প্রাপ্তি (প্রথম অধ্যায়) — পর্ব ৩৮
লেখক: বিনতে ফিরোজ · বিভাগ: ইসলামিক · পর্ব ৩৮ · ৪৫ পর্বের মধ্যে ৩৮
সালেহা বেগমের অশ্রুসিক্ত মুখে হাসি ফুটেছে। অনেকের কাছে এই ঢের হতে পারে। তবে যাদেরকে কেন্দ্র করে আমরা আবর্তিত হচ্ছি সেই দুইজন মানুষ হাসপাতালের কেবিন থেকেই মুখে কুলুপ এঁটেছে। সেই দুর্ঘটনার আজ পাঁচ দিন পেরিয়ে গেলো। আরো একবার সূর্য তার আবশ্যিক দায়িত্ব হিসেবে অস্ত গেছে। পৃথিবীকে আঁধারের চাদরে মুড়িয়ে অন্ধকার তার রাজত্ব বজায় রাখার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তবে তার সেই সব চেষ্টাকে ব্যর্থ করে মানুষ সূর্যালোকের উপর আরো বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। রিলিজ দেওয়ার কালে ডাক্তার বলেছিলেন,
- পেশেন্টের পায়ের অবস্থা এখনো অনেক ভালো না। অপারেশনের মাধ্যমে রিস্ক কেটেছে মাত্র। এখন প্রধান কাজ হলো এক মাস বেড রেস্টে থাকা। বেড রেস্ট মানে ফুল বেশ রেস্ট। কোনো এদিক সেদিক যেনো না হয়। ডান পায়ের উপর এখন একদম ভর দেওয়া যাবে না। ঠিক এক মাস পর একটা চেকআপ করাবেন তারপর পরবর্তী করণীয় বলে দেওয়া হবে। টেক কেয়ার।
ডাক্তারের কথা কর্ণ কুহর ভেদ করে মস্তিষ্কের অলি গলিতে পৌঁছানো মাত্র আহমাদের বুলি বন্ধ হয়েছে। মাহিবা নির্বিকার। সালেহা বেগম খুশি। আফিয়া ফিরে পেয়েছে স্বস্তি। সবার এমন চিন্তাহীনতা দেখে আহমাদ আরো বেশি চিন্তায় পড়ে যায়। চিন্তায় চিন্তায় কখন যে পুরো রাস্তা পার হয়ে গেছে সে খেয়াল করেনি। ইফাদের সাহায্যে গাড়ি থেকে নামতেই তার ধ্যান ভাঙ্গে। ইফাদ বলে,
- কি রে শালা! হাঁটতে পারবি? তুই বললে আমি আর ভাবি তোরে চ্যাংদোলা করে নিয়ে যাইতে পারি। নো টেনশন! বল, নিবো?
কটমট করে তাকায় আহমাদ।
- মজা নিস? নে! এক মাঘে শীত যায় না।
নিষ্পাপ মুখে ইফাদ বলে,
- শুধু মাঘে শীত যাবে ক্যান? পৌষ কি দোষ করলো? তুই পৌষ আর মাঘের ডিভোর্স করায় দিচ্ছিস আহমাদ? ব্যাটা তুই তো নিমকহারাম রে! যেই শীতরে উসীলা বানায়ে কম্বলের ভেতর এহেম এহেম করিস সেই শীত, সেই পৌষ মাঘরে তুই আলাদা করে দিচ্ছিস! হাউ ক্রুয়েল!
- আল্লাহর কসম ইফাদ! আমার পা যদি ভালো থাকতো তোরে আমি চান্দে ঘুরায় আনতাম। সেইটা না পারলে তারা তো দেখাইতামই।
সিঁড়িতে পা রেখে দুই হাতে আহমাদকে ভীষণ যত্নে আগলে রেখে ইফাদ মেকী ভাবুক দৃষ্টিতে বলে,
- আহারে! তোর এই বুদ্ধি নভোচারীরদের দিলে ওরাও উপকৃত হইতো তুইও একটু ব্যাংক ব্যালেন্স করতে পারতি। বাই দা মেঠো পথ! এতো বুদ্ধি নিয়ে তুই ঘুমাস কেমনে?
