প্রাপ্তি (প্রথম অধ্যায়) — পর্ব ১৪

লেখক: বিনতে ফিরোজ · বিভাগ: ইসলামিক · পর্ব ১৪ · ৪৫ পর্বের মধ্যে ১৪

আহমাদের মেজাজ বেশ ফুরফুরে। অফিসে এসেই ঊর্ধ্বতনের ডাক পড়াতে ভেবেছিলো ছুটি কাটানোর কারণে কাজের বোঝা চাপিয়ে দেবে, যদিও সে ছুটি নিয়েই গেছিলো। কিন্তু কর্মকর্তার কেবিনে যেতেই তাকে বিবাহের শুভেচ্ছা জানানো এবং তারপরই পাওয়া এক সারপ্রাইজ। যদিও ভদ্রলোক সারপ্রাইজ রাখেননি কিন্তু আহমাদ সারপ্রাইজড হয়েছে বটে। সামনের মাসে এক বিদেশি কোম্পানির সাথে একটা ডিল ফাইনাল করা হবে। সেখানে আহমাদকে সুযোগ দেওয়া হয়েছে নিজেকে তুলে ধরার জন্য। আশ্চর্য হওয়ার কারণ হলো আহমাদ এখনও সেই পদে যেতে পারেনি যেখানে থাকলে এমন সুযোগ পাওয়া সম্ভব। নিঃসন্দেহে এটা মহামহিমের অনুগ্রহ। আহমাদ শুনেছিলো বিয়ে করলে নাকি মানুষের রিজিকের ব্যবস্থায় উন্নতি হয়। তারই এক কলিগ বিয়ের পর বলেছিলো। আজ নিজ জীবনে সেই কথার বাস্তব প্রতিফলন দেখতে পেরে কথাটা বিশ্বাস করে ফেললো আহমাদ। নিজ ডেস্কে ফেরত আসতেই পেছনের ডেস্কে থাকা রমণীর দিকে চোখ যায়। তৎক্ষণাৎ দৃষ্টি ফিরিয়ে আনে ছেলেটা। তার অবচেতন মন যেনো ওই চোখ জোড়া একজনের নাম লিখে দিয়েছে, সে চোখ দিয়ে অন্য নারীর সৌন্দর্য দেখা নিষিদ্ধ সাব্যস্ত করেছে। চেয়ারে হেলান দিতে দিতেই আহমাদের মনে হয় বিয়ের সুবিধা নেহাৎই কম নয়। এই যে এখন চট করে দৃষ্টি ফেরাতে পেরেছে এটা কি আগে হতো? উহু! ব্যাচেলর থাকাবস্থায় দৃষ্টি রক্ষার ব্যাপারে মন দেওয়া হয়নি। কিন্তু আজ? কাল রাতের দীর্ঘ গবেষণা এবং নিজের করে নেওয়া মেয়েটার আদল চোখে ভাসতেই মনে হয় এই চোখ শুধু একজনের জন্য। শুধু একজন!

খুশি ভাগাভাগি করতে আহমাদ ফোন দেয় ইফাদকে। কল ধরে ছেলেটা আহমাদকে কথা বলার সুযোগই দেয় না।

- কি রে আমার হতে পারে বিয়াই! খবর কি?

- কে তোর হতে পারে বিয়াই?

- ক্যান তুই?

- কিসব কথাবার্তা?

- ক্যান তুই আমার ছেলেরে তোর মেয়ে দিবি না?

- আশ্চর্য! আমার মেয়ে কই আর তোর ছেলেই বা কই?

- অন দা ওয়ে। আসতেসে।

- যতোসব পাগল ছাগল মার্কা কথা! বিয়ের কোনো খোঁজ নাই উনি আসছে বিয়াই হইতে! আর তোর বিয়ে হইলেই বা? আমার মেয়ে তো হিসাব অনুযায়ী তোর ছেলের থেকে বড়োই হবে। ছোটো ছেলের কাছে মেয়ে দিবো না।

- আরিব্বাস! বন্ধু দেখি ফ্যামিলি প্ল্যানিং করা শুরু করে দিসে! ভালো ভালো! কে জানি বিয়েই করতে চাচ্ছিলো না? এখন কি সে ডুবে ডুবে জল খাচ্ছে নাকি? আহা আহা! আর আমার ছেলে ছোটো হইলেই কি? সিনিয়র জুনিয়র টাইপ একটা প্রেম হয়ে যাবে! জোশ না!

- ফালতু কথা বলবি না তো! তোরে তো দেখসি আর ভদ্রসমাজে রাখা যাবে না। হেমায়েতপুর এবার যাওয়াই লাগবে।

- এই তুই হানিমুন না যায়ে হেমায়েতপুর যাবি ক্যান রে ভাই?

- উফ! ইফাদ! থাম ভাই!

- ওকে থামলাম।

দীর্ঘশ্বাস ফেলে আহমাদ। এই ছেলেটা পাগল। একদম পাগল!

- দোস্ত আগামী মাসের ডিলের প্রেজেন্টেশন বস আমারে দিসে।

- আরে কংগ্রাচুলেশন! কিন্তু তোরে এখনই দিলো ক্যান?

