প্রাপ্তি (প্রথম অধ্যায়) — পর্ব ০৪
লেখক: বিনতে ফিরোজ · বিভাগ: ইসলামিক · পর্ব ০৪ · ৪৫ পর্বের মধ্যে ৪
আত্মীয় স্বজনে বাড়ি ভর্তি হলেও এই মুহূর্তে ড্রয়িং রুমে কোনো পুরুষ মানুষ দেখলো না মাহিবা। গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে গেলো সামনের সোফায় উপবিষ্ট মানবীর দিকে। মহিলাকে কাল দেখেছিল। আহমাদ সম্ভবত খালামণি বলে ডাকছিল। সেই হিসেবে দেখতে গেলে তার খালা শাশুড়ি। নম্র স্বরে সালাম দেয় মাহিবা,
- আসসালামুয়ালাইকুম খালামণি।
অপরিচিত কণ্ঠের সম্বোধনে ফিরে তাকান ভদ্রমহিলা। নতুন বউকে সালাম দিতে দেখে খুশি হন মনে মনে। সালামের উত্তর নিয়ে জিজ্ঞাসা করেন,
- কি ব্যাপার বউমা? এত সকালে বের হলে? কোনো সমস্যা?
- না খালামণি। আলহামদুলিল্লাহ কোনো সমস্যা নেই।
- তাহলে? কিছু দরকার?
খানিক ইতস্তত করে মাহিবা। লজ্জাও পায় বোধহয়। বিষয়টা খেয়াল করেন মধ্য বয়স্ক নারী। ভরসার হাত মাথায় দিয়ে বলেন,
- কোনো সমস্যা হলে বল মা। আমি তো তোমার মায়ের মতই।
এই একটা কথাই যেনো সমস্ত জড়তা কাটাতে সক্ষম। মা এমনই একটা ভরসার জায়গা যার মত করে কেউ নিজেকে উপস্থাপন করতে চাইলে সেও ভরসা পূর্ণ হয়ে ওঠে। ধীর গলায় মহিবা বলে,
- খালামণি উনার মাথা ব্যাথা করছে। একটু চা খেলে মনে হয় ভালো লাগতো। ইয়ে আমি কি একটু চা বানাবো? আপনি একটু সাহায্য করবেন?
মেয়েটার খালামণি ডাকে যেনো মায়া ঝরে পড়ছে। এতো সুন্দর করে তো উনার নিজের ভাগ্নী গুলোও ডাকে না। আবার আহমাদেরও খেয়াল রাখছে। যাক আপার ভাগ্যে একটা ভালো বউ জুটেছে তবে। কে জানে আসলেই ভালো নাকি... অন্য চিন্তা মাথায় জায়গা না দিয়ে খুশিমনে মাহিবাকে নিয়ে চললেন রান্নাঘরের দিকে। প্রফুল্ল কণ্ঠে বললেন,
- অবশ্যই অবশ্যই! চলো দেখি।
মাহিবা আশেপাশে তাকিয়ে তার শাশুড়ি কে খোঁজে। তাকে রাতে দেখেছিল। এখানে কোথাও নেই। এই পর্যায়ে খালা শাশুড়িকে জিজ্ঞেস করে মাহিবা,
- খালামণি, মা কোথায়? এখনও ওঠেনি?
শাশুড়ির খোঁজ নেয়াতে এবার মনে হলো আসলেই মেয়েটা ভালো। উত্তরে বললেন,
- তোমার মা একটু অসুস্থ। কাল রাত থেকে পায়ের ব্যথা বেড়েছে। তাই আমি জোর করে শুইয়ে রেখে এসেছি।
মনে মনে উদ্বিগ্ন হলেও সেটা প্রকাশ করলো না মাহিবা। চা বানাতে বানাতেই জিজ্ঞেস করলো,
- আপনি চা খাবেন খালামণি? আপনার জন্য এক কাপ বানাই?
বিনয় প্রকাশ পেলো মাহিবার স্বরে। খুশি হলেন শিউলি বেগম। বললেন,
- বানাবে? বানাও। দেখি নতুন বউয়ের হাতের চা কেমন।
হাসিমুখে মাহিবা বলে,
- খারাপ হলে কিন্তু রাগ করবেন না খালামণি। শিখিয়ে দিয়েন।
- অবশ্যই। শিখিয়ে তো দিতেই হবে। দশটা না পাঁচটা না একটা মাত্র ছেলের বউ আমার আপার। শেখাতে তো হবেই।
চা বানানো শেষে শিউলি বেগমের হাতে এক কাপ দিয়ে আরেক কাপ নিয়ে ঘরের দিকে যায় মাহিবা। ঘরে এসে দেখে আহমাদ বিছানায় হেলান দিয়ে বসে আছে।
- আপনার চা।
চোখ খুলে আহমাদ। জিজ্ঞেস করে,
- বাইরে কেউ ছিলো?