মাহিবা তাড়াতাড়ি হেঁটে আহমাদ ইফাদের পেছন থেকে সামনে চলে আসে। মুহূর্তেই বাড়ির তালা খুলে সকলকে ঢোকার ব্যবস্থা করে দেয়। আহমাদ ইফাদের দিকে দৃষ্টি দিয়ে অগ্নি নিক্ষেপ করে বোঝায় তার বিপদ অনাগত, দ্রুত আশ্রয় কেন্দ্রে আশ্রয় নিতে হবে। এদিক ওদিক তাকিয়ে হিসাব কষতে থাকে ইফাদ। বিপদ আসতে ঠিক কতোটা দেরি হতে পারে?
নিজের কক্ষে ফিরে এসে এই পাঁচ দিনের সমস্ত ঘটনা যেনো আহমাদের চোখে ভাসে। পুরো স্মৃতি আওড়ানো হলে ছেলেটা আবার নিস্তব্ধ হয়ে যায়। ইফাদ বিদায় নিতে এলে চোখ বন্ধ করেই বলে,
- খেয়ে যা।
- এই শালা এই! গাড়ির ধাক্কায় কমন সেন্স কি নদীতে ভাসায় দিয়া আসছিস? তোর মা বউ পাঁচ দিন কুত্তা দৌড়ানি পর বাড়ি আসছে। তারা কি এখনই রান্নায় ঢুকবে? মানে, মাঝে মাঝে যে তুই এমন কথা কস না!
- তাইলে দুর হ।
আহমাদের শীতল স্বরে রেগে যাওয়ার পরিবর্তে চিন্তিত হয় ইফাদ। বন্ধুর কাছ যেয়ে বসে ভরসা দেওয়ার সুরে বলে,
- চিন্তা করিস না দোস্ত। একটা ব্যাবস্থা হয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ। খামাখা টেনশন করে মাথায় প্রেশার দিস না।
- হাসপাতালে কতো টাকা খরচ হইসে রে?
- হইসে কিছু। আগে পা ঠিক হোক তারপর বলবো। তোরে টাকা একেবারে দিয়ে দেই নাই। আমার টাকা আমি ফেরত নিবোই।
ইফাদের মুখটা হাসি হাসি। তবে সেই হাসি ছোঁয়াচে হয়ে আহমাদকে ছুলো না। তার বন্ধ চোখের পাতা স্থির। সেই স্থির মুখে তাকিয়ে ইফাদ বলে,
- তামিম ওরা আসতে চাচ্ছে। সেদিন তো হাসপাতালে গেছিলো। এরপর আমার সাথে প্রতিনিয়তই যোগাযোগ হইসে। কি বলবো ওদের?
- আসতে চাইলে আসবে।
- আচ্ছা।
আহমাদ নিশ্চুপ। ইফাদই আবার বলে,
- আচ্ছা আমি আসি তাইলে।
- হুম।
আহমাদ স্থির। গম্ভীর তার স্বর। ইফাদ প্রস্থানের উদ্দেশ্যে আসন ছাড়ে। যাওয়ার আগে আহমাদের শিয়রে যেয়ে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। নিঃশব্দে বুঝিয়ে দেয় সে আছে। পাশে আছে, কাছে আছে।
সালেহা বেগম ছেলের কাছে এসে বসেন। মন ভরে, চোখ জুড়িয়ে ছেলেকে দেখেন। কতো কথা বলেন! শিউলি বেগম এসেছিলেন। থাকতেও চেয়েছিলেন। তার স্বামীর জরুরী কাজ পড়ে যাওয়ায় শহরে বাইরে যেতে হয়েছে। তাই বেচারী থাকতে পারেনি। এমন হাজার কথার ফুলঝুরি সাজিয়ে বসেন। আহমাদ তাকিয়ে থাকে মায়ের মুখের দিকে। কয়েকদিনেই কেমন পাংশুটে হয়ে গেছে মুখটুকু। আহমাদ প্রয়োজনে হু হা করে নতুবা চুপ থাকে। কিছুক্ষণ পর সালেহা বেগম উঠে যান রান্নাঘরের দিকে। মেয়েটা একা কি করছে কে জানে।
কিছুক্ষণ পর আয়িশা আসে আহমাদের ঘরে। দরজার কাছে দাঁড়িয়ে নিষ্পাপ কণ্ঠে আবদার করে,
- দাদাভাই! আমি তোমার বুকে একটু ঘুমাই? তুমি কি ব্যাথা পাবে?
