প্রাপ্তি (প্রথম অধ্যায়) — পর্ব ১৮
লেখক: বিনতে ফিরোজ · বিভাগ: ইসলামিক · পর্ব ১৮ · ৪৫ পর্বের মধ্যে ১৮
সালেহা বেগমের বড়ো বোন শেফালী বেগমের এক ছেলে। সায়ান বয়সে আহমাদের থেকে বছর দুয়েকের বড়ো। পেশায় একজন ইঞ্জিনিয়ার। কর্পোরেট অফিসের বেশ উচুঁ পদে তার স্থান। তার স্ত্রী হেনা। শেফালী বেগম এই আয়োজনে শামিল করেছেন পুত্রবধূর বাবার বাড়ির কিছু মানুষকে। সদর দরজা পেরুতেই সামনে এতো মানুষ দেখে ভরকে যায় মাহিবা। শেফালী বেগমের পরিবার সম্পর্কে জেনেছে শাশুড়ির থেকে। সেই হিসেবে এতো মানুষের সামনা সামনি হওয়ার মানসিক প্রস্তুতি তার ছিলো না। হঠাৎ ধাক্কা সামলে উঠে হাসি মুখে সালাম জানায় শেফালী বেগমকে। মহিলা সে হাসি দেখলেন কি না বোঝা গেলো না, তবে আয়িশার মাথার এক ফালি কাপড় তার দৃষ্টিগোচর হলো বটে। মন মনে হিসেব কষতে বসলেন। এই "অবনতির" শেষ কোথায়?
বসার ঘরে উপবিষ্ট হেনার বাবার বাড়ির সকলের সাথে কুশল বিনিময় করলেন সালেহা বেগম। টুকটাক কথা বার্তা হলো। বাদ গেলো না আয়িশা, আফিয়াও। সকলের উৎসুক দৃষ্টি মাহিবার দিকে পড়তেই শেফালী বেগম বিরস মুখে বললেন,
- ওকে আর আপনাদের দেখতে হবে না। মেয়ে বহুত সুন্দরী! তাই যার তার সামনে মুখ খোলে না। সায়ানের বাবার সাথেই কথা বলেনি আর আপনাদের সাথে কি বলবে!
সায়ানের বাবা অবসর প্রাপ্ত স্টেশন মাস্টার। লোকটা স্ত্রীকে থামতে ইশারা করলেন।
- আহা শেফালী! থাক মা! তোমরা ঘরে যাও। আফিয়া! ওকে তোমার ভাবির ঘরে নিয়ে যাও।
সূক্ষ্ম অপমান মুখ বুজে সহ্য করলো মাহিবা। মেয়েটার হজম শক্তি বেশ! বদহজম হলেও সমস্যা কি? বাড়ি ফিরে একটা এন্টাসিড খেলেই হলো!
ঘরে ঢুকতে গেলেই আফিয়াকে হাত ধরে থামায় আয়িশা। জিজ্ঞাসু চোখে বোনের দিকে তাকালেই মেয়েটা ফিসফিসিয়ে বলে,
- পারমিশন নিয়ে ঢোকো আপাই! এভাবে ঢোকা ব্যাড ম্যানার!
চকিতে মাহিবার দিকে দৃষ্টি দেয় আফিয়া। মেয়েটা মুগ্ধ চোখে বিয়ের পরদিন সকালের ঘটনার স্মৃতিচারণ করছে। আহমাদকে সে এভাবেই থামিয়েছিল না! হিস্ট্রি রিপিটস ইটসেলফ!
আফিয়ার বুঝতে দেরি হয় না এই শিক্ষার শিক্ষক কে। হাট করে দরজা খোলা থাকলেও অনুমতি চায় মেয়েটা।
- ভাবি আসি?
হাসিমুখে এগিয়ে আসে হেনা। সাদরে গ্রহণ করে সকলকে। মেয়েটা সুন্দরী বটে! ভাবে মাহিবা।
- কি গো মাহিবা? কেমন আছো? আমাকে চিনেছো? আমি কিন্তু তোমার বড়ো জা!