- জি, খালামনি ছিলো।
- ওহ আচ্ছা।
দ্রুতই চা শেষ করে ফেলে আহমাদ।এতক্ষণে খেয়াল হয় মাহিবা চা খায়নি। এভাবে তাকে না জিজ্ঞেস করে খেয়ে ফেলাটা অভদ্রতা মনে হয়। জিজ্ঞেস করে,
- আপনি চা খেলেন না?
চিন্তায় বুদ হয়ে থাকা মাহিবা প্রশ্নের জবাবে বলে,
- না। সমস্যা নেই। আপনি খান।
- খাওয়া শেষ।
বিছানায় গা এলিয়ে দিতেই মাহিবা বলে,
- খালামণি বললেন কাল রাত থেকে নাকি মা'র পায়ের ব্যথা বেড়েছে। চলেন দেখে আসি মা কে।
মায়ের এই খবর জানত না আহমাদ। তড়িঘড়ি করে উঠে বলে,
- আশ্চর্য! আমাকে এই কথাটা একবার কেউ জানানোর প্রয়োজন মনে করলো না।
আগে পিছে না দেখে মায়ের ঘরের দিকে ছোটে। ভেজানো দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকতে গেলেই মাহিবা বাধা দেয়,
- দাড়ান। নক করে নিন আগে।
পেছনে ফিরে মাহিবাকে দেখে আহমাদ। মেয়েটার আগমন খেয়াল করেনি সে। বিরক্ত হয়ে বলে,
- আমি কি মায়ের অপরিচিত কেউ? জিজ্ঞেস করে ঢুকতে হবে কেন?
- অপরিচিত বলে কথা না। প্রাইভেসি বলে একটা বিষয় আছে। মা হয়ত ভেতরে এমন কোনো অবস্থায় থাকতে পারে যেখানে আপনি উপস্থিত হলে দুজনই বিব্রত হয়ে পড়বেন। এটা নবীজির আদেশ, নিজের ঘর ছাড়া অন্য কারো ঘরে ঢোকার সময় অনুমতি নেওয়া সুন্নাহ।
কথাগুলো যৌক্তিক শোনালো আহমাদের কাছে। কার্টেসি বলে তো একটা কথা আছে। সে অবশ্য অন্য কারো ঘরে যাওয়ার সময় অনুমতি নিলেও মায়ের ঘরে ঢোকার সময় কখনও এসব ভাবেনি। তবে ভাবা উচিত বলে মনে হলো। নক করলো সে,
- মা আসবো?
শব্দ পেয়ে দরজা খুলে দিলেন শিউলি বেগম।
- আরে আহমাদ? তোর নাকি মাথা ব্যাথা? তা মাথা ব্যাথা নিয়ে এখানে কি?
- মা'র পায়ের ব্যাথা বেড়েছে এটা আমাকে জানাওনি কেনো? কই মা? দেখি সরো।
শিউলি বেগমকে সরিয়ে দিয়ে ঘরে ঢোকে আহমাদ। ততক্ষণে উঠে পড়েছেন সালেহা বেগম।
- এই যে এখানে। কিরে এমন তাড়াহুড়া কিসের?
মায়ের পাশে বসতে বসতে আহমাদ বলে,
- কিসের আবার? তোমার পায়ের ব্যথার কথা আমাকে বলোনি কেনো?
- ছেলে বিয়ে দিয়েছি। এখন কি সব কথা চাইলেই বলা যায় নাকি?
- এসব আজাইরা যুক্তি দেখাবা না মা। ফালতু কথা বলে। মলমটা দিয়েছো পায়ে?
- ইয়ে..
-দাওনি না? দাড়াও আমি দিয়ে দিই।
মা ছেলের কথায় ঘটনা পরিষ্কার মাহিবার কাছে। মলম না দেয়াতেই পায়ের ব্যাথা এত বেড়েছে।মাহিবা বলে,
- কোথায় মলম? আমাকে বলেন আমি নিয়ে আসি।
এতক্ষণে ওকে খেয়াল করে সবাই। সালেহা বেগম তড়িঘড়ি করে বলেন,
- কিরে নতুন বউকে নিয়ে চলে এসেছিস? এখনই শাশুড়ি সেবা শুরু করবে নাকি তোর জন্য?
- আমি আনিনি। তোমার বউমাই আমাকে বলেছে তোমার কথা। নাহলে কেউ তো আমাকে জানানোর প্রয়োজনই মনে করেনি।... ঐযে ড্রেসিং টেবিলের ড্রয়ারে আছে মলম।
ঔষধ নিয়ে আসে মাহিবা। শাশুড়ির সামনে এসে ধীর কণ্ঠে অনুমতি চাইতে বলে,
- আমি দিয়ে দেই?