হাত বাড়িয়ে দেয় আহমাদ। এমন ব্যাথা সে রোজ পেতে চায়। হার রোজ!
চোখ বন্ধ করে বুকে আয়িশাকে জড়িয়ে শুয়ে থাকে আহমাদ। বুঝতে পারে কারো উপস্থিতি। তবুও চোখ খুলে তাকায় না সে।
আফিয়া ভাইয়ের পাশে এসে বসে। ভাইয়ের মাথায় হাত রেখে তাকিয়ে থাকে খোলা জানালা দিয়ে উকি দেওয়া ঐ অসীম আকাশের দিকে। হারিয়ে যায় ভাবনার রাজ্যে। জানতে পারে না তার পাশে একজন মানুষ তার মতোই চিন্তা করে চলেছে। একই চিন্তা, একই ভাবে।
মাহিবা রান্নাঘরে ছিলো। সালেহা বেগম যেয়ে মেয়েটাকে ঘরে পাঠিয়ে দিলেন। ছেলেটার কখন কি না কি দরকার হয়! খাবার হাতে কক্ষে প্রবেশ করে মাহিবা। আহমাদের ওষুধের সময় হয়েছে। বেশি রাত করা ঠিক হবে না। আহমাদ শুয়ে ছিলো। আফিয়া যাওয়ার সময় ঘুমন্ত আয়িশাকে নিয়ে গেছে। মেয়েটা ঘুমে কাদা হয়ে ছিলো।
আহমাদকে খাইয়ে সকল কাজ সমাপ্ত করতে লেগে যায় মাহিবা। আহমাদ চেয়ে চেয়ে মেয়েটাকে দেখে। নির্নিমেষ...
বেশ কয়েকদিন কেঁটে গেছে হাসপাতাল থেকে ফিরে আসার। আহমাদ সেদিন থেকেই নীরবতাকে নিত্যকর্ম হিসেবে বেছে নিয়েছে। মাহিবাও বেশি ঘাটাঘাটি করেনি। ভেবেছে মানুষটা অ্যাকসিডেন্ট, কাজ কর্ম নিয়ে হয়তো চিন্তায় আছে। মন খারাপের সময় বেশি জোরাজুরি হয়তো ভালো লাগবে না।
কিছুদিনে পরিণত হওয়া নিত্য কাজ হিসেবে রাতে আহমাদকে খাওয়াতে আসে মাহিবা। আহমাদ ঘুমিয়ে ছিলো। তাকে ডেকে উঠিয়ে ওয়াশরুমে নিয়ে যায়। এক হাতে মাহিবার ঘাড় ধরে আরেক হাতে হাতের কাছে পাওয়া দেওয়াল, আসবাব ধরে ধরে ওয়াশরুম পর্যন্ত যায় আহমাদ। তাকে পৌঁছে দিয়ে বাইরে এসে অপেক্ষা করে মাহিবা। কাজ সম্পন্ন করার পর নিজে নিজে উঠতে চায় আহমাদ। তবে নিজেকে গুছিয়ে উঠতে পারে না। হুট করে খুব লজ্জা পেয়ে যায় আহমাদ। নিজেকে বড় অথর্ব মন হয়। নিজের মৌলিক কাজটুকুর জন্যও আজ সে অন্য কারো উপর নির্ভরশীল। বেশ কিছুক্ষণ নিশ্চুপ হয়ে বসে থাকার পর বাধ্য হয়ে মাহিবাকে ডাকে। তাকে বিছানায় নিয়ে যায় মাহিবা। খাওয়া শেষে আহমাদ বলে,
- মাহি!
- জি।
- তুমি চাইলে চলে যেতে পারো।
- কি বলছেন?
- তুমি চাইলে তোমার বাসায় যেতে পারো।
- এটাই তো আমার বাসা।
- আমি বলতে চাচ্ছি, আমার মনে হয় তোমার উচিত বাবার বাসায় চলে যাওয়া।
- কি বলতে চাচ্ছেন আপনি? সোজাসুজি বলুন।
কথার ধারা কোনদিকে গড়িয়ে চলেছে বোধগম্য হয় না মাহিবার।
- দেখো আমি এখন অক্ষম একটা মানুষ। নিজেই চলতে ফিরতে একজন দরকার হয়। তার উপর আবার বেকার। কবে কাজ পাবো, আদও পাবো কি না সেটাও একটা প্রশ্ন। নিজের বেসিক নিডসই যে পূরণ করতে পারে না সে কিভাবে অন্য একজনের দায়িত্ব নিবে বলো?
