প্রাপ্তি (প্রথম অধ্যায়) — পর্ব ৩৭
লেখক: বিনতে ফিরোজ · বিভাগ: ইসলামিক · পর্ব ৩৭ · ৪৫ পর্বের মধ্যে ৩৭
নিস্তব্ধ রাতের নীরবতার জাল ছিন্ন করে ডুকরে ডুকরে উঠছে সালেহা বেগমের কান্নার শব্দ। শক্ত মনের মানুষটা ছেলের দুর্ঘটনায় ভেঙে পড়েছেন। বুক ভাঙ্গা কান্নায় ভাসিয়ে দিচ্ছেন আশপাশের সকলকে। আয়িশা বহু আগেই ঘুমিয়েছে মাহিবার কোলে। আফিয়া চোখ বন্ধ করে বসে আছে। মাকে কয়েকবার শান্ত করার চেষ্টা করেছে। মহিলা কারো কথা কানে তুলছেন না। ব্যর্থ প্রচেষ্টাকে থামিয়ে নিজ বুদ্ধির উপর জোর দিয়ে আফিয়া ভাবতে বসেছে সামনে দিনগুলোতে সে কি করতে পারে তার পরিবারের জন্য। ইফাদকে আশেপাশে দেখা যাচ্ছে না। রাত দশটার দিকে অপারেশন থিয়েটারের লাল বাতি জ্বলে ওঠার পর থেকেই সে লাপাত্তা। তবে সালেহা বেগমকে কিছু একটা বলে গেছে। অদ্ভুত এই নীরবতার সাথে তাল মিলিয়ে চলছে মাহিবা। তার নীরবতাটুকু ভীষণ রকম অদ্ভুত লাগছে। জ্বলতে থাকা লাল আলোর দিকে তার দৃষ্টি তাক করা। সেই দৃষ্টিতে কোনো ভাষা নেই, কোনো অশ্রু নেই। তার নীরবতায় ভয় পেয়েছিলো ইফাদ। কিছু শুনতে চেয়েছিলো, বলতে চেয়েছিলো। তবে তার পূর্বে নিজেকে একটু গুছিয়ে নিতে চাইলো। ঘড়ির কাঁটা একটার ঘরে গেলে ইফাদের দেখা মেলে। করিডোরে পা রেখেই লাল আলোর দিকে চোখ যায় তার। এখনও বন্ধ হয়নি! আর কতক্ষণ? ধৈর্য্যহীন হয়ে যায় ছেলেটা। তবে ঠায় বসে থাকা মেয়েটাকে দেখে থমকে যায়। মেয়েটা সেই যে তখন এসেছে সেই থেকে চোখ লাল করে বসেছে। না কোনো প্রশ্ন, না কোনো উত্তর। টাকার ব্যাপারে একটা সমাধানে আসা গেছে। ইফাদের হাতে থাকা নগদ অর্থ দিয়েই ব্যবস্থা করা গেছে। এর মাঝে আহমাদের ছোটো চাচা খবর পেয়ে দেখা করে গেছেন। অপারেশন চলাকালীন বসে থেকে লাভ নেই ভেবে বাড়ি গেছেন। নীরবতার বেড়ি ভেঙে মাহিবা ডেকে ওঠে,
- ভাইয়া?
কণ্ঠে অনুভূতির অনুপস্থিতি ধরতে না পারায় কারণেই মাহিবার কণ্ঠস্বর অন্যরকম লাগে ইফাদের কাছে।
- জি ভাবী?
- আমার বাবা-মাকে একটু ফোন দিয়ে জানাবেন?
আশ্চর্য হয় ইফাদ।
- ওদের এখনও জানাননি?
- না।
মেজাজ খারাপ হয় ইফাদের। এরকম কাণ্ডজ্ঞানহীন কাজ সে আশা করেনি। নাম্বার নিয়ে ফোন দেয় সাহেদ দম্পতিকে। এতো রাতে ফোন দিতে ইতস্তত বোধ করলেও ঘটনার গুরুত্বে ফোন না দিয়ে পারে না। কল দিতেই বাঁধা দেয় মাহিবা।
- আমি একটু নামাজ পড়বো। ব্যবস্থা করে দিতে পারবেন ভাইয়া?