- আমারে একা দেয় নাই। আমার পদের আরো একজনরে দিসে। যারটা বসের বেশি ভালো লাগবে তার জন্য সুযোগ থাকবে ওই কোম্পানির সাথে ওদের দেশের ব্রাঞ্চে যাওয়ার।

- কি গরম খবর মামা! কিছু তো খাওয়ানোই লাগে!

- বাড়ি আয়। মা তোর কথা শোনে। কতদিন যাসনা!

- আরে তোর বাড়ি একটা মহিলা ডেরা হয়ে গেছে। ওখানে যাওয়া এখন একটা ডেঞ্জারাস ব্যাপার স্যাপার। আর সবচেয়ে ডেঞ্জারাস ওই কুটিটা। দেখতে ছোটো হইলে কি হবে, মেয়ের তেজ আছে!

হেসে ফেলে আহমাদ। আয়িশার সাথে ইফাদের কোনোদিন মেলে না। একসাথে হলে এই দুটোর ঝগড়া লাগবেই লাগবে।

- আচ্ছা তাহলে অফিসের পর দেখা করি আয়।

- ওকে।

- রাখি তাহলে।

- হ রাখ।

•• •• •• ••

শাশুড়ির কাছ থেকে কিছু রেসিপি টুকে নিচ্ছে মাহিবা। সালেহা বেগম বেশ খুশি। আজকালকার দিনে ইউটিউব থাকার পরও এমন রেসিপি লিখে রাখার ব্যাপারটার মানে কি হতে পারে তিনি বেশ স্পষ্ট বুঝতে পারছেন। মেয়েটা তাকে মন থেকে সম্মান করে। মনের মাঝে ভালো কাগা কাজ করে। তার বিয়ে করতে না চাওয়া ছেলের জন্য যেনো একটা জহরত খুঁজে পেয়েছেন। উবু হয়ে বসে লিখতে থাকা মেয়েটার মাথায় হাত বুলিয়ে দেন। মাহিবা মুখ উঠিয়ে নির্মল হাসে।

- উনার কি বেশি পছন্দ মা? উনি তো দেখি সবই খান।

- উনিটা কে?

বিছানার আরেকপাশে বসে থাকা আয়িশার প্রশ্নে লজ্জা পায় মাহিবা।

সালেহা বেগম হেসে বলেন,

- তোর দাদাভাই।

মুখ বেকিয়ে আয়িশা বলে,

- এতো সম্মান দিয়ে উনি বলার কি আছে? আমি তোমার চেয়ে কতো ছোটো, তাও তুমি বলি। তুমিও তুমি করে বলবে বুঝেছো?

- হুঁ।

মাথা নাড়ায় মাহিবা। নাহলে এই মেয়েকে এখন থামানো যাবে না।

হাসি মুখেই সালেহা বেগম বলেন,

- আহমাদ সব খাবারই টুকটাক খায়। তবে মিষ্টি জাতীয় জিনিস ওর বেশি পছন্দ।

- তাই! আমারও মিষ্টি জিনিস বেশি পছন্দ। তাহলে একটা মিষ্টির রেসিপি বলুন মা।

উচ্ছল কণ্ঠের বিপরীতে আরেকটা রেসিপি বলে দেন সালেহা বেগম।

মাহিবা নিজ ঘরে যেতেই মায়ের কোলে উঠে আয়িশা বলে,

- ভাবিমণিটা কি ভালো আম্মু! তাই না?

মেয়েকে বুকে জড়িয়ে নেন সালেহা বেগম। প্রশান্ত কণ্ঠে বলেন,

- হ্যাঁ, মা শা আল্লহ।

- এটা বললে কেনো?

- কোনো জিনিস ভালো লাগল এটা বলতে হয়। নাহলে নজর লেগে সেই জিনিসের ক্ষতি হতে পারে।

- তাই! তাহলে তো সারাদিন আমাকে বলেই যেতে হবে! ভাবিমণিকে তো আমার সবসময় ভালো লাগে!

শব্দ করে হেসে ফেলেন সালেহা বেগম। হাস্যোজ্জ্বল মায়ের কোল থেকে তড়াক করে লাফ দিয়ে নামে আয়িশা।

- আমি যাই! ভাবিমণি বলেছিলো আমাকে পুতুল বানিয়ে দিবে।

মাহিবা ঘরের সামনে যেয়ে উচ্চকন্ঠে আয়িশা বলে,

- ভাবিমণি আসি?

- আসো!

আয়িশাকে এই কাজে অভ্যস্ত করে ফেলেছে মাহিবা। মেয়েটা ভাবিমণির ফ্যান বলে কথা!