- আপনি কি আমাকে একেবারে চলে যেতে বলছেন?
মাহিবার স্বর অদ্ভুত শান্ত।
- কিছুটা তেমনই। তুমি একটু ভাবলেই বিষয়টা বুঝতে পারবে। আম...
হয়তো এতক্ষণের নীরবতা ছিলো ঝড় আসার পূর্বাভাস। হয়তো তার ধৈর্য্যের পাত্র পরিপূর্ণ হয়েছিলো। সর্বশেষ বিন্দু সেখানে অতিরিক্ত চাপ যুক্ত করেছে। তবে তার বিপরীত অভিব্যক্তি ছিলো আহমাদের কাছে সম্পূর্ণ অনাকাঙ্ক্ষিত। আহমাদের কথা শেষ হওয়ার পূর্বেই হাতে থাকা কাঁচের গ্লাস সশব্দে ফেলে দেয় মাহিবা। প্রায় চিৎকার করে বলে,
- আর কি কি করতে হবে বলুন? একেবারে বলে দিন আমাকে আর কি কি করতে হবে! বিয়ের দিন বলেছেন "আপনি আপনার মতো থাকবেন আর আমি আমার মতো"। নিজেকে আমার থেকে দূরে নিয়ে গেছেন। অচেনা পরিবেশে এনে আমাকে অথৈ সাগরে ফেলে দিয়েছেন। আমি কিছু বলিনি। বাইরের মানুষের সাথে রাগ করে সেটা আমার উপর ঝেড়েছেন। কিছু বলেছি আমি? বলিনি। তারপর হুট করে এসে "মাহি মাহি" বলে মুখে ফেনা তুলে ফেললেন। এখন বলছেন আমি যেনো বাবার বাড়ি চলে যাই। কেনো? আমাকে কি আপনার পুতুল বলে মনে হয়? আমার কি ইচ্ছা বলে কিছু নেই? নাকি থাকতে পারে না? আপনি যা বলেছেন যেভাবে বলছেন সেভাবেই মেনে নিয়েছি। এখন বলছেন চলে যেতে। কেনো? আমার আর দরকার নেই? খাওয়া পড়ার অভাবে কি আমি আমার বাবা মাকে ছেড়ে এখানে এসেছি? আপনার মা বোনকে কিছু খাওয়াবেন না আপনি? নাকি ওদের রাস্তায় ফেলে দেবেন? কি করবেন বলুন!
ডুকরে কেঁদে উঠে মাহিবা। ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কাঁচের টুকরো গুলোর উপর বসে পড়ে। পায় বিঁধে যায় একটা টুকরো। সেদিকে কোনো ধ্যান নেই মেয়েটার। একধারে এতো কথা বলে ক্লান্ত মেয়েটা। গলা কাঁপিয়ে শেষ কথাগুলো বলে ক্ষান্ত হয় মেয়েটা।
অবাক চোখে তাকিয়ে থাকে আহমাদ। মেয়েটার মনে এতো ক্ষোভ জমে ছিলো তার প্রতি? এতোটা!
গ্লাস ভাঙার আওয়াজ পেয়ে ছুটে আসেন সালেহা বেগম। মাহিবাকে এই অবস্থায় পেয়ে তার অবাকের সীমা পাহাড় ছোয়। ছুটে যেয়ে মেয়েটাকে ধরতে গেলে ছড়িয়ে থাকা কাঁচ নজরে আসে। ছেলে বউমার মাঝে কিছু হয়েছে কি না কে জানে! কি বলবেন ভেবে পাননা। তবে মাহিবার পায়ের অবস্থা দেখে তৎক্ষণাৎ মেয়েটাকে উঠিয়ে নেন। আপাতত পায়ের একটা ব্যবস্থা করা জরুরী। কলের পুতুলের মত শাশুড়ির সাথে যায় মাহিবা।
প্রস্থান পানে চেয়ে থাকে আহমাদ। এক দৃষ্টিতে।
চলমান.