প্রথম রিং বাজার আগেই কল কেঁটে দেয় ইফাদ। রিসেপশনে যেয়ে খোঁজ নেয়। ফের অপারেশন থিয়েটারের সামনে এসে মাহিবাকে নিয়ে পাশে বরাদ্দকৃত ঘর দেখিয়ে প্রস্থান নেয়। দরজা ঠেলে ভেতরে ঢোকে মাহিবা। অন্ধকার, মানবশুন্য ঘরের দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে অজানা সময় ধরে। বন্ধ চোখের কোল ঘেঁষে অশ্রুরা নিজেদের অস্তিত্ব জানান দেয়। ভিজিয়ে দেয় মুখে থাকা আবরণ। হুট করে কিছু মনে হলে উঠে দাঁড়ায় মাহিবা। পরিহিত কিছু বসন সরিয়ে কক্ষ সংলগ্ন ওয়াশরুম থেকে ওযু সেড়ে আসে। নিজেকে গুছিয়ে টিমটিমে আলো জ্বেলে পাশে থাকা মাদুর বিছিয়ে নেয়। স্থির হয়ে, হালকা আওয়াজে "আল্লহু আকবার" বলে নিজেকে আবদ্ধ করে অকৃত্রিম অনুভূতির মাঝে। হাত বাঁধতে না বাঁধতেই কান্নায় বুক ভেঙে যায় মেয়েটার। দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না। পায়ের শক্তি ফুরিয়ে আছড়ে পরে সিজদায়। হু হু করে কাঁদতে শুরু করে। এতক্ষণের জমিয়ে রাখা বুকের ভার সবটুকু ঢেলে দেয় মহামহিমের কাছে। বিড়বিড় করে কি যেনো বলত থাকে! শ্বাস নেওয়া দুষ্কর হয়ে যায়। তবুও থামে না। আঁধার রাতে মেয়েটার অবয়ব কেমন অদ্ভুত বিস্ময়কর লাগে!
•• •• ••
হন্তদন্ত হয়ে ছুটে আসেন সাহেদ দম্পতি। বাদ যায়নি মাহিদও। ইফাদকে না চিনলেও এই মুহূর্তে যেনো সেই সবচেয়ে আপন হয়ে উঠেছে। ঘটনার বৃত্তান্ত শোনায় সে। মালা বেগম ছুটে যান কাঁদতে কাঁদতে ক্লান্ত হয়ে পড়া সালেহা বেগমের কাছে। এক পর্যায়ে সাহেদ সাহেব বলেন,
- আহমাদের খালাদের ওদিকে খবর দেওয়া হয়েছে?
বিরস মুখে ইফাদ বলে,
- ওদের নাম্বার আমার কাছে নেই আঙ্কেল। আর আন্টির অবস্থাও তেমন না যে কিছু বলবো।
- তা বেশ। কিন্তু তুমি এক ফাঁকে যেয়ে জামা কাপড় পাল্টে আসো। এগুলো পড়ে আর কতক্ষণ থাকবে?
গায়ের র•ক্তমাখা পোশাকের দিকে তাকিয়ে মলিন হেসে ইফাদ বলে,
- ওর জ্ঞান ফিরুক আঙ্কেল। এর আগে আমি নড়ছি না।
হুট করে সাহেদ সাহেবের মনে হয় আহমাদ যেনো তেনো কোনো বন্ধু পায়নি। ছেলেটা অন্যরকম। একদম অন্যরকম...