অবাক হয় সকলেই। বিয়ের পরদিনই শাশুড়ি সেবার এমন ঘটনা মনে হয় কারো জানা নেই। সালেহা বেগম মনে মনে হাসেন। মানুষ চিনতে ভুল করেননি তিনি।আহমাদ ভাবে মেয়েটা কি আসলেই এমন নাকি নাটক করছে? শিউলি বেগম বলেন,
- দাও দাও। তোমার শাশুড়ি তুমিই তো দেখবে। আমরা আজ আছি কাল নেই।
ধীরে সুস্থে পায়ের গোড়ালি ও তার আশপাশের জায়গায় মলম দিতে থাকে মাহিবা। সকলেই তার দিকে তাকিয়ে। বিষয়টা বুঝতে পেরে অস্বস্তি ঘিরে ধরে তাকে। একবার চোখ উঠিয়ে সবাইকে দেখে আবার চোখ নামিয়ে জড়তা ভরা মুখে বলে,
- ইয়ে.. এরকম করে তাকিয়ে থাকলে তো লজ্জা লাগে।
কথা শুনে এবং কথার ধরণ দেখে হেসে দেয় সকলে। এই প্রথম আহমাদের হাসি দৃষ্টিগোচর হয় মাহিবার। মনে মনে আওড়ায় ,
- "মা শা আল্লাহ্"।
সালেহা বেগম বলে উঠেন,
- এই কেউ দেখবে না আমার বউমা কে। এই শিউলি চোখ সরা। দেখছিস না ও লজ্জা পাচ্ছে।
রসিকতা পূর্ন এই কথায় আবার হেসে উঠে সকলে, বাদ যায় না মাহিবাও।
সেই ক্ষণে ঘরে প্রবেশ করে সালেহা বেগমের বড় বোন শেফালী বেগম। এক ভাই তিন বোনের মাঝেই তিনিই সবার বড়। তারপর ভাই, সালেহা এবং সবার ছোট শিউলি বেগম। ঘরে ঢুকে হাসিখুশি পরিবেশ দেখে চোখ সরু করে তাকান সবার দিকে।
- কিরে? আমাকে রেখেই সবাই হাসছিস কেনো? বল দেখি, আমিও একটু হাসি।
হাসিমুখে শিউলি বেগম বলেন,
- তেমন কিছু না বড় আপা। দেখছি মেজো আপার বউভাগ্য আল্লাহ দিলে ভালোই। এসেই কেমন শাশুড়ির সেবা করছে দেখেছো!
তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে মাহিবাকে পরোখ করেন শেফালী বেগম।
- তাই নাকি! তেমন হলে তো ভালোই।
মাহিবার দিকে দৃষ্টি রেখেই তার কাছে এসে দাঁড়ান শেফালী বেগম। হুট করে মেয়েটার থুতনিতে হাত রেখে মুখ উঠিয়ে এদিক ওদিক ঘুরিয়ে দেখেন।
হাসিমুখে থাকলেও বড় খালা শাশুড়ির আগমনে পরিবেশ কিছুটা নীরব হয়। তার সম্পর্কে কথা উঠলে বেশ অস্বস্তি বোধ করে মাহিবা। হঠাৎ শেফালী বেগমের আক্রমণে চমকে ওঠে।
- চেহারা আছে মোটামুটি। কিন্তু রংটা আরেকটু উজ্জ্বল হলে ভালো হতো। নাকটা এতো উঁচু কেনো গো মেয়ে? কারো রং ভালো না হলে ছেলেমেয়ের রং তো আরো ময়লা হবে।
মাহিবা হতচকিত। এভাবে যে চেহারা নিয়ে মতামত দেওয়া যায় সে ধারণা তার ছিলো না। নাক কি সে নিজে বানিয়েছে নাকি যে বলবে এত উঁচু কেন! আর গায়ের রং? মাহিবা এ পর্যন্ত তার গায়ের রং নিয়ে তৃপ্ত ছিলো। যেমন আল্লাহ তাকে দিয়েছে তেমনি নিজের জন্য সর্বোত্তম বলে খুশিমনে মেনে নিয়েছে। না কোনো অসন্তুষ্টি ছিলো না কোনো হীনম্মন্যতা। শেফালী বেগমের আক্রমণে ভরকে গেলেও উত্তর দেওয়ার প্রয়োজন মনে করলো না। এমন চিন্তা চেতনার মানুষকে মুখে বলে কিছু বোঝানো যায় না, এরা ঠেকে শেখে। তার উপরে সে নতুন বউ। এখন কিছু বললেই যদি আবার কিছু মনে করে? থাক বাবা!
তবে শিউলি বেগম চুপ থাকলেন না। বড় বোনের কথার বিপরীতে বললেন,
- এখানে কার গায়ের রং তুমি ময়লা দেখলে বল তো? আমাদের আহমাদ-মাহিবাকে পাশাপাশি কি সুন্দর লাগে দেখেছো? আর ছেলেমেয়ে কেমন হবে এসব আল্লাহর ইচ্ছা। নাহলে দেখো তুমি দুলাভাই দুজনেই ফর্সা তাহলে তোমার সায়ান অমন শ্যামলা হলো কেনো?
ছেলের কথা উঠতেই মুখ বন্ধ হয়ে যায় শেফালী বেগমের। শিউলি বেগমের উত্তর শুনে মুখ নামিয়ে স্মিত হাসে। আহমাদ কিছু বলতে চাইলেও ছোট খালার কথায় আর কিছু বলার প্রয়োজন মনে করে না। মহিলা মানুষের মাথায় এতো প্যাচ কেন?
চলমান.