প্রাপ্তি (প্রথম অধ্যায়) — পর্ব ১৬

লেখক: বিনতে ফিরোজ · বিভাগ: ইসলামিক · পর্ব ১৬ · ৪৫ পর্বের মধ্যে ১৬

আহমাদের আইডিতে ঢোকে মাহিবা। আশ্চর্যের সাথে খেয়াল করে আহমাদের অত্যন্ত সুন্দর একটা ছবি প্রোফাইলে দেওয়া। আপন শক্তিতে জ্বলে ওঠে মেয়েটা। বিয়ের সময় তো একটা রোবট মার্কা ছবি দিয়েছিলো। আর এখানে দেখো! নায়কের ছবি ঝুলিয়ে রেখেছে! আর ওকে কি না বলে, "সিঙ্গেল বোর্ড ঝুলিয়ে রাখার মানে কি"। আবার লোকটার সাথে অ্যাডও নেই। এটা একটা কথা! বিয়ে করা বরের সাথে অ্যাড না থাকলে হয় নাকি! ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট দিতে যেয়েও থেমে যায়।

- আমি দিবো কেনো? হুহ দিবো না!

ফন্দি আঁটে আহমাদকে দিয়ে রিকোয়েস্ট পাঠানোর। চঞ্চল হরিণীর মতো মেয়েটা স্থির বসে রয় কারো অপেক্ষায়।

•• •• ••

চার জনের একটা দল ক্যাফের এক প্রান্ত দখল করে রেখেছে। টেবিলগুলো ছোটখাটো হওয়ায় দুটো টেবিল এক করে নিজেদের দখলে নিয়েছে। কেউ হাতের তালু দিয়ে টেবিলে শব্দ করে চলেছে, কারো বা আঙ্গুল টেবিলে অনবরত নতুন নতুন শব্দ উৎপন্ন করছে, কারো দৃষ্টি ফোনে তো কেউ কাঁচবদ্ধ জানালা দিয়ে দূরে বৃদ্ধ হয়ে আসা গাছের সৌন্দর্য অবলোকনে ব্যস্ত। একেকজন একেক কাজে ব্যস্ত। তন্মধ্যে ছটফট করে চলেছে ইফাদ। তাকে পাশ থেকে শিহাব টোকা দেয়।

- কিরে! বাইম মাছের মতো লাফাস ক্যান?

- পেটের ভিতর গন্ডগোল শুরু করছে তাই! আমি লাফাই তাতে তোর কি?

- সোজা গেলে বামে তোর কাঙ্ক্ষিত জায়গা। যা ফোট!

সামনে তাকিয়ে বেশ খানেক দূরে "উইমেন্স ওয়াশরুম" লেখা দেখতেই দাঁত কিড়মিড়িয়ে ওঠে ইফাদ।

- শালা! লুজ ক্যারেক্টারওয়ালা!

একপেশে হাসি হাসে শিহাব। গুনগুন করে,

- ম্যা কারু তো সালা ক্যারেক্টার ঢিলা হ্যাঁ!

- থামো জনগণস! আজকে এতদিন পরে আমাদের মিলন সভাকে তোমরা পন্ড করে দিও না প্লিজ!

জয়ের কথায় লড়াই থামায় দুজন। ইফাদ শিহাবের দিক থেকে মুখ ঘোরায়। স্পষ্ট খোঁচা। শিহাব আমলে নেয় না।

- কি রে! তোর জানে জিগার আসে না ক্যান? আর কতক্ষণ এমনে বইসা থাকুম?

- অয় তো আর আপনার মতো হাওয়া খায় আর ঘুরে না তাই সময় লাগতেই পারে। যত্তোসব অশান্তি!

শেষ কথাটা বিড়বিড় করে বলে ইফাদ। শুনতে পায় না শিহাব। কিন্তু পূর্বের কথার জের ধরে কিছু বলতে থাকে। সেদিকে মন নেই বাইরে দৃষ্টি তাক করে রাখা উদাস ছেলেটার। একটুপর ছেলেটা ফোন বের করে লুকিয়ে রাখা এক প্রাইভেট ফাইল ওপেন করে। একটার পর একটা ছবি বের করে সন্তর্পনে দেখতে থাকে। খুব যত্নে স্ক্রিনের উপর আঙ্গুল বোলায়, যেনো স্বয়ং মানুষটা! পিঠে কারো স্পর্শ পেয়ে মলিন চোখজোড়া তুলে দেখে। আহমাদ ক্লান্ত হেসে ইফাদের পাশে রাখা চেয়ারটা নিয়ে ছেলেটার পাশে বসে। স্ক্রিন অফ করে দিয়ে ফোন রেখে দেয় সেই ব্যক্তি। ইফাদ হায় হায় করে বলে,

- কি রে! কি হইলো এইটা! তোর জন্যে আমি এতক্ষণ ধরে জায়গা ধরে রাখলাম আর তুই ঐ ছ্যাকাখোরের পাশে বসলি ক্যান? বাই এনি চান্স, ভাবি কি তোরে ছ্যাকা দিসে?