•• •• ••
দীর্ঘ চার ঘণ্টা অ•স্ত্রপচারের পর লাল রঙ্গা আলোটা বন্ধ হয়। উদগ্রীব হয়ে থাকা চোখগুলো চেয়ে থাকে ডাক্তারের মুখের দিকে। একটু সাফল্য বাণী শোনার ইচ্ছা। সুখের কথা শোনান ডাক্তার। অ•স্ত্রপচার সফল হয়েছে। আহমাদ ঘুমিয়ে আছে। সকালের আগে আর উঠবে না। স্বস্তির শ্বাস ফেলে সকলে। নিশুতি রাতে কয়েক বাক্যের কথাগুলো মধু সুধার মতো মনে হয়। মালা বেগম মেয়ের কাছে ছুটে যান। মেয়েটা সিজদায় পড়ে ঘুমিয়ে গেছে। চোখ মুছে মেয়েটার মাথায় হাত বুলিয়ে দেন। মেয়েটা এমন চাপা হলো কবে? তার বুকে কি একটু কান্না করা যেতো না? ডেকে আর ঘুম ভাঙ্গালেন না। অপেক্ষা করলেন সূর্যোদয়ের। সে পর্যন্ত ঠায় বসে রইলেন সেখানে। মুয়াজ্জিনের ডাক আসতেই পিটিপিটিয়ে তাকায় মাহিবা। দীর্ঘ একটা সময় উপুর হয়ে থাকার কারণে বুকে চাপ অনুভব করে। ঝাপসা চোখ স্বচ্ছ হলে বুঝতে পারে ভয়ংকর রাতের প্রস্থান। পাশে ঘুমিয়ে থাকা মালা বেগমকে তৎক্ষণাৎ ডেকে তোলে। কাঁচা ঘুম ভাঙায় মহিলা বিরক্ত হলেও মেয়ের কাছে প্রকাশ করেন না। ঘুম ঘুম চোখে ঘণ্টা তিনেক পূর্বে পাওয়া সুসংবাদের পুনরাবৃত্তি করেন। মেয়েটা ছুটে যেতে চাইলে জানান সকালের আগে কাউকে কেবিনে প্রবেশ করতে দেবে না। ডাক্তারের নিষেধাজ্ঞা আমলে নিয়ে ধৈর্য্য ধরে মাহিবা। নিজেকে শান্ত রাখার সর্বত্র চেষ্টা করে। তবে ধৈর্য্যের ধনুক ভেঙে পড়ার উপক্রম হয় যখন শুনতে পায় আহমাদের ঘুম ভেঙেছে। চোখ মেলে তাকিয়েছে সে। হন্তদন্ত পায়ে বের হতে গেলে দেখা হয় সালেহা বেগমের সাথে। ক্লিষ্ট মুখে সদ্য ফোঁটা হাসির ছাপ কি সুন্দর লাগে দেখতে! তিনি এগিয়ে দেন মাহিবাকে। সকলের চেয়ে অগ্রাধিকার দিয়ে মেয়েটাকে কেবিনে প্রবেশ করিয়ে সুখের হাসি হাসেন।
ধুক পুক করতে থাকা বুক নিয়ে কাঁপা হাতে নব মোচড় দেয় মাহিবা। দরজা খুলে শীতল পরিবেশের মাঝে খুঁজে পায় চিরচেনা পুরুষের শায়িত অবয়ব। নির্নিমেষ চেয়ে থাকে মেয়েটা। আহমাদের বন্ধ চোখের হালকা উপরে একটা ব্যান্ডেজ। কতো চোট পেয়েছে লোকটা? মেয়েটা ভুলে যায় দরজা বন্ধ করতে, ভুলে যায় ছুটে ঐ চোট পাওয়া বুকে ঝাঁপিয়ে পড়তে। ক্লান্ত চোখে চায় আহমাদ। স্থির হয়ে থাকা মাহিবাকে দেখে ভগ্ন কণ্ঠে বলে,
- কাছে এসো মাহি!
ঠোঁট চেপে কান্না আটকায় মাহিবা। দরজা আটকে ধীর পায়ে হেঁটে যায় আহমাদের দিকে। বিছানার পাশে রাখা চেয়ারে বসতেই আহমাদ আবার বলে,
- তোমাকে আবার দেখার আশা আমি হারিয়ে ফেলেছিলাম মাহি!
কান্নার স্রোত আটকে রাখা দুষ্কর হয়ে যায়। ডুকরে কেঁদে ওঠে মাহিবা। করপুটে চেপে ধরে আহমাদের দুর্বল হাত। ছেলেটাও চায় বিপরীতে বন্ধন শক্ত করতে। তবে সে আজ দুর্বল। বড়োই দুর্বল! ক্লান্ত কণ্ঠে বলে,
- তোমার মুখটা খোলো মাহি। মনে হচ্ছে কতোদিন তোমাকে দেখিনি!
মুখের আবরণ সরিয়ে আহমাদের দুর্বল বুকে মুখ লুকায় মাহিবা। খুঁজে নেয় নিজের চির পরিচিত স্থান।
চলমান.