প্রাপ্তি (প্রথম অধ্যায়) — পর্ব ৪০
লেখক: বিনতে ফিরোজ · বিভাগ: ইসলামিক · পর্ব ৪০ · ৪৫ পর্বের মধ্যে ৪০
মধ্য গগনে সূর্যের অবস্থান দুপুরের অস্তিত্বকে আরো দৃঢ় করেছে। রান্নার কাজ অর্ধেক করে ঘরে আসে মাহিবা। হালকা গতিতে ফ্যান ছেড়ে শরীর থেকে ওড়না খসিয়ে আরাম করে বসে। আহমাদ সেই সকাল থেকে বসে আছে বিছানায় হেলান দিয়ে। এর মাঝে একবার ঘরে এসে বুকশেলফ থেকে একটা বই নিয়ে তার হাতে দিয়ে গেছে মাহিবা। তবে কোনো শব্দ খরচ করেনি মেয়েটা। এই মুহূর্তে অর্ধাঙ্গিনীকে কাছে পেয়ে বইয়ের মলাট বন্ধ করে আহমাদ। বইটা পাশে রেখে ডাক দেয় তাকে।
- মাহি!
মাহিবার চোখ বন্ধ। খুব আয়েশ করে ফ্যানের বাতাস উপভোগ করছে সে।
- মাহি! তাকাও।
দুই হাত পেছনে দিয়ে তার উপর দেহের ভর রেখে বসে আছে মাহিবা। গুনগুন করে গানের তালে একটু পরপর পা নাচাচ্ছে।
- আশ্চর্য! আমি যে ডাকছি সেটা কি তোমার কানে যাচ্ছে না?
উঠে দাঁড়ালো মাহিবা। ওড়না ঠিক করে ফ্যানের সুইচ অফ করে বের হয়ে যায়। যেতে যেতে গুনগুন করে ওঠে,
- যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চলো রে! একলা চলো একলা চলো একলা চলো....
হতভম্ব হয়ে যায় আহমাদ। এই মেয়ের হলোটা কি!
• • •
- আফি আসি?
কিছুক্ষণ আগেই কলেজ থেকে এসেছে আফিয়া। মেয়েটা ইদানিং বেশ দেরি করে আসছে। নীরব সম্মতি পেয়ে খাবার হাতে ঘরে ঢোকে মাহিবা। টেবিলের একপাশে খাবারটা ঢেকে রেখে বলে,
- আজকাল বেশ দেরি করে ফিরছো। অনেক ব্যস্ততা বুঝি?
চুল মুছতে মুছতে আফিয়া বলে,
- কাজ একটু বেড়েছে। সেই বিষয়ে আপনার সাথে একটু কথা বলতে চাচ্ছিলাম। এখন কি ফ্রি আছেন?
- আছি। খাওয়া শুরু করতে করতে বলো।
বিছানায় বসতে বসতে বলে মাহিবা।
- একটা টিউশনি পেয়েছি ভাবি। মেয়েটা ক্লাস সিক্সে পড়ে। আমার কলেজের পাশেই বাসা। সপ্তাহে চারদিন পড়াতে হবে। তিন হাজার টাকা দেবে বলেছে। অনেক খুঁজে এটা পেয়েছি। ভালোই তাইনা?
উত্তরের আশায় জিজ্ঞাসু চোখে মাহিবার দিকে তাকায় আফিয়া। মাহিবাকে বেশ ভাবুক এবং কিছুটা গম্ভীর দেখাচ্ছে।
- এই কয়েকদিন ধরে কি টিউশনি খুঁজছিলে?
- জি।
- তোমার ভাইয়ার এই অবস্থার কারণে কি তুমি টিউশনির চিন্তা করছো?
- সেরকমই। ভাইয়ার যেমন অবস্থা কবে সুস্থ হবে আবার চাকরি-টাকরি কবে পাবে তার কোনো ঠিক ঠিকানা নেই। এখন এই তিন হাজার টাকাও অনেক।
আরেক লোকমা মুখে দেয় আফিয়া। গম্ভীর কণ্ঠে মাহিবা বলে,
- আমার মনে হয় তোমার উচিত তোমার ভাইয়ার সাথে একবার কথা বলা।
- আপনি বলে দিলেই তো হলো।
- আমি থাকবো পাশে। তুমি বলবে। আর একটা কথা। টিউশনি নিয়ে তোমার ভাইয়ার অভিজ্ঞতা ভালো না। তাই সবরকম উত্তরের জন্য প্রস্তুত থাকবে। আর আমার মনে হয় তুমি তোমার ভাইয়ার আদেশ অমান্য করবে না। তাই না?
