প্রাপ্তি (প্রথম অধ্যায়) — পর্ব ০৭
লেখক: বিনতে ফিরোজ · বিভাগ: ইসলামিক · পর্ব ০৭ · ৪৫ পর্বের মধ্যে ৭
বিশ্বাসের শক্ত প্রাচীরে ধোঁকার নির্মম আঘাতগুলো তখনও সজীব। দগদগে ঘা জানান দিচ্ছে কারো পৈশাচিক নিষ্ঠুরতার। নিষ্ঠুর অতীত থেকে নিজেকে টেনে হিচড়ে বের করে একই আঘাত সে দেয়ালের পক্ষে সহ্য করা কঠিন বটে। কঠিন হলেও সেটা ঘটেছে। মায়া, ভালোবাসা দিয়ে ঢেকে রাখা ভাঙ্গা দেয়ালের পলেস্তারা খসে খসে পড়ছে। উকি দিচ্ছে ভাঙনগুলো। আচ্ছা মানুষ ভাঙ্গা জায়গায় আঘাত হানতে এতো ভালোবাসে কেন? কোন সে কারণে তাকে বারবার এমন পরিস্থিতির শিকার হতে হচ্ছে? সে তো তাকে সম্মান দিতে চেয়েছিল, মনের কোণে ছোট্ট একটা জায়গা তার নামে বরাদ্দ করতে চেয়েছিল। কিন্তু! কিন্তু তার অতীত অনুভূতির সজীব স্মৃতিগুলো পথরোধ করে দাঁড়ালো। ডায়েরির লেখাগুলো নিয়ে গভীর ভাবনায় মজে আহমাদ। তিন লাইনের ওই লেখা বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায় উদ্দিষ্ট ব্যক্তি আজ মাহিবার জীবনে অনুপস্থিত। কিন্তু তার জন্য জমিয়ে রাখা অনুভুতির পাহাড় আজও দৃঢ়পদে দাড়িয়ে আছে মাহিবার মনরাজ্যে। মনের জমিনে একজনকে রেখে মেয়েটা তার সাথে কিভাবে থাকবে? যদিও সেটা অতীত। কিন্তু বর্তমানে সেই অতীত তার মনের শান্তি কেড়ে নিয়েছে। চোখ বুজলেও প্রশান্তির ঘুম আসার বদলে শ্রান্তিময় চিন্তা মস্তিষ্কে ভর করছে। এক মিনিট! সেই বা মেয়েটাকে নিয়ে এমন গভীর চিন্তা করছে কেন? কাল রাতেই তো তাকে জানিয়ে দিয়েছে দুজনার পথ ভিন্ন হবে। যে যার মত থাকবে। তবে! সে কেনো মেয়েটার ব্যাপার নিয়ে চিন্তিত হচ্ছে। চোখ খুলে কপালের দিকের চুল মুষ্টিবদ্ধ করে ধরে। মাথা নাড়ে দুদিকে। নাহ্! মেয়েটাকে নিয়ে আর ভাববে না।
এদিক ওদিক তাকাতেই চোখে পড়ে আয়িশাকে। আস্তে আস্তে দরজার দিকে যাচ্ছে। ভ্রু কুঁচকে তাকায় আহমাদ। মেয়েটা এমন চোরের মত করে হাঁটছে কেন?
- আয়িশা।
পরপরই গলা খাঁকারি দেয় আহমাদ। নিজের কাছেই নিজের স্বর ভারী লাগে।
চমকে পিছু ফিরে চায় আয়িশা। ইশ! দাদাভাই জেগে গেলো!
স্বর নরম করে আহমাদ ডাকে,
- এখানে আয়।
মলিন মুখে আহমাদের দিকে পা ফেলে আয়িশা। মূলত সে এসেছিল এই ঘর থেকে একটা জিনিস নিতে। আহমাদকে ঘুমাতে দেখে আস্তে আস্তে কাজ সেড়ে চলে যাচ্ছিলো। সে যে জেগে যাবে এটা তো মেয়েটা বুঝতেই পারেনি!
