদের দাওয়াত দিয়েছিলাম। ওরা তো অনেকদিন আসে না।
ভ্রু কুঁচকে আসে সালেহা বেগমের। আয়িশার স্কুল ড্রেস গুছিয়ে দিয়ে বলেন,
- কি উদ্দেশ্য?
এমন কাঠ কাঠ প্রশ্ন সালেহা বেগম এর পূর্বে কখনো করেননি। থতমত খেয়ে যায় আহমাদ।
- ইফাদ তো বিয়ের দিন ছিলো না। তামিমও ছিলো না। শুধু জয় আর শিহাব এসেছিলো। তাই সবাইকে একটু দাওয়াত দিলাম।
- তোমার বন্ধু তুমি দাওয়াত দিতেই পারো। কিন্তু তোমাকে মনে রাখতে হবে তোমার বউ কেমন। তার আদর্শ যদি ঠিক থাকে সেক্ষেত্রে তাকে সাহায্য করা তোমার কর্তব্য। আর বউকে প্রদর্শন করা আমি পছন্দ করি না। সে কোনো প্রদর্শনীয় বস্তু নয় যে নতুন মানুষের সামনে তাকে সাজিয়ে গুছিয়ে উপস্থাপন করবে। আশা করি বুঝতে পেরেছো কি বোঝাতে চেয়েছি।
মাথা নাড়ে আহমাদ। সে তো মাহিবাকে বন্ধুদের সামনে আনার কথা চিন্তাও করেনি।
- কবে আসতে বলেছো?
সালেহা বেগম এখনও সম্বোধন পাল্টাননি। তার "তুমি" মানেই সিরিয়াস কিছু। বিষয়ের গুরুত্ব বোঝাতে তিনি মাঝে মাঝে এমন করে থাকেন।
- আমার হাতে একটা কাজ এসেছে। কাজটা শেষ হতে মোটামুটি একমাস মতো লাগবে। ওদের বলেছিলাম আগামী মাসে আসতে। কিন্তু কালকে অফিসে যেয়ে বুঝলাম আগামী মাসে সম্ভব না। এখন কি করি বলো তো?
বিব্রত বোধ করছে আহমাদ। দাওয়াত দিয়ে কি সেটার আবার তারিখ পাল্টানো যায় নাকি! কি একটা বিপদে পড়া গেলো!
ভাবার সময় নেন না সালেহা বেগম।
- ওরা তোর বন্ধু আহমাদ! বন্ধুই তো বন্ধুর বিপদ আপদে পাশে থাকে। ওদের সাথে এতো বিব্রত বোধ করার কোনো কারণ তো দেখিনা! সোজাসুজি বলবি অফিসে কাজের প্রেশার বেড়ে গেছে। প্ল্যান ক্যানসেল করে কয়েকদিন পেছাতে চাইছিস। ওরা কি বলে শোন।
কণ্ঠের ভার কমান সালেহা বেগম। সাথে আদুরে সম্বোধন। শ্বাস ছাড়ে আহমাদ। সালেহা বেগমের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের পর ভাবে মায়ের এই রূপটা বড়ো কঠিন! তবে হ্যাঁ! এ রূপের কারণেই তো আজও তারা ঠিক পথে আছে। বিপথে যায়নি।
•• •• ••
অফিসে যাওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছে আহমাদ। মাহিবাও তৈরি হয়ে গেছে। হাতে এখনো বিশ মিনিট সময় থাকায় বিছানায় বসে পা দোলাচ্ছে মেয়েটা। দৃষ্টি সামনে তৈরি হতে থাকা আহমাদের দিকে। হঠাৎ পা দোলানো থামিয়ে ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করে,
- আপনি আমাকে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠান নি কেনো?
আয়না দিয়েই মাহিবার দিকে তাকায় আহমাদ।
- আমি পাঠাবো কেনো?
- আপনি পাঠাবেন না?
- আশ্চর্য! কেনো পাঠাবো?
- আপনি আমাকে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠাবেন না!
- আরে আপনিও তো পাঠাতে পারেন!
- না! আপনিই পাঠাবেন!
- কেনো?
- বিয়ের দিন রাতে আমি আপনাকে বন্ধু হওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলাম। এবার আপনার পালা। আপনি ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠাবেন। আমি ভেবে দেখবো রিকোয়েস্ট একসেপ্ট করা যায় কি না!