এক দমে কথা বলে থামে হেনা। বিব্রত বোধ করে মাহিবা। আদতেও এই মেয়েকে সে দেখেছ কি না সন্দেহ। চেনা তো বহু দূরের কথা! সেই ক্ষণে আফিয়া বলে,
- তুমি যেভাবে বিয় খেয়ে দৌড় দিলে তোমাকে ভাবি চিনবে কিভাবে?
মাহিবার হাত দুটো মুঠোয় নিয়ে হেনা বলে,
- মাহিবা! ঐদিন আমার আব্বু অসুস্থ হয়ে গেছিলো। তাই হুট করে চলে যেতে হয়েছে। তোমার সাথে কথা বলার সুযোগই পাইনি। তুমি কিন্তু কিছু মনে করতে পারবে না! অ্যাই! মুখ খোলো তো! নতুন বউয়ের মুখের জেল্লা দেখি!
মেয়েটার আন্তরিকতায় মুগ্ধ হয় মাহিবা। প্রথম পরিচয়েই কি দারুন করে কথা বলছে! মুখ খুলতে গেলেই ঘরে প্রবেশ করে একটা ছেলে। মুখের আবরণ আর খোলা হয় না মাহিবার।
- কি ব্যাপার খুলছো না কেনো? আরে এখানে কোনো ছেলেমানুষ নেই! খোলো! খোলো!
মাহিবা বুঝলো না সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটাকে ছেলে ছাড়া আর অন্য কিছু বলা যায় নাকি। তার দৃষ্টি অনুসরণ করতেই হেনা বলে,
- আরে ও আমার ছোটো ভাই! হিমেল। আফিয়া আর ও একই কলেজে পড়ে। ও তো এখনও ছোটো। ওর সামনে মুখ খুললে কিছু হবে না। আরাম করে বসো তো। আমি দেখি ঐদিকের কি অবস্থা!
মুখ বাঁকায় আফিয়া। এই ছেলে নাকি ছোটো! কলেজে উঠে কতদিন যে ওর পেছনে ঘুরেছে, কতো প্রেম বাক্যে ভরা চিঠি যে দিয়েছে সে হিসেব কি রেখেছে? রাখলে বলতে পারতো না, "ভাবি! তুমি দুধের বাচ্চা ভাবলে কি হবে! তোমার ভাই পেকে গিয়েছে। মেয়ে দেখলেই সুযোগ খোঁজে।" যত্তোসব!
আফিয়ার সাথে আলাপ জমাতে চায় হিমেল। মাহিবার দিকে ফিরেও তাকায় না। বিরক্তিবোধ করে আফিয়া। তবে প্রকাশ করতে পারে না। যতোই হোক আত্মীয় বলে কথা। ইচ্ছে না থাকলেও অনেক কিছুই বলতে হয়। আফিয়ার পক্ষ থেকে আগ্রহ না পেয়ে প্রস্থাও নেয় হেনার হিমেল। একটুপর হেনা রুমে ঢুকে পর্দা টেনে দরজা ভেজিয়ে দেয়। স্বস্তি পায় মাহিবা। মুখের আবরণ সরায়। তবে হেনার দিকে দৃষ্টি গেলে সংকোচে দৃষ্টি সরাতে বাধ্য হয়। হেনার শাড়ি কোমড়ের দিক থেকে বেশ খানিকটা সরে গেছে। মাহিবা কিছু বলবে কি না ভাবে। শেষমেষ বলেই ফেলে,
- ভাবি! আপনার শাড়িটা সরে গেছে।
সেদিক পানে একবার চেয়ে হাসে হেনা। মাহিবাকে পরামর্শ দেওয়ার ভঙ্গিতে বলে,
- শাড়ি পড়লে অমন একটু আধটু হয়ই। এতে সুন্দরই লাগে বুঝেছো! মানুষ কিভাবে তাকায় দেখোনি!
খুব স্বাভাবিক ভাবে বললেও মাহিবার কানে কথাগুলো সীসার মত ঠেকে। সায়ান এখনও বাড়ি ফেরেনি। তবে এই সৌন্দর্য্য কাকে প্রকাশের জন্য? নাকি এই সৌন্দর্য্য উন্মুক্ত?