আহমাদের ধার ঘেঁষে দাড়াতেই আয়িশার হাত ধরে তাকে নিজের কোলে বসিয়ে জড়িয়ে ধরে আহমাদ।
- আমার ময়নাপাখি কি বেশি রাগ করেছে?
মুখ নিচু করে রাখে আয়িশা। যত জোরে একটা ধমক দিয়েছে এত সহজেই সে গলবে নাকি! হুহ!
আয়িশার কোমল চিবুকে ঠোঁট ছুঁইয়ে আহমাদ আলিঙ্গন শক্ত করে।
- সরি পাখি। ভুল হয়ে গেছে। আর এভাবে বকবো না। প্রমিস!
তবুও কথা বলেন আয়িশা। অভিমানের গাঢ়ত্ব বুঝতে পেরে আহমাদ আলিঙ্গন মুক্ত কর বলে,
- এই যে কোন ধরেছি। উঠবস করবো?
টলমলে চোখে ফিরে তাকায় আয়িশা। আদুরে কণ্ঠে আহমাদ বলে,
- করি?
আহমাদের গলা জড়িয়ে ধরে আয়িশা। মেয়েটা নাক টেনে চলেছে সমানে। স্মিত হাস্যে বুকে জড়িয়ে নেয় সন্তানসম বোনকে। সে তো বাবাকে দেখেছে, বাবার ছায়া পেয়েছে। ষোলো বছর বাবার তত্ত্বাবধানে থেকেছে। কিন্তু এই ছোট্ট মেয়েটার জন্মই হয়েছে এতিম পরিচয়ে। না কোনোদিন বাবার ছোঁয়া পেয়েছে, নাইবা বাবা বলে গালভরে কখনো ডাকতে পেরেছে। এই ছোট্ট মনটাকে কখনো দুঃখ দেওয়ার কথা ভাবতেও পারেনা আহমাদ।
- কার জন্য যেনো চকলেট এনেছিলাম! তার কি চকলেট চাই না?
ঘাড় নেড়ে সম্মতি দেয় আয়িশা।
চকলেট দিয়ে ছোট্ট হাতদুটো ভরে দিয়ে ভেজা পদ্মের ন্যায় ঐ চোখগুলো মুছে দেয় আহমাদ।
- আরে দুলাভাই! ক্যায়া হাল চাল হ্যাঁ?
আগমনী স্বরের পানে চোখ ঘোরায় আহমাদ। হেলেদুলে আসছে মাহিদ। বিব্রত হাসে আহমাদ। ছেলেটার সাথে এখনও ভালো করে কথা হয়নি।
- এইতো ভালো। তোমার কি অবস্থা?
- ফার্স্ট ক্লাস ছিলাম দুলাভাই! কিন্তু আপনার বউ আসায় এক ধাপ ডিমোশন হয়েছে। এখন সেকেন্ড ক্লাসে আছি।
আয়িশার হাতের চকলেট দেখে আহ্লাদ করে মাহিদ বলে,
- শুধু নিজের বোনের জন্যেই চকলেট এনেছেন? আমার জন্যে আনেননি দুলাভাই?
অস্বস্তিতে পরে যায় আহমাদ। মাহিদ ক্লাস এইটে পড়ে এই তথ্য তার জানা আছে। এইট পড়ুয়া কোনো ছেলে যে চকলেটের জন্য বায়না ধরতে পারে এই ধারণা তার ছিলো না। বিব্রত ভঙ্গিতে সে বলে,
- তুমি চকলেট পছন্দ কর?
- আপনি যা দিবেন তাই পছন্দ দুলাভাই!
