প্রাপ্তি (প্রথম অধ্যায়) — পর্ব ৩৫

লেখক: বিনতে ফিরোজ · বিভাগ: ইসলামিক · পর্ব ৩৫ · ৪৫ পর্বের মধ্যে ৩৫

বাড়ি ফিরতেই মাহিদকে খুঁজে বের করলো আহমাদ। ছেলেটা পড়তে বসেছিলো। তার সামনে পাঁচটা ললিপপ রেখে বললো।

- এই যে মাহিদ! তোমার চকলেট।

ললিপপ হাতে নিয়ে বিস্মিত চোখে তাকিয়ে রইলো মাহিদ। আহমাদের দিকে তাকাতেই দেখলো পেছনে দাঁড়িয়ে হাসছে মাহিবা। কটমটে চোখে বোনকে দেখলো। ফের হাসিমুখে আহমাদের দিকে তাকিয়ে বললো,

- ধন্যবাদ দুলাভাই।

আহমাদ প্রস্থান নিতেই মাহিবাকে চেপে ধরলো মাহিদ।

- এই! এসব তুই ইচ্ছা করে এনেছিস না?

- আমি! আমি কে?

মাহিবার নিষ্পাপ ভঙ্গির কথায় রেগে যায় মাহিদ। তেড়ে এসে বলে,

- সুবিধাবাদী মহিলা! আমি তোকে চিনিনা ভাবিস? এসব অখাদ্য আমি খাই? ঐ জন্যেই তো নিয়ে আসলি যেনো নিজে গিলতে পারিস!

- চিনলি না রে চিনলি না! আমার মতো রত্ন চিনলি না! চু চু! আফসোস লাগে তোর জন্য।

- এহ! আসছে আমার রত্ন! দূর হ তুই তোর এসব অখাদ্য নিয়ে।

ভদ্র মেয়ের মতো ললিপপগুলো নিয়ে যেতে যেতে মাহিবা অদ্ভুত সুর তুলে বলে,

- চিনলি না রে চিনলি না! আমার মতো রত্ন চিনলি না!

• • •

আহমাদ ছটফট করছে। পাশে বসে কাঁধে হাত রেখে অদৃশ্য ভরসার দেওয়াল তৈরি করে মাহিবা। সাহস পেয়ে সালেহা বেগমের কাছে কল দেয় আহমাদ। কুশল বিনিময়ের পর উশখুশ করে ছেলেটা।

- কি হয়েছে বাবা?

সচরাচর আহমাদকে এমন সম্বোধন করেন না সালেহা বেগম। মায়ের মন হয়তো সন্তানের বিপদ টের পান। আহমাদের কথাবার্তায় সালেহা বেগম বুঝতে পারেন কোথাও সমস্যা হয়েছে। কণ্ঠে ভরসার সুধা ঢেলে দেন ভদ্রমহিলা। ভরসা পেয়ে আহমাদ বলে,

- মা!

- বল।

- আমার.. আমার চাকরিটা চলে গেছে।

ওপাশটা নীরব। সেই নীরবতার সুযোগে ঘটনা সংক্ষেপে বলে আহমাদ। শান্ত অথচ দৃঢ়‌ কণ্ঠে সালেহা বেগম বলেন,

- ওরা বের না করলে তোর কাজ হতো নিজেই ঐ চাকরি ছেড়ে দেওয়া। যাক যেটা গেছে গেছে। ঐসব নিয়ে টেনশন করতে হবে না। ওখানে সাহেদ ভাই আছেন। তোর ছোটো চাচ্চু আছে। তাদের সাথে পরামর্শ কর। আল্লাহ একটা উপায় বের করে দিবেন।

- আমার জন্য দুয়া কোরো মা।

- করি বাবা। আল্লাহ সব কল্যাণে তোর সাথে থাকুন।

সালেহা বেগমকে কথাটা বলে নির্ভার হয় আহমাদ। যেনো বুকের অর্ধেক ভার কমে গেছে। মাহিবাকে জিজ্ঞেস করে,

- বাবা এসেছেন?

- হ্যাঁ।

- চলো কথা বলে আসি।

- চলুন।

আগে আগে যেতে গেলেই মাহিবার হাত টেনে ধরে আহমাদ। জিজ্ঞাসু চোখে তাকায় মাহিবা।

- কি হয়েছে?

- মাহি!

- জি! বলুন।

মাহিবাকে নিজের কাছে বসায় আহমাদ। ধীর, ভঙ্গুর কণ্ঠে বলে,

- আমি জানিনা বাবার প্রতিক্রিয়া কেমন হবে। বেকার ছেলের কাছে তার মেয়ে রাখবে কি না সেটাও একটা প্রশ্ন। অমত করলেও অস্বাভাবিক কিছু হবে না। বিয়ের এক মাসের মাথায়ই যে ছেলে বেকার হয়ে যায় তার কাছে মেয়ে রাখার ব্যাপারে ভাবতেই পারেন।

- এসব কথা উঠছে কেনো?