•• •• ••
সালেহা বেগম এসে থেকে বোনের সাথে কাজে হাত লাগিয়েছেন। বউ মেয়েদের দিকে খেয়াল রাখার সুযোগ পাননি। সবাই খেতে বসলে সেই ক্ষণে মাহিবার কথা মনে হয়। মেয়েটা তো এভাব খাবে না। ঘিরে দিয়ে এলে ভালো হবে। সেই কথা ভেবেই বড়ো বোনের উদ্দেশ্যে বলেন,
- বড়ো আপা! মাহিবা কোথায়?
হেনার মায়ের সাথে কথা বলছিলেন শেফালী বেগম। বোনের ডাকে ফিরে তাকিয়ে বলেন,
- হেনার সাথে ওর ঘরে আছে।
বিচলিত বোধ করেন সালেহা বেগম।
- তুমি যে বললে সায়ানের আসার সময় হয়েছে?
- হয়েছে। তো?
বুঝতে পারে না নাকি না বোঝার ভান করে সেটা বোঝেন না সালেহা বেগম। তবে পুত্রবধূর স্বকীয়তার বিষয়ে তিনি বেশ তৎপর। হেনার মা চলে যেতেই ছটফট করতে থাকা বোনের দিকে তাকান শেফালী বেগম। আশেপাশে দেখে বেশ নিচু কণ্ঠে বলেন,
- শোন সালেহা! কিছু কথা বলি। বউদের এতো মাথায় তুলতে নেই। তুই যেমন করছিস এই মেয়ে কয়দিন পরেই দেখবি তোর মাথার উপর ছড়ি ঘোরানো শুরু করেছে। ছেলেকে আঙ্গুলে নাচাবে। আর তো ছোটো মেয়েটার কথা কি বলবো? ঐটা তো এসে থেকেই ঐ মেয়ের লেজ ধরেছে! ঐ মেয়েও কি ঘোল খাইয়েছে কে জানে। এখন আফিটা একটু শক্ত থাকতে পারলেই হলো।
বোনের শেষ কথায় মনে মনে হাসেন সালেহা বেগম। "সে তো গলে মোম হতে চলেছে বড়ো আপা!" মনের কথা মুখে আনেন না।
- বড়ো আপা! তোমার মেয়ে নেই। থাকলে বুঝতে নিজের মেয়েকে আরেক বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া কি কষ্টের! আমার আফিকে কয়দিন পরেই তো মানুষের কাছে দিয়ে দিতে হবে। সেই বাড়িতে আমি আমার মেয়েটার যেমন যত্ন আত্তি চাই আমার ছেলে বউকেও সেভাবেই রাখতে চাই। অন্যকে না করলে আল্লাহ আমাকে দেবে কেনো?
কথার পৃষ্ঠে এমন জবাব হয়তো শেফালী বেগম আশা করেননি। বেশ ক্রোধ জমে যুক্তিতে না পেরে। সেই ক্রোধের প্রতিফলন দেখা চায় তার চেহারাতেও। রাগটা কড়াইয়ের উপরে ঢালেন। জোরে খুন্তি রেখে বলেন,
- যা মন চায় কর! হুজুর বউ এনেছে! হুহ! বড়োদের কোনো সম্মান করতে জানেনা আবার হুজুরগিরি দেখায়! কয়দিন এই ভালো মানুষের রূপ ধরে থাকে আমিও দেখি। চুল তো আর বাতাসে পাকেনি! বিপদে পড়ে যেনো আবার "বড়ো আপা বড়ো আপা" করতে করতে আমার কাছে আসবি না!
বড়ো বোনের ধমক খেয়ে বড়ো হয়েছেন সালেহা বেগম। তার জীবনে এ আর কোনো নতুন বিষয় নয়। কিন্তু মাহিবা সম্পর্কে এমন কথা তিনি হজম করতে পারলেন না। মেয়েটার সামনে বড়ো আপা এমন কথা না বললেই বাঁচা!