ভাত চিবানো বাদ দিয়ে মাহিবার মুখের দিকে তাকায় আফিয়া। স্মৃতির ঝাপসা ছায়ায় ভেসে ওঠে মায়ের কোলে মুখ লুকিয়ে ভাইয়ের কান্নার দৃশ্য।
- আচ্ছা।
বিকেলের প্রথম প্রহরে ভাইয়ের ঘরের দুয়ারে হাজির হয় আফিয়া। ছোট্ট বিকেলের সময়টাতে ঘুমায়নি আহমাদ। কি চিন্তায় যেনো মগ্ন ছিলো ছেলেটা।
- ভাইয়া আসি?
ধ্যান ভেঙে দরজার দিকে তাকায় আহমাদ। ইশারায় বোনকে কাছে ডাকে। পেছনে মাহিবার মূর্তি দেখা গেলে তার দিকে অসহায় চোখে তাকায়। তবে মাহিবা নির্বিকার হয়ে ঘরে ঢুকে সোফায় জায়গা করে নেয়।
- ব্যাথার কি অবস্থা? কমেছে একটু?
- হ্যাঁ। প্রথম দিকের থেকে ভালো।
- আচ্ছা। ভাইয়া একটা কথা বলতাম।
- বল।
- কলেজের পাশে একটা টিউশনি পেয়েছি। তুমি অনুমতি দিলে করবো।
টিউশনির কথা শুনতেই স্মরণে আসে ভুলতে চাওয়া সেই স্মৃতি। চোয়াল শক্ত করে বলে,
- স্টুডেন্ট ছেলে নাকি মেয়ে?
- মেয়ে। ক্লাস সিক্সে পড়ে।
- ওদের বাসায় কোনো ছেলে আছে?
- তা তো আছেই..
- করা লাগবে না।
- হ্যাঁ?
- আমার অভিমত তোকে এই টিউশনি করা লাগবে না। এরপরও তোর ভালো মনে হলে তুই করতে পারিস।
- আচ্ছা।
ভোতা মুখে ঘর থেকে চলে যায় আফিয়া।
সোফায় বসা মাহিবা পায়ের উপর পা তুলে গালে এক হাত রেখে আহমাদের দিকে তাকিয়ে থাকে। দীর্ঘশ্বাস ফেলে মাহিবার দিকে তাকালে তার এমন ভঙ্গি নজরে আসে আহমাদের। ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে থাকে মাহিবার দিকে। জিজ্ঞেস করে,
- কি হয়েছে?
কোনো উত্তর আসে না মাহিবার তরফ থেকে। সে তাকিয়ে আছে এক দৃষ্টিতে।
- তুমি কি আমার সাথে কথা না বলার পণ করেছো?
উঠে দাঁড়ায় মাহিবা। ঘর ছাড়তে ছাড়তে বলে,
- লা লা লা লা লা, লা লা লা লা লা!
মাহিবার প্রস্থান পানে চেয়ে ছক কষে আহমাদ। কিভাবে মেয়েটার মুখ দিয়ে কথা বের করা যায়?
•• •• ••
প্রচ্ছন্ন চিন্তার মাঝে সকলের দিনাতিপাত হচ্ছে। সালেহা বেগমের ভাঁজ পড়া চামড়ায় চিন্তার ছাপ। ছেলেটা বিছানায় পড়ে আছে। মাসের বাজার শেষের দিকে। ছেলেটাকে বলতেও মন টানছে না। না বলেও উপায় নেই। একটা ব্যবস্থা তো করা লাগবে। কি করা যায়? চিন্তার শাখা প্রশাখা মাহিবার সাথে ভাগ করে নেন। মাহিবা যে চিন্তা করছিলো না এমন নয়। তবে শাশুড়ির সরাসরি প্রকাশে চিন্তার ঢেউ খেলে যায় তার মনেও। আহমাদের সাথে একবার আলাপ করা দরকার। তবে সে মিশনে আছে। সেটা সফল না হওয়া পর্যন্ত নতুন কাজ হাতে নেওয়া যাচ্ছে না।
• • •
ঘরে উকি দেয় মাহিবা। লোকটা কি ঘুমিয়ে গেছে? বোঝা যাচ্ছে না। চোখ বন্ধ করে কপালে হাত দিয়ে শুয়ে আছে। পা টিপে টিপে ঘরে ঢোকে মাহিবা। হুট করে দাঁড়িয়ে যায়। মানুষটাকে এই সময়ে একবার ওয়াশরুমে নিয়ে যাওয়া দরকার ছিলো। কিন্তু ডাকা তো যাবে না! বুকশেলফের কাছে যেয়ে একটা বই নিয়ে জোরে টেবিলে রাখে। পেছন ঘুরে দেখে আহমাদ এখনও সেভাবে শুয়ে আছে। আবার আরেকটা বই নিয়ে তার চেয়েও বেশি জোরে রাখে। আহমাদের দিকে তাকায়। লোকটা উঠছে না কেনো!
এক চোখ হালকা করে খুলে মাহিবাকে দেখে আহমাদ। মেয়েটা ডাকবে না? ডাকিয়ে ছাড়বে!