অস্থির কণ্ঠ মাহিবার।

- উঠছে। আমার কথা শোন। একজন বাবার জায়গায় থেকে এসব কিছু ভাবা স্বাভাবিক। কিন্তু তোমার কাছে আমার রিকোয়েস্ট..

থেমে যায় আহমাদ। মাহিবার দুই হাত নিজের করপুটে নিয়ে বলে,

- বাবা তোমাকে নিজের কাছে রাখতে চাইলে তুমি থেকো মাহি। কিন্তু আমাকে একটু সময় দিও। আমি শীঘ্রই কিছু একটার ব্যবস্থা করে ফেলবো ইনশাআল্লহ্। আমাকে তোমার জীবন থেকে আলাদা করে দিও না প্লিজ!

প্রথমে অস্থির হয় মাহিবা। পরক্ষণেই শান্ত হয়ে যায়। এটা সেই ছেলেই যে বিয়ের রাতে বলেছিলো, "আপনি থাকবেন আপনার মতো আর আমি আমার মতো।" সেই ছেলেটাই তাকে নিজের জীবনে রাখার অনুরোধ করছে। আল্লহর উপর ভরসা রাখলে তিনি সত্যিই আমাদের অভাবনীয় কিছু দান করেন। আরও একবার প্রমাণ পেলো মাহিবা।

আহমাদের হাত শক্ত করে ধরে মাহিবা বলে,

- আপনার হাত ধরেছি তো ছেড়ে দেওয়ার জন্য না! আল্লহ না চাইলে এই বন্ধন কেউ ছিন্ন করতে পারবে না। এই যে হাত ধরেছি না? এই হাত ধরার তৃপ্তি আমার ইহজনমে মিটবে না। জান্নাতেও আমি এই হাতই ধরবো ইনশাআল্লহ্।

মেয়েটাকে বুকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে আহমাদ। এমন সঙ্গীনি দান করার পরিবর্তে কি বলে শুকরিয়া আদায় করলে আল্লহ খুশি হবেন?

গুরুত্বপূর্ণ এক আলোচনা বসেছে সাহেদ সাহেবের ঘরে। আলোচনার ভারে পিন পতন নীরবতা বিরাজ করছে সর্বত্র। ঘটনা শুনেছেন সাহেদ সাহেব। আহমাদের চাকরি চলে গেছে। কারণ অবশ্য ছেলেটা বলেনি। সেটা না বললেও চলছে। সেই থেকে তিনি চুপ করে বসে আছে। তার নীরবতা আহমাদের ভয় বাড়াচ্ছে। হৃদস্পন্দনের গতি বাড়ছে। বহমান নৈঃশব্দের জাল ছিঁড়ে ভদ্রলোক বলেন,

- এখন তাহলে কি ভাবছো?

- জি?

ভয়ে সহজ কথাও বুঝতে বেগ পেতে হয় আহমাদকে।

- কোনো কাজ কি খুঁজছো? কি করবে কিছু ভেবেছো?

সাহেদ সাহেবের স্বর গম্ভীর। রাগ করেছেন কি না বোঝা যাচ্ছে না।

- আমার এক বন্ধুর সাথে কথা বলেছি। এছাড়া এখনও কিছু করিনি।

- আচ্ছা। আমি একটা পরামর্শ দিই।

- জি অবশ্যই।

- তোমার তো এখনও বয়স আছে। একবার বিসিএস চেষ্টা করে দেখবে নাকি?

ইতিউতি করে আহমাদ। এদিকে তার কোনো আগ্রহ নেই। কিন্তু চাকরি হারিয়ে শ্বশুরের সম্মুখে সেটা বলার সাহসও সে পাচ্ছে না।

- করা যায়।

- হ্যাঁ দেখো। আর আমার পরিচিত জায়গায় খোঁজ নিয়ে দেখি। টেনশন কোরো না। আল্লহ ভরসা।

- জি।

মুখে ছোট্ট উত্তর দিলেও বুকের বাকি বোঝাটাও কমে যায়। শ্বশুর নামক লোকটার থেকে এমন ভরসা সে আশা করেনি।

শ্বশুর বাড়ি দুদিন থেকে বাড়ি ফেরে আহমাদ সাথে মাহিবাও। এদিক সেদিক চেষ্টা করে চলেছে আহমাদ। ইতোমধ্যে তার চাকরি হারানোর খবর আত্মীয় মহলে ছড়িয়ে পড়েছে। কোনো কাজের খোঁজ পাওয়া যায় কি না সে উদ্দেশ্যে খালাতো ভাই সায়ানকে কল করে সে। কারণ শুনে ব্যস্ততা দেখায় সায়ান। স্পষ্ট অনাগ্রহ। চাকরি হারিয়ে একটা কাজ বেশ হচ্ছে। মানুষ চেনা! সম্পর্কে চাচা নামক লোকটার সাথেও কথা হয়েছে। কোনো আশাও দেননি, নিরাশাও দেখাননি। যেনো যার কাজ তার হিসাব। ভেঙে পড়ে না আহমাদ। মা, স্ত্রী, বন্ধু এবং সাথে শ্বশুরকে পাশে পেয়েছে সে। ভেঙে পড়ার প্রশ্নই ওঠে না!