লাফিয়ে ঝাঁপিয়ে মাহিবার কাছে যেয়ে আয়িশা বলে,

- আমাকে না পুতুল বানিয়ে দিতে চাইলে? দাও এখন।

- ওহ্ হ্যাঁ! আসো দেই।

আলমারিতে থাকা কাপড়গুলোর মাঝ থেকে বেশ পুরাতন একটা ওড়না বের করা মাহিবা। ভাঁজ করে করে ভাঁজের মাঝে একটা কাঠি গুঁজে দেয়। কাঠির নিচে সুতা দিয়ে বেশ করে বেধে দেয়। এই জিনিসটার উপরে আরেকটা রঙচঙে ওড়না কেটে শাড়ির মতো পরিয়ে দিয়ে পুতুলের কাঠামোটা আয়িশার হাতে দেয়। নতুন ধরণের একটা খেলনা পেয়ে কি খুশি হয় মেয়েটা!

- শোনো এরপর একটা নতুন জুতার বাক্স দিয়ে আমরা এই পুতুলের বাড়ি বানাবো ঠিকাছে? এরপর ওর বর বানাবো, ছেলেমেয়ে বানাবো। ওকে?

প্রফুল্ল কণ্ঠে আয়িশা বলে,

- ওকে!

তখনই মেয়েটার চোখ যায় আলমারির খোলা পাল্লার এক প্রান্তে।

- ঐটা কি ভাবিমণি?

ইশারাকৃত জিনিসটা দেখতেই ওটা বের করে মাহিবা। জিনিসটা ধরে সামনে আনতেই তার গায়ে লেখা দেখা যায়। "ইশিকা"।

- ইশিকা? তোমার ঐ বেস্টু না?

নামটার উপর হাত বুলিয়ে মলিন হাসে মাহিবা।

- হুঁ, আমার বেস্টু।

- এটা কি?

- এটা একটা ব্যাংক। ইশিকার ব্যাংক।

- তোমার কাছে কেনো?

- এখানে আমি ওর নামে টাকা জমাই।

- কি বলো? বুঝিনা।

- এই ব্যাংকে আমি প্রতিদিন অল্প কিছু হলেও টাকা জমাই। তারপর অনেক টাকা জমলে সেগুলো কোনো জায়গায় দান করে দিই। আর এই পুরোটা করি ইশিকার নামে। নেকিগুলো যেনো ও পায়, আল্লাহ যেনো ওকে ক্ষমা করে শাস্তি মাফ করে দেন তাই।

- সব নেকি দিয়ে দিলে তুমি কি নিবে?

- আমি এখন বেঁচে আছি। নামাজ পড়তে পারি, কুরআন পড়তে পারি, ভালো কাজ করতে পারি। নিজের নেকি গোছানোর সুযোগ আছে। কিন্তু ও তো এখন কিছুই করতে পারেনা। ওর জন্য যেটুকু আমরা পাঠাবো সেটুকুই ওর লাভ।

খুব মনোযোগ দিয়ে শোনে আয়িশা।

- কি কি করলে সোয়াব পাওয়া যায় ভাবিমণি?

- যেকোনো ভালো কাজ করলেই সাওয়াব পাওয়া যায়। এই যেমন তুমি আমার সাথে সুন্দর করে কথা বলছো এটা ভালো কাজ, মায়ের সাথে সুন্দর করে কথা বললে সেটা আরো ভালো কাজ। তারপর নামাজ পড়া, কুরআন পড়া, এসব নিয়ম কানুন তো আছেই।

- এই কাজেও সোয়াব পাওয়া যায়? আমি তো ভাবতাম শুধু নামাজ পড়লে আর রোজা রাখলে সোয়াব পাওয়া যায়।

- না। সব ভালো কাজের বিনিময়ে আল্লাহ দিবেন। সেটা যতো ছোটোই হোক না কেনো।

- আচ্ছা ভাবিমণি! আমার বাবাও তো মারা গেছে। তাহলে কি বাবার জন্য এমন এটা ব্যাংক বানাবো? যেনো বাবাও সোয়াব পায়? ভালো থাকে?

- বানাবে! বানালে তো খুব ভালো হয়। আসো আমি বানিয়ে দেই।

প্রস্তাব উত্থাপিত হতে না হতেই সেটা গৃহীত হয়ে যায়। খুব উৎসাহের সাথে পুরাতন একটা মোবাইলের বাক্স দিয়ে একট ব্যাংক বানায় মাহিবা। রঙিন কাগজ দিয়ে চারপাশ মুড়িয়ে দেয়। উপরের চিকন চারকোনা একটা ছিদ্র করে। বাক্সটার একপাশে বড়ো করে লিখে দেয় বাবা।

ব্যাংকটা হাতে নিয়ে একভাবে চেয়ে থাকে আয়িশা। আচ্ছা এই বাক্সটা যদি জাদুর বাক্স হতো? হাত দিলেই যদি বাবাকে পাওয়া যেতো? মায়ের আলমারির এক কোণায় খুব যত্নে রেখে দেয় জিনিসটাকে।

চলমান.

(নোট: আপনারা আপ্পিতা আপুকে চেনেন? আফিয়া খোন্দকার আপ্পিতা? "স্বর্ণাভ সুখানুভূতি" গল্পের লেখিকা। আপুর একটা ই-বুক আছে, "সোলমেট"। বক্সের আইডিয়াটা সেখান থেকেই পাওয়া। জিনিসটা আমার মস্তিষ্ক প্রসূত নয়। আল্লহ আপুর লেখায় বারাকাহ দান করুক💚)