কিছুক্ষণ নীরবতার পর হুট করে মাহিবার চিৎকার ভেসে আসে। ধরফরিয়ে উঠে বসে আহমাদ। চেয়ে দেখে মাহিবা সুস্থ সবল ভাবে দাঁড়িয়ে আছে। ভালো করে দেখলে বোঝা যাবে হাসি চেপে রাখার যথাসাধ্য চেষ্টা করে যাচ্ছে। আহমাদকে উঠতে দেখে তার কাছে যেয়ে ডান হাতের ভেতর দিয়ে হাত গলিয়ে পিঠের অপর পাশে হাত দেয়। হতভম্ব আহমাদ তখনও স্তব্ধ। তাকে ধাক্কা দিয়ে উঠাতে গেলে ধ্যান ভাঙ্গে আহমাদের। উল্টো চেপে ধরে মাহিবাকে। সাম্যতা বজায় রাখতে বিছানায় বসে পড়ে মাহিবা। অবাক চোখে তাকিয়ে থাকে আহমাদের দিকে। ছুটে যেতে চাইলে মেয়েটাকে আরো আটকে দেয় আহমাদ। নড়াচড়া করলেও কথা বলে না মাহিবা। ধমকে উঠে আহমাদ বলে,
- কি সমস্যা? এমন করছো কেনো?
থেমে যায় মাহিবা। কথা বলে না। তাকে আরো চেপে ধরে আহমাদ। ব্যাথা পায় মাহিবা।
- কথা বলবা না? তাকাও আমার দিকে!
মুখ ঘুরিয়ে নেয় মাহিবা। এক হাতে তার চোয়াল চেপে ধরে নিজের দিকে ফেরায়।
- তাকাতে বলেছি।
এবারও কথা না বললে ধমক দেয় আহমাদ।
- তাকাও!
কেঁপে উঠে আহমাদের দিকে তাকায় মাহিবা।
- কি সমস্যা?
- কোনো সমস্যা না।
কথা ফোঁটে মাহিবার মুখে।
- তাহলে কথা বলছো না কেনো?
- আপনার সাথে কথা বলবো কেনো?
- বলবে না কেনো?
- যে লোক আমাকে তার জীবন থেকে বের কর দিতে চায় তার সাথে আমার কোনো কথা নেই। থাকতেই পারে না।
- আচ্ছা! তাই?
- আপনাকে আমি অভ্যাস করাচ্ছি।
- কিসের অভ্যাস?
- আপনি আমাকে চলে যেতে বলেছেন। তাহলে কি আমি বসে থাকবো নাকি? আবার বিয়ে করবো। এই পাড়াতেই করবো। আপনার সামনে ঘুরে বেড়াবো কিন্তু আপনার সাথে কোনো কথা বলবো না। আপনি ডাকলেও উত্তর দিবো না। তাই এখন থেকে প্র্যাকটিস করছি। একটা ভালো ছেলে খুঁজে দিয়েন তো! তখন জানবেন মাহিবা না না মাহি অমুকের ব...
কথা বন্ধ হয়ে যায় মাহিবার। আহমাদ জানান দেয় নিজের অস্তিত্বের। মেয়েটাকে বুকে চেপে ধরে বলে,
- তুমি নিষ্ঠুর।
আহমাদের বুকে মুখ লুকিয়ে মাহিবা বলে,
- আপনার মতো কাঠখোট্টা লোকের সাথে নিষ্ঠুরই হওয়া উচিত।
- আমি কাঠখোট্টা?
- অবশ্যই।
নীরবতার চাদর ছিঁড়ে বের হয়ে আসে মাহিবার কান্নার শব্দ। চমকে উঠে তাকে ওঠাতে চায় আহমাদ। ওঠে না মাহিবা। আহমাদকে জাপটে ধরে পড়ে থাকে বুকে।
- কি হলো? কাদছো কেনো?
- আপনি আমাকে একটুও ভালোবাসেন না। কিভাবে আমাকে চলে যেতে বললেন!
মেয়েটাকে শক্ত করে জড়িয়ে আহমাদ বলে,
- তোমার নীরবতায় যে এতোটা কষ্ট হতে পারে সেটা তো আগে বুঝিনি! তোমাকে ছেড়ে আমি থাকতাম কিভাবে! যেভাবেই থাকি না কেনো স্বার্থপরের মতো তোমাকে নিজের সাথেই রাখবো। থাকতেই হবে তোমাকে।
- স্বার্থপর!
- এমন স্বার্থপর আমি সারাজীবন থাকতে চাই মাহি!
একজনের কান্না আরেকজনের হাসির শব্দ মিলে এক অদ্ভুত সুর তরঙ্গ তৈরি হয়। বিস্ময়কর সেই সুর দেওয়ালের চারিধারে ঘুরে বেড়ায়।
চলমান.