প্রাপ্তি (প্রথম অধ্যায়) — পর্ব ২৭

লেখক: বিনতে ফিরোজ · বিভাগ: ইসলামিক · পর্ব ২৭ · ৪৫ পর্বের মধ্যে ২৭

কপালের কাছে কিছু চুল কচি পাতার মতো দুলছে। জানালা দিয়ে আসা তীর্যক আলো মুখের এক পাশকে আলোকিত করে রেখেছে। স্বল্প পরিচিত, বহু আকাঙ্খিত মুখের সে হাসি আহমাদের অন্তঃস্থল নাড়িয়ে দিচ্ছে প্রতি মুহূর্তের জন্য। এক ঝড়ের পূর্বাভাস সে পাচ্ছে। এক অনুভূতির সন্ধান মিলেছে, যা এর আগে অনুভূত হয়নি। কখনো না...

টেনে হিঁচড়ে দৃষ্টি সরিয়ে নেয় আহমাদ। গলা খাঁকারি দিয়ে অপ্রয়োজনীয় ব্যস্ততা দেখি নিজেকে স্বাভাবিক করার প্রয়াস চালায়।

মাহিবার শরতের আকাশে মেঘ জমে। একটুখানি প্রশংসা সে চাইছিলো। একটা সুন্দর বাক্য তার ঝলমলে আকাশে রোদের কোমলতা তৈরি করতো। কিন্তু না! লোকটার মনে না আছে শরৎ, না আছে বসন্ত। সে সবসময় কাঠফাটা গ্রীষ্মের মতো! দীর্ঘশ্বাস ফেলে মাহিবা। কি আর করার! গ্রীষ্ম হোক আর বর্ষা এ তার ব্যাক্তিগত ঋতু, একান্তই তার। চুলগুলো হাতখোপা করে আহমাদকে ডেকে যায়,

- খেতে আসুন।

আঁচলের শেষ অংশটুকুর প্রস্থান দেখা পর চোখ বন্ধ করে ফেলে আহমাদ। চোখের অন্ধকার ক্যানভাসে মনের রং তুলি দিয়ে একটু আগের সেই ঝলমলে ছবিটা ফুটিয়ে তুলতে চায়। একবার, দুইবার, বারবার...

• • •

বিকেলের নরম আলো মনের বাতাবরণে শান্তির প্রলেপ লাগিয়েছে। খুব যত্নে আল্পনা এঁকেছে মন উঠান জুড়ে। বারান্দার একপাশে দাঁড়িয়ে স্নিগ্ধ বাতাস গায়ে মাখছে মাহিবা। ওপাশটায় যাওয়ার কায়দা নেই। পাশের বাড়ির জানালাটা একদম সোজাসুজি। দাঁড়ালেই দেখা যায়। খুব ইচ্ছা করলো একবার আহমাদকে বলে, "চলুন কোনো জায়গা থেকে ঘুরে আসি"। ফের ভাবে, "লোকটা নাওয়া খাওয়া ভুলে কাজ করছে। এখন বললে যাবে না, বলা ঠিকও হবে না।" তুলনামূলক ছোটো আশা নিয়ে আহমাদের পাশ ঘেঁষে বসে মেয়েটা। উৎসুক চোখে চেয়ে দেখে চোখের সাথে সাথে হাতের অস্থিতিশীতা। কাজের গতি একটু শিথিল হলে বলে,

- একটা কথা বলি?

- হুঁ।

- তাকান আমার দিকে।

হাতের কলম রেখে তাকায় আহমাদ।

- বলো।

- কিছু গাছ কিনে আনতে পারেন? বারান্দায় লাগাবো।

- কেনো? বাইরে গাছ নেই? বারান্দায় লাগাতে হবে কেনো?