•• •• ••

ভীষণ ছুটোছুটি করছে ছেলেটা। স্থির হচ্ছে না একদণ্ড। হাতের টাকা শেষ হয়ে আসছে প্রায়। পরের মাসে টাকা পাওয়ার নির্দিষ্ট কোনো উৎস নেই। জমানো টাকায় হাত দিতে হবে। সেটাও একটা ঝামেলার বিষয়। জমানো টাকা একবার ভাঙলে সেটা পুরোটাই খরচ হয়ে যায়। বাসা ভাড়া,মাহিবার খরচ,আফিয়ার খরচ, আয়িশার খরচ, বিদ্যুৎ বিল এসব ছাড়াও বাজার খরচ তো আছেই। দিশেহারা বোধ করে আহমাদ। কারো কাছ থেকে ধার নেওয়ার উপায় নেই। এই অবস্থা কতদিন চলবে কে জানে! কতদিনই বা ধারের উপর চলা যায়? পরিচিত এক জায়গায় গিয়েছিলো আজ বিকেলে। বেশ খানিকক্ষণ সময় ব্যয় করার পর বুঝলো এখানে টিকে থাকতে হলে ঊর্ধ্বতনদের তোষামোদি করা আবশ্যক। মনটাই বিষিয়ে গেলো। আলাপ সংক্ষেপ করে কোনো রকমে সে জায়গা থেকে বেরিয়ে এসেছে সে। মাগরিব পড়ে মসজিদ থেকে বের হয়ে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরছে। ফেসবুকে বেশ কিছু পেজে মেসেজ দিয়েছে। ছোটো পোস্ট হোক তাও একটা আয়ের উৎস অন্তত হোক। বিসিএস এর আশায় বসে থাকলে চলবে না। পড়াশোনা করা হয় না বছর দুই তিন হয়ে গেলো। বিসিএস হবে কি না ঠিক নেই। হলেও চাকরি এক দেড় বছরের আগে হচ্ছে না। তাই এখন একটা কাজ পাওয়া অতীব জরুরী হয়ে পড়েছে।

একটা ব্রিজের উপরে দাঁড়িয়ে ব্যস্ত নগরীর সৌন্দর্য পরোখ করতে চায় সে। তবে আজ কিছুতেই কোনো সৌন্দর্য্য ধরা পড়ছে না। হাসে আহমাদ। পকেট ফাঁকা থাকলে বুঝি সব সৌন্দর্য্য ফিকে পড়ে যায়? মানুষের মুখের দিকে তাকালে যেনো বুঝতে পারছে কে কাজ করে আর কে কাজের খোঁজে আছে। ঐ যে লোকটা দৌড়ে চলেছে, তার হাতের ব্যাগটা দেখে সে বোঝে সারাদিনের কর্মব্যস্ততা ছেড়ে সে চলেছে পরিবারের কাছে। রাস্তার অপর পাশে চায়ের দোকানে যে ছেলেটা সিগারেট মুখে নিয়ে উদাস চোখে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে, আহমাদ সেই ছেলেটার চোখে দেখতে পায় এক সাগর দায়িত্ব পালনের চিন্তা। সেদিন সে তামিমকে বলেছিলো বাবার অবর্তমানে ভাইয়ের পরিচয় বোনের বিয়ের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। আজ তার পরিচয় আফিয়ার জন্য বাঁধা তৈরি করবে না তো? না, চেষ্টা তাকে করতেই হবে! রাস্তার অপর পাশের দেওয়ালে কিসের যেনো নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি লেখা আছে। স্পষ্ট বুঝতে পারে না আহমাদ। মনে ক্ষীণ এক আশা নিয়ে সেদিকে পা বাড়ায়। চেষ্টার কোনো ত্রুটি রাখা যাবে না। নজর পোস্টারে বিদ্ধ রেখে ব্যস্ত সড়কে নামে। যান চলাচলের দিকে কোনো ধ্যান দেয় না ছেলেটা। দেবে কিভাবে? সব ধ্যান তো সে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতেই দিয়েছে। কিছু পথ অতিক্রম করলে পরের লাইন দৃশ্যমান হয়। চোখ সরু করে সেদিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখা ছেলেটা দেখতে পায় না তার ডান দিক থেকে ধেয়ে আসা প্রাইভেট কারকে। শুনতে পায় না চালকের অনবরত বাজানো হর্নের বিরক্তিকর শব্দ। শুনবে কিভাবে? সে যে মনোযোগ দিয়েছে বিজ্ঞপ্তিতে। নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে....

চলমান.