একটা প্লেটে সব খাবার থেকেই কিছু কিছু নিয়ে হেনার ঘরের দিকে যান। বাইরে থেকে ডাকতেই আফিয়া এগিয়ে আসে। মাহিবার দিকে তাকিয়ে দেখেন মেয়েটা এখনও বোরখা ছাড়েনি। আফিয়ার দিকে জিজ্ঞাসু চোখে চাইতেই মেয়েটা বলে,
- ভাবির ভাই যখন তখন চলে আসছে।
বিরক্তি সৃষ্টি হয় সালেহা বেগমের মনে। কোনো ঘরে মেয়েরা দরজা বন্ধ করে বসে থাকলে যে যখন তখন যেতে হয় না সে বুদ্ধি কি ও ছেলের নেই নাকি!
- এই মাহিবা! আমার সাথে আয়।
শাশুড়ির আদেশে তার পিছু নিতে গেলেই হাত ধরে আয়িশা। আফিয়া থেকে গেলেও মাহিবার সাথে যায় আয়িশা। বড়ো বোনের কক্ষে নিয়ে যেয়ে দরজা ঠেলে দেন সালেহা বেগম। মাহিবাকে বলেন,
- তুই এখানে বোরখা খুলে বস। সমস্যা নেই। ওদিকে ওর সব খাচ্ছে। এই ঘরে কেউ আসবে না। আর তোর বরকে একটা ফোন দে তো! মহারাজ কাজ শেষ করে কখন আসবেন একটু শোন!
শেষ কথাগুলো বেশ আক্রোশের সাথে বলেন সালেহা বেগম। ছোটো থেকেই এই ছেলের মানুষের বাড়ি যাওয়ার কথা শুনলেই জ্বর চলে আসে। আজ না এলেও অবাক করা কিছু হবে ন। কিন্তু আজকে দাওয়াতটা ভিন্ন রকম। না এলে বিষয়টা খুব দৃষ্টিকটু ঠেকবে।
সালেহা বেগমের কথায় আয়িশা, মাহিবা দুজনেই হেসে ফেলে। সালেহা বেগম নিয়ে আসা খাবার ভর্তি প্লেট বাড়িয়ে দিলে আয়িশা বলে,
- মা, উনি আসুক। তারপর খাই?
- আমার ক্ষুধা লেগেছে। আমি খাবো!
- তাহলে এটা ওকে খাইয়ে দেই।
- যা ভালো লাগে তোদের কর!
শুনতে বকা মনে হলেও তিনি আসলে আহমাদের উপরে বিরক্ত। সেটা বুঝতে পেরেই মাহিবা ফোন লাগায়। আয়িশার কানে গুঁজে দিয়ে তাকে বলে কথা বলতে। পরে কি মনে করে নিজের হাতে ফোন রেখেই সেটা লাউড স্পিকারে দিয়ে দেয়।
- হ্যালো?
- সালাম দিতে জানো না? বলো "আসসালামু আলাইকুম"!
আহমাদ বুঝতে পারে এটা আয়িশা।
- ওয়া আলাইকুমুস সালাম! বলেন আপা! এই অধম আপনার কি উপকার করতে পারে?
আহমাদের কথায় মুগ্ধ হয় মাহিবা! আয়িশার সাথে আহমাদের আদুরে আলাপ যে তার কি ভালো লাগে!
- এখনই এখানে এসে আমাদের উদ্ধার করতে পারো। আম্মু ক্ষেপে বো'ম হয়ে আছে! আপাতত মানুষের বাড়িতে এসে বকা খেতে না চাইলে এক্ষুনি আসো।
- আমি তো আসছিই। রাস্তায় আছি। কিছু আনতে হবে নাকি শোন তো মার কাছে!
- না কিছু আনতে হবে না। আসার সময় আম্মু আর ভাবিমণি সব এনেছে। তুমি আসো।
- আচ্ছা।
ফোন রেখে বোরখা খোলে মাহিবা। হাত ধুয়ে আয়িশাকে খাইয়ে দেয়। খাওয়া শেষ হতেই এঁটো প্লেটটা আয়িশার হাতে ধরিয়ে দেয় সালেহা বেগমের কাছে দেওয়ার জন্য। আয়িশা যেতেই মাহিবা ওয়াশরুমে যায়। সেই ক্ষণে খোলা দরজা দিয়ে সেই কক্ষে প্রবেশ করে হিমেল। আরাম করে বসে বিছানায়। ওদিকে ওয়াশরুম থেকে ভেসে আসছে পানির কলকল ধ্বনি।
চলমান.