বারবার দুলাভাই ডাকে জড়সড় হয়ে যাচ্ছে আহমাদ। নতুন এবং অস্বস্তিপূর্ণ এই ডাক পছন্দ হচ্ছে না তার।
- আচ্ছা, তুমি আমাকে দুলাভাই না ডেকে অন্য কিছু ডাকো।
দুষ্টুমি চেপেচুপে রেখে সরল কণ্ঠে মাহিদ জিজ্ঞাসা করে,
- কেনো দুলাভাই?
- না এমনি। কেমন লাগছে শুনতে।
মাহিদের শিরায় শিরায় দুষ্টুমি। তার আজকের টার্গেট আহমাদ। ভগ্নিপতির অবস্থা আজ সে টাইট করবে!
- আমি আপনার কি হই দুলাভাই?
নিষেধ করার পর যেনো দুলাভাই ডাকার জোর বেড়েছে। আয়িশার দিকে তাকিয়ে দেখে মেয়েটা হাসছে। ভাইয়ের দুর্দশায় মজা পাচ্ছে সে। খানিকক্ষণ ভেবে চিন্তে অন্য কিছু বলতে না পেরে ইতস্তত করে আহমাদ বলে,
- শালা।
হায় হায় করে মাহিদ বলে,
- আপনি আমাকে গালি দিলেন দুলাভাই!
চমকে উঠে আহমাদ বলে,
- কই!
- এইমাত্রই তো বললেন!
- আশ্চর্য! কি বললাম?
এবার যুক্ত হয় আয়িশা।
- তুমি মাহিদ ভাইয়াকে শালা বলেছো না? এটাই তো গালি! তুমি গালি দাও দাদাভাই! বাসায় যেয়েই আম্মুকে বলবো তুমি ভাবিমণির ভাইকে গালি দিয়েছো।
হতভম্ব হয়ে যায় আহমাদ। সে কি শালা গালি হিসেবে বলেছে? নাকি নিজে থেকে বলেছে?
দুঃখমাখা কণ্ঠে মাহিদ বলে,
- খাইয়ে পড়িয়ে আপনার বউকে হৃষ্টপুষ্ট বানিয়ে দিলাম। এটা বাদ দিলেও ওকে যে এতদিন সহ্য করে নিজেদের কাছে রেখেছি, বাড়ি থেকে বের করে দেইনি এই জন্য হলেও তো আপনি আমার প্রতি একটু কৃতজ্ঞ হবেন দুলাভাই! আর আপনি কি না আমাকে গালি দিলেন! আমি অনেক কষ্ট পেয়েছি দুলাভাই!
হতাশ হয়ে প্রস্থান নেয় মাহিদ। তার পিছুপিছু যায় আয়িশা। থেকে যায় হতভম্ব আহমাদ। বিড়বিড় করে বলে,
- আশ্চর্য!
দরজা পার হতেই আয়িশাকে জেঁকে ধরে মাহিদ।
- এই যে বিয়াইন সাব! আমাকে দুটো চকলেট দেন না!
ভ্রু কুঁচকে তাকায় আয়িশা। এটা আবার কেমন ডাক!
- বিয়াইন সাব আবার কি জিনিস! আপনাকে আমার চকলেট কেনো দিবো?
- আমি আপনার বিয়াই সাব তাই দিবেন!
- আমার কোন ছেলেকে আপনার মেয়ের সাথে বিয়ে দিয়েছি?
ঘরের দিকে দৃষ্টি দিয়ে সেদিকে ইশারা করে মাহিদ বলে,
- ঐ যে ঐ ছেলের সাথে আমার একমাত্র বোনের বিয়ে দিয়েছেন। দিন না চকলেট! একটা চকলেট দিতে বিয়াইনের এতো কষ্ট! বিয়াইনের মন দেখি সরিষা দানার মত ছোট!
নাক মুখ কুঁচকে তাকায় আয়িশা। এই ছেলেটা একটা পাগল!
- আপনি আমার ভাবিমণির সাথে মারামারি করেছেন। আপনার সাথে আমার কোনো কথা নেই। দেখি সরেন তো!