হিসাবের জটিল সমীকরণে হতভম্ব আহমাদ। সরু চোখে মাহিবার চোখের দিকে তাকিয়ে ভাবে এই মেয়ে তার সাথে প্রতিশোধ নিতে চাচ্ছে! ভালো তো!
তক্ষুনি আবার মাহিবার কণ্ঠ শোনা যায়। অন্য দিকে তাকিয়ে বেশ ব্যঙ্গ করে বলছে,
- আমাকে বলে সিঙ্গেল বোর্ড ঝুলিয়ে রেখেছি। নিজে যে বিয়ের জন্য ছবি টাঙিয়ে রেখেছে ওতে কোনো দোষ নেই! হুহ!
আহমাদকে শোনাতেই এই কথা বলা। বেশ বোঝে ছেলেটা। দৃষ্টির পরিবর্তন না ঘটিয়ে বলে,
- বিয়ের ছবি মানে?
- ঐরকম নায়ক মার্কা ছবি প্রোফাইলে দিয়ে রাখার মানে কি? মেয়েদের দেখাতে চান! যে দেখো মহিলাসমাজ, "আমি কতো হ্যান্ডসাম! আমাকে দেখতে কি সুন্দর!" ঢং!
কথা শেষ করেই উঠে যায় মেয়েটা। জড়তা ছেড়ে আজ অনেক কিছু বলে ফেলেছে। আর থাকা যাচ্ছে না!
প্রহসন শুনে থেমে যায় আহমাদ। প্রশংসা ভেবে হাসবে নাকি খোঁচা ভেবে রাগবে? শেষমেষ হেসেই ফেলে। মেয়েটা বেশ পাগল আছে তো!
ঘর থেকে বের হতেই আফিয়ার মুখোমুখি হয় মাহিবা। মেয়েটা এখানেই দাঁড়িয়ে ছিলো। মাহিবার সাথে কথা বলা দরকার তার। সেই ক্ষণে মাহিবাকে বের হতে দেখে তার হাত ধরে ফেলে। হাত বন্ধনীর দিকে তাকিয়ে হাসে মাহিবা। এটা আর ছুটবে না ইনশাআল্লহ্!
- ভাবি একটু আমার ঘরে চলুন তো!
মাহিবাকে টেনে নিয়ে যায় মেয়েটা।
- ভাবি! কালকে আপনি আমাকে একটা কাজ দিয়েছিলেন। আমি চেষ্টা করেছি সেটা করতে। কিন্তু...
উদ্ভ্রান্ত আফিয়ার চেহারা ধরা পড়ে মাহিবার চোখে। পরিচিত পৃথিবীর অপরিচিত রূপের ধাক্কা সামলাতে পারেনি মেয়েটা। ভাবনা আটকে যাচ্ছে, কথা বেঁধে যাচ্ছে। আফিয়াকে খাটে বসিয়ে তার ঘাড়ে হাত রাখে মাহিবা।
- শান্ত হও আফি! তোমার কাজের একটা অংশ পূর্ণ হয়েছে পুরোটা হয়নি কিন্তু!
- মানে?
- তোমার সবচেয়ে পরিচিত জায়গা, তোমার কলেজ সেখানেই তো এখনও কিছু দেখোনি। আগে কলেজে যাও ওখানকার পরিবেশ খেয়াল করো তারপর কথা হবে ইনশাআল্লহ।
- কিন্তু আমার আজকে কলেজ যেতে ভালো লাগছে না ভাবি।
- আজ না গেলে অনেক কিছু মিস করবে আফি! আজকে কষ্ট করে যাও। কাল তোমাকে জোর করবো না। আসো গুছিয়ে দেই।
আফিয়া চিন্তার জগতে ঢুকেছে। দৃষ্টি ধারালো হয়েছে। মাহিবা চায় এই দৃষ্টি দিয়ে সে তার চির পরিচিত জায়গাটা চিনে নিক, দেখে নিক।
নিজ কক্ষ থেকে বের হতেই পাশের কক্ষে এই মনোরম দৃশ্য চোখ আটকায় আহমাদের। আফিয়ার ব্যাগ গোছাচ্ছে মাহিবা। বোন নির্দেশ দিচ্ছে আর বউ সে নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করছে। বিষয়টা এতোই আশ্চর্য জনক লাগে আহমাদ পলক ফেলতে ভুলে যায়, ভুলে যায় সে যাচ্ছিলো অফিসে, তার কাজের অনেক চাপ। অনেক!
চলমান.