- বাইরে তো আছে। বারান্দাটা একটু সাজাতাম।

- বারান্দা সাজানো লাগবে না।

নিস্তেজ হয়ে যায় মাহিবার উৎফুল্ল মেজাজ। আহমাদের থেকে নেতিবাচক উত্তর সে আশা করেনি। মুখের কালো মেঘ সরাতে নিজের দিকে মন দেয়। শাড়ির দিকে দৃষ্টি যেতেই সেটা খুলে ফেলার কথা ভাবে। ভাবনা অনুযায়ী কাজ সারতেও দেরি হয় না। ঘরোয়া বেশে ফিরে আসতেই আহমাদ বলে,

- খুলে ফেললে কেনো? ভালো লাগছিলো।

কাঁদতে মন চাইলো মাহিবার। সেজেগুজে যখন চোখের সামনে ঘুরে বেড়িয়েছে তখন কিছু বলতে ইচ্ছে করেনি। যেই খুলে ফেলেছে অমনি বলছে, "ভালো লাগছিলো"।

ভাবনার পথ ঘোরাতে চায় মাহিবা। তৎক্ষণাৎ মনে হয় ইশিকার কথা।

- ইশিকা কেমন আছে?

- পরে আর কথা হয়নি। তুমি ফোন দিয়ে শুনে নাও।

- কার কাছে ফোন দেবো?

- চাচীর কাছে দাও।

- নাম্বার দিন।

নাজমা বেগমের সাথে কথা বলে প্রসন্ন হয় মাহিবার মন। মানুষটা এতো ভালোবাসে! এতো ভালোবাসা পেলে কি কারো মন খারাপ থাকতে পারে? মাহিবা তো পারে না!

• • •

সন্ধ্যার পর রান্নাঘরে ব্যস্ত মাহিবা। আয়িশাকে সেমাই রান্না করে দিতে হবে। দুপুরের খেলায় সে জিতে গেছে। মাহিবা যে ইচ্ছে করে জিতিয়েছে এমন নয়। মাহিবা ঠিকঠাক মতো হিসাব রাখতে পারেনি। এটা করতে যেয়ে ভুলে গেছে, ওটা করতে যেয়ে ভুলে গেছে। কিন্তু আয়িশা পুঙ্খানুপুঙ্খ রূপে নিজের হিসাব রেখেছে। তাই বিজয়ী ব্যাক্তির ইচ্ছা স্বরূপ এই রান্নার আয়োজন।

আয়িশা মাহিবার রুমে পুতুল খেলছে। একা একাই কতো কথা বলছে পুতুলের সাথে। আহমাদ ঘরে এসে সেটা খেয়াল করে। বেশ খানিকক্ষণ পর্যবেক্ষণ করে বোনকে।

- ওটা কি?

আহমাদের দিকে চেয়ে আয়িশা বলে,

- পুতুল।

- এটা আবার কেমন পুতুল?

- এমনই পুতুল।

- চোখ মুখ নেই। এটা একটা পুতুল হলো নাকি!

- তুমি পুতুলের কি বোঝো? ভাবিমণির তো চোখ মুখ আছে। ভাবিমণিকে কি তোমার পুতুলের মতো লাগে? তাহলে এটাকে লাগবে কিভাবে?

থতমত খেয়ে যায় আহমাদ। মেয়েটা দিনদিন ঝগড়ুটে হচ্ছে বলে তার মনে হয়।

সেই ক্ষণে মাহিবা আসে। হাতে ট্রে। একপাশে ওগুলো রাখতেই আহমাদের প্রশ্ন ভেসে আসে।

- আয়িশাকে সুন্দর দেখে কিছু পুতুল কিনে দিও তো! বেচারি বোবা, কানা পুতুল নিয়ে ঘুরছে।

- সুন্দর পুতুল বলতে?

- ঐ যে ছোটো ছোটো পুতুল পাওয়া যায় না? ঘরবাড়ি সহ সেগুলো কিনলেই তো হয়।

বেশ গাম্ভীর্যের সাথে মাহিবা বলে,

- ওগুলো কেনা যাবে না।

- কেনো?