কোনো কথা না শুনেই পাশ কাটিয়ে চলে যায় মেয়েটা। মাহিদ হা করে চেয়ে থাকে। দুমদাম কিল ঘুষি নিজে খেলো। ঐ রাক্ষসীকে কখন মারলো! কি পল্টিবাজ মেয়ে!
________________
- ভাবিমণি, তুমি বোরখা কেনো পড়?
বিছানা গোছাতে গোছাতে তার বোরখা নিয়ে নাড়াচাড়া করতে থাকা আয়িশার দিকে চাইলো মাহিবা।
- ও ভাবিমণি! বলো না!
হাতের কাজ শেষ করে ছোট্ট মেয়েটাকে কাছে টেনে নিলো মাহিবা।
- আসো বলছি।
আদুরে বিড়ালছানা মতো মাহিবার সাথে লেপ্টে যায় আয়িশা। আয়িশার চুল আঁচড়াতে আঁচড়াতে মাহিবা বলে,
- ধরো তোমার কাছে খুব দামী কিছু আছে। উম.. যেমন ধরো হীরা, সোনা এমন কিছু।
- হীরা কি? ডায়মন্ড?
- হ্যাঁ ডায়মন্ড। এখন তোমার কাছে থাকা ঐ ডায়মন্ড তুমি কিভাবে রাখবে?
- আম্মু যেই বক্সের ভেতর গয়না রাখে ওখানে রাখবো।
- বক্সের ভেতরে কেনো রাখবে?
- ওমা! দামী জিনিস তো লুকিয়েই রাখতে হয়।
মুচকি হেসে মাহিবা বলে,
- মেয়েরা এর থেকেও মূল্যবান। নবীজী বলেছেন দুনিয়ায় একজন মানুষের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হতে পারে একজন নেককার স্ত্রী। তাহলে বলো তো যে দুনিয়ার সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ তাকে কি লুকিয়ে রাখতে হবে না?
- হবে তো।
- এজন্যেই আমি বোরখা পড়ি। এটা এমন একটা আবরণ যা মূল্যবান মানুষকে কুদৃষ্টি থেকে বাঁচাতে সাহায্য করে। বুঝতে পেরেছো?
- কিন্তু আপাই তো বোরখা পড়ে না। ও কি মূল্যবান না?
এক কাধে বেনী ঝুলিয়ে অপর পাশের এলোমেলো চুলে হাত দিয়ে মাহিবা বলে,
- অবশ্যই মূল্যবান। কিন্তু বিশেষত্বের একটা ব্যাপার আছে। যারা নিজেদের আবৃত করে রাখে তাদের মাঝে বিশেষ একটা ব্যাপার আছে। আছে না?
মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানায় আয়িশা। মাহিবা যোগ করে,
- ডায়মন্ড না ঢেকে রাখলে কি তার মূল্য কমে? কমেনা। কিন্তু নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়ে যায়। অনেকে নিজের মূল্য বুঝতে পারেনা। বুঝতে পারেনা নিজের কদর। নিজেকে নিয়ে হেলাফেলা করে। এতে তার নিজেকে নিয়ে ঝুঁকি তৈরি হয়। বিপদে পড়ার আশঙ্কা থাকতে পারে। বুঝেছো?
- হুঁ।
দুই বেনী করা শেষে মাহিবা উঠতে গেলে তার হাত ধরে ফেলে আয়িশা। ছোট্ট আদলে দৃষ্টিপাত করলে মেয়েটা আকুতি নিয়ে বলে,
- তুমি একটু আপাইকে বোঝাবে যেনো ও বোরখা পড়ে? নাহলে যদি বিপদে পরে?
সীমাহীন আনন্দ ঘিরে ধরে মাহিবাকে। আয়িশার মুখের শঙ্কা তাকে স্বস্তি দেয়। বার্তা জানায় আগাম দিনের প্রস্ফুটিত ফুলের।
- বোঝাবো আয়িশু! অবশ্যই বোঝাবো।
চলমান.