সন্দেহী কণ্ঠে শুধায় ইফাদ। হেলান দিয়ে বসে আহমাদ বলে,

- ক্লান্ত লাগতেছে। একটা ঠান্ডা অর্ডার দে।

- কি অবস্থা তামিম? কোনো খবরই নাই তোর!

পাশে বসে থাকা ছেলেটার দিকে তাকিয়ে বলে আহমাদ। ততক্ষণে কোল্ড ড্রিংক অর্ডার করেছে ইফাদ। তামিমের থেকে কোনো উত্তর না পেয়ে জয় বলে,

- ঐ শালারে বাদ দে! হুদাই মুখটা লটকাইয়া রাইখ্যা দেয়।

কোল্ড ড্রিংক আসতেই গলা খাঁকারি দিয়ে জয় বলে,

- সুপ্রিয় বন্ধুগণ! আজ এক মাস ২০ দিন পর আমরা সকলে আবার একত্রিত হয়েছি। এরই মাঝে গলায় বেড়ি পড়েছেন আমাদের বিয়ে বিমুখী, আহমাদ ইয়াসির! বউ ছাড়া ছেলেমেয়ে নিয়ে নিজ জায়গায় অটল আছেন ইফাদ নাসের। প্লে বয় খ্যাত হ্যান্ডসাম শিহাব তার গেম চালু রেখেছেন। আমাদের ব্যাকা বয় তামিম ব্যাকাই আছেন। আর আমি! নো আপডেট!

শেষ কথায় হেসে ফেলে সকলে। বাদ যায় না তামিমও। বন্ধুদের আড্ডায় মনোযোগ দেওয়ার চেষ্টা করে। ইফাদের হাসি দেখে শিহাব বলে,

- জানিস তোর গালে এই যে টোল পড়ে না? এটা একটা সমস্যা! বংশগত সমস্যা!

ক্ষেপে যায় ইফাদ। কণ্ঠে রাগ নিয়ে বলে,

- কীহ! আমার বাপের গালে তো টোল পড়ে না! শালা তোর বংশে সমস্যা!

- আমি কখন বললাম বংশে সমস্যা!

হতবিহ্বল শিহাব।

- আরে কি টম এন্ড জেরির মতো শুরু করলি বল তো! শিহাব বলতে চাচ্ছে এইটা একটা জেনেটিক বিষয়।

শিহাব পেশায় একজন মেডিকেল অফিসার। তার প্র্যাকটিসের সময়কাল এখনও এক বছর হয়নি। মেডিকেল লাইনে এসে বন্ধুদের সাথে তেমন বিচ্ছেদ ঘটেনি। এর একটা কারণ সে পড়েছে স্থানীয় মেডিকেলে। বন্ধুদের সাথে প্রায়ই দেখা হতো। আরো একটা প্রধান কারণ, "মায়াবাড়ি"। ইফাদের সাথে যার বন্ধুত্ব যেমনই হোক মায়াবাড়ির সাথে সকলের রয়েছে এক অদৃশ্য দৃঢ় বন্ধন।

আহমাদের কথায় কষ্ট পায় ইফাদ। কোথায় তার পক্ষ নিবে, না! শিহাবের কথায় কথায় তাল মেলাচ্ছে। মনে মনে পণ করে ইফাদ, আহমাদের সাথে আর কোনো কথা হবে না।

ইফাদ জয়কে জিজ্ঞেস করে,

- তোর আইটি ফার্মের কি অবস্থা? ঐটা কি মুরগির ফার্ম হয়ে গেছে?

- আস্তাগফিরুল্লাহ! কি ছি মার্কা কথা কস! শালা আমার আগে মাইয়ার বাপেরা ফার্ম দেখে, জানি ঐডার লগেই বিয়া দিবো।

হাসির রোল পড়ে যায় টেবিলে। জয় বিয়ের চেষ্টা করছে। বেচারা এখনও পাত্রী পাচ্ছে না। এতক্ষণে কথা বলে তামিম।

- তোর বিয়ের এক্সপেরিয়েন্স বল ব্যাটা। দিল্লীর লাড্ডুর কি অবস্থা?

- কথা তো ঠিক! তোর বউরে তো দেখাই হইলো না! শালা বউ দেখাবি কবে?

শিহাবের কথা শুনতেই তৎক্ষণাৎ মানসপটে ভেসে ওঠে মাহিবার আবরণে ঢাকা মুখ। শান্ত, ধীর কণ্ঠে বলে,

- বউ হলো একান্ত পার্সোনাল বিষয়। পাবলিকে আনা যাবে না।

- তাইলে তোর বউ দেখাবি না?