- হালকার উপর ঝাপসা খেয়াল না করে যদি ভালোভাবে দেখেন তাহলে বুঝবেন ঐসব পুতুলের একটা নির্দিষ্ট স্ট্রাকচার আছে। কালার, আউটফিট যেমনই হোক ওদের বডি স্ট্রাকচার একই আর খুবই অবাস্তব।

- অবাস্তব হবে কেনো?

- কারণ ওদের দেহের অনুপাতে যেই মাথা লাগানো হয় সেটা কখনোই যুতসই না। একটা মানুষের ওরকম মাথা থাকতে হলে তাকে আরো মোটা হতে হবে। নয়তো ঐ মাথা নিয়ে মেরুদন্ড বেঁকে যাবে। তাছাড়া ওদের কোমড় যেমন ওতে দেহের ভার নেওয়া সম্ভব না। পুরো একটা ভুয়া জিনিস।

- এতো রেশিও দেখে আমরা কি করবো? ছোটো মানুষ খেলবে, খুশি হলেই হলো।

ওড়না দিয়ে মুখ মোছে মাহিবা। একটু গরম লাগছে।

- এটাই তো সমস্যা। আপনি গুরুত্ব না দিয়ে ওদের হাতে ঐ পুতুল তুলে দেবেন। তখন ওদের কাছে ওগুলোই স্বাভাবিক লাগবে। নিজেকে ঐ পুতুলের মতো মনে করবে। নিজের বডিকে ওরকম বানাতে চাইবে। তারপর মোটা মানুষ ওদের কাছে অস্বাভাবিক লাগবে। কাউকে সেজন্য অপমান বা ঘৃণা করলেও সেটা অস্বাভাবিক হবে না।

- আশ্চর্য! পুতুলের সাথে এসবের কি সম্পর্ক?

- আছে। সম্পর্ক আছে বলেই বলছি। আমাদের অবচেতন মনে এমন অনেক জিনিসই অভ্যস্ত যেটা আমরা সতর্কভাবে গ্রহণ করি না। যেমন দেখুন আপনার অবচেতন মন ধরে নিয়েছে আয়িশুর খেলার ঘর এটা। এখন ও যদি অন্য কোনো ঘরে খেলা করে সেটা আপনার কাছে অস্বাভাবিক লাগবে। কিন্তু যখন এই ঘরে খেলবে সেটাতে কিন্তু আপনি কোনো আলাদা মনোযোগ দেবেন না। এভাবে অনেক জিনিস আমাদের অবচেতন মনকে প্রভাবিত করে। যেগুলো নিয়ে আমরা প্রত্যহ নাড়াচাড়া করি সেগুলো আমাদের খুব গভীর থেকে ইফেক্ট করে। এভাবেই পুতুল গুলোও আমাদের যদি প্রভাবিত করে সেটা আহামরি কোনো বিষয় হবে না। আর এর ভয়ানক দিক কি জানেন? একটা বাচ্চা মেয়ে যখন নিজেকে পুতুলের মতো দেখাতে চাইবে তখন খাওয়া দাওয়া কমিয়ে দেবে, নিজেকে স্লিম করতে চাইবে, সাজগোজের প্রতি আসক্ত হয়ে যাবে। ফলাফল স্বরূপ স্বাভাবিক জীবন থেকে বের হয়ে যেতে পারে।

- কিন্তু তাহলে তো মানুষ এগুলো আর কিনতো না।

- ক্যান্সার তো ঘরে ঘরে হয় না। কিন্তু যার ঘরে আসে তার জীবনের শেষ বার্তা নিয়ে আসে। দুর্ঘটনা একবারই ঘটে। তারপর থেকে তো মানুষ সতর্ক হয়ে যায়। কিন্তু সতর্ক হওয়া দরকার ছিলো আগে। যেটা আমরা উল্টো করি।

ভাবুক হয়ে পড়ে আহমাদ। ভাবতে থাকে মাহিবার কথার গূঢ় রহস্য।

চলমান.