- আমার বউ তো আর এলিয়েন না! নতুন কিছু দেখার নাই।

- শালা ভাবতাসে আমরা নজর দিমু! যা দেখলাম না। ভাবিরে কবি আমার লাইগ্গা দোয়া করতে। দিল্লীর লাড্ডুর লাইগ্গা মনডা হাহাকার করতাসে।

জয়ের কথা শুনে হাসে আহমাদ। জয় ফের শুধায়,

- এই আহমাদ! ভাবির কোনো বান্ধবী নাই? একটু লাইন কইরা দে না!

- ছিলো একজন। কিন্তু..

- কিন্তু কি?

উদগ্রীব জয়।

- শি ইজ ডেড।

- কিহহ!

- ক্লোজ ফ্রেন্ড একটা ছিলো। দুই বছর আগে সে মারা গেছে। আর কোনো ফ্রেন্ডের কথা জানিনা।

- জয় তো বিয়ার আগেই বিধবা হইলি রে!

জয় আকস্মিক একটা ধাক্কা খেলেও তার মনে কৌতুহল সৃষ্টি হয়।

- কিভাবে মারা গেলো রে?

- রোড এক্সিডেন্ট। ওকে সরাতে যেয়ে নিজে গাড়ির সামনে পড়েছে।

- ভাবিরে?

- হ্যাঁ। আর এজন্য ও খুবই গিলটি ফিল করে। দুইদিন আগে মেয়েটার মৃত্যুবার্ষিকী গেলো। তখন রোজাও ছিলো।

দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে আহমাদ। দিনটার কথা ভাবলেই তার দম আটকে আসে। মেয়েটা কিভাবে ছটফট করছিলো!

পরিবেশটা বেশ ভারী হয়ে যায়। শান্তশিষ্ট তামিম কথা ঘোরাতে চায়।

- ইফাদ, কানাডা সেটেল হচ্ছিস কবে?

- ধুরু মিয়া! কানাডা গেলেই আমার মনে হয় মরুভূমি আইসা পড়ছি। কোনদিকে মানুষ নাই। এইখানেই আমার ভালা। যেদিকে তাকাই মানুষ আর মানুষ।

- কারেকশন! মাইয়া আর মাইয়া!

শিহাবের কথার বিপরীতে তার দিকে তাকিয়ে ইফাদ বলে,

- যার মনে যা ফাল দিয়া উঠে তা!

- শোন! তোদের সবার আমার বাসায় দাওয়াত! আফটার ম্যারিজ ট্রিট বলতে পারিস! কবে আসবি বল!

হৈ হৈ করে ওঠে সকলে। সকলের হৈ চৈ এর মাঝেই আহমাদের কানে কানে শিহাব জিজ্ঞেস করে,

- বউ কি আসলেই দেখাবি না?

শান্ত, দৃঢ় দৃষ্টিতে শিহাবকে দেখে আহমাদ বলে,

- শি ইজ রিজার্ভড শিহাব।

- ওকেই!

সারেন্ডার করার ভঙ্গিতে হাত উচু করে শিহাব।

সকলের কাজের মিল রেখে আহমাদের বাসায় আগামী মাসে যাওয়ার কথা জানায়। আহমাদও নিমন্ত্রণ পাকা করে।

আসে ভঙ্গ হতেই উঠে যায় সকলে। কিন্তু তামিমকে আটকে রাখে আহমাদ। ইফাদ অভিমান করে ডাকে না আহমাদকে। তখন থেকেই সে আহমাদের সাথে আর কথা বলেনি। আহমাদ খেয়াল করলেও সবার সামনে কিছু বলেনা। প্রিয়জনের অভিমান আড়ালে ভাঙ্গালে তো কোনো অসুবিধা নেই তাই না?

- কি অবস্থা? এতো চুপচাপ কেনো?

ইঙ্গিত বুঝতে দেরি হয় না তামিমের। তার দৃষ্টি তখনও উদাস। এবার যেনো সেখানে কিছু জল যোগ হলো। উদাস চোখের জলাভাব চোখ এড়ায় না আহমাদের। ছেলেটার ঘাড়ে হাত রেখে নীরবে বোঝায় সে পাশে আছে, কাছে আছে।

ভাঙ্গা ভাঙ্গা কণ্ঠে থেমে থেমে তামিম বলে,

- ও.. ও বিয়ে করে নিল আহমাদ! ও.. কিভাবে পারলো!

বিস্মিত হয় না আহমাদ। পুরো ঘটনাই তার জানা। পাঁচ বছর যাবৎ একটা মেয়ের সাথে সম্পর্কে ছিলো তামিম। ভার্সিটি থেকে ওদের বন্ধু বৃত্তের সকলেই এটা জানে। কিন্তু কিছুদিন আগে একটা ঠুনকো বিষয় নিয়ে কথা কাটাকাটির এক পর্যায়ে সম্পর্ক ছিন্ন করার কথা বল মেয়েটা। নৈমিত্তিক ব্যাপার ভেবে গুরুত্ব না দিলেও বিয়ের খবরে পাগলপ্রায় হয়ে যায় তামিম। বন্ধু বর্গের কেউ কেউ মেয়েটাকে অনুরোধ পর্যন্ত করেছে। কিন্তু সে নিজ কথায় অটল থেকে অন্যের ঘরনী হয়েছে। কারোরই এটা অজানা নয়। তখন থেকেই যেনো তামিমের জীবন গাড়ি এক স্ট্যান্ডেই থেমে গেছে। সকলেই কোনো না কোনো কাজে যুক্ত হলেও তামিম এখনও বেকার। তার অন্তঃস্থ কোনো শক্তি নেই। স্পৃহা বিহীন ছেলেটা যেনো নির্জীব পুতুল হয়ে গেছে। আহমাদ বুঝতে পারে মেয়েটাকে সে মণিকোঠায় কোন স্থানে বসিয়েছিলো।

- তামিম! মেয়েটা এখন কারো স্ত্রী! মানতে কষ্ট হলেও এটাই সত্যি। দুদিন পর কারো মা হবে। তার ছবি ফোন এভাবে রাখাটা দৃষ্টিকটু। আশা করি তুই বুঝতে পারছিস আমি কি বলতে চাচ্ছি?

মলিন দৃষ্টিতে তাকায় তামিম। তার চোখের দিকে তাকিয়ে আহমাদ বলে,

- বাবা ছাড়া একটা মেয়ের অভিভাবক কে জানিস? তার ভাই। সে ছোটো হোক অথবা বড়ো। তনু আপুর অভিভাবক তুই। কেউ যখন আপুর জন্য সম্বন্ধ নিয়ে আসবে তখন কিন্তু তোর পরিচয় সেখানে খুব ম্যাটার করবে। আপু বিয়ের বয়স হয়েছে। আজ হোক কাল হোক তার বিয়ে হবে। তারপর আন্টির দায়িত্ব তোকে নিতে হবে। সাথে নিজের দায়িত্বও।

- আমি তো ওকে ভুলতে পারি না রে!

- ভুলতে হবে না। তুই যতো ভোলার চেষ্টা করবি সেটা মনে আরো বেশি জেঁকে বসবে। তুই নিজের দায়িত্বগুলো বুঝে নে। জীবনটা অনেক ছোটো তামিম! কারো প্রতি কষ্ট মনে চেপে এই ছোট্ট জীবনের আনন্দটুকু নষ্ট করিস না। নিজেকে একটা সুযোগ দে। তোর জন্যও কেউ না কেউ আছে। নিজের জীবনটাকে গুছিয়ে নেওয়ার চেষ্টা কর। যে তোর কদর বোঝেনি তাকে কেন্দ্র করে একটা গোটা জীবন নষ্ট করে দেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ না তামিম!

চোখ মুছে মাথা নাড়ায় তামিম। তাকে সাথে নিয়ে পেছন ঘুরলেই দেখতে পায় ইফাদ মুখ কালো করে দাঁড়িয়ে আছে। তামিমের কষ্ট সকলের মাঝেই ছাপ ফেলেছে। কিন্তু আজকের মতো করে কেউ তাকে বোঝায়নি। তিনজন আহমাদের বাইকে বসে তামিমের বাসায় যায়। তামিম নামতেই তাকে বিদায় জানিয়ে বাড়ির পথ ধরে আহমাদ। ইফাদ কথা বলছে না ঠিক, কিন্তু তার সঙ্গ ছাড়েনি এক মুহূর্তের জন্যও। আহমাদ মিটিমিটি হাসে,

- বিয়ে করে পস্তাইনি, আমার না হওয়া বিয়াই! না করলেই মনে হচ্ছে আফসোস থাকতো।

কোথায় গেলো ইফাদের পণ! শুরু করে দিলো হাজারো অভিযোগ, হাজারো কথা।

- কে যেনো আড্ডায় আসতেই চাচ্ছিলো না। এখন আবার সবাইকে দাওয়াত করা হচ্ছে! যত্তোসব ঢং!

হাসে আহমাদ। কে বলবে এটা একটা ছেলে? কেমন মেয়েদের মতো অভিমান করে!

আঁধারে ছেয়ে থাকা রাস্তা তার বুকে চলতে থাকা এক আলোকিত বন্ধুত্বের সাক্ষী থাকে। দেখতে থাকে তার জ্বলজ্বলে রং